মনীষ মুখোপাধ্যায়
অলকেন্দু শোকে পাথর হয়ে গেল উত্তমার করুণ পরিণতির কথা শুনে। সে শনিবার সন্ধের দিকে বাড়ি ফিরেছিল। চিঠি পাওয়ার পর একবার ভেবেছিল দৌড়ে উত্তমাদের বাড়ি চলে যায়। কিন্তু সে যাত্রায় আর যাওয়া হয়নি। ধানমুন্ডি থেকে ফিরে রেহান সাহেবের ধূম জ্বর এসেছিল। তাকেই ছুটতে হয়েছিল ডাক্তারের খোঁজে। ডাক্তার এসে ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন। সেই ওষুধ আনতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল অলকেন্দুর। তারপর যখন সে উত্তমাদের বাড়ি গিয়েছিল, তখন সেখানে কেউ ছিল না। সেদিন সেই তন্ত্রবেত্তা মানুষটি আর আসেননি অলকেন্দুর কাছে। যাঁর সঙ্গে দেখা করাবার কথা অলকেন্দু উত্তমাকে চিঠিতে জানিয়ে ছিল।
শ্রীকান্ত সামন্ত এখন অনেকটা ভালো আছেন। সে রাতে সহদেব একটা সাইকেল ভ্যান জোগাড় করে, একটা চাদরে শ্রীকান্তকে ভালোভাবে জড়িয়ে পৌঁছে দিয়েছিল ডাক্তার সূর্যকান্ত-র বাড়ি। বদমাইশগুলো তাঁর কোমরে লুকানো টাকা আর বাড়ির কাগজ হাতিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল। রাধামাধবের মূর্তি তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন, তিনি যেখানে আহত অবস্থায় পড়েছিলেন তার চেয়ে কিছুটা দূরে। তবে গোবিন্দের গলায় সেই নীল হিরের লকেটটা ছিল না। ওটাও ওরা লুঠ করে নিয়ে গিয়েছিল।
তিনি অলকেন্দুর বাড়ি খুঁজে বের করেছেন আজ। বাংলাদেশে তাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। দিনের বেশিরভাগ সময়ে তিনি চাদর মুড়ি দিয়ে রাস্তার ভিখারিদের মাঝে বসে থাকেন। ওদের পাশে বসে সামান্য কিছু ভিক্ষা পান। তাই দিয়েই দিন গুজরান করেন। শরীর এতদিন ভালো ছিল না তাঁর। সূর্যকান্ত ডাক্তার তাঁকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন। তিনি রাজি হননি। শুধু শুধু একটা ভালো মানুষকে তিনি বিপদে ফেলতে চাননি। আজ শরীরটা একটু ভালো হতেই তিনি অলকেন্দুর বাড়ি এসেছেন। তিনি এসেছেন প্রতিশোধের বাসনা নিয়ে।
'আমার মাইয়ায় বলছিল আপনি একটা বিহিত করতে পারবেন। তাই আপনার লগে দেখা করতে আইছি।' মেয়ের ভয়ংকর মৃত্যু সংবাদ দেওয়ার পর অনেক্ষণ অলকেন্দুকে নিরীক্ষণ করছিলেন শ্রীকান্ত সামন্ত। এবার তিনি কথা বললেন। তাঁর মেয়ে তাঁকে বলেছিল তার মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে। তারা দুজনে মিলে ওদের মৃত্যুর বিহিত করতে পারবে, সেই আশায়ই এখানে আসা।
দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসেছিল অলকেন্দু। তার বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সারা শরীর জ্বালাপোড়া করছে। শোকে পাথর হয়ে গেছে সে। আহ! কত কষ্ট পেয়েছে উত্তমা মৃত্যুর আগে। শ্রীকান্ত সামন্তের শেষ কথাগুলো খুব আস্তে তার কানে গিয়ে পৌঁছাল।
সে চকিতে ঘুরে তাকালো ওঁর দিকে। হ্যাঁ একটা রাস্তা আছে। যে রাস্তায় মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা বা অন্য কেউই কোনোভাবে বিপর্যস্ত হবে না। খুব ভয়ংকর একটা জিনিসকে পাঠিয়ে অনায়াসেই শেষ করে ফেলা যাবে অনেকগুলো মানুষকে। যে জিনিসটার কথা ও ওই কালীপ্রসাদের থেকে শুনেছে। কালীপ্রসাদ কালী। কী অদ্ভুত নাম ভদ্রলোকের। তন্ত্রশাস্ত্রের একজন পণ্ডিত মানুষ। পুরাণ নিয়েও ভদ্রলোকের পড়াশোনা অসাধারণ। তিনি যেন কোনও একটা বাচ্চার কথা বলছিলেন, যার বেশ কিছু অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। আচ্ছা তাকে দিয়ে কিছু করা যায় না! সে শুনেছে তন্ত্র বিদ্যায় এমন অনেক কিছু ক্রিয়া আছে, যার প্রয়োগে শেষ করে ফেলা যায় শত্রুকে।
অলকেন্দু ভারি গলায় বলল, 'কাকাবাবু আপনি সংকোচ না করেই আমার বাড়িতে থাকুন। আমি শীঘ্রই একটা রাস্তা বার করে ফেলব। ওদের শেষ না দেখে আমি ছাড়ছি না।'
শ্রীকান্ত থাকার ব্যাপারে আপত্তি করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পরের কথাটা শুনে চুপ করে গেলেন। তিনিও তো ওদের শেষ দেখতেই চান।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন