মনীষ মুখোপাধ্যায়
১৯৯০ কলকাতা
বিজয় হেমব্রম একটা ট্রাম ধরল ধর্মতলার মোড় থেকে। ছাব্বিশ বছর বয়সেই বেশ নামডাক হয়েছে ছেলেটার। অনাথ একটা ছেলে যে কীভাবে নিজের ভাগ্য নিজেই বদলাতে পারে, এ ওকে না দেখলে বোঝা যায় না। আজ বিজয় এসেছিল মধ্য কলকাতার অফিসে একটা কাজে। এমনিতে বিজয় অফিসে খুব একটা থাকে না। সারা দেশ ঘুরে বেড়িয়ে সমাজের অনগ্রসর মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ওর কাজ। ও নিজেও উঠে এসেছে অনেক নিচু থেকেই। সেই ফাদার ফ্রেডেরারের কাছে বড় হওয়ার দিনগুলো এই ট্রামে চড়লেই মনে পড়ে যায় ওর। ফাদার ওকে নিয়ে আসতেন কলকাতায় বইপত্র কিনতে। ট্রামে চড়ে ওরা ধর্মতলা যেত বইপাড়া থেকে। সেখান থেকে গড়ের মাঠে। কী মজাই না হত ফাদারের সঙ্গে কলকাতা এলে। এখনও পুরুলিয়ায় যায় বিজয়। ফাদারকে দেখে আসে মাঝে মাঝে। ওরসঙ্গে আরও যারা পড়াশোনা করত তারাও আজ মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। এই তো সেদিন দেখা হল মোজেসের সঙ্গে, ও লালাবাজারে আছে। পুলিশের চাকরি করছে। কথায় কথায় ও জানতে পেরেছে মোজেস ওর পার্কসার্কাসের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে থাকে না। আজই একবার সন্ধের দিকে চলে যাবে আড্ডা দিতে, তেমনই কথা হয়েছে ওদের। মনে মনে ভাবল বিজয়।
ও যে বিভাগে কাজ করে সেই বিভাগের প্রধান কাজ হল অনগ্রসর মানুষদের উন্নয়ন করা। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সত্যিই ওই মানুষগুলোর উন্নয়ন দরকার। বিজয় কাজের সূত্রে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখেছে, মানুষগুলো শুধু শাকপাতা আর গাছের শিকড় খেয়ে বেঁচে আছে। দুমুঠো ভাতও তাদের ভাগ্যে জোটে না।
টুংটুং শব্দ করতে করতে ট্রাম এগিয়ে চলেছে ডিপোর দিকে। আজ নোনাপুকুরে নেমে একটা ছোট্ট কাজ মিটিয়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরবে বিজয়। একা থাকতে আর ভালো লাগেনা ওর। অফিসের পুষ্পদা আজ নোনাপুকুরে দাঁড়াতে বলেছে ওকে। একটা মেয়ের ছবি নিয়ে আসবেন তিনি। সেই মেয়েও অনাথ, মাসির সংসারে বড় হয়েছে। যদিও সে বিজয়ের মতো উপজাতি সম্প্রদায়ের নয়। মেয়েটা স্বাধীনচেতা। ভালো গানের গলা। পুষ্পদা মেয়েটার নাম বলায় বিজয় একবারেই চিনতে পেরেছিল মেয়েটাকে। মেয়েটার ছবি ও কখনও দেখেনি ঠিকই কিন্তু গান শুনেছে বেশ কয়েকবার রেডিওতে। এমন সুন্দর গলার স্বর যার, সে বিজয়কে পাত্তা দেবে এটা ভেবেই ওর লজ্জা লজ্জা করছিল।
ট্রাম থামতেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুষ্পদাকে দেখতে পেল বিজয়। মনের সুখে সিগারেটে টান দিচ্ছেন তিনি। ট্রাম থেকে নেমে বিজয় হাত নাড়ল। পুষ্পদা পদমর্যাদায় সামান্য বড় বিজয়ের থেকে। দিল দরিয়া মানুষ। একা থাকেন, বিয়ে থা করেননি। এই একাকীত্বের কষ্টটা যাতে অন্য কেউ না পায় সে বিষয়ে তাঁর একপ্রকার অলিখিত দায়িত্ব আছে যেন। এই যেমন বিজয়কে বিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি পাগল হয়ে উঠেছেন।
পুষ্পদা এগিয়ে এলেন বিজয়ের দিকে বোতাম লাগানো বুক পকেটের বোতাম খুলে একটা খাম বার করলেন। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে সেটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। তারপর বললেন, 'এই নাও ব্রাদার তোমার লতা মঙ্গেশকরের ছবি।'
বিজয় সলজ্জ চোখে তাকাল ওঁর দিকে। লোকটা খুবই রসিক প্রকৃতির। ছোটবড় জ্ঞান নেই একেবারেই। খামটা পুষ্পদার হাত থেকে নিয়ে পকেটে ভরল বিজয়। তারপর হেসে বলল, 'চলুন পুষ্পদা চা খাই।'
'যাচ্চলে! একবার খুলে দেখলে না ছবিটা, কেমন ছেলে গো তুমি?' অবাক চোখে তাকাল পুষ্পদা বিজয়ের দিকে।
'আরে, আপনি তো দেখেছেন। তাহলেই হবে। আমার অত বাছবিচার করলে চলবে?' হেসে উত্তর দিল বিজয়।
'শুধু দেখিইনি তোমার ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট সহ তোমার বায়ওডেটাখানাও সাবমিট করে দিয়েছি মেয়ের কাছে। মেয়ের মাসির তো তোমার ছবি না দেখেও তোমাকে খুব পছন্দ হয়ে গেছে। তা তোমার ছবিখানা যে আনতে বলেছিলাম, এনেছ?' পুষ্পদা হাত বাড়ালেন বিজয়ের দিকে।
জিভ কাটল বিজয়, 'ইসস, দেখুন তো কাজের চাপে পড়ে খুব ভুল হয়ে গেছে। কাল শিওর ছবি পেয়ে যাবেন।'
'থাক আর ছবি দিতে লাগবে না। ও তোমার দ্বারা হবে না বুঝতেই পেরেছি। আমিই কাজ এগিয়ে রেখেছি বুঝলে! কাল কলামন্দিরে একটা গানের অনুষ্ঠান আছে। মেয়ে আসবে সেখানে গান গাইতে। সঙ্গে তার মাসিও থাকবেন। সেখানেই দেখা করে নিও। আমিই আলাপ করিয়ে দেব। বাড়ি থেকে এটুকু এসে আমায় দয়া করে উদ্ধার করো বাবা। তোমরা তো জানো না একা থাকার কী জ্বালা!' একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করলেন পুষ্পদা।
সূর্য কখন যেন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে খেয়ালই করেনি বিজয়। চা খেতে খেতে ও হাত ঘড়িটার দিকে দেখল একবার। ওর মনে পড়ল আজ তো মোজেসের ওখানে যেতে হবে! পরেরদিন ঠিক পাঁচটায় কলামন্দিরের সামনে ও হাজির থাকবে সেই আশ্বাস দিয়ে ও বেরিয়ে এল পুষ্পদার থেকে অনুমতি নিয়ে।
পার্কসার্কাস থেকে বেগবাগানের দিকে যেতে সামান্য এগোলেই মোজেসের বাড়ি। যদিও এটা ওর বাড়ি নয়। এখানে ও ভাড়া থাকে। একটা বাড়ির পুরো একতলাটা জুড়ে মোজেস আর বেটির সংসার। মোজেসের সঙ্গে আগেরদিন যখন দেখা হয়েছিল ও আলাপ করিয়ে দিয়েছিল বেটির সঙ্গে। ওরা মাস ছয়েক হল বিয়ে করেছে। মেয়েটা বেশ মিশুকে। আলাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওকে বলেছিল বেটি, 'আপনাদের ছেলেবেলার অনেক গল্প শুনি ওর কাছে। আসুন না একদিন আমাদের ওখানে। সারাদিন গল্প করা যাবে।'
'তুই থাকিস কোথায়?' মোজেস জিজ্ঞেস করেছিল বিজয়কে।
বিজয় উত্তর দিয়েছিল, 'থাকি আর কোথায় অফিসের কাজে সারাক্ষণই তো ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। আজ পুরুলিয়া, কাল কেরালা তো পরশু বীরভূম। তবে কলকাতায় আমার ঠিকানা একটা আছে বটে। চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের উলটোদিকের গলি ধরে সোজা চলে গেলেই আমার এক কামরার ছোট্ট বাসা।'
'আরে ইডিয়ট, তোর বাড়ি থেকে আমার বাড়ি বেশিদূর না তো। তা চলে আয় না পরের শুক্রবার ছ'টার দিকে। আড্ডা মারব। বেটি ভালো রোজ ওয়াইন বানায় সেটা দুজনে মিলে ভাগ করে খাব। কতকীই তো ভাগ করে খেয়েছি বল একসময়।' হাসিমুখে বলেছিল মোজেস।
আজ সেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতেই ও চলেছে। সাতমাথা পার করে বিজয় এসে দাঁড়াল বেগবাগানের মুখের চার্চটার সামনে, পরের বাঁদিকের গলিটাতেই মোজেসের বাড়ি। ও সেদিকে ঢুকে গেল। বাড়ি খুঁজে পেতে খুব বেশি বেগ পেতে হল না। পুলিশ আর ডাক্তারের বাড়ি খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে সোজা। এলাকার সবাই চেনে সেই বাড়ি।
কলিং বেলে চাপ দিতেই খানিকক্ষণ পরে এসে দরজা খুলল বেটি। বিজয়কে বাইরে দেখে হাসল। দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলল, 'আসুন, দেখুন দেখি আপনাদের জন্য কত কষ্ট করে রোজ ওয়াইন আর ফ্রুট কেক বানিয়ে সারাদিন অপেক্ষা করছি আপনাদের গল্প শুনব বলে। ওদিকে আপনার বন্ধু ডিউটি থেকে ফিরে মুখভার করে বসে আছে।'
'কেন ওর আবার কী হল?' প্রশ্ন করল বিজয়।
'আমাকে তো বলেনি কিছুই। আপনিই গিয়ে জিজ্ঞেস করুন।'
বেটির পেছন পেছন বিজয় এসে একটা ঘরে ঢুকল। ও দেখল সত্যিই মোজেস মুখভার করে বসে আছে একটা চেয়ারে। পাশের টেবিলে অ্যাশট্রেতে বেশ কয়েকটা সিগারেটের পোড়া ফিল্টার জমা হয়েছে।
'কী হল রে ব্যাটা?'
বিজয়ের ডাকে কেমন যেন কেঁপে উঠল মোজেস। ওর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, 'ওহ তুই! বোস বোস।' সামনে একটা ফাঁকা চেয়ারের দিকে দেখাল মোজেস হাতের ইশারায়।
'আমার ডাকে অমন ঘাবড়ে গেলি কেন রে? তুই আমাকে নেমন্তন্ন করে নিজেই মন মরা হয়ে বসে আছিস। সমস্যা কী?'
'সমস্যা কিনা তাই তো বুঝতে পারছি না, তাই আরও সমস্যা হচ্ছে বুঝলি।'
মোজেসের কথায় চোখ সরু করে তাকাল বিজয়। ছেলেটা কি পাগল টাগল হয়ে গেল নাকি! ও আবার জিজ্ঞেস করল, 'আরে সমস্যার কথা কাউকে না বললে সমস্যার সমাধানও হয়না। বরং সমস্যা আরও বেড়ে যায়। বুঝলি ইডিয়ট।' কথাটা বলে হাসল বিজয়।
'একটা মেয়ে বুঝলি।' থমথমে মুখে বলল মোজেস।
'মেয়ে! বেটি জানে কিছু? তুই বাইরে এসব করে বেড়াচ্ছিস।' হালকা মজা করার জন্য কথাটা বলে ফেলেও চুপ করে গেল বিজয় মোজেসের মুখটা দেখে। কেমন যেন অসহায় লাগছে ওকে।
'সরি মোজেস। বল কী হয়েছে আমাকে। তোকে তো খুবই আপসেট দেখাচ্ছে রে।' নিজেকে সামলে নিয়ে বলল বিজয়।
'একটা মেয়ে। মেয়েটা এই আলিপুরের দিকে থাকে। একজন বুড়োলোক ওর একমাত্র অভিভাবক। তাঁরও বেশ বয়েস হয়েছে। মেয়েটার বয়েস বড়জোর আঠেরো উনিশ হবে। ওকে আমাদের এক অফিসার ধরেছিল। মেয়েটা কাঁচা মাংস খাচ্ছিল বাজারের পাশে বসে বসে। আলিপুর অঞ্চলে ওরা এসেছে মাস ছয়েক আগে। আগে ওরা কোনও ট্রাইবাল এরিয়ায় থাকত। গায়ের থেকে বুনো গন্ধটা যায়নি মেয়েটার। তবে জানিস! একেবারে অন্যরকম দেখতে মেয়েটাকে। মানে, ওর বাপের মতো অমন জংলি চেহারা নয়।' বেশ চিন্তিত দেখাল মোজেসকে।
'মেয়েটা কাঁচা মাংস খাচ্ছিল এটা তোর সমস্যা, নাকি ওর বাবাকে ট্রাইবালদের মতো দেখতে হলেও মেয়েটাকে অন্যরকম দেখতে এটা তোর সমস্যা?' হাসিমুখে প্রশ্ন করল বিজয়।
পাশের টেবিল থেকে জলের গ্লাসটা তুলে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে নিল মোজেস। তারপর হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, 'দুটোর একটাও পারে ভাই। আমার সমস্যা হল, যেদিন মেয়েটা বাজারে বসে বসে কাঁচা মাংস খাচ্ছিল, সেই রাতেই ও ওদের বস্তির একটা ঘরে রাতের অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দশ বারো বছরের একটা বাচ্চা ছেলে খাটে একা ঘুমচ্ছিল। মেয়েটা ওর ওপর আক্রমণ করে। নখের আঘাতে তুলে আনে অনেকটা মাংস। ছেলেটার বাবা পাশের ঘর থেকে শব্দ শুনে দৌড়ে এসে দেখে এই কাণ্ড চলছে। মেয়েটা নাকি ওর নখটা চাপ দিয়ে ঢুকিয়েই চলেছিল ছেলেটার বুকে। আর বেশিক্ষণ এমন চললে ছেলেটাকে বাঁচানো যেত না। পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় ছেলেটাকে হাসপাতালে পাঠানোর পরে। মেয়েটাকে বস্তির মানুষগুলো ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে রেখেছিল। ওর বাবাকেও খুব মারধর করেছিল ওরা। মেয়েটার বাপ ওদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনেক কাকুতিমিনতি করছিল। পুলিশ ঘটনাস্থলে না গেলে হয়তো মেরেই ফেলত ওরা বাপ মেয়েকে।'
'তা এতে এত চিন্তার কী আছে?' সত্যিই চিন্তার কোনও কারণই খুঁজে পাচ্ছে না বিজয়।
'চিন্তার সত্যিই হয়তো কোনও কারণ থাকত না যদি না আমি মেয়েটাকে নিজের চোখে দেখতাম! এই কেসটা খুব কাছ থেকে দেখেছেন পাহাড়িবাবু। উনি আজ অফিসে এসে বললেন, ''মোজেস সাহেব মানুষখেকো ডাইনি দেখেছেন নাকি কখনো? যদি দেখতে চান তো আজ দুপুরে আমার সঙ্গে আলিপুর থানার লকআপে চলুন। পরশু একটা কেস এসেছে বুঝলেন। এখনও কোর্টে চালান হয়নি।'' হাসলাম আমি। মানুষখেকো ডাইনি সে আবার হয় নাকি? ''আরে হয় কি হয় না একবার নিজের চোখেই দেখে আসবেন চলুন না।'' বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাটা বললেন পাহাড়িবাবু। আমিও ওর সঙ্গে চলেই গেলাম থানায়।' এটুকু বলেই হঠাৎ থামতে বাধ্য হল মোজেস। বেটি একটা ট্রেতে করে সরু সুন্দর গ্লাসের দু'গ্লাস রোজওয়াইন আর ফ্রুট কেক নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে ওদের সামনে।
মোজেস বেটিকে হাতের ইশারা একটা চেয়ার দেখিয়ে চুপকরে বসতে বলে আবার কথা বলা শুরু করল। 'মেয়েটাকে একটা আলাদা সেলে আটকে রেখেছে ওরা। আমি ওই সেলটায় ঢুকলাম সঙ্গে পাহাড়িবাবু আর থানার ইনচার্জ। মেয়েটার হাত-পাগুলো শেকল দিয়ে বাঁধা ছিল। মাথা নিচু করে বসেছিল ও। কেমন পাথরের মূর্তির মতো নিথর হয়ে বসেছিল মেয়েটা। তারপরেই একেবারে সোজাসুজি আমার দিকে তাকাল। আর আমাকে অবাক করে দিয়ে ফাদারের সেই কথাটা বলল। যেটা আমাদের ফাদার একদিন বলতেন, মানুষের এই মূল্যবান পৃথিবীতে একদিন শয়তান রাজত্ব করবে... একদিন শয়তান রাজত্ব করবে...। মেয়েটার রূপ দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এত সুন্দর মানুষ দেখতে হয়! ফর্সা টকটকে গায়ের রং, কোমর অবধি লম্বা চুল। একটা লাল ব্লাউজের ওপর আদিবাসীদের মতন করে পরা সাদা একটা শাড়ি। আমার কানের সামনে এসে মেয়েটা ফিসফিস করে বলল, ''আর একজন বেঁচে আছে তো, ওটাকেও মারব...'' তারপর ইনচার্জের চিৎকারে সে কয়েক পা সরে গেল। মাটিতে বসে হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে বিশ্রীভাবে কাঁদতে লাগল মেয়েটা। কী ভয়ঙ্কর সে কান্না উঁউ...উউ...উউউ...উঁউ...উউ...উউউ... ওহ এখনও কানে বাজছে আমার।'
'তুমি কি মেয়েটার প্রেমে পড়লে নাকি?' মজা করে প্রশ্ন করল বেটি।
কপট রাগ দেখিয়ে মোজেস উত্তর দিল, 'যা বোঝো না তা নিয়ে কথা বোলো না। আমার অবস্থায় তুমি থাকলে তোমার অবস্থাও খারাপ হত। ফর শিওর।'তারপর বিজয়ের দিকে তাকিয়ে ও বলল, 'বুঝলি বিজু! ওর বাপটাকে দিয়ে কিচ্ছু বলাতে পারলাম না। সেই লোকটার চেহারা কিন্তু অত সুন্দর নয়। সাধারণ আদিবাসীদের মতোন চেহারা তার। স্বাস্থ্য দেখে মনে হয় আগে বেশ পেটানোই ছিল, এখন বার্ধক্যের কারণে তাতে জং লেগেছে।'
এবার মোজেস বিজয়কে কিছুটা অনুনয়ের সুরেই বলল, 'দেখ না বিজু কাল দুপুরে যদি সময় বের করতে পারিস। আমি নিয়ে যাব তোকে ওর বাবার কাছে। তুই তো ট্রাইবালদের গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াস। ওদের ভাষা, ওদের সঙ্গে কথা বলার আদব কায়দা তোর জানা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস মেয়েটা ওর নয়। এর পেছনে কী রহস্য আছে আমাকে জানতেই হবে।'
'অনেক সাহেবের ঔরসেও ট্রাইবালদের সন্তান হয় এটা নিশ্চয়ই তোর জানা আছে। সে ক্ষেত্রে মেয়েটাকে ওইরকম দেখতে হতেই পারে। আর আমি গেলেই যে আমার সঙ্গে কথা বলবে তার কি মানে আছে!' ভুরু কুঁচকে বলে উঠল বিজয়।
'তাও... ইউ আর মাই লাস্ট হোপ। অ্যাটলিস্ট চেষ্টা কর, তারপর না হলে অন্য কথা। আর তারচেয়েও আশ্চর্যের ব্যাপার হল ফাদার ফ্রেডেরারের কথাগুলো ওই মেয়েটা জানল কী করে!' আকুতি নিয়ে আবার শেষবারের মতো মোজেস তাকাল বিজয়ের দিকে।
'আচ্ছা আমি কাল যাব তোর সঙ্গে। কিন্তু যে করেই হোক আমাকে কিন্তু সাড়ে চারটের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে। আমার কাল একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।' থামল বিজয়।
সন্দেহের চোখে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে মোজেস বলে উঠল, 'এমন করে বলছে যেন কালই বিয়ে করতে যাচ্ছেন বাবু।'
উত্তর এল, 'ধরে নে তাই!'
লাফিয়ে উঠল মোজেস, 'ওরে শুয়ার এতক্ষণ বলিসনি কেন? লেটস সেলিব্রেট। বেটি স্টকে যত রোজ ওয়াইন আছে সব নিয়ে এসো। আমার বন্ধুর বিয়ের আনন্দে আজ আমি মাতাল হতে চাই।'
'ওরে গর্ধব কাল আমার বিয়ে নয়। মেয়ে দেখতে যাব। অফিসের পুষ্পদা এরেঞ্জ করেছেন সবকিছু।' হাসিমুখে বলে উঠল বিজয়।
এতক্ষণের থমথমে বিষাদমাখা পরিবেশটা যেন নিমেষের মধ্যে আনন্দময় হয়ে উঠল। সদ্য কেনা টেপ রেকর্ডে মোজেস ফুল ভলিউমে এলভিস প্রেসলি চালিয়ে দিল। ফিরে এল ওদের ছেলেবেলার স্মৃতি। সেই পুরুলিয়ার মাঠে মেলা হত। সেখানে পাগলা সাহেব এসে প্রেসলির রেকর্ড বাজাতেন, ওরা দুই বন্ধু নাচত। পাগলা সাহেব খুশি হয়ে হাততালি দিতেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন