১৬

মনীষ মুখোপাধ্যায়

মেয়েটাকে দেখে চমকে উঠল বিজয়। সত্যিই তো মোজেস ভুল কিছু বলেনি! একে যে একেবারেই আদিবাসীদের মতো দেখতে নয়। তাহলে কি বস্তির লোকেরাই মিথ্যে মিথ্যে বানিয়ে বলছে কথাগুলো! এরা কি আসলেই কোনও আদিবাসীদের গ্রাম থেকে কলকাতায় আসেনি! মেয়েটার সঙ্গে যাতে বিজয় কথা বলতে পারে তাই ওকে এখানে এনেছে মোজেস। কিন্তু বিজয় ভাবতে লাগল কোন ভাষায় মেয়েটার সঙ্গে কথা বলা উচিত? যদিও কাল মোজেস বলেছিল মেয়েটা নাকি ওর সঙ্গে ফাদারের মতো বাংলায়ই সেই কথাটা বলেছিল। বিজয় নিজেও ওর এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে এত সুন্দরী কোনও মেয়ে দেখেনি।

এদের সঙ্গে ভালোবেসে কথা বললে এরা সাড়া দেয়, কাজ করতে করতে এই অভিজ্ঞতাটা অন্তত সঞ্চয় করেছে বিজয়। ঠিক যেমন ফাদার ফ্রেডেরার ওদের ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। ওদের মতো হেমব্রম, মাহাতো, মুন্ডা, ওরাওদের মুখে কথা ফুঁটিয়েছিলেন। সমাজের উঁচু স্তরে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রাণপাত করেছিলেন। বিজয় নিজেও তো সেই চেষ্টাই করছে, সরকারিভাবে কাজটা করতে আরও সুবিধা হচ্ছে ওর। সময় না নিয়ে এবার বিজয় মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল।

'তুমি ছেলেটাকে মারতে গেছিলে কেন?' সরাসরিই প্রশ্নটা করল ও।

হাত নাড়ল মেয়েটা। মাটির সঙ্গে ঘষা লেগে শেকলের ধাতব শব্দ হল। আজ সকালে একবার এদের কোর্টে তোলার কথা হয়েছিল। শনিবার হাফবেলা বলে কাজ কিছুই হয়নি। এ দেশের গরিব মানুষদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। এই ঘটনাটাই যদি কোনও বড়লোকের ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে ঘটত, এতক্ষণে একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যেত। কিন্তু এক্ষেত্রে দোষীও গরিব আর যার উপর আক্রমণ হয়েছে সেও গরিব। তাই কারোর বিশেষ হেলদোল দেখা যাচ্ছে না।

মেয়েটা বিজয়ের কথার কোনও উত্তর দিল না। সেলের দেয়ালের টঙের ওপর জাল লাগানো ভেন্টিলেটরের আলোর দিকে চেয়ে রইল। ওই আলোয় দেখা যাচ্ছে ওর ধবধবে ফর্সা মুখটার একপাশ। খোলা চুলে ঢেকে রয়েছে গালের একটা দিক। সেই চুল ঢালে ঢালে নেমে এসেছে কোমর অবধি।

'তোমার নিশ্চয়ই এখানে থাকতে ভালো লাগছে না, আমি তোমাকে এই বাজে ঘরটা থেকে বের করে নিয়ে যাব। বলো আমাকে, তুমি ওই ছেলেটাকে মারতে গেছিলে কেন?' একটু বিরতি নিয়ে আবার প্রশ্ন করল বিজয়।

'আমার মুখে ওর রক্ত লেগেছিল। বাবা বলেছিল ওই বাজে লোকটার রক্ত ছাড়া আর কারোর রক্ত তুই খাবি না।' অনেক দূর থেকে ভেসে এল কথাগুলো। কী সুন্দর মিষ্টি গলার স্বর মেয়েটার। কথা বলেছে। মেয়েটা অবশেষে কথা বলেছে।

'কোন বাবা? যে এখানে বন্ধ আছে?' এবার একটু উত্তেজিত হচ্ছে যেন বিজয় ভেতরে ভেতরে। মোজেস দেখছে সবকিছুই বাইরে থেকে।

মেয়েটা সরাসরি তাকাল বিজয়ের দিকে। একটা ধাক্কা মতো খেল বিজয়। ওহ! কী ভয়ংকর দৃষ্টি! একবার তাকিয়েই যেন মানুষকে অবশ করে দিতে পারে। এক পা এক পা করে এগিয়ে এল মেয়েটা। বিজয় যেন নড়তে পারছে না। মোজেস বাইরে থেকে প্রস্তুত হল, এদিক ওদিক কিছু হলেই ও সেল খুলে ঝাঁপ দেবে মেয়েটার ওপর। দাঁতে দাঁত পিষল ও। এই কেসটার দ্রুত মীমাংসা হওয়া উচিত। এইসব ক্যানিবসদের মানুষের সংস্পর্শে রাখা খুবই ঝুঁকির ব্যাপার। কাঁচা মাংস খাওয়া একটা মেয়ে যে কি না মানুষের মাংসের লোভে তাকে আক্রমণ করতে গেছিল তাকে সাধারণ সেলে রেখে দেওয়াই উচিত হয়নি। দেশে তো আর পাগলাগারদের অভাব নেই।

মেয়েটা এগিয়ে এসে গালটা হাত দিয়ে ছুঁল বিজয়ের। তারপর চোখ বুঝে ফেলল। ফিসফিস করে বলে উঠল, 'তুমি ভালো লোক... তুমি ভালো লোক... কিন্তু শয়তান পৃথিবীতে রাজত্ব করবেই... কেউ বাঁচবে না।'

কয়েক পা সরে এল বিজয়। মেয়েটার হাতের স্পর্শে ওর গালটা কেমন জ্বালা জ্বালা করছে। মেয়েটার হাতের চামড়া কেমন খসখসে। কেমন যেন ধারালো মতো। কোমলভাব একেবারেই নেই।

বিজয় যে ভেতরে ভেতরে একটু ভয় পেয়েছে এটা ও প্রকাশ করল না মেয়েটার সামনে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য কথা বলল। আর যাই হোক মেয়েটা স্বাভাবিক নয়। ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ হয়।

'তোমার নাম কী?'

'আমার... আমার নাম... তৃষ্ণা।' উত্তর দিল মেয়েটা। হাসল তৃষ্ণা বিজয়ের দিকে তাকিয়ে। মেয়েদের হাসি বড়ো সুন্দর হয়। কিন্তু এই মেয়েটার হাসি যেন মানুষের মৃত্যু হলে তাঁর ঠোঁটে যে প্রশান্তিটুকু লেগে থাকে অনেকটা সেইরকম।

'তা তৃষ্ণা কী যেন বলছিলে, তোমার বাবা কার রক্ত তোমাকে খেতে বলেছে?' চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল বিজয় ওর দিকে।

'হ্যাঁ একটা খারাপ লোক। এখানেই কোথাও থাকে। ওর গন্ধটা অনেক ছোটবেলায় পেয়েছিলাম আমি। অনেক অনেক আগে...আমার কিছু মনে নেই...কিন্তু গন্ধটা এখনও নাকে লেগে আছে আমার। ওকে খুঁজে বের করতেই তো আমি এখানে এসেছি।'

কথাটা শুনে বুকটা ধক করে উঠল বিজয়ের। সেকী কথা! মানুষের গন্ধ পেয়েছে ছোটবেলায়, তাকে খুঁজতে এসেছে, রক্ত খাবে...! মাথাটা পুরো গুলিয়ে গেল ওর। নাহ! এই মেয়েটা বদ্ধ উন্মাদ মনে হচ্ছে। এর থেকে কিছুই জানার আশা নেই, মনে মনে ভাবল বিজয়। ও বরং চেষ্টা করবে মেয়েটা যাতে সঠিক বিচার পায়। ঠিকঠাক ভাবে ওর চিকিৎসা হয়।

সেলের দরজা খুলে বেরিয়ে এল বিজয়। বাইরে থেকে সবটাই দেখেছে মোজেস। বিজয় ঘড়িতে দেখল তিনটে চল্লিশ বাজে। হাতে এখনও সময় আছে। পৌনে পাঁচটায় কলামন্দির পৌঁছতে পারলেই হল। মোজেস ছেড়ে দিলে বেগ পেতে হবে না রাস্তার জ্যাম-জটে।

ও মোজেসের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এটা মানসিক ব্যাপার বুঝলি! ট্রাইবালদের মধ্যে অনেক ধরনের ফ্যান্টাসি আছে। এর বাবাও বোধহয় সেইসব ফ্যান্টাসির সঙ্গেই একে বড়ো করছে। চল দেখি এর বাবার কথা শুনলে কিছুটা বুঝতে পারব।'

একটা ছোট্ট মতো ঘরে মাথা নিচু করে বসেছিলেন একজন বুড়ো মতো মানুষ। তাঁর সামনে নিয়ে গিয়ে বিজয়কে দাঁড় করালো একজন সেপাই গোছের লোক। মোজেস এইঘর অবধি আসেনি। মানুষটার চেহারার সঙ্গে মুন্ডাদের চেহারার মিল আছে, দেখে মনে হল বিজয়ের। ও সরাসরি মুন্ডারি ভাষায় জিজ্ঞেস করল—

'কাকা কেমন আছেন? এখানে কেউ খারাপ ব্যবহার করেনি তো?'

বৃদ্ধ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে। হাসার চেষ্টা করল। মুন্ডারি ভাষায় কলকাতায় ওঁর সঙ্গে কেউই কথা বলে না। বিজয়ের মুখের সারল্য ওঁর ভালো লাগল। তিনি উত্তর দিলেন—

'হ্যাঁ ভালো আছি বটে বাপধন।'

'তুমি তোমার মেয়েকে রক্ত খেতে বলছ কেন?' আবার প্রশ্ন করল বিজয়।

চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল বুড়ো মানুষটার। মাথা নাড়তে নাগল সে দুদিকে। মাথার সামনের চুল ঝোরে গেলেও পেছনের চুলগুলো বেশ ঘন আছে লোকটার। তিনি মুঠো করে চেপে ধরলেন নিজের চুলের গোছা।

'ও আমার মেয়ে লয়রে বাপধন!' বলে উঠলেন তিনি।

'মানে!' চমকে উঠল বিজয়। 'বস্তির লোকেরা যে বলে তুমি আর তোমার মেয়ে ওখানে থাকো।'

'উ ছোটানাগাপুরা ডাইনি আছে বটে। সে অনেক ঘটনা বুঝলি ব্যাটা।'

লোকটার ভাষায় মুন্ডারি টান থাকলেও বাংলা বলতে পারেন ভালোই। চোখদুটো সরু হয়ে গেল বিজয়ের। 'ডাইনি আছে মানে?' আবার প্রশ্ন করল ও।

'আমাদের এক পরবে আমি, পাহান আর হেল্লা মিলে ডাইনিচক্র বসিয়েছিলাম। সে অনেকদিন আগের কথা। বিশ বচ্ছর আগের কথা তো হবেই। সেই চক্র আমাদের কাছে একটা খেলার মতো ছিল। আমাদের বয়সও তখন কম। গাঁয়ের সাতটা আইবুড়ো মেয়েছেলে জোগাড় করে শুরু করেছিলাম চক্র। আকাশ থেকে ডাইনি ডেকে আনব এই ছিল সেই খেলার ধরন। লেশাও করেছিলাম অনেক। সে খেলা যে সত্যিই হয়ে যাবে কে জানত। যে রাতে আমরা ডাইনি চক্র বসাই সে রাতেই গাঁয়ে একটা ছোট্ট দুধের বাচ্চাকে লিয়ে একটা লোক আসে। বুড়োলোক। সেই বুড়ো এসে আমাদের কাছে সাহায্য চায়। লোকটার পেছনে সেপাই লেগেছে। আমরা যেন ওকে গ্রামে আস্তানা দিই। আমরা ছোটানাগাপুরার লোক হলেও পেটের টানে আমরা চলে এসেছিলাম দক্ষিণে। বাস গেঁড়েছিলাম পরগনায়। সোঁদরবনের মধু এনে আমরা বেচতাম বাজারে। ওই লোকটা এসেছিল নদী দিয়ে। আমরা লোকটাকে থাকতে দিয়ে দিলাম আমাদের সঙ্গে।' কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেলেন বুড়ো মানুষটা।

'তারপর কী হল?' উত্তেজনা চেপে রাখতে না পেরে আবার জিজ্ঞেস করল বিজয়।

'ও লোক আমাকে দিয়ে কিরা কাটিয়েছিল ওর কথা কাউকে বলতে মানা করেছিল। ডাইনি তার শিকার ধরতে এসেছে। ডাইনি তার শিকার ধরতে এসেছে...' থেমে গেলেন বৃদ্ধ। আর কিচ্ছু বললেন না।

হাজার চেষ্টা করেও ওঁর মুখ থেকে একটা কথাও বার করতে পারল এরপর বিজয়। মাথা নিচু করে ও বেরিয়ে এল ঘরটা থেকে। তারপর মোজেসে দিকে তাকিয়ে ও বলল, 'কেসটা গোলমেলে বুঝলি। দেখ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়েটাকে কোনও মানসিক হাসপাতালে পাঠানো যায় কি না!'

মোজেস ওর কথা রাখল। বিজয়কে নামিয়ে দিল কলামন্দিরের সামনে। পুষ্পদা বিজয়কে দেখতে পেয়ে দৌড়ে এলেন। 'আরে ব্রাদার মেয়ে দেখতে এসে এত দেরি করলে চলে! ওদিকে যে প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেল।' ওরা হলে ঢুকে আসনে বসল। শুরু হল অনুষ্ঠান।

সত্যিই মেয়েটাকে দেখে ভালো লেগে গেল বিজয়ের। গলার স্বর যেন কোকিলের থেকেও মিষ্টি। গতকাল বাড়ি ফিরে আর ছবিটা দেখে ওঠার সুযোগ হয়নি। মেয়ের মাসিরও চাক্ষুষ দেখার পর বেশ পছন্দ হল বিজয়কে। সব ঠিকঠাক থাকলে এই শীতেই বিয়ের কাজ শেষ হয়ে যাবে, সেই কথাই হয়ে রইল। গায়ের রংটা একটু চাপা হলেও টানাটানা চোখ আর পুরু ঠোঁটে অসাধারণ দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। নামটাও ভারি মিষ্টি মেয়েটার দোয়েল। যদিও নামটা আগেই জানত বিজয়। চাপা স্বভাবের মেয়েদের ওর ভীষণ ভালো লাগে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%