মনীষ মুখোপাধ্যায়
সাজিদ হাসল তাকে দেখে। সে পায়ে পায়ে এগিয়ে এল সাজিদের কাছে। দূরে দাঁড়িয়ে ওদের ওপর নজর রাখছেন আরেকজন। কিন্তু ওকি! লোকটা সাজিদের দিকে বন্দুক তুলল কেন? অবাক হয়ে গেল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা। ওই লোকটা যদি সাজিদকে মেরে দেয় তাহলে ওঁর বুকের আগুন ঠান্ডা হবে কী করে!
জায়াগাটায় আলো ভীষণ কম। দূর থেকে পরিষ্কারভাবে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবুও চেষ্টা করছেন তিনি। যদি কিছু দেখা যায়! অপেক্ষা করছেন মনে মনে। তিনি জানেন, আজই সেই রাত। এতগুলো দিন অপেক্ষার ফল আজ ফলবেই। ভীষণ ঠান্ডা লাগছে তাঁর, তাঁর শরীর যেন এই শীতের কামড় আর সহ্য করতে পারছে না। ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও তিনি আজ নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি। নিজের কষ্টের, নিজের সংগ্রামের দিনগুলোর কথা ভেবে আজ তাঁকে আসতেই হত। ওরা কিছু একটা বলছে। কান খাঁড়া করলেন তিনি তাঁকে শুনতেই হবে।
'আরে ভাই! এত জায়াগা থাকতে এখানে ডাকলে কেন, দুর্গেই তো কথা বলা যেত। রাতে খানা খেতে খেতে আরাম করে তোমার কথা শোনতাম।' সাজিদের গলা শোনা গেল।
'প্রোমোটারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে একাই সবটা খাবে সাজিদ মিঞা!' লোকটার চোখে বিস্ময়। তার চোখমুখ বলছে সে নিজেও চায়নি এই দিনটা আসুক।
লোকটার কথা শুনে একটা বিশ্রী হাসি হাসল সাজিদ। পকেট থেকে বের করল দামি সিগারেটের প্যাকেট। একটা সিগারেট ঠোঁটে গুঁজে খুব যত্ন নিয়ে দেশলাই দিয়ে ধরালো সেটাকে। চোয়াল শক্ত করে তাকাল সে সামনে দাঁড়ানো লোকটার দিকে। তারপর কেটে কেটে বলল, 'তাহলে গতদিন যে হামলাটা হয়েছিল ওটা তুমিই করিয়েছিলে?'
লোকটা শব্দ করে হাসল এবার। 'তুমি বুদ্ধিমান সাজিদ মিঞা। এতে কোনও সন্দেহ নেই। আমি ছাড়া কারও হিম্মত আছে এই ডক অঞ্চলে, কারও বন্দুকের গুলির ক্ষমতা আছে, যে তোমার সর্বনাশ করে?'
এবার সে সময় নষ্ট না করে বন্দুকটা সারাসরি সাজিদের বুকে ঠেকালো। আনসেফ করল যন্ত্রটাকে। শীতের রাতে একটা হাড়হীম করা শব্দ হল হ্যামারটা টানার সময়। এবার ট্রিগার চাপলেই খেলা শেষ।
'বেইমান!' দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলল সাজিদ।
ভুরু কোঁচকাল লোকটা। 'বেইমান! কে বেইমান সাজিদ মিঞা? বন্ধুর পেছনে ছোরা চালিয়ে যে একা রাজত্ব করতে চায় সে বেইমান, না গদ্দারকে রাস্তা থেকে সরিয়ে রাজা যখন নিজের রাজত্ব কায়েম রাখতে চায় সে বেইমান?'
'তুমি রাজা!' দুলে দুলে হাসতে লাগল সাজিদ। 'নিজের মালিককে চোখের সামনে মরতে দেখে যেদিন তুমি প্রতিবাদ করোনি সেদিন থেকেই বুঝেছি বেইমানি তোমার রক্তে আছে। শত হলেও সে তোমার অন্নদাতা ছিল। অর্জুনভাই অন্যের দমে রাজা সেজে বসে আছেন!' মাটিতে একদলা থুতু ফেলল সাজিদ।
মাথায় আগুন চড়ে গেল অর্জুনের। হ্যাঁ বহুদিন ধরে সে পরিকল্পনা করছে সাজিদকে সরিয়ে ফেলার। একসময়ের অন্তরঙ্গ বন্ধুকে সে সরিয়ে ফেলতে চাইছে। প্রোমোটিং ব্যবসাটা আড়ালে থেকে নিজের নামে করে নিচ্ছিল সাজিদ। সেই খবর তার কানে গেছিল অনেকদিন আগেই। প্রথমে সে বিশ্বাস করেনি। ধীরে ধীরে খোঁজখবর করে সে জেনেছে ঘটনার সত্যতা। ও জানে সাজিদের ইতিহাস। এই লোকটা সবকিছু করতে পারে। সেই যে প্রথম যেদিন এসেছিল সেদিনই সে বলেছিল ওকে ওর ঘটনা।
সাজিদ কেমন ভয়ে ভয়ে ছিল সেদিন। যেন কারও থেকে পালাচ্ছিল। অর্জুন জিজ্ঞেস করেছিল সাজিদকে অমন করার কারণ। সাজিদ ওকে বলেছিল নিজের কথা। ও পূর্ববঙ্গে দাঙ্গায় আটকে পড়া পরিবারদের এদেশে পাঠাবার ব্যবস্থা করত। একটা পরিবারের সঙ্গে খুব অন্যায় করে ফেলেছিল ও। একটা দামি পাথরের লোভ ও সামলাতে পারেনি। ওই পাথরটার জন্য ও আরও দুজনের সঙ্গে মিলে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ওরা দুজনেই মারা গেছে। ও মারা যেত যদি ওখানে থাকত। ও পালিয়ে এসেছে পূর্ববঙ্গ থেকে। একটা কালোছায়া ওকে তাড়া করেছিল। একটা বাচ্চা ঘুমের মধ্যেই ওর রক্ত চুষে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ও সেই লোকটাকে দেখেছিল বাচ্চাটাকে দেখার একদিন আগে, যে লোকটা আর্মির গুলিতে মরে গেছিল। ও কিছু বোঝার আগেই জ্ঞান হারিয়েছিল। রমোনা অঞ্চলে ও একটা কাজে গেছিল। রাতের অন্ধকারে ও একাই ফিরছিল, একটা পরিবারের সঙ্গে ওর কথা হয়েছিল সেদিন গাঙ পার করাবার ব্যাপারে। অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেও দেখতে পেয়েছি লোকটা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একপাশে। ওকে হাত তুলে ডেকেছিল লোকটা। আর্মির গুলির থেকে বেঁচে ফেরা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। ও ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিল লোকটাকে দেখে। সে ওর কাছে এগিয়ে আসছিল ও জ্ঞান হারিয়েছিল একসময়। জ্ঞান ফিরতেই দেখেছিল ওর বুড়ো আঙুলের কাছটায় একটা ক্ষত। সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে জমে রয়েছে। এর একদিন পরেই ও দেখেছিল সেই বাচ্চাটাকে। ও তখন ঘুমচ্ছিল। গভীর রাত। একটা কালো আলখাল্লা পরা লোক এসে দাঁড়িয়েছিল ওর কাছে। ওর পাশে কারা যেন চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। দুর্বোদ্ধ ভাষায় কীসব বলছিল। বাচ্চাটা ওর ওপর উঠে এসেছিল। কিন্তু এর কিছু সময় পরেই ছিটকে পড়ে গেছিল মাটিতে। ওর গলায় ঝোলানো ওই পাথরটা থেকে নীল একটা আলো বেরিয়ে আসছিল। ও আর দেরি করেনি। ঘর ছেড়ে পালিয়েছিল। পালিয়েই চলেছিল পালিয়েই চলেছিল। শেষে এই ডক অঞ্চলে এসে পৌঁছেছিল ও। অর্জুনের সংস্পর্শে নিজেকে নিরাপদ মনে করেছিল। সেই-ই বেইমানি করল!
অর্জুন ঠান্ডা গলায় এবার বলল, 'তোমাকে এখানে মেরে রেখে যাব আমি। কেউ সন্দেহই করবে বা কিছু। কিছুদিন আগেই তোমার ওপর অ্যাটাক হয়েছে। বেইমানের একটাই সাজা। মৃত্যু!'
'একটা বাঘকে আরেকটা বাঘই মারতে পারে।' দুলে দুলে হাসছে সাজিদ। লোকটার মৃত্যুভয় নেই। 'তুমি জানো দোস্ত। আজিজকে মারা অত সোজা নয়।' শরীরের বাঁদিকে ভর দিয়ে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ঘুরে গেল সাজিদ। একসময়ের পূর্ব পাকিস্তানের আজিজ এজেন্ট। ওই দুর্ধর্ষ আর্মির চোখে যে নিপুণভাবে ধুলো দিতে পারত। গুলি চালাল অর্জুন। কিন্তু একী! সামনে কেউ নেই। বরং তার গলাতেই নেমে এসেছে একটা মরণ ফাঁস। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওর।
পেছন থেকে পাশবিক একটা গলার স্বর শুনতে পেল ও। 'আমার কাছে এই রুমালটা থাকতে দুনিয়ার কোনও বন্দুক আমাকে মারতে পারবে না। তুমি বোধহয় ভুলে গেছিলে দোস্ত!' নিষ্ঠুর একটা হাসির শব্দে খানখান করতে লাগল ডক অঞ্চলটা।
শীতের রাতে এই অন্ধকার নির্জন জায়গাটায় ডকের এক মস্তানকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসবে না। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে হাতটা পেছন দিকে করে খামচে ধরতে চাইল অর্জুন সাজিদের জামাটা। ও পারছে না। ছটফট করছে, বাঁচার তাগিদে বারবার ধরার চেষ্টা করছে পশুটাকে, কিন্তু পারছে না। একসময় ওর হাতের নাগালে এল সাজিদের গলার চেনটা। সেটাকে ধরেই বাঁচার শেষ চেষ্টা করল। হাতের চাপে ছিঁড়ে গেল চেনটা। ততক্ষণে ওর চোখের সাদা অংশটা লাল হয়ে উঠেছে। শেষবারের মতো জোরে হাত-পা ঝাঁকাল অর্জুন। হাতের থেকে চেনটা আলগা হয়ে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে নিথর হয়ে গেল অর্জুনের শরীরটা।
ভারি শরীরটা রাস্তার একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিল আজিজ। যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে একটা সিগারেট ধরাল ও। 'কুত্তারবাচ্ছায় আজিজের পোঁদে লাগতে আইছিল।' ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল আজিজ।
তখনই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা খেয়াল করলেন ব্যাপারটা। তিনি এতক্ষণ নিশ্বাস আটকে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর সামনে একটা মানুষ খুন হয়ে যাচ্ছে দেখেও উত্তেজনা চেপে রেখেছিলেন। উনি অপেক্ষা করছিলেন কখন ওই শয়তানটার শরীর থেকে খুলে পড়ে ওর কবচটা। যে কবচের জোরে এই শয়তানটা উনিশ বছর আগে বেঁচে গিয়েছিল। আজ যদি কোনওভাবে ওদের লড়াইয়ের কারণে ওটা নাও খুলে পড়ত, এই জর্জরিত শরীরটা নিয়ে তিনি নিজেই ওটা খোলার চেষ্টা করতেন। মেয়েটাকে মুক্তি দিতে হবে। আজকে রাতেই মুক্তি দিতে হবে।
সামনের ভয়ংকর দৃশ্যটা দেখে তিনি শিহরিত হওয়ার বদলে হাসলেন। আজিজ যে ট্রলারটার গায়ে হেলান দিয়ে সিগারেট টানছে তার ওপর সাজানো আছে আরও দুটো ট্রলার। ওপর থেকে ট্রলারের গা বেয়ে নেমে আসছে মেয়েটা। চার হাতপায়ে ভর দিয়ে নেমে আসছে ও। এতদিন বাদে সেই গন্ধটা চিনে নিয়েছে মেয়েটা। সেই পায়ের নীচের ধুলোর গন্ধ থেকে যেভাবে শিকার চেনাতেন কালীপ্রসাদ কালী। সেই গন্ধ যেন আজ আবার পেয়ে মেয়েটা নেমে আসছে।
মেয়েটা ঝাঁপিয়ে পড়ল আজিজের সামনে। চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখে চমকে উঠল আজিজ। এই অন্ধকারেও ধকধক করে জ্বলছে মেয়েটার দু'চোখ। বড়ো বড়ো লখগুলোয় লেগে আছে কাদামাটি আর শুঁকিয়ে যাওয়া রক্ত। মেয়েটা এবার উঠে দাঁড়াল। বিশ্রী একটা কটকট করে শব্দ হল ও উঠে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গেই। ওর ঠোঁটের কষ থেকে গড়িয়ে পড়ছে লালা। রক্তের পিপাসা নিয়ে সে আস্তে আস্তে এগিয়ে এল আজিজের দিকে। প্রবল প্রতিহিংসা ঠকঠক করে জ্বলছে আর দু'চোখ।
আজিজ এত সহজে ভয় পাওয়ার পাত্র নয়। যেদিন গেছে সেদিন গেছে, এখন ও আর সেই দুর্বল এজেন্ট নেই। পকেট থেকে একটা ছুরি বার করল ও। সেটাকে আমূল গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করল মেয়েটার পেটে, এবং সফলও হল। পেটটা চেপে ধরে কিছুটা সরে গেল মেয়েটা। ও ছুরিটাকে চেপে ধরে বের করে আনল পেট থেকে। সেটাকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দ্বিতীয়বার ও আবার এগিয়ে এল প্রচণ্ড ক্ষিপ্র গতিতে।
এবার ভয় পেল আজিজ। অত তাড়াতাড়ি মানুষের পক্ষে এগিয়ে আসা সম্ভব নয়! ছুরির ফলাটা পেটে পুরোটাই ঢুকে গেছিল, তাও কিচ্ছু হয়নি মেয়েটার। আজিজ হতভম্ব হয়ে গেল ব্যাপারটা দেখে। এক পা এক পা করে পেছতে শুরু করল ও। এখান থেকে পালাতেই হবে। না হলে আজ আর রক্ষা নেই। ও পালাতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ল অর্জুনের মৃতদেহটার ওপর। মৃত অর্জুন যেন ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে।
কানের কাছে নিশ্বাস পড়ছে যেন কারও। আজিজ ঘুরে দেখার আগেই ওর ঘাড়টা ধরে ওকে শূন্যে তুলে নিল মেয়েটা। আজিজ দেখতে পেল মেয়েটার মুখের ভেতর দেখা যাচ্ছে ধারালো চকচকে দুই সারি দাঁত। ফিসফিস করে বলছে সে, 'তোর রক্তের নেশায় আমি ফিরে এসেছি... আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তৃষ্ণা। একবার তুই আমার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলি। আজ আর পাবি না...'
মেয়েটা কথা শেষ করার আগেই আজিজের অতবড় শরীরটাকে নিজের মুখের কাছে নামিয়ে আনল। ওর ঘাড়ের কাছে বসালো একটা মারণ কামড়। আজিজ যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল। ঘাড়ের কাছ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল রক্তের ধারা। বিশ্রী বিবর্ণ জিভ দিয়ে সেটা চাটতে লাগল মেয়েটা। সোঁ...সোঁ... শব্দ করে শুষে নিতে লাগল আজিজের রক্ত।
সেই সময়ই ওদের খুব সামনে এসে দাঁড়ালো পুলিশের গাড়িটা। ওরা অনেক্ষণ ধরেই এই বিশাল ডক অঞ্চলের সবদিক তন্নতন্ন করে খুঁজছিল। অবশেষে ওরা খুঁজে পেয়েছে জায়গাটা। দরজা খুলে দ্রুত লাফ দিয়ে নামল বিজয় আর মোজেস। মোজেস দৌড়ে গিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু মেয়েটা অন্যহাতে শুধু একটা ধাক্কা মারল মোজেসকে। সে বেশ কয়েক হাত দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ল।
বিজয় চিৎকার করে উঠল, 'কী করছ তৃষ্ণা? ওকে ছেড়ে দাও। মানুষ খুনের অপরাধে কঠিন শাস্তি পেতে হবে তোমায়, আমি তোমাকে বাঁচাতে পারব না।'
কিছুই যেন শুনল না মেয়েটা। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে আজিজ। সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসছে। নিজের সমস্ত শক্তিটুকু দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে সে তৃষ্ণাকে। তাহলে এই কী সেই মৃত্যু যা উনিশ বছর আগে তার জীবনে ধেয়ে এসেছিল! সে অনেক পাপ করেছে। সামন্তদের রাধা-গোবিন্দের মুখে আমিষ ভোগ লাগিয়েছে। সামন্তদের মেয়েটাকে ভোগ করার পর আধমরা করে ফেলে এসেছিল গাঙের পারে। ওদের ঠাকুরের পাথরটা চুরি করেছে। সেই পাথরটাই ওকে বাঁচিয়েছিল সেই সময়। নিজের গলায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করল আজিজ, নাহ ওটা ওর গলায় নেই। তাই বুঝি এই মৃত্যু ওকে ঘিরে ধরল। একটা ভোঁতা যন্ত্রণা সারা শরীরটা অবশ করে দিল ওর। আস্তে আস্তে চোখ বুঝে আসছে। ইসস! একবার যদি ওই শ্রীকান্ত সামন্ত নামের লোকটার কাছে ক্ষমা চাওয়া যেত! আহ এবার ঘুম আসছে ওর। একটা প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করল আজিজ বুকের কাছে। বহুকষ্টে কোনওমতে ঘাড়টা কাত করে দেখল, মেয়েটা ওর বুকে কামড় বসিয়ে কিছু একটা বের করে আনছে। আর পারল না ও। চোখ বুজে গেল।
ফাদার দ্রুত নামলেন গাড়ি থেকে। চিৎকার করে উঠলেন তিনি, 'ও রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছে সবাই সাবধান হয়ে যাও।' ফাদার মাটিতে একটা বৃত্ত চিহ্ন আঁকলেন খুব তাড়াতাড়ি। উনি দীর্ঘ সময় ধরে স্পিরিচ্যুয়ালিজমের চর্চা করেছেন। এই বৃত্তচিহ্নের ভেতর যে কোনো অপশক্তিকে বেঁধে রাখা যায়।
সামনের দৃশ্য দেখে ভয়ে অসাড় হয়ে এল দোয়েলের শরীর। আর একটু হলেই ও জ্ঞান হারাচ্ছিল। ওকে দেখতে পেয়ে খপ করে ধরে ফেলল বিজয়।
বৃত্তের মাঝেই কোথা থেকে দৌড়ে এল একটা গোসাপ। পণ্ড করে দিতে চাইল ফাদারের প্রতিরোধ। মোজেসের সামনে এসে দাঁড়ালো সেই বৃদ্ধা। বৃদ্ধার দিকে তাকাতেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল ওর। এ যে মুখ চোখ কিছুই আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না! ফাদার বলে উঠলেন, 'ডোন্ট লুক ইনটু হার ফেস... খবরদার দেখো না...'
মেয়েটা রক্ত খাওয়া শেষ করে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল আজিজের শরীরটা। ওর রক্তের তৃষ্ণা যেন আরও বেড়ে গেছে। মানুষের রক্তের স্বাদ লেগেছে ওর জিভে। ওর বুড়ো বাবা ওকে মানুষের রক্তের স্বাদ পেতে দেয়নি কখনো। সেই কবে যেন পেয়েছিল তাও ভুলে গেছে। দ্রুত পায়ে ও এগিয়ে এল মোজেসের দিকে। মোজেস আত্মরক্ষার্থে পিস্তলটা তুলল, ওর হাত কাঁপছে। সামনে শমন দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিজয় ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের মাঝে। তৃষ্ণা এগিয়ে আসতে গিয়েও থেমে গেল হঠাৎ। ওই ভয়ংকর ধকধক করে জ্বলতে থাকা অগ্নিপিণ্ডের মতো চোখ দুটো দিয়ে তাকিয়ে থাকল বিজয়ের দিকে।
ফাদার ফ্রেডেরার যেন এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিলেন। মাটিতে একটা বজ্রচিহ্ন আঁকলেন তিনি। সেই চিহ্নের একপ্রান্তে আঁকলেন একটা বড় ক্রস। অপশক্তির বিরুদ্ধে এভাবেই কবচ আঁকা হত অনেক আগে। এখনও ইউরোপের দেশগুলোতে এই কবচ আঁকার প্রক্রিয়া আছে। আগের চিহ্নটায় কোনও কাজই হয়নি। আগে ওই ডাইনিটাকে শেষ করতে হবে। মেয়েটা অপশক্তি হলেও রক্তমাংসের মানুষ। কিন্তু ওই ডাইনিটা তা নয়। কবচের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি আহ্বান জানালেন ডাইনিটাকে। প্রবল ঝুঁকি নিলেন। কারণ এইভাবে ওই ডাইনিটাকে ডাকতে গেলে ওর মাংস ঝুলে পড়া মুখের দিকে দেখতেই হবে। বুড়ি ডাইনিটা এগিয়ে আসতে লাগল ফাদারের দিকে। ওটার মুখের দিকে তাকানো মানেই গভীর সম্মোহনের ফাঁদে পা দেওয়া। গোসাপটাও এগিয়ে আসছে তার লকলকে জিভটা বের করে। প্রমাদ গুনলেন ফাদার। একটা ভুল হলেই চলে যেতে পারে তার জীবন।
বুড়ি ডাইনিটা ফাদারকে স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সরে গেলেন সামান্য। আকাশ কাঁপিয়ে ভয়ংকর চিৎকার করে উঠল ডাইনিটা। সে পা দিয়ে ফেলেছে কবচটার ভেতর। দাউদাউ করে আগুন ধরে গেল তার সারা শরীরে। আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে লাগল তার ছায়াশরীর। হাতের লাঠিটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল পাখির খুলি সমেত। পুড়ে গেল তার পোষ্য নরকের প্রহরী সেই গোসাপটা।
ডাইনির চিৎকারে ঘোর ভাঙল তৃষ্ণার। সে বীভৎস গলায় বলে উঠল, 'রক্ত চাই রক্ত... আরও রক্ত...'
সে গলার স্বর শুনে ফাদারও কিছুটা যেন দমে গেলেন। শিউরে উঠলেন তিনি। এইভাবে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যাবে না একে। তিনি জানেন না একজন অপদেবীকে কীভাবে ঠেকিয়ে রাখা যায়। এখন সে আর মানব সন্তান নয়। সে পুরোপুরিই হয়ে উঠেছে রক্তলোভী এক পিশাচী। ফাদার মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন। বাইবেলের পবিত্রতা উজার করে দিতে লাগলেন। কিন্তু কিছুতেই যেন ফল ফলছে না।
মোজেসকে একহাতে তুলে ধরল তৃষ্ণা। অত ভারী শরীরটা যেন মোমের চেয়েও হালকা হয়ে গেছে। বিজয় চেপে ধরল তৃষ্ণার হাতটা। সর্বশক্তি দিয়ে মোজেসকে ছাড়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না যেন। মেয়েটার গায়ে যেন অসীম ক্ষমতা। তখনই বিজয়ের মাথায় এল মোজেসের বাড়ি থেকে বেরনোর আগের মুহূর্তে ফাদার কী বলেছিলেন। ফাদার বাইবেল পড়ে চলেছেন একমনে এই কারণে হয়তো উনি কিছু বলতে পারছেন না।
বিজয় চিৎকার করে উঠল, 'দোয়েল একটা গান তোমাকে গাইতে হবে। খুব বিষাদ আছে যে গানের সুরে। ওকে শান্ত করতে হবে।'
দোয়েল মাঝে মাঝেই শিউরে উঠছিল সামনের দৃশ্য দেখে। কী করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না। পদে পদে ওকে তাড়া করছিল মৃত্যুভয়। গাড়ির ভেতর ঢুকে বসেছিল ও বিজয়ের নির্দেশে। মনের জোর সঞ্চয় করে ও বেরিয়ে এল বাইরে। কারও জীবন ওর গানের জন্য রক্ষা পাবে! আশ্চর্য লাগছে ব্যাপারটা। এই পরিবেশে যেন গান কিছুতেই গলা দিয়ে বেরোতে চাইছে না। তবুও বহু কষ্টে ও একটা বিষাদের গান গেয়ে উঠল।
তৃষ্ণার হাত শিথিল হয়ে গেল হঠাৎ। ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল মোজেস। ওর শরীরটা যেন নিমেষের মধ্যে পালটে যাচ্ছে। ভয়ংকর রক্তপিপাসু পিশাচী থেকে সে যেন হয়ে উঠছে সুন্দরী এক রমণী।
দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখতে থাকা মানুষটা আর দেরি করলেন না। এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিলেন তিনি। ওঁর মনে পড়ল বহুদিন আগে কালীপ্রসাদ কালীর বলা কথাটা 'সঙ্গীতে ভগবান, মানুষ, পিশাচ সবাই জব্দ হয়।' চাদরের ভেতর থেকে তিনি বের করে আনলেন সেই ছুরিটা। যার বাঁটে '০' সংখ্যাটি লেখা আছে। এটা কালীপ্রসাদই তাঁকে দিয়েছিলেন। আর দিয়েছিলেন একটা কালো রঙের কাপড়ে তৈরি পুতুল। তিনি পুতুলটার বুকে ছুরিটা বসাতে গিয়েও থমকে গেলেন। তাকালেন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তৃষ্ণার দিকে। যে নামটা মেয়েটাকে তিনিই দিয়েছিলেন। উত্তমা চলে যাওয়ার পরে এই মেয়েটাই সেই ফাঁকা জায়গাটা ভরাট করে দিয়েছিল। হোক ও পিশাচী, কিন্তু নিজের মেয়ের মতোই ওকে বড় করেছেন তিনি। তিনি এটা জেনেই ওকে বড় করেছেন, উনিশ বছর বয়সে ওই পিশাচীর কার্য সিদ্ধি হলে পাঠিয়ে দিতে হবে নিজের দুনিয়ায়। তাও মায়া পড়ে গেছে যে। হাত কাঁপতে লাগল তাঁর। ছুরিটার ভার যেন হাত আর নিতে পারছে না। চোখের কোণে জল জমেছে, আর একটু হলেই গড়িয়ে পড়ে যাবে।
'নাহ! এ আমি পারব না।' মাটিতে বসে পড়লেন বৃদ্ধ শ্রীকান্ত সামন্ত। চাদরের পেছন ধরে কেউ টান দিল তাঁর। তিনি চকিয়ে ঘুরে তাকালেন। তাঁকে কি কেউ ধরে ফেলল! পেছনে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন তিনি। একটা বাচ্চা ছেলে মিটিমিটি করে হাসছে তাঁর দিকে তাকিয়ে। বাচ্চাটা বলল, 'কোই গো দাদু তাড়াতাড়ি শেষ কর খেলাটা!'
কেমন যেন ঘোরের মধ্যেই তিনি আমূল বিঁধিয়ে দিলেন ছুরিটাকে পুতুলটার বুকে। সামনে তাকিয়ে তিনি দেখলেন বাচ্চাটা কোথাও নেই। কোথায় গেল ছেলেটা! বুড়ো বয়েসে মনের ভুল হয়েছে হয়তো। তৃষ্ণার দিকে দেখলেন তিনি। চোখদুটো জলে ঝাপসা হয়ে আসছে তাঁর। তবুও যেটুকু বুঝলেন অপদেবী জিলোনেন ওর মেয়ের শরীর ছেড়ে চলে গেছে নিজের দুনিয়ায়। ওই দূরে ওদের সামনে যে দেহটা পড়ে আছে সেটা কালীপ্রসাদ আর রঙলী ডাইনির ভালোবাসার সন্তান তৃষ্ণার দেহ।
বাড়ির পথ ধরার আগে শ্রীকান্ত সামন্ত অর্জুনের মৃতদেহটার থেকে দূরে পড়ে থাকা আজিজের চেনটা তুলে নিলেন। তিনি ভীষণ হাঁফিয়ে উঠেছেন। এবার ভাইপো-ভাইঝিদের মাঝে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। আজিজের চেনটায় যে লকেটটা ঝুলছে সেটাই তাঁদের কুলদেবতার সেই নীলকান্ত মণিটা। সেই নীলা হীরেটা ওটা আবার মাধবের গলায় পরিয়ে দিতে হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন