পারমিতা চক্রবর্তী
অহীরাবণ রাজি হয়ে যায় দশাননের আদেশ পালন করার জন্য। দশানন সেনা পাঠান শদ্রুলাকে সাথে নিয়ে চৌর্যবৃত্তি করার জন্য।
শদ্রুলার মারফৎ অহীরাবণ সকল সংবাদ গ্রহণ করবে। তিন দিন অতিক্রান্ত হয় কিন্তু কোন সংবাদ পাওয়া যায় না। চতুর্থ দিনে তার মৃত্যু সংবাদ আসে। হনুমান দ্বারা মৃত হন তিনি এবং তার লোকজনকে চিহ্নিত করে শ্রীরামচন্দ্রের সেনাবাহিনীর কিছু মানুষ। তাদের জীবনকে বিপদে ফেলে দেয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয় আক্রমণ করবে তাঁবুতে এবং ধ্বংস করার চেষ্টা করবে ভ্রাতাদের। এক রাতে রামের সেনারা ঘুমিয়ে ছিল। অহিরাবণ তখন গোপনে প্রবেশ করে তাঁবুতে। রাতের রক্ষীদের চোখে ধুলো দিয়ে। সেখানে গিয়ে দেখে ও লক্ষণ ঘুমে আচ্ছন্ন। সে তখন ঘুমের বড়ি খাইয়ে দেয় তাদের। আচ্ছন্ন অবস্থায় দুই ভ্রাতাকে বাইরে নিয়ে আসে। পরবর্তী দিন এইভাবে লঙ্কার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আহির্বাণের সেনা পৌঁছায় অর্ধেক রাস্তায় এবং সুগ্রীব ও হনুমানদের সেনা মুখে পড়ে। দুই ভ্রাতা রাম ও লক্ষ্মণকে উদ্ধার করে তারা। ফলস্বরূপ হনুমান অহিরাবণ এবং সেনাদের হত্যা করে। তাদের দেহ ফেরৎ পাঠায় এই বার্তা দিয়ে সীতাকে যাতে মুক্ত করে দেয়া হয়। কিন্তু দশানন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয় সে যুদ্ধক্ষেত্রে না নেমে কোনভাবেই সীতাকে মুক্ত করবে না।
রাম কীভাবে লঙ্কায় সেনা পাঠাবে সেই ভাবনা ভাবার আগেই দশানন তাকে বিনষ্ট করতে চায়। আর পিছন দিকে ফেরা সম্ভব নয় তার পক্ষে।
পরবর্তী দিন খুব ঘটনাবহুল ও দুঃখজনক। চারিদিকে সতর্ক আওয়াজ বেজে ওঠে। এক নৌকা আসে লঙ্কার উদ্দেশ্যে থেকে। প্রথমে সবাই ভেবেছিল বিপক্ষ শিবির থেকে আসছে। লঙ্কার সেনা প্রস্তুত থাকে, চারিদিক ঘিরে ফেলে। অহিরাবণের মৃতদেহ এবং তার সেনাদের মৃতদেহ ফিরে আসে। নৌকাচালক এগুলি দিয়েই সাথে সাথে চলে যায়। শম্ভুকুমার, মীনাক্ষীর পুত্র’র শুধু হাড় এবং পিছনের মাংস খুঁজে পাওয়া যায়।
সারা শহর স্তব্ধ হয়ে যায় এই ঘটনায়। রাজদরবার দেখে মনে হয় যেন অতীত আবার হাতছানি দেয়। মীনাক্ষী পাথর হয়ে যায় পুত্রের মৃতদেহের সামনে। শম্ভু কুমারকে বন্দী করে বানর সেনা ফিরে আসার সময়। তাকে হত্যা করে অহিরাবণের সাথে ফেরৎ পাঠানো হয়। মন্দোদরী আর সহ্য করতে পারেনা তরুণ সন্তানদের মৃত্যু। ধীরে ধীরে যেন লঙ্কা অন্ধকার হয়। দশানন ও তার পরিবার ভয়ানকভাবে হতাশাগ্রস্থ হয়। লঙ্কায় একের পর এক চিতা জ্বলছে থাকে সাথে শোনা যায় বুকফাটা কান্না। মীনাক্ষী অর্ধউন্মাদ হয়ে যায় পুত্রশোকে। রাজদরবারে আবার অধিবেশন বসে, শুরু হয় আলোচনা।
প্রত্যেকে খুব ভীত হয়। আবার বিভীষণ দশাননকে দোষারোপ করে। ‘ভারত লঙ্কেশ আপনি কীভাবে এসব ঘটনার সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছেন? অহিরাবণ পরাজিত হয় এবং প্রচুর সেনা মারা যায়। শম্ভুকুমার একমাত্র পুত্র আমাদের ভগিনীর। ভয়ানক ভাবে হত্যা করা হয় তাকে। আপনি এখানে বসে কৌশল করছেন কীভাবে তাদের পরাজিত করবেন।’ বিভীষণ বলেন।
নানাশ্রী বিব্রত হন, ‘তোমার কী কোন আদর্শ, মূল্যবোধ নেই বিভীষণ? ভুলে যেও না তিনি আমাদের রাজা। তোমার উচিত ওনাকে সাহায্য করা সর্বদিক থেকে।’
‘আপনি কী মূল্যায়ন করছেন আপনার কৌশলে নানাশ্রী?’ বিভীষণ নির্ভয়ে বলতে থাকেন।
‘বিভীষণ আমাদের হাতে আর সময় নেই।’ দশানন বলেন।
‘তথাস্তু আপনি যা ভালো মনে করবেন সেইভাবেই পরিকল্পনা করুন ভারত লঙ্কেশ। আপনাকে যেন আপনার রাজত্ব না হারাতে হয়।’
‘যথেষ্ট হয়েছে বিভীষণ, তুমি আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না। এই দরবার থেকে চলে যাও নাহলে আমি তোমাকে বিতাড়িত করে দেব।’
‘ইহা বিশ্বাসঘাতকতা বিভীষণ।’ নানাশ্রী বলেন।
‘প্রভু, আপনি তাকে বরখাস্ত করুন। কতদিন সহ্য করা যাবে তার এই রূপ? তার কোন যোগ্যতা নেই এই দরবারে স্থান গ্রহণ করার এবং রাজত্বে থাকার।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন।
বিভীষণ রাগার্ত ভাবে তাকিয়ে থাকে। সরমা অস্বস্তিতে পড়ে। সে চলে যায় তার স্বামীর সাথে ও বলে, ‘একী করছেন? কেন এমন করছেন?’
