পারমিতা চক্রবর্তী
আমাদের এই সমাজে মন্দোদরী চরিত্র পাওয়া যায় ঘরে ঘরে। পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে নারীদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম চলে আসছে যুগ-যুগান্ত ধরে। সেই সংগ্রামে সর্বদাই আমরা নিজেদেরকে দেখতে পাই তাই কখনও নিজেকেও মন্দোদরী মনে হয়।
দশানন ফেরার পরও মন্দোদরীর জীবনে বয়ে যায় অন্ধকার স্রোত। চোখে ভেসে ওঠে বেদাবতীর মৃত্যু। মন্দোদরী স্থির করে সাক্ষাৎ করবেন মহান্ত’র সাথে। মহান্ত হলেন মুখ্য যাজক লঙ্কার। মন্দোদরী তার সাথে দেখা করতে চায় বেদবতীর মৃত্যুর পুরো ঘটনা জানার জন্য।
মহান্ত বৃদ্ধ মানুষ। তিনি শুধুমাত্র দিন এবং রাত্রি চোখে দেখেন এবং এটা মনে করা হয় যে তার মধ্যে ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে। যার দ্বারা তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেন। মানুষ তাকে বলেন মায়াবী। তার ভবিষ্যৎবাণী মিথ্যা হয় না। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন কুবেরের পরিবর্তে দশাননের জয়জয়কার হবে চারিদিকে। মন্দোদরী তার বিশ্বস্ত দাসীকে সাথে নিয়ে মহন্ত’র সাথে দেখা করতে যায়।
শ্রদ্ধেয় মহান্ত আমি আপনার পরামর্শ চাই। আমি আমার স্বামীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আপনি বলুন কী করে তাকে রক্ষা করা সম্ভব? আপনি আমাকে দিকনির্দেশ করুন।
নিশ্চয়ই ... আমি আপনাকে দশাননের স্ত্রীরূপে দেখি লঙ্কার রানি রূপে নয়। আপনার স্বামী সম্প্রতি একটি ব্যথার মধ্য দিয়ে চলছেন। তার মধ্যে এক পবিত্র আত্মা জাগ্রত হয়েছে সেটাই তাকে রক্ষা করবে। সেই আত্মাই আপনি!
মহান্ত আমরা এক বড় ভুলের সম্মুখীন হয়েছি এবং আমার স্বামী তার জন্য এক অভিশাপ বহন করে চলেছেন। এর প্রতিকার কী?
মহান্ত মৃদু হেসে – ‘অনুতপ্ত! তার ক্রিয়াকর্মের জন্য? তাহলে তিনি এখানে আপনার সঙ্গে কেন আসেননি নাকি তিনি বিশ্বাস করেন না বৃদ্ধ মানুষের কথা?’
মন্দোদরী দশাননের দোষ প্রাণপণ কার চেষ্টা করে কিন্তু দশাননের চরিত্র পুরো লঙ্কাবাসীর কাছে পরিষ্কার। কিন্তু দশানন...
‘কে বেশি মূর্খ রানি? তার অভিশাপ নিয়ে বেশি চিন্তিত আমি, ইহা সত্যি হবে! সেই নারী দশাননের মৃত্যুর কারণ হবে।’
‘কীভাবে ...কী ভাবে আমি রক্ষা করব ঘটনার থেকে?’
‘আপনি যেমন আপনার অতীতকে পরিবর্তন করতে পারেন না তেমনই আপনার ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে পারেন না। আপনি খুব বড় বীর পুত্রের জননী হবেন শীঘ্রই। সেই হবে শিবের একমাত্র প্রতিবন্ধক। তাকে ‘অতি মহারথী’ নামে ডাকা হবে। কিন্তু আপনার প্রথম বর অনুযায়ী আপনি আপনার স্বামীর দ্বারা প্রতারিত হবেন।’
‘আমার প্রথম বর? আমার পুত্র? কী ধরনের প্রতারণা মহান্ত?’ মন্দোদরী তাকিয়ে থাকে আরো উত্তর পাবার জন্য মহান্ত’র থেকে কিন্তু তিনি চোখ বন্ধ করলেন। মন্দোদরী চায় তিনি আরো বেশি তার সাথে কথা বলুক কিন্তু তিনি ধ্যানে বসলেন। তিনি অনেক কথাই বললেন কিন্তু কোন কথায় পূর্ণ হল না। মন্দোদরী স্থান ত্যাগ করে।
লঙ্কা পরবর্তীকালে খুব জনপ্রিয় এক রাজত্ব হল। দশানন অনেক রাজ্য জয় করলেন এবং দখল করলেন বহু সম্পদ ও রমণী। তিনি বিভিন্ন রাজ্য থেকে সুন্দর, সুন্দর রমণী কিনে আনলেন। দশানন ভাবতেন অন্তঃপুর হল একটি আশ্রয় যা ভারতবর্ষের আশ্রিত নাগা উপজাতির নারীদের জন্য। এছাড়াও এখানে উওরের গান্ধর্বী, দেবতার দাসী, অন্ধকার জগতের রাক্ষসী, অসুর কন্যাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে সমস্ত রাজ্যগুলো তিনি জয় করতেন সেই রাজ্যের রাজকন্যা এবং রানিরাও থাকতেন অন্তঃপুরে। তারা মূলত ভারতবর্ষে পশ্চিমপ্রান্ত থেকে আসত। অন্তঃপুরে কিন্নরা উপজাতির নারীর থাকতেন ভারতবর্ষের পূর্ব প্রান্ত থেকে আসা।
দশাননের ধন-সম্পদ এবং নারী সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পায়। যার প্রভাবে দশানন আরো লোভী এবং চাহিদা বেড়ে যায়। তিনি বহু রাত কাটাতেন অন্তঃপুরে নারীদের নিয়ে। কিছু মাস অতিক্রান্ত হবার পর অন্তঃপুরে মহিলা সংখ্যা ভয়ংকর ভাবে বর্ধিত হয় যা মন্দোদরী গুনে শেষ করতে পারত না। নানাশ্রী এবং মাতা কৈকেসী অন্ধ ছিলেন তাদের পুত্রের এরূপ কার্যকলাপে। রাতের পর রাত দশানন মাদকাসক্ত হয়ে থাকতেন অন্তঃপুরে। একটা সময় পর অন্তঃপুর হয়ে উঠল সুরাপানের গুপ্তশালা।
মন্দোদরীকে সবথেকে বেশি হতবাক করল, ধন্যমালিনীর স্বভাব। সে পূর্বে কখনই কোন নারীর প্রতি দশাননের আসক্তি নিয়ে কোনো অভিযোগ করত না। এই ধরনের বহুগামিতা প্রথা উপজাতিদের মধ্যে আগেই প্রচলিত ছিল। সে নিজেই পছন্দ করত এই সুরা পান, জুয়াখেলা, যৌন-সহবাস। মন্দোদরী এই সব থেকে দূরে থাকত। সে পছন্দ করত না বলে অন্য সকলের থেকে দূরে থাকত।
প্রায় চার মাস হল দশানন মন্দোদরীর কক্ষে আসতেন না। প্রতি রাতে মন্দোদরী প্রতীক্ষা করত দশাননের জন্য। দিন দিন মন্দোদরী একা হয়ে পড়ল। কিছু রাত মন্দোদরী নিজের বিছানায় কাটিয়ে দিতেন অন্তঃপুর থেকে আসা বিভিন্ন আওয়াজ শোনার মাধ্যমে। এইসময় মন্দোদরী রাজদরবারের কোন কাজই করত না। সেই সময় তার স্বভাব কিছুটা হিংসুটে এবং পরশ্রীকাতর হয়ে ওঠে। তখন মন্দোদরীর কানে ভেসে আসত অন্তর থেকে আনন্দ, হাসির সুরাপাত্র ঠুংঠাং আওয়াজ। এই আওয়াজগুলো যেন তাকে আরো একাকী করে দিত।
সারা আকাশ জুড়ে বর্ষার মেঘ ছেয়ে থাকত। বর্ষায় লঙ্কায় প্রতিদিন বৃষ্টিপাত হয়। দশানন একদিন সকালে মন্দোদরীকে দেখতে আসলেন বহু দিনের প্রতিক্ষার পর। মন্দোদরী ভাবল তার উচিত উষ্ণ অভ্যর্থনা করার, কিন্তু যখন রাজাকে দেখত তার মনে রাগ, অভিমানের মাত্রা আরও বেড়ে যেত।
‘স্বাগত প্রভু পুরানো কক্ষে। কী এমন প্রয়োজনীয়তা পড়ল যার জন্য আপনাকে আমার কক্ষে আসতে হলো?’ মন্দোদরী কিছুটা অবজ্ঞার স্বরে কথাটা জানায়।
‘তুমি আমাকে দেখে খুশি হওনি মন্দোদরী?’
‘আমি অবাক হয়েছি প্রভু। আমার স্বামী প্রায় চার মাস পর আমার কক্ষে এসেছেন যা দেখে মনে হয় যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর দুই রাজার মধ্যে সমঝোতা হয়েছে।’
‘তুমি কিসে সুখী হবে মন্দোদরী এবং আমাকে উপহাস করছ? তোমার স্বামী কী তোমার কাছে উপহাস করার যোগ্য?’
‘আমি সুখী হয়েছি এই কারণেই যে আপনি আমার কক্ষে অতিথির মত এসেছেন।’ দশানন মন্দোদরীর কথোপকথন ও বিদ্রুপ করা প্রসঙ্গে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়।
‘আমার মনে হয় আমার অন্য সময় আসা উচিত ছিল। এই সময় আমাদের কথা বলার জন্য উপযুক্ত সময় নয়।’ একথা বলেই মন্দোদরীর কক্ষ ত্যাগ করার জন্য এগিয়ে যায় দশানন।
‘আমাদের মধ্যে আর ভালো সময় কোনদিনও আসবে না প্রভু? আপনি যা বলতে এসেছিলেন তাই বলুন।’ মন্দোদরী দশাননের সামনে এসে উপস্থিত হয় এবং তার চোখের দিকে তাকায়, ‘বলুন প্রভু, মন্দোদরী আপনাকে কীভাবে সাহায্য করবে?’
‘আমি উত্তরপশ্চিম প্রান্ত থেকে আসা প্রস্তাব নিয়ে চিন্তিত। ওখানকার রাজারা আমার সঙ্গে সন্ধি করতে ইচ্ছুক পরিবর্তে তারা তাদের কন্যাদের বিবাহ দিতে চান আমার সাথে।’
‘আপনি কী স্থির করলেন প্রভু?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে ।
‘আমি স্থির করেছি আমি তাদের বিবাহ করব। আমি আর পাঁচ দিনের মধ্যেই ফিরে আসব।’ একথা বলেই দশানন স্থান প্রস্থানের জন্য উৎগ্রীব হন।
‘আপনি যদি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন স্থির করেছেন তবে আমার কাছে আসার কারণ কী?’ মন্দোদরীর মাথা আগুন জ্বলে ওঠে।
‘কারণ শেষবার তুমি অসুখী হয়েছিলে যে আমি তোমাকে জানাইনি এবার আমি তোমাকে অগ্রিম জানিয়ে যেতে চাই এবং আমি তোমাকে মনে করাতে চাই শুধুমাত্র রাজত্ব ও সন্ধি স্বার্থে আমি কন্যাদের বিবাহ করতে বাধ্য হতে হচ্ছি।’
মন্দোদরী উপহাস করে বলেন, ‘আপনি কেন আপনার আসল উদ্দেশ্য লোকাচ্ছেন আমার কাছে লঙ্কেশ্বর? বিবাহ মানে একের অধিক অংশীদার আপনার রাজত্বে। আপনি অপর একজন নারীকে বিবাহ করলেন কিনা তাতে আর কিছু এসে যায় না। কারণ অন্তঃপুরে একশোর অধিক নারীর সাথে রাত্রিবাস করেন আপনি প্রভু!’
‘তুমি এমন কথা কেন বলছো মন্দোদরী?’ দশাননের গলায় তীক্ষ্ণতা আরো বেড়ে যায়।
‘কারণ এগুলো আমার হৃদয়কে যন্ত্রণা দেয় প্রভু। আমাকে ব্যথিত করে এটা দেখে আমার স্বামীকে রোজ রাতে একাধিক নারীর সাথে রাত্রিবাস করতে হয়। আপনার এই বিষয়গুলি এতদিন যাবৎ ভালোলাগে কী করে প্রভু? আপনার কী মনে হয় না এবার পরিসমাপ্তি দেওয়া উচিত? আপনি যদি এই স্বভাবগুলোকে ছাড়তে নাই পারেন তবে আমাকে কেন বিবাহ করছেন প্রভু? আমার পিতা তো আপনার সাথে কোন প্রকার সমঝোতা করেননি? লঙ্কার সাথেও করেননি। এই বিবাহ হয়েছে আপনার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে ...
সুতরাং কেন? কেন আপনি আমাকে আঘাত দিয়ে চলেছেন?’
‘আমি তোমাকে বিবাহ করেছি তার কারণ আমি তোমাকে ভালবাসি বলে মন্দোদরী এবং আমি এখনও তোমাকেই ভালোবাসি।’ দশানন মন্দোদরীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।
‘আমি ঠিক পাঁচ দিনের ব্যবধানে ফিরে আসব। তুমি যথাযথ ব্যবস্থা করে রেখো অন্তঃপুরে তার থাকার।’ বলেই চলে যান দশানন।
মন্দোদরী নিজের মনকে প্রশ্ন করে যে তার মধ্যে কী কোনো সৌন্দর্য্য নেই দশাননকে আটকে রাখার! কোন ক্ষমতাই নেই তার মধ্যে। দশানন মন্দোদরীকে যদি মন থেকে ভালবাসতেন তবে তার জীবনে এত নারীর উপস্থিতি কেন থাকবে। অন্তঃপুরে দিনদিন নারীর সংখ্যা বেড়েই যায় আর তার সাথে বেড়ে যায় দশাননের উশৃঙ্খল জীবনযাত্রা।
দশাননের যখনই বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দরকার হত আগে মন্দোদরীর কাছে ছুটে আসত। বহু সময় তারা কাটিয়েছে একসাথে কিন্তু পরবর্তীতে সেটুকুও বন্ধ হয়ে যায়। নারী, সুরাই তার জীবন হয়ে ওঠে। অন্তঃপুর থেকে ভেসে আসে নারীদের হাসি, চিৎকারের আওয়াজ। কোন নারী কোন কোন দিন দশাননের কাছে থাকবে সেই নিয়ে তাদের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা। এদিকে মন্দোদরীর দু চোখে অন্ধকার নামে। রাজ দরবারে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। মাতা কৈকেসীও আসে না তার কাছে। নিজেকে অপরাধী মনে করে সে। নিজের ওপর রাগ বেড়ে যায়। মন্দোদরীর দুচোখ রোজই খোঁজে দশাননকে একবার দেখার জন্য। ক্রমশ সে শিশুর মতো হয়ে যায় দশাননকে দেখার জন্য। দশাননের অনুপস্থিত সময় তাদের কাছে আসেন এক অতিথি। তার নাম ঘৃতস্মদা। তিনি একজন ঋষি ভৃগু সপ্তর্ষিমণ্ডল পরিবারের।
তিনি জলযাত্রা করে আসেন এবং কিছুদিন বিশ্রাম নিতে চান লঙ্কায়। মাতা কৈকেসী তাকে অভ্যর্থনা করেন এবং অতিথিশালায় থাকার ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু তিনি অনুরোধ করেন আরও নির্জন জায়গায় থাকার জন্য। মন্দোদরী তাকে প্রস্তাব দেয় যে তিনি দশাননের গুপ্ত কক্ষে থাকার জন্য। মাতা কৈকেসীর নির্দেশমত মন্দোদরী নিজের সব আয়োজন সম্পন্ন করেন। মন্দোদরী লক্ষ্য করেন ঋষির চোখে তার প্রতি ভালোলাগা। মন্দোদরী তার কাছে জানাতে চায় দশাননের নতুন বিবাহের কথা।
‘আমার মনে হয় আমি সর্বকাজ সম্পন্ন করেছি মাতা! আপনার কী মনে হয় সব বিষয় সঠিকমতো হয়েছে?’ মন্দোদরী বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করে মাতাকে।
‘আমি আপনার কাছে জানতে চাই অন্তঃপুরের জন্য কোন ব্যবস্থা কী আমায় করতে হবে? মাতা আপনি যদি চিন্তিত হন অন্তঃপুরে থাকার ব্যবস্থা জন্য তাহলে আমি আপনাকে বলব বিশ্রাম নিতে। আমি সবকিছু প্রস্তুত রাখব আমার স্বামীর নতুন স্ত্রীর আগমনের জন্য। এখন আপনি আমাকে যাওয়ার জন্য আজ্ঞা দিন। আমি সেই প্রাসাদে একবার যেতে চাই।’ মন্দোদরী বলে এগিয়ে যায়।
‘দয়া করে কিছুক্ষণ থাকো মন্দোদরী। আমি বুঝতে পারছি না তোমায় কি বলা উচিত। কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছি তোমার মনের অবস্থা!’
‘আপনি বুঝতে পারবেন না কারণ আপনি আপনার স্বামীর জীবনে অপর এক নারী এবং আমি মনে করি তার প্রথম স্ত্রী বুঝতে পারবে আমার যন্ত্রণা কথা!’
মাতা কৈকেসী কোন উত্তর দিতে পারে না। তিনি কিছুটা আঘাত পান মন্দোদরীর মন্তব্যের দ্বারা। তিনি ভাবেন মন্দোদরীকে তার কিছু বলা উচিত নয়।
‘আমি মনে করি দশাননের তৃতীয় বিবাহ দ্বিতীয় বিবাহের মতোই যুক্তিপূর্ণ। লঙ্কার সাথে তাদের সমঝোতা, চুক্তির জন্য দশানন এই বিবাহ করতে বাধ্য হয়েছে।’ মাতা কৈকেসী বোঝানোর চেষ্টা করেন মন্দোদরীকে।
‘আমি বুঝতে পারি আমাদের রাজত্বে সুবিধা এবং উপযোগিতার কথা। এই কথা আমি বহুবার শুনেছি এবং এই দর কষাকষিতে অনেক সম্পর্ক দূরে চলে গেছে। আজকের দিনে লঙ্কার প্রতি কার কী সম্পর্ক তা আমার কাছে কোন বিষয় না।’
‘তুমি ঠিক ভাবে কথা বলছ না।’ মাতা কৈকেসী বলেন।
‘ইহা পরিষ্কার, দশানন আপনার মতামতের দ্বারাই প্রভাবিত। যখন লঙ্কার উন্নতি এবং সমঝোতার কথা আপনি বলছেন আপনার মতামতের প্রতি প্রত্যুত্তর দেওয়া এবং এগুলোকে অভিনন্দন আমি জানাতে পারছি না। মাতা আপনি হয়ত সঠিক বলছেন কিন্তু আমি আপনার কথার সাথে একমত হতে পারছি না।’
‘তুমি কী মনে কর দশাননকে বিবাহ করার জন্য আমি প্রভাবিত করি?’ মাতা কিছুটা বিব্রত হন, ‘আমি দশাননকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছি বৃহৎ উদ্দ্যেশ্যে। তিনি তার অভিশাপকে পরিবর্তন করতে চায়। দশানন আমাদের দৈত্যকূলের গর্ব এবং তাকে দীর্ঘায়িত করার একমাত্র মানুষ। তাকে পৃথিবীতে আনার উদ্দেশ্য পরিপূর্ণতা পেয়েছে এবং এই উদ্দেশ্যে তাকে অনেক দূরে নিয়ে চলেছে তার ভালোলাগা এবং উচ্চাকাঙ্খা থেকে।
তিনি প্রতিপক্ষ ভাবেন প্রকৃতিকে কারণ যে সর্বশক্তি ক্ষমতা তার আছে, যার জন্য তিনি অমর। আমি তাই আর হতবাক হই না কে তার সাথে থাকল এবং সে নতুন কোনো সমস্যার মধ্যে প্রবেশ করল কিনা।
তুমি মনে করো আমি আমার পুত্র নিয়ে একটু চিন্তিত নই! আমি আমার গোটা জীবন ত্যাগ করেছি। আমার যৌবন, আমার বিবাহ সবটাই দশাননকে এই পৃথিবীতে আনার জন্য। আমি তোমার থেকেও তরুণী ছিলাম যখন আমার বিবাহ হয়। আমি তখন আমাদের উপজাতির পুরো দায়িত্ব একার কাঁধে নিই। আমি আমার পূর্ণ যৌবন ত্যাগ করে এমন একজনকে বিবাহ করি যিনি আমার পিতৃতুল্য। আমি আমার যোগ্য উত্তরসূরি প্রদান করি আমার উপজাতিকে। আমি জানতাম দশাননের পিতা কোনদিনই আমাকে সুন্দর দাম্পত্য জীবন উপহার দিতে পারবে না। আমি একসাথে চারটি সন্তানকে লালন পালন করতাম। ক্রমাগত চেষ্টা করে গেছি তাদের প্রধান চাহিদা গুলোকে পূর্ণ করার। তারা কোনো ভাবেই ব্রাহ্মণ রূপে মর্যাদা পায়নি। আমি ক্রমাগত আমার পুত্রকে ব্রাহ্মণদের গুণগুলোকে আয়ত্ত করার চেষ্টা করে গেছি। কারণ আমি জানতাম তার মধ্যে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। আমার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা খুব সহজ মন্দোদরী। কিন্তু তুমি কোনভাবেই বুঝবে না আমার উপর দিয়ে কী কী গেছে। দশাননকে এই জায়গায় আনতে আমাকে কতটা কষ্ট করতে হয়েছে।’ মাথা কৈকেসী কিছুটা ভেঙে পড়েন।
‘আমি শ্রদ্ধা করি আপনার সংগ্রামকে মাতা। কিন্তু এটাই আদর্শ সময় এসেছে বোঝার যে আপনার সংগ্রাম এবার শেষ হয়েছে। এর জন্য তিনি অনেক অনেক বেশি সমস্যা ও প্রতিকূলতার মধ্যে পড়ছেন। আপনি এখন বুঝতে পারছেন না কারণ আপনি স্নেহে অন্ধ। আপনার অতীত এবং বর্তমানের জন্য কোন অনুশোচনা নেই। যাইহোক আমাকে এবার যেতে হবে। আমাকে শান্তি ভবনে যেতে হবে দেখার জন্য সব ব্যবস্থা যথাযথ হয়েছে কিনা এবং আমাদের অতিথির কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা।’ মন্দোদরী চলে আসে মাতার কক্ষ থেকে। উপলব্ধি করে যে এতক্ষণ যার সঙ্গে সে মতবিরোধ করছিলেন তিনি পুত্রস্নেহে অন্ধ। তার জীবনে একাকীত্ব সম্বল। মাতা নিজের গোটা জীবন পুড়িয়ে ফেলেছেন অযাচিত দায়িত্ব কর্তব্য পালনে। তার জীবন তার সন্তানদের নিয়ে এবং আবেগে ঘিরে। তিনি তাদের সাথে থাকার চেষ্টা করবেন। মন্দোদরী মাতা কৈকেসীর পূর্বতম দিনগুলির কথা ভাবার চেষ্টা করে।
যখন দশানন ঋষি অবস্থায় ছিলেন তার ভাগ্য মোটেই প্রসন্ন ছিল না। বয়ঃসন্ধিকালে দশাননের ভাইয়েরা তাকে নিয়ে নানা বিদ্রুপ করত এবং তার হাতে ব্রাহ্মণের চিহ্ন দেখে বলতো সে অর্ধেক ব্রাহ্মণ এবং অর্ধেক দৈত্য। যখন বেদ পাঠ করতেন এবং শুনতেন তাকে বলা হতো শুধুমাত্র ব্রাহ্মণরা বেদ পাঠ করতে পারে। পরবর্তীকালে পিতা বিশ্রবা দেখেন রাবণের বেদের প্রতি আগ্রহ এবং তার পুত্রগণের আচরণ। তিনি তাদের সাবধান করেন প্রাথমিকভাবে এবং বলেন দশানন তার বংশজাত। তার অর্ধেক দৈত্যজাত সন্তানের পূর্ণ অধিকার আছে শিক্ষা গ্রহণ করার সেই সময় থেকে দশানন তাদের ঘৃণা করা শুরু করেন এবং সেই ঘৃণা, অবজ্ঞা অপমানই দশাননকে ব্রাহ্মণ এবং দৈত্যের মধ্যে অদৃশ্য এক যুদ্ধে বাধিয়ে তোলে। তখন থেকেই তার মনে দৈত্যর অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং তা কিভাবে অর্জন করতে হয় মনে মনে স্থির করতে থাকে। দশানন আরো উন্নত বিদ্যা, জ্ঞানার্জন করা শুরু করে অন্য ব্রাহ্মণদের থেকে। অন্য ব্রাহ্মণরা বিদ্যায় পরাস্ত হতে থাকে তার থেকে। দশাননের বীরত্ব অন্যান্যদের উচ্ছেদ করা শুরু করে। গুজব রটে যায় দশানন ব্রাহ্মণদের হত্যা করে রক্ত সঞ্চয় করে রাখছে একটি বড় পাত্রে। দশানন এবং তার ভাইরা কতটা মন্দ ছিল তার জন্য কোন কিছুই নির্ভর করে না তাদের গৃহে তিনি যিনি অতিথি হিসেবে এসেছেন। মন্দোদরী ঋষির দেখাশোনা করার জন্য রক্ষী এবং পরিচালক রেখে যান। মাতা কৈকেসীর নির্দেশ মতো ঋষি ঘৃতস্মদা শান্তি ভবনে থাকার ব্যবস্থাতে খুশি হন। মন্দোদরীর শান্তিভবনে প্রবেশের খবর আগেই উচ্চারণ করা হয় এবং সে প্রবেশ করে, ‘হে ঋষি, আমি অভ্যর্থনা জানাই আপনাকে। আমি মন্দোদরী।’
‘মন্দোদরী মায়াসুরের কন্যা এবং লঙ্কার রানি।’ ঋষির দিকে মন্দোদরীর তাকিয়ে বলেন। এই প্রথমবার মন্দোদরী লক্ষ্য করেন যে কেউ তাকে তার পিতাশ্রীর নামে চিহ্নিত করেছে। তার যে আরও একটি পরিচয় আছে সে ভুলেই গেছিল। মন্দোদরী লঙ্কার রানি ছাড়াও মায়াসুরের কন্যা। ঋষি খুব বেশি বয়স্ক ছিলেন না তিনি লম্বা, গায়ের রং ফর্সা এবং সুন্দর শরীর। তার হাতে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা।
‘আপনাকে আপনার পরিচিতি দিতে হবেনা। লঙ্কার মানুষ সবাই আপনাকে চেনেন। আমার মনে হয় আপনি এখানে অনেকক্ষণ আছেন। আমার কিছু কাজ বাকি আছে এখানে এবং তা শেষ হলেই আমি চলে যাব।’ জানায় ঋষি।
‘দয়া করে এভাবে বলবেন না ঋষি। আমরা সত্যিই গর্বিত আপনার আগমনে। আপনার থাকার কোন অসুবিধা হলে কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজন হলে আপনি অবশ্যই আমাকে জানাবেন।’
ঋষি মন্দোদরীর দিকে হাঁসেন, ‘এটা সত্যিই খুব মহৎ। আমি ভাবতেই পারি না যে লঙ্কার রানি এত উদার।’
‘আমি যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি আপনার কি কাজ বাকি আছে?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে। ‘আমি অবাক হচ্ছি আপনার মহিমা দেখে। লঙ্কেশ্বর এবং তার ভাইয়েরা কঠিন তপস্যা করেছেন এবং আমি ছোট একটি গবেষণা করতে চাই। যা নিয়ে আপনার আগ্রহ থাকা উচিত নয়।’
‘আপনি যদি বলতে না চান তবে কোন অসুবিধা নেই। আমাকে এবার যেতে হবে। আমার পরিচালকরা আপনার পরিচর্যা করবে।’
‘ইহা সত্যি যে লঙ্কেশ্বর ব্রাহ্মণদের রক্ত সঞ্চয় করে রেখেছে একটি বড় পাত্রে। যা চিহ্নিত হয় ব্রাহ্মণদের প্রতিশোধ হিসেবে! আপনি কি দেখেছেন?’ প্রশ্ন করেন ঋষি।
এ সম্পর্কে কিছুই জানেনা মন্দোদরী। সে শুনেছিল মাঝে মধ্যে ব্রাহ্মণদের উপর দশাননের রাগ। কিন্তু কোনমতেই জানতো না দশানন একটি পাত্রে ব্রাহ্মণদের রক্ত সঞ্চয় করে রেখেছে।
‘আমি নিশ্চিত নই এ বিষয়ে। আমি এমন কোন পাত্র দেখিনি প্রাসাদের মধ্যে।’
‘একটি পাত্র আছে। পাত্রটি বারান্দার মধ্যে রাখা আছে। আমি ভিতরে বারান্দার দিকে যাওয়ার সময় দেখেছি যে স্থানে দশানন ধনুর্বিদ্যা অভ্যাস করেন।’ ঋষি বলেন।
‘যাইহোক এরূপ পাত্র দেখলেও তাতে কি রাখা আছে তা দেখিনি এবং এখন আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে আমি রাজদরবারের কাজে যেতে চাই।’
‘অবশ্যই আপনার মহিমা। আমার কোনো ইচ্ছাই নেই আপনাকে আটকাবার। আমার জন্য এরকম একটি পাত্র চাই। দেওয়া কী সম্ভব?’ ঋষি জিজ্ঞাসা করেন।
‘অবশ্যই আমি আপনার জন্য একজনকে নিয়োগ করে যাচ্ছি যে সর্বদাই আপনার সাথে থাকবে।’ মন্দোদরী চলে যায় আর কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করে। সে বুঝতে পারে ঋষি লঙ্কার আগমনের পিছনে নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে যা মাতা কৈকেসী জানেন না। কি এই পাত্র? যা কিনা ব্রাহ্মণকূলের চিন্তার কারণ। দশাননের ঘৃণার পরিমাণ এতই বৃহৎ কিভাবে হয়! তাদের রক্ত সঞ্চয় করে রাখে। এই জাতীয় ঘৃণা প্রদর্শনের জন্য এরূপ ব্যবহার কখনই উচিত নয়। মন্দোদরী ভাবে যে দশাননের এরূপ অধঃপতনের কারণ তার মাতা। তিনি তার পুত্রকে সঠিক পথ দেখানোর চেষ্টা করেননি কোনদিন। বারবার তার লোভ, আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে গেছেন। দশানন দিনের-পর-দিন ভুল পথে পা বাড়িয়েছেন কেউ তাকে আটকায়নি বরং উৎসাহ দিয়ে গেছেন। একের পর এক নারীসঙ্গ, বিবাহ করেছেন। কোথাও কোন শৃঙ্খলতা ছিল না তার জীবনে। ভালোবাসা, প্রেম অপেক্ষা শব্দগুলো তার জন্য কোনদিনই নয়। তিনি চেনেন শুধুমাত্র রাজত্ব আর ক্ষমতা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন