২৫

মনীষ মুখোপাধ্যায়

মাস দুয়েক কেমন করে পার হয়ে গেল বিজয় বুঝতেই পারল না। সে রাতে বড্ড ঝামেলা পোয়াতে হয়েছিল ওদের। তিন তিনটে ডেডবডির ঝামেলা তো কম কথা না। ভাগ্যিস মোজেস ছিল নাহলে অনেক সমস্যাতে পড়তে হত।

আজ ওর আর দোয়েলের বিয়ে। কোর্ট ম্যারেজের পর একটা ছোটখাটো পার্টি দিয়েছে বিজয়। খুব সামান্য ক'জনকেই ডাকা হয়েছে পার্টিতে। একে একে সবাই এসে অভিনন্দন জানিয়েছেন ওদের। পুষ্পদা মজায় মজায় মাতিয়ে রেখেছেন অনুষ্ঠানটা। উনি এক একটা কথা বলছেন আর সবাই হো হো করে হাসছে। এত আনন্দের মধ্যেও ফাদার ফ্রেডেরার এককোণে একটা চেয়ারে বসেছিলেন মাথা নিচু করে। ওঁর বিষাদমাখা মুখটা বারবার চোখে পড়ছিল বিজয়ের।

ধীরে ধীরে কমে এল আমন্ত্রিতদের ভিড়। ফাদারেরে সামনে গিয়ে দাঁড়াল বিজয়। 'ফাদার আপনাকে এত বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন? আপনি কি এ বিয়েতে খুশি নন?' ও ফাদারকে জিজ্ঞেস করল।

প্রৌঢ় মানুষটা মাথা তুলে তাকালেন ওর দিকে। হাসলেন একবার। তারপর চাপাস্বরে বললেন, 'আমি খুবই খুশি হয়েছি বিজয়। তাবে একটা বিষয় আমাকে বড়ো ভাবাচ্ছে। ওই মেয়েটা কি আদৌ মানুষ ছিল! আর একটা ব্যাপার হল ওই রাতে ও মোজেসকে আক্রমণ করতে গেলে তুমি যখন ওর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লে ও থেমে গেছিল কেন?'

বিজয় কিছু বলল না মাথা নিচু করে শুনল শুধু। তারপর সেইভাবেই বলল, 'আমারও একটা খটকা থেকেই গেছে ব্যাপারটা নিয়ে জানেন ফাদার! ওই মেয়েটা কয়েক মিনিট আগেও হিংস্র একটা পিশাচী ছিল আর যেই দোয়েল ওই গানটা ধরল অমনি শুনতে শুনতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল! আর সবকিছু এক নিমেষেই যেন শেষ হয়ে গেল।'

ফাদার ফ্রেডেরার মাথা নাড়লেন বিজয়ের কথা শুনে, 'ঠিকই বলেছ বিজয়। আমি এত বছর চার্চের সঙ্গে যুক্ত থেকেও এই পৃথিবীর গোপনে লুকিয়ে থাকা রহস্যগুলোর কিছুই বুঝতে পারলাম না। তুমি জানো বিজয়, আমি ওই মুন্ডা বৃদ্ধ মানুষটার সঙ্গে সেই বাড়িটায় গিয়েছিলাম। যেখানে ওই মেয়েটা ওর বাবার খোঁজে ওঁকে নিয়ে গিয়েছিল। ওরা স্বীকার করেছিল ওদের কাকা ওই বাড়িতে এসে উঠেছিলেন এত বছর পর, তাঁর সঙ্গে ছিল ওদের কুলদেবতার মূর্তিযুগল। ওরা আগে ওদের মিথ্যে বলেছিল ওদের কাকার নির্দেশেই। আমি ওই কুলদেবতার মূর্তি দেখে অবাক হয়ে যাই। শ্রী রাধিকার মুখটা আমার অবিকল ওই মেয়েটার মতো লেগেছিল! পৃথিবীর সব দেবীই কি একইরকম সুন্দর হন! প্রশ্নটা তাড়া করছিল আমায়। হন বোধহয়, কখনও তিনি মায়ের মতো স্নেহময়ী আবার কখনও প্রতিশোধের তাড়নায় রক্তপিপাসু! আর একটা ব্যাপার জানলে তুমি আরও আশ্চর্য হয়ে যাবে, যে রাতে ডক অঞ্চলে ওই ঘটনাটা ঘটেছিল ঠিক তার পরের দিনই রহস্যজনকভাবে ওই বাড়ির ঠাকুরঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় সেই ভদ্রলোককে। যাঁকে মেয়েটা বাবা বলত।'

এই খারাপ ব্যাপারটা নিয়ে আর ভাবতে ইচ্ছে হল না বিজয়ের। ও দূরে তাকিয়ে দেখল বেটি আর মোজেস খুব আনন্দ করছে। ভিড় কমার পরে ফাদারের স্কুলের বাচ্চাদের খেতে বসানো হয়েছে। দোয়েলকেও বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে আজ।

'চলুন ফাদার এবার খেয়ে নেবেন।' একজন পিতাকে যেভাবে তার পুত্র আবদার নিয়ে ডাকে সেভাবেই ডাকল বিজয়। ফাদার হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালেন এবার। আজ এই খুশির দিনে তাঁরও ওসব ভাবতে আর ভালো লাগছে না। বিজয় ওঁদের থাকার ব্যবস্থা করেছে কলকাতার একটা হোটেলে। কাল ভোরে উঠেই বাচ্চাদের নিয়ে তাঁকে ফিরতে হবে।

সেদিনের সেই কেসটা পুলিশের কাছেও বেশ রহস্যজনক মনে হয়েছে। ওই পাগল মেয়েটার সঙ্গে ডক অঞ্চলের কুখ্যাত মাফিয়াদের কী সম্পর্ক তাঁরা বুঝতে পারেনি আজও। যদিও এটা নিয়ে খুব একটা জলঘোলা হয়নি। কেস ক্লোজ করে দিয়েছেন তাঁরা এর মাস খানেক পরেই।

ফাদার যাওয়ার সময় প্রাণভরে আশীর্বাদ করলেন নবদম্পতিকে। তারপর বিজয়ের কানের কাছে মুখটা নিয়ে এসে ফিসফিস করে বললেন, 'আমার মন কেমন কু গাইছে মাই বয়! আজ রাতটা একটু সাবধানে থেকো। ওই মেয়েটা তোমাকে দেখে স্থির হয়ে গিয়েছিল কেন, এই প্রশ্নটা বারবার মাথায় আসছে। তবে কি ওই পিশাচীটার তোমার প্রতি কোনও টান হয়েছিল!' ফাদারকে বেশ চিন্তিত দেখাল, 'নাহ! গড ব্লেস ইউ মাই সন--তোমরা সুখে থেকো। বিপদ এলে ঈশ্বরকে স্মরণ কোরো তিনিই রাস্তা বলে দেবেন। টান বড় খারাপ জিনিস। মায়ার টানেই সবাই বাঁধা পড়েছে। ঈশ্বরও সেই টান অগ্রাহ্য করতে পারেন না। যে কোনো টানকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে না পারলে সে থেকেই যায়, চলে গেলেও ফিরে আসে।'

সবাই একে একে বেরিয়ে গেলেন বাড়িটা থেকে। আজ থেকে ওই বাড়িটা শুধু ওদের দুজনের। ওদের দুষ্টু-মিষ্টি সংসার শুরু হবে এখানে। অনেক রাত হয়েছে। বিজয় ঘরে ঢুকল। সারাদিন বেশ খাটাখাটনি গেছে। আরামে ও মাথাটা এলিয়ে দিল দোয়েলের কোলে। দোয়েল ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, 'তোমার ছেলেবেলার গল্প শুনতে চাই।'

হাসল বিজয়। 'আমার ছেলেবেলার তো অনেক গল্প। সেসব বলতে গেলে আজ রাতটা তো পার হবেই বরং কাল রাতের মধ্যেও শেষ হবে কি না জানি না।'

দুজনেই হেসে উঠল খুব জোরে। ওদের আজ সারারাত বিনা কারণেই হাসি পাবে। বিয়ের পর প্রথম রাতে সবারই অকারণে হাসি পায়। মাথার কাছের জানলাটা খোলা থাকায় একটা মিষ্টি হাওয়া আসছে বসন্তের গন্ধ বুকে নিয়ে। শীতের আমেজ অনেকটাই কমে এসেছে কলকাতা থেকে।

'তবে খুব অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটেছিল আমার সঙ্গে। তখন আমি অনেক ছোট। ফাদারের চার্চ থেকে অদূরেই ছিল একটা মাঠ। সেখানে চৈত্রমাসে গাজনের মেলা বসত। সেখানেই একা একা চলে গেছিলাম কাউকে না জানিয়ে। মেলায় গিয়ে ভয়ে আমার শরীর খারাপ লাগছিল। অত বড় বড় চেহারার মানুষগুলো বঁটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, কিন্তু কিচ্ছু হচ্ছিল না ওদের। আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলাম। আমার মাথায় এসে হাত রেখেছিলেন এক সাধুবাবা। তিনি বলেছিলেন ওরা তো সন্ন্যাসী, ওদের কিছু হয় না বাবা। চলো তুমিও ঝাঁপাবে, দেখো তোমারও কিছু হবে না। আমি সাধুবাবার কথায় কেমন যেন বোকা হয়ে গেলাম। আমিও সত্যিই ঝাঁপ দিলাম, কিচ্ছু হল না আমার। সাধুবাবা হেসে বলেছিলেন তোমার ভেতর একটা সম্মোহনী ক্ষমতা আছে গো বাবা। মানুষ, দৈত্য, ভগবান সবাই তোমায় ভালোবাসবে।'

গল্পটা বলে, খুব হাসল বিজয়। দোয়েলও হেসে উঠল। সে বলল, 'তাই না তাই, নাহলে আমি কি আর বশ হতাম?'

'বশ হয়েছ বুঝি?'

দুজন যেন আরও ঘন হয়ে এল, একে অপরের কাছাকাছি চলে এল ওরা। তার তখনি চিৎকার করে ছিটকে সরে গেল দোয়েল। 'দেয়ালে ওটা কী!' ভয়ে কুঁকড়ে গেল ওর শরীরটা।

বিজয় তাকাল দেয়ালের দিকে। সেও স্তম্ভিত হয়ে গেল জিনিসটা দেখে। একতাল মাংসপিণ্ড যেন চার হাত-পায়ে আটকে রয়েছে দেয়ালের গায়ে জানলার ঠিক ওপরেই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওটা ঝাঁপ দিল দোয়েলের দিকে। কী করবে বুঝতে পারল না বিজয়। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওটাকে সরাতে চেষ্টা করল ও। কিন্তু ওটা যেন দোয়েলের গায়ের সঙ্গে লেগে রয়েছে। কোনওভাবেই ওটাকে সরানো যাচ্ছে না। তাহলে কি কোনও টান তৈরি হয়েছে ওই পিশাচীটার সঙ্গে বিজয়ের! যন্ত্রণায় ছটফট করছে দোয়েল। ওকে বাঁচাতেই হবে। মনে মনে স্মরণ করল বিজয় ঈশ্বরকে। হে প্রভু যিশু আমাদের রক্ষা করুন, আপনি আমাদের রক্ষা করুন।

'ও আমার রক্ত খাচ্ছে...বিজয় প্লিজ কিছু করো...ওকে আমার ওপর থেকে...' আর কিছু বলতে পারল না দোয়েল। কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে ও। চোখগুলো কাপালে উঠে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। পাগলের মতো কেঁদে উঠল বিজয়, 'প্লিজ লর্ড জিসাস ক্রাইস্ট...' আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল ও। জিনিসটাকে দোয়েলের শরীর থেকে সরাতেই হবে।

ওই পিশাচীর কী এমন টান এখনও অবশিষ্ট আছে যার জন্য ও ফিরে আসবে! ওর বাবা মারা গেছেন, শত্রুকে নিজের হাতে শেষ করেছে ও। তাহলে! বিজয় নিজেই কি সেই টান, যা অগ্রাহ্য না করতে পেরে ও অন্ধকার থেকে ফিরে এসেছে? নিজেকেই শেষ করে দিতে হবে। দোয়েলকে বাঁচাতেই হবে। বোকার মতো সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল বিজয়। ঠিক তার আগের মুহূর্তে একঝলক বিদ্যুতের মতো মাথায় এল কথাটা। মেয়েটার সেই ছবিটা এখনও আছে। যেটা পুলিশ রেকর্ডের জন্য মোজেস রেখেছিল। কোনও কারণে ওটা শেষমেশ বিজয়ের কাছেই থেকে গেছিল।

দ্রুত বিজয় পাশের ঘরে ছুটে এল। ওর লেখার টেবিলের দেরাজটা খুলে বের করে আনল ছবিটা। আর এক মুহূর্তও দেরি করা চলবে না। কোনওমতেই দেরি করা চলবে না। ফাদারের কথা মতো টানটা শিকড় থেকে উপরে ফেলতে হবে। দেশলাই কাঠি ঠুকে আগুল জ্বালালো বিজয়। তারপর ছবিটার নীচে আগুনের শিখাটা নিয়ে এল। দাউ দাউ করে ধরে গেল ছবিটা।

ওই মাংসপিণ্ডের ভেতরেও প্রাণ আছে কি না জানা নেই। কিন্তু ওটা দোয়েলের শরীর থেকে ছিটকে পড়ল মাটিতে। ওটার সারা শরীরও যেন উত্তাপে জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। ছটফট করছে ওটা। একটা বিশ্রী শরীর হীম করে দেওয়া শব্দ বেরিয়ে আসছে ওটার থেকে। যেন কেউ প্রচণ্ড কষ্টে আর্তনাদ করে উঠছে। একসময় ওটা স্থির হয়ে গেল।

দোয়েলের জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করল বিজয়। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকাল ও। জ্ঞান ফিরলেও ও যেন কেমন দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর দেরি করল না বিজয়। মোজেসকে ফোন করল ও। রাতেই মোজেস আর বেটি চলে এল বিজয়ের বাড়ি। মাংসপিণ্ডের ঘটনাটা ফোনে বলায় মোজেস ফাদারকেও সঙ্গে এনেছে।

ফাদার তাকালেন মাংসপিণ্ডটার দিকে। পকেট থেকে পবিত্র জল বের করে ছিঁটিয়ে দিলেন ওটার ওপর। বললেন, 'আমার মন বলছিল আজ একটা কিছু ঘটবেই। বিজয়ের প্রতি হয়তো একটা টান জন্মে গিয়েছিল মেয়েটার। এই পৃথিবীতে ওর কিছু জিনিসের সূত্র ধরে ওর ফেরার রাস্তা ছিল। সেই জিনিসটা হল ওর ছবিটা। সেই সূত্র ধরেই নরকের কালো অন্ধকার থেকে ও ফিরে এসেছিল। দোয়েলকে হত্যা করে হয়তো ওর শরীরেই বেঁচে থাকত পিশাচী জিলোনেন। কিন্তু বিজয় সেই সূত্রটাই পুড়িয়ে ফেলেছে। আটকে দিয়েছে ওর অভিসন্ধিকে। যাক আর বিপদ নেই। এবার এই পিণ্ডটাকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দাও।

ভোর হওয়ার আগে ব্রাহ্ম মুহূর্তে আগুনে পুড়িয়ে ফেলল পিণ্ডটাকে বিজয় আর মোজেস। মনে মনে বলল বিজয়, 'তৃষ্ণা তুমি আর ফিরে এসো না। তোমার জন্য আমার মনে কোনও জায়গা নেই...'

বেশ বেলায় ঘুম ভাঙল দোয়েলের। শরীর এখনও বেশ দুর্বল। বিজয়কে পাশে বসে থাকতে দেখে ও জড়িয়ে ধরল ওকে। তারপর আদুরে গলায় বলল, 'আমি তো একমিনিটের জন্য ভেবেই নিয়েছিলাম আর হয়তো এ জীবনে তোমার সঙ্গে সংসার করা হল না। মরেই যাব বোধহয়!'

বিজয় হাসতে হাসতে বলল, 'আমার মধ্যে যে সম্মোহনী শক্তি আছে ভুলে গেলে? কেউই তোমাকে আমার থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারবে না। সম্মোহনের টানে তোমায় আটকে রাখব।' ওরা আরও ঘন হয়ে এল দুজন।

সেই ভোরেই বাড়ি ফেরার বাসে উঠলেন একজন বৃদ্ধ মানুষ। তাঁর বুকের ঝড় যেন এই দু'মাসেও থামেনি। তাঁর শেষ অবলম্বনটুকু ছিল একটা বছর আঠেরো-উনিশের মেয়ে। তাকে তিনি আর কখনোই দেখতে পাবেন না। প্রকৃতি একদিকে শূন্য করে আবার অন্যদিকে ভরিয়ে তোলে। সেই প্রকৃতিই হলেন শ্রী রাধিকা আবার সেই প্রকৃতিই হলেন জিলোনেন।

তথ্যঋণ :

১৯৭১—হুমায়ুন আহমেদ—দেয়াল—হুমায়ূন আহমেদ মেঘমল্লার চলচিত্র

পৃথিবীর মাতৃসাধনা—নিগূঢ়ানন্দ ভূতডামরতন্ত্র—শ্রীরসিকমোহন চট্টোপাধ্যায়

বৃহৎ ইন্দ্রজাল—শ্রীদেড়ে বাবাজী প্রণীত।

অধ্যায় ২৫ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%