মনীষ মুখোপাধ্যায়
বুড়োর দিকে শান্ত চোখে তাকালেন ফাদার। এই চাহনি বড় পবিত্র, একেবারে অন্যরকম। একজন বাবা তার ছেলের দিকে তাকাতে পারে কেবল সেই দৃষ্টিতে।
'গাড়িতে আসতে আসতে আমার ছাত্র বিজয় বলল আপনি কারও কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আপনি ওই মেয়েটার কাহিনি কাউকে বলতে চান না। দেখুন, আজ যদি ওর সব কথা আমাদের না বলেন তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে প্রকৃতি। দারুণ একটা শয়তান রাজত্ব করবে তখন এই সুন্দর পৃথিবীটাতে। সেটাই কি আপনি চান?' কথাটা বলে জিজ্ঞাসু চোখে ফাদার তাকিয়েই রইলেন লোকটার দিকে।
একটু আগেই একটা খারাপ খবর এসেছে থানায়। হাসপাতালে মারা গেছে কনস্টেবল নারায়ণ দাস। অলোক পাহাড়ি আর ইনচার্জ সাহেব আজ একটু রেগেই গেছেন এই বৃদ্ধ মানুষটার ওপর। তাই শেষবারের জন্য ওঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা চালাচ্ছেন ফাদার ফ্রেডেরার।
'সেই বুড়োকে আমরা গাঁয়ের শেষপ্রান্তে একটা ঘর বাঁধতে দিয়েছিলাম। লোকটা ওই বাচ্চাটাকে নিয়ে সেখানেই থাকতে শুরু করেছিল। আমরা কেউ যেতাম না ওদিকটায়। ডাইনিচক্রের রাতে এসে পড়া বাচ্চাটাকে নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা অজানা ভয় কাজ করত বটে।' কথা বলতে শুরু করলেন বৃদ্ধ।
ফাদার ফ্রেডেরারকে উৎসাহী দেখাল এবার। তিনি চেয়ারটা এগিয়ে নিয়ে এসে বসলেন বৃদ্ধের সামনে। বৃদ্ধ বসে আছেন মাটিতে দু'পা ভাঁজ করে।
'গাঁয়ের শেষপ্রান্তে হঠাৎ করেই দেখা যেতে লাগল এক বুড়িকে। রাতের আন্ধারে সেই বুড়ি ঘুরে বেড়াইত। মুখের কাছে ছিল শুধু দলা দলা চামড়া। চোখ, নাক কিছুই দেখা যেত না। আমাদের গাঁয়ের একটা ছেলে রাতের অন্ধকারে দেখে ফেলেছিল ওই বুড়িকে। খুব ভয় পেয়েছিল সে। সবাইকে বলেছিল কথাটা। বুড়িটা নাকি নিজেদের বাচ্চা ফেরত চাইছিল! কিন্তু এরপর আর খুব বেশি বাঁচেনি ছেলেটা। এরপরই আমরা সবাই মিলে একদিন চড়াও হই ওই বুড়োর কুটিরে। গাঁয়ের এককোণে পড়ে থাকা বুড়োটাকে দেখে বড্ড মায়া হল আমাদের। ওইটুকু ফুটফুটে বাচ্চাটাকে বুকে আগলে নিল আমার বউটা। বুড়ো লোকটাই আমাদের বলেছিল, রাস্তাঘাটে যদি ওই ডাইনির দেখা পাই কখনও যেন ওর মাংস ঝুলে পড়া মুখের দিকে না তাকাই। বুড়ো তার বাড়ির কথা বইলত আমাদের। ওর ছেলে-মেয়েকে সেনারা মেরি ফেলেছে। ওই ডাইনির মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ হয়ে গেছে ওর খুব কাছের একজন মানুষ। ও জীবন বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছে এই মেয়েটাকে নিয়ে।'
'মেয়েটা বড়ো হতে লাগল আমাদের মাঝেই। যতই বড়ো হয় ওর মইধ্যে দেখা দিতে থাকে পাগলিপনা। রান্নাকরা মাংস ছেড়ে সে খেত কাঁচা মাংস। আমার বউটা বারবার বাঁধা দিত ওকে। ও শুধু মা-মা বলে ডাকত আর হাসত। আমি সেবার একটা কাজে টাউনে গেছিলাম। বাড়ি ফিরে দেখলাম আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার বউটা মরে গেছে জলে ডুবে। ওই মেয়েটার উপর আরও মায়া বেড়ে গেল আমার। রাতে ওই বেটি নানান আজেবাজে কথা বলত। রাতে ওকে দেখে ভয়ই পেত সবাই। ওর পাগলামি আরও বেড়ে উঠল আমার বউ মরার পর। গাঁয়ের বৈদ্য দেখে বলল বায়ুরোগ। বুড়ো কিছুতেই মানতে রাজি ছিল না সে কথা। বুড়ো ওকে ফিরিয়ে নিল নিজের ঘরে। ও আর আমার কাছে থাইকত না। সকাল সন্ধে ওই কুটিরের পাশ থেকে যাতায়াতের সময় দেখতাম ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে রেখেছে ওরা। বুড়োর সঙ্গে দেখা হলে সে এড়াইং যেত। ওরা কী খেত কী করত ওরাই জানত। তারপর এই মাস ছয়েক আগে দেখলাম মেয়েটা ঘরের দাওয়ায় বসে খুব কাঁইনছে। ওকে জিগ্যেস করলাম, কী হয়েছে ওর? ও উত্তর দিল ওর বাবা ওকে রেখে কোথাও চলে গেছে। আমি অবাক হলাম কথাটা শুনে। বুড়োর এখন বেশ বয়েস হয়েছে তা প্রায় চার কুড়ির বেশি। এত বয়সে একলা একলা গেল কোথায়! মেয়েটা শুধু বলল ওর বাবা গেছে একটা বড়ো শহরে। আমার এক মামার ছেলে থাকত এই কলকেতা শহরে। পাছে বুড়োকে খুঁজে পাই তাই ওই মেয়েকে নিয়ে চলে আসি। ও যে রক্তখাকি তা কি জানতাম? বুড়ো আমায় বলেছিল ওর বাংলাদেশের বাড়ির কথা, বলেছিল সেসব আমি যেন কাউকে না বলি। সেইই আমাকে বলেছিল তার মেয়ের একটা অদ্ভুত রোগ আছে! ওর মুখে রক্ত লাগলে আর রক্ষা নেই। একটা লোককে শেষ করা বাকি আছে, যে লোকটা বুড়োর ওপর অত্যাচার করেছিল তাকে মারবে ওর বেটি। শিকার কইরবে। বুড়ো এসবই আমাকে বলতে বারণ করেছিল।'
ফাদার দেখলেন লোকটা কথা বলার সময় বাংলার মাঝে মাঝে স্থানীয় ভাষায়ও কয়েকটা শব্দ বলছেন। 'মেয়েটার মধ্যে কাঁচা মাংস খাওয়া বা পাগল পাগল ভাব ছাড়া কোনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেছেন কখনো? মানে ধরুন যা অন্যান্য মানুষদের নেই এমন কোনও ক্ষমতা দেখেছেন ওর মধ্যে?' ফাদার ফ্রেডেরার প্রশ্ন করলেন।
'হ্যাঁ। খেয়াল করেছি। আমার বউ যখন গান করে ওকে ঘুম পারাইতে চেষ্টা করত ও মন দিয়ে সেই গান শুনত। গান শুনলে ওর সব পাগলামি শান্ত হয়ে যেত। আর...আর...একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ওর মধ্যে। ওর ঘ্রাণশক্তি কুকুরের মতো প্রবল। এখানে এসে ও বাবা বাবা করে ছটফট করেছে। আমাকে আলিপুরের একটা বাড়িতে নিয়ে গেছিল। কিন্তু সেই বাড়ির লোক আমাদের বলেছিল অত বৃদ্ধ কেউ ওখানে থাকেন না। ও অনেক ছোট অবস্থায় কারও গন্ধ পেয়েছিল তাকেই মারতে ও কাল পালিয়েছে রাত্রে। ওকে আটকান সাহেব। ওর প্রতি যে বড্ড মায়া পড়েগেছে আমার... পেটে না ধরলেও তো ও আমার বউয়ের মেয়ের মতই ছিল।' নিজের মাথাটা দুহাত দিয়ে চেপে ধরে বসে পড়লেন বৃদ্ধ মানুষটা।
ফাদার আর দেরি করলেন না। বেরিয়ে এলেন বৃদ্ধ মানুষটার ঘর থেকে। বিজয়ের কাঁধে হাত রাখলেন তিনি। ওঁকে ভীষণ বিমর্ষ দেখাচ্ছে। বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলে তিনি এমন কোনও সূত্রই পেলেন না যা থেকে মেয়েটা কোথায় আছে জানা যায়। মন বলছে মেয়েটা আলিপুরে এই বৃদ্ধকে নিয়ে যে বাড়িটাতে গেছিল সেখানে গেলে কিছু পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ওঁকেও যদি তারা বের করে দেয়! এখন একটাই রাস্তা খোলা আছে। সাইকিক ফোর্সের প্রয়োগ। স্পিরিচুয়াল বিদ্যার অতী প্রাচীন একটা পদ্ধতি এই সাইকিক ফোর্স।
ফাদার ফ্রেডেরার বিজয়ের উদ্দেশে বললেন, 'বিজয়! আমার ধারণা তোমার মন খুব পরিষ্কার। আমরা একটা শেষ চেষ্টা করে দেখব, যাতে রক্তের এই খেলাটা আটকানো যায়। আমরা সাইকিক ফোর্সের দ্বারা বোঝার চেষ্টা করব মেয়েটার গতিবিধি।'
মাথা নাড়ল বিজয় ও রাজি আছে এই বিষয়ে। ও জানে এরজন্য মেয়েটার কোনও একটা জিনিস ওদের লাগবে। মোজেসের বাড়ি ফিরে এল ওরা।
একটা তেপায়া টেবিলের তিনদিকে তিনটে মোমবাতি রাখা হল। মোম তিনটে নিজেদের মধ্যে সমান দূরত্ব আর একই কোণে অবস্থান করছে। রাত সাড়ে আটটা বেজে গেছে। সময় যেন দ্রুত এগিয়ে চলেছে। বাইরের কলকাতায় একটু একটু করে নেমে আসছে শীত। আর ঘরের পরিবেশে নেমে এসেছে অদ্ভুত একটা ঠান্ডাভাব। চিকচিক শব্দে সেকেন্ডের কাঁটা এগিয়ে চলেছে। ফাদার আর বিজয় একে অপরের বিপরীতে বসেছে দুটো চেয়ারে। ঘরের দরজা বন্ধ করে বাইরে অপেক্ষা করছে মোজেস আর বেটি। মোমবাতি তিনটের মাঝে যে ত্রিভুজ রচিত হয়েছে সেখানে রাখা হয়েছে তৃষ্ণার ছবিটা। ওঁরা দুজনেই চোখ বুঝে স্পর্শ করে রয়েছেন ছবিটাকে। ধ্যান, ধ্যান আরও ধ্যান... মন একেবারে শূন্যের পর্যায় গেলে ধরা পড়বেই সেই মেয়েটার অস্থিত্ব। একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে মোমবাতিগুলো। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, পনেরো মিনিট, কুড়ি মিনিট। এ যেন এক পরীক্ষা। মানুষকে বাঁচাতে হলে এ পরীক্ষায় পাশ করতেই হবে। সাইকিক ফোর্সের আসরে অনেক সময় এমন হয়, যারা ধ্যানে বসেছেন তারা হঠাৎ কিছু বলে ওঠেন কিন্তু পরে মনে থাকে না। তাই মোজেস বাইরে থেকে কান পেতে সজাগ হয়ে রয়েছে।
হঠাৎ ফাদারের গমগমে গলার শব্দ শোনা গেল, 'একটা অন্ধকার জায়গা...সেখানে অনেকগুলো ট্রলার রাখা রয়েছে। মেয়েটা একটা উঁচু ট্রলারের ওপর চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে অপেক্ষা করছে তার শিকারের জন্য। মেয়েটার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধা। ওর হাতে ওটা কী! ওর হাতে ওটা...' চোখ খুলে গেল ফাদারের। ফাদারের কণ্ঠস্বরে বিজয়েরও ঘোর ভেঙে গেছিল। দরজা ঠেলে ঢুকল মোজেস।
'কী বললাম আমি?' ফাদার চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন।
'অনেকগুলো ট্রলারের কথা বললেন। মেয়েটা নাকি সেই ট্রলারের ওপর বসে আছে শিকারের অপেক্ষায়!' বিজয়কে উদ্বিগ্ন দেখাল। সারা শহরে এমন প্রচুর ট্রান্সপোর্ট আছে যেখানে অনেক ট্রলার রয়েছে। এইভাবে খুঁজতে গেলে তো সারারাত লেগে যাবে। ওদিকে মেয়েটা তার শিকারকে শেষ করে ফেলবে অনায়াসেই।
'অনেকগুলো ট্রলার!' ভাবিত দেখাল মোজেসকেও।
লাফিয়ে উঠল বেটি। 'একসঙ্গে অনেক ট্রলার আমি দেখেছি।'
তিনজনেই একসঙ্গে তাকাল ওর দিকে। ওদের চোখের দৃষ্টি একইরকম। ফাদার প্রশ্ন করলেন, 'কোথায় দেখেছ তুমি একসঙ্গে অনেক ট্রলার?'
'খিদিরপুর ডকে। ওটা তো একটা বন্দর। ওই বন্দরে অনেকগুলো ট্রলার একসঙ্গে থাকে আমি দেখেছি। ওখানে আমার আঙ্কেল থাকেন আমি জানি।' আনন্দে বেটিকে জড়িয়ে ধরল মোজেস। অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে। ওরা দ্রুত বেরিয়ে পড়ল হাত ঘড়িতে সাড়ে নটা বাজতে যায় প্রায়। জোরে গাড়ি চালালে হয়তো সময়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে। কে জানে এতক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে কি না!
গাড়ি স্টার্ট দেয়ার আগে ফাদার বলে উঠলেন, 'ভালো গানের গলা এমন কাউকে চেনো তোমরা? কারণ মুন্ডা বৃদ্ধটার কথা ঠিক হলে একমাত্র সুরই পারে ওকে আটকে রাখতে।'
'তারমানে হাজরা হয়ে যেতে হবে। ওখান থেকে দোয়েলকে সঙ্গে নিলে কাজ হবে।' বলল বিজয়। কথাটা শুনে এই চাপের মুহূর্তেও এক ঝলক হাসল মোজেস।
বিজয়কে দেখে চমকে গেল দোয়েল। 'একী এত রাতে আপনি!'
'হাতে সময় খুব কম। দ্রুত রেডি হয়ে চলে আসুন। ডাইনিকে আটকাতে হবে গান গেয়ে।' কথাটা এক নিশ্বাসে বলল বিজয়।
দোয়েল দরজা থেকে উঁকি দিয়ে দেখল একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়। আর কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল ও। কিন্তু বিজয় আঙুল দিয়ে ওর ঠোঁট ছুঁয়ে বলল, 'প্লিজ দেরি করবেন না তাড়াতাড়ি আসুন। আমরা খুবই সমস্যায় আছি।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন