বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী

পারমিতা চক্রবর্তী

মন্দোদরী ছোট থেকেই ছিল মা, বাবার আদরের মণি। প্রায় প্রতিদিন ভাইদের সাথে শিকারে যাওয়া নিয়ে ছোটখাট বিবাদ লেগেই থাকত। আর সেই বিবাদ মেটাত মাই। মাই ছিল মন্দোদরী ও রানি হেমার সংযোগ মাধ্যম। মাই সারাদিন মন্দোদরীর ছোটখাটো চাহিদার দিকে নজর রাখত। ছোটবেলা থেকেই মন্দোদরী ভয়ংকর দুষ্টু ছিল। প্রায়সই নিজেই নিজের আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়াত। মন্দোদরীর ভাইয়েরা অর্থাৎ দুন্দুভী ও মায়াবী সাথে ঝগড়া লাগত কে কত বেশী পারদর্শী শিকারবিদ্যায়। মন্দোদরীর মা ছিলেন খুব সুন্দরী অপ্সরা এবং শাস্ত্রীয় নৃত্যবিদ এবং বাবা ছিলেন মায়ারাষ্ট্রের রাজা। মায়াসুর ছিলেন রাক্ষস, অসুর ও দৈত্য সম্প্রদায়ের পিতা। তিনি ছিলেন পরিকল্পক এবং তিনটি উড়ন্ত শহরের রাজা যাকে বর্তমানে ত্রিপুরা নামে চিহ্নিত করা হয়। মন্দোদরীকে স্থাপত্য সম্পর্কে নানা শিক্ষা তিনি দিতেন। বিভিন্ন ভূমিখন্ডে বাড়ি তৈরী করার শিক্ষা পায় মন্দোদরী তাঁর পিতার থেকেই। ছোট মন্দোদরী বড় হয় এই সমস্ত শিক্ষার মধ্য দিয়েই। পাহাড়, গিরিশৃঙ্গকে স্বর্গ বলে এবং সমতলকে ভূমি ও মাটির নীচের অংশকে পাতাল বলে - এই ধারণাগুলো মন্দোদরী একটু একটু করে বুঝতে শেখে। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালকে একত্রে ত্রিলোক বলা হয় এবং দেবতাগণ বিরাজ করেন স্বর্গলোকে। ভারতবর্ষের দেবলোক দেবতাদের জন্য বরাদ্দ ছিল। ভূমিতে বসবাস করত রাক্ষস, অসুর ও দৈত্যগণ এবং মাটির নীচে চলত আর এক সাম্রাজ্য। যা ছিল অসুরদের হাতে তাকে বলা হয় দেনাবাস। ভারতবর্ষের এই ছিল নিয়ম। দেবতা ও অসুররা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নিয়েছিল। কোথায় থাকবে। ভূখন্ড, জল, পাহাড় সবদিকেই যেন এক অংশীদারিত্ব। ছোট মন্দোদরী মাঝে মাঝে ভাবত সে কোন শ্রেণীর! দেবতা নাকি অসুর। আর তার এইসব প্রশ্নের উত্তর দিত মাই। মাই তাকে বোঝায় তারা অসুর এবং দেবতা, মানুষদের থেকে অন্যরকম।

মন্দোদরী যখন একটু বড় হয়ে বাইরে সখীদের সাথে খেলা শুরু করে এবং শিকার করতে করতে ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে। মন্দোদরী আস্তে আস্তে বাল্যকাল পেরিয়ে কৈশোরে প্রবেশ করে। তার জীবনে ছোঁয়া লাগে প্রেম নামক শব্দ। সখীদের সাথে বিবাহ, প্রেম এবং রাজা ও কুমারীদের সাথে প্রণয়ের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হত। প্রেম শুধুমাত্র দেবতা, মানুষদের মধ্যে ছিল না। অসুরদের মধ্যে তার প্রভাব থাকত। কিন্তু মন্দোদরীর বড় হওয়া বিভিন্ন প্রকার প্রাসাদের স্থাপত্য, ভাস্কর্য্য মধ্য দিয়ে প্রেম, ভালোবাসা তার বহিঃপ্রকাশের সান্নিধ্য পায় সখীদের থেকে। সখীরা যখন মন্দোদরীকে বিভিন্ন রাজা, যুবরাজদের প্রণয়ের কথা বলত তখন সে উচ্চসিত হয়ে শুনত। কিন্তু প্রাসাদের মধ্যে তার জীবন ছিল বস্তুকেন্ত্রিক, ইট কাঠ চার দেওয়ালের মত স্থির। একথা কথিত আছে যে তার প্রাসাদ ও ভবনগুলি দেবরাজ ইন্দ্রর ‘অমরাবতী’ থেকেও ঈর্ষণীয়। মন্দোদরীর বাবা বিভিন্ন সময়ে দেবলোকে দেবতাদের প্রাসাদে ঘুরতেন এবং তাদের নতুন ধরনের প্রাসাদ তৈরীর পরিকল্পনা দিতেন। রাজা মায়াসুর ছিলেন একজন সফল পরিকল্পক। সেই কারণে দেবতাদের কাছে তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। শুধু তাই নয় তাঁর নিজের প্রাসাদটিও ছিল অভিনব। মন্দোদরী বাবার সাথে থাকতে থাকতে একসময় বাবার সহকর্মী হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রকম নতুন নতুন পরিকল্পনা দিতে শুরু করে মন্দোদরী। মন্দোদরীর বয়স যখন পনেরো বছর তখন পাকাপাকি ভাবে তার বাবার সাথে ব্যবসায় নিযুক্ত হয়। মন্দোদরীর প্রাসাদটি ছিল বিস্ময়ে ভরা। তার শোবার ঘরের সাথে যুক্ত ছিল একটি সুন্দর বাগান। যার সাথে সরু পথে যুক্ত ছিল মূল প্রাসাদটি। বাইরে থেকে দেখে কেউ বুঝতেও পারবে না। বাগানটি ঈশ্বরিক ফুলে পরিপূর্ণ এবং ভেষজগুণসম্পন্ন। বাগানটির পরিচর্যা এত সুন্দর ভাবে করা হত যা দেখে দূর থেকে সবুজ ভূদৃশ্য মনে হত। দিনের বেলার বাগানটির এই অদ্ভুত রূপ দেখে অনেকে উজ্জ্বল চকচকে পান্না নামে ডাকে। একদিকে ঝর্ণা কুলকুল করে বয়ে চলে অপরদিকে ফুলের সুবাস বাগানটিকে স্বর্গীয় রূপ দেয়। বাগানটির মধ্যকেন্দ্রে ছিল এক মায়াবী পথ। যা মনকে সুন্দর, প্রসন্ন, স্বচ্ছ করে। এই পথ দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হয় কোন জ্যোতিষ্কলোকে হেঁটে চলেছি। বাগানটির অপর প্রান্তে ছিল শিবের মন্দির। অসুরগণ মূলত শিবের ভক্ত। মন্দিরটির স্থাপন এমনভাবে করা হয়েছিল যা প্রাসাদের সামনে এবং বাগানটির মূল কেন্দ্রে অবস্থিত। মন্দোদরীর শোবার ঘর থেকে খুব সহজেই মন্দিরে প্রবেশ করা যেত। মন্দিরটি তৈরী উঁচু লম্বা মার্বেল পাথর দিয়ে। যা দেখে মনে হয় কৈলাস পর্বত দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরে এক মস্ত শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হয়েছিল এবং তাকে পূজা করা হত। মন্দিরের উপরে কোন ছাদ ছিল না। চারিদিকে গাছপালা ঘেরা মন্দির প্রাঙ্গণ। তারা মনে করত শিব দেবতা ও অসুর কোনটাই নয়। ভগবান শিব কখনই কোন এক পক্ষ গ্রহণ করেন না। তিনি সদাসর্বদা ন্যায়ের পক্ষে। সে দেবতাই হোক কিংবা অসুর। মন্দোদরী ছোট থেকেই শিবের পুজো করতেন এবং তার প্রাসাদের ভৌগলিক কারণের জন্য ভগবান শিবের কাছাকাছি থাকতেন।

তাদের প্রাসাদটি ছিল কুম্ভাকার আকৃতির এবং মায়ারাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। বাইরে থেকে আগত পর্যবেক্ষক ও অতিথি অভ্যাগতরা প্রথমে প্রবেশ করত মূল প্রাঙ্গণে তারপর তাদের নিয়ে যাওয়া হত অতিথিশালায় অথবা শহরের বাইরে।

একদিন বিশেষ এক অতিথি প্রবেশ হয় প্রাসাদের মূল অঙ্গণে। মা হেমাকে প্রশ্ন করলে মন্দোদরী জানতে পারে এক ব্রাক্ষণ সন্তান তার বাবার কাছে বাড়ির নকশা, পরিকল্পনা সাহায্য নেবার জন্য এসেছেন। গুজব ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। মহান সৈনিক ও ব্রাক্ষণ সন্তান এসেছেন মায়াসুরের কাছে। তিনি শিবের পরম ভক্ত – রাবণ। রাবণ বিশ্রবা ও দৈত্যকন্যা কৈকেসীর পুত্র। বংশপরম্পরায় ব্রাক্ষণ হলেও রাবণ শারীরিক ভাবে দৈত্য বা অসুরকূলের। মাতা হেমা মন্দোদরীকে জানায় রাবণের মাতা কৈকেসী পিতা সুমেলী ছিলেন দৈত্যরাজ। তিনি চেয়েছিলেন তার কন্যা বিবাহ হোক এমন একজনের সাথে যে খুব শক্তিশালী। যার ফলে তাদের সন্তানও শক্তিশালী হবে। সেই কারণে রাজা সুমেলী বহু রাজাকে প্রত্যাখান করেন তার মেয়ের স্বামী নির্বাচনের জন্য। রাজা আশা করেছিলেন রাজকন্যার সন্তান যেন তার শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে ধরে রাখতে পারে এবং দৈত্য সাম্রাজ্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কিন্তু রাজকন্যা কৈকেসী স্বামী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজমত গ্রহণ করেন। মুনি বিশ্রাবাকে বিবাহ করেন রাজকন্যা। বিশ্রবা হলেন পুলস্তের পুত্র এবং ব্রক্ষার জেষ্ঠ্যপুত্র। [তথ্যসূত্র - নিনাদ যোশী - ।nd।an Mythology ]

