মনীষ মুখোপাধ্যায়
ডক অঞ্চলে অর্জুন আর সাজিদের নামে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায়। পুলিশ পর্যন্ত ওদের এড়িয়ে চলে। আজ থেকে উনিশ বছর আগে অর্জুন ছিল এই অঞ্চলের সামান্য মালবাহী কুলি শ্রেণির লোক। আর আজ ওদের মেটিয়াবুরুজ বস্তির মধ্যে প্রাসাদের মতো একটা বিশাল বাড়ি। সাজিদকে না পেলে এসব কিছুই হত না অর্জুনের। সবরকম কালো বা সাদা কাজকর্মের ওরা আধাআধি অংশীদার। সাজিদ কোথা থেকে এসেছিল অর্জুন জানে, জানে ওর অতীতের কথা। ওর কাছে যেন সে ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতোই এসেছিল। লালাজি তখন ডক এরিয়ার হেড ছিলেন। ট্রলারের ভাগ একা নিতেন। টানা মালের হিসসা একাই ভোগ করতেন। মজুর কুলিদের খাটানোর পর দু'বেলার খাওয়া ছাড়া আর কিছুই দিতেন না। তারপর একদিন এসেছিল সাজিদ।
সাজিদ যেদিন এখানে এসেছিল ওকে খুব ভয়ার্ত দেখাচ্ছিল। যেন কোনও কিছু থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ছেলেটা। অর্জুনের বয়েস তখন বাইশ বছর মতো হবে। ওর মনে আছে সাজিদ একরাতে ডক এরিয়ায় ঢুকে ওর ছোট্ট চালাটার সামনে এসে বসে হাঁফাচ্ছিল। অর্জুন হিন্দিতে ওকে জিজ্ঞেস করেছিল ওর কী হয়েছে। সাজিদ বাংলাদেশি টানে কথা বলছিল। ও বলেছিল, 'পানি খাওয়াতে পারেন ভাই?' অর্জুন ওকে জল দিয়েছিল। সে রাতে ওরা বন্ধু হয়ে গেছিল। সাজিদের খারাপ লেগেছিল অর্জুনের অবস্থা দেখে। দাঁতে দাঁত চেপে ও বলেছিল, 'ভাই অধিকার সকলের। খাড়ান আপনে। আমি একটা মস্ত পরিকল্পনা করব। তারপর আপনি এই তল্লাটের রাজা হয়ে যাবেন।'
অর্জুনকে শুধু সাজিদ জিজ্ঞেস করেছিল কখন ওদের মালিককে একা পাওয়া যায়। একেবারের একা। অর্জুন জানত, লালাজি প্রতি রবিবার রাতে ফ্যান্সিবার থেকে মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফেরেন। ফেরার সময় একবার গদিতে এসে ওঁর ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে লায়লা নামের একটা মেয়েছেলের বাড়ি যান। ও সবটাই বলেছিল সাজিদকে।
সেদিন শহরে খুব গোলমাল হচ্ছিল। রাত নটার মধ্যেই ফাঁকা হয়ে গেছিল ডক এরিয়া। লালা একা হেঁটে যাচ্ছিলেন ওঁর গদির দিকে। ধোঁয়াশাঘেরা অন্ধকারের জাল ছিঁড়ে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল অর্জুন। লালার মুখটা ওকে দেখে বিরক্তিতে কুঁচকে গেছিল। জড়ানো গলায় ওকে গালাগালি দিয়েছিলেন লালা। অর্জুন দেখতে পেয়েছিল, ধূর্ত শিকারির মতোই পেছন থেকে একটা প্যাঁচানো রুমাল লালার গলায় চেপে ধরেছিল সাজিদ। ছটফট করছিলেন লালা। কিন্তু সাজিদের চোখে যেন কেমন শান্ত একটা ভাব ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে যেন একটা মানুষকে মারছে না। একটা মানুষকে মেরে ফেলা যেন কোনও ব্যাপারই না।
কে বা কারা লালাকে মেরে রেখে চলে গেছিল আজও জানেনা পুলিশ। লালার ডানহাত ছিল নেরু। ও ব্যবসার ভার নিয়েছিল সেই সময়। কিন্তু গায়ের জোর থাকলেই তো এই ব্যবসা করা যায় না, বুদ্ধিও লাগে। নেরু অশিক্ষিত ছিল আর বোকাও ছিল খুব। এই সুযোগটাই নিয়েছিল সাজিদ আর অর্জুন। অর্জুনের শক্তি আর সাজিদের বুদ্ধি দিয়ে একটা নতুন দল তৈরি করেছিল ওরা। আর আজ আলপিন থেকে হাতি সবই ওদের মর্জিতে বেরোয় ডক এরিয়া থেকে। সব মালের চোরাচালানের ওপর থাকে ওদের ভাগ। উনিশ বছরের কড়া পরিশ্রমের ফসল এই রাজত্ব। অর্জুনকে সামনে রেখে ব্যবসা চললেও, সেই প্রথম দিন থেকেই সাজিদকে অংশীদার করে নিয়েছিল অর্জুন। ডক ইয়ার্ডে ওদের শত্রুরা তাই সাজিদকেই নিজেদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে। সাজিদকে সরিয়ে দিতে পারলেই অর্জুন শেষ এটাই মনে করে ওরা।
দিন দুয়েক আগে একটা হামলাও হয়েছে সাজিদের ওপর। বুদ্ধির জোরে এবারেও বেঁচে গেছে ও। পঁয়তাল্লিশ ছেচল্লিশ বছরের রোগাটে চেহারায় এখনও অনেক ক্ষমতা আছে সাজিদের। সেই নিয়েই আজ দুর্গে একটা মিটিং বসেছিল। অর্জুনের কোমরে নতুন রাশিয়ান মডেলের পিস্তলটা দেখে একপ্রকার বোবার মতোই বসেছিল এলাকার মস্তানগুলো। অর্জুন ওদের থেকে বারবার জানতে চাইছিল আক্রমণকারীর নামটা। কেউ মুখ খুলছিল না। বেশ কিছু সময় পর দুর্গে ঢুকেছিল সাজিদ। ওদের মেটিয়াবুরুজের দোতলা বাড়িটার 'দুর্গ' নাম রেখেছে সবাই।
সাজিদকে দেখেই ঘামতে শুরু করেছিল মস্তানেরা। যেন স্বয়ং যমরাজ নেমে এসেছেন। ও শুধু হেসেছিল ওদের দিকে তাকিয়ে। খুনি মস্তানগুলো নিজে থেকেই বলতে শুরু করেছিল, তারা কিছুই জানে না। খুব ঠান্ডা মাথায় সাজিদ গিয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজুর পেছনে। পকেট থেকে বের করেছিল ওর চেনা পরিচিত অস্ত্র সেই রুমালটা।
তারপর কেটে কেটে ঠান্ডা গলায় বলেছিল, 'আমার সত্যিটা অর্জুনভাই ছাড়া আর কেউ জানে না। তোরা আমারে চেনসই না। হাসতে হাসতে পাখি উড়াইয়া দেয়া আমার কাছে একটা ব্যাপারই না।'
রাজু হল নেরুর ছেলে। সে তার বাপের ক্ষমতা ফেরাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই কারণে ওকেই নিজেদের প্রধান শত্রু ভাবে সাজিদরা। রুমালটা ধীরে ধীরে গলায় নেমে আসছিল রাজুর। চাপ বাড়ছিল। চেঁচিয়ে উঠেছিল গণেশ, 'রাজুদা কিছু জানে না। আমি আর রাজুদা পার্কস্ট্রিটে ছিলাম ওদিন রাতে। কেদারকে জিগ্যেস করে নিও সাজিদদা...'
কথাটা বলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছিল গণেশ। সাজিদ ছেড়ে দিয়েছিল রাজুকে। কেদারকে ফোন করেছিল ও। কেদার পার্কস্ট্রিটের ডিউটি অফিসার। অর্জুনের সঙ্গে তাঁর ভালোই সক্ষতা। ফোনে তিনি কনফার্ম করেছিলেন, হ্যাঁ রাজু ওদিন এই অঞ্চলেই ছিল...
রাতে দুই বন্ধু বসেছিল দুর্গের বৈঠকখানায়। অর্জুন সাজিদকে বলল, 'দোস্ত একটু সাবধানে থেকো, তিসরা কেউ আছে। যে চায় না তুমি বেঁচে থাকো।'
পাঁচশো পঞ্চান্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটে লম্বা টান দিল সাজিদ। হেসে তাকাল অর্জুনের দিকে, 'ভাই তুমি তো জানো আমি কার হাত থেকে বেঁচে ফিরছি। তারপরে আমাকে মারার ক্ষমতা আর কাউর নাই। এইসব ছুঁচোরা আমাকে মারতে পারব না। সে ক্ষমতা আল্লাহ ওদের দেয় নাই।' দুলে দুলে হাসতে লাগল সাজিদ।
সত্যিই ওর ওপর সারাজীবনে অনেক ঝড় গেছে মনে মনে ভাবতে লাগল অর্জুন। নাহ! একে এত সহজে কেউ মারতে পারবে না। ও সাজিদের পিঠে হাত রাখল 'সাবধানে থেকো তবুও। তুমি ছাড়া এই ডক এরিয়া চালাবার ক্ষমতা কারও নেই।'
কথা বলতে বলতেই বাবুর্চি খাবার দিয়ে গেল ওদের। ওরা ব্যবসার কথায় ঢুকে গেল খেতে খেতে। ডক এলাকার আশেপাশে অনেক বড়বড় বাড়ি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। কলকাতা দ্রুত পালটে যাচ্ছে। ওই বাড়িগুলো যারা বানাচ্ছে তাদের সঙ্গে মিটিং করতে হবে এবার। বুঝিয়ে দিতে হবে, সাজিদ আর অর্জুনকে বাদ দিয়ে কিছুই করা যাবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন