মনীষ মুখোপাধ্যায়
উত্তমা আজ একটা চিঠি পেয়েছে প্রফেসরের কাছ থেকে। চিঠিটা নিয়ে এসেছে সুলতানা। চিঠিটা নিয়েই সে দ্রুত পায়ে দৌড়ে ছাদে উঠল। এই একটাই জায়গা যেখানে তাকে কেউ বিরক্ত করবে না। দাদা আজ বাড়িতে নেই। তার শ্বশুরবাড়ি গেছে বউদিকে নিয়ে। ছাদের সিঁড়িতে বসে উত্তমা চিঠিটা খুলল। চিঠিটা প্যাঁচানো হাতের লেখায় শুদ্ধ ভাষায় লেখা হয়েছে আদ্যোপান্ত। এই লোকটা চিঠি লেখে শুদ্ধ আর সুন্দর ভাষায়। হাসল উত্তমা।
কল্যাণীয়াসু
আজ একাদশ দিবস অতিক্রান্ত। মনের উপর জোর খাটাইতে পারিতেছি না। তোমাকে একটিবার দেখিবার অভিপ্রায় হইতেছে। বিশ্ববিদ্যালয় আসিতেছ না কী কারণে বুঝিতে পারিতেছি না। শীঘ্র আইস। বিরহ সহিতেছে না। একটা কথা জানাইয়া রাখি, গত কয়েক দিবস ধরিয়া কয়েকটি পুস্তক লইয়া মজিয়া আছি। পুস্তকগুলি হিন্দুদের তন্ত্র সাধনার উপর আধারিত। ইহার মধ্যে একটি পুস্তকে একটি বিশেষ সাধন প্রণালী ব্যক্ত হইয়াছে। যাহাতে মানব সম্প্রদায়ের ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান বিষয়ে অবগত হওয়া যায়। এবং বিদ্যার সঠিক প্রয়োগে সম্ভব হয়না এমন কোনও কর্মই নাই। ইহার সম্বন্ধ সুদূর মায়াং নামক একটি প্রদেশের সঙ্গে। কথিত আছে মায়াং মহাভারতের কালে ভীমপুত্র ঘটৎকচের রাজধানী ছিল। সেই অঞ্চলটি ছিল ডাকিনীবিদ্যা এবং অদ্ভুত নানা বিদ্যার পীঠস্থান। এবং যে সিদ্ধির বিষয়ে কথা বলিতেছি তাহা ছিল স্বয়ং বেদব্যাসের আওতায়।
যিনি এই পুস্তকগুলি আমাকে দিয়াছেন, তিনি তন্ত্র বিষয়ে বিশেষ পণ্ডিত ব্যক্তি। তাহার নিকট তন্ত্র সম্পর্কিত নানান বিষয় জানিয়া বড় প্রফুল্ল অনুভব করি। একটি ছোট্ট শিশু নিয়া তিনি বসবাস করেন সিদ্ধেশ্বরীর নিকটে। মূলত ডাকিনি, যোগিনী, পিশাচ সিদ্ধি এবং অন্ধকারের দেব-দেবী লইয়া তাহার জ্ঞান ঈর্ষনীয়।
শনিবার ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ছয় ঘটিকায় একটিবার যদি আমার গৃহে আসো তাহা হইলে সেই তন্ত্রবেত্তা পণ্ডিতের সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হইতে পারে। তন্ত্র এবং মহাভারতের সময়কালীন নানা বিষয় নিয়ে তাহার সঙ্গে আলাপ করিতে তোমার ভালো লাগিবে আশা করি। এবং অবশ্যই আমাদিগের সাক্ষাৎ হইবে। অপেক্ষা করিব। আর হ্যাঁ! সাদেক, বাবলু, অমিয় ইত্যাদি ছেলেরা সকলেই মুক্তি বাহিনীতে নাম লিখাইয়াছে। উহাদের লইয়া আমি বিশেষ চিন্তিত! উহারা তো তোমারই সহপাঠী।
আজ এই অবধিই থাক।
ইতি
অলকেন্দু দাস
চিঠিটা বেশ কয়েকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ল উত্তমা। এই প্রেমিক নিয়ে সে কী করবে ভেবে পেল না। একটা চিঠি দিয়েছে এতদিনে, তাও ভালোবাসার কথা বাদ রেখে তন্ত্র-মন্ত্র, সিদ্ধি, মহাভারত, ঘটৎকচ এইসব হাবিজাবি লিখে গেছে। লোকটা সরল ভাষায় চিঠি লিখতে পারে না কেন কে জানে? মনে মনে ভাবল উত্তমা। ''আমাদিগের সাক্ষাৎ হবে'' এমন ভাবে লিখেছে যেন পাকিস্তান আর্মি কামান দাগলো। কপাল থেকে চুলের থোকাটা সরিয়ে উত্তমা ভাবতে লাগল বাবলু, সাদেক, অমিয়দের কথা। সত্যিই ওদের জীবন সংশয় আছে বটে। আর্মি খুবই তৎপর হয়ে উঠছে প্রতিনিয়ত। শেখ সাহেব আহ্বান জানিয়েছেন লড়াইয়ের। পাকিস্তানি আর্মির অত্যাচার থেকে মানুষকে রক্ষা করে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে ওরা। প্রতিদিন শোনা যাচ্ছে কোনো না কোনো খারাপ খবর।
বাবার হাতে এই চিঠি পড়লে উত্তমার খবর আছে। সে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে দিল। চিঠির টুকরোগুলো উড়তে উড়তে গিয়ে পড়ল পাশের কচুরিপানায়। আস্তে আস্তে উত্তমা নেমে এলো ছাদ থেকে। আজ মঙ্গলবার। ও হাতের করে গুণলো, আর ঠিক তিনদিন। উড়ো খবর শুনেছে ও ইন্ডিয়া যাওয়ার ব্যাপারে। কালই নাকি একটা লোক কথা বলতে আসবে। বাবার যদি লোকটাকে ঠিকঠাক মনে হয় শনিবারেই চলে যেতে হবে এখান থেকে। যে করেই হোক সে একবার যাবেই অলকেন্দু স্যারের বাড়ি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন