সীতা হরণ ও মন্দোদরী

পারমিতা চক্রবর্তী

মন্দোদরী দশাননের উত্তরের অপেক্ষা করে। কিন্তু দশানন...

‘প্রভু আপনি মনে করে দেখুন সেই ক্ষেত্রে সীতার কোনো দোষ ছিল কিনা এবং যা হয়েছে মীনাক্ষীর সাথে তাতে সীতার কোন দোষ আছে কিনা। আপনি তার স্বামীকে দোষারোপ করুন অথবা তার ভ্রাতাকে শাস্তি দিন কিন্তু সীতাকে এর মধ্যে জড়াবেন না কোন ভাবে।’

‘কেন মনে হচ্ছে আমি তাকে জড়াচ্ছি? সে আমার শত্রু নয়।’ দশানন বলেন।

‘কিন্তু আমি জানি আপনার পরিকল্পনা তাকে নিয়েই। আপনি কি ভাবছেন প্রভু? দয়া করে বলুন।’

‘বিশ্বাস করো মন্দোদরী আমি এই মুহূর্তে কিছুই ভাবছি না। আমি আগে তাকে দেখতে চাই তারপর যা সিদ্ধান্ত নেবার নেব।’

যদি আমি প্রশ্ন করি আপনি কী ভুলতে পেরেছেন আজও? কত বছর আগে সীতার স্বয়ম্বরের ঘটনা। আপনি এখন কী তার প্রতিশোধ নিতে চান?’

‘যদি তুমি বিশ্বাস করো আমি আমার উপলব্ধির জন্য প্রতিশোধ নিতে চাইছি তাহলে আমাকে ভুল ভাববে। এই প্রতিশোধ সম্পূর্ণ মীনাক্ষীর জন্য নেওয়া। সেই ঘটনা আমার মনে রয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু আমার ভগিনীর সাথে যা হয়েছে এটা তার কাছে কিছুই নয়। তারা অলিখিতভাবে আমার শত্রু হয়ে উঠেছে। ওই দুই ভ্রাতা শুধুমাত্র আমার ভগিনীর নাক, কান কাটেনি তারা লঙ্কার সম্মানকে আঘাত করেছে। আমি আজ্ঞাবহ তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।’

‘আমি একজন পুরুষের সাথে যা করতে পারি তার থেকেও আরো নৃশংস হতে পারি নারীর ক্ষেত্রে। তুমি কী ভাবে এই অধ্যায়কে সমাপ্ত করতে চাইছ যেখানে একজন নারী জড়িত?’

মন্দোদরীর নিজের মধ্যে আরও একবার নড়ে ওঠে। দশাননের গুণাবলীর কথা মনে পড়ে যায়। মন্দোদরী ভাবে লঙ্কায় বিবাহ হয় রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে এবং তার স্মরণে আসে অন্তঃপুরে মহিলাদের নিয়ে দশাননের মনোভাবের কথা। মন্দোদরী যে ভালোবাসার জন্য এত কথা বোঝাতে চায় দশাননকে সে ভালোবাসাই বিকৃত মনে হয়। দশানন প্রতিমুহূর্তে তাকে যে ভাবে অপমান করে তা প্রায় জোর করেই মেনে নেয়।

‘আমি খুব শীঘ্রই ফিরে আসব। আমার প্রতিহিংসা রাম ও লক্ষণের উপর। আমি কোনমতেই সীতার ক্ষতি চাইনা।’ দশানন মন্দোদরীকে কথা দেয় ওই দুই ভ্রাতাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে। তার আক্রোশ রাম ও লক্ষণের উপর। সীতাকে নিয়ে তিনি একটুও চিন্তিত নন। দশানন এরপর পুষ্পক বিমানে করে মামা মরিচনেরে সাথে রওনা দেন। সাত দিন পর এক রক্ষী জানায় মন্দোদরীকে দশাননের পুষ্পক বিমানকে দেখা যাচ্ছে ফিরে আসতে। নানাশ্রী, বিভীষণ, সরমা, মেঘনাথ এবং ধন্যমালিনী সবাই মিলে উপস্থিত হয় বিমান অবতরণ কেন্দ্রে।

‘লঙ্কেশ্বর আপনি ফিরে আসছেন এই সংবাদ জানালেন না। আমি আশা করি সবকিছুই কুশল আছে।’ ধন্যমালিনী আকাশে বিমান উড়ন্ত অবস্থায় কথাগুলি বলে।

‘লঙ্কেশ আসতেই চাইছিলেন না। আমি তাকে বাধা দিই। কিন্তু তিনি আমার কোন কথাই শুনতে চাইছিলেন না। দশানন চরম বিপজ্জনক অবস্থায় ছিলেন। আমি আনন্দিত তিনি ফিরে এসেছেন।’ নানাশ্রী ধন্যমালিনীর কথায় যোগদান করেন।

বিমান ধীরে ধীরে নেমে আসে। দশাননকে প্রথম দেখা যায়। তার পিছনে এক তরুণীকে দেখা যায়। পরনে আলুথালু বেশ।

‘প্রভু কে এই রমণী? ইনি কি সীতা?’ সরমা বর্ণনা করে।

মন্দোদরীর হৃদয় কম্পিত হয়। সে তার কাছে যায় এবং পিছে পিছে হাঁটতে থাকে। প্রশ্ন করে মন্দোদরী দশাননকে, ‘কে উনি?’

‘তিনি সীতা।’ মৃতস্বরে দশানন উত্তর দেন। তিনি তার রক্ষীকে জানান, ‘এনাকে শান্তি ভবন নিয়ে যাও এবং সর্বদা পর্যবেক্ষণে রেখো।’

মন্দোদরী রাগে অগ্নিশর্মা হয়, ‘সীতাকে লঙ্কায় এনেছেন কেন প্রভু? ইনি কেমন ভাবে আপনার সাথে এলেন?’ মন্দোদরী রাগার্ত স্বরে কথাগুলি বলে।

‘সীতা স্বইচ্ছায় আমার সাথে আসেন নি।’ দশানন সঠিকভাবে উত্তর দেয় না মন্দোদরীকে।

‘সুতরাং কী ভাবে উনি এলেন প্রভু? আপনি কী অপহরণ করে এনেছেন? আমার আপনাকে জিজ্ঞাসা করার অধিকার নেই ঠিকই তাও প্রশ্ন করলাম।’

দশাননকে দেখে মর্মাহত লাগে। তিনি উত্তর দেন, ‘এটাই একমাত্র পথ প্রতিশোধ নেবার।’

‘না প্রভু এটা সঠিক পথ নয়। আপনি এই ভাবে অন্যের স্ত্রীকে অপহরণ করে আপনার ভগিনীর উপর হওয়া অপরাধের প্রতিশোধ নিতে পারেন না। আমি কোনভাবেই আপনাকে সমর্থন করতে পারছি না এক্ষেত্রে।’ মন্দোদরী তাকিয়ে থাকে মেঘনাদের দিকে যাতে সে, তার পিতার করা অপরাধের বিরুদ্ধে কিছু বলে।

‘আমরা এই কাজ করেছি শুধুমাত্র সঠিক বিচার পাবার আশায় নয় মন্দোদরী। আমরা শুধুমাত্র প্রতিশোধ নিয়েছি।’ দশানন একথা বলে চলে যান।

কিছুক্ষণ পর সবাই মিলিত হয় রাজদরবারে। মন্দোদরী সবার কাছে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে। সে একাই অপহরণের বিরুদ্ধে যায় এবং সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করে প্রতিশোধ নেবার এটা সঠিক পদ্ধতি নয়। কিন্তু কেউই দশাননকে এই নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস পায় না।

‘প্রিয় প্রভু লঙ্কেশ, আপনার সীতাকে অপহরণ করার সিদ্ধান্ত আমাকে আঘাত করেছে। আমাদের কথোপকথন অনুযায়ী যতদূর স্মরণ হয় কোথাও তাকে অপহরণ করা হবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’

‘আমি শুধু ভেবেই চলেছি আমরা কোনো ভাবেই সীতাকে অপহরণ করে প্রতিশোধ নিতে চাইনি। যদি কোনভাবে রাম ও লক্ষ্মণ তাকে খুঁজতে আসেন আমি নিশ্চিত তখন আমি তাদের ধ্বংস করতে পারব। তারা আমার ভগিনীকে অসম্মান করেছে এবং আমি তাদের থেকে সীতাকে আলাদা করেছি।’

‘লঙ্কেশ মারিচনের কী হলো? তিনি কেন ফিরলেন না আপনার সাথে?’ নানাশ্রী ফিসফিস করে প্রশ্ন করেন।

‘মামা মারিচন আর ফিরতে পারবেন না আমার কাছে এই সংবাদ পাঠানো হয়েছে। তাকে ধরে ফেলেছিল রাম। তিনি কোনভাবেই পালাতে পারেননি। তাকে হত্যা করে ওরা।’ দশানন ঘোষণা করেন।

অভাবনীয় সংবাদ। কেন এমন হলো এবং আপনি যখন সীতাকে অপহরণ করলেন তখন তার কাছে রক্ষী ছিল না?’ প্রশ্ন করে নানাশ্রী।

‘আমি যখন তাকে অপহরণ করি, সেখানে কোনও রক্ষী ছিল না।’ দশানন বর্ণনা করেন।

"যখন আমরা দণ্ডকে পৌঁছাই আমাদের তাদের চিনতে একটা গোটা দিন লেগেছিল। আমরা নিজেরাই নিজেদের নিন্দা করতে থাকি এত সময় লাগার জন্য। আমি আমার বিমানকে অনেক দূরে লুকিয়ে রাখি যাতে তারা আমাদের আবিষ্কার করতে না পারে। তাদের গৃহের চারপাশে আবরণ দেওয়া ছিল এবং গৃহটিকে খুব শক্তভাবে বানানো হয়। চারিদিকে ছিল দেওয়াল। বেশিরভাগ সময় লক্ষণ বাইরে পাহারা দিত। আমি তাকে সঠিকভাবে ধ্বংস করতে পারতাম কিন্তু সেইসময় দেখতে পাই রামকে, যে আমাদের অনেক মানুষকে হত্যা করেছে। তাই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি। পরের দিন সকালে আমি দেখি সীতাকে কাজ করতে গৃহের আশেপাশে। সেখানে আগুন জ্বালিয়ে তাতে জল দিয়ে নেভাতে এবং তার হাতে একটা বড় পাত্র দেখা যায়। লক্ষ্মণ সর্বদা তাকে পাহারা দিয়ে রাখত। এটা বোঝাই গেল লক্ষ্মণ বৌদিকে এক মিনিটের জন্য একা ছাড়ত না। হঠাৎ দেখি রাম গৃহের মধ্যে ঘুমাচ্ছেন তীর-ধনুক পাশে নিয়ে। সীতা শীঘ্রই ফিরে আসে সেখানে এবং লক্ষ্মণ আবার পাহারা দিতে চলে যায়। এইভাবে আমরা তাদের তিনদিন পর্যবেক্ষণ করি। প্রতিদিনই দেখি একই রকম ঘটনা।’

‘কিন্তু কেন সীতা? আপনারা কেন রাম অথবা লক্ষ্মণকে অপহরণ করলেন না?’ বিভীষণ প্রশ্ন করেন।

‘বোঝার চেষ্টা করো বিভীষণ। আমি সেখানে গিয়েছি মীনাক্ষীর অপমানের প্রতিশোধ নিতে। তারা আগে থেকেই সতর্ক ছিল এবং আমাদের ধ্বংস করার ফাঁদ পাতা ছিল। আমাদের আক্রমণ করার সময় তারা তাদের আত্মরক্ষার পন্থা তৈরি করে রেখেছিল। যদি আমি তাদের উপর আক্রমণ করতাম তাহলে সঠিকভাবে বিচার করা হতো না। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সীতাকে অপহরণ করা হবে। রাম তাকে পাবার জন্য সমস্ত রকম পন্থা অবলম্বন করবেন, লক্ষ্মণ তার দাদার জন্য যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত হবে। যদি তারা এখানে খুঁজতে আসে আমি তাদের নতজানু করে এনে উপস্থিত করব আমার ভগিনীর সামনে।’

‘সে তো আমারও ভগিনী। আমিও খুব সচেতন তার ব্যাপারে।’ বিভীষণ বলেন।

‘তাহলে তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো।’ দশানন বিভীষণকে জানায়। বোনের প্রতি আপমান যেন তার শরীরের প্রতি অঙ্গে প্রত্যঙ্গে মিশে যায়।

‘প্রভু আপনার সীতাকে অপহরণ করার সিদ্ধান্তে একজনের প্রাণ চলে গেছে। মামা মরিচনের মৃত্যুকে আপনি কি বলবেন? মন্দোদরী দশাননকে প্রশ্ন করেন।

মন্দোদরী এতদিন চুপ থাকলেও সীতার অপহরণকে কোনভাবেই মানতে পারেনি। একজন নারীকে অপহরণ করা তার সম্মানে কতখানি আঘাত এনেছে তা বুঝতে পারে না দশানন ।

‘এটা তার ভবিতব্য। আমি কোনরকম পরিকল্পনা করে করিনি। আবার মন্দোদরীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন ।

‘আমি চেয়েছিলাম লক্ষ্মণ ও রামের থেকে তাকে আলাদা করতে। কিন্তু তা প্রাচীরের মধ্যে গিয়ে করা সম্ভব হয়নি। আমি মামা মারিচনকে বলেছিলাম জন্তু-জানোয়ার, গাছের ডালপালা চলাচল করার আওয়াজ পেলে লক্ষ্য রাখতে। কিন্তু ঘরে যে কেউ শুয়ে আছে তা বুঝতে পারা যায়নি। ফলস্বরূপ লক্ষ্মণ সারা বন জুড়ে খুঁজে বেড়ায় আর রাম তার স্ত্রীর সাথে থাকে। লক্ষ্মণ আমাদের কৌশল অনুসরণ করে যায়। মামা মারিচন পরের দিন সকালে ফিরে আসেন। লক্ষ্মণ তাকে ধরতে অসমর্থ হয়।

আমরা আবার তার পরের দিন সকালে চেষ্টা করি এবং এই সময়ে রাম খুঁজতে বেরোয় আমাদের কিন্তু লক্ষণ তার বৌদির সাথে ছিলেন না। সীতা একাকী ছিলেন। মামা মারিচন ব্যস্ত ছিলেন রামের কারণে। এক সন্ধ্যায় দশানন দেখেন লক্ষ্মণ ও সীতা নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছে, কিন্তু সবকিছুর থেকেও সীতা তার স্বামীকে নিয়ে বেশী চিন্তিত ছিল। বার বার প্রাচীরের সামনে এগিয়ে আসে তাকে দেখার জন্য। শেষত সূর্যাস্তের আগে দেখা যায় লক্ষ্মণের ভুল। যার জন্য রাম তাকে ফেলে চলে গেছিলেন। সেই সুযোগে আমি সীতাকে অপহরণ করি। আমার নিজেকে ব্রাহ্মণ বলতেই ঘৃণা লাগে। আমি নিজেই নিজের হাতকে স্তোত্র বাক্য দিতে পারছিলাম না প্রাচীরের পাশে দাঁড়িয়ে। সীতা প্রথমে প্রাচীরের বাইরে আসতেই ইতস্তত বোধ করছিল। আমি তাকে বলি বাইরে বেরিয়ে না আসলে তাকে অভিশাপ দেবেন তিনি। ব্রাহ্মণের অভিশাপের ভয় পেয়েই সীতা চলে আসেন। তখনই আমি তার হাত ধরে বিমানে তুলে নিই। সেই পথ দিয়ে আসার সময় আমি একজনের কান্না শুনতে পাই যেখান দিয়ে মামা মারিচন দৌড়ে গেছিলেন। আমি বুঝলাম এই কণ্ঠস্বর তারই। দুঃখের বিষয় এটাই তার শেষ চিৎকার।’

সবাই স্তব্ধ হয়ে যায় মামা মারিচনের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে।

‘এই কাজ সঠিক হয়নি প্রভু। তিনি আমাদের শক্রর কাছে মারা গেছেন বললেন।’ মন্দোদরী অনুতপ্ত হয়।

‘আমি আশা করিনি এইভাবে তার মৃত্যু হবে। কিন্তু আমার এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোন বিকল্প পথ ছিলনা।’ দশানন বলেন।

‘ভারত দশানন এর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? সীতা রাজা জনকের কন্যা। তিনি আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন?’ বিভীষণ প্রশ্ন করেন।

‘এত ভয় কেন পাচ্ছ বিভীষণ? মিথিলা যথেষ্ট ছোট রাষ্ট্র, লঙ্কার মত এত বড় নয়। তারা আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেনা। আর সীতা এখন রামের। জনক সরাসরি এর মধ্যে জড়াবেন না। তাকে অন্তঃপুরে রাখার ব্যবস্থা করো। মীনাক্ষীকে খবর দাও সবকিছু জানিয়ে। দশানন বলে চলে যান।

সীতাকে একটা পাখির মত বন্দী করা হয়। মন্দোদরী তার প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে। একজন নারী যার কোন দোষ না থাকা সত্বেও দোষী। মন্দোদরী তাই মানতে পারেনি। মীনাক্ষীও দশাননের এই বিচারকে মানতে পারেনি। সে চেয়েছিল দুই ভ্রাতা শাস্তি পাক।

মাতা কৈকেসী তার মেয়ের অখুশি হওয়াকে মানতে পারেনি। দশানন তার জন্যই এত বড় বিপদ ঘাড়ে নিয়েছেন এবং কঠিন সমস্যার মধ্যে পড়েছেন।

পরদিন মন্দোদরী ভালো, ভালো কাপড় দিয়ে পাঠায় দাসীকে সীতার কাছে। যাতে কোনরকম গুজব রানির বিপক্ষে না ছড়ায়। সীতাকে অন্তঃপুরে রাখাটাও মেনে নিতে পারেনি মন্দোদরী।

মন্দোদরীর দাসী ফিরে আসে জামা-কাপড়গুলি ফেরত নিয়ে। ‘অনেক ধন্যবাদ এগুলির জন্য, আমি ভীত এইগুলো নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

‘তিনি এখন আমাদের কাছে বন্দী হতে পারে কিন্তু তাকে অপহরণ করা হয়েছে। তার কাপড় অন্যধরনের সুতো দিয়ে বানানো তাই তিনি রানির পাঠানো জামা-কাপড় নিতে অসমর্থ হয়।’

‘হুম... তাহলে তিনি থাকবেন কী ভাবে?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে।

‘আপনার কৃপা রানি, তার চোখ কেঁদে কেঁদে ফুলে উঠেছে। কোন রকম খাবার নিতে চাইছেন না এবং যে কাপড় আপনি পাঠিয়েছেন সেগুলো নিতে চাননি। যখন আমি তাকে জানাই এই কাপড়গুলো রানি পাঠিয়েছেন শুনে কৃতজ্ঞ হন। কিন্তু তিনি এখন অপহৃত হয়ে আছেন তাই জানান আমাকে।’

‘কি মনে হয় তোমার আমার কী তার সাথে সাক্ষাৎ করা উচিত? আমি ভাবছি তাকে অন্য কোথাও রাখা যায় কিনা শীঘ্রই। তাকে কোন ভাবে অন্তঃপুরে রাখা ঠিক হবে না। এই অন্তঃপুর পুরুষ দ্বারা রক্ষিত। তাকে এখানে রাখা নিরাপদ নয়।’

‘আমি আপনার সাথে সহমত। রক্ষীরা যারা জানেন না তাকে তারা তাকে বন্দিনীর চোখে দেখবেন। তিনি রক্ষিতা, তাকে জয় করে পুরস্কার পাননি দশানন।’

মন্দোদরী দাসীদের তৎপর হতে বলেন সীতা থাকার জায়গা পরিবর্তনের জন্য। সে সীতার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়। মন্দোদরীকে সবাই সতর্ক করে দেয় সীতার সাথে বাক্যালাপের সময়।

‘আমার কথা, মনোভাব আপনার দুঃখকে প্রশমিত করতে পারবেনা কিন্তু আমি দুঃখিত সমগ্র ঘটনার জন্য। আপনি কোন অন্যায় না করেও শাস্তি পেয়েছেন। আমি ক্ষমা চাই আমার স্বামীর কৃতকর্মের জন্য।’

তিনি চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকেন ঘরের এক কোণে। মন্দোদরী তার পাশের দাঁড়ায়। লম্বা কেশ মুখের অর্ধেক অংশ ঢেকে দেয় এমন ভাবে থাকেন সীতা। যাতে কেউ তাকে দেখতে না পায়। তিনি বিবাহিতা। মাথায় সিঁদুর,লম্বা কেশ, কোমল ত্বক,আকর্ষণীয় চোখ,নাক রাজকন্যার মত, ঠোঁট ধনুকের মতো। সীতা অপূর্ব সুন্দরী। কিন্তু এই ঘটনার ফলে তার মুখের চিত্র পরিবর্তিত হয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আলুথালু হয়ে যায় তিনি। তার বয়স মেঘনাদ এর মত হবে। গায়ে কোন অলংকার নেই, হাতে এবং গলায় শুধু অলংকার, তার শাড়ি কুঁকড়ে গেছে। সীতা প্রাণপণ নিজের সৌন্দর্য্যকে ঢাকার চেষ্টা করে কিন্তু চলন, ত্বক, নাক সবটাই রাজকন্যার মত। হাত জড়ো করে ধনুকের মত মাথা নিচু করে বসে থাকে।

‘আমার সাথে হওয়া ঘটনা ভোলার নয়। তাতে আপনার কোন দোষ নেই। আমি খুবই কৃতার্থ আপনার, আমার প্রতি ব্যবহারে দ্বারা রানি।’

‘আমি শুনলাম আপনি খাদ্য গ্রহণ করতে, বস্ত্র গ্রহণ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছেন। আমি আপনার জন্য আরো ভালো থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি ...’

‘আমি এখানে থাকতে চাই না। বাঁচতে চাইনা। আপনার স্বামী যখন আমাকে স্পর্শ করেছেন তখনই আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছিল কিন্তু আমি পারিনি আমার স্বামীর জন্য। আমি পুষ্পক বিমান থেকে ঝাঁপ দিতে চাইছিলাম, কিন্তু আমি আমার জীবন শেষ করতে পারলাম না। কারণ আমাকে বাঁচতে হবে প্রতিমুহূর্তে আমার স্বামীর জন্য। প্রতিদিন আমি তার জন্য অপেক্ষা করে চলেছি কখন তিনি আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করবেন।’

এ কথা শুনে মন্দোদরীর নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। রাজার কন্যা বড় হয়েছে বিলাসিতার মধ্যে। বিবাহের পরই তারা বনবাসে এসেছেন তেরো বছরের জন্য। বনবাসে এসেও তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শুধুমাত্র এই ঘটনার কারণে। সীতা এমনিতেই নানা পরিস্থিতির স্বীকার।

‘এটা আপনার জন্য খুব সহজ নয় তবু আমি আপনার জন্য আমার তরফ থেকে শ্রেষ্ঠ কিছু জিনিস করার চেষ্টা করব।’ মন্দোদরী সীতাকে নিশ্চিন্ত করেন।

‘কেন? আপনি তো তার স্ত্রী আপনি কেন আমাকে সাহায্য করবেন?’

‘কারণ আমি গভীরভাবে বিধ্বস্ত। আমি স্বীকার করি আমার স্বামী যা করেছেন সঠিক করেননি। তিনি আপনাকে এইভাবে এখানে নিয়ে এসে সঠিক কাজ করেন নি। কিন্তু তিনি প্রথম নন আপনাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবার।’

‘প্রতিশোধ নেবেন? আমাদের তরফ থেকে কে প্রতিশোধ নিয়েছে?’

‘আপনার স্বামীর রাম এবং তার ভাই লক্ষ্মণ। রাম আমাদের অনেক মানুষকে হত্যা করেছে এবং লক্ষণ তার সাথে ছিল। তারা লঙ্কাপতি রাবণের বোন মীনাক্ষীকে চরম অপমান করেছে। তার সাথে চরম অসভ্যতা করেছে লক্ষ্মণ।’

‘সীতা মন্দোদরীকে বোঝানোর চেষ্টা করে।’ আমার স্বামী খুনি নন এবং আমি খুবই লজ্জিত লঙ্কাপতি রাবণের ভগিনীর সাথে যা হয়েছে তার জন্য। কিন্তু রাবণ আমাকে অপহরণ কেন করলেন?’

‘আমার কাছে এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই এবং আমি আপনার তরফ থেকে কোনো ত্রুটি খুঁজে পাইনি। আমার স্বামী এখন আপনার শত্রু কিন্তু আমি নই। আমি চাই আমার তরফ থেকে যাতে কোনো ভুল না হয়।’

‘আমি খুবই দুঃখিত লক্ষ্মণের কার্যকলাপের জন্য। আমি যদি সঠিক সময়ে সেখানে থাকতাম তবে অবশ্যই এইরূপ কার্যকলাপ হতে দিতাম না ওই নারীর সাথে। লক্ষ্মণ নিজে ধৈর্য্য হারিয়েছে সহজেই...আমি যখন শুনি ঘটনাটা তখন আমার কিছু করার ছিল না। রানি ওই নারীর মনের পরিস্থিতি আমি বেশ বুঝতে পারছি।’

‘এই সমস্ত চিন্তা লঙ্কাপতি রাবণের...’

সীতা মুহূর্তের মধ্যে ভাবতে থাকে, ‘আমি সম্পূর্ণ সহমত আপনি যা বলেছেন ...

আমরা ঠিক শত্রু না আপনাদের। আমি গর্বিত আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবার জন্য। আপনি কত কিছুর প্রস্তাব দিয়েছেন আমাকে।

‘আমি কী আপনাকে কোন রকম সাহায্য করতে পারি বর্তমানে?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে।

‘হ্যাঁ আমি এখন বনবাসে এবং বন্দীদশায়। আমি সারাদিন দুইবার ভোজন করি। আপনি আমার জন্য ভোজনের যে ব্যবস্থা করেছেন তা অত্যন্ত সম্মানজনক আমার কাছে। কিন্তু আমি কোন প্রকার প্রতিহিংসা পরায়ণ অর্থাৎ আমিষ ভোজন গ্রহণ করি না। আমি সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোজন করি। আমি স্বচ্ছন্দবোধ করি হাল্কা ভোজন যেমন ভাত, ফল ইত্যাদি।

‘আমি সত্যিই দুঃখিত আপনার খাবার তালিকা না জেনে খাদ্য প্রেরণ করার জন্য। আমি অবশ্যই চেষ্টা করবো আপনার পছন্দের খাবার পাঠাতে।’

‘ধন্যবাদ আপনাকে। আমি বড়ই কৃতার্থ। কী বলে ডাকি আপনাকে?’

এই কথাগুলো মন্দোদরীর মনকে নাড়া দেয়। তিনি সত্যিই সাধারণ নয়। একজন প্রতিভাবান নারী।

‘মন্দোদরী আমার নাম।’

চারিদিকে গুজব রটে যায় দশানন রামকে হত্যা করে তার স্ত্রীকে বিবাহ করবেন। মন্দোদরী এই নিয়ে চিন্তিত হয়। তাদের কাছে ভারতবর্ষ এবং রাম নিয়ে কোন প্রকার সংবাদ ছিল না। সবাই জানে রাম, লক্ষ্মণ খুবই শক্তিশালী, কিন্তু তাদের কাছে এত ক্ষমতা নেই যে লঙ্কা আক্রমণ করবেন। তারা সত্যিই জানেন কিনা জানা নেই মন্দোদরীর, রাবণ সীতাকে অপহরণ করেছেন। মন্দোদরীর মতই ধন্যমালিনী, ন্যায়নন্দিনী সীতাকে নিয়ে চিন্তিত হন। তারা প্রত্যেকেই আলোচনা করে সীতাকে কীভাবে নিরাপদ ভাবে রাখা যায়।

‘আপনার কী মনে হয় এটা সঠিক কাজ হবে সীতাকে অন্তঃপুরে রাজার তত্ত্বাবধানে রাখা। তাহলে গুজব ছড়ানোর আরো ইন্ধন পাওয়া যাবে।’ ন্যায়নন্দিনী বলেন এবং মন্দোদরী সায় দেয়।

ধন্যমালিনী প্রশ্ন করে, ‘তাহলে তাকে কোথায় রাখা যায়? তিনি কোনোভাবেই রানিমহলে থাকতে পারেন না। তাহলে তাকে কোথায় রাখা যাবে?’

‘আমি নিশ্চিত নই এ ব্যাপারে। ব্যক্তিগতভাবে তাকে শান্তিভবনে রাখার আমার কোনো পরিকল্পনা ছিল না এবং তারপর তার পরিণতি যদি হয় ঋষি ঘৃতস্মদার মত তখন... আমি তাকে অন্য কোথাও রাখার কথা ভাবতেই পারছিনা।’

আমার মনে হয় আমাদের উচিত উনি এখন যেখানে আছেন প্রাথমিকভাবে তাকে কোন প্রাসাদে স্থানান্তরিত করা। তিনি অপেক্ষারত তার স্বামীর জন্য আর দশানন অপেক্ষারত তার শত্রুর জন্য। আমাদের একটা অপেক্ষাঘর কিম্বা বিশ্রামাগার বানানো উচিত লঙ্কায়। ধন্যমালিনী মজা করে।

‘তাকে অন্তঃপুরে রাখা হোক মন্দোদরী।’ দশানন একথা বলেই প্রবেশ করেন সেখানে তিন রানি আলোচনা করছিল।

‘আমি তো আগেই বলেছি অন্তঃপুর কিংবা শান্তিভবনে রাখা হোক। এই ভবন রাখা হয়েছে বিভিন্ন কাজের জন্য। এই ভবন মূলত ...’

‘প্রভু এখানে তার থাকার উপযুক্ত জায়গা নয়। তিনি বিবাহিতা।’

‘আপনি কী তাকে বিবাহ করতে চান?’ ন্যায়নন্দিনী চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ‘আমি এমন কোন কিছুই চাইনা।’ দশানন বলে তাকিয়ে থাকেন তারদিকে।

‘আমার মধ্যে কী কোনো প্রভাব ফেলে না। চারিদিকে যা গুজব রটছে।’ ধন্যমালিনী প্রশ্ন করে।

‘আপনি বলছেন আপনি বিবাহ করতে চান না সীতাকে!’ মন্দোদরী বলে।

‘আমি তেরো বছর আগেই বলেছি মন্দোদরী। আমি তার স্বামীকে নিয়ে চিন্তিত। আমার যদি সেই ইচ্ছা থাকতো তবে পূর্বে সীতাকে বিবাহ করতে পারতাম অর্থাৎ তাকে প্রস্তাব দিতে পারতাম। এই সময় আমি তার স্বামীকে হত্যা করে তবে বিবাহ করব।’ একথা বলেই দশানন চলে যান।

এই সিদ্ধান্তে মন্দোদরী সহ সকল রানিদের হতবাক করে দেয়। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। দশানন তিন রানি তাদের স্বামীর সিদ্ধান্তের হতবাক হয়ে যায়। তারা আলোচনা করে এবং বলাবলি করে, ‘আমাদের স্বামী চতুর্থ স্ত্রী আনতে চলেছেন।’ ধন্যমালিনী বলে।

‘সঠিক বলেছ। গুজব সত্যি চিন্তায় ফেলেছে দশাননকে। দশানন সীতাকে নিয়ে ভাবতে বসেছেন।’

‘আমি আবার সীতার সাথে সাক্ষাৎ করব।’

‘এই মুহূর্তে এই ভবনে থাকাটা আপনার জন্য সঠিক হবে না। আপনি চাইলে আমি এই স্থানটিকে আপনার ব্যক্তিগত কক্ষ করে দিতে পারি।’

‘আপনি সত্যিই খুব ভালো। কিন্তু আমি আবারো আপনাকে বলছি আমি বন্দিনী এবং বনবাসে আমার স্বামীর মত। আমি এখানে কোন প্রকার বিলাসিতায় থাকতে পারবোনা। আমি গত তেরো বছর ধরে অরণ্যে বাস করছি। এর থেকে বেশী কিছু আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না। আমি অরণ্যে আছি এমন ভাবে এখানে থাকতে থাকতে চাই। আমি কাঠ, জঙ্গল আকাশ, পাখি এই সব কিছু অনুভব করতে চাই। আমি কোন ছাদের নিচে থাকতে চাই না।’

‘কিন্তু আপনি কীভাবে এখানে থাকবেন?’

‘ভাববেন না আমি এখানে সারা জীবন থাকব না। আমার স্বামী খুব শীঘ্রই আমাকে খুঁজে বের করবে এবং আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে।’ তিনি এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলে মন্দোদরীর দেখে খুব ভালো লাগে। তার বিশ্বাস দেখে মন্দোদরী আশ্চর্য লাগে, ‘আপনি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন যে তিনি আপনাকে খুঁজতে আসবেন এখানে? তিনি তো জানেন না আপনি লঙ্কায়।’ মন্দোদরী তাকে পরীক্ষা করতে চায়।

‘তিনি আসবেন আমি নিশ্চিত। তিনি খুঁজতে আমাকে দক্ষিণে আসবেনই। আমি আসার আগে তার জন্য কিছু নিদর্শন ছেড়ে আসি। যখন আমাকে বিমানে তোলা হয় আমি আমার গয়না ফেলে আসি মাটিতে পথ নির্দেশ করার জন্য।’

তার শান্ত, উদার, শৈশব মাখানো প্রচেষ্টার কথা শুনে ভালো লাগে মন্দোদরীর। তিনি এতটাই আশাবাদী ছিল তার স্বামীর কাছে যাবার জন্য যে নানান রকম ভাবতে থাকে। যা সম্ভবপর নয় তার জন্য।

মন্দোদরী চেষ্টা করে যাতে কোনো রকম সমস্যার মধ্যে পড়তে না হয়। সীতা তার স্বামীর কাছে ফেরত যাওয়ার জন্য প্রচন্ড উদগ্রীব হয়ে পড়ে।

‘আমি সত্যি মন থেকে চাই আপনি আপনার স্বামীর কাছে ফিরে যান।’

‘আপনি ঠিক আমার মা'র কথা মনে পড়িয়ে দিলেন মন্দোদরী। তিনিও আপনার মত মমতাময়ী। আমি তার সাথে প্রায় তেরো বছর দেখা করিনি বনবাসে থাকার জন্য। কিন্তু আজ যেন মনে হচ্ছে আমি তার সাথে রয়েছি।’

সীতার উষ্ণ ভালোবাসায় মন ভরে যায় মন্দোদরীর। তিনি সীতাকে আশীর্বাদ করে।

‘আপনার মাতা ... আপনার পিতা ...আমি শুনেছি তারা আপনাকে খুব ভালোবাসেন।’

‘হ্যাঁ তারা আমাকে খুবই ভালবাসেন। আমি তাদের দ্বারা পালিত। তারা খুব খুশি আমাকে পেয়ে। মাতা একবার আমাকে বলেছিলেন কীভাবে যজ্ঞ'র মাধ্যমে আমাকে পেয়েছেন। মাতা বলেন আমাকে তারা পেয়েছেন ভূমি মা’র থেকে।’ সীতা বলার সময় হেসে ওঠে, ‘আমি এখন বুঝতে পারি তারা এই গল্প কেন বলেছেন। যখন আমায় আনা হয় শোনা যায় আমি তখন একটি পাত্রে পড়েছিলাম। যেটি মাটি দ্বারা আবৃত। যারা আমাকে চায়নি, তারা এই ভাবে ফেলে রেখে চলে যায়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমি বাঁচতে ইচ্ছুক এবং আমার স্বামীর সাথে সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছুক।’

সীতার এই কাহিনী যেন আঘাত করে মন্দোদরীকে। তার মনে পড়ে যায় সন্তান হারানোর কথা। স্মৃতি যেন মন্দোদরীকে আঘাত করে। মন্দোদরীর মনে বারবার প্রশ্ন আসে সীতার জন্মকাহিনী নিয়ে।

‘আপনার পিতা আপনাকে কীভাবে পান?’

আমার পালিত মাতা, পিতা এবং রানি সুনয়না এবং রাজা জনকের আমি ছাড়া কোন সন্তান ছিল না। আমাদের রাজত্ব ছিল মূলত মাতৃকেন্দ্রিক। তিন বছর ধরে সেখানে কোন বৃষ্টি হয়নি। আমার পিতা এক যজ্ঞ'র আয়োজন করেন। এই যজ্ঞ'র একটি অঙ্গ হল জমিকে কর্ষণ করা। সুতরাং বৃষ্টি নামে আকাশ জুড়ে। জমি খুঁড়তে খুঁড়তে আমার পিতা এক বাচ্চার কান্না আওয়াজ শুনতে পান। তিনি মাটি সরিয়ে আমাকে দেখতে পান তখন তিনি সবাইকে জিজ্ঞাসা করেন এই সন্তান কার অর্থাৎ এই সন্তানের মাতা পিতা কে? তিনি প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করেও কোন উত্তর আসে না। তখন তিনি বুঝতে পারেন এই সন্তান, মাতা পিতা দ্বারা প্রত্যাখ্যাত। পিতা গর্ব করে বলেন আমাকে তিনি লাঙ্গলের দ্বারা কর্যণ করে পেয়েছেন তাই আমার নাম রাখেন ‘সীতা’।’

মন্দোদরীর কাছে সব পরিষ্কার হয়ে যায় সে নিজেকে দেখতে পায়। এমনই এক ঘটনা ছিল ছাব্বিশ বছর আগে। তার জীবন থেকে একমাত্র কন্যা সন্তানে হারিয়ে যায়। কেউ সে কথা জানে না। যে সন্তান জন্মের আগে মৃত, সে জীবিত এই সত্য তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই সন্তান আজ তার কাছে দাঁড়িয়ে। মন্দোদরী আগে বুঝতে পারেনি। তাকে দেখে মনে হয়েছিল কোথাও যেন তাকে দেখেছে।

মন্দোদরী তার কক্ষে ফিরে যায় এবং সবকিছু মনে করার চেষ্টা করে। উত্তরের অপেক্ষা করে বসে থাকে। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে তার কন্যা। যার জন্য সে একমাত্র দায়ী। মন্দোদরী নিজেই নিজেকে বোঝাতে পারেনা। একটা ভালোলাগা, অপরাধবোধ জাগে মনের মধ্যে। যে সন্তানকে ফেলে রেখেছিল কত বছর আগে সেই তার সামনে দাঁড়িয়ে। আবার ফিরে যায় সীতার কাছে। মন্দোদরী আলাদা এক জগতে বিরাজমান থাকে। তার ডান হাত স্পর্শ করে। ধীরে ধীরে সীতার কনুই স্পর্শ করে কাপড় সরিয়ে দেখে সেই কালো দাগ যা দেখেছিল বহু বছর আগে। মন্দোদরী পুরো স্তব্ধ হয়ে যায়। কী করে সেই মৃত সন্তান আবার জীবন ফিরে পায়। যাকে রেখে এসেছিল মাটি চাপা দিয়ে সেই সীতা। তার প্রথম কন্যা। প্রথম দিন থেকেই তাকে খুব চেনা লাগে কিন্তু সেই চেনা যে তার রক্তের তা বুঝতে পারেনি। তার চোখ-মুখ সর্বত্র স্পর্শ করে দেখে মন্দোদরী।

যে সন্তানের কথা কাউকে বলেনি মন্দোদরী এ যাবৎ অবধি তার কথা এখন কি ভাবে জানাবে দশাননকে। এ এক অভাবনীয় পরিস্থিতির স্বীকার সে। বহুকষ্টে যে সত্য লুকিয়ে রেখেছিল সেই সত্য আজ সামনে উপস্থিত। সেই সত্য হল সীতা তার কন্যা।

সকল অধ্যায়
১.
অহল্যা, দ্রৌপদী, সীতা, তারা, মন্দোদরীপঞ্চসতীর প্রতি নিবেদন
২.
সূচনা
৩.
বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী
৪.
বিবাহ পর্যায়ে মন্দোদরী
৫.
দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ ও মন্দোদরী কথা
৬.
বজ্রজলা ও মন্দোদরী
৭.
অমৃতের সন্ধানে দশানন ও তার প্রতিক্রিয়ায় মন্দোদরী
৮.
দশানন, বালী ও মন্দোদরী
৯.
মহান্ত, মাতা কৈকেসী ও মন্দোদরী
১০.
মন্দোদরী ও ঋষি ঘৃতস্মদা
১১.
আত্মশ্লাঘা ও মন্দোদরী
১২.
জীবন সন্ধিক্ষণে মন্দোদরী
১৩.
মন্দোদরী ও দশানন
১৪.
মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ
১৫.
মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন
১৬.
যোদ্ধা মেঘনাদ
১৭.
মেঘনাদের বিবাহ ও মন্দোদরী
১৮.
দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী
১৯.
সীতা হরণ ও মন্দোদরী
২০.
বানর ও লঙ্কা
২১.
অহিরাবণ
২২.
যুদ্ধে মেঘনাথ ও মন্দোদরী
২৩.
লঙ্কার রানি মন্দোদরী
২৪.
ফিরে দেখা
২৫.
ঋণ স্বীকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%