১৯

মনীষ মুখোপাধ্যায়

কাল সারারাত ধরে মোজেস আর বিজয় মিলে খুঁজেছে মেয়েটাকে। তৃষ্ণার খোঁজ ওরা কোথাওই পায়নি। আলিপুর এবং তার আশপাশের প্রত্যেকটা জায়গায় প্রত্যেকটা বস্তির ঘরে ওরা খুঁজেছে তৃষ্ণাকে তন্নতন্ন করে। সঙ্গে পাহাড়িবাবুও ছিলেন, আর ছিলেন থানার ইনচার্জ। নারায়ণের বলা কথায় কেউ বিশ্বাস করেনি। কিন্তু বিজয়ের মনে হচ্ছে কোথাও যেন একটা গলদ আছে। কাজের সূত্রে ওকে ঘুরতে হয় নানান উপজাতিদের গ্রামে। সেখানের সংস্কার আর লোককথাকে ও অগ্রাহ্য করতে পারে না। এই যে সেদিন বুড়ো বলেছিল সাত ডাইনির চক্রের কথা, বিজয় জানে পুরুলিয়ার অনেক গ্রামে অনেক উপজাতিই বিশ্বাস করে সেসব।

এখন ওরা বসে আছে মোজেসের বাড়ির ডাইনিং রুমে। সারারাত ঘুম না হওয়ার কারণে ওদের দুজনের চোখই লাল হয়ে রয়েছে। একটু ঘুমিয়ে নিলে ওদের ক্লান্তি আর ধকল দুটোই কমে যায়। কিন্তু ওদের যেন এখন ঘুমোলে চলবে না। ওরা ঘুমিয়ে পড়লেই যেন শহরটাকে একটা প্রকাণ্ড ময়াল সাপ এসে গিলে ফেলবে।

'ওই বুড়ো মুন্ডা কিছু বলল?' চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করল বিজয়।

মোজেস কিছু একটা ভাবছিল। ও কথার উত্তর না দিয়েই বলে উঠল, 'বিজু তোর কি মনে হয় এই মেয়েটা সত্যিই একটা ডাইনি?'

'দেখ আমার কি মনে হয় না হয় তা দিয়ে কিছু এসে যায় না। তবে প্রথম থেকেই মনে হয়েছে বিষয়টা ঠিক আমাদের বোধগম্য হওয়ার নয়। এটার মধ্যে একটা অতিপ্রাকৃত ব্যাপার আছে। ট্রাইবালদের মধ্যে ডাইনি ব্যাপারটা বহুল প্রচলিত। আর সেদিকটা বাদ দিলেও মনস্তত্ত্বের একটা দিকও থাকে। যাকে ডাইনি বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে একেবারে ছেলেবেলা থেকে সে মানসিক ভাবেই এটা বিশ্বাস করবে সে অন্যদের থেকে আলাদা। তখন সে অদ্ভুত আচরণ করবেই। যেমন মেয়েটার কাঁচা মাংস খাওয়া বা মানুষকে আক্রমণ করা ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে ফাদারের ওই কথাটা ওর মুখে যখন শুনলাম, আর ওর বাবা ওকে রক্ত খেতে বলেছে একটা নির্দিষ্ট লোকের এই দুটো ব্যাপারে একটু খটকা লাগছে।' কথা শেষ করে বেটির রেখে যাওয়া গরম কফিতে চুমুক দিল বিজয়। তারপর আবার জিজ্ঞাসু চোখে মোজেসের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আচ্ছা ফাদারকে এখানে আনালে কেমন হয়? উনি শুনেছি এসব বিষয় ভালোই জানেন।'

'গ্রেট আইডিয়া!' লাফিয়ে উঠল মোজেস। আজই ফাদারকে টেলিফোন করার ব্যবস্থা করছি পারলে গাড়ি পাঠিয়ে ওঁকে আনানোর ব্যবস্থা করব আমি।

বিজয়ও সায় দিল ওর কথায়। ওর মন বলছে ফাদার ফ্রেডেরার এলে নিশ্চয়ই একটা রাস্তা বের হবেই। হতে বাধ্য।

'আচ্ছা ওর ওই বাবা, মানে মুন্ডা কী বলছেন বললি না তো?' আবার একই প্রশ্ন করল বিজয়।

'কাল রাতে থানায় ওকে খুব কড়কেছে বড়োবাবু আর পাহাড়িবাবু। লোকটা ভয়ে কাঁপছিল। তবে পুলিশের মারের ভয় যে ওর নেই তা ওর চেহারা দেখেই বোঝা যায়।' উত্তর দিল মোজেস।

'তাহলে কীসের ভয়?' হঠাৎ ক্লান্তিটা কোথাও উধাও হয়ে গেল যেন বিজয়ের।

'আরে বুড়োকে যতই ওরা চাপ দেয়, বুড়ো সেই একই কথা বলে যায়। ডাইনি শিকার ধরতে বেরিয়েছে... ডাইনি শিকার ধরতে বেরিয়েছে... যেন কেউ কথাটা ওকে পাখি পড়ানোর মতো করে পড়িয়ে দিয়েছে।' হাসতে হাসতেই কথাটা বলল মোজেস।

চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠল বিজয় কথাটা শুনে। ওকে খুব উত্তেজিত দেখাল হঠাৎ। ও দু'হাতে চাপড় মেরে বলে উঠল, 'পেয়ে গেছি... যে করেই হোক আজ সন্ধের মধ্যে ফাদার ফ্রেডেরারকে আনার ব্যবস্থা কর তুই। আজ রাতেই ডাইনি শিকার করবে। যার গন্ধে গন্ধে ও এখানে এসেছে তাকে ও মারবেই। আমার মনে হচ্ছে এর পেছনে অনেক বড় কোনো ঘটনা আছে। যা আমরা জানি না। একমাত্র ফাদারই আমাদের সাহায্য করতে পারেন।'

'হ্যাঁ সবচেয়ে তাড়াতাড়ি ওঁকে আনার একটাই রাস্তা আছে। লালবাতি গাড়ি! আমি চেষ্টা করছি। হার্ট এন্ড শোল চেষ্টা করছি যাতে ফাদার এসে পৌঁছতে পারেন।' বলল মোজেস। প্রয়োজন হলে ও নিজেই বেরিয়ে যাবে গাড়ি নিয়ে এটুকু আশ্বাস দিল ও।

মোজেসের হাতটা চেপে ধরল বিজয়। 'ফাদার এলে আমরা একজনের জীবন বাঁচাতে পারব বলে আমাদের মনে হয়। দেখ তুই চেষ্টা করে। তৃষ্ণাকে আমাদের থামাতেই হবে। ডাইনি বলে কিছু হয় না। ওই সাধারণ মানুষগুলোকে আমাদের দেখাতেই হবে। ওর মুখে আর রক্ত লাগতে দেওয়া চলবে না।' কণ্ঠে বেশ কিছুটা বিনয়ের সুর ঝোরে পড়ল বিজয়ের।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%