মনীষ মুখোপাধ্যায়
সারারাত ঘুম এল না শ্রীকান্ত সামন্তের। একে একে মনে পড়ছে সব কথা। সেদিন রাতে অলকেন্দু বাড়ি ফিরেছিল ধূম জ্বর নিয়ে। তিনি সারারাত ধরে সেবা করেছিলেন ওর। পরের দিন জ্বর কমলেও ওঠার শক্তি ছিল না ছেলেটার। সেই তাঁকে বলেছিল সেই ডাইনিটার কথা যার সারা শরীরে চামড়া ঝুলে নেমেছে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন অদ্ভুত টান তৈরি হয় ভেতরে। যার হাতেও নাকি কালীপ্রসাদের গল্পের ওই উগ্রার মতোই একটা লাঠি রয়েছে। এর দিন দুয়েকের মাথায়ই হঠাৎ মারা গিয়েছিল অলকেন্দু। তিনি তখন পড়ে গিয়েছিলেন অথৈ জলে। প্রফেসর রেহান সাহেব খবর পাঠিয়েছিলেন অলকেন্দুর বাড়ির লোকেদের। তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন সেখান থেকে। এরপর একাই দেখা করেছিলেন কালীপ্রসাদের সঙ্গে। কালীপ্রসাদ ওঁকে জানিয়েছিলেন দুজন শত্রু সাফ হয়ে গেছে রাস্তা থেকে। আর বাকি আছে একজন। অলকেন্দুর মৃত্যু সংবাদ শোনার পর বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন কালীপ্রসাদ।
ওহ! সেই খাটে শুয়ে অলকেন্দুর যন্ত্রণায় ছটফট করার দৃশ্য এখনও যেন চোখের সামনে ভাসছে শ্রীকান্তর। কথাগুলো মনে পড়লে আজও শিহরিত হন শ্রীকান্ত, 'কাকাবাবু একটা ভয়ংকর ডাইনি যার নাম আহুরা, সে তার মেয়েকে ফেরত চাইছে। এই আহুরাই হল কালীদার সেই উগ্রা। ওর হাতে ওই লাঠিটা ছিল কাকাবাবু। আমার সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে... আমাকে বাঁচান কাকাবাবু...ওই যে ! ওই যে! ও দাঁড়িয়ে আছে। ও আমার আত্মা নিয়ে নেবে কাকাবাবু।' যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একসময় ছেলেটা স্থির হয়ে গিয়েছিল।
এইসব কথাই তিনি কালীপ্রসাদকে বলেছিলেন। অলকেন্দুর মৃত্যুতে কালীপ্রসাদ ভেঙে পড়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু তিনি ছিলেন অন্ধকার জগতের অনুসন্ধানে ব্রতি। এত সহজে যেন কিছুই টলাতে পারত না তাঁকে। সেই রাতেই তিনি রচনা করেছিলেন প্রেত যজ্ঞ। অষ্টসিদ্ধ মহাভূতিনীদের নভস্তর থেকে নামিয়ে এনেছিলেন।
বাঁ-হাতটা মুঠো পাকিয়ে কেবল কনিষ্ঠা আঙুলটা আগে বাড়িয়ে তিনি বজ্রকণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণ করছিলেন 'ওঁ ফট্ ফট্ হুঁ হ্রীং ওঁ মহা ভূতকুলসুন্দরী হুঁ ফট্ স্বাহা...'
অনেকক্ষণ পর তাঁর মন্ত্রপাঠ শেষ হয়েছিল। শ্রীকান্ত যেন কাদের অস্তিত্ব অনুভব করছিলেন ঘরের ভেতর। কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। একটা মাদুলী কালীপ্রসাদ বেঁধে দিয়েছিলেন তাঁর হাতে। তারপর গুরুগম্ভীর স্বরে বলেছিলেন, 'মৃত্যুর পরেও উগ্রা কীভাবে ফেরত এল বুঝতে পারছি না। আপনি এই কবচ ধারণ করে থাকুন ও আপনার কাছে ঘেঁষতে পারবে না।'
'তিন নম্বর শয়তানডার কী হইব?' উৎকণ্ঠিত গলায় প্রশ্ন করেছিলেন তিনি।
'ওকে আপনাকেই খুঁজে বার করতে হবে। তারপর জোগাড় করতে হবে ওর রক্ত আর পায়ের ধুলো। পায়ের ধুলো ঠিক চিনিয়ে দেবে বেটিকে আসল শিকার। প্রত্যেকের গন্ধ চেনার ওটাই একমাত্র রাস্তা। আর রক্ত ওকে শেষ করতে সাহায্য করবে। আপনি পারবেন তো?' প্রশ্ন করেছিলেন কালীপ্রসাদ।
তিনি মাথা নেড়েছিলেন, তিনি অবশ্যই পারবেন। তাঁর ছেলে-মেয়ের প্রাণ যারা নিয়েছে তাদের শেষ তাঁকে দেখতেই হবে। দীর্ঘসময় তিনি পিছু নিয়েছিলেন ওই শয়তান আজিজের। গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য আবার বেছে নিয়েছিলেন ভিক্ষাবৃত্তি। ভিখারির বেশে তিনি সারাক্ষণ পিছু নিতেন ওই শয়তানটার। তারপর একদিন লোকটাকে একলা পেয়েই গেছিলেন তিনি। ওঁকে দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল লোকটা। ভয়ে পেয়েছিল নিশ্চয়ই! যাকে এত কষ্ট, এত পরিকল্পনা করে মারল সে বেঁচে গেল কী করে!
অচৈতন্য আজিজের শরীর থেকে একটু রক্ত আর একটু ধুলো সংগ্রহ করতে বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। তিনি ওগুলো নিয়ে গিয়েছিলেন কালীপ্রসাদের ওই রহস্যময় বাড়িটাতে। কালীপ্রসাদ জিনিসগুলো নিয়েছিলেন ওঁর থেকে।
এর দুদিন পর ওখানে গিয়ে দেখেছিলেন কালীপ্রসাদ মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। হাত-পা ফেটে বেরিয়ে আসছে রক্ত। ওই গুরুগম্ভীর স্বরের অধিকারী কালীপ্রসাদ কথা বলছিলেন মিহি স্বরে। যেন কথা বলতেও তাঁর কষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেছিলেন 'মস্ত ভুল হয়ে গেছে সামন্ত সাহেব, মস্ত ভুল! ওই বেটি লোকটার রক্ত খেতে পারেনি। ওর তৃষ্ণা মেটাতে আমাকেই রক্ত খাওয়াতে হয়েছে ওকে। আমার আয়ু আর খুব বেশি নেই। শুনুন মন দিয়ে। আপনি ওকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যান। ওর আঠেরো বছর পার হলেই ওর পৈশাচিক শক্তি দ্বিগুণ হয়ে যাবে। তখন ওকে ছেড়ে দেবেন আপনি। ও রক্তের নেশায় মেতে উঠবে। তখন ওর কাছে স্নেহ, মায়া, মমতা কিছুরই কোনও গুরুত্ব থাকবে না। ও ঠিক ওই লোকটাকে খুঁজে বের করে হত্যা করবে। ওর নাকে ওই গন্ধটা থেকে যাবে তখনও। তবে আপনি ওকে অনুসরণ করবেন। ওই ঘটনা ঘটার পরই ওর মুক্তি আবশ্যিক, নচেৎ এই পৃথিবীর কোনও অস্থিত্ব থাকবে না। আমি কালো বিদ্যার চর্চা করে জিলোনেনকে প্রতিহত করার রাস্তা খুঁজে বের করেছি।' কালীপ্রসাদ কাঁপা কাঁপা হাতে এগিয়ে দিয়েছিলেন একটা ছুরি আর একটা কালো কাপড়ের তৈরি পুতুল।
তিনি আবার বলেছিলেন, 'আপনার উদ্দেশ্য সফল হলেই এই পুতুলের বুকে বসিয়ে দেবেন এই ছুরিটা। এই ছুরিটা একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি। এর বাঁটে লেখা '০' সংখ্যাটি একে আরও শক্তিশালী করেছে। পৃথিবীর যেকোনো অপশক্তিকেই এটা দিয়ে শেষ করা যায়। আর এই কালো কাপড় হল ওর মায়ের। এই কাপড়ের তৈরি পুতুলকে শেষ করা মানে ওর নাড়ির সংযোগ কেটে দেওয়া। এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ও এই জগৎ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।' আর কথা বলতে পারছিলেন না কালীপ্রসাদ। ধীরে ধীরে তাঁর চোখ বুজে আসছিল।
'নিন কোলে তুলে নিন ওকে তারপর চলে যান যেদিকে খুশি।' চোখ বুঝে ফেলেছিলেন তিনি।
শ্রীকান্ত কোলে তুলে নিয়েছিলেন দুধের বাচ্চাটাকে। যে জন্মের পরই দুখের বদলে মাংস খেতে শিখেছে, খেতে শিখেছে রক্ত। সহদেবের সাহায্যে তিনি পৌঁছেছিলেন পরগনায়। এক অন্ধকার নিশুতি রাতে সেখানে একটা গ্রামে গিয়ে উঠেছিলেন তিনি। বিহান মুন্ডার সাহায্য না পেলে হয়তো তিনি ভেসেই যেতেন সেদিন।
বিহানের বউটা যতদিন বেঁচেছিল মেয়েটাকে কষ্ট করতে হয়নি। কিন্তু ওই মেয়ের আসল রূপ দেখেই তো মারা গেল সে! তারপর আলাদা চলে এসেছিলেন একটা ঘর তুলে। শাক-পাতা যা পেতেন ফুটিয়ে খেতেন তখন। মেয়েটার জন্য তিনি শহরে যাওয়া শুরু করেছিলেন। বুড়ো হাড়ে খেটে মাংস নিয়ে আসতেন তিনি ওর জন্য। তারপর একদিন মেয়েটার আঠেরো বছর বয়স হল। সেইদিন থেকেই তিনি কলকাতা যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু করলেন। এবার সময় হয়েছে শিকার চিনে নেওয়ার। শেষে একদিন মেয়েটাকে ছেড়ে চলে এলেন। মায়াই হবে, যা ওঁকে বলছিল মেয়েটার মুখে রক্ত লাগতে দিস না। কিন্তু পালিয়ে এসে এত বছর পরে দাদার বাড়ি আশ্রয় নিয়েও তো কোনও ফলই হল না। সেই মেয়ে যে ঠিক খুঁজে খুঁজে চলে এল! কালীপ্রসাদের কথা অনুযায়ী মেয়েটা যখন নিজের কাজ করবেই, তখন আর বাঁধা দিলেন না তিনি। এই হয়তো বিধির লিখন। মেয়েটা ঠিক গন্ধ শুঁকে চলে এসেছিল ওঁর দাদার বাড়ি। ভাগ্যিস ওদের বলা ছিল, ওঁর খোঁজ কাউকে না দেওয়ার জন্য। বেঁচে গেলেন তিনি। আর আজ এই সমাপতন। নিজের হাতে শেষ করতে হল ওকে।
চোখের কোণ থেকে জল মুছলেন শ্রীকান্ত সামন্ত। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে উঠে বসলেন খাট থেকে। কুয়াশাঘেরা কলকাতা শহরে ভোর নামতে এখনও অনেক দেরি। পিশাচী জিলোনেন আর কখনোই ফিরে আসবে না রক্তের নেশায়। স্নান সারলেন শ্রীকান্ত সামন্ত। কাচা জামাকাপড় পরে ঢুকলেন ঠাকুর ঘরে। আগে দাদা এই বাড়িটায় ভাড়া এসেছিলেন। এখন ওঁর ছেলেরা কিনে নিয়েছে বাড়িটা। বড় করে ঠাকুরঘর তৈরি করেছে একটা। দাদা, বউদি এখনও বেঁচে আছেন। ঠাকুরঘরের দরজা বন্ধ করে তিনি এগিয়ে গেলেন রাধামাধবের বিগ্রহের দিকে, যেটা তিনিই সঙ্গে করে এনেছেন। ধুতির কোঁচর থেকে বের করে আনলেন সেই নীল হীরেটা। তারপর ওটাকে আটকে দিলেন শ্রীমাধবের গলার নীচের গর্তটায়। মাথা নত করে প্রণাম করলেন তিনি, 'কুলদেবতার ঐশ্বর্য ফিরাইয়া দিতে পারছি। গ্রহণ করো রাধামাধব...গ্রহণ করো...'
মাথাটা তুলেই চমকে গেলে তিনি। একী শ্রীমাধবের মুখটা তো অবিকল কাল রাতে দেখা বাচ্চা ছেলেটার মুখের মতো! আর রাধিকার মুখটা! আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না তিনি। ধপ করে পড়ে গেলেন মাটিতে।
সূর্য ওঠার পরপরই সামন্ত বাড়ির গিন্নির স্বভাব ঠাকুরঘরে যাওয়া। তার ওপর ঠাকুরপো যবে থেকে রাধামাধবকে এনেছেন কাজ তো আরও বেড়ে গেছে। লোকটা বাংলাদেশ থেকে কোথায় যেন হারিয়ে গেছিলেন, যেটুকু কর্তার মুখে শুনেছেন সামন্ত গিন্নি। ওঁর পুরো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছিল পাকিস্তানি আর্মি। কত খুঁজেছে ওঁর দাদা নিজের ভাইকে, কোথাও পাওয়া যায়নি। শেষে এই মাস ছয়েক আগে কোথা থেকে যেন ফিরে এলেন তিনি। সঙ্গে সামন্ত বাড়ির প্রতিষ্ঠিত রাধামাধব। লোকটাকে দেখলে কেমন ক্ষ্যাপাটে লাগে সামন্ত গিন্নির!
সকাল সাড়ে ছ'টায় তিনি ঠাকুর ঘরে ঢুকতে গেলেন। ঠাকুরঘরে ঢোকার আগেই বেশ অবাক হয়ে গেলেন। ঠাকুরঘরের দরজা খোলা। দরজা ফাঁক করেই সামন্ত গিন্নি চিৎকার করে উঠলেন, 'ওরে কে কোথায় আছিস রে সর্বনাশ হইসে...'
সবাই দৌড়ে এসে দেখল মাটিতে চোখ খোলা অবস্থায় পড়ে আছেন শ্রীকান্ত সামন্ত। ডাক্তার ডাকতে ছুটল বাড়ির বড়োছেলে। ডাক্তার এসে পালস দেখে বললেন, অনেক আগেই নাকি প্রাণ বেরিয়ে গেছে। ওরা সকলেই তাজ্জব বনে গেল শ্রীমাধবের বিগ্রহের দিকে তাকিয়ে। তাঁর গলায় চকচক করছে একটা দামি নীল হীরের পাথর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন