মনীষ মুখোপাধ্যায়

দুদিন আগে...

আজিজের দিকে একমনে তাকিয়ে ছিলেন শ্রীকান্ত সামন্ত। লোকটাকে দেখে অতি ধুরন্ধর মনে হচ্ছে। লোকটার চোখের দৃষ্টি বাঘের মতো। চোখের মণির চারপাশটা কেমন হলদেটে ধরনের। বাঘের চোখ যেমন সর্বদা শিকার খোঁজে, আজিজের চোখও তেমন যেন শিকার খুঁজে চলেছে। আজিজকে আজ এ বাড়িতে ডেকে এনেছে শ্রীকান্তের ছেলে শাম্ব। এই লোকটাই বুড়িগঙ্গায় নৌকোর ব্যবস্থা করবে। এই হল সেই এজেন্ট।

শ্রীকান্ত সামন্তের সামান্য অস্বস্তি হচ্ছে লোকটাকে দেখে। লোকটার চেহারায় যেন ভদ্রতার লেশমাত্র নেই। কেমন খুনি খুনি চেহারা! তেলচিটে একটা সস্তার জামা আর ময়লার প্রলেপ পড়ে যাওয়া একটা ছেঁড়া লুঙ্গি পরে থাকার কারণেই লোকটাকে আরও ভয়ংকর দেখাচ্ছে। বাঘের দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে শ্রীকান্ত সাহেবের দিকে। ওই চেয়ে থাকা দেখলে বুকের ভেতর কেমন শূন্য হয়ে আসে।

একখিলি পান মুখে দিয়ে শ্রীকান্ত সাহেব ভীতিটা কাটাতে চেষ্টা করলেন। তারপর গলা খাঁকরে আজিজকে জিগ্যেস করলেন, 'এই ভাই! তুমি ঠিক কইরা গাং পার করায়্যা দিতে পারবা তো?'

'হ সাহেব, ওইডাই তো বর্তমানে আমার কাম। পুলিশ আর গার্ড ফিটিং কইরা থুইছি। শুধু আপনারা আমার লগে গাং অবধি গিয়া নাওয়ে ওঠবেন। আর চিন্তা নাই। সহদেব মাঝি আপনাগো ঠিক নিয়া পৌঁছায়া দিবে।'

লোকটার কথা বলার ধরনে বিশাল আত্মবিশ্বাসের ঝলক রয়েছে। শ্রীকান্ত সাহেবের ভালো লাগল ব্যাপারটা। তিনি এবার একটু আশ্বস্ত হলেন। নাহ! লোকটাকে যতটা ভয়ংকর দেখতে, ততটা ভয়ংকর হয়তো না আসলে। শাম্বর বউ একটা প্লেটে করে কিছু মিষ্টি রেখে গেল টেবিলের ওপর। সেইটা দেখে লোকটার চোখটা চকচক করে উঠল। এবার কিছুটা মায়া হল শ্রীকান্ত সাহেবের। আহারে! লোকটা হয়তো ভালোভাবে খেতে পায় না।

'নাও ভাই মিষ্টিগুলান খায়া নাও।' আজিজের উদ্দেশে বললেন তিনি।

আজিজ নোংরা লুঙ্গিতে হাত মুছে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল মিষ্টির প্লেটটার ওপরে। যেন তার অনেক দিনের পেটের জ্বালা আজ একসাথে শান্ত হয়ে যাবে। একসঙ্গে অনেকগুলো মিষ্টি মুখে ফেলে সে চিবোচ্ছে। কেমন একটা বিশ্রী চপচপ করে শব্দ হচ্ছে এর ফলে।

'মিষ্টিগুলা কেমন গো?' প্রশ্ন করলেন শ্রীকান্ত সাহেব।

'খাইতে অপূর্ব লাগে সাহেব।' সে আবার খেতে লাগল মন দিয়ে। মুখ পরিষ্কার করার জন্য এক ঢোঁক জল খেয়ে সে সরু চোখে শ্রীকান্ত সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, 'সাহেব বাড়িডার কথা ছোট সাহেব কিছু কইছেন আফনারে?'

'হ কইছে। ওইডা তুমিই পাবা। তুমার নামে একখান দলিল লিখ্যা রাখছি। তবে কুনো কারণে আমি ফিরত আসলে আমি আবার এইহানেই বসবাস করব সেই কথাও লেখা আছে দলিলে। মানে তুমারে দিন কয়েকের জন্য এই বাড়িডা থাকনের জন্য দিতাছি।' শ্রীকান্ত সাহেব চুপ করলেন।

মিষ্টির প্লেটটা আস্তে আস্তে নামিয়ে রাখল আজিজ। তারপর হলুদ চোপ পড়া দাঁত বের করে হেসে উঠল। 'কী যে কন বাবু। একবার দিলি পরে আবার নিয়া নিবেন সে ক্যামন কথা! এত্তগুলো লোকেরে ফিটিং কইরা আফনাগো যাওনের ব্যবস্থা করছি। সেই পরিশ্রমের একটা পাওনা নাই!'

লোকটার চেহারায় কেমন যেন লোভী পশুর মতো একটা ভাব লক্ষ করলেন শ্রীকান্ত সাহেব। এই একটু আগে যখন মিষ্টি খাচ্ছিল ওর চেহারা ছিল অন্যরকম, আর এই এক মুহূর্তের মধ্যেই লোকটার কেমন ধূর্ত হয়ে উঠেছে। নাহ! এমন লোককে ঠিক বিশ্বাস করা যায় না। শ্রীকান্ত সামন্ত ব্যবসা করে খান। বক্সিবাজারের দোকানে আসে হাজার রকমের খদ্দের। তিনি তাদের মুখ দেখেই বুঝতে পারেন তাদের মনের কথা। তাছাড়া লোকটা একটু আগেই ওঁকে সাহেব সাহেব করে তেল দিয়ে কথা বলছিল, সেটাই হঠাৎ বাবু হয়ে গেছে। এখানকার বাঙালি হিন্দুদের অনেকেই বাবু সম্বোধন করে যদিও। তাঁর মনে হল একবার ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করে দেখেন, অন্য কোনও লোক পাওয়া যায় কিনা! কিন্তু সময় অনেক কম।

'তুমি গিয়া বাইরে খাড়াও, আমি আমার পোলার লগে পরামর্শ কইরা তোমারে ডাকতাছি।' আজিজের উদ্দেশে কথাটা বললেন শ্রীকান্ত সামন্ত।

উঠোনের পাশে একটা গাছ তলায় দাঁড়িয়ে শাম্ব সিগারেটে টান দিচ্ছিল। সে একটু চিন্তায় আছে। বাবার সঙ্গে আজিজের কথা পাকা হলে আসছে শনিবারেই ওদের ইন্ডিয়া চলে যেতে হবে। এতদিন কথা চলছিল, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেননি বাবা। সেও একটা ঠিকঠাক এজেন্ট পাচ্ছিল না। এই সপ্তাহে বাবা মোটামুটি ঠিকই করে ফেলেছিলেন এই শনিবার রাতেই তারা ইন্ডিয়া চলে যাবে। আজ পাকা কথা বলার জন্যই সে আজিজকে বাড়িতে এনেছে।

হঠাৎ বাবার গলা শুনতে পেল শাম্ব। বাবা তার নাম ধরেই ডাকছেন। সে সিগারেটটা ছুঁড়ে বাগানের এককোণে ফেলে দৌড়ে গেল বসার ঘরের দিকে। বসার ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই সে দেখতে পেল, আজিজ বেরিয়ে আসছে বাইরে। শাম্ব তাকে ইশারায় জিগ্যেস করতে চাইল, খবর কী! আজিজ কোনও উত্তর না দিয়েই বারান্দার এককোণে দাঁড়িয়ে রইলো। শাম্ব মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকে দেখল বাবার মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে।

'বাবা, আমাকে ডাকছিলেন?' ইউনিভার্সিটি পাশ দেয়া শাম্বর কথায় দেশীয় ভাষার টান অনেক কম। সে পরিষ্কার ভাষায়ই কথা বলে। যেমন বলে তার বোন উত্তমাও।

'এই লোক অতি বুদ্ধিমান। এ রে বিশ্বাস কইরা পরিবার, ট্যাহা, গহনা নিয়া যাওয়া কি উচিত হইব! তুমার কী মনে হয়?' প্রশ্ন করে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন শ্রীকান্ত সাহেব ছেলের দিকে।

'বাবা অনেক খোঁজাখুঁজি করে এই লোকটাকে বের করেছি। এই লোকটার যোগাযোগ মারাত্মক রকমের। পাহারাওয়ালাদের ম্যানেজ করে এই লোকটা সহজেই নৌকোয় তুলে দেয়। তবে বদলে চাহিদা একটু বেশিই। এই যেমন আমাদের বাড়িটা ও চাইছে। বরিশাল, বগুড়া, খুলনা, কুমিল্লা, সর্বত্র ওর চ্যানেল আছে বলে শুনেছি। এ পর্যন্ত অনেক লোককে ও পার করিয়েছে। আর তা ছাড়া এখন আর অন্য লোক খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল।' থামল শাম্ব।

এবার একটু যেন বেশিই চিন্তায় পড়ে গেলেন শ্রীকান্ত। এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়া যায় ততই তাঁদের পরিবারের জন্য মঙ্গল, এই বিষয়টা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছেন তিনি। কিন্তু এই বাঘের মতো দৃষ্টিওয়ালা লোভী লোকটাকে এক কথায় বিশ্বাস করে নিতে তাঁর একটু কষ্ট হচ্ছে। তিনি আর এক খিলি পান মুখে দিয়ে কপালের মধ্যভাগটা টিপে ধরে বললেন, 'উপায় যখন নাই, কী আর করন যায়! খুলনা দিয়া ওদেশে যাওয়ার আর একখান পথ আছে শুনছি। তুমি কি অন্য কাউরে ধইরা সেই পথের সন্ধান করতে পারো?'

শাম্ব আবার তার বাবার দিকে চাইলো। সে বাবাকে চেনে। বাবা অত্যন্ত জেদি ধরনের মানুষ। মানুষকে বিশ্বাস করার ব্যাপারেও তাঁর একটা খুঁতখুঁতে ভাব আছে। শাম্ব কী বলবে, প্রথমে কিছুই মাথায় এল না। তারপর একটু ভেবেচিন্তেই কথাটা বলল, 'বাবা এখানে সর্বত্রই খান সেপাইদের প্রহরা। আপনি যে রাস্তাই ধরুন, ওদের চোখ এড়িয়ে যাওয়াটাই হল সমস্যার। শুধু সন্দেহের বশে ওরা করতে পারে না এমন কাজ নেই।'

ছেলের যুক্তি অকাট্য। তিনি নিজেও কিছু কিছু ঘটনা শুনছেন। দেশের ভিটে মাটির প্রতি মায়া বাড়িয়ে আর লাভ নেই। যেদিন খুশি যা খুশি হতে পারে তাঁর পরিবারের সঙ্গে। তাঁর বাল্যবন্ধু হান্নান সাহেবের পরিবারের সঙ্গে দিন কতক আগেই ঘটে গেছে একটি দুর্ঘটনা। হান্নান সাহেবের শ্যালক ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অন্ধভক্ত। খান সেনারা তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে। তাঁকে দিয়ে বলপূর্বক বলানোর চেষ্টা করে— পাকিস্তান জিন্দাবাদ। তিনি বলতে রাজি না হলে, বুলেটে ঝাঁজরা করে রেখে চলে যায় ওরা পুরো পরিবারটাকে। শ্যালক থাকত জামাইবাবুর কাছেই। বেঘোরে প্রাণ দিলেন তাঁর বন্ধু হান্নান মিঞা।

তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ওরে কইয়া দাও, শনিবার রাইতে আমরা তৈরি থাকব।'

শাম্বকে কিছুটা আশ্বস্ত দেখালো এবার। সে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে দেখল তখনও বারান্দার এক প্রান্তে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে আজিজ। আজিজ কেমন করে যেন পড়ে ফেলল শাম্বর চোখের ভাষা। শাম্ব কিছু বলার আগেই সে বলে উঠল,

'শনিবার রাইতে পাহারাগাড়ি টহল দিয়া চইল্যা গেলেই আয়া পড়ব। চিন্তা কইরেন না। সহদেব লোক ভালা। ও ঠিক আপনাগো পার করাইয়া দিব।'

অন্ধকারের মধ্যে ধূর্ত জানোয়ারের মতোই কথাগুলো বলে মিলিয়ে গেল আজিজ। শাম্ব অনেক্ষণ সেইদিকে চেয়ে রইলো। অন্ধকারের বুকে চিরে শুধু ভেসে আসছে ব্যাঙের ডাক। বাড়ির আশ-পাশ দিয়ে কারা যেন খুব নিঃশব্দে চলাচল করছে। তাদের সস্তার স্যান্ডেলের শব্দ আসছে। চারিদিকে রহস্যজনক মানুষ জনের আনাগোনা। সত্যিই এ দেশটা আর থাকার যোগ্য নেই। আর্মির লোকেরা শিক্ষিত অশিক্ষিতের মাঝে কোনও বিভেদ করছে না। যাকে সন্ধেহ হচ্ছে তাকেই তুলে নিয়ে গিয়ে গুম করে দিচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সংকটজনক। এমত অবস্থায় ওদেশে চলে যাওয়া ছাড়া কোনও পথ দেখতে পাচ্ছে না শাম্ব। মুক্তিফৌজি ভাইদের ওপর ওর অগাধ আস্থা আছে। ও জানে একদিন স্বাধীন বাংলাদেশ হবেই। কিন্তু নিজে জড়াতে বড্ড ভয় পায় ওসবে শাম্ব। স্ত্রী করুণা আর সে কত স্বপ্ন দেখে একটা সন্তান নিয়ে। দেশের এই পরিস্থিতিতে একটা সন্তান নিয়ে আসার মানে হল তাকে একটা অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল শাম্ব। শনিবার রাতটা পার করতে পারলে একটু দুশ্চিন্তা দূর হবে। তারপর তো তারা কলকাতায় চলেই যাবে জ্যাঠার বাড়ি। এই মাঠ, এই খাল, বুড়িগঙ্গার পাড়, সবকিছুর জন্য তার মন কেমন করে ওঠে। সেই ছেলেবেলা থেকে এখানেই বেড়ে উঠেছে সে।

'কী কী সঙ্গে নেবো?'

করুণার কথায় ঘোর ভাঙে শাম্বর। সে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। করুণার বাপেরবাড়ি দৌলতপুরের দিকে। ওদের বাড়ির ওখানে সমস্যা কিছুটা কম। বড় শহরগুলোতেই যত ঝামেলা। করুণা বোধহয় শ্বশুরমশাইয়ের মুখে শুনেছে, শনিবারই তাদের যেতে হবে। তাই শাম্বকে জিগ্যেস করতে এসেছে এই কথা।

'তোমার যা যা নিতে ইচ্ছে হয় তাই নিও।' ছোট্ট উত্তর দিল শাম্ব।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%