‘আমি সঠিক কাজ করছি। লঙ্কেশ আমাকে বরখাস্ত করার আগে আমি পদত্যাগ করি। আমি এই রাজদরবারে এবং রাজত্ব থেকে চলে যাচ্ছি।’
সরমা হতবাক। মহিলারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। দরবার ঘোষণা করে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বিভীষণকে। তিনি খুব শ্রদ্ধার এবং তার ভাইয়ের সাথে সুসম্পর্কযুক্ত কিন্তু নিজেও কর্তব্য সম্পর্কে অবগত নয়।’
‘আমি প্রশ্ন করছি আবার কী বিবেচনা করা যায় না বিভীষণ?’ দশানন বলেন।
‘আমি মনস্থির করে ফেলেছি দশানন।’ বিভীষণ জানান।
‘আপনি মূর্খ।’ নানাশ্রী বলেন এবং দশানন তাকে চুপ করতে হাত নাড়ান।
‘আপনি চালাকের মতো কথা বলছেন না কিন্তু সম্মান করি আপনার সিদ্ধান্ত।’ দশানন মৃদু স্বরে বলেন।
‘বৌদি সরমা, আপনার স্থান এই রাজত্বে কোন পরিবর্তন হবে না আপনার স্বামী সিদ্ধান্তের উপর।’ সরমা মাথা নিচু করে থাকে। তার স্বামী তাকে বিভ্রান্তিতে ফেলেছে।
বিভীষণ তার স্ত্রীরদিকে তাকিয়ে থাকে সে জানে সে খুব সাহসী নয় তাই তার পক্ষে কোন কিছু করা সম্ভব নয়। স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখে বিভীষণ এবং হালকা ভাবে বলেন, ‘এটাই সঠিক সময় আমি একা থাকতে চাই। আমি আর এখানে থাকতে চাইনা।’ সরমা তার দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলে। সে ফিরে চলে যায়!
এই চলে যাওয়া বিভীষণের বহু দিনের জন্য। ‘তিনি বিদ্রোহী ভাবে যদি থাকেন তবে আমি খুব একটা আশ্চর্য হবো না, যে কোন দিন আপনার সিংহাসনের দাবিদার হবেন।’
মন্দোদরী চেষ্টা করে, ‘বিভীষণ? তিনি আপনাকে এভাবে...’
‘আমি দেখতে পাচ্ছি তাঁর ভ্রাতাকে, সিংহাসনের দাবীদার হতে রানি। বহু বছর ধরে তাঁর মানবাসনা অপূর্ণ। নিজের ভ্রাতার প্রতি এত খারাপ শব্দ ব্যবহার করেছেন যা প্রাপ্য নয় রাজার কাছে।’ নানাশ্রী বলেন।
রাজদরবারে সবাই নানাশ্রীর বিচারে সহমত হয়। এনারা তৈরী হয়েছেন একই মাংস এবং রক্ত থেকে। বিভীষণ জন্মগতভাবে উদার। তাঁরা একই সাথে বড় হয়েছে এবং শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। দশানন চিরকালীন ব্যতিক্রমী।
দুই ভ্রাতা দুই ধরনের ভাগ্য বহন করে চলেছেন।
একজন রাজা এবং অন্যজন সদস্য রাজদরবারে। বিভীষণ বছরের-পর-বছর দশাননের অন্ধকার পথ অনুসরণ করে চলেছিলেন কিন্তু তার ফলে তিনি হতাশাগ্রস্ত হন। নানাশ্রী মানতে বাধ্য হন কিছু ক্ষেত্রে দশাননের সিদ্ধান্ত সঠিক না হলেও। এই ঘটনায় মাতা কৈকেসীর হৃদয় ভগ্ন হয়। তাদের পরিবার ক্রমাগত ভেঙ্গে যায়। ক্রমাগত তিনি কোন খাদ্য, পানীয় গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক হন। মাতা কৈকেসী বিভীষণের চলে যাওয়ার পিছনে কোন কারণ খুঁজে পান না। বিভীষণ কোনভাবেই রাজী হন না ফিরৎ আসতে। দশানন তার মাতাকে এইভাবে দেখতে অখুশী হন। দশানন তার মাতা কৈকেসীর দেখা করেন এবং নিজেদের দুঃখের কথা আলোচনা করেন। মাতা কোনোভাবেই তার পুত্রের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেন না। দশানন কোনোভাবেই মাতার হৃদয়ের ক্ষতি পূরণ করতে পারেন না। এটা শুধুমাত্র বিভীষণের অনুপস্থিতি নয়, বিভীষণ তার ভ্রাতাকে যে দোষারোপ করেছেন, সেই কারণে বেশি চিন্তিত হন মাতা। একটি পরিবারে ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় সম্পর্কের বাঁধন যত দৃঢ় হয়। মাতা ক্রমাগত চেষ্টা করে যান মীনাক্ষীর স্বামীর মৃত্যুর পর দশাননের সাথে তার সম্পর্ক ঠিক করতে কিন্তু বিভীষণের চলে যাওয়া ভাঙনের এক মুখ খুলে দেয়।
মাতা কৈকেসী এই শোক মানতে পারেনি। ছয় দিনের বেশি তিনি হতাশায় মারা যান। অনুভব হয় যেন ঈশ্বর তাদের উপর অখুশি হয়ে আছেন। একের পর এক মৃত্যু হতে থাকে পরিবারে। যুদ্ধ শুরু করার আগে সবাই বিচ্ছেদ যন্ত্রণা ভোগ করে। মাতা কৈকেসীর মৃত্যু যেন দশাননকে আরও একধাপ এগিয়ে দেয় অন্ধকার পথে। মাতা যেন তাদের শক্তি ছিল। দশানন কুম্ভকর্ণকে জিজ্ঞাসা করেন ঘুম থেকে ওঠার কথা। শেষ তিন মাসে তিনি নিদ্রায় মগ্ন। বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা জানা নেই তার। সবাই মিলে মাতার চিতা প্রস্তুত করে।
কুম্ভকর্ণ বিস্ময় প্রকাশ করে বিভীষণের চলে যাওয়ার খবর শুনে। তিনি জানেন সীতাকে অপহরণ করে এখানে রেখে দেওয়া হয়েছে। তাকে জানানো হয় হনুমানের সম্পর্কে। তাঁর শারীরিক অবস্থা দুঃসাধ্য হয় রাজদরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য। দশানন এবং নানাশ্রী আলোচনা করেন আসন্ন যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে। সমস্ত ঘটনার কথা মাথায় রেখে কুম্ভকর্ণ দশাননকে পরামর্শ দেন তাদের উচিত অপেক্ষা করা। রামের সেনাবাহিনী সমুদ্র অতিক্রান্ত করে আসতে সক্ষম হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত বিরোধীপক্ষ আক্রমণ করছে তাদের আগে থেকে আক্রমণ করার পরিপন্থী নন কুম্ভকর্ণ। যদি তারা মনে করে লঙ্কার ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবে তবে দশাননের অধিকার তারা যা বলছে শোনার। ততক্ষণ পর্যন্ত সবারই ধৈর্য ধরা উচিত।
চারিদিকে সর্তকতা জারি করা হয়। লঙ্কায় একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয় ক্রীড়া, শরীরচর্চার জন্য। সেই স্টেডিয়ামের যুদ্ধের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয় যদি কোনরকম আক্রমণ হয় সেখানে যেন তারা আশ্রয় নিতে পারেন। মেঘনাথ তীরন্দাজ বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে বলে। সে সকল সেনাদের বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করে। সকল সেনাদের মোট আটটি সমান বাহিনীতে ভাঙ্গার চেষ্টা করা হয়। প্রত্যেক বাহিনীর একজন সেনাপ্রধান নিযুক্ত হয়। এই বাহিনীর প্রধানরা রাজপুত্রদের কাছে সমস্ত তথ্য দেবে। আতিকায়, প্রহেষ্ঠ, ত্রিশির, দেবন্ত্বক, নারান্ত্বকা, কুম্ভ, নিকুম্ভ দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের অধীন ৩০,০০০ করে সেনা নিযুক্ত করা হয়, বাকি সেনাদের রাখা হয় শহরের সুরক্ষার জন্য। দশানন অন্য অসুরদের শমন পাঠায় যাতে তারাও লঙ্কার পক্ষে যুদ্ধ করতে পারে। লঙ্কার সবাই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকে কিন্তু কোথাও রামের দেখা পাওয়া যায় না কিংবা কোন জাহাজের হদিস পাওয়া যায় না সমুদ্রে। এইভাবে এক মাস অতিক্রান্ত হয়। লঙ্কার পরিদর্শক সামুদ্রিক সীমায় নজর রাখে। বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা হয় এই অভিজ্ঞতা মেঘনাদ চৌকিদার বাহিনীকে পাঠায় অনুসন্ধানের জন্য। তারা এসে খবর দেয় যা লঙ্কার সামরিক বাহিনী ধারণার বাইরে।
‘প্রভু, প্রশিক্ষিত বানর বাহিনী মিলে একটি পথ তৈরি করেছে প্রবেশের জন্য লঙ্কায়। তারা এমনভাবে ধূসর রঙের সেতু স্থাপন করেছে যেন মনে হচ্ছে মানুষের সেতু। রামের বানর বাহিনী সমুদ্রের উপর এক সেতু নির্মাণ করেছে যাতে তাদের সামরিক বাহিনী লঙ্কায় প্রবেশ করতে পারে। আমরা দেখলাম একদল প্রশিক্ষিত বানর পাথর বহন করছে এবং জড়ো করছে সেতু নির্মাণের জন্য।’ চৌকিদার প্রধান জানায় মেঘনাদকে।
এটা কল্পনা করা লঙ্কার সেনাবাহিনী চিন্তার বাইরে। এই ভাবনাটাই বুদ্ধিদীপ্ত করেছে তাদের। ‘একটি সেতু নির্মাণ করেছে বানর! আপনি জানেন আপনি কী বলছেন।’ মন্দোদরী বিস্ময় প্রকাশ করে।
‘হ্যাঁ, আপনাকে যা বলছি সব সত্যি। প্রথমে আমরাও বিস্মিত ছিলাম কিন্তু যখন দেখি বানর-মানুষ একসাথে সেতু নির্মাণ করছে তখন অবাক হয়ে যাই। তারা লঙ্কা আসার জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। ওই সেতু নির্মাণে প্রায় ৮০ হাজার বানর-মানুষ খনন করার যন্ত্র (যা দিয়ে পাথর ভাঙ্গা যায়) নিয়ে তাঁবু খাটিয়ে রয়েছেন। দিনরাত সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। সব রকমের রয়েছে তাদের কাছে।
দরবারে এক মন্ত্রী চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘প্রভু, তারা আমাদের সাথে যুদ্ধ করবেন বানরকে সাথে নিয়ে!’
‘স্তব্ধ হন। আপনারা শত্রুকে ছোট ভাবছেন।’ দশানন বলেন, ‘তারপর?’ চৌকিদারকে প্রশ্ন করেন।
সে বলতে শুরু করে, ‘প্রভু, আমরা কোনভাবেই তাদের ছোট ভাবছিনা, সেতু নির্মিত হচ্ছে বিভিন্ন রকমের পাথর দিয়ে। যার কৌশল নির্মাণ করছেন নল এবং নীল। আমরা কতগুলি পাথর দেখেছি যা দেখে মনে হয়েছে চুনাপাথর, যা জলে সহজেই ভেসে যায়। রাম এবং সুগ্রীব তাদের নেতা। তাদের মস্তিষ্ক খুবই বুদ্ধিদীপ্ত। তাদের কাছে আছে প্রশিক্ষিত শ্রমিক, যোদ্ধা, প্রশিক্ষিত বানর-মানুষ, যারা শিক্ষিত এই ব্যপারে প্রভু...’ তিনি জানান।
‘আর কী? এখনও কিছু বাকি আছে?’ দশানন প্রশ্ন করেন। তিনি দশাননের চোখের দিকে তাকাতে পারে না।
‘প্রভু, সেখানে আছে আপনার ভ্রাতা বিভীষণ। তিনি লঙ্কা সম্পর্কে পুরো তথ্য দিচ্ছেন তাদের।
লঙ্কার বহিরপথ সম্পর্কে পুরো বিবরণ দিচ্ছেন। তিনি প্রায় একমাস আগেই তাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন।
দশাননের চক্ষু স্থির হয়ে যায়। কিন্তু কিছু বলতে পারেনা। বিভীষণ তার দিক থেকে অন্তিম অস্ত্র প্রয়োগ করেছেন। তিনি যখন এখান থেকে চলে যান তখনই বোঝা যায় বিপরীত কিছু করতে চলেছেন। কিন্তু শত্রু শিবিরে গিয়ে যোগদান করবেন এটা ভাবা যায়নি।
নানাশ্রী ভয়ংকর রেগে গেলেন, ‘তিনি আমাদের পিছন থেকে ছুরি মেরেছেন। তিনি তঞ্চক! মেরুদণ্ডহীন পুরুষ।’
‘শান্ত হন নানাশ্রী মাল্যবান।’
‘ভুলে যান প্রভু। কিন্তু বিভীষণ আমাদের সাথে তঞ্চকতা করেছেন...’ মন্ত্রী বলেন।
‘তিনি কী ভাবে আপনার বিরুদ্ধে গেলেন ...তিনি আপনার ভ্রাতা!’ মন্দোদরী বলে।
‘এক ভ্রাতা আর এক ভ্রাতাকে ধ্বংস করতে চাইছে সিংহাসনের জন্য ... কোন বিচারবুদ্ধিতে তিনি রামের পক্ষ নিলেন?’ নানাশ্রী বলেন।
প্রভু বিভীষণ বিশ্বস্ত সমর্থক রামের সেনাবাহিনীর। তারা আমাদের ঘৃণা করে ভারতবর্ষ থেকে আসা বলে। আমরা আরো অনেক কিছু জানতে চেয়েছিলাম বিভীষণের ব্যাপারে। তথাপি আমরা ফেরৎ আসি যা সংবাদ পেয়েছি তাই নিয়েই।’ চৌকীদার বাহিনীর প্রধান জানায়। দশানন চেষ্টা করে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর ব্যাপারে। মন্দোদরী পুরো ঘটনা মানতে পারে না মন থেকে। সে ভাবে সবার মনোভাব। মন্দোদরী মনে মনে অনেক বড় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। সেভাবে যুদ্ধ আসন্ন। দশানন এর আগে অনেক বড় যুদ্ধ করেছেন কিন্তু তার প্রভাব কখনই মন্দোদরীর ওপর পড়েনি। মন্দোদরী যেন এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এই প্রথমবার মন্দোদরী ও গোটা লঙ্কাবাসী নিজেকে নিজে রক্ষা করে। যুদ্ধের হুমকি আসে আপন লোকের থেকে।
দশানন যাবার প্রস্তুতি নেয় এবং মন্দোদরীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এটা জেনে আমাদের ভালো লাগলো যে আমাদের শত্রু প্রস্তুত যুদ্ধের জন্য এবং সবাই এত আশ্চর্য হলেন তাদের পরিকল্পনা নিয়ে কেন? আপনারা কেউ ভুলবেন না যে তারা যুদ্ধ করতে আসছে আমাদের সাথে... রাক্ষসের ভূমিখণ্ডের সাথে! এখন কি আমার প্রিয় একজন সাথে আছের তাদের। আজ থেকে আমার কুম্ভকর্ণ ছাড়া অন্য কোনো ভাই নেই। সুতরাং সবাই নিজেদের প্রস্তুত রাখুন। আমাদের বহু প্রতিক্ষিত শত্রু এসে উপস্থিত আমাদের দ্বারে। হর হর মহাদেব!’
