১৮

মনীষ মুখোপাধ্যায়

রাত সাড়ে দশটা বেজে গেছে। শীতের কারণে প্রতিটা রাস্তা, অলিগলি ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। থানাতেও তেমন কোনও কাজ নেই আজকে। এস আই প্রতিম কুন্ডু আর কনস্টেবল নারায়ণ ছাড়া এই মুহূর্তে থানা প্রায় ফাঁকা। ওরা নাইট ডিউটি সামলাচ্ছে। পাহাড়িবাবু কড়া নির্দেশ দিয়ে গেছেন, 'কোনোমতেই মেয়েটাকে হালকাভাবে নেবেন না আপনারা।'

বিকেল থেকেই ওই সেল থেকে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। দুপুরে খাবার দিয়ে আসার পর থেকে কেমন যেন সব চুপচাপ হয়ে গেছে। এস আই একটা সিগারেট ধরিয়ে নারায়ণকে জিগ্যেস করল, 'মেয়েটার খবর কী গো?'

'দুপুরে হারাণ খেতে দিয়ে এসেছিল তারপর তো আর ওদিকে যাওয়া হয়নি।' উত্তর দিল নারায়ণ।

'আর বাপটার?' আবার প্রশ্ন করল এস আই।

'সে সারাদিন শুধু ঘুমায়।' হেসে বলল নারায়ণ। বুড়োটার সারাদিন গুমোনোর ব্যাপারটাতে সে খুব মজা পায়। তাদের এই কঠিন ডিউটির মাঝে কাউকে এত ঘুমোতে দেখলে সত্যিই মজা হয় বুড়ো কনস্টেবল নারায়ণের।

'একবার দেখে আসবে নাকি?' নির্দেশের সুরেই কথাটা বলল প্রতিম কুন্ডু।

মাথা নাড়ল নারায়ণ। রাতের খাবার দেয়ার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। এই কেসটাকে নিয়ে ওদের তেমন হেলদোল নেই বলেই ওরা খুব একটা যায় না ওই সেলটার দিকে। পাহাড়ি স্যার দুপুরের দিকে আসেন বলে যেতেই হয়।

লাঠিটা হাতে নিয়ে সেদিকে চলতে লাগল নারায়ণ। সেলটার দশ হাত দূর থেকে বিরাজ করছে গাঢ় অন্ধকার। শীতের কুয়াশা ঢুকে পড়েছে কেমন করে যেন থানার শক্ত দেয়াল ভেদ করে। নানান রকমের কটু গন্ধের সমাহার এদিকটাতে। এই মেয়েটার জন্য একজন মহিলা কনস্টেবল থাকে অন্যদিন, আজ কোনও কারণে সে বাড়ি গেছে।

সেলটার কাছাকাছি পৌঁছে একটা শব্দ শুনতে পেল নারায়ণ। কেউ করুণ সুরে কাঁদছে! একটনা ভেসে আসছে প্রাণ জল করে দেওয়া সেই কান্নার শব্দ। উঁউউ...উঁউ...উঁ... উঁউউ...উঁউ...উঁ...

বুকটা কেঁপে উঠল নারায়ণের। রাতের রাস্তায় ব্যাকুল স্বরে যখন অনেকগুলো কুকুর কেঁদে ওঠে, ঠিক যেমন শুনতে লাগে এই কান্নার শব্দও যেন ঠিক তেমন। আর একটু এগিয়ে গেল নারায়ণ। অন্ধকার একচিলতে বারান্দা পার করলেই মেয়েটার সেল। শব্দটা সেদিক থেকেই আসছে না তো! মনে মনে ভাবল নারায়ণ। আন্দাজে মনে হচ্ছে আওয়াজটা আসছে সেদিক থেকেই। অন্ধকারে একবার হোঁচট খেল ও। আর একটু হলে পড়েই যেত, বেঁচে গেল জুতোর শক্ত সোলের জন্য।

অন্ধকারের মধ্যে চোখের আন্দাজে নারায়ণের মনে হল মেয়েটার সেলের বাইরে কেউ একটা দাঁড়িয়ে আছে।

'কে ওখানে?' কঠিন গলায় জিগ্যেস করল নারায়ণ।

ফিসফিস করে কেউ কথা বলছে। কথার মাথামুন্ডু কিচ্ছু উদ্ধার করতে পারা যাচ্ছে না। টর্চটা আনলে ভালো হত। ইসস, খুব ভুল হয়ে গেল। এসব ভাবতে ভাবতেই সেলটার খুব কাছে চলে এল নারায়ণ। সেলটার কাছে এসেই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পড়ল সে। সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে কে? এই থানায় সে ঢুকলই বা কী করে! আর হাতে ধরা ওই প্রাণীটা! ওটাকে নিয়ে এ থানায় ঢুকল অথচ কারও চোখে পড়ল না! এ যে গোসাপ!

সেলের ভেতরের খয়াটে বাল্বের আলো আগন্তুকের মুখে এসে পড়েছে। সে মুখ দেখে চিৎকার করে উঠতে গেল নারায়ণ। কিন্তু তখনও হয়তো আসল বিস্ময়টা ওর জন্য অপেক্ষা করছিল বলে গলা থেকে স্বর বেরোল না। সেলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুক একজন বৃদ্ধা। মাংস ঝুলে নেমেছে তার সারা মুখের। দগদগে মাংস গা থেকে খসে পড়তে চাইছে। বৃদ্ধার একহাতে ধরা একটা লম্বা লাঠি আর অন্য হাতে ধরা গোসাপের দড়িটা।

সে ফিসফিস করে বলে উঠল, 'আমাদের মেয়েকে ছেড়ে দাও... আমাদের মেয়েকে ছেড়ে দাও... ও শয়তান ও সবাইকে শেষ করে দেবে...'

আর তখনই সেলের ভেতর থেকে ভেসে এল আবার সেই কান্নার শব্দটা। উঁউউ...উঁউ...উঁ...

হাঁড়হীম করে দেওয়া সেই কান্নার শব্দটা শুনে নারায়ণের চোখ সরে গেল বুড়ির ওপর থেকে। ও তাকাল সেলের ভেতর। সামনের দৃশ্য দেখে ভয়ে অবশ হয়ে গেল তার শরীর। সেলের ভেতর যে মেয়েটা ছিল, ও চার হাত-পায় ওর দিয়ে দেয়াল বেয়ে উঠে গেছে ভেন্টিলেটারের কাছে। ডানহাতের ধারালো নখ দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করছে ভেন্টিলেটারের জালটা। হাত কেটে রক্ত পড়ছে ওর। আর ও যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে।

দৃশ্যটা দেখে ভয়ে আর বিস্ময়ে ঘোর লেগে গেল নারায়ণের। কানের কাছে বুড়িটা তখনও বলে চলেছে, 'ওকে ছেড়ে দাও... ও শয়তান... সবাইকে শেষ করে দেবে... ওকে ছেড়ে দাও...'

নারায়ণ যন্ত্রচালিতের মতোই খুলে দিল সেলের তালা। মেয়েটা মাকড়সার মতোই দ্রুত দেয়াল বেয়ে নেমে এল দরজাটার কাছে। কেমন যেন অদ্ভুতভাবে হামা দিয়ে বেরিয়ে এল সেলটা থেকে। ঝাঁপিয়ে পড়ল নারায়ণের ওপর। নারায়ণ ভার সামলাতে না পেরে পড়ে গেল মাটিতে। এতক্ষণ গোসাপটা আজ্ঞাবহের মতো একই জায়গায় দাঁড়িয়েছিল। এবার সেও এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে লাগল তার দিকে। আর সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে উঠল নারায়ণ।

প্রতিম কুন্ডুর কানে গেল নারায়ণের চিৎকারের শব্দ। সে মন দিয়ে একটা ফাইল পড়ছিল। ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল শব্দটা শুনে। ও তো নারায়ণকে পাঠিয়ে ছিল ওই মেয়েটার সেলে ওকে খাবার দেওয়ার জন্য। কোনও বিপদ হল নাকি! টেবিলের ওপর থেকে টর্চটা তুলে নিয়ে ও দৌড়ে গেল সেলটার দিকে। সেখানে পৌঁছেই অবাক হয়ে গেল। নারায়ণ কনস্টেবল মাটিতে পড়ে আছে। ওর মুখ থেকে গ্যাঁজলা বেরিয়ে আসছে! ওর সামনে হাট করে খোলা সেলের দরজা। মেয়েটা ভেতরে নেই!

ও নিজেই চেষ্টা করে ফেরাতে চেষ্টা করল নারায়ণের জ্ঞান। বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় বিফল হয়ে একে একে ফোন করল স্থানীয় ডাক্তার, থানার ইনচার্জ আর পাহাড়ি স্যারকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%