মনীষ মুখোপাধ্যায়

সিদ্ধেশ্বরীর মোড়ের থেকে একটা ছোট্ট রাস্তা চলে গেছে সামনের দিকে। এদিকটায় বেশ কিছু আদ্যিকালের বাড়ি কোনওরকমে ভিতের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটা বোম পড়লেই সমূলে ধ্বসে পড়বে তার সবটুকু। সেই রাস্তা ধরেই এগিয়ে চলল ওরা দুজন। অলকেন্দু বেশ কয়েকবার এসেছে এই জায়গাটায়, কিন্তু শ্রীকান্ত সামন্তের খুব একটা আসার দরকার পড়ে না সিদ্ধেশ্বরীর দিকে। রাস্তাঘাট অবশ্য চেনেন না এমন নয়।

অলকেন্দু চেপে ধরে রেখেছে শ্রীকান্তের একটা হাত। এখনও বেশ কষ্ট হচ্ছে তাঁর হাঁটাহাঁটি করতে। সূর্যকান্ত ডাক্তার ওঁর পা পরীক্ষা করে বলেছিলেন, 'চোট ভালোই লেগেছে তবে ভাঙেনি।' হাতের যে অংশটায় গুলি ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছিল, সেখানটা ভালো করে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিয়েছিলেন ডাক্তার ওষুধ লাগানর পরে। প্রত্যেক সপ্তাহে অন্তত দু'বার ওটাকে পরিষ্কার করে আবার ওষুধ লাগাবার নির্দেশ দিয়েছিলেন সূর্যকান্ত ডাক্তার। যে মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছেই চলে গেছে তার আবার ওষুধ পট্টি! মনে মনে ভাবলেন শ্রীকান্ত। এখন বেঁচে থাকার একটাই উদ্দেশ্য। অলকেন্দুর হাত ধরে এগোতে লাগলেন তিনি।

রাস্তাঘাট বেশ অন্ধকার। সিদ্ধেশ্বরীর এদিকিটায় আর্মির পাহারা নেই, সেই কারণে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করছেন শ্রীকান্ত। নাহলে প্রায় সময়ই তাঁকে গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। অলকেন্দুর ঘরের এক কোনায় একপ্রকার মুখ বুঝে পড়ে আছেন তিনি। ছেলেটা ওঁর যত্নআত্তির কোনও ত্রুটি করছে না। ওষুধ-বিষুধ যা লাগছে সবই এনে দিচ্ছে।

'কাকাবাবু! আপনার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?' অন্ধকারের মধ্যে গলাটা একেবারে খাদে নামিয়ে জিজ্ঞেস করল অলকেন্দু। সে জানে, যে ভদ্রলোক তার সঙ্গে এতদূর কতটা কষ্ট করে দাঁতে দাঁত চেপে এসেছে। তাও যদি কোনও অসুবিধা হয়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নেওয়া যাবে।

'কোনও সমস্যা নাই। আমরা কি আয়্যা পড়ছি?' জিজ্ঞেস করলেন শ্রীকান্ত।

'হ্যাঁ। ওই যে পুব দিকের বাড়িটা দেখছেন। ওখানেই যাব আমরা।' উত্তর দিল অলকেন্দু।

তারা আবার হাঁটতে লাগল। অন্ধকারে অনেকটাই চোখ সয়ে এসেছে অলকেন্দুর। কিন্তু শ্রীকান্তের বেশ অসুবিধা হচ্ছে। অক্ষম পা'টা টেনে নিয়ে যাওয়া যেন ভারি কষ্টের কাজ বলে মনে হচ্ছে তাঁর।

অবশেষে বাড়িটার সামনে এসে পৌঁছাল ওরা। ঝোপ জঙ্গলে ঘেরা বেশ পুরোনো দিনের বাড়ি। একমানুষ সমান পাঁচিলের সঙ্গে লেগে আছে একটা ভাঙা লোহার দরজা। দরজার ওপ্রান্তে একফালি জঙ্গল। আর জঙ্গলের শেষ প্রান্তে গায়ে মিশকালো গাঢ় অন্ধকার মেখে প্রাচীন দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে বাড়িটা। বাড়িটা কোনও এক সময় দোতলা ছিল। এখন উপরের তলাটা ভেঙে পড়েছে। বাড়ির বাইরে পাহারাদারের মতো বসে আছে দুটো কালো কুকুর। ওদের চোখ জ্বলছে অন্ধকারের মধ্যে। কুকুর দুটো ভুকভুক করে একবার ডেকে আবার মাথা নামিয়ে নিল। যেন ওরা কথা বলতে পারলে বলত, আপনারা ভেতরে যান, আমার মালিক আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

লোহার ভাঙা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল অলকেন্দু। শ্রীকান্ত লক্ষ করলেন বাইরের পোকামাকড়ের শব্দ বা ঝিঁঝি পোকার ডাক বাড়ির ভেতরে আর শোনা যাচ্ছে না। জোলো হাওয়ায় বাইরে গাছের পাতা নড়ছিল, কিন্তু এই বাড়ির ভেতরের জঙ্গুলে গাছগুলোর একটা পাতাও নড়ছে না। কোনও এক মায়াবী শক্তি যেন নিয়ন্ত্রণ করছে সবকিছুকে। খুব অশুভ কিছু যেন তার জাল বিস্তার করে রেখেছে। চাপ চাপ অন্ধকারে গাছের মাথাগুলো কেমন নীল দেখাচ্ছে। বাতাসে ছড়িয়ে আছে খুব খারাপ একটা গন্ধ। কাঁচা মাংসের বিশ্রী এবং উৎকট একটা গন্ধ যেন গ্রাস করে রেখেছে সম্পূর্ণ পরিবেশটাকে।

খালি চোখে প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অলকেন্দু পকেট থেকে ম্যাচবক্স বার করে একটা কাঠি ধরালো ফস করে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শ্রীকান্তের মনে হল, কারা যেন সরে গেল সামনে থেকে। তারা ভীষণ অশুভ। তাদের শরীর বলে কিছু নেই। তাদের বসবাস এই পৃথিবীর অন্ধকারে।

খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে অলকেন্দু বলল, 'কাকাবাবু এখানে অনেক কিছু দেখতে পাবেন। ভয় পাবেন না। ভয় পেলে খুব খারাপ হবে।'

একটা ঢোঁক গিলে শ্রীকান্ত অলকেন্দুর পেছনে চলতে লাগলেন। তিনি যাদের ভয় পাচ্ছেন তারা মানুষের চেয়ে ভয়ানক নয় হয়তো।

একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল ওরা। ঘরের ভেতর থেকে মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। খুব সুন্দর একটা সুর বাজছে। দরজার সামনে পৌঁছে অলকেন্দু হালকা টোকা দিল তাতে। তারপর কারও উদ্দেশে জিজ্ঞেস করল অনেকটা অনুমতি চাওয়ার ঢঙে। 'কালীদা আসব?'

ভেতর থেকে বেশ গম্ভীর গলায় কেউ বলে উঠলেন, 'এসো অলকেন্দু! তোমার অপেক্ষাতেই বসে আছি এতক্ষণ।'

শ্রীকান্ত ঘরের ভেতর ঢুকে চমকে উঠলেন। তাঁর পেটের ভেতরে সবকিছু কেমন গুলিয়ে উঠল। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে ভেতরের এই দৃশ্য সহ্য করা বেশ কঠিন!

ঘরটার ভেতর একটা লালচে মায়াবী আলো তার জাল বিস্তার করে রেখেছে। দম আটকে যাওয়া একটা পচা গন্ধ পাক খেয়ে বেড়াচ্ছে বাতাসে। তারমধ্যেই একটা বড় আরাম কেদারা দখল করে বসে আছেন একজন মধ্য বয়স্ক মানুষ। যাঁর বয়স শ্রীকান্তের চেয়ে অনেক কমই হবে। লোকটার মাথায় চুল খুব কম। বেশ বড়ো দাড়িতে মুখ আর গলার অনেকটা অংশ ঢাকা পড়েছে। লোকটার গায়ে কালো রঙের আলখাল্লার মতো একটা পোশাক। তাঁর ঠিক সামনে একটা টেবিলে রাখা আছে একটা বেশ পুরোনো গ্রামোফোন, সেই গ্রামোফোনটার চোং দিয়ে বেরিয়ে আসছে একটা অদ্ভুত মায়াকাড়া সুর। আর তাঁর পাশেই ডান দিকে একটা কাঠের দোলনায় একটা ছোট্ট শিশু দোল খাচ্ছে। উঁ-আঁ করে শব্দ করছে শিশুটা। ছোট্ট ছোট্ট হাত নেড়ে কিছু ধরার চেষ্টা করছে।

এই দৃশ্যটাই শ্রীকান্তের সবকিছু গুলিয়ে দিচ্ছে। পেট থেকে পাক মেরে উঠে আসতে চাইছে সব কিছু। ওই ছোট্ট শিশুটা কী ধরার চেষ্টা করছে সেটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। আর তাতেই তার শরীর আড়ষ্ট হয়ে গেছে ভয়ে আর ঘেন্নায়। ওই ছোট্ট শিশুটা বারবার হাত তুলে ছুঁতে চাইছে জিনিসটাকে। দোলনার উপরের কাঠের পাটাতনে যেমন ঝোলানো থাকে ঝুমঝুমি, ঠিক সেইভাবেই এই দোলনাটার কাঠের পাটাতনে ঝুলছে কাঁচা মাংসের একটা বড়ো টুকরো।

ঘরের মাঝে বসা ভদ্রলোক চোখ মেলে তাকালেন। তারপর শ্রীকান্তের উদ্দেশে বললেন, 'এই সুরটা এই বাচ্চাটাকে অবশ করে রেখেছে। এই দুনিয়ায় ভগবান, মানুষ, শয়তান, সবাই সংগীতের কাছে জব্দ। সংগীত আমাদের মোহের মধ্যে নিয়ে যায়। এই মোহ আছে বলেই না ওই শয়তানের বাচ্চাটা এইভাবে খেলা করছে! ওই মাংসের টুকরো আর সংগীত ওকে আমার কাছে চুপ করে শুয়ে থাকতে বাধ্য করছে। না হলে ওইটুকু শিশুই সারা পৃথিবী তছনছ করে দিতে পারে। কী বুঝলেন?'

ভদ্রলোকের কথাগুলো শুনে শ্রীকান্ত শিউরে উঠলেন। বলে কী! শয়তানের বাচ্চা! সেটা আবার কী? উনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই ভদ্রলোক বলে উঠলেন, 'আমার কাছে সমস্যায় না পড়লে কেউ আসে না। বিশেষ করে কঠিন কোনও সমস্যা, যা মানুষের দ্বারা সমাধান করা সম্ভব নয়। আপনি আপনার সমস্যার কথা কিছু বলবেন না আমাকে। বরং আমিই বলব এবং প্রতিকার করব, অবিশ্যি যদি তা করার মতো পরিস্থিতিতে থাকে!'

শ্রীকান্ত সামন্ত বেশ হকচকিয়ে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন কালো আলখাল্লা পরা ভদ্রলোকের দিকে। তারপর জিজ্ঞাসু চোখে চাইলেন অলকেন্দুর দিকে।

'কাকাবাবু! উনি কিছু কাজ আপনাকে করতে বলবেন। সেগুলো আপনি করবেন। তারপর উনিই বলে দেবেন কী করার আছে আমাদের।' অলকেন্দু বলল।

বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়লেন শ্রীকান্ত। এখন একটু ভয় ভয় করছে তাঁর। প্রতিশোধের আগুনে এ কেমন সমিধ পড়ছে! তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি প্রশ্ন করলেন, 'আমারে কী করতে হইব?'

আরাম কেদারাটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক তারপর এগিয়ে গেলেন ঘরের অন্য প্রান্তে। একটা হ্যারিকেনের সলতেতে আঁচ দিলেন। তারপর ঘরের কোণ থেকে একটা কাচের বোতল নিয়ে এসে রাখলেন শ্রীকান্তের সামনে। নিজের পাশে হ্যারিকেনটা রেখে আবার আরাম করে বসলেন তিনি।

শ্রীকান্ত বোতলের ভেতরটা দেখে আঁতকে উঠলেন। বোতলের ঘোলা জলে ভেসে বেড়াচ্ছে পাখির পা আর ঠোঁট। ভদ্রলোক একটা চিরকুট এগিয়ে দিলেন শ্রীকান্তের দিকে। তারপর নির্দেশের সুরে বললেন, 'ওই কাগজে আপনার নাম লিখুন ন'বার। লেখা হলে সরু ফালি করে কাগজটা ওই বোতলে ঢুকিয়ে দিন।'

ভদ্রলোকের নির্দেশ মতো শ্রীকান্ত নিজের নাম লিখে ওই কাগজটা বোতলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। ওঁর হাত থেকে বোতলটা নিয়ে ভদ্রলোক সেটাকে ঝাঁকাতে লাগলেন। বোতলের জলের রং লাল হয়ে উঠতে লাগল ধীরে ধীরে। কুঁচকে যেতে লাগল ভদ্রলোকের ভুরু। চিন্তার ভাঁজ পড়তে লাগল তাঁর কপালে। শ্রীকান্ত অনুভব করলেন একটা ভোঁতা ব্যথা হচ্ছে তাঁর বুকের ঠিক মধ্যিখানে। ভদ্রলোক সজোরে বোতলটা কেদারার হাতলে নামিয়ে রাখলেন। বিস্মিত চোখে তাকালেন শ্রীকান্তের দিকে।

'শ্রীকৃষ্ণকে আমিষ ভোগ কে দিয়েছে আপনার বাড়িতে? এটা পাপ। মহাপাপ! সেই পাপের শাস্তিই ভোগ করেছে আপনার গোটা পরিবার। আপনার ছেলে, আপনার মেয়ে, বউমা সবাই মারা গেছে দারুণ কষ্ট পেয়ে। আপনি আমার কাছে এসেছেন তারই প্রতিকারের জন্য। আগে আপনি আপনার দেবতার কাছে ক্ষমা চাইবেন। তবেই আমি এর প্রতিকার করব।' থামলেন ভদ্রলোক।

শ্রীকান্ত অবাক হয়ে ভাবতে লাগল। তাঁর বাড়িতে রাধামাধবের সেবা হয়। আমিষ আহার ঢোকে না। তাহলে এটা কী করে সম্ভব! তবে ছেলেমেয়েদের আমিষ খাওয়ার ব্যাপারে তিনি কখনো বারণ করেননি। এটা তো কারণ হতে পারে না। ভদ্রলোকের কথা হল, কেউ শ্রীহরির উদ্দেশে আমিষ ভোগ দিয়েছে। তার বংশে এটা কেউ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।

শ্রীকান্ত সামন্ত প্রায় কেঁদে পড়লেন। 'আমার বাড়িতে এ কাজ করার কেউ নাই। কেউ ছল কইরা এই কাজ করছে। আমারে আপনে উদ্ধার করেন। মাইয়াডা মরণের আগে বিহিত চাইছিল।'

'তাহলে এটাও ওরাই করেছে। শ্রীকৃষ্ণের ওই মূর্তিটা ছিল খুবই শক্তিশালী, ওটার প্রভাবে আপনাদের কোনও ক্ষতি হত না। আর আমার মনে হয় ওই মূর্তির মধ্যে মূল্যবান কিছু একটা ছিল, যেটা মূর্তিটাকে অপবিত্র না করলে পাওয়া যাবে না। তাই ওরা ওটার গুণ নষ্ট করার জন্য এই পাপ কাজ করেছে। এরফলে আপনাদের কুলদেবতার আপনাদের রক্ষা করতে পারেনি। আপনি তাও মনে মনে ক্ষমা চেয়ে নিন দেবতার কাছে।' ভদ্রলোক একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলেন।

ভদ্রলোকের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কুলদেবতার উদ্দেশে মাথায় হাত ঠেকালেন শ্রীকান্ত। 'হে রাধা-গোবিন্দ কোনও ভুল কইরা ফ্যালাইলে ক্ষমা কইরা দাও...'

ভদ্রলোক কথা বলতে শুরু করলেন, 'অলকেন্দু আমার পরিচয় আপনাকে দিয়েছে কিনা জানি না। আমি হলাম কালীপ্রসাদ কালী। আপনি মনে মনে ভাবতেই পারেন নামটা ভীষণ অদ্ভুত। কিন্তু এরও একটা ইতিহাস আছে। এই কালী উপাধিটা আমাদের বংশের একমাত্র সম্পদ। আমরা চার পুরুষ আগে ছিলাম সান্যাল। লালগোলার রাজবংশের দ্বারা আমাদের এই উপাধি প্রাপ্তি। চার পুরুষ আগে আমাদের বংশে দক্ষিণা কালী পূজার পত্তন ঘটে। সেই থেকেই এই কালী উপাধি। আমাকে অবশ্য টেনেছিল সৃষ্টির অন্ধকার দিকটা। সেই অন্ধকারের টানেই বাড়ি ছেড়েছিলাম একদিন। আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, ঘুরেছি সব জায়গায়। দিন কাটিয়েছি নানান সব উপজাতিদের সঙ্গে। তাদের জাদুবিদ্যা আমাকে দারুণ আকর্ষণ করত। এইভাবেই একদিন পৌঁছই মায়ং নামের একটা জায়গায়। আসাম থেকে সে জায়গা খুব বেশি দূরের পথ নয়। সেই অঞ্চলের পাশ থেকে বয়ে গেছে পাগলপারা ব্রহ্মপুত্র নদ। কিন্তু ওদের জাদুর অনেক কিছু শিখলেও, যে অন্ধকারের খোঁজ আমি করছিলাম সে জিনিস সেখানে ছিল না।'

কথার মাঝে একটা বিরতি নিলেন কালীপ্রসাদ। শ্রীকান্ত সামন্ত তাঁর দিকে একভাবে তাকিয়ে রইলেন। উসখুস করতে লাগল অলকেন্দুও। কালীপ্রসাদ ঘরের অন্ধকার কোণটার দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর স্বরে কারও উদ্দেশে বলে উঠলেন, 'এই যা! যা বলছি! এখনও খাওয়ার সময় হয়নি...'

শ্রীকান্ত সামন্ত আর অলকেন্দু দুজনেই সেই অন্ধকারের দিকে চাইলেন কিন্তু দেখা গেল না কাউকেই। শুধু মনে হল গাঢ় কালো কিছু একটা সরে গেল নিমেষের মধ্যে। দুজনেই জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন কালীপ্রসাদের দিকে। কালীপ্রসাদ হাসলেন। 'ও কিছু না পিশাচের বাচ্চাদের খিদে পায় খুব!' কথাটা তিনি এমন ভাবে বললেন যেন কোনও ভিখারি তার ঘরের কোণে এসে দাঁড়িয়ে ছিল, তিনি তাড়িয়ে দিলেন।

'অবশেষে উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ের কোলে আমি খুঁজে পেলাম একটা গ্রাম। মেঘালয়ের খুব কাছে, কিন্তু সকালের সূর্যের আলোয় যেন সেই গ্রামকে শ্মশানের নিস্তব্ধতা শুষে নিয়েছে। রুক্ষ ঘরগুলোর সামনে যেন প্রাণের কোনও অস্তিত্ব নেই। গ্রামের বাইরে একটা মড়া গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার ঠিক নীচে পাথরের বেদির উপর বসেছিল এক বৃদ্ধা। তার পোশাক ছিল ভীষণ অদ্ভুত! সে হাতে ধরেছিল একটা প্রকাণ্ড লাঠি। বুড়ির গায়ের গন্ধ যেন মানুষের মতো ছিল না। দিন তিনেক কোনও বাসি মড়া পড়ে থাকলে যেমন গন্ধ পাওয়া যায়, সেই বুড়ির গা থেকে বেরচ্ছিল তেমন একটা গন্ধ। অনেকটা পথ চড়াই-উতরাই করে শরীর ছিল ক্লান্ত। অগত্যা বসে পড়েছিলাম ওই মড়া গাছতলায়, বুড়ির পায়ের কাছে।'

'ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বুড়ি আমাকে বলল, ''এই গ্রামে কেন এসেছ? এই গ্রামে কেউ আসে না। এখানে কোনও পুরুষ মানুষ থাকে না। এই গ্রাম চালায় মেয়েরা। পুরুষকে তাদের লাগে নিজের শরীরের খিদে মেটাবার জন্য। তাদের কোনও পুরুষ সন্তান হলে ওই পাহাড়ের খাদের থেকে ফেলে দেয় তারা। রেখে দেয় শুধু কন্যা সন্তান।'' কথা শেষ করে একটা পাহাড়ি বাঁকের দিকে আঙুল দেখাল বুড়ি। সেই বাঁকের নীচে নেমে গেছে খাঁড়া একটা পাহাড়ি খাদ। আমি তাকিয়েই শিউরে উঠলাম। এ কেমন মানুষজন! সদ্যজাত পুত্র সন্তানকে পাহাড়ের খাদে ফেলে দেয়!'

'আমি আর ভূমিকা না করে আমার উদ্দেশ্যর কথা জানালাম বুড়িকে। আমি এসেছি সৃষ্টি ও শক্তির অন্ধকার দিক নিয়ে জানতে। তাকেই খুঁজে চলেছি নানা জায়গায়। আমার কথা শুনে হাসল বুড়ি, ''তুমি তাহলে ঠিক জায়গাতেই এসেছ বাপু! এই গ্রাম অন্ধকারেরই গ্রাম। আমরা এখানে জ্ঞানের উপাসনা করি। অন্ধকারকে না জানলে জ্ঞান সম্পূর্ণ হয় না। তাই মৃত্যু আর কালো নিয়ে খেলতে খেলতেই আমরা জ্ঞানী হয়ে উঠি। তবে সন্ধে না নামলে তুমি এখানে কারও দেখাই পাবে না। আমি অনেক অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি এই জীবনে, করেছি অনেক জপ তপ সাধনা। অনেক রক্তের বিনিময় পেয়েছি সেই শক্তি, যে শক্তির ফলে সকালের আলোতেও এই গ্রামের যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতে পারি।'' বুড়ির কথায় বেশ ভয়ের উদ্রেক হল। কিন্তু ততদিনে কেমন করে যেন জেনে গিয়েছিলাম সহজে আমার মৃত্যু নেই। এর আগে বহু পথ দুর্ঘটনায় আমার প্রাণ যেতে যেতেও রক্ষা পেয়েছে। অগত্যা দেখার চেষ্টা করলাম কীসে কী হয়!'

'সন্ধে হতেই পরিবেশ বদলে গেল সেই গ্রামের। কালো পোশাক পরা মেয়েদের দেখা যেতে লাগল গ্রামের আনাচেকানাচে। সবাই আমার দিকে তাকায়, কিন্তু কাছে আসে না। সেই মেয়েদের অসাধারণ রূপ। চোখের তারায় খেলা করছে কামনার আগুন। ওদের মধ্যে একটি মেয়ে সাহস করে আমার দিকে এগিয়ে এল। আমার হাতটা ধরল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ছিটকে সরে গেল কয়েক পা। বুড়িকে ওদের ভাষায় কী একটা বলল। বুড়ি আমার দিকে তাকাল সন্দেহের চোখে। হাতের লাঠিটাকে আকাশের দিকে তুকে কীসব বলতে লাগল অজানা ভাষায়। এতক্ষণ আমি লক্ষ করিনি, এই প্রথম দেখলাম লাঠিটার মাথায় আটকে আছে একটা পাখির খুলি। দুর্বোধ্য সেই কথাগুলো সুর করে বলে চলল বুড়ি। আমি অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম সামনের দৃশ্য। হঠাৎ হল কি এই বুড়ির!'

'কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ করেই একটুকরো লাল মেঘে ছেয়ে গেল আকাশটা। শব্দ করে একটা বাজ পড়ল মড়া গাছটার একটা ডালে। বুড়ি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল পোড়া ডালটার দিকে। সেটার আকার থাকলেও, ভেতরে ভেতরে আসলে ছাই হয়ে গেছিল। একটা কাপড়ে করে সেই ছাইটা কুড়িয়ে বুড়ি হুংকার দিয়ে কাউকে একটা ডাকল। বছর চোদ্দের একটা মেয়ে এগিয়ে এলো ভিড়ের মধ্যে থেকে। বুড়ি তার কপালে লাগিয়ে দিল সেই ছাইয়ের কিছুটা। একটানে তার কালো পোশাক খুলে তাকে নগ্ন করে দিল বুড়ি। তারপর বাকি ছাইটুকু নিয়ে লাগিয়ে দিল তার স্তনে আর গোপনাঙ্গে। আমি হতবাক হয়ে দেখছিলাম সবকিছু। সামনে যা হচ্ছিল তা বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল না।'

'কখন মেঘ কেটে গেছিল খেয়ালই করিনি আমি। সামনের দৃশ্য আমাকে এতটাই অবাক করে রেখেছিল। ''মুসাফির!'' আমাকে ডাকল বুড়ি। আমি যন্ত্রচালিতের মতো দাঁড়ালাম তার সামনে। বুড়ি বলতে শুরু করল, ''আমরা হলাম ডাইনি! এই গ্রাম হল ডাইনির গ্রাম। বহুযুগ আগে আমাদের অন্ধকার জগতের ঈশ্বর আমাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন এখানে এসে বসতি স্থাপন করতে। আমরা তাই করেছি। মানুষ রূপে সেই ঈশ্বরের কন্যা আমাদের গর্ভে জন্ম নেবেন এমন নির্দেশ ছিল। কিন্তু এত বছর পরেও তাঁর জন্ম হয়নি। তিনি বলেছিলেন, যদি অন্ধকার সাধনার কোনও উপাসক এই গ্রামে আসেন এবং তার বীর্য আমাদের কারও গর্ভে ধারণ করা যায়, একমাত্র তবেই তাঁর কন্যার জন্ম হতে পারে। আর চাই এমন একজন ডাইনির কন্যা সন্তানকে, যে তেরো বছর বয়স অবধিও ঋতুমতী হয়নি। ডাইনির সন্তানেরা আট বছর থেকে দশ বছরের মধ্যেই ঋতুমতী হয় এই গ্রামে। কিন্তু এই রঙলী এখনও ঋতুমতী হয়নি। হয়তো তোমার অপেক্ষাতেই ঈশ্বর ওকে রজঃস্বলা করেননি এতদিন। তুমি এই গ্রামেই থাকো। ঘর বাঁধো রঙলীর সঙ্গে। অন্ধকার জগতের সব বিদ্যা, যা আমার জানা আছে তোমায় শেখাব।'' বুড়ির কথা শুনে মনে হল, আমি ঠিক যা চাইছিলাম তাই পাবো এবার। থেকে গেলাম সেই গ্রামে।'

উসখুস করতে লাগলেন শ্রীকান্ত সামন্ত। লোকটা তো তাঁর জীবন কাহিনি নিয়ে পড়লেন। তাঁর মেয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধের কথা প্রায় কিছুই বলছেন না। অলকেন্দু কিছু ধৈর্য হারায়নি। সে একমনে শুনে যেতে লাগল সবকিছু। শ্রীকান্তের মনের ভাব বোধহয় বুঝতে পারলেন কালীপ্রসাদ। তিনি বললেন, 'বাবু! এই কথাগুলো না শুনলে আমি আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে কী প্রয়োগ করতে যাচ্ছি আপনি জানতে পারবেন না। সাবধান থাকতে হবে আপনাকেও।'

'আপনে বলেন। বয়স হইলে ধৈর্য থাহে না।' উদাস ভাবে বলে উঠলেন শ্রীকান্ত।

'ওই ঘটনার পরের দিন সকালে উঠে আমি আবার কাউকে দেখতে পেলাম না। একটা কাঠ আর খড় দিয়ে তৈরি ঘরে আমাকে থাকতে দেয়া হয়েছিল। কাঠ, চকমকি পাথর আর একটা বড় হাঁড়ি দিয়ে গেছিল ওরা। কাঁচা মাংস আর কিছু শাকসবজি দেয়া হয়েছিল, যাতে আমি রান্না করে খেতে পারি। কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালালাম খিদের তাড়নায়। ওই শাক সেদ্ধ করেই খেলাম কোনওরকমে। তারপর বের হলাম বাইরে। গ্রামটা ঘুরে সত্যিই অদ্ভুত লাগল আমার! প্রত্যেক বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলাম প্রাণের শব্দ, কিন্তু কোথাও যেন কেউ নেই। এমনকি দেখা পেলাম না সেই বুড়িরও। অগত্যা অপেক্ষা করতে লাগলাম সন্ধে হওয়ার। বসে পড়লাম মড়া গাছতলার নীচে।'

'সন্ধে হতেই ফিরে এল গ্রামের জৌলুস! যেন উৎসব লেগে গেছে। একটা মন কেমন করা সুর বাজতে লাগল বাতাস কেটে কেটে। সেই বুড়ি এসে দাঁড়ালো মড়া গাছের তলায়। আমাকে ডেকে বলল, ''শোনো বাছা! আজ রঙলী রজঃস্বলা হয়েছে। এটাকে চমৎকারও বলতে পারো অথবা শয়তানের ইচ্ছে। আজ তোমাদের বিয়ে দেওয়া হবে। তারপর তোমার কুটিরে দুজনে থাকবে একসঙ্গে। এখনই শয়তানের কন্যা ভূমিষ্ঠ হবেন না। এ এক দীর্ঘ তপস্যার ব্যাপার। তোমাকে এবং রঙলীকে একই সঙ্গে সেই তপস্যা করতে হবে। তুমি রাজি তো বাছাধন?'' বুড়ির কথায় মাথা নাড়লাম আমি। আমার প্রবল আগ্রহ হতে লাগল বিষয়গুলো দেখে। তার চেয়েও বড় কথা হল বুড়ি আমাকে আগের দিনই বলেছে, সে আমাকে অন্ধকারকে জানার সব কৌশল শেখাবে। সেই লোভ যেন সংবরণ করা যায় না। বুড়ি হেসে বলল, ''অবশ্য রাজি না হলেও আমাদের কিচ্ছু এসে যেত না। ওই খাদের কিনারা তোমার জন্য অপেক্ষা করত।'' এমন শান্তভাবে কারো জীবন কেড়ে নেওয়ার কথা আমি আগে কাউকে বলতে শুনিনি।'

'এক অদ্ভুত উপাচার পালনের মাধ্যমে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। আমাকে নগ্ন করে সারা শরীরে মাখানো হল নীল রং। দাঁড় করানো হল একটা বৃত্তের মাঝখানে। বৃত্তের তিন দিকে রাখা হল তিনটে কুকুরের কাটা মাথা। বৃত্তের চারদিকে উন্মাদের মতো নাচতে নাচতে ঘুরতে লাগল একদল মেয়ে। ওরা ওদের সুরেলা গলায় যেন কীসব বলে চলেছিল অবিরত। এবার দেখলাম, রঙলীকে ওরা আমার পাশে এনে দাঁড় করিয়ে দিল। সেও আমার মতোই নগ্ন এবং গাঢ় নীল রঙে রাঙানো। তার থাই বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। খেয়ালই করিনি বুড়ি কখন এসে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে। সে রঙলীর থাই থেকে সামান্য রক্ত নিয়ে লাগিয়ে দিল তার লাঠির মাথার ওই পাখির খুলিটার কপালে। তারপর একটা ধারাল পাথর দিয়ে আমার হাতে চেটোতে লম্বালম্বি একটা দাগ টানল। নিমেষের মধ্যে বেরিয়ে এল ফিনকি দিয়ে রক্ত। উল্লাসে নেচে উঠল বুড়ি। সেই রক্ত হাতের পাতায় নিয়ে বুড়ি লাগিয়ে দিল রঙলীর কপালে। রঙলী কেঁপে উঠল থরথর করে, ও ঢুকে পড়ল আমার বৃত্তের মধ্যে। আমাকে জড়িয়ে ধরল। বুঝতে অসুবিধা হল না ও কী চাইছে! একটা মাটির পাত্রে বুড়ি আমাদের রক্ত সংগ্রহ করল। একটা ভেঁড়া জাতীয় প্রাণীকে টেনে আনল দুজন মেয়ে। বুড়ি তার সামনে রাখল সেই পাত্র। ভেঁড়াটা ঠোঁট ডুবিয়ে খেতে লাগল সেই তরল। সবাই সুর করে কিছু বলে উঠল। আমাদের ঘিরে নাচতে লাগল সবাই। বুড়ি চেঁচিয়ে উঠল, ''আমাদের পুজো গ্রহণ করেছেন মহান ঈশ্বর। এবার ঠিক পাঁচ বছর পর তাঁর কন্যা জন্ম নেবেন রঙলীর গর্ভে।'' সবাই যেন অজানা এক ভাষায় জয়ধ্বনি দিতে লাগল সুরের তালে তালে।'

'আমাদের সংসার শুরু হল। সারাদিন রঙলী ঘরের কোনায় কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে থাকত। যেন একটা মড়া পড়ে রয়েছে। প্রাণের কোনও স্পন্দন নেই বিন্দুমাত্র। সন্ধে হলেই বুড়ি নানান কালো বিদ্যার অনুশীলন করাতো আমায়। প্রত্যেক পশুর ভেতর একজন করে অপদেবতা বাস করে। এ আমি তার থেকেই জেনেছিলাম। সেই পশুর সঙ্গে মানুষের কোনও সংযোগ ঘটাতে পারলেই জন্ম নেয় এক শক্তিশালী রাক্ষস। একজন ক্ষমতাশালী জাদুকর যেমন তাকে কাজেও লাগাতে পারে, একই ভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারে। ডাইনির সঙ্গে সহবাস করা জাদুকরের ক্ষেত্রে খুবই সহজ তাদের নিয়ন্ত্রণ করা। তারা যদি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েও ফেলে কোনই ক্ষতি হবে না জাদুকরের। সাধারণ তান্ত্রিক তাদের বশ করে রাখে ঠিকই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারালে তাদের মৃত্যুও হয়। কালো জাদুকরের ক্ষেত্রে তা হয় না। আমি রাতে ফিরে আসতাম কুটিরে। সুস্বাদু নানান খাবার রান্না করে রাখত রঙলী। খাওয়া শেষ করেই একটা পানীয় আমার হাতে তুলে দিত ও। সেটা পান করার পরেই শরীরে বোধ করতাম অসীম শক্তি। সারারাত চলত আদর আর প্রেমের ভয়ানক খেলা। হ্যাঁ সে খেলা ভয়ানকই ছিল বটে। মাত্র তেরো-চোদ্দোর রঙলী যেন একুশ বছরের যুবতিটি ছিল। ডাইনিদের ক্ষেত্রে তেমন হয় হয়তো। বুড়ির মতে ওটাই ছিল ডাইনিদের শরীর সাধনার অঙ্গ। সভ্য সমাজের মানুষ হয়ে আমার কাছে ব্যাপারটা আপত্তিকর ছিল। কিন্তু সেই সাধনায় যুক্ত না হলে হয়তো প্রাণ চলে যেত আমার।'

'দেখতে দেখতে কোথা থেকে পাঁচ বছর পার হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না! ততদিনে আমি কালোবিদ্যার অনেক কিছুই জেনে গেছি বুড়ির থেকে। এক রাতে রঙলীর কাছে যেতেই ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল সে আমায়। দুর্বোধ্য ভাষায় আমাকে কিছু একটা বলল। তার চোখে মুখে তখন খেলে বেড়াচ্ছে বিশ্রী একটা কাঠিন্য। কপট রাগ দেখিয়ে সে একটা জলের পাত্র দেখাল আমাকে। তারপর বলল সেই পাত্র থেকে কিছুটা জল তার পেটে ঢেলে দিতে। আমিও ওর কথা মতো তাই করলাম। আমি পাত্রটা উলটে দিলাম ওর পেটের উপর, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল পুরো জলটাই ওর নাভি দিয়ে ঢুকে যেতে লাগল। একটুকুও পড়ল না বাইরে। সেই দৃশ্য দেখে বিকট শব্দে হাসতে লাগল রঙলী। আমি ওই রাতেই ছুটে গেলাম বুড়ির কাছে। ঘটনা শুনে তো বুড়ি লাফাতে লাগল আনন্দে। সে বলল, '' বাছা! শয়তানের মেয়ে ওই ডাইনির গর্ভে এসেছে। এবার সে জন্মাবে। দ্রুত পরিবর্তন হবে তোমার রঙলীর শরীরের। সে দিন দিন রোগগ্রস্ত হয়ে পড়বে। মাত্র তিনমাস পরেই সে জন্ম নেবে, মাত্র তিনমাস...'' বিশ্রী শব্দে ভয়ংকর একটা হাসি হাসতে লাগল বুড়ি।'

'বুড়ির অমন কাণ্ড দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। জানতাম শয়তানের মেয়েকে জন্ম দেওয়ার জন্যই এই ডাইনিদের গ্রামে একটা মানুষের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে একটা মেয়েকে। যে তার বিয়ের সময় নাবালিকা ছিল। রঙলী মেয়েটা ডাইনির সন্তান কিনা জানি না আমি। কিন্তু তার যে ভালোবাসা পেয়ে এসেছি এতদিন, তা তো মানুষের মতোই ছিল। মায়া বড় খারাপ জিনিস! আমি রঙলীর সঙ্গে মায়ায় জড়িয়ে পড়েছিলাম। আমি বুড়িকে জিগ্যেস করেছিলাম, ''এবার তাহলে রঙলীর কী হবে?'' বুড়ি তার জঞ্জাল ভরতি ঘরে কিছু একটা খুঁজছিল। সে এতটাই অন্যমনস্ক ছিল যে, আমার কথা তার কানেই যায়নি। খুঁজতে খুঁজতেই সে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে, ''কিছু বললে বাছা!'' আমি আবার একই প্রশ্ন করেছিলাম, ''আমি জিজ্ঞেস করলাম, এবার তাহলে রঙলীর কী হবে?'' বুড়ি একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল আমার। ওর নিশ্বাস আমার গায়ে লাগছিল। ''এই ডাইনির গ্রামে আমরা অনেক অনেক বছর ধরে সাধনা করে আসছি শয়তানের কৃপা লাভ করার জন্য। পশু, পাখি, মানুষ সবই শয়তানের নামে উৎসর্গ করেছি আমরা। তারপর একদিন তিনি প্রসন্ন হয়েছেন, আমাদের জানিয়েছেন কী ভাবে তিনি আমাদের মাঝে আসবেন। এই রঙলী আর তুমিই হলে তাকে নিয়ে আসার আধার। শয়তানের বাচ্চা যেদিন জন্ম নেবে সেদিনই মারা যাবে তোমার রঙলী। আর তোমার সব বিদ্যা শেষ হয়ে যাবে। তোমাকে চলে যেতে হবে এই গ্রাম থেকে। আমরা শয়তানের মেয়েকে পেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠব। তার উপস্থিতিই বিনাশের কারণ। সে চাইলে সব শেষ করে দিতে পারে। তাকে নিয়ন্ত্রণ করাও বেশ কঠিন কাজ। জ্যান্ত মানুষকে সে গিলে নিতে পারে। কোনও মানুষের রক্ত তার মুখে লাগলে সে সেই মানুষকে না খাওয়া অবধি নিস্তার নেই। তোমরা কেউই পারবে না তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। তাই রঙলীর মৃত্যু হলে সেই বাচ্চা থাকবে আমার কাছে। তুমি কিন্তু বাচ্চার প্রতি মায়া না বাড়িয়ে ফিরে যেও। কী বুঝলে বাছা!'' বুড়ির কথা শুনে আমার খারাপ লাগল। শয়তানের উপাসনার নৈবেদ্য আমার রঙলী! বড় মন খারাপ হয়ে গেল আমার।'

'বুড়ি আমার হাতে একটা রুপোর পয়সা বেঁধে দিল। সেটাই সে খুঁজছিল এতক্ষণ। ওটা বাঁধতে বাঁধতে বুড়ি বলল, ''দেখো বাছা! এটা হল একটা কবচ। তোমার রঙলী যতক্ষণ না বাচ্চার জন্ম দিচ্ছে ততক্ষণ ও নিজেই শয়তানের মতো আচরণ করবে। তোমার জীবন খুব একটা সুরক্ষিত নয়। এই কবচ তোমাকে ওই মেয়েটার থেকে বাঁচাবে। যদিও শয়তানের বাচ্চা এলে আর এই কবচের ক্ষমতা থাকবে না কোনই। তোমার বাড়ির সামনে প্রত্যেকে দিন চারটে করে মোরগ পৌঁছে দেওয়া হবে। রঙলী এখন থেকে কাঁচা মাংস খাবে। তুমি খেতে দিয়ে ওর থেকে দূরে সরে যেও। আর এই নাও, এই কালিটা দিয়ে রঙলীর চারপাশে গণ্ডি দিয়ে দেবে। না হলে বিপদ। এখন যাও তুমি।'' আমি বুড়ির হাত থেকে কালির পাত্রটা নিয়ে ফিরে এলাম নিজের বাড়ি।'

'সে রাতে ভালো ঘুম হল না আমার। পরেরদিন থেকে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন লক্ষ করলাম রঙলীর মধ্যে। অত সুন্দরী মেয়েটা যেন রাতারাতি কালো কুৎসিত একটা বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে। এক রাতের মধ্যেই বেশ উঁচু হয়ে উঠেছে ওর পেটটা। জিভটার রং কেমন বেগুনি হয়ে গেছে। যে মেয়েটা দিনের আলোয় অচেতন হয়ে পড়ে থাকত, সে দিনের আলোকেও আর তোয়াক্কা করছে না। ছটফট করছে, আর উচ্চারণ করে যাচ্ছে না না রকম দুর্বোধ্য সব শব্দ। আমি বেশিক্ষণ সে দৃশ্য সহ্য করতে পারলাম না। বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। বাইরে এসেই দেখতে পেলাম ওই সকালে বুড়ি আমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে উলটো হয়ে ঝুলছে চার চারটে মোরগ। ওগুলো বেঁচে আছে। পায়ে দড়ি বাঁধা বলে নিজেদের ছাড়াতে পারছে না। বুড়ি আমাকে নির্দেশ দিল, ''এগুলো ওকে খেতে দাও। তুমি সেই খাওয়ার দৃশ্য সহ্য নাও করতে পারো। তবে অন্ধকারকে জানতে বেরিয়েছ তুমি, তোমার মন শক্ত। চাইলে তুমি সেই দৃশ্য দেখতেও পারো। আর হ্যাঁ! এগুলো ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই গণ্ডিটা কেটে ফেলো।'' আমি তার হাত থেকে মোরগগুলো নিয়ে ঘরে ঢুকলাম। আমায় দেখে লাফিয়ে এগিয়ে এল রঙলী। ও যেন কেমন একটা ভয়ংকর পিশাচের মতো হয়ে উঠেছে। আর একটু দেরি করলেই আমার মৃত্যু অনিবার্য, কেউ যেন বলে উঠল ভেতর থেকে। আমি ওর দিকে ছুঁড়ে দিলাম জ্যান্ত মোরগগুলোকে। ও ঝাঁপিয়ে পড়ল ওগুলোর ওপর। আমি সময় নষ্ট না করেই ওর চারপাশে বুড়ির দেওয়া কালিটা দিয়ে গণ্ডি কেটে ফেললাম। তারপর সরে এলাম জায়গাটা থেকে।'

'অন্ধকারকে খুঁজতে খুঁজতে কত বড় অন্ধকারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম তার কোনও আন্দাজই আমার ছিল না। যদি না সেদিন রঙলীর রূপ দেখতাম! আমি সরে এসে দাঁড়িয়েছিলাম দরজার বাইরে। বুড়ির নির্দেশে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু একটা সামান্য ফাঁক রেখেছিলাম দরজায়, যাতে ভেতরে কী হচ্ছে দেখতে পারি। আমি দেখে ছিলাম ছাল-বাকল সমেত দুটো মোরগকে খাচ্ছিল রঙলী। একসঙ্গে দু দুটো মোরগকে ওইভাবে খাওয়া দেখে কেঁপে উঠেছিল আমার বুক। বাকি মোরগ দুটো মাটিতে পড়ে ছটফট করছিল। ওরা হয়তো বুঝতে পারছিল ওদেরও সময় হয়ে এসেছে। এর পরের ঘটনাটা দেখার জন্য যেন প্রস্তুত ছিলাম না আমি। সে এক ভয়ংকর দৃশ্য। আমি দেখেছিলাম...আমি দেখেছিলাম... একটা মোরগকে রঙলী চেপে ধরেছে নিজের পেটের সঙ্গে। আর অদ্ভুতভাবে সেটা ঢুকে যাচ্ছে ওর নাভি দিয়ে। দেখেছিলাম, প্রাণ বাঁচাবার শেষ আশাটুকু নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আছে মোরগের মাথাটা, সে চিৎকার করছে... কিন্তু নিমেষের মধ্যে যেন কিছু একটা টেনে নিল ওটাকে রঙলীর পেটের ভেতরে। তারপর সে তুলে নিয়েছিল চতুর্থ মোরগটাকে। এরপরের দৃশ্য দেখার মতো মানসিক জোর বা শক্তি কোনোটাই আমার ছিল না। সরে এসেছিলাম কয়েক পা। বুড়ি হেসেছিল আমায় দেখে। ''বলেছিলাম কিনা বাছা, ও তুমি সহ্য নাও করতে পারো। এই তিনমাসে তোমাকে শয়তান সাধনার কিছুটা শেখাবো। যাতে তুমিও শয়তানকে ভয় না পেয়ে তার সঙ্গে মিলেমিশে যেতে পারো, সেই চেষ্টাই করব আমি।'' আমি বুড়ির কাছে হাত জোর করেছিলাম। পারলে তিনি আমাকে সেই সাধনা শিখিয়ে দিন।'

'দেখতে দেখতে কেমন করে যেন কেটে গেছিল তিন তিনটে মাস। সেদিন সকাল থেকেই পাহাড়ের ঢালে নেমে এসেছিল প্রচণ্ড ঠান্ডা। সামনের খাদটায় কাছে দাঁড়ালে নীচের উপত্যকার কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। মেঘে ঢেকে গিয়েছিল চারিপাশ। মাঝে মাঝেই নামছিল ঝুম বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি যেন বাড়িয়ে দিচ্ছিল শীতের মাত্রা। ঘরের এককোণে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল রঙলী। বৃষ্টির মধ্যেই আমি চেষ্টা করেছিলাম বেরিয়ে যেতে, যদি বুড়িকে একবার ডেকে আনা যায়! কিন্তু অত প্রবল বৃষ্টিতে বাইরে বেরনোর মানে ছিল নিজের মৃত্যুকে ডেকে আনা। ওই গ্রামটা এমনিই ছিল রুক্ষ ধরনের। সেই রুক্ষ মাটিতে বৃষ্টির জল পড়ে রাস্তা হয়ে উঠেছিল বিভীষিকা। ওই রাস্তায় পা ফেলে চলা একপ্রকার দুঃসাধ্য কাজ ছিল। পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বৃষ্টির জল ঢালের দিকে নিয়ে চলে যাচ্ছিল। ধ্বস নামছিল এদিকে ওদিকে। রঙলীর কষ্ট চোখে দেখা যাচ্ছিল না। অগত্যা বেরিয়ে পড়েছিলাম। একটা ভারী গাছের ডালকে শক্ত করে ধরে কোনও মতে পার করেছিলাম রাস্তা। বুড়ি আমাকে দেখে হেসেছিল, ''কী হে বাছাধন! আজ কি সময় হয়েছে?'' আমি আমতা আমতা করে বলেছিলাম, ''আপনি শিগগির চলুন, রঙলীর ব্যথা হচ্ছে।'' বুড়ি আর দেরি না করে বেরিয়ে এসেছিল আমার সঙ্গেই।'

'রঙলীকে দেখেই বুড়ি বলে উঠেছিল, ''আজ তার আসার সময় হয়েছে বলেই না প্রকৃতি এমন উন্মাদের মতো হয়ে উঠেছে! নাও তুমি ওর হাতটা ধরো। এই ঘরের উত্তরে একটা পাথর আছে দেখেছ নিশ্চয়ই! ওই পাথরেরে পেছনে আছে একটা গুহার মুখ। সেই গুহায় ওকে নিয়ে যেতে হবে। সেখানেই জন্ম নেবে সে।'' পাথরটা সরিয়ে দেখেছিলাম বুড়ির কথা এক বর্ণও মিথ্যে নয়। সেখানে সত্যিই একটা গুহা রয়েছে। অন্ধকার ঘুটঘুটে সেই গুহায় রঙলীকে কাঁধে তুলে ঢুকে পড়েছিলাম আমি। গুহার ভেতরটা ছিল অসম্ভব স্যাঁতসেঁতে। আমার পেছনে পেছনে এসে বুড়ি একটা প্রদীপ জ্বালিয়েছিল। তার আলোয় দেখতে পেয়েছিলাম বিকট দর্শন দুই মহিলাকে। যাদের নাকের জায়গায় ছিল প্রকাণ্ড দুটো গর্ত। চোখগুলো যেন জ্বলছিল প্রদীপের আলোর চেয়েও বেশি দীপ্তি নিয়ে।'

''ওদের দেখে ভয় পাচ্ছ নাকি? ওরা হল সেই ডাইনি, যাদের না আছে জীবন না আছে মৃত্যু! এই মৃতের গ্রামে সন্ধে নামলে প্রাণ ফিরে পায় ডাইনিরা, কিন্তু ওরা এই গুহা ছেড়ে কোথাও বেরতে পারে না। শয়তানে বেটি এলেই ওদের মুক্তি হবে। ওরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। তারপর ওরা আমাদের মাঝে আবার ফিরে আসতে পারবে। নাও এবার ওই পাথরের উপর ওকে শুয়ে দাও।''

'আমি বুড়ির কথামতো কাজ করেছিলাম। শুয়ে দিয়েছিলাম রঙলীকে একটা পাথরের ওপর। স্যাঁতসেঁতে গুহার গা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল বৃষ্টির জল। বুড়ি নিজের হাত কেটে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ফেলছিল রঙলীর মুখে। ও ছটফট করছিল। তীব্র বেদনায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল বারবার। ওই দুই কুৎসিত মহিলা পাক খেয়ে খেয়ে বৃত্তাকারে ঘুরছিল আমাদের চারপাশে। রক্ত দিয়ে রঙলীর সারা শরীরে আঁক কাটছিল বুড়ি। এই দৃশ্যটাই ঠিক সহ্য হচ্ছিল না আমার। মনে হচ্ছিল, আমি ভদ্র সমাজে মানুষ হওয়া একটা লোক হয়ে এই অশিক্ষাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি কীভাবে! কিছু সময়ের জন্য হলেও কেঁদে উঠেছিল প্রাণ। রঙলীকে আমি হয়ত ভালোবেসে ফেলেছিলাম! সেখানেই মস্ত বড় ভুলটা করে ফেলেছিলাম আমি। বুড়িকে বাঁধা দেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম ডাইনিদের তৈরি বৃত্তের মধ্যে।'

হঠাৎ থেমে গেলেন কালীপ্রসাদ। দোলনার ভেতর বাচ্চাটা মাংসের নাগাল পেয়ে গেছে। অলকেন্দু আর শ্রীকান্ত সামন্ত অবাক হয়ে দেখলেন বাচ্চাটার হাতে রয়েছে মাংসের টুকরোটা। আর সে মহানন্দে তার ছোট জিভ বের করে চেটে নিচ্ছে মাংসের গায়ে লেগে থাকা শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। কালীপ্রসাদ আর দেরি করলেন না। তিনি আর একটুকরো মাংস আবার ঝুলিয়ে দিলেন দোলনায়। বাচ্চাটা ততক্ষণে মাংসের টুকরোটা মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়েছে।

আঁতকে উঠলেন শ্রীকান্ত সামন্ত। 'ওইটুকু দুধের শিশু কাঁচা মাংস খ্যায়া ফ্যালায় কী কইরা!'

হাত তুলে তাঁকে শান্ত হতে বললেন কালীপ্রসাদ। তারপর বললেন, 'এই বাচ্চাটাই রঙলীর সন্তান। বাকি ঘটনা আর আজ বলব না। বাচ্চাটা...' থেমে গেলেন তিনি।

অলকেন্দু বলে উঠল, 'আপনি যে বললেন পুরো ঘটনাটা না শুনলে সবকিছু ঠিক পরিষ্কার হবে না। আমাদের প্রতিকারের সঙ্গে কীভাবে আপনার ঘটনা জড়িত তা নাকি আমাদের জানতে হবে! তাহলে...?'

'শোনো, আপাতত কাজ শুরু করতে হবে। ওই শয়তানগুলোর শাস্তি হবেই। ওদের পায়ের নীচের মাটি আর রক্ত আমাকে জোগাড় করে এনে দাও যেভাবেই হোক। তারপর আর তোমাদের ভাবতে হবে না কিছু। প্রতিশোধের সঙ্গে সঙ্গেই চলবে আমার কাহিনি।' বললেন কালীপ্রসাদ।

চিন্তায় পড়ে গেল অলকেন্দু। শ্রীকান্ত সামন্তকেও বেশ চিন্তিত দেখালো। অলকেন্দুই আবার জিগ্যেস করল, 'মেছকন্দর, এরশাদ আর আজিজের পায়ের তলার মাটি নয় জোগাড় হবে, কিন্তু ওদের রক্ত পাব কীভাবে?'

'সে বুদ্ধি তোমাকেই মাথা খাটিয়ে বের করতে হবে। তুমি ছাত্র পড়িয়ে খাও, তোমার বুদ্ধি অন্যদের থেকে আলাদা বলেই মনে হয়। ভাবলেই উপায় বের করতে পারবে।' কালীপ্রসাদ কথা বলতে বলতে আবার তাকালেন দোলনার দিকে। মাংস হাতের নাগালে একবার যখন চলে এসেছে তখন বারবার ও ধরে ফেলবে। আজ রাতটা এভাবেই কাটবে। প্রায় সাতদিন পর বেটি মাংসের নাগাল পেয়েছে।

'তোমাদের এবার যেতে হবে। আর বেশিক্ষণ এখানে থাকা তোমাদের জন্য ঠিক নয়। আমি যা পারি তোমরা তা পারো না। এবার যাও এখান থেকে।' কথাগুলো আদেশের সুরেই বলে উঠলেন কালীপ্রসাদ।

অন্ধকার নিঝুম ওই রহস্যময় বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল ওরা দুজন। পথে আর একটাও কথা হল না শ্রীকান্ত সামন্ত আর অলকেন্দুর মধ্যে। বাড়ি পৌঁছে শ্রীকান্তের শরীরটা কেমন আনচান করে উঠল। অসুস্থ বোধ করলেন তিনি। মাথাঘুরে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন, ধরে ফেলল অলকেন্দু।

'শরীর খারাপ লাগছে কাকাবাবু?' জিগ্যেস করল সে।

'ওই বাড়ি তো পুরাই শয়তানের বাসা! চারিপাশে কারা যেন ঘুইরা বেড়াইতেছে, মনে লাগে!' চোখ বড় বড় করে উত্তর দিলেন শ্রীকান্ত।

কিছু বলল না অলকেন্দু। ও জানে শয়তানদের মারতে হলে শয়তানের সাহায্য নেওয়াই একমাত্র রাস্তা। কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হয়।ও শুধু বলল, 'অনেক রাত হল কাকাবাবু। এবার শুয়ে পড়ুন।' যা দেখে বা শুনে এল ওরা তারপর আর দুজনেরই খিদে নেই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%