বিশ্রাবা মুনি হলেন বৈদ্ধিক সমতায় শ্রেষ্ঠ এবং অত্যন্ত আধুনিক মনষ্ক। মাতা কৈকেসীকে তিনি দ্বিতীয় পত্নীরূপে বিবাহ করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্রাবা মুনি তপস্যা করে বিরাট শক্তি অর্জন করেন। প্রথমে তিনি বিবাহ করেন ঋষি ভরদ্বাজের কন্যা ইলাভিদাকে। তাদের পুত্রের নাম কুবের। প্রাচীন ভারতের অন্যতম বৈদিক ঋষি, পন্ডিত, অর্থনীতিবিদ এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক হলেন ভরদ্বাজ মুনি। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে তাঁর অবদান তৎকালীন সমাজকে অন্তদৃষ্টি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। [ জর্জ এম উইলিয়ামস (২০০৮) হিন্দু পুরাণের হ্যান্ডবুক] তিনি এবং তাদের ছাত্রদের পরিবারকে ঋকবেদের ষষ্ঠ গ্রন্থের লেখক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ঋষি ভরদ্বাজ ছিলেন যোদ্ধা ব্রাক্ষণ দ্রোণাচার্যের পিতা। দ্রোণাচার্য মহাভারতের একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র। যিনি পাণ্ডব এবং কৌরব রাজকুমার উভয়েরই প্রশিক্ষক ছিলেন। মহর্ষি ভরদ্বাজকে "Med।c।ne of father" আয়ুর্বেদের পিতা" বলা হয়। মুনি বিশ্রাবা যখন যজ্ঞ করেছিলেন তখন সুমেলী কন্যা কৈকেসী তার সামনে এসে দাঁড়ান। কৈকেসীর ভরন্ত যৌবন, নিটোল দেহ দেখে আকৃষ্ট হন। কৈকেসী বিশ্রবা মুনির কাছে উপস্থিত হয় এই ভেবে যে তার ঔরসজাত সন্তান রঙ্গসকূলকে মর্যাদা দিতে পারে। সেই সন্তান যাতে ভারতবর্ষকে শক্তিশালী উত্তরসূরী দিতে পারে। বিশ্রাবা মুনি কৈকেসীকে দেখে মুগ্ধ হন এবং তাকে দ্বিতীয় স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে রাজী হন। প্রথম পত্নী ইলাভিদা ব্যাথিত ও প্রত্যাখাত হয়েও স্বামীর সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়। বিশ্রাবা মুনি বাবা হন। মাতা কৈকেসী তার সন্তানদের নাম রাখেন- রাবণ, বিভীষণ, কুম্ভকর্ণ এবং শূর্পনখা। একথা কথিত আছে প্রথম পুত্র রাবণ যখন জন্মগ্রহণ করেন কৈকেসী তার জন্মক্ষণকে স্মরণীয় করার জন্য কাচের হার তার মুখের চারিদিকে পাক খাওয়ান। তাতে দশটি রাবণের মাথার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। তাই মাতা তার পুত্রের নাম রাখেন রাবণ। আবার অনেকে বলেন জন্মের পর রাবণের নামকরণ হয়নি। তিনি ছিলেন দশগ্রীব বা দশাননা (দশ মাথা নিয়ে রাক্ষস) কৈলাশ পর্বতমালার উদ্ধোধনের চেষ্টা করার সময় যেখানে শিব ধ্যান করছিলেন, তার পায়ের আঙ্গুল দিয়ে রাবণের অগ্রভাগ পাহাড়টিকে টিপেছিলেন। রাবণ যখন যন্ত্রণায় রক্ত - কুঁচকানো চিৎকার করলেন, তখন তিনি রাবণ (যিনি চিৎকার করেন) নামে পরিচিত হয়ে উঠলেন।

দশানন খুব অল্প বয়সে তার বাবার থেকে চারটি বেদপাঠ করেন এবং বেদ বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। আয়ুর্বেদ ও জ্যোতিষশাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জন করেন। রাবণ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শুনতে ভালবাসতেন এবং কলা, সমাজবিজ্ঞান, গূঢ়বিজ্ঞান, সঙ্গীত নিয়ে ছয়টি শাস্ত্রে পণ্ডিত হয়ে ওঠেন। রাবণের দশ মাথাকে বলা হয় ছয়টি শাস্ত্র। তিনি শিবের ভক্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি তপস্যা করেন এবং রচনা করেন শিব তাণ্ডবাস্ত্রোত্রম শিবকে সন্তুষ্ট করার জন্য। শিব প্রাথমিক ভাবে তুষ্ট হয়ে তার নাম দেন রাবণ।

এই স্তোত্রটি অতি গুম্ভীর সংস্কৃতে বর্ণিত। এটি পঞ্চচামর ছন্দে লেখা এবং প্রত্যেক লাইনে ১৬ টি দলের ব্যবহার করা হয়েছে। মুক্তদল ও বদ্ধদলের উচ্চারণ পাশাপাশি ভাবে রয়েছে। এটিতে দেবাদিদেব শিবের সৌন্দর্য্য ও শক্তির বর্ণণা করা আছে। শিব হলেন ধ্বংসের দেবতা এবং কীভাবে প্রলয়কালে শিব জীবন, মৃত্যু, কাল এবং মাত্রাকে ধ্বংস করবেন তাও এই স্তোত্রে বলা হয়েছে।

ঋক বেদে উল্লেখ পাওয়া যায় এই মন্ত্র বলে মৃত্যুকেও জিতে নেওয়া সম্ভব। যদি সঠিক নিয়ম মেনে এই মন্ত্র যপ করা যায়, তাহলে দেহের অন্দরে দৈবিক শক্তি এতটাই বেড়ে যায় যে মৃত্যু ধারে কাছেও ঘেঁষতে ভয় পায়। প্রসঙ্গত, অনেক বইতে এই মন্ত্রকে রুদ্র মন্ত্র নামেও ডাকা হয়ে থাকে। রুদ্র কথার অর্থ হল তেজ বা শক্তি, যা শরীরকে ভিতরে এত পরিমাণে শক্তির প্রবেশ ঘটায় যে রোগ বেড়ে ওঠার সুযোগই পায় না। পরমভক্ত এবং জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণীগুলির একটি পাঠকে ‘রাবণ সংহিতা’ বলে বর্ণনা করা হয়।

রাবণ পরবর্তীকালে ক্রমবর্ধমান পৈশাচিক শক্তির সুযোগ নিয়ে লঙ্কায় তার সৎ ভাই কুবেরের সিংহাসন দখল করেন। বিশ্রবা মুনি পরামর্শ দেন কুবেরকে সিংহাসন ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কারণ তাঁর থেকে রাবণের ক্ষমতা বেশী এবং যুদ্ধ কৌশলে অনেক তীক্ষ্ণ। পরবর্তীকালে রাবণ তার দাদাকে (কুবের) অশ্রদ্ধা করা শুরু করেন এবং বিশ্রবা মুনি লঙ্কা ছেড়ে আশ্রমে চলে যান তাঁর প্রথম স্ত্রী ইলাভিদার কাছে।

হঠাৎ একদিন মন্দোদরীকে ডেকে পাঠানো হয় বিশেষ এক মানুষের সাথে আলাপ করার জন্য। মূল কক্ষ একেবারে পরিষ্কার পরিচছন্ন। চারিদিকে মায়ারাষ্ট্রের মন্ত্রীবর্গ, অতিথিদের ভিড়। সবার আকষর্ণ একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ। মন্দোদরী সেখানে প্রবেশ করতেই বুঝতেই পারে তার কিঞ্চিৎ বিলম্ব হয়েছে। রাবণ সম্পর্কে এত কথা মন্দোদরী শুনেছে যে তাকে দেখার ও পরিচয় করার আগ্রহ প্রবল হয়ে পড়েছিল। এক সুন্দর সঙ্গীতের মূর্ছনায় ভরে ওঠে প্রাঙ্গণ। কক্ষের মধ্যমনি এক সুন্দর, সুঠাম দেহের পুরুষ। তিনি মন্দোদরীর পিতার সিংহাসনের বিপরীতে বসে আছেন। একাগ্র চিত্তে রাবণ বীণা বাজিয়ে চলেছেন। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছেন সবাই। রাবণের উচ্চতা এতটাই যে হাঁটু মুড়ে বসা কষ্টদায়ক হলেও একহাতে বীণা ধরে আছেন এত সুন্দর ভাবে যেন মনে হয় স্বয়ং দেবী সরস্বতী বসে আছেন। মাথায় উচু লম্বা সোনার মকুট, কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল। দুই কানে সোনার দুল। দুই কাঁধে চন্দনের তিলক কাটা যা পরিচয় দেয় তিনি ব্রাক্ষণ। তিনি পরেছিলেন উপনয়ন যা তার বুকের বেশীরভাগ অংশকে ঢেকে দেয়। গলা ভর্তি বর্ণময় পাথরের মালা। দশাননের কোমল, সুন্দর পেটের নীচের অংশটি সাদা জরিপাড় সিল্কের ধুতি দ্বারা পরিবৃত। প্রথম দর্শনেই দশাননকে দেখে মন্দোদরীর শিহরণ জাগে। তার থেকে চোখ সরছিল না মন্দোদরীর। রাবণের দুই হাতে পেঁচানো নীল রঙের ভেল।

ধ্যানমগ্ন হয়ে দুচোখ বুঝে বীণা বাজানো দশাননের থেকে নিজেকে পৃথক করতে পারছিল না মন্দোদরী এবং বেশ বুঝতে পারছিল যে একটু একটু করে নিজেকে সমর্পণ করছে দশাননের কাছে। মন্দোদরীর দুচোখ স্থির দশাননের চোখের দিকে। সবাই স্তব্ধ। বাজানো শেষ হতেই পিতাশ্রী ‘অপূর্ব’ বলে চিৎকার করেন। তাতেই মন্দোদরীর সম্বিত ফেরে।

‘আপনি গান্ধর্বের থেকে সুন্দর বাজান।’

চোখ খোলেন দশানন। বীণা নামিয়ে হাতদুটো মায়াসুরের দিকে বাড়িয়ে হেসে ফেলেন বলেন,‘আপনি মহান অসুররাজ।’

মায়াসুর মুগ্ধ দশাননের ব্যবহারে, বীরত্বে। তাঁর মধ্যে অসাধারণ, দুষ্পাপ্য কিছু গুণ খুঁজে পান মায়াসুর। অল্প সময়ের ব্যবধানে এক সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে। দশানন মনে করেন তাঁর এই সমস্ত গুণের একমাত্র কারণ তার গুরু 'মহাবলী'। অসুররাজ মহাবলী হলেন দৈত্যরাজ প্রহ্লাদের নাতী। মহাবলী বালী বা মাভেলী নামে তিনি পরিচিত। প্রহ্লাদ হলেন হিরণ্যকশিপু ও কায়ধুর পুত্র এবং বিরোচনের পিতা। তিনি কাশ্যপ পরিবারের অন্তর্গত। ভগবান বিষ্ণুর প্রতি তাঁর ভক্তি অব্যাহত রেখেছিলেন। পুরাণে তাঁকে সাধুবালক রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। পিতা হিরণ্যকশিপুদের আপত্তিজনক স্বভাব সত্ত্বেও তিনি দেবতাগণের প্রিয় পাত্র ছিলেন। বৈষ্ণব ঐতিহ্যের অনুসরীগণ তাঁকে 'মহাজন' বা 'মহাভক্ত' হিসাবে বিবেচনা করেন এবং অবতার নরসিংহের ভক্তদের কাছে এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ভাগবত পুরাণে একটি অধ্যায়ে প্রহ্লাদের ভগবান বিষ্ণুর প্রতি প্রেমময় উপাসনার প্রক্রিয়া বর্ণনা করা আছে। পুরাণের বেশিরভাগ গল্পেই ‘ছোট ছেলে’ হিসাবে প্রহ্লাদের কার্যকলাপের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয় এবং সাধারণত চিত্রকর্ম ও চিত্রায়ণে তাকে চিহ্নিত করা হয়। ভগবান বিষ্ণুর প্রতি অবিচ্ছিন্ন ভক্তির পাশাপাশি শুক্রাচার্যের শিক্ষার কারণে প্রহ্লাদ অসুরদের মধ্যে প্রবল শক্তিশালী রাজা হয়েছিলেন। একটিও অস্ত্র না তুলে ভালো ব্যবহারের কারণে প্রহ্লাদ তিন পৃথিবী জয় করেছিলেন এবং তাঁর ভয়ে ইন্দ্র স্বর্গ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। অসুররা তাদের রাজার সদর্থক আচরণের সুযোগ নিয়ে দেবগণের প্রতি ক্রদ্ধ হয়ে আকাশ আক্রমণ করেছিলেন। দেবগণ অসুরদের ভয়ে অন্ধক, যযাতি, রাজি এবং কাকুস্থ রাজাদের সহায়তায় লিপ্ত হন এবং তাদের পরাজিত করেছিলেন। পিতামহ প্রহ্লাদ মহাবলীর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা ও নিষ্ঠা বোধ তৈরী করেছিলেন। মহাবলীকে হিন্দুরা ঈশ্বরের সত্য ভক্ত বলে মনে করেন। তিনি যোগের একজন অনুশীলনকারী ছিলেন। অসুররাজ মহাবলী রাবণের উপর প্রসন্ন হয়ে তাকে নানা প্রশিক্ষণ দেবেন স্থির করেন।

রাজা মায়াসুর খুশি হবেন শুনে পুত্র মায়াবীর আমন্ত্রণে দশানন তাদের প্রাসাদে আসতে রাজী হন। রাবণ উপস্থিত হলে দর্শকদের মধ্যে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। রাবণ বা দশানন তাদের দেখে খুশি হন এবং বলেন ‘আপনারা ক্রমশঃ আমার নিকটাত্মীয় হয়ে উঠছেন। সবাই আমার শুভাশিস গ্রহণ করবেন।’

রাবণ একে একে ভাই বিভীষণ এবং মুখ্য উপদেষ্টা মাল্যবানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। মাল্যবান লঙ্কারাজ্যের বৌদ্ধিক ও রাজকীয় বৃত্তিগুলোর মধ্যে একটি সম্মানিত কন্ঠ ছিলেন। তিনি বুদ্ধিজীবি এবং ধর্মগ্রন্থগুলিতে পারদর্শী ছিলেন। মাল্যবান রাবণের প্রকৃত মাতামহ সুমেলীর বড় ভাই এবং লঙ্কার প্রাক্তন রাজা হিসাবে অধিষ্ঠিত হন। পরে রাবণ দখল করেন লঙ্কা সাম্রাজ্য। তিনি রাবণকে রাজনৈতিক পরামর্শ দিতেন। সম্পর্ক এবং বুধিমত্তার কারণে রাবণ মাল্যবানকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। তিনি শিবের ভক্ত ছিলেন।

মন্দোদরী আবেগমিশ্রিত নয়নে তাকিয়ে থাকেন রাবণের দিকে। কী অসম্ভব সৌম্যকান্তি চেহারা, ব্যক্তিত্ব তার সাথে মায়াবী দুই চোখ রাবণের। প্রাসাদকক্ষে অন্যান্য মন্ত্রীদের সাথে কথা বলার সময় রাবণ লক্ষ্য করেন অদূরে দাঁড়িয়ে এক সুন্দরী তনয়া সে বহুক্ষণ ধরে তাকে পর্যবেক্ষণ করে চলছে। মন্দোদরীর মধ্যে প্রবল ইচ্ছা জাগে তার সাথে আলাপ করার কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল হয় না। তার মধ্যে শুরু হয় দোলাচল। চোখে ঘুম নেই। সারারাত ধরে ভাবতে থাকে সুন্দর অনুভূতির কথা। দশানন কী এখন তাকে নিয়ে ভাবছে! নিজের মনকে প্রশ্ন করে বারবার মন্দোদরী। সেই রাতে রাবণ মন্দোদরীর অতিথি শালায় রাত্রিবাস করেন। মাতা হেমা তার কন্যাকে রাবণ সম্পর্কে নানা গল্প করেন। তিনি বলেন ভারতবর্ষের দক্ষিণ প্রান্ত তাঁর ক্ষমতাধীন এবং তাদের প্রতিটি দেওয়াল সোনার তৈরী। প্রজাগণ এই সাম্রাজ্যের নামকরণ করে ‘স্বর্ণলঙ্কা’ এবং রাবণকে তারা ‘লঙ্কেশ’ নামে অভিহিত করে। মাই এবং মাতা হেমা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন অতিথিকক্ষে রাবণের আতিথেয়তার জন্য।তাদের অতিথিশালাটি বেশ বিলাশবহুল এবং রাবণও খুব স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলেন সেখানে। মন্দোদরী মনে মনে ঠিক করে রাবণের সাথে সাক্ষাৎ করে আসবে। নিজেকে প্রস্তুত করে সে মনে মনে। মাইয়ের থেকে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করে মন্দোদরী। জানতে পারে রাবণের ফিরে যাওয়ার সময়। রাজা মায়াসুরের সাথে রাবণের সাক্ষাৎ হবে দুপুরের মধ্যাহ্নভোজের সময়। তারপর পুষ্পক বিমানে রওনা দেবেন তিনি। এই বিমানটি কুবের তাকে দিয়েছিলেন প্রথমত পুষ্পক নির্মাণ করেছিলেন দেবতা বিশ্বকর্মা, পরবর্তীতে তিনি এটি কুবেরকে দিয়ে দেন।

পুষ্পক বিমানটি মূলত শহর, সমুদ্র, রাজত্বকে যুক্ত করে। রাবণের পুষ্পক বিমান যখন মায়ারাষ্ট্রে অবতীর্ণ হয় সারা রাজ্যের মানুষ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখতে থাকে। বিমান বা ভী-মানা সংস্কৃত শব্দ। যার আক্ষরিক অর্থ ‘পরিমাপ করা’ ট্র্যাভারসিং বা ‘মাপানো হয়েছে’। মন্দোদরী মাইকে প্রশ্ন করে, ‘রাবণ তার ভাইয়ের সাথে শিকারে যাবেন কিনা?’

রাবণের শিকার করার প্রতি কোন নেশা ছিল না। রাবণের সাথে সারাদিন থাকেন পিতাশ্রী। মন্দোদরীর দিন কাটে উৎকণ্ঠায় যদি একটি বারের জন্য দেখা হয়। কিন্তু ... বিকেলের দিকে মাই জোর করে তার কক্ষে নিয়ে যায় মন্দোদরীকে। সেখান থেকে পুষ্পক বিমান উড়তে দেখা যায়।

মন্দোদরীর বয়স যখন বারো বছর তার শিক্ষা সমাপ্ত হয়। শিক্ষা বলতে মূলত যোগের মাধ্যমে শারীরিক প্রশিক্ষণ, সাহিত্য, রন্ধনশিল্প, সামাজিক বিজ্ঞান এবং দেব ও অসুর ইতিহাসের জন্য কয়েকটি বেদপাঠ। মন্দোদরী বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারে। অসুররা বড় যোদ্ধা ও বিজয়ী। তারা পরাজয় স্বীকার করতে জানে না। অসুরদের দেবতাদের পরাজয়ের ইতিহাস যুগ যুগ ধরে কথিত আছে। মাইকে নির্দেশ দেয় মাতা হেমা মন্দোদরী যেন রাজকন্যার সাথে সাথে পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠতে পারে। পত্নী কিংবা রাজবধূ হবার সমস্ত শিক্ষা তাকে যেন দেওয়া হয়। মন্দোদরী মনের কল্পনায় তখন একটি পুরুষের বিচরণ। তাঁকে নিয়ে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব দুই বিরাজমান। কিন্তু তার স্বামী ব্রাক্ষণ হবে না অসুর তা নিয়ে উৎকণ্ঠার শেষ নেই। কিছুদিন পর মন্দোদরী আবিষ্কার করে সে এক গন্ধর্ব'র প্রেমে পড়েছে। রাবণকে মন্দোদরী দশানন নামে ডাকা শুরু করে মনে মনে। তাঁর সাথে প্রথম সাক্ষাতের মুহূর্ত যেন ক্রশকাঠির মত বিঁধতে থাকে। এইভাবে চার মাস অতিক্রান্ত হয়।

একদিন মাই মন্দোদরীর কাছে এক নতুন ঘটনা শোনায় দশানন সম্পর্কে। লঙ্কাপতি রাবণ সদ্যই ব্রহ্মার দ্বারা এক বর পেয়েছেন এবং খুব শীঘ্রই হয়ত পিতাশ্রী সাথে দেখা করতে আসবেন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য। বিশাল মহাভোজের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন প্রকার মাংস, কারী, ভাত ইত্যাদি পদ প্রস্তুত করা হয় দশাননের এর উদ্দেশ্যে। সেই ভোজে মহিলাদের ব্রাত্য রাখা হল কারণ পিতাশ্রী দশাননের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন। মন্দোদরী নিজেকে অন্তরমহলে আটকে রাখল এবং অপেক্ষা করল দশাননের সাথে সাক্ষাতের জন্য।

পরদিন যখন মন্দোদরী তার মার সাথে দেখা করার জন্য নিজের কক্ষের বাইরে পা রাখল দেখল সাদা এবং লাল পোশাক পরিহিত বেশ কয়েকজন সোনার থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। থালাটি সোনার জরি দিয়ে সজ্জিত কালো ভেলভেট দ্বারা আবৃত। তার মধ্যে একটি থালার মধ্যে রাখা সোনার বীণা। মন্দোদরীর কাছে এইরকম উপহার প্রদান নতুনত্ব ছিল না কারণ তার পিতাশ্রীকে প্রায়সই অন্য দেশের রাজারা উপহার প্রদান করতেন যুদ্ধে জয়লাভ করলে, নতুন সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হলে। মন্দোদরী বুঝতে পারে উপহারগুলি গুরুত্বপূর্ণ কেউ পাঠিয়েছেন। সে তার মায়ের ঘরে প্রবেশ করতেই দেখে মাতা হেমা মাইয়ের এর সাথে আলোচনায় ব্যস্ত এবং তারা দুজনেই খুব উচ্ছ্বসিত। মাতা তাঁকে জানালেন একটি সংবাদ অপেক্ষারত তার জন্য। মন্দোদরী জানতে চায় মাতার কাছে, ‘উপহারগুলি কারা পাঠিয়েছেন? মায়ারাষ্ট্রে কি কোন বড় অনুষ্ঠান হতে চলেছে?’

মাতা জানান মায়ারাষ্ট্রে এক বড় অনুষ্ঠান আসতে চলেছে। মাইয়ের হাসি মুখ দেখে মন্দোদরী আরো কৌতুহলী হয়ে পরে।

কী সেই অনুষ্ঠান?

মাতা মন্দোদরীকে জানায় উপহারগুলি এসেছে লঙ্কা থেকে।

লঙ্কেশ্বর একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন এই প্রভাতে। যা মায়ারাষ্ট্রের কাছে খুবই সম্মানজনক। লঙ্কেশ্বর মন্দোদরীকে বিবাহ করার প্রস্তাব দেয়। মন্দোদরী তার মার চোখে এই সুসংবাদের উচ্ছ্বাস দেখতে পায়। মা ও মাই দুজনেই মন্দোদরীকে জড়িয়ে ধরে এবং মন্দোদরী সম্পূর্ণ ঘটনায় বাক্যহারা হয়ে যায়। এতদিনে কি স্বপ্ন সত্যি হলো! লঙ্কেশ্বর কি সত্যিই তাকে ভালবাসেন! এমন সংবাদ যে কখনো আসতে পারে তা ভাবতেই পারেনি মন্দোদরী। তার হৃদয় কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মন্দোদরীর পিতাশ্রী এই প্রস্তাবের জন্য দ্বন্দ্বে পড়েন। তিনি মন্দোদরীকে খুব স্বাধীনচেতা রূপে মানুষ করেছিলেন। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনরকম প্রভাব খাটাতে চাইলেন না কন্যার উপর। মন্দোদরী পিতামাতার খুব আদরের। পিতা মায়াসুর ও মাতা হেমা তাঁদের দুই পুত্র সন্তান থাকা সত্ত্বেও মন্দোদরীকে নিজেদের প্রাণের অধিক ভালোবাসতেন। পিতাশ্রী দশাননের পাঠানো সংবাদের কোনো উত্তর দিতে পারলেন না যতক্ষণ না মন্দোদরী সম্মত হয়। মাই মন্দোদরীকে পিতাশ্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে বলেন। এতক্ষণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ আলাপ চারিতা যেন স্বপ্নের মত মনে হচ্ছিল মন্দোদরীর। মাতাকে প্রশ্ন করে সে- সত্যিই দশানন তাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে চান? মাতা বুঝতে পারেন মন্দোদরীর মনের অবস্থা। তিনি বলেন, অবশ্যই আমরা এর জন্য গৌরবান্বিত এবং এই বিবাহমৈত্রী স্থাপন করবে লঙ্কা ও মহারাষ্ট্রের মধ্যে। মন্দোদরী কোন ভাবে বিশ্বাস করতে পারছিল না গোটা ঘটনাটি।

পিতাশ্রী পায়চারি করছেন তার কক্ষের মধ্যে এমন অবস্থায় মন্দোদরী প্রবেশ করে সেখানে। মন্দোদরীকে দেখে পিতাশ্রী কিছুটা তৎপর হয়ে উঠলেন, ‘পুত্রী আমি এবং তোমার মাতা দুজনই খুব আনন্দিত তোমার মত কন্যাকে পেয়ে। তুমি নিশ্চয়ই তোমার মাতার থেকে দশাননের প্রস্তাবের কথা জানতে পেরেছো?’

পিতাশ্রী মন্দোদরীকে সেই প্রথমবার দশাননকে রাবণ রূপে বর্ণনা করলেন। মন্দোদরী জানায়, ‘অবশ্যই পিতাশ্রী। মাতা সম্পূর্ণ ঘটনাই আমাকে বলেছেন।’ পিতাশ্রী কন্যার আচরণ দেখে প্রসন্ন হলেন এবং তার মনোভাব সম্পর্কে জানতে চাইলেন। মন্দোদরী বড় হওয়া তার পিতার আদর্শ ও মূল্যবোধের দ্বারা। পিতাশ্রী জানায় দশাননকে যদি সে আদর্শ স্বামী রূপে মেনে নিতে পারেন তবে বিবাহ হবে। তৎক্ষণাৎ পিতাশ্রীকে জানায় মন্দোদরী রাবণকে স্বামীরূপে গ্রহণ করতে তার কোনপ্রকার অসুবিধা নেই। সম্রাট দশানন এক অসাধারণ শক্তিসম্পন্ন রাজা। একই সাথে তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলো খুবই প্রকট। পিতাশ্রী মন্দোদরীকে জানায় রাবণকে স্বামীরূপে গ্রহণ করতে গেলে তার সম্পর্কে পুরোটা জানা দরকার। কিন্তু কন্যা বদ্ধপরিকর নিজের কাছে। তিনি জানান রাবণ শক্তিশালী রাজা হয়েও বহু মানুষের কাছে বিরুদ্ধচারণ করেছেন। তিনি দেবতাগণের কাছে বর হিসেবে যা যা পেয়েছেন সবগুলোই দেবতাগণকে প্রতারিত করে। পিতাশ্রী রাবণের বুদ্ধিমত্তা, বীরত্ব সবকিছুর প্রশংসা করলেও কন্যার স্বামীরূপে দশাননকে চাননি। একথা মন্দোদরী বেশ বুঝতে পারে। দশাননের উশৃঙ্খল চরিত্র সম্পর্কে শুধুমাত্র লঙ্কায় নয় পার্শ্ববর্তী দেশের রাজারাও জানতেন। তাই পিতাশ্রী চাননি মন্দোদরী রাবণকে বিবাহ করুক। তাই দশাননের থেকে প্রস্তাব আসা মাত্রই সরাসরি তিনি কিছু উত্তর দেননি। কারণ রাজা মায়াসুর কোনভাবেই দশাননের সমকক্ষ ছিলেন না। তিনি বুঝতেই পারেননি এই প্রস্তাবের কারণ কি হতে পারে। রাজা মায়াসুর সরাসরি দশাননকে প্রত্যাখ্যান করতে পারছেন না। অদ্ভুতরকম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মন্দোদরীর পিতাশ্রী।

মন্দোদরী পুরো ঘটনাটা বুঝতে পেরে বেশ ভয় পায়। পিতাশ্রী মন্দোদরীকে বোঝালেন এই প্রস্তাব যদি তারা প্রত্যাখ্যান করে দশানন কোনভাবেই বুঝতে চাইবেন না এই প্রত্যাখ্যান তাকে নয় তার প্রস্তাবকে। দশানন পিতাশ্রীকে জানাবেন এই বিবাহ লঙ্কার সাথে মায়ারাষ্ট্রের। লঙ্কা সমস্ত রকম ভাবে আত্মরক্ষা করবে মায়ারাষ্ট্রকে। দশানন একথা বুঝতেই চাইবেন না যে মায়ারাষ্ট্র পুরোপুরি আত্মনির্ভর একটি রাষ্ট্র। তাদের লঙ্কার দ্বারা আত্মরক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। মন্দোদরী এই প্রস্তাব গ্রহণ না করলে গোটা মায়ারাষ্ট্র এক সমস্যার সম্মুখীন হবে। দশানন এও তাদের বোঝানোর চেষ্টা করবে যে সে শিবের সবথেকে বড় ভক্ত। তার থেকে আদর্শ পুরুষ মন্দোদরীর জন্য হতেই পারে না। সুতরাং মন্দোদরীর বুঝতে অসুবিধা হল না তার পিতা কতটা চিন্তান্বিত গোটা ঘটনাতে এবং মন্দোদরী একটি বড় পরীক্ষার সম্মুখীন। সর্বশেষে পিতাশ্রীর সমস্ত চিন্তার অবসান ঘটে মন্দোদরী জানায় সে দশাননকেই বিবাহ করবে। পিতাশ্রী মন্দোদরীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন সে কোন সামান্য নারী নয়। ভগবান শিবের আশীর্বাদধন্য কন্যা তার স্বামী যে শিবের পরম ভক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। শেষ পর্যন্ত পিতাশ্রী মন্দোদরীর মনোভাবে প্রভাবিত হয়ে বিবাহটি মেনে নিলেন এবং মন্দোদরীও পিতাকে বোঝালেন যে সে সঠিক পাত্র নির্বাচন করেছে। পিতাশ্রীর চোখে জল। তাঁর কন্যা অবশেষে লঙ্কার রানি এবং দশাননে স্ত্রীরূপে প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি মন্দোদরীর কাছে জীবনের চরম মুহূর্ত।

রাজা মায়াসুর তার সকল মন্ত্রীদের নির্দেশ দিলেন মহারাষ্ট্রের কন্যার বিবাহের আয়োজন অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে করার। তিনি আদেশ দেন এই বিবাহ যেন শতাব্দীর সেরা বিবাহ হয়। বিবাহমণ্ডপের স্থান নির্বাচন করা হল নিকটবর্তী স্থানে এবং সেই মণ্ডপটির নাম, রাখা হলো ‘রাবণ কী চানওয়ারি’। এই স্থানটির বর্তমান নাম মন্দোর, যা রাজস্থানে অবস্থিত। এখানে মন্দোদরী ও রাবণের বিবাহ হয়েছিল বলে স্থানীয়দের ধারণা।

অনুষ্ঠানটি রাবণ কী চানওয়ারীতে পরিবেশিত হয়। কিছু ব্রাহ্মণ বিশেষত মৌদগিলরা রাবণকে জামাই হিসেবে বিবেচনা করেন। এই কারণে এখানে রাবণের পূজা করা হয়। ভারতবর্বের বিভিন্ন প্রান্তে দশেরা পালন করা হলেও এখানে পালন করা হয় না। রাবণকে এখানে ঘরে জামাই বলে অভিহিত করা হয়। রাবণ কী চানওয়ারী মন্দিরে পুরোহিতরা রাবণের হিন্দুরীতি অনুসারে শ্রদ্ধা ও পিন্ডদান করেন তাদের বংশধরের জন্য। এখানে রাবণের ৩৫ ফুট দীর্ঘ মূর্তি রয়েছে। দশেরায় লোকেরা রাবণের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করে এবং প্রার্থনা করে। মন্দোরের মধ্যে একটি লম্বা ছত্রী (ছাতা) রয়েছে যা রাবণ এবং মন্দোদরীর বিয়ের স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়। বিশ্বাস করা হয় যে রাবণের পরিবার থেকে বহু ব্রাহ্মণ মন্দোদরীর সাথে তাদের বিবাহের জন্য মন্দোরে এসেছিলেন এবং এখানেই বসতি স্থাপন করেছিলেন। অন্য বিবরণে বলা হয়েছে যে ভগবান রাম’এর সাথে যুদ্ধের সময় লঙ্কা ধ্বংস হওয়ার পরে তার বংশধররা এখানে এসেছিল। রাবণকে এখানে শিবের পরম ভক্ত এবং ‘মহাপন্ডিত’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মন্দোরে মুদগল ও ভেৎ ব্রাহ্মণেরা বিশ্বাস করেন যে তারা রাবণের বংশধর এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ। জ্যোতিষের জনক হিসেবে তাকে শ্রদ্ধা করে। শহরে এমন একটি মন্দির রয়েছে যেখানে তারা তাকে দেবতার মত উপাসনা করে। এই মন্দিরে জ্যোতিষশাস্ত্র শেখা ব্রাহ্মণদের সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে ধার্মিক হিসেবে বিবেচিত হয়। অনুগামীরা বিশ্বাস করেন যে রাবণের মন্দিরটি মানুষকে অলৌকিক শক্তি, কৃষ্ণ জাদু এবং অশুভ আত্মার হাত থেকে বাঁচায়। চানওয়ারী আজ ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে। হিন্দু পুরাণ অনুসারে বিবাহের সাতটি পবিত্র ব্রত এখানে গ্রহণ করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে রয়েছে গণেশ এবং সাতটি মাতৃদেবতা বা সপ্ত মাত্রিকীর খোদাই করা মূর্তি। যেখানে তারা জয়মালা পড়েছিলেন সেখানে টোকেশ্বর মহারাজের শিলা খোদাই রয়েছে। বিশ্বাস করা হয় যে মন্দোরের নাম মন্দোদরী নামের উপর ভিত্তি করে রাখা হয়েছে।

সকল অধ্যায়
১.
অহল্যা, দ্রৌপদী, সীতা, তারা, মন্দোদরীপঞ্চসতীর প্রতি নিবেদন
২.
সূচনা
৩.
বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী
৪.
বিবাহ পর্যায়ে মন্দোদরী
৫.
দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ ও মন্দোদরী কথা
৬.
বজ্রজলা ও মন্দোদরী
৭.
অমৃতের সন্ধানে দশানন ও তার প্রতিক্রিয়ায় মন্দোদরী
৮.
দশানন, বালী ও মন্দোদরী
৯.
মহান্ত, মাতা কৈকেসী ও মন্দোদরী
১০.
মন্দোদরী ও ঋষি ঘৃতস্মদা
১১.
আত্মশ্লাঘা ও মন্দোদরী
১২.
জীবন সন্ধিক্ষণে মন্দোদরী
১৩.
মন্দোদরী ও দশানন
১৪.
মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ
১৫.
মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন
১৬.
যোদ্ধা মেঘনাদ
১৭.
মেঘনাদের বিবাহ ও মন্দোদরী
১৮.
দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী
১৯.
সীতা হরণ ও মন্দোদরী
২০.
বানর ও লঙ্কা
২১.
অহিরাবণ
২২.
যুদ্ধে মেঘনাথ ও মন্দোদরী
২৩.
লঙ্কার রানি মন্দোদরী
২৪.
ফিরে দেখা
২৫.
ঋণ স্বীকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%