রামের বাহিনী লঙ্কার প্রবেশদ্বারে পৌছে যায় আটদিনের মধ্যে। তাদের যেন বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয় লঙ্কার শক্র হাজির। দশানন মন্দোদরীকে তার প্রাসাদের উঁচু স্থানে নিয়ে যান ওখান থেকে পুরো ঘটনাটা যাতে সুন্দরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। সবাই দেখে রামের সেনাবাহিনীর লঙ্কার প্রবেশদ্বারে তাঁবু খাটিয়ে থাকতে। তারা দূর থেকে বুঝতেই পারছিল না কারা লঙ্কার এবং কারা রামের বাহিনী। কিন্তু সবাই দেখে যুদ্ধের রথ, কামান এবং পতাকা। তাদের পতাকা হল কমলা এবং নীল রঙের। আড়াআড়িভাবে বিভক্ত দুটি রঙের মধ্যে আছে শাঁখের চিহ্ন। কমলার প্রতীক হল বানর কিষ্কিন্ধ্যা এবং নীল রং রামের প্রতীক। শঙ্খের প্রতীক হল বিষ্ণু। দুটি রং পাশাপাশি রাখার অর্থ হল রাম, লক্ষ্মণ এর সাথে আছেন সুগ্রীব এবং কিষ্কিন্ধ্যা রাজা।
সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকে প্রবেশপথে। মন্দোদরী জিজ্ঞাসা করে দশাননকে, ‘তিনি কী তাদের সেনার সাথে আছেন প্রভু বিভীষণ? তিনি কীভাবে চলে গেছেন ভূমিখণ্ড থেকে। তার মধ্যে কোনো অপরাধ বোধ কাজ করছে না।’
‘আমার কিছু যায় আসে না মন্দোদরী যদি সে সেখানে থাকে। আমি এখন যুদ্ধজয় নিয়ে ভাবছি। আমার অনেক কিছু করা বাকি।’ দশানন মন্দোদরীকে জানায়।
মনে-মনে দশানন কিছুটা চিন্তিত, ভীত হলেও প্রকাশ করে না মন্দোদরীর কাছে। এরপর সে ঘুমাতে যায়। রামের সেনাবাহিনী যেন তার পাকস্থলির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুতেই ঘুম আসে না তার। উৎকণ্ঠায় কাটে রাত। বিভিন্ন ভাবনা এসে ভিড় করে। মন্দোদরী ভাবে দশানন কীভাবে এই চাপ নিতে পারবে যেখানে মন্দোদরী এই নিয়ে এত চিন্তিত। সে নিজের কক্ষে বসে দাঁড়িয়ে কাটায় রাত। শীঘ্রই ভোর হয়। সূর্যোদয় দেখা যায়। মন্দোদরী তার দাসীকে নিয়ে হাঁটতে যায় মহান্তর বাড়ি। তিনি ভবিষ্যতের কথা জানতে পারে।
মহান্ত মারা যায় আট বছর আগে। কিন্তু তার পুত্র মহান্তকুমার এখন সেখানে বসবাস করে। তার কাছে যারা আসে সকলেই কথা শোনে মন দিয়ে। মন্দোদরী সেখানে পৌঁছানোর আগেই অনেক কথা বলে যান। তিনি তাকিয়ে থাকে রানির দিকে অনেকক্ষণ। কিছুক্ষণ পরে চিনতে পারেন। মহান্তকুমার কোন কিছু শুরু করার আগে রক্ষী বলে, ‘আমাদের রানি আপনার সাথে কথা বলতে চান... তিনি আপনার উপদেশ চান গোপনে। আপনি আপনাদের কথোপকথনকে খুব সতর্কভাবে গোপন রাখবেন।’
‘অবশ্যই, অবশ্যই ...আমি বুঝতে পেরেছি।’ মহান্তকুমার সেখানে বসেছিলেন যেখানে দুহাত দিয়ে পরিষ্কার করে বসতে বলেন মন্দোদরীকে।’ আমি খুবই দুঃখিত, আমি কোন ভাবে আপনাকে চিনতে পারিনি আপনি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ভাবে এখানে এসেছেন। আমি আপনার জন্য কী করতে পারি বলুন? মহান্তকুমার মন্দোদরীকে বলেন।
‘বহুবছর আগে আমি আপনার পিতার কাছে এসেছিলাম পরামর্শের জন্য। আমি তখন কিছু স্বপ্ন দেখতাম কিন্তু আজ আমি আমার স্বামীকে নিয়ে চিন্তিত এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে। আপনার পিতা তখন আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন...
তিনি কিছু জিনিস গণনা করেছিলেন যা আমি বুঝতে পারি বহু বছর আগে। কিন্তু আমি এসেছি আজ আপনার কাছে একই কারণে আমার স্বামী, সন্তান এবং আমার রাজত্ব সবই আজ যেন অন্ধকারে। এক অপ্রতিরোধ্য শত্রু অপেক্ষারত আমাদের জন্য। আমি আপনার কাছে জানতে চাই এর পরবর্তী কী হতে চলেছে। সত্যি কি যুদ্ধ শেষ হবে?
মহান্তকুমার তাকিয়ে থাকে দুঃখজনকভাবে।
‘ক্ষমা করবেন। আমি চিকিৎসক, আমি আমার পিতার মত যাজক, মায়াবী নই। আমি কোনভাবেই আপনাকে সাহায্য করতে পারব না।’ মন্দোদরী কিছুটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
‘কিন্তু আপনার চোখে আপনার পিতার মত। তাই নয়? তিনি সরাসরি তাকিয়ে থাকে। মন্দোদরী আশার চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে।আমি চেষ্টা করতে পারি কিন্তু আমি খুবই অনিশ্চিত যা বলছি তা নিয়ে। আমার পিতার কিছু নির্দেশ আছে। যদিও আমার স্বপ্ন অন্য। তবুও চেষ্টা করছি আমার দিক থেকে শতভাগ।
তিনি বাড়ির বাইরে আসেন। এক কোণে বসে পড়েন চোখ বন্ধ করে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেন। মন্দোদরী অপেক্ষা করে তিনি কী বলবেন তা শুনবেন বলে। হঠাৎ করে তিনি চোখ খোলেন এবং খুব কষ্ট করে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন।
‘আপনি কী কিছু দেখতে পাচ্ছেন? যুদ্ধ সংক্রান্ত কিছু দেখতে পাচ্ছেন? মন্দোদরী প্রশ্ন করে।
এই যুদ্ধ ইতিহাসে এক মহাযুদ্ধ হিসেবে লিখিত হবে। নায়কের মৃত্যু হবে, কাউকে ভগবান উদ্ধার করবেন। যুদ্ধের শেষে এক ভ্রাতা অপরের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। এক বরকে ভুল বোঝা হয়েছিল। অমরত্বের বর। আপনি পরের কথাগুলো শুনলে ভয় পাবেন। কে বলবে সেই সত্য, তিনি তার প্রকৃত পিতা। তাকে হাঁটতে হবে আগুনের মধ্য দিয়ে। আগুনের জন্য তার জন্ম।
তিনি ফিসফিস করে বলেন। এই সব অসমাপ্ত কথা তিনি বলে যান।
এক কঠিন স্রোত প্রবাহিত হয় মন্দোদরী শিরদাঁড়া দিয়ে। সে বুঝতে পারে না মহান্তকুমার কী বলতে চায়। আপনি কী বলছেন তা যদি আরো একবার বলেন! আপনি ঠিক কী বলতে চান?
‘আমি খুব দুঃখিত রানি। ক্ষমা করবেন, আমি আর বলতে পারব না আমি কী বলেছি।’
‘আপনি কী আর কিছু দেখতে পাচ্ছেন?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে।
‘হ্যাঁ, আমি দুটো জিনিস দেখতে পাচ্ছি, শুধু মাত্র দুটো... প্রথম আমি এই শহরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি আর আমার চারিদিকে বানর। তারা আমার থেকে কিছু জিনিস চাইছে কিন্তু আমি জানিনা আমি সেখানে দাঁড়িয়ে কি করছি। আমি সেনা নই তাও আমি নিজেকে দেখতে পাচ্ছি তৃণের মধ্যে মিশে যেতে।’ তিনি হঠাৎ করে জেগে ওঠেন বড় অদ্ভুত ভাবে। দ্বিতীয় বিষয় হল, ‘আমি আপনাকে সিংহাসনে বসতে দেখতে পাচ্ছি রানি রূপে। আপনাকে দেখতে আরো বৃদ্ধ লাগছে। আপনি এখন যা আছেন তার থেকেও।’
মন্দোদরী কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। যুদ্ধ আসন্ন। মন্দোদরী সিংহাসনে বসবে তবে অবশ্যই দশানন পরাজিত করবেন রামকে এবং কয়েক বছর বাদে তিনি পদত্যাগ করবেন। তার মন ফিরে আসে আগের জায়গায় এই সত্য শুনে। এটাই সঠিক সময় মন্দোদরী ভাবে। তার পক্ষে সীতাকে নিয়ে কোন কিছু লুকানো সঠিক হবে না। সীতার সঠিক পরিচয় তার জানিয়ে দেওয়া উচিত। সে যা শুনেছেন তা বিশ্বাস করতে শুরু করে। নিজেকে নিজে ধন্যবাদ দেয়। ফিরে আসে নিজের কক্ষে।
পরের দিন বানর উপস্থিত হয় রাজদরবারে বার্তাবাহক হিসেবে রাম ও লক্ষ্মণের। আমাদের সেনা ঘিরে ফেলেছে আপনাদের। অপর বানরকে দেখা যায় দরবারে। মন্ত্রী, সভাসদ সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তাকে দেখতে হনুমানের মত, বয়স বেশি নয়। তার মুখে হাসি লেগে থাকে যখন দশাননের দশ জন সেনা উদ্ধার করে দশাননের সামনে নিয়ে আসে। এটা বোঝানোর জন্য যে লঙ্কার সেনা একটুও ভীত নয় বানরের সেনার কাছে।
দশাননের কাছে আগেই সংবাদ ছিল তার সম্পর্কে। তিনি কিছুটা হতবাক হন দেখে কতজন সেনা মিলে তাকে উদ্ধার করেছে। একজন বানরকে ধরতে এত সেনা লাগে।
‘আমি শুনতে চাই আপনি নিশ্চিত কোনো শান্তির বার্তা দিতে এসেছেন।’ দশানন বলেন।
‘আপনি ঠিকই শুনেছেন। আমাদের সেনা অপেক্ষারত আপনার শহরের প্রবেশদ্বার ভেঙে ফেলার জন্য। কিন্তু রাম শেষ চেষ্টা করতে চান যাতে যুদ্ধ না হয় তার জন্য। তিনি আমাকে এই বার্তা প্রেরণ করতে পাঠিয়েছেন।’ বানর বলে।
‘এরপর বলুন আপনি যা বলছেন উনি কী এই প্রস্তাব পাঠিয়েছেন? নানাশ্রী বলেন।
বানর চারিদিকে তাকিয়ে দেখেন, ‘অদ্ভুত ব্যবহার। লঙ্কার অতিথির আসনে বসার জন্য এটা সঠিক ব্যবহার নয়। আপনাকে দশ জন সেনা মিলে আটক করেছে, এরপর আপনি হুমকি দিচ্ছেন! আপনার মধ্যে কোন শিক্ষা, সহবত নেই?’
‘আসন গ্রহণ করুন।’ দশানন চিৎকার করেন।
‘আমি আপনার সাহসকে মেনে নিচ্ছি বানর। আপনাকে দেখতে খুব তরুণ লাগছে। আপনার মতো তরুণ মানুষের কাছে এমন সাহসই আশাপ্রদ। যিনি শত্রু দরবারে হাজির হওয়ার ঔদ্ধত্য দেখান। কে আপনি? কী আপনার নাম?’
বানর আসন গ্রহণ করেন এবং নিজের পরিচয় দেয়।
‘আমি অঙ্গদ, কিষ্কিন্ধ্যা রাজা বালির পুত্র। আমার মা তারা।’
দশানন উষ্ণ অভিবাদন দেন, ‘অঙ্গদ! আমি হতবাক আপনি রামের বাহিনীতে কী করছেন? আপনার পিতা বালি আমার পরম বন্ধু ছিলেন। আমি যখন আপনাকে দেখেছি তখন আপনি অনেক ছোট।’
মন্দোদরী দেখে রাবণ অঙ্গদকে দেখে খুবই আনন্দিত হয় এটা শুনে অঙ্গদ বালির পুত্র। তিনি তাকে অভিবাদন জানিয়ে বলেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত আপনাকে এভাবে এখানে পেয়ে। শুধুমাত্র রামের বার্তাবাহক না, বালির পুত্র হওয়ার জন্য। আমি আপনাকে আমন্ত্রণ জানাই আমার অতিথি হিসেবে থাকার জন্য।’
অঙ্গদ কিছুটা থামিয়ে দেয়, ‘আমি এখানে এসেছি একটি নির্দিষ্ট কারণে। আমি রামের সেনাবাহিনীর প্রধান। সুগ্রীব হল আমাদের রাজা। আমি এখন তার আদেশ মানতে বাধ্য। আপনি আমার পিতার বন্ধু। কিন্তু তিনি এখন আর বেঁচে নেই আর আমি জানি আপনি একসময় তাকে কড়া প্রতিদ্বন্দিতায় ফেলেছিলেন এবং তিনি আপনাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান।’
দশাননের হাসি মিলিয়ে যায়। মন্দোদরী তাকে জানায় রাজাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের জন্য, ‘আপনি যথাযথ পদ্ধতি মেনে কথা বলুন।
একজন রাজার সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলা কখনই উচিত নয়। তাই নয় কী?’
আজ তিনি আর আমার পিতার বন্ধু নন। কিন্তু রামের স্ত্রীকে অপহরণ করা দোষের দোষী!
‘যথেষ্ট হয়েছে বানর, আপনি এখন যেভাবে কথা বলছেন তাতে আপনি আপনার নিজের অধিকারবোধটাই হারিয়ে ফেলছেন। এখানে আপনার পরিচয় শুধুমাত্র বার্তাবাহক।’ নানাশ্রী বলেন।
অঙ্গদ বলেন, ‘বন্দী করুন আমাকে। আপনি তা পারেন। আমি আপনার কাছে একটি বাক্য বলতে পারি যে রাজদরবারে কেউই আমার গায়ে হাত দিতে পারবে না।’
তিনি সোজা দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আসুন আমার কাছে চেষ্টা করুন। আমার পা মাটি থেকে হেলানোর চেষ্টা করুন।’
প্রত্যেকের ইতস্তত বানরের এই কথা শুনে? দশানন সব কথা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘ভুলে যাবেন না আপনি শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছেন আমাদের কাছে। সুতরাং কোনোভাবে প্রভাবিত করতে পারবেন না অন্য কাউকে তাকে ভঙ্গ করার। বলুন এখানে কেন এসেছেন ...কী প্রস্তাব আপনার?’ দশানন জানান।
‘লঙ্কাপতি, রাম কোনভাবেই যুদ্ধ চান না। আপনি তার স্ত্রীকে মুক্ত করে দিন বিনা যুদ্ধে। তিনি আপনার সাথে শান্তির হাত বাড়াবেন। এই যুদ্ধ কিন্তু খুব দামী হবে আপনাদের জন্য। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন সীতাকে মুক্ত করে দিতে এবং ক্ষমা চাইতে এই ব্যবহারের জন্য। রাম খুবই ক্ষমাপ্রবণ। তিনি সবকিছু ভুলে যাবেন আপনি যা করেছেন।’ প্রস্তাব দেন।
দশানন অত্যন্ত রাগার্ত ভাবে তাকিয়ে থাকেন। তিনি জানান, ‘বলুন রামকে আমি তার স্ত্রীকে মুক্ত করতে প্রস্তুত পরিবর্তে তাকে এবং ভ্রাতাকে বন্দী করতে চাই। এই দরবারে আমি তখনই সীতাকে মুক্ত করে দেব। আমি সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছি। তাকে এবং তার ভাইকে আমার বোনের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তারা হত্যা করেছে অনেক অসুরদের। তারা আমার কাছে ক্ষমা চাইলে আমি সমস্ত কিছু প্রত্যাহার করে নেব!
দরবারের সমস্ত সদস্যরা উল্লাসে ফেটে পড়ে। তারা চিৎকার করতে থাকে। ‘দীর্ঘজীবী হও রাবণ... দীর্ঘজীবী হও... দীর্ঘজীবী হোক তোমার রাজত্ব!’
অঙ্গদ বুঝে যান তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তার গলা আরো স্পষ্ট এবং আনন্দিত হয়।
‘এটা কোনদিনই সম্ভব নয়...আপনার মানুষ এতই বোকা যে তারা রাম এবং লক্ষ্মণকে বন্দি করে রাখতে চাইবে। আমি আপনাকে পরামর্শ দেব আপনার প্রস্তাব গ্রহন করার জন্য। আরও একবার রাবণ...’
দশানন উচ্চ কণ্ঠে হেসে ওঠে, ‘ওহ, নবীন যুবক তারা আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে বার্তাবাহকরূপে...এটা সত্যই সুন্দর যে আপনি তাদের আদেশ বহন করতে এসেছেন এখানে। আপনি কী মনে করেন আপনি বালির সিংহাসনের জন্য আদর্শ পুত্র? তারা আপনাকে বলেনি রাম আপনার পিতাকে হত্যা করেছে যাতে সুগ্রীব কিস্কিন্ধ্যার রাজা হতে পারে এবং জিজ্ঞাসা করুন হনুমানকে এই ব্যাপারে এবং আমার বার্তা তাদেরকে প্রেরণ করবেন। অথবা আমি অপেক্ষা করব যুদ্ধের জন্য আগামীকাল।’ দশানন বলেন মন্দোদরী অভিভূত হয় দশাননের বিশ্বাস দেখে। অঙ্গদ এর পর চলে যায়।
বিভিন্ন প্রদেশের ওসুর ত্রিকূট সামনে অপেক্ষা করে দশাননের পক্ষ গ্রহণ করার জন্য। দশানন এবং মন্দোদরী অভ্যর্থনা জানায় তাদের- ধূমারক্ষ, বজ্রদংস্ট্রা, একম্পনা, মহোদরা, জম্বুমালী, মকরক্ষ এবং বিরুপাক্ষ। তারা আসেন লঙ্কার সেনাবাহিনীকে সমর্থন করার জন্য। প্রতি বাহিনীতে তাদের নিযুক্ত করে দেওয়া হয়। এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে পরবর্তী দিনের সূচনা। লঙ্কার সবাই একথা জানে দশাননের প্রস্তাবে রাম কখনই রাজি হবেন না। তথাপি বানরের দ্বারা সেই চিহ্ন পাঠানো হয় রামের বাহিনীর কাছে।
দশানন তার সেনাপ্রধানের ভূমিকা পালন করে। তিনি এক মহাভোজের আয়োজন করেন তার সেনা প্রতিরক্ষা বিভাগের জন্য যাতে তারা নির্ভয় এই যুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। পরেরদিন সকালে অঙ্গদ চলে যাবার পর মন্দোদরী কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়। সে সীতাকে বারান্দার এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। কিছু পরে বসে থাকতে দেখে অশোক গাছের নিচে। চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করে সে। মন্দোদরীর নিজের সন্তান হয়েও আজও সে বিরূপ ভাগ্য বহন করে চলেছে। সে সীতার সাথে দেখা করতে বাগানে প্রবেশ করে। এই প্রথমবার মন্দোদরী প্রবেশ করেন অশোকবনে হনুমান কান্ডের পর। আগের মতো সেই গাছ আর নেই, সীতা তাকে দেখে এগিয়ে আসেন।
‘আমার অনেক কিছু বলার আছে। আমার আপনার সাথে অনেকদিন পর সাক্ষাৎ হল।’ আমি খুবই দুঃখিত আপনার পুত্র আকাশ্যকুমারের মৃত্যুর জন্য। এই ক্ষতি অপূরণীয়।
সে আমাদের কনিষ্ঠতম পুত্র। বয়স আঠারো। সে তার রাজ্য কে বাঁচার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এভাবে তার মৃত্যু আশাপ্রদ নয়। মন্দোদরীর চোখের জল ভরে যায়। সীতা সব শুনে চুপ হয়ে যায়। ভাবতে থাকে পরবর্তী কি বলা উচিত।
‘হনুমানের কিন্তু এমন করার কোন ইচ্ছা ছিল না।’
‘যদি তার উদ্দেশ্য কাউকে আঘাত না করাই হত তবে কেন আমাদের সেনাকে মারল। আমার পুত্রকে অবধি হত্যা করল কেন? সে কী দেখতে পারছিল না আমাদের অবস্থা কী ভয়ঙ্কর হয়েছিল। কারণ আমরা এখানে আপনাকে দেখেছি তাই এমন করল।
‘আপনারা আমাকে অপহরণ করে রেখেছেন। আমি সর্বদাই বিপদের মধ্যে থাকি।’ সীতা জানায় মন্দোদরীকে।
মন্দোদরী হেসে ওঠে সীতার সরলতায়। সে তার স্বামীর প্রেমে এতই অন্ধ যে তার পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয় কী ভয়ংকর দিন গেছে তার উপর দিয়ে।
‘আপনারা যখন বনবাসে ছিলেন তখন আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? আপনাদের জীবনযাত্রা ছিল ভবঘুরের মতো। বিস্ময়ে আশ্রয়ের ঘুরে জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এক অরণ্য থেকে অন্য অরণ্য। তখন আপনাদের জীবনের ঝুঁকি ছিল না? আপনার জীবনকে সুন্দরভাবে রেখেছিলেন।’
‘আপনি কী ভাবে আমার স্বাধীনতাকে ব্যাখ্যা করছেন আমার অসহায়তার জন্য আমি তার সাথে? আপনার স্বামী আমাকে এখানে জোর করে ধরে আনেননি? আমি কখনোই ভাবতে পারি না আপনি মন্দ। কিন্তু রাবণ আমার সাথে যা করেছেন তা কখনোই ক্ষমাযোগ্য নয়... তিনি একজন পাষণ্ড ...’
‘আপনি সতর্ক হন আপনার শর্ত আরোপের ক্ষেত্রে সীতা। আপনি তার সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তিনি আপনার স্বামীর থেকে একেবারেই আলাদা। আপনি যে তার সম্পর্কে এ কথা বলছেন তিনি আপনার সাথে কোন খারাপ আচরণ করেছেন? আপনি এখানে আরো ভালো অবস্থায় আছেন। আপনি যে তাকে এতটাই ভর্সনা করছেন তিনি কিন্তু একবারও আপনার সামনে আসেননি।’
সীতার চোখ দিয়ে জল পড়ে এবং তাকিয়ে থাকে অদ্ভুতভাবে। ‘আপনি বলুন রাবণ আমাকে বিবাহ করতে চাননি! রাক্ষসী ভদ্রমহিলা গল্প করছিলেন। তিনি বলছিলেন রাবণ অপেক্ষা করছেন আমার স্বামীর মৃত্যুর জন্য। তারপর তিনি আমাকে অন্তঃপুরে নিয়ে তুলতেন। আপনার খুব ভাল লাগত তা দেখতে। একটা কথা রানি মন্দোদরী, আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস আমার স্বামীর জন্য। যদি আপনার স্বামী আমাকে স্পর্শ করতেন তাহলে আমি নিজেকে শেষ করে ফেলতাম সে মুহূর্তে।’
সত্যটা সীতা যা বলেছে তাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা মন্দোদরীর নেই। তিনি বাস্তব সত্য কথা বলেছেন, যাকে তাচ্ছিল্য করে এসেছে কয়েকমাস আগে। তার জীবনটা যেন স্থির হয়ে গেছে। মন্দোদরী ভাবে দশানন এরূপ ভাবতে পেরেছে কারণ সে তার স্বামীকে প্রকৃত সত্যটা জানায়নি। যদি মন্দোদরী সত্যটা তাকে জানাতে পারত তবে কী সীতাকে অন্তঃপুরে রাখতে পারতেন! তখন দশাননের জীবনে অন্য যুদ্ধ নেমে আসত। যদিও এইরকম যুদ্ধ দশানন আগেও করেছেন ইন্দ্রর সাথে। মন্দোদরী স্থির করে সীতার পরিচয় সম্পর্কে সব জানাবেন দশাননকে।
প্রায় মাঝরাতে মন্দোদরী হেঁটে যায় দশাননের কক্ষে। তিনি তখন বীণা বাজাচ্ছিলেন। মন্দোদরী দাঁড়িয়ে যায়। শুনতে শান্তিপূর্ণ লাগে।
এইরকম সুর দশানন বহুবছর বাজাননি। বহু বছর পর মন্দোদরী তার স্বামীকে বীণা বাজাতে দেখে। দশানন সর্বদা নির্জন সময়ে বীণা বাজাতে পছন্দ করেন। মন্দোদরীকে দেখে চমকে যান তিনি।
‘আহ! এই শব্দ তোমাকে এখানে টেনে আনল মন্দোদরী! তুমি এইভাবে একা দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভিতরে এসো। আমি তোমার জন্য কিছু বাজাব?’
‘আমি বিস্মিত প্রভু, আপনি কীভাবে এইরূপ বীণা বাজাচ্ছেন। যেখানে কাল যুদ্ধ হতে চলেছে।’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে।
‘আমি সেই কারণেই এই সুর তৈরি করতে পেরেছি। কাল কী হতে চলেছে কি হবে কাল তা জানিনা। আজকের রাত এত অন্ধকার কেন? হয়তো যুদ্ধের জন্য।’
‘প্রভু আপনি যুদ্ধের সূচনা নিয়ে এত ভাবেন না?’ ফিসফিস করে বলে মন্দোদরী।
তিনি দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং বলেন, আমি সর্বদা সৎ থাকি তোমার সাথে মন্দোদরী। আমার কোন যুদ্ধের মধ্যে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিলনা আমি এই রাজত্ব অত্যন্ত অহংকারের সাথে চালিয়ে আসছি। কোন মানুষ আমাকে অবহেলা, অসম্মান করার সাহস পায়নি। প্রতিশোধের কারণে আমি হারিয়েছি আমার পুত্র, আমার প্রজা। আমি এতদূর এগিয়ে গেছি যে পিছিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। আমার গর্ব কিন্তু অহংকার না। তুমি একবার বলেছিলে আমার অহংকার আমাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে। তারা একে অপরের দিকে এগিয়ে যায়। তিনি রানির হাত নিজের কাছে নিয়ে চুম্বন করেন।
‘তাহলে আপনি এখনও কেন ঘুমাননি প্রভু?’
‘যুদ্ধচলাকালীন কেউ তোমার মত আমার কাছে আসেনি। আমার ভূমি, আমার ভাই সবাই আমার বিপক্ষে। তারা সবাই আমার প্রবেশদ্বারের সামনে। আমি বাধ্য যুদ্ধ করতে। হয় আমি তাদের হত্যা করব না হয় আমাকে হত্যা করবে।’
‘প্রভু, আপনার কী মনে হয় কতদিন ধরে যুদ্ধ চলবে?’
মন্দোদরীর প্রশ্নে হেসে ওঠে দশানন, ‘খুব দীর্ঘ নয়, তুমি শান্তিতে বিশ্রাম নাও।’
মন্দোদরীর কিছু গোপন মুহূর্তের কথা মনে পড়ে যায়। তার মনে পড়ে সেই মুহূর্তে। জানিয়ে দেওয়া উচিত যদিও অনেকটা দেরি হয়ে গেছে তবুও বিশ্বাস করবেন কিনা জানে না মন্দোদরী।
‘আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই । বহুদূরে বলতে চাইছে কিন্তু কিছু বলা হচ্ছে না ।
‘কী কথা মন্দোদরী?’
‘আমি জানিনা কী ভাবে শুরু করব।’
মন্দোদরীর ঠোঁট কেঁপে ওঠে ভয়ে। এমন ঘটনা তার জীবনে আগে কখনো ঘটেনি ।
‘আমি আপনার থেকে গোপন রাখতে চাইনি। কিন্তু আমি একথা বলার আগে মনে রাখতে হবে আমি ইচ্ছা করে গোপন রাখতে চাইনি এটা বুঝতে হবে। কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু পরিস্থিতির স্বীকার আমি।
আমি জানি না আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন কিনা। আমার কথা আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা তাও জানিনা। কিন্তু আমি এই রাতে আপনাকে সব কথা জানাতে চাই। না হলে আর বিলম্ব হবে।
‘আমি তোমাকে আমার থেকেও বেশি বিশ্বাস করি। তুমি একমাত্র যে সম্পূর্ণরূপে আমাকে চেনো মন্দোদরী। সুতরাং তুমি কি বলতে চাও। আমি তোমাকে কোন প্রশ্ন করব না কেন তুমি একদিন লুকিয়ে রেখেছিল।’
‘ঘটনাটি ঘটে আপনার ন্যায়নন্দিনীকে বিবাহ করার পর। তখন ঋষি ঘৃতস্পদা এখানে থাকতেন। আমি আপনার এক সন্তানের মা। আমি সুস্থ হওয়ার পর জানতে পারি আমি সে সময় বিষ গ্রহণ করেছিলাম। আপনার সাথে বিরোধের ফলে ঋষি ঘৃতস্পদার মৃত্যু হয়। আমি সে সময় নিজের দিকে তাকাতে পারিনি। আমি চিকিৎসককে জানাই আমার দুর্বলতার কথা এবং অদ্ভুত লক্ষণের কথা। তিনি আমায় জানান আমি সন্তানসম্ভবা এবং আমার সন্তান ওই বিষের দ্বারা আক্রান্ত। আমি তখন মাইকে ডেকে পাঠাই সাহায্যে জন্য। কিন্তু আমি বদ্রিকাশ্রম পর্যন্ত যেতে পারি। আমি সেই সময় তীর্থযাত্রার যেতে চেয়েছিলাম এই কারণে যাতে আমার সন্তান সুস্থ ভাবে পৃথিবীতে আসতে পারে। আবার শরীর আমার বিপথে চলে যায়। আমার শরীরে কোনো রকম অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা যায়নি। আমি বুঝতে পারলাম তখন আমার সাত মাস। এক রাতে ভারতবর্ষের এক প্রান্তে আমি জন্ম দিই কন্যা সন্তানের।’
‘তুমি এক কন্যার জন্ম দিয়েছে? আমাদের প্রথম সন্তান আর তুমি তাকে গোপন করেছ?’ দশানন প্রশ্ন করেন এবং মন্দোদরীর গলার মধ্যে কী যেন বিঁধে থাকে ।
‘শুনুন প্রভু আমার পুরো কথা। সে জন্ম নেয়নি। তার হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যায় জন্মাবস্থায়। আমরা অপেক্ষা করে যদি নিঃশ্বাস চালু হয় কিন্তু সে নড়াচড়া করে না। বুকে পাথর চাপা দিয়ে তাকে একটা পাত্রের মধ্যে মাটি চাপা দিয়ে রেখে আসি। আমি বলতে পারব না আমার মধ্যে বয়ে চলা অপরাধবোধ। আমার সর্বদা মনে হতো আমি আমাদের প্রথম সন্তানকে বাঁচাতে পারিনি কিন্তু এখন এইভাবনা মনে করার কারণ আছে। ‘তুমি কীভাবে আমার কাছে গোপন করলে মন্দোদরী? এটাতো তোমার সন্তান ছিল না আমারও সন্তান ছিল।’
আমি জানি প্রভু, আমি গোপন করেছি কারণ আমি ভেবেছিলাম আপনি জানলে আগেই হত্যা করতে চাইবেন। আমি লুকিয়েছিলাম কারণ আমার সন্তান প্রতিবন্ধী ছিল তাই।"
দশানন আরো অধৈর্য হয়ে পড়ে, ‘কিন্তু আমাদের সন্তান মৃত। এত বছর ধরে মন্দোদরী সেকথা আমাকে জানাওনি কেন?’
‘কারণ আমাদের সন্তান এখনও বেঁচে আছে আমি জানতাম না।’ মন্দোদরী জানায়। দশাননের চোখ রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। দুচোখ ভরে যায় জলে, ‘এখনো বেঁচে আছে। তাহলে, তুমি আমাকে মিথ্যে বলে সর্বদা...’
‘আমি জানতাম আমি তাকে আবার দেখতে পাবো। সে যখন আমাকে বলে কী করে তাকে মিথিলা মাটিতে খুঁজে পাওয়া গেছে। সেই আপনার যুদ্ধের প্রধান কারণ-সীতা আপনার কন্যা।
দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মন্দোদরী বুঝতে পারে দশানন তাকে কিছু বোঝাতে চাইছে। দশাননের শরীরে তীব্র ঝাঁকুনি লাগে। তার মুখ ক্রোধে, দুঃখে ভরে যায়। মন্দোদরী নিজেকে সংযত করে রাখে।
ভুল বুঝবেন না প্রভু। আপনি যখন তাকে এখানে নিয়ে আসেন আমি জানতাম না সীতা আমাদের কন্যা। তার সাথে সাক্ষাতের পর জানতে পারি এবং তার হাতে জন্মচিহ্ন দেখে আমি নিশ্চিত হই যে সীতা আমার সন্তান। আমি ভাবতেই পারিনি সে আবার বেঁচে ফিরতে পারবে। আমি বলতে চেয়েছি ততবারই ভয় পেয়েছি। আমি অপেক্ষা করেছি রাম তাকে খুঁজে বার করবে কিন্তু তিনি অনেক সময় নিয়ে নিয়েছেন। সীতা যত থাকতে শুরু করে আপনার তার প্রতি বিবাহ করার আগ্রহ জন্মায়। আমি অপেক্ষা করি সঠিক সময় আপনাকে জানাবো বলে।
দশানন মন্দোদরীর দিকে ফিরে তাকায়। একটা শব্দ বলে না, ‘লঙ্কেশ্বর, আমি আপনার কাছে ভিক্ষা চাইছি আপনি কিছু বলুন।’
‘আমি কাল যুদ্ধ করতে চলেছি। আমি অনুরোধ করছি আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য মন্দোদরী।’
এর থেকে ভালো সময় আর ছিল না প্রভু। এটাই উপযুক্ত সময়। এই সত্য আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। এর থেকে বড় সত্য আর পৃথিবীতে নেই। আমি আমার ভাগ্যকে আপনার হাতে ছেড়ে দিলাম প্রভু।’
এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মন্দোদরী। সে জানেনা দশানন এই সত্য জানার পর কীভাবে নেবে। দশানন প্রথম থেকেই চাইতেন তার এক কন্যাসন্তান হোক। কিন্তু সেই সন্তান যে সীতা তা কল্পনাও করতে পারেনি। নিজের অজান্তেই দশানন এক ভুল করে ফেলেছে। সেই ভুলকে মর্যাদা দেবে নাকি রাষ্ট্রের মর্যাদা দেবে দশানন, তা জানা নেই মন্দোদরীর। দশাননকে বড় অচেনা লাগে তার। সন্তানের পিতৃত্ব খবর যখন জানতে পারে তখন এক মহা অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন