মনীষ মুখোপাধ্যায়

শুক্রবারে প্রায় সবকিছুই বন্ধ থাকে। আর আজ তো বৃষ্টিও নেমেছে বেশ। রেডিওর খবরে বলছে এই বাদলা নাকি আরও দিন দুয়েক থাকবে। ওদিকে পাক্কা একটা খবর এসেছে মেছকন্দরের কানে। আজিজ নামের একটা এজেন্ট রাজি হয়েছে নদী পার করিয়ে দিতে। তারমানে রাতারাতি সামন্তরা ইন্ডিয়া ভেগে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে! আজ জুম্মাবার পার করে কাল শনিবার রাতেই ওই পরিবার পগার পার হয়ে যাবে। দোকানের কোনও সওদা করেননি শেষ অবধি সামন্ত সাহেব। একটা জর্দা পানের খিলি গালে ঠেসে মেছকন্দর এরশাদের পিছন নিল।

এরশাদ মাংসের দোকান চালায় পুরোনো বাজারে। কিন্তু আসলে সে পাকিস্তান আর্মির গুপ্তচরের কাজ করে। বাজারে যেসব কথা হাওয়ার ওড়ে, সে সেই কথাগুলো পুটুস করে লাগিয়ে দেয় আর্মির অফিসারদের কানে। ওর কারণেই অনেক মুক্তিযোদ্ধার খবর আর্মির কানে গেছে।

একটা স্কুল অধিকার করে রেখেছে আর্মির লোক। সেখানে মাজিদ খান হলেন পাকিস্তান আর্মির ক্যাপ্টেন শ্রেণির একজন কর্মী। তাঁর কাছেই যাচ্ছে এরশাদ আর মেছকন্দর। দরজার সামনে পাহারায় যারা দাঁড়িয়েছিল, এরশাদকে দেখে তারা পথ ছেড়ে দিল। একটা সেপাই দুষ্টু হাসি হাসল এরশাদকে দেখে।

এরশাদ তাকে জিগ্যেস করল, 'ছিকারেট খাইবেন নাকি?'

সে কোনও কথা না বলেই হাত বাড়িয়ে দিল এরশাদের দিকে। মুরগির রক্ত লাগা জামার পকেট থেকে এরশাদ একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল। সে সিগারেটটা বেশ আয়েস করে ধরালো। তারপর ভারি গলায় এরশাদকে জিগ্যেস করল, 'কেয়া চাহিয়ে?'

এরশাদ হলদে ছোপলাগা দাঁত বার করে বলল, 'সেপাই সাহেব, মাইবাপ আন্দার আছেন নাকি?'

মেছকন্দরের বুঝতে অসুবিধা হল না, এরশাদ ক্যাপ্টেন সাহেবের কথা জিগ্যেস করছে। এই পরিবেশে তার কেমন ভয় ভয় করছিল। দিন কয়েক আগে কয়েকজন সেপাই বাজারে গিয়েছিল। একটা কী বিষয় বদরুল মিঞার সঙ্গে কথা কাটাকাটি শুরু হয় ওদের। ব্যস! এক সেপাই রেগে গিয়ে বেদম মারতে থাকে বদরুলকে। প্রতিবাদ করতে সবাই ভয় পায়। মেছকন্দর এই পরিস্থিতির সঙ্গে আপোস করে নিয়েছে। সে ব্যবসায়ী মানুষ। দেশে পাকিস্তানি রাজত্ব চলুক বা স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হোক, তাকে ব্যবসা করেই খেতে হবে। তার ব্যবসার পথে চিরকাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই শ্রীকান্ত সামন্ত। যাওয়ার সময় দোকানটাও দিয়ে যাচ্ছে না। তার ওপর আবার কী বাজে ব্যবহারটাই না করল তার সঙ্গে। সেই রাত থেকেই মেছকন্দর ঠিক করেছে, প্রতিশোধ নিতেই হবে।

সেপাই মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, 'স্যার হ্যায়। পর জাদা পরেশান মত করনা। তবিয়ৎ আচ্ছা নেহি হ্যায়।'

'না না সেপাই সাহেব। আমি কিসুই কমু না। আমার এই দোস্ত ছ্যারেরে একটা গোপন সংবাদ দিয়াই বাইরইয়া আইব।' বলল এরশাদ।

'ঠিক হ্যায় যাও। পর কোই নারাজগিকা বাত হুয়া তো বেশক গোলি মার দেংগে...'

বুকটা কেঁপে উঠল মেছকন্দরের। অন্যের কবর খুঁড়তে এসে শেষে নিজের জানটাই না চলে যায়! সে হাতটা চেপে ধরল এরশাদের। এরশাদ তার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারল।

যে ঘরটায় তারা ঢুকলো, সেই ঘরটা মেছকন্দর চিনতে পারল। এটায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক বসতেন আগে। এখন আর স্কুলও হয় না। প্রধান শিক্ষক নিজের বাড়ি চলে গেছেন কুমিল্লায়। মেছকন্দর লক্ষ করল একজন পেটানো চেহারার ইউনিফর্ম পরা মানুষ প্রধান শিক্ষকের চেয়ার দখল করে বসে আছেন। লোকটার গায়ের রং টকটকে ফর্সা। লম্বাটে মুখ, আর খেয়াল করার জিনিস হচ্ছে লোকটার নাকটা। যেটা ভীষণ অপ্রয়োজনীয় রকমের লম্বা। লোকটা চোখ বুঝে একমনে লম্বা একটা চুরুট টেনে চলেছেন। মেছকন্দর অনুমান করল, ইনিই সম্ভবত ক্যাপ্টেন সাহেব!

এরশাদ গলা খাঁকারি দিল বেশ জোরেই। ভদ্রলোক বিরক্তির সঙ্গে চোখ মেলে তাকালেন ওর দিকে। তারপর দাঁতে দাঁত পিষে বললেন, 'উই দ্য ব্লাডি ডগ। হোয়াট দ্যু ইউ ওয়ান্ট ফ্রম হিয়ার?'

অশিক্ষিত মেছকন্দর আর এরশাদ লোকটার কোনও কথাই বুঝতে পারল না। এরশাদের মুখটা ঝুলে গেল ইঞ্চি খানেক। ক্যাপ্টেন সাহেব একহাতে চুরুটটা ধরে অন্য হাতে তার রিভলভারটা তুলে নিলেন টেবিল থেকে।

কিন্তু কিন্তু করে এরশাদ কথাটা পেড়েই ফেলল, 'ছ্যার আমার এই বন্ধু মেছকন্দর মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে আফনাকে কিছু কইতে আইছে।'

'কেয়া কহেনা হ্যায়। কুইক। আই ডোন্ট হ্যাভ মাচ টাইম।'

কিছু বোঝার আগেই মেছকন্দর শুরু করল। 'আমাগো পাশের দোকান সামন্ত বস্ত্রালয়, বোঝলেন কিনা ছ্যার! তার মালিকের পোলাডা সম্ভবত মুক্তিযোদ্ধাদের দলে নাম লেখাইছে। এইর লইগ্যা তার বাপে তারে লইয়্যা ইন্ডিয়া পালানোর পরিকল্পনা করছে। আফনার রাজত্বে থাইক্যা এসব আমরা সহ্য করুম না। তাই পাক্কা খবর দিতে আইলাম। পাছে পলায় তার আগেই ধইরা ফ্যালান।'

ক্যাপ্টেন বোধহয় বাংলা বোঝেন কিছু কিছু। উনি চুরুটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, 'কব যায়েঙ্গে উও লোগ?'

এরশাদ এইখানে খবর পৌঁছতে এসে এদের ভাষা অনেকটা শিখে ফেলেছে। সে মেছকন্দরকে বলল, 'এরা কবে যাবে, হেইডা হুজুরে জিগায়।'

'কাল রাতে নদী পার হওনের পরিকল্পনা আছে ওদের।' ছোট্ট উত্তর দিলো মেচুকন্দর।

'ওকে আই উইল সি। তুম লোগ আভি যাও ইধর সে।' কড়া গলায় বলে উঠলেন ক্যাপ্টেন।

মেছকন্দর আর এরশাদ ওই গলার ঝাঁঝ শুনে পড়ি কি মড়ি বলে ছুট দিল পেছন ফিরে। আসার পথে এরশাদ বলল, 'ভুইল্যা যাইও না মিঞা। পনেরো হাজার কিন্তু আমার চাই। আর্মির কানে যহন কথা উঠছে একটাও প্রাণ নিয়া নৌকায় উঠতে পারব না। ইসপট ডেড।' নিজের ইংরেজি শুনে নিজেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠল সে।

'হ দোকানডার অধিকার পাইলে তোরে পনেরো হাজার তো অবশ্যই দিব কইছি। মেছকন্দর উদ্দিনের কথার খেলাপ হয় না।' সায় দিল মেছকন্দর।

অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে ওরা। এরই মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টির তোড় কিছুটা বেড়েছিল। তাতেই তাদের শরীর ভিজে সপসপে হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে সামান্য সমস্যা আছে মেছকন্দরের। বৃষ্টি ভিজলেই তার আসে ধূম জ্বর। কিন্তু আজ ওই দোকানটা পাওয়ার আশ্বাস পেয়ে বোধহয় ওসব জ্বরজারির তোয়াক্কা সে করছে না। তার একটা অন্যরকম ভয় কাজ করল।

সে চুপিচুপি একেবারে গলার স্বর নীচে নামিয়ে এরশাদকে জিগ্যেস করল, 'ও মিঞা! শুনছি ওই সামন্তের মাইয়াডার কলেজের পোলাগুলা সব মুক্তি বাহিনীতে নাম লিখাইসে। ওরা জানে মাইরা ফ্যালাইবো না তো?'

মুখে লেগে থাকা বৃষ্টির জল কাঁধে ঝোলানো গামছায় মুছে এরশাদ ফিক করে হাসল। তারপর বলল, 'ডরায়েন কীর লইগ্যা? ওরা মুক্তি বাহিনী হইলে আমরাও শান্তি বাহিনী। ক্যাপ্টেন সাহেব যহন ভরসা দিছেন, যান গিয়া বাসায় গিয়া নাকে ত্যাল দিয়া ঘুম দ্যান।'

মেছকন্দরকে কিছুটা আশ্বস্ত দেখালো। মনে মনে একটা বড়ো পরিকল্পনা করেছে সে। যে এজেন্ট ওদের নদী অবধি নিয়ে যাবে তাকে বিলক্ষণ চেনে মেছকন্দর। এরশাদ আর তার এই নিয়ে একটা কথাবার্তা হয়েছে, সামন্ত পরিবার শেষ হলে এরশাদ নিজেই সরিয়ে ফেলবে ওই এজেন্টটাকে। তারপর সামন্তদের বসতবাড়িটাও আধাআধি ভাগ করে নেবে তারা দুজন। এই বাজারে অত বড়ো বাড়ি পাওয়া কি মুখের কথা! এ দেশের হাওয়া যা বলছে, আগামী দিনে মুক্তিযোদ্ধারাই জয় লাভ করবে। তখন এই শান্তি বাহিনীর পোশাক পরে নিজের বাসাটা ওদের দানে দিয়ে দেবেন একটা ইস্কুল করার জন্য।

একেবারে গোছানো পরিকল্পনা। কেউ কোনও সন্দেহই করবে না মেছকন্দরের বিষয়। যদিও মুক্তি ফৌজের কেউ কেউ এরশাদকে সন্দেহ করে ঠিকই। এরশাদের যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে মেছকন্দরের পোয়া বারো। মনে মনে হাসল সে। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, 'কাইল রাইতটা পার হইতে দে, তারপর দেহি তোরে কী করন যায়। হালা ইবলিসের বাচ্চা।'

'কিছু কইলেন নাকি?'

'নারে ভাই, আগে দেইখ্যা চল। রাস্তা খন্দে ভরতি।'

ওরা দুজন এগিয়ে বলল বৃষ্টিভেজা অন্ধকার রাস্তা ধরে। আর মাত্র একটা রাতের ব্যাপার!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%