মনীষ মুখোপাধ্যায়
সন্ধের আগে...
সন্ধে নামার আগেই মোজেস গাড়িটা থামাল নিজের বাড়ির সামনে। একজন সাধারণ মানুষকে লালবাতি গাড়ি করে আনার অনুমতি পাওয়া যায় না। ভাগ্যিস কেসের গুরুত্ব বুঝে সাহায্য করেছেন ওপর মহলের অফিসারেরা। পাহাড়িবাবুও মাত্র একঘণ্টার চেষ্টায় সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেই সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে বেরিয়ে গেছিল মোজেস রাত জাগার ক্লান্তি ভুলে। পথে কোথাও না দাঁড়িয়ে একনাগারে গাড়ি চালিয়ে গেছে। তাই সন্ধে নামার আগেই ফাদারকে নিয়ে ফিরতে পেরেছে সে।
মোজেস নিজেই নেমে এসে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নামলেন প্রৌঢ় মানুষটা। বয়সের কারণে তাঁর গাল ভেঙে গেছে। মাথায় অবশিষ্ট আছে আর কয়েকটাই মাত্র সাদা চুল। কিন্তু চোখটা। চোখটা এখনও যেন জ্বলজ্বল করছে। জ্ঞানের দীপ্তি ছড়িয়ে দিতে চাইছে। বড়ো মায়া ওই দুটো চোখে।
বিজয়ে ছুটে এল ফাদারকে দেখতে পেয়ে। ওকে দেখে দুহাত তুলে আশীর্বাদ করলেন তিনি। ঢুকলেন মোজেসের বাড়িতে। ঢোকা মাত্রই কেমন একটা খটকা লাগল তাঁর। পথে আসতে আসতে মোজেসের মুখে কিছুটা শুনেছিলেন ঘটনাটা। মোজেসে বাড়িতে ঢুকেই তিনি বললেন, 'ওই মেয়েটার কোনও ছবি আছে, আমাকে সেটা দেখাতে পারো তোমরা?'
এতটা রাস্তা গাড়ি চলানোর ধকল যেন কোথায় হারিয়ে গেছে মোজেসের। সে অলোক পাহাড়ির কাছ থেকে আগেই জোগাড় করে রেখেছিল ছবিটা। ফাদারও পথের ক্লান্তি ভুলে যেন বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছেন হঠাৎ। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন মোজেসের দিকে।
ছবিটা হাতে নিয়ে উনি বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। দু'দিকে মাথা নাড়াতে লাগলেন এক নাগারে। 'এ যে অসম্ভব। এসে যে অবিশ্বাস্য!' বারবার বলতে লাগলেন তিনি।
'কী হয়েছে ফাদার?' একইসঙ্গে মোজেস আর বিজয় দুজনেই প্রশ্নটা করল এবার। ফাদারকে এমন উত্তেজিত দেখে ওরাও কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেছে।
'এই শতাব্দীর চার এবং পাঁচের দশকে আমি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলাম দক্ষিণ আমেরিকার নানান উপজাতিদের মাঝে। কম বয়েস তখন আমার। নিজের তাগিদেই এবং চার্চের অনুমতি পেয়ে আমি অনুসন্ধান শুরু করি সেইসব উপজাতিদের সংস্কৃতি এবং ধর্মবিশ্বাস নিয়ে। সেই অনুসন্ধান চালাতে গিয়েই আমি খোঁজ পাই একটি গ্রামের। সেই গ্রামের মানুষেরা গ্রাম এবং গ্রামের প্রধানের পরিবারকে রক্ষা করার জন্য এক দেবীর উপাসনা করত। আসলে সেই দেবী রক্ষাকর্তী হলেও সে ছিল ভয়ংকর রক্তপিপাসু। দেবীর সংযোগ ছিল প্রাচীন অ্যাজটেকদের সঙ্গে। এই রক্তপিপাসু দেবীর উদ্দেশে গ্রামের মানুষ কুমারি মেয়েদের বলি দিত। তখন উত্তাল একটা সময়। সারা পৃথিবী জুড়ে চলছে যুদ্ধ। ওই অজ্ঞানীদের ঈশ্বরের শরণে নিয়ে আসাই ছিল আমার কাজ। একরাতে খবর পেলাম ওই গ্রামে নাকি শুরু হয়েছে বলির নৃশংস খেলা। কয়েকজন সৈন্যকে ভাগ্যিস সঙ্গে পেয়েছিলাম। সময় নষ্ট না করেই পৌঁছলাম সেই গ্রামে। অন্ধকারাচ্ছন্ন সেই গ্রামে যেন কোনও এক দৈবের নির্দেশে বাতাস থেমে গেছিল। গাছপালা ঘেরা একটা ফাঁকা জায়গায় জ্বলছিল মশালের আগুন। একটা মেয়েকে একটা বড়ো পাথরের ওপর শোয়ানো হয়েছিল। তাকে ঘিরে উন্মাদের মতো নৃত্য করছিল অর্ধনগ্ন যুবক-যুবতীরা। শব্দহীন সেই পরিবেশে শুধু শোনা যাচ্ছিল একটা কেঁপে ওঠা গলার স্বর। এক দেবীর পায়ের নীচে বসে অদ্ভুত পোশাক পরা একটা লোক দুলে দুলে গলা কাঁপিয়ে কীসব বলে চলেছিল! তারপর সে একটা ধারালো ছোরা তুলে নিয়েছিল নিজের হাতে। যে ছোরাটাকে আমরা 'ম্যাশেট' নামে চিনি। আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না ভেবেই লাফিয়ে পড়েছিলাম আমরা ওদের মাঝে। সৈন্যরা শক্তহাতে দমন করেছিল ওদের। আমি মেয়েটাকে রক্ষা করার জন্য পাথরের কাছে এগিয়ে গেছিলাম। অদ্ভুত পোশাক পরা লোকটাকে ধরাশায়ী করে ফেলেছিল শক্তিশালী দুই সৈন্য। তখনই আমি ভালো করে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম ওই দেবীর মুখ। এত শান্ত আর স্নিগ্ধ দেবী এমন রক্তপিপাসু! অবাক হয়ে গিয়েছিলাম আমি। ওই অদ্ভুত পোশাক পরা লোকটা ছিল ওঝা। উপজাতিদের মেডিসিনম্যান! সে আমার দিকে ক্রুর দৃষ্টি হেনে বলেছিল, তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে আমার দেবীর...আবার দেখা হবে...'
ফাদার হাঁফাচ্ছিলেন। ওই লোকটার কথা সত্যি হয়ে যাচ্ছে। আজ এত বছর পর সত্যিই আবার দেখা পেলেন তিনি সেই দেবীর। হাঁফাতে হাঁফাতে ফাদার বললেন, 'এই দেবীর নাম জিলোনেন। তবে ইনি মানুষের শরীর পেলেন কী করে, এটাই আমার মাথায় ঢুকছে না।'
ফাদারের এই অবস্থা দেখে মোজেস চিন্তায় পড়ে গেল। তাহলে কী সত্যিই শয়তানের রাজত্ব কায়েম হতে চলেছে! কিছুই কি করা যাবে না আর!
'আচ্ছা মেয়েটা কিছু বলেছে?' ফাদার চিন্তাহ্নিত গলায় প্রশ্ন করলেন দুজনের দিকে তাকিয়ে।
বিজয় উত্তর দিল এবার, 'হ্যাঁ ফাদার, ও বলেছে ও কারও গন্ধ পাচ্ছে। তার রক্তে ওকে খেতে হবে...'
কথা শেষ করতে পারল না বিজয়, তার আগেই ফাদার বলে উঠলেন, 'বিরাট বিপদ নেমে আসছে। ওর ব্যাপারে আমাদের ভালোভাবে জানতেই হবে। এমন কাউকে চেপে ধরো যে ওর ব্যাপারে জানে। আজ রাতটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, আজ রাতেই ও শিকার করবে। একবার যদি মানুষের রক্তের স্বাদ ও পেয়ে যায় তাহলে সব শেষ হয়ে যাবে। সত্যিই শয়তান রাজত্ব করবে তখন।'
'ফাদার! যে কনস্টেবলকে আক্রমণ করে ও পালিয়েছে সে অদ্ভুত সব কথা বলছে। সে বলছে একটা বুড়িকে সে ওর সেলের বাইরে দেখেছিল। বুড়িটার হাতে ছিল একটা গোসাপ। মেয়েটা নাকি চার হাতপায়ে হাঁটছিল পোকামাকড়ের মতো!' মোজেস বলল এবার।
ভুরু কুঁচকে গেল ফাদারের। নাহ! তিনি এমন কিছুর কথা আগে শোনেননি। জিলোনেনের সঙ্গে কোনও অপশক্তি থাকে কি না তাঁর সত্যিই জানা নেই। তিনি বললেন, 'দ্রুত সেই মানুষের কাছে আমাদের পৌঁছতে হবে যে ওর সম্পর্কে জানে। ওর অতীতের ব্যাপারে যে অবগত।'
'এমন মানুষ একজনই আছেন। যিনি আমাকে আগের দিন সবটা বলেন নি। সেই মুন্ডা বৃদ্ধ লোকটার কাছে নিশ্চয়ই ওই মেয়েটার অতীতের সব খবর পাওয়া যাবে! আর দেরি করা যাবে না তাড়াতাড়ি ওঁর কাছে চল মোজেস।' দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে উঠল বিজয়।
ফাদার আর মোজেসও এগিয়ে এল দরজার কাছে। মোজেস চিন্তিত গলায় ফাদারকে প্রশ্ন করল, 'ওকে আটকানোর কি কোনও রাস্তাই নেই ফাদার?'
'ঈশ্বর চাইলে সব আটকাতে পারেন মাই বয়। তিনি দয়া করলে শয়তান নিজের রাজত্ব কখনোই কায়েম করতে পারবে না।'
'আচ্ছা ফাদার, আপনি তো বললেন সে একজন দেবী। তাহলে দেবী হয়ে সে মানুষের রক্তের পিপাসু কেন? বা তাকে শয়তানের সঙ্গেই বা তুলনা করা হচ্ছে কেন?' গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে প্রশ্ন করল বিজয়।
'উপজাতিদের বিশ্বাসে এইসব ভয়ংকর দেব-দেবীদের বাস। সে যদি নিজেই ঈশ্বর হয় তাহলে তার রক্তের লোভ থাকবে না। সেটা সে অনুধাবন করলেই তার মুক্তি সম্ভব। ঈশ্বরের মহান উর্জার প্রকাশই তাকে আটকাতে পারে নচেৎ কোনও রাস্তা নেই।'
ফাদারের কথা শেষ হওয়ার আগেই গাড়ি স্টার্ট দিল মোজেস। গাড়ি এগিয়ে চলল ভিড় রাস্তা ঠেলে। ব্যস্ত কলকাতা শহরটা জানেও না এই দিনের পর দিন ঘটে চলা উন্নত শহরের মধ্যেও আর একটা ভুবন লুকিয়ে আছে। বড় অন্ধকার সেই ভুবন। প্রযুক্তি বা উন্নতি তাকে প্রশ্রয় দেয় না। কিন্তু কঠিন সত্য হল তার অস্তিত্ব আছে, ভীষণভাবে জাল বিস্তার করে সে তার যখন ইচ্ছা হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন