১৪

মনীষ মুখোপাধ্যায়

কাল অনেক রাত অবধি আর্মি ব্যারাকে খাওয়া-দাওয়া হয়েছে। এরশাদের মন বেশ খুশি খুশি রয়েছে। ক্যাপ্টেন স্যার বলেছেন ওকে শান্তি বাহিনীর একটা পদ দেওয়া হবে। আর মাংস কাটতে হবে না এরশাদকে। এই ইনফর্মারের ছোটলোকি কাজ করে আর কটা টাকাই বা আসে। এদেশে পাকিস্তানি সরকারের পূর্ণ ক্ষমতা কায়েম হলে সে সরাসরি রাজনীতিতে নাম লেখাবে। মঞ্চে মঞ্চে ভাষণ দিয়ে বেড়াবে সে। লোকে তখন আর তার পেছনে তাকে মুরগি এরশাদ বলে ডাকবে না। তখন সে হবে মহান নেতা এরশাদ আলম জাহাঙ্গীর। নিজের মনেই হেসে উঠল ও। উহ! কী যে খুশির দিন আসছে। পাকিস্তানিরা ভেতরে ভেতরে কোনও গভীর ষড়যন্ত্র করছে, এটা ওদের মুখ দেখেই বুঝতে পারে এরশাদ। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রটা আসলে কী ও জানে না। জোর করে সেসব জানার চেষ্টাও করে না। ও জানে খানেদের ব্যাপারে নাগ গলালে পুরো মাথাটাই কেটে নেবে ওরা।

আজ আর দোকান খোলেনি এরশাদ। কাল ভালোই টাকা-পয়সা রোজগার হয়েছে। তা ছাড়া মহান নেতা রোজ দোকান খুললে তার গা থেকে মাংসওয়ালার গন্ধ যাবে না। দুপুর বেলাতেই সে একটা কাচের শিশি নিয়ে বসে পড়েছে। এই শিশি ওকে বেশ আনন্দ দেয়। ওই মেয়েটার চেয়েও বেশি আনন্দ দেয়।

মাঝে মাঝে খুবই আক্ষেপ হয় এরশাদের। অমন ফুলের মতো মেয়েটাকে ওরা না মারলেই পারত! কিন্তু মেয়েটা প্যারা দিচ্ছিল খুব। ওর গালের কাছটা খামচে দিয়েছিল। আর ওই রাজাকারের বাচ্চা আজিজের তো নাকটা ভেঙে দিচ্ছিল ঘুষি মেরে। ভাগ্যিস ও তখনই হাতটা মুচড়ে ধরেছিল পেছন থেকে। ইশশ! মেয়েটা বেঁচে থাকলে ওকেই শাদি করত এরশাদ।

ধুস! এসব আর ভালো লাগছে না। কবে যে শান্তিবাহিনী তৈরি হবে! শিশিটা তুলে একঢোঁক গলায় ঢালল এরশাদ। মাথাটা ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠল। আজকের মালটা খুবই কড়া। এই প্যাচপ্যাচে গরমের মধ্যে সে আরও ঘামতে লাগল। নাহ, আজ একবার সুরমার কাছে যেতে হবে। ওকে একমাত্র সুরমাই ঠান্ডা করতে পারবে এই প্রচণ্ড উষ্ণ পরিস্থিতিতে।

দুপুর বেলায়ও কেমন যেন একটা অন্ধকার ভাব আজ। বিকেলের দিকে ঝড় উঠতে পারে। ঝড়ের মধ্যে নাও নিয়ে সুরমার সঙ্গে জলে ভাসবে এরশাদ। ওহ! ভেবেই আনন্দ হচ্ছে ওর। কী সুন্দর কলাগাছের মতো শরীর সুরমার। মাথার চুল খুলে উদলা গায়ে সামনে এসে যখন বসে এমনিই মরে যায় এরশাদ। রোমাঞ্চিত হতে হতে আরও কয়েকটা ঢোঁক পরপর খেয়ে ফেলল ও।

'এরশাদ...'

কারও যেন ডাক শোনা গেল খোলা জানলার ওপার থেকে। এরশাদ সে দিকে তাকাল একবার। মেয়েলি মিঠে সুরে কেউ তার নাম ধরে ডাকল একবার। কাল বিকেলে হাতের যে জায়গাটায় চোট পেয়েছিল ও সেই জায়গাটা কেমন জ্বালাজ্বালা করে উঠল হঠাৎ। কাল বিকেলের পর ওটার দিকে নজরই ছিল না ওর। সেই কোন ছোটবেলা থেকে মুরগি কাটছে ও, এমন কতবার কেটেছে। আঙুলের ব্যাপারটা গুরুত্ব দিল না ও। উঠে দাঁড়িয়ে জানলার কাছে গেল এবার। কিন্তু বাইরে কাউকেই দেখতে পেল না। কেউ ওর নাম ধরে ডেকেছে এটা স্পষ্ট শুনেছে ও।

জানলার কাছ থেকে ফিরেই আসছিল ও কিন্তু আবার শুনতে পেল কেউ ডাকছে 'এরশাদ!'

'ডাকে কেডায়?' গলা চড়িয়ে প্রশ্ন করল ও এবার।

কোনও উত্তর এল না। আবার জ্বালা করতে লাগল ওর আঙুলের কাটা জায়গাটা। এতটাই জ্বালা করতে লাগল, মনে হয় এখনই কেউ একটা ধারালো কিছু দিয়ে একটা পোঁচ মেরেছে আঙুলের ওপর। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে একটু মদ ক্ষতটার ওপর ঢেকে দিল ও। সঙ্গেই সঙ্গেই বুকের কাছে একটা চাপা ব্যথা অনুভব করল এরশাদ। যেন কেউ সজোরে একের পর এক কিল মারছে বুকের মাঝখানে। চারিদিক অন্ধকার হয়ে এলো ওর। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না এরশাদ। ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। মাথার পেছনটায় লাগল ভীষণ জোরে। চোখ বুঝে আসতে লাগল ওর। কেমন যেন একটা ঘোর মত লাগছে। কারা যেন ওর চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লম্বা লম্বা কাঠি দিয়ে একটা গোল দাগ টানছে ওকে ঘিরে। তাদের গায়ে বড়ো বড়ো আলখাল্লা পরা।

আলখাল্লায় সারা শরীর ঢাকা কেউ একজন ঢুকে পড়ল গোল দাগটার ভেতর। সে তার আলখাল্লার আড়াল থেকে একটা ছোট্ট বাচ্চাকে বের করল। তারপর বাচ্চাটাকে মাটিতে ছেড়ে দিল। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করল এরশাদ কিন্তু পারল না। ওর পেশিবহুল শরীরটা যেন সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। বাচ্চাটা হামা দিতে দিতে উঠে এল ওর গায়ের ওপর। এরশাদের সারা শরীরে যেন কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, দাউদাউ করে জ্বলছে যেন ওর সর্বাঙ্গ। বাচ্চাটা হাঁ করল। ছোট্ট ছোট্ট দাঁতের মাঝে চকচক করছে ধারালো দুটো দাঁত। ওইটুকু চোখে কেমন যেন নেশা লেগে আছে। রক্তের নেশা...

হাত দিয়ে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইল এরশাদ বাচ্চাটাকে। তার আগেই বাচ্চাটা ধারালো দাঁত দুটো বসিয়ে দিল ওর বুকের ওপর। ঝরঝর করে রক্ত বেরিয়ে এল। মাটি ভেসে যেতে লাগল রক্তে। চিৎকার করে উঠল এরশাদ। কিন্তু সেই চিৎকার কেউ শুনতে পেল না। পাড়াপড়শি ওকে এড়িয়ে চলে। ভালোমন্দ বলতে এলে গাল খায়। তাই ওর চিৎকারে কারও কিছুই এসে যায় না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%