ফিরে দেখা

পারমিতা চক্রবর্তী

লঙ্কার সবকিছু স্থির হয়ে যায়। এমন হওয়ার ছিল না কিন্তু যা হলো তা দুর্ভাগ্য। রাম এবং রাবণের যুদ্ধ লোকমুখে প্রচারিত হল চারিদিকে। কেউ কেউ বলে রাবণ হল প্রকৃত রাজা যদিও তিনি অনৈতিক খলনায়ক। রাম যুদ্ধে রাবণকে পরাজিত করেছিলেন একেই সবাই ঈশ্বরের দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। এই জয় ন্যায়ের, তাকে এখন সবাই ‘মর্যাদাপুরুষোত্তম’ নামে চেনেন। রামকে সবাই বিষ্ণুর অবতার মনে করে। লঙ্কার মানুষ রামকে মানতে পারে না কারণ সে তাদের প্রিয় রাজাকে কেড়ে নিয়েছে। তারা কখনোই এই শাসন চায়নি। তারা বেঁচে থাকতে চেয়েছিল মাত্র।

চার মাস পর সীতা রামকে ছেড়ে চলে আসে। সে নৈতিকতার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। এটা সবাই মনে করে রাম তার রাজত্বের জন্য সীতাকে ত্যাগ করেছিলেন। এই দুঃখজনক সংবাদ শোনামাত্র মন্দোদরী হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

রাম সীতাকে শাস্তি দিয়েছিলেন, লক্ষ্মণ তাকে রাজত্বের বাইরে রেখে আসেন। রাম এই কাজ করে কী ঠিক করেছিলেন? যুদ্ধ, হত্যা, প্রথা যুক্তিযুক্ত নয়। চোদ্দ বছর বনবাসে থাকার পরও একজন নারীকে প্রত্যাখ্যাত হতে হলো পিতা-মাতা থেকে এবং সর্বশেষে স্বামীর থেকেও। সে কখনোই জানলো না তার প্রকৃত পিতৃপরিচয়।

সে যা করেছে তাতে এই পরিণতি প্রাপ্য ছিল না। কেউ রামের অন্য স্ত্রীদের এবং ভ্রাতাদের কাছে জানতেও চায়নি তারা কি চায়। ধন্যমালিনী তার পিতার তত্ত্বাবধান থেকে ফিরে আসে ক্রিকূটে, মন্দোদরীকে সহচর্য দেবার জন্য। ন্যায়নন্দিনী তার পরিবার নিয়ে সমুদ্র অতিক্রম করে ফিরে আসে। নানাশ্রী বিভীষণকে পরামর্শ দিতে থাকেন যেমন রাবণকে দিতেন। মন্দোদরী নিজেকে নিয়োজিত করে মেঘনাদের পুত্রকে বড় করার জন্য যে লঙ্কার উত্তরসূরী।

কেউই মন্দোদরীর কাছে জানতে চায়নি সে কী চেয়েছিল! কিংবা তার জীবনের ঘটনাগুলো কীভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। তাকে সবাই ‘লঙ্কার রানি’ রূপে চিনেছিল।

লঙ্কার ইতিহাসে মন্দোদরী এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র রূপে উল্লেখিত থাকবে। রাবণের অনেক রানি, মহিলার সাথে সম্পর্ক থাকলেও মন্দোদরী ছিল তার পরম আশ্রয়, ভালোবাসা। সর্বদা সে কষ্ট করে গেছে রাবণকে সঠিক পথে চালনা করতে। একটা অপরাধবোধ সর্বদা তাকে কুড়ে কুড়ে খেত কন্যা সন্তান জন্মের খবর রাবণকে জানায়নি বলে। কিন্তু সে মনে প্রাণে বিশ্বাস করত কোন একসময় সে এ কথা বলবেই তাকে। একই সাথে ভয় কাজ করত এই সংবাদ শুনে রাবণের প্রতিক্রিয়া কী হবে তা ভেবে! কিন্তু যখন এই সংবাদ না জানালে রাবণ কোন বড় ভুল করতে পারে তখন সবকিছু জানিয়ে দেয় মন্দোদরী।

বিভীষণকে মন্দোদরী স্বামী রূপে মানেনি কোনভাবেই। তিনি ছিল শুধুমাত্র লঙ্কার রাজা। প্রজাদের জন্য মন্দোদরী এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় কারণ লঙ্কা তার কাছে সন্তানসম। লঙ্কার মানুষ শুধু না শাস্ত্রে,বাস্তবে মন্দোদরীকে পঞ্চ সতীর এক সতী মনে করে। তার এই অবদানকে পবিত্র রূপ ধরা হয়। রাজত্বের জন্য স্বামী, পুত্র সবই ছাড়তে হয়েছিল মন্দোদরীকে। তারই আত্মত্যাগকে মনে রেখেছে সবাই।

সকল অধ্যায়
১.
অহল্যা, দ্রৌপদী, সীতা, তারা, মন্দোদরীপঞ্চসতীর প্রতি নিবেদন
২.
সূচনা
৩.
বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী
৪.
বিবাহ পর্যায়ে মন্দোদরী
৫.
দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ ও মন্দোদরী কথা
৬.
বজ্রজলা ও মন্দোদরী
৭.
অমৃতের সন্ধানে দশানন ও তার প্রতিক্রিয়ায় মন্দোদরী
৮.
দশানন, বালী ও মন্দোদরী
৯.
মহান্ত, মাতা কৈকেসী ও মন্দোদরী
১০.
মন্দোদরী ও ঋষি ঘৃতস্মদা
১১.
আত্মশ্লাঘা ও মন্দোদরী
১২.
জীবন সন্ধিক্ষণে মন্দোদরী
১৩.
মন্দোদরী ও দশানন
১৪.
মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ
১৫.
মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন
১৬.
যোদ্ধা মেঘনাদ
১৭.
মেঘনাদের বিবাহ ও মন্দোদরী
১৮.
দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী
১৯.
সীতা হরণ ও মন্দোদরী
২০.
বানর ও লঙ্কা
২১.
অহিরাবণ
২২.
যুদ্ধে মেঘনাথ ও মন্দোদরী
২৩.
লঙ্কার রানি মন্দোদরী
২৪.
ফিরে দেখা
২৫.
ঋণ স্বীকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%