১০

মনীষ মুখোপাধ্যায়

মেছকন্দর উদ্দিন বেশ কৌশলের সঙ্গে বাজেয়াপ্ত করেছে সামন্তদের বসত বাড়িটা। আজিজ এজেন্টের হঠাৎই এই বাড়িটার প্রতি আগ্রহ চলে গেছিল, সে ওকে বাড়ির কাগজপত্র দিয়েদিয়েছিল। শ্রীকান্ত সামন্তের পড়শিরা খুব একটা নাক গলাতে যায়নি এ নিয়ে। এরশাদকে ওর সঙ্গে দেখে পাড়ার লোকেরা চুপচাপই ছিল। মেছকন্দর নিজেই চিৎকার করে সবাইকে জানিয়েছে ' ইন্ডিয়া যাওনের আগে সামন্ত সাহেব আমারে বাসাটা লেইখ্যা দিয়া গেছেন।'

এই অঞ্চলে আজকাল আর্মির গাড়ি টহল দিচ্ছে সকাল সন্ধে। তাই মেছকন্দর কী বলল না বলল কারো সেদিকে অত খেয়াল ছিল না। সবাই ভয়ে ভয়ে থাকে। কানাঘুষো শোনে, একটা খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে পূর্ব পাকিস্তানে। আশার বাণী শোনান কেবল বঙ্গবন্ধু। এদেশ স্বাধীন হবে...

সন্ধে নেমে আসছে চারিদিকে। পাখিরা ফিরে আসছে যে যার বাসায়। দিনের আলো বাড়লেও, রাত নামলেই বারুদের গন্ধ ভাসে বাতাসের কণায়। এই সময়টাকেই কাজে লাগাবে বলে ঠিক করেছে অলকেন্দু। সে খবর পেয়েছে, মেছকন্দর সামন্তদের বাড়ির দখল নিয়েছে। খুব সাবধানে সে এসে দাঁড়ালো বাড়িটার সামনে। এই পথ দিয়েই দোকান থেকে ফিরবে মেছকন্দর মিঞা।

এদিক ওদিক দেখে নিল অলকেন্দু। না লোকজন নেই! মেছকন্দরের পরিবার সম্ভবত এখনও এই বাড়িতে আসেনি! লোকটা প্রতিদিন এই সন্ধের দিকে এসে একবার করে বাড়িটা দেখে যায়। তিনটে ছোট ছোট কাঁটা সদর দরজার সামনে খুব সাবধানে পুঁতল অলকেন্দু। যে কোনও একটাতে লোকটা অবশ্যই পা দেবে। তারপর সরে গিয়ে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল অলকেন্দু।

বিকেলের দিকে আজ হঠাৎ বেশ ভালো ব্যবসা হয়েছে। মনটা বেশ ফুরফুরে আছে মেছকন্দরের। এই সামন্ত সাহেবের বাড়িটায় যেদিন থেকে সে পা রেখেছে সবকিছু যেন খুব ভালো হচ্ছে তার সঙ্গে। তার ওপর সামন্ত সাহেবের গোডাউনের শাড়ির স্টক বেশ ভালোই। যে যা চাইছে তাই ব্যবস্থা করে দিতে পারছে সে। মনে মনে হাসল মেছকন্দর। 'ভালা কথায় তোর লগে সওদা করতে গেলাম, শুনলি না। পুরা পরিবার নিয়া অজরাইলের প্যাঁচে পড়লি।' বিড়বিড় করে বলল সে। আনমনেই সে পা দিল দরজার চৌকাঠে। কি যেন একটা ফুঁটে গেল তার পায়ে রবারের নরম সোলের চটি ভেদ করে। গোড়ালির কাছটা জ্বালা করে উঠল নিমেষের মধ্যে। হাতের টর্চটা জ্বালল সে। পায়ের তলায় ফুঁটে রয়েছে একটা লম্বামতো লোহার কাঁটা। মেয়েরা এই কাঁটা দিয়ে চুল বাঁধে। কাঁটাটা অনেকটা ঢুকে যাওয়ার ফলে বেশ কিছুটা রক্ত বেরিয়েছে।

কাঁটাটা পা থেকে টেনে বের করল মেছকন্দর। আরও কিছুটা রক্ত বেরিয়ে এল কাঁটাটা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। এই বাড়িতে ওষুধপত্র কোথায় কী আছে সে জানে না। সে আর ঢুকল না বাড়ির ভেতর। খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে গেল রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে। আজ আর এবাড়িতে ঢোকা হল না তার। দাঁতে দাঁত পিষে সে বলল, 'আমার কপালেই এইসব প্যাঁচাল আয়া পড়ে।'

একটা রিকশাকে হাত দেখিয়ে দাঁড় করালো মেছকন্দর। তারপর সেটায় উঠে বসল। রিকশাটা বাজারের দিকে এগিয়ে গেল।

সবকিছু অলকেন্দু খেয়াল করছিল গাছের পেছন থেকে। ধীর পায়ে সে এগিয়ে এল সামন্ত বাড়ির দরজার সামনে। যে কাঁটাটা মেছকন্দরের পায়ে ফুঁটেছিল সেটা আর কোথাও দেখতে পেল না ও। সেটা বোধহয় পা থেকে বের করে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে লোকটা। তাতে কোনও সমস্যা হবে না। কাঁটাটা অনেকটাই ঢুকেছিল। লোকটা চটি পরে থাকা সত্ত্বেও বেশ খানিকটা রক্ত পড়ে আছে মাটিতে। একটা কাপড়ে রক্তটা মাখিয়ে নিল অলকেন্দু। সেটাকে পকেটে ভরে অন্য একটা কাপড়ে সামান্য ধুলো তুলে নিল সে, ঠিক যেখানে মেছকন্দরের জুতোর ছাপ আছে সেখান থেকে।

কাজ হয়ে গেছে। এবার এটা নিয়ে যেতে হবে কালীপ্রসাদের কাছে। উনি পায়ের নীচের ধুলো আর রক্ত চেয়েছিলেন। এতেই আশা করি কাজ হবে। অন্ধকারে যেমন করে এসেছিল অলকেন্দু, সেভাবেই আবার মিলিয়ে গেল।

রাত আটটার দিকেই বেশ শুনশান হয়ে এসেছে সিদ্ধেশ্বরীর মোড়। একটা রিকশা থামল মোড়ের মাথায়। দুজন মানুষ নামল রিকশা থেকে। আলোআঁধারিতে তাদের দেখা যাচ্ছে না। তারা এগিয়ে যেতে লাগল আলোআঁধারিতে ঘেরা সেই রহস্যময় বাড়িটার দিকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%