মনীষ মুখোপাধ্যায়
কালীপ্রসাদ কালী খুব সাবধানে অলকেন্দুর হাত থেকে কাপড়ের পুঁটলিটা আর রক্তমাখা কাপড়টা নিলেন। তারপর সেটা পাশের টেবিলে রেখে বললেন, 'কাল কাজ হয়ে যাবে। ডাইনিদের সন্তান যদি একবার রক্তের স্বাদ পায়, সে তার শিকারকে ছেড়ে দেবে না...'
আজও এই ঘরে বেজে চলেছে সেই বিষাদের সুর। একইভাবে দোলনায় খেলা করছে বাচ্চাটা। আজ তাকে একটা সুন্দর জামা পরিয়েছেন কালীপ্রসাদ। মাংসের টুকরোটা একটু উঁচু করেই ঝোলানো হয়েছে, যাতে সহজে ওটা হাতের নাগালে না পায় বাচ্চাটা।
অলকেন্দু দেখল জিনিসগুলো টেবিলে রেখে কেমন আনমনা হয়ে গেলেন কালীপ্রসাদ। সে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বলল, 'আগের দিন আপনি আপনার সেই ঘটনাটা সম্পূর্ণ বলেননি আমাদের। সেটা শুনতে ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছে।'
সায় দিলেন শ্রীকান্ত সামন্তও। তাঁর মনেও বেশ একটা আগ্রহ জন্মেছে কালীপ্রসাদের গল্পের প্রতি। যদিও সেটাকে গল্প বলা ঠিক হবে না।
হাসলেন কালীপ্রসাদ। তারপর বললেন, 'হ্যাঁ গতদিন এই বেটি এমন করল, যে আপনারা এখান থেকে চলে যা গেলে বিপদ ঘটত। তা শুনতে যখন চাইছেন তখন বলাই যায় সেই ঘটনা।'
'আমি বুড়িকে বাঁধা দেওয়ার জন্য হঠাতই লাফিয়ে পড়েছিলাম ওই বীভৎস দুই মহিলা আর বুড়ির রচনা করা কাল্পনিক বৃত্তের মধ্যে। একটা সন্তানকে পৃথিবীতে আনার জন্য ওরা নারকীয় একটা খেলা খেলছিল। আমায় লাফিয়ে পড়তে দেখেই চিৎকার করে উঠেছিল বুড়ি, ''ঘোর অনর্থ করলে বাপু! এবার আর কেউ বাঁচবে না। রক্তমাংসের কোনও মানুষ এই বৃত্তের ভেতর ঢোকে না। সে অধিকার তাদের নেই।'' কথা বলতে বলতেই বুড়ি থামিয়ে দিয়েছিল তার মন্ত্রপাঠ। রঙলীর কাছ থেকে বেশ কিছুটা সরে এসেছিল সে। স্থির হয়ে গিয়েছিল রঙলীও। এই দৃশ্য দেখে আমিও কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিলাম যেন। ডাইনিদের কাজে বাধা দিলে কী হতে পারে আমার জানা ছিল না। তা ছাড়া আমি ওদের একটা উদ্দেশে কেবল একটা শরীর ছাড়া আর কিছুই ছিলাম না। হাওয়ার চেয়ে দ্রুত বেগে আমার একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল দুই বীভৎস ডাইনির একজন। সে তার ক্ষতবিক্ষত হাতটা দিয়ে চেপে ধরেছিল আমার গলা। আমি ততদিনে কালোবিদ্যার অনেক কিছুই শিখে ছিলাম। ডানহাতটা তুলে একটা মুদ্রা তৈরি করলাম। সেই ডাইনি আগুন ঝড়া চোখে তাকাল সেদিকে। এতে সে কিছুটা শিথিল হলেও আমার গলা থেকে হাত নামাল না। আস্তে আস্তে তার কঠিন হাতটা চেপে বসতে লাগল আমার গলায়। বুড়ি অন্যদিকে দাঁড়িয়ে শব্দ করে হাসতে লাগল। তার কাজে আমি বাধা দিয়েছি। আমি তার শিষ্য হলেও শত্রু। সে আমাকে শিখিয়েছে, কীভাবে একটা মড়া বুনো জন্তুর আত্মাকে একটা মানুষের শরীরে প্রবেশ করানো যায়। সে আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে জন্তুদের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু সেই এখন আমার মৃত্যু চাইছে!'
'হঠাৎ কোন এক দৈবের প্রকোপে হাত আলগা হয়ে গেল ডাইনিটার। সে ছিটকে সরে গেলে আমার কাছ থেকে। আমি অবাক হয়ে বেশ কয়েক পা সরে এলাম। প্রকৃতি যেন একটা ভয়ংকর নাটক মঞ্চস্থ করছে আমার সামনে। দেখলাম, একহাতে ডাইনিটার মাথাটা ধর থেকে ছিঁড়ে নিয়েছে রঙলী। আর একইসঙ্গে সে বাধা দিচ্ছে অন্য ডাইনিটাকেও। সে তখন ছটফট করছে, কিন্তু রঙলীর শক্তির সঙ্গে ঠিক পেরে উঠছে না। সেই ডাইনিটার শরীরটাও একহাতে শূন্যে তুলে নিল রঙলী। তারপর একটা আছার দিল স্যাঁতসেঁতে ওই গুহার দেয়ালে। প্রদীপের আলোয় দেখতে পেলাম সেই ডাইনির শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে কালো রক্ত। পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ গন্ধের সঙ্গেও সেই রক্তের গন্ধের তুলনা চলে না। দু'দুটো ভয়ংকর ডাইনিকে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মেরে ফেলে রঙলী ছুটে গেল বুড়ির দিকে। বুড়ি ততক্ষণে তুলে ধরেছে পাখির খুলি লাগানো লাঠিটা। আমি জানি, ওটাই ওর রক্ষাকবচ। নিজেকে রক্ষা করার জন্য বুড়ি একের পর এক মন্ত্র পড়তে লাগল। কিন্তু তখন বেশ দেরি হয়ে গেছে।'
'রঙলীর নাভির মধ্যে থেকে রক্তের বন্যা বইয়ে ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে একটা মাথা! একটা ছোট্ট শিশুর মাথা! মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল বুড়ি। শয়তানের শক্তির কাছে সে বোধহয় হার মেনে নিয়েছিল। রঙলী তার ডান হাতটা চেপে ধরল বুড়ির বুকের ওপর। বুড়ি ছটফট করতে লাগল, মরণ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে লাগল সে। ছটফট করতে করতে একটা সময় নিথর হয়ে গেল সে। রঙলী একটানে বের করে আনল তার হৃদপিণ্ড। তারপর সেটা ও চেপে ধরল ওর নাভির মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা বাচ্চাটার মুখের কাছে। বাচ্চাটার মুখ সামান্য হাঁ হল। চোখ বোজা অবস্থাতেই বাচ্চাটা একটু একটু করে খেতে লাগল বুড়ির হৃদপিণ্ডটা। আর সহ্য হল না আমার আমি ছুটে বেরিয়ে আসতে গেলাম গুহাটা থেকে। পেছন থেকে কেউ ডেকে উঠল ''দাঁড়াও বাবু... একটু দাঁড়াও...''।'
'পেছন ঘুরে দেখলাম বাচ্চাটা ততক্ষণে রঙলীর নাভি ফুঁড়ে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে। বুড়ির নিথর শরীরটা ছেড়ে ও তখন শুয়ে পড়েছে গুহার মাটিতে। ও হাঁফাচ্ছে, কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে যেন। হাঁফাতে হাঁফাতে ও বলল, ''এই গ্রামের আসল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চোগমা মিলেতিন গিয়েল। তিনি ছিলে বৌদ্ধ বজ্রযান শাখার এক বিরাট সন্ন্যাসী। তিনিই ছিলেন ডাকিনি সাধক। ডাকিনি আসলে কোনও অতিপ্রাকৃত শক্তি নয়, তা যে সাধারণ সাধিকাদের মধ্যেই একজন সাধনার দ্বারা হয়ে ওঠে এটা বুঝতে পেরেই তিনি চলে আসেন কম জনবসতিপূর্ণ এই পাহাড়ের কোলে। সঙ্গে ছিলেন তার শক্তি উগ্রা। উগ্রা ছিলেন এই উত্তর-পূর্ব ভারতেরই গ্রামের মেয়ে। সন্ন্যাসীবাবাকে সঙ্গে পেয়ে তিনিও ছিলেন ভারী খুশি। কঠিন সাধনা আর ঘোর তপস্যার ফলে উগ্রা একদিন জ্ঞানী ডাকিনিতে পরিণত হলেন। চোগমারও সেইদিন আনন্দের শেষ ছিল না। এই জনপদে যারা তখন বসবাস করত তারা সন্ন্যাসীকে খুবই সম্মান করত। তারাও জেনে গেল উগ্রার সাধিকা হয়ে ওঠার কথা। সেদিন হল বিরাট ধুমধাম। কিন্তু সে রাতেই উগ্রা একটা স্বপ্ন দেখলেন। ভারী সুন্দর দেখতে এক রমণী তাঁর স্বপ্নে এসে বলল ডাইনিবিদ্যার যেমন একটা ভালো দিক আছে তেমনই আছে খারাপ দিকও। সেই খারাপ ডাইনিদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে এই গ্রামে। এরজন্য গ্রামের সব পুরুষকে মেরে ফেলতে হবে। উগ্রা জানতেন না যে তাঁর স্বপ্নে এসেছিল সে আর কেউ নয়, সে হল অ্যাজটেকদের দেবী জিলোনেন। আসলে এই জিলোনেন কুমারি নারীর রক্তপিপাসু। কিন্তু কেন তিনি এই ডাইনিদের গ্রাম তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনিই জানতেন। তিনি স্বপ্নে এও বলেছিলেন, একসময় মানব সন্তান আর ডাইনির ঔরসে তিনি জন্ম নেবেন এই গ্রামেই। তারপর এই উগ্রা হয়ে উঠবেন মহাশক্তিশালীনি। কিন্তু তিনিও আজ আমার হাতেই বলি হলেন! এই বুড়িই হলেন উগ্রা। আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি বাবু... তুমি আমাদের এই সন্তান নিয়ে পালিয়ে যাও এই গ্রাম থেকে। বুড়ি মরে গেছে শুনলে হয়তো অন্য ডাইনিরা এই বাচ্চাটাকে মেরে ফেলবে। শক্তিশালী চোগমাও এর নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেননি। তিনিও প্রাণ দিয়েছিলেন...'' কথা শেষ করে আবার হাঁফাতে লাগল রঙলী।'
'আমি ছুটে গিয়ে বসলাম রঙলীর পাশে। ''কিন্তু তোমার কী হবে?'' আমার প্রশ্ন শুনে হাসল ও। তারপর বলল, ''আমার দিদিমা ছিলেন এই উগ্রার খুব কাছের একজন। তিনিই আমাকে এসব গল্প বলেছেন। হঠাৎ কোনো চমৎকার হলেই মৃত্যু হতে পারে জিলোনিনের এই সন্তানের। অথবা ওর পিতা হিসেবে তুমিও কোনও অস্ত্র তৈরি করতে পারো ওকে মারার জন্য। যার ঔরসে ওর জন্ম সেও ওর মৃত্যু কারণ হতে পারে--এও বলেছিলেন তিনি। একে মৃত্যুর দূত হিসেবে যেখানে খুশি পাঠানো যায়। জিলোনেন রক্ষাকর্তী হলেও তার স্বভাব ভীষণ পাশবিক। বিষাদের সুরে সে বশ হয়। তার খাদ্য হল কাঁচা মাংস। এ শিশু অবস্থায় ওই কাঁচা মাংস খেলে হয়ত ততটা ভয়ংকরী হবে না। তবে বয়স বাড়লে এর মুখে মানুষের কাঁচা মাংস বা রক্ত লাগলে বিনাশ নেমে আসবে। কারও রক্তের স্বাদ পেলে এ তাকে শেষ করেই ছাড়বে। আমার শরীর থেকে এ মুক্ত হয়ে গেলেই আমার মৃত্যু অনিবার্য। তাই তোমাকে বললাম বাবু একে নিয়ে পালাও।'' হাঁফাতে হাঁফাতে চুপ করে গেল রঙলী। সারা শরীরে রক্ত মেখে বাচ্চাটা ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে ওর পেট থেকে। বাচ্চাটার মুখচোখ এতটাই মায়া কাড়া যে ওকে ছেড়ে আসতে ইচ্ছে হল না। রঙলীর দিকে তাকিয়ে বুক কেঁপে উঠল আমার। ওর চোখগুলো কপালের কাছে এসে ঠেকেছে, শ্বাস পড়ছে না আর।'
'রাত্রি নামার আগেই ওই দুর্গম রাস্তার তোয়াক্কা না করেই আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম। পাহাড়ি পথ ধরে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করেছিলাম আমি। আসাম পার করে একসময় ঢুকে পড়েছিলাম পূর্ব পাকিস্তান। এখানে এসে শুরু করেছিলাম নিজের অন্ধকারের সাধন-ভজন। এই বাড়ি আমার এক পূর্বপুরুষের তৈরি। এখানেই থেকে গেলাম আমি। ইচ্ছে ছিল চলে যাই নিজের ভিটেয়, কিন্তু বাধ সাধল এখানের গণ্ডগোল।'
থামলেন কালীপ্রসাদ। দীর্ঘক্ষণ একভাবে কথা বলে তিনি হাঁফিয়ে উঠেছেন। ঘটিতে গড়িয়ে একটু জল খেলেন। তারপর বললেন, 'এবার বুঝতে পারছেন তো কীভাবে আমি আপনাদের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নেব?'
অলকেন্দু আর সামন্ত সাহেব মাথা নিচু করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। কাঁটা দিয়েই বোধহয় কাঁটা তুলতে হয়! ওঁরা বেশ বুঝতে পারছেন। কালীপ্রসাদ ওই তিনজনকে নরক যন্ত্রণা ভোগ করাতে চলেছেন। কয়েক মুহূর্তের জন্য একবার মেয়ের মুখটা মনে পড়ল শ্রীকান্ত সামন্তের। মনের ভেতরটা মুষড়ে উঠল তাঁর। নাহ! ওই জানোয়ারগুলোর অবশ্যই কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। যে পাপ ওরা করেছে তারজন্য যেকোনো খারাপ থেকে খারাপতর শাস্তি ওদের জন্য কিছুই না।
'অগো কঠিন শাস্তি দ্যান আপনে।' দৃঢ় গলায় বলে উঠলেন শ্রীকান্ত সামন্ত। সায় দিল অলকেন্দুও।
কালীপ্রসাদ রক্তলাগা কাপড়টাকে একটা জলভরতি পাত্রে ফেললেন। তারপর সেই ভেজা কাপড়টা থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে দিলেন বাচ্চাটার ঠোঁটের ওপর। অলকেন্দু আর শ্রীকান্ত সামন্ত অবাক হয়ে দেখলেন ছোট্ট জিভ বার করে বাচ্চাটা চেটে নিচ্ছে জলটুকু। সে আনন্দে হাত-পা ছুঁড়ছে। যেন সে এই জলের অপেক্ষা করছিল, জন্মের পর থেকে সে এই অমৃতের জন্যই বেঁচে আছে।
গম্ভীর গলা শোনা গেল কালীপ্রসাদের 'এবার আপনারা যান, কাল একজন সকাল দেখবে ঠিকই কিন্তু সন্ধেটা আর দেখতে পাবে না।'
ওরা বেরিয়ে এল বাড়িটা থেকে। মনের মধ্যে একটা পাপবোধ যেন পিঁপড়ের মতো কামড়াচ্ছে শ্রীকান্তকে, কিন্তু...
আর ভাবতে পারলেন তিনি। মেছকন্দর মিঞা! সেই কোন কাল থেকে পাশাপাশি দোকান দুজনের। সেই কবে থেকে পরবে উৎসবে একসঙ্গে ওঠাবসা দুজনের। লোভ ওই লোকটাকে দিয়ে কীই না করিয়ে নিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন