মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন

পারমিতা চক্রবর্তী

মাস পরিবর্তনের সাথে সাথে ঋতু পরিবর্তন হয়। মেঘনাদের  বয়স তিন বছর হয়ে যায়। ন্যায়নন্দিনী মা হয়ে ওঠেন। তাঁর পুত্রের নাম প্রহস্ত এবং সে হাঁটতে শুরু করে। ধন্যমালিনী তখনও পর্যন্ত মা  হয়ে উঠতে পারেনি। অনেকেই বলে ধন্যমালিনীর গর্ভে কোন প্রতিবন্ধকতা আছে। দশানন কিছু পন্থা অবলম্বন করেন ওই ব্যাপারে। তিনি কিছু ঔষধপত্র এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা করেন সন্তান ধারণের জন্য। ধন্যমালিনী নিষ্ঠার সাথে সেই বিধিনিষেধ পালন করে। কিছু মাস পর তাদের প্রচেষ্টা সার্থক হয়। কিছু মাসের পর ধন্যমালিনী সন্তানসম্ভবা হয় এবং পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। তার নাম দেওয়া হয় অতিকায়া।

মন্দোদরী এবং দশাননের অন্য স্ত্রীদের  সাথে দশাননের মতবিরোধ থাকলেও সন্তানদের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। মেঘনাদকে তারা তাদের বড় ভাই হিসাবে মানত এবং অন্য ভাইদের মধ্যে তা নিয়ে বিরোধ দেখা যেত না। সকল ভাইয়েরা একসাথে খাবার খায়, খেলা করে, একসাথে ঘুমায়। মেঘনাদের বয়স যখন চার বছর যখন তখন ন্যায়নন্দিনী দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেয়। দশানন সেই সময় কন্যা সন্তানের জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন কিন্তু তার সকল স্ত্রীরা একের পর এক পুত্রসন্তানের  জন্ম  দেন । ধন্যমালিনীর দ্বিতীয় পুত্র ত্রিশির এবং ন্যায়নন্দিনী জন্ম দেয় যমজ সন্তানের। নাম নারান্ত্বক এবং দেবত্বক।

যখন মেঘনাদের বয়স পাঁচ বছর হয়, তার সাথে পরিচয় করানো হয় ধর্মগ্রন্থ এবং বইপত্রের। বিভিন্ন ভাষা পড়তে শুরু করে। গুরু শুক্রাচার্য তাদের শিক্ষা দিতে শুরু করেন এবং উন্নতির চেষ্টা করেন। যখন তার বয়স ছয় বছর হয় মন্দোদরী আরেক সন্তানের জন্ম দেয়, নাম আকাশ্য কুমার। আকাশ্যকুমার খুব সুন্দর দেখতে। সে সব থেকে ছোট রাজপুত্র এই পরিবারের।

দশাননের তিন পত্নীর সাত সন্তান ছাড়াও আরো কিছু অবৈধ সন্তানের জন্ম দেয় অন্তঃপুরের নারীরা। অদ্ভুতভাবে এই নারীদের মধ্যে কারোর কন্যা সন্তান হয় না। রানিদের সাত সন্তান এক মহলেই থাকে তারা কেউই আলাদা থাকা পছন্দ করে না। বছরের পর বছর ধরে এর কোন পরিবর্তন হয় না। মন্দোদরীর দায়িত্ব দিনে দিনে বর্ধিত হয়।

মন্দোদরী সাথে তার স্বামীর  সম্পর্কের কোন পরিবর্তন হয় না। দশাননের অন্যান্য অবৈধ সন্তানদের মেনে নেয় তিন রানি। ন্যায় নন্দিনীর দাবি দিনে দিনে বর্ধিত হয়। তিন সন্তানদের প্রতি দশাননের কর্তব্য নিয়ে অত্যন্ত সজাগ থাকে সে। পূর্বের মতো জটিলতা সৃষ্টি করার প্রবণতা তার অনেক কমে যায়। তাদের মধ্যে বাক্যবিনিময় হয় শুধুমাত্র অনুষ্ঠানগুলোতে। জনসম্মুখে যাতে তাদের নিয়ে কোন গল্প না হয়। সেদিকে সজাগ থাকে মন্দোদরী ও ন্যায়নন্দিনী।

ধন্যমালিনী, ন্যায়নন্দিনী এবং মন্দোদরী দিনের বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করে সন্তানদের লালন পালনে। তারা তাদের লালন-পালন নিয়ে একপ্রকার পরিকল্পনা করে ফেলে। দায়িত্ব ভাগ করে নেয় পড়াশোনা ও দেখাশোনা ব্যাপারে। মন্দোদরী দায়িত্ব নেয় পড়াশোনার দিক মূলত সাহিত্য, বেদপাঠ, শাস্ত্র নিয়ে এবং ন্যায়নন্দিনী ও ধন্যমালিনী কলা, সঙ্গীত, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করত সন্তানদের মধ্যে। তাদের সন্তান দশাননের মতোই বুদ্ধিমান ছিল। মেঘনাদের বয়স যখন এগারো বছর পড়াশোনা ছাড়াও অস্ত্রশিক্ষা, ধনুবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে গুরুশুক্রাচার্যের থেকে। তিনি তাকে রাজনীতি শিক্ষা দিতেন। মেঘনাদের মধ্যে ফলিত বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ দেখা যায়। সে কলা, জাদুবিদ্যা পারদর্শী হয়ে ওঠে। অদ্ভুত ভাবে মেঘনাদের চরিত্রের সাথে তার পিতার চরিত্রের প্রচুর সাদৃশ্য দেখা যায়। অন্যান্য সন্তানেরা বিভিন্ন দিকে তাদের গুণ বাড়াতে থাকে। প্রহেষ্ঠা, ধন্যমালিনীর পুত্র ত্রিশির  যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে। অতিকায়া ধনুর্বিদ্যা পারদর্শী হয়ে ওঠে। সে একসাথে পাঁচটা তীর চালাতে পারত এবং তীর চালানোর সময় ঐশ্বরিক মন্ত্র শিখে নেয়। দশ বছর বয়সে দশানন তাদের অপরাজেয় বর্ম প্রদান করে, যা কুম্ভকর্ণ জয় করেছিলেন যখন ব্রহ্মার কাছে বর গ্রহণের জন্য তপস্যা করেছিলেন। দশানন তার সন্তানদের বিভিন্ন গুণ দেখে খুব গর্ববোধ করতেন।

এমন এক সময়, মন্দোদরী ও দশাননের অন্য পত্নীদের আমন্ত্রণ করা হয় স্বয়ম্বরের জন্য। নানাশ্রীকে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় লিখিত ভাবে। পার্শ্ববর্তী সকল দেশ থেকে রাজাদের আমন্ত্রিত করা হয়। স্বয়ম্বরে ধনুর্বিদ্যা যে সব থেকে বেশি পারদর্শী হবে, সেই জিতে নেবে রাজকন্যাকে। কন্যার পিতা সানন্দে তার সাথে বিবাহ দেবেন। সেই কারণে সকল ধনুর্বিদদের আমন্ত্রণ করা হয়।

অনুষ্ঠানের জন্য একটি বড় তীর, ধনুক রাখা হয় নীল ভেলভেটের উপর। এ ছাড়াও সেখানে থাকে নানা ধরনের শুকনো ফল, উপকারী তেল, সিল্কের শাল। যা রেখে দেয়া হয় অভ্যাস করার জন্য। রানি মন্দোদরী অধীর আগ্রহে  অপেক্ষা করে স্বয়ম্বরে কারা অংশগ্রহণ করে তা দেখার জন্য। মন্দোদরী দশাননের পাশে বসেন। নানাশ্রী ধনুকের উপর থেকে পাতলা কাপড় সরিয়ে দেন।

‘ইহা স্বাভাবিকের থেকে বেশি ভারী। কে ইহা এখানে এনেছেন? কোথা থেকে আমন্ত্রণ’ দশানন প্রশ্ন করেন।

‘দুই রক্ষী এবং  মন্ত্রীরা এনেছে। আমন্ত্রণ এসেছে মিথিলার রাজার থেকে। যাকে আমরা সবাই ‘জনক’ নামে চিনি। তিনি বেদ অঞ্চলের।’ নানাশ্রী উত্তর দেন।

‘রাজা জনক মিথিলার...’ মনে মনে খুব প্রসন্ন হয় মন্দোদরী। কিন্তু কাউকে কেন পাঠাননি এটা আনার জন্য? এটা কী কোন প্রথা? দশানন প্রশ্ন করেন।

‘তাই হবে প্রভু।’

‘হুম...তাহলেই আমন্ত্রণের কারণ কী নানাশ্রী?’

রাজা জনক লঙ্কেশ্বর এর জন্য বিশেষ আমন্ত্রণ পাঠান। তিনি এক স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করেছেন তার কন্যার জন্য এবং অনুরোধ করেছে আমাদের সকলের উপস্থিত হওয়ার জন্য। তার বড় কন্যা সীতা তেরোয় উত্তীর্ণ হয়েছে। সদ্যই শৈশব পেরিয়ে যৌবনে উত্তীর্ণ হয়েছে সীতা। তাই এখন বিবাহ মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে। সেই উপল্যক্ষে তিন দিন ধরে এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন। এই প্রতিযোগিতায় যে জয়ী হবে তার সাথে কন্যা সীতার  বিবাহ হবে।’ নানাশ্রী জানান।

‘বিবাহ করার যোগ্য হবে!সুতরাং জয়ী হলেই যে তার সাথে বিবাহ হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।’ প্রশ্ন করেন বিভীষণ।

মিথিলার মন্ত্রীরা প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়।

‘আমি খুব গর্বিত আমন্ত্রণে লঙ্কার হয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য। মিথিলার রাজা জনককে আমার ভালোবাসা গ্রহণ করতে বলবেন নানাশ্রী।’ দশানন মাথা নত করে বলেন।

‘প্রভু আপনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে দশাননের মত উচ্চকণ্ঠে।

রাজা দশানন তার সাথে অন্য স্ত্রীদের নিয়ে যেতে প্রস্তুত নন। মিথিলার সাথে লঙ্কার চুক্তির ব্যাপারে দশাননের অন্য স্ত্রীরা আগ্রহী নয়।

‘আমি ঠিক জানিনা এই ব্যাপার নিয়ে পরে কথা বলা যাবে।’  দশানন উত্তর দেয়।

‘এটা কী সত্যিই? প্রতিযোগিতায় জেতার পরও কোনো নিশ্চয়তা নেই বিজয়ী ব্যক্তি বিবাহ করার জন্য যোগ্য হবে। একী স্বয়ম্বরের নিয়ম?’ বিভীষণ প্রশ্ন করে।

মন্ত্রীরা বলেন, ‘রাজা এই প্রতিযোগিতায় একটা শর্ত দিয়েছেন যে, জয়ী হবে প্রথমে সেই অগ্রাধিকার পাবে। পরিশেষে জনক কন্যা সিদ্ধান্ত নেবে কাকে তিনি বিবাহ করতে চান।’

‘তার মানে তিনি প্রথম বিজয়ীকে অস্বীকার করতেই পারেন, যদি তার পছন্দ না হয়।’ নানাশ্রী বলেন।

‘না প্রভু আমাদের রাজা বিশ্বাস করেন যে এই প্রতিযোগিতা অত সহজ নয়। তিনি আমন্ত্রণ করেছেন বিশেষ শক্তিসম্পন্ন রাজা এবং রাজপুত্রদের এই প্রতিযোগিতার জন্য, কিন্তু এখানে ধনুর্বিদদের মধ্যে অনেক বিজয়ী জুটি আছেন।’

‘এই প্রতিযোগিতা তাহলে ঠিক কী?’ দশানন প্রশ্ন করেন।

‘বিজয়ী রাজপুত্রের হাতে তুলে দেয়া হবে রাজকন্যা সীতাকে। প্রতিযোগীকে অবশ্যই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে হবে ধনুকের দড়ি বাধতে হবে।’

নানাশ্রী পুরো পরিকল্পনা শুনে চুপ করে থাকে। ‘ধনুকে দড়ি পড়াতে হবে তাহলে প্রতিযোগিতা কী নিয়ে হবে?’

মিথিলার মন্ত্রী জানান, ‘এটা কোন সাধারণ ধনুক নয় প্রভু। ইহা উপহার পেয়েছেন রাজা জনক বড় যুদ্ধবিদ পরশুরামের থেকে। একে সুন্দরভাবে সজ্জিত করে স্বর্গীয় সৎপতি এবং কারিগর বিশ্বকর্মা। প্রভু এই ধনুক অন্য কারোর নয়, এটি মহাদেব শিবের।’

দশানন চুপ করে শুনলেন শিবের ধনুর কথা। দশানন তার চোখের ধনুককে দেখতে পান। অপর যোদ্ধাদের জন্য এই প্রতিযোগিতা খুবই কষ্টদায়ক।

মন্দোদরী মনে করে এই স্বয়ম্বর মুগ্ধ করবে তার স্বামীকে। মন্দোদরী দশাননের কাছে জানতে চান, ‘প্রিয় প্রভু আপনি কী ভাবছেন? আপনি কী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবেন?’ কিন্তু তিনি এড়িয়ে যান।

মন্ত্রীরা আরও যোগ করেন, ‘আমাদের রাজা বিশ্বাস করেন যে শুধুমাত্র শিবের ভক্ত, এই ধনুকে দড়ি পড়াতে সক্ষম হবে। বড় ঘোষণা এবং প্রপাগান্ডা মতে লঙ্কেশকে রাজা ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যে শিবের পরম ভক্ত নয় কিন্তু তিনি ত্রিভূবনের অধিপতি। লঙ্কেশ শিবের শিষ্য এবং ইন্দ্র শত্রু।’ দশানন মন্ত্রীর এই কথায় প্রভাবিত হন। মন্দোদরী জানে দশাননকে থামানোর আর কোন উপায় নেই।

‘অন্য কোন কোন ধনুর্বিদদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আপনাদের রাজা?’ বিভীষণ প্রশ্ন করেন।

‘নিকটবর্তী সকল ফ্যারাও, শক্তিশালী রাজা এবং তাদের রাজপুত্র, ব্রাহ্মণ সন্তান, দেবতা রাক্ষস, ক্ষত্রিয় সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’

‘আপনি আপনার রাজাকে বলে দিন আমি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছি এবং স্বয়ম্বরের শেষ দিন রওনা দেব। আমি আমার এক প্রতিনিধি প্রেরণ করব আমার কৃতজ্ঞতা প্রেরণ করার জন্য।’ দশানন ঘোষণা করেন।

মন্দোদরী অপেক্ষা করছিল তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের জন্য। সে খুঁজছিল ব্যক্তিগত সময় দশাননের সাথে কথা বলার জন্য। ‘হে প্রভু, মিথিলা আপনার সমকক্ষ নয় সন্ধি করার জন্য। সুতরাং কী কারণে আপনি এই সময়ে অন্য নারীকে বিবাহ করতে চলেছেন?’

‘তোমার মাথায় আসলো না মন্দোদরী! তাদের কাছে একটি ধনুক আছে যা ভগবান শিবের।’

‘এটা শুধুমাত্র ধনুক না স্বয়ম্বর! আপনার অনেক অস্ত্রশস্ত্র আছে তাই এই ধনুক না হলেও ...এই বয়সে আপনার এখনও অন্য নারী চাই?’

‘আমি চিন্তিত শিবের ধনুক সম্পর্কে, আমি তাকে লঙ্কায় আনতে চাই। যদি রাজা জনক বলেন ওই ধনুটি শিবের তবে ওটা আমার চাই বিভীষণ।আমি যাওয়ার আগে তুমি আমার প্রতিনিধি হয়ে উপস্থিত থেকো এবং খবরের সত্যতা যাচাই করো।’

‘কিন্তু ভারত দশানন আপনি কেন শেষ দিনে যেতে চাইছেন? যদি আগে কেউ জয়ী হয়ে থাকেন!’ বিভীষণ প্রশ্ন করেন।

‘যদি সবাই পরাস্ত হন ধনুকে দড়ি পড়াতে তাহলে বুঝব এটা সত্যিই কঠিন প্রতিযোগিতা এবং আমি দেখতে চাই কারা কারা ধনুর্বিদ হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন। এটা কোন রাজার জন্য যথাযথ হবে না আমার মত। যদিও আমি নিশ্চিত আমি এই ধনুকটি আমার কাছে আনতে পারব। মহাদেব কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবেন না।’ দশানন একথা বলে স্থান থেকে প্রস্থান করেন।

দশাননের স্ত্রীরা এটা ভালোভাবে মেনে নেয় না। ধন্যমালিনী রাগার্ত ভাবে তার কক্ষে প্রবেশ করে এটা জানতে যে, সে এই সিদ্ধান্তে খুশি নয়। কিন্তু দশানন কারো কথায় কর্ণপাত করেন না। মন্দোদরী'র দাসীরা বলাবলি করে ধন্যমালিনী এতটাই রেগে যান এই ঘটনার পর থেকে তার হাতে সেই মুহূর্তে যা ছিল তাই দিয়ে ছুড়ে মারেন অন্যদের। মন্দোদরী অবাক হয় ধন্যমালিনীকে এত হতাশাগ্রস্থ দেখে। সেটা জানতো দশানন, তার অন্য স্ত্রীরা এটা মেনে নিতে পারলেও একজন  মানতে পারবে না। কিন্তু সেটা ধন্যমালিনী হবে ভাবতেই পারেনি। দশানন এমনই এক মানুষ যার ইচ্ছা কখনো পূর্ণ হয় না।

দশানন চলে যাবার আগে মন্দোদরীর সাথে দেখা করে।

‘তুমি কি আমার উপর রাগ করেছ মন্দোদরী? আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই যাবার আগে।’

‘আমি এখন আর রাগ করিনা প্রভু!’ মন্দোদরী উত্তর দেয়।

‘তুমি কি বুঝেছো আমি কি করতে চাইছি?’

‘আমি এইসব নিয়ে ভাবিনা প্রভু। এই প্রসঙ্গ ত্যাগ করুন। লঙ্কা হল সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র। আমাদের পরিবার এবং সন্তান আছে। এই সময় আমাদের কারো সাথে সন্ধি করা উচিত আছে বলে আমি মনে করি না।

আপনার আরো দুইজন স্ত্রী এবং অন্তঃপুরে দাসীরা আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে পারছে না সেটা বেশ বুঝতে পারছি। আপনি এখনও অন্য নারীকে কেন বিবাহ করতে চাইছেন তা বুঝতে পারছিনা ভাবছেন।

‘তোমার কী মনে হয় আমি একজন নারীকে বিবাহ করতে চাইছি? আমি শুধুমাত্র এই প্রতিযোগিতায় জিততে চাইছি যার দ্বারা আমি শিবের কাছে পৌঁছতে পারব।’

‘প্রতিযোগিতায় জেতার পর পুরস্কার স্বরূপ সীতাকে পাওয়া যাবে.. ধনুক কিন্তু উপহার নয় প্রভু।’

‘আমি এই নিয়ে ভাবছি না।’

‘সুতরাং আপনি কী ঠিক করলে লঙ্কেশ্বর? আপনি প্রতিযোগিতা জিতবেন এবং রাজা জনক আপনার সাথে তার কন্যার বিবাহ না দিয়ে ছেড়ে দেবেন। আমি আপনাকে চিনি, আপনি বিয়ে না করে ফিরবেন না।’

‘আমি বুঝতে পারছি না তুমি একজন মহিলাকে নিয়ে কেন হিংসা করছ?’

‘আপনি যদি মনে করেন আমি তার শত্রু, আমি কখনো অন্য নারীদের আমার শত্রু ভাবিনা। প্রভু আমি কখনো আপনার অন্তঃপুর যাওয়া নিয়ে কোনো বাধা কিংবা কোনো সমস্যা করিনি। আমার কিছু যায় আসে না আপনার অবৈধ সন্তানদের ব্যাপারে। কিন্তু আমি আমাদের পরিবার নিয়ে চিন্তিত, আমাদের সম্মান, মর্যাদা নিয়ে আমি চিন্তিত।’

‘আমি কালি যাচ্ছি মন্দোদরী। আমি দুই - তিন দিনের মধ্যে ফিরে আসব। যদি তুমি আমাকে নিয়ে ভাবো তবে আমাকে শুভেচ্ছা দিও। আমি আমার সাথে শিবের ধনুক আনতে চাই।’ বলেই চলে যান দশানন।

রানিমহল এবং অন্য দাসীরা বলাবলি করে এই স্বয়ম্বরের পরিণতি কী হতে চলেছে। যখন দশানন চলে যায় তারা প্রস্তুতি শুরু করে দেয় নববধূকে অভ্যর্থনা করার জন্য। এই বিষয়ে কিছু যায় আসে না মন্দোদরীর। সে প্রার্থনা করে যাতে দশানন সঠিকভাবে শীঘ্রই ফিরে আসতে পারেন। দশানন এবং বিভীষণ ফিরে আসেন তিনদিন পর। মন্দোদরী এবং ন্যায়নন্দিনী বাদ দিয়ে সবাই তাদের অভ্যর্থনার জন্য যায়। মন্দোদরী নিজের কক্ষে অপেক্ষা করে নুতন সংবাদ শোনার জন্য। অবিশ্বাস্যভাবেই যদি তিনি বিবাহ করে থাকেন, তবে তার কক্ষে সেই সংবাদ আসবেই। কিন্তু তেমন কিছুই শোনা যায় না। কিছুক্ষণ পর মন্দোদরী'র দাসী ফিরে আসে। সে  কোন খবর দিতে পারে না।’

‘বিমানে কোন নারী নেই। শুধুমাত্র লঙ্কেশ্বর। কিছুক্ষণ বাদে রাজার  রক্ষী ফিরে আসে। তিনি বিমান থেকে সোজা নিজের কক্ষে যান।’

কি ঘটনা ঘটেছে? এর অর্থ দশানন কী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেননি? মন্দোদরী তার দাসীকে জিজ্ঞাসা করে সে ধনুক দেখেছে কিনা অথবা এমন কোন অথচ কোন জিনিস দেখেছে কিনা যাকে দশানন আগ্রহ নিয়ে সংরক্ষিত করে রেখেছে। মন্দোদরী দশাননের কাছে পুরো ঘটনা বিবরণ জানতে আগ্রহী হয় কিন্তু সে জানে তিনি জানাবেন না কোনভাবেই। তাই মন্দোদরী ঠিক করে বিভীষণের কাছে জানতে চাইবে সম্পূর্ণ বিবরণ।

বিভীষণ পুরো ঘটনার বিবরণ দেন ধন্যমালিনী, মাতা কৈকেসী এবং মন্দোদরীকে। তিনি জানান রাজা জনক রাজাদের জন্য জাঁকজমক পূর্ণ আয়োজন করেছেন। শুধুমাত্র দশানন শেষ দিন উপস্থিত হবেন বলে যান। অন্য রাজারা ভারত দশাননকে অহংকারী এবং উপেক্ষাপূর্ণ ব্যক্তি ভাবে। সীতাকে দশানন পাননি। প্রত্যেকে সীতার সৌন্দয্যের প্রশংসা করেছিলেন এবং এই  শিবের ধনুক তার পিতার কাছে রক্ষিত হয় এটা জেনে বাহবা দিচ্ছিলেন।

‘বিস্ময়কর লাগে এটা জেনে যে সীতা রাজা জনকের পালিত কন্যা। রাজা জনক তা স্বয়ম্বরের সময় জানাননি। যখন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায় তখন কেউ একজন এ কথা বলেন।’ বিভীষণ জানায়।

‘সুতরাং সীতা পালিত কন্যা? তার প্রকৃত পিতা মাতা কারা?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে।

‘কেউ জানে না। সাধারণ মানুষ বলেন  রাজা জনক যজ্ঞ করে সীতাকে পান। সেই অঞ্চলে গত তিন বছর ধরে খরা দেখা দিয়েছিল। রাজা জনক সেই সময় সীতাকে পান বৃষ্টির মধ্যে। সুতরাং জনক ভাবেন সীতা ঈশ্বরের আশীর্বাদ।’

‘আপনি বলুন যখন দশানন যেখানে উপস্থিত হন তখন কী ঘটে তিনি কী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন? ধন্যমালিনী প্রশ্ন করেন এবং বিভীষণ আবার বর্ণনা করা শুরু করেন।

‘অবশ্যই তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। লঙ্কেশ্বর যখন স্বয়ম্বরে প্রবেশ করেন শতাধিক ধনুর্বিদ চেষ্টা করে ফেলেছেন আগেই। কিন্তু আমরা যা অনুমান করেছিলাম তার থেকেও কঠিন এই ধনুক। একের পর এক ধনুর্বিদ পরস্পর দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজকন্যাকে জয় করার জন্য কিন্তু কেউই সফল হয়নি। কেউই ধনুকে দড়ি পরাতেই পারেননি। কিছু প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করতে চাননি আবার অন্যরা নানা সমস্যার কথা বলেন। যখন লঙ্কেশ্বর সে প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন, তখন কেউ তার পরিচয় দেননি। তিনি সরাসরি সেখানে চলে যান; যেখানে ধনুকটি রাখা ছিল। অন্য প্রতিযোগিরা তখন তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তিনি ধনুকটিকে ডান হাতে নিয়ে একটু শ্বাস নেন এবং চোখ বন্ধ করে ধ্যান করছিলেন। আমি জানি তার ক্ষমতা। তিনি কাঁধের মধ্যে ধনুকটিকে নেন। সেখানে উপস্থিত সকল প্রতিযোগীর চক্ষু স্থির হয়ে যায়। কেউ কেউ ভয় পান আবার কেউ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই লঙ্কেশ সেই ধনুকের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি এবং তা পড়ে যায়।’

তারা অপেক্ষা করছিল শোনার জন্য, ‘সুতরাং লঙ্কেশ দ্বিতীয়বার আর চেষ্টা করেননি?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে।

‘তিনি চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু অসমর্থ হন। অন্য প্রতিযোগির মত  চলে আসেন।’ বিভীষণ জানান।

‘কিন্তু তিনি প্রতিযোগিতা ছেড়ে আসলেন? তার আগে কেউ কী এমন করেছিলেন?’ ধন্যমালিনী জানতে চায়।

‘প্রতিযোগিতার শর্ত সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।কেউ পড়াতেই পারে না। লঙ্কেশ যখন অসমর্থ হয় প্রত্যেকে তার ব্যর্থতা নিয়ে বিদ্রুপ, হাসাহাসি করে। তার আগের প্রতিযোগী ভুলে যায় যে সে পরাজিত হয়েছে সেও এই বিদ্রুপে যোগ দেয়। লঙ্কেশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এই ধরনের আচরণের দ্বারা। তিনি কোন কিছু না বলে মাথা নিচু করে ধ্যান করেন ধনুকের দিকে তাকিয়ে এবং সেই স্থান থেকে চলে যাবেন স্থির করেন।’ বিভীষণ বলেন।

প্রত্যেকে এই ঘটনা শুনে নির্বাক হয়ে যায় এবং দশাননের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে।

‘তিনি এখন কী বলছেন? আমি বলতে চাইছি স্বয়ম্বরে কি হলো এরপর? কেউ কি পারল? মন্দোদরী প্রশ্ন করে।

‘না বৌদি, তিনি একটি কথা কাউকে বলেননি। তিনি এতটাই বিষন্ন ছিলেন, যে আমি একটা কথাও বলতে পারিনি।’

মন্দোদরী বোঝে যে বিভীষণ কী কারণে ভয় পাচ্ছিলেন। বিভীষণ দশাননর ক্রোধ সম্পর্কে অবগত।

‘হুম... ঠিকই বলেছেন লঙ্কেশ পুরো ঘটনাটা ভুলে যাবার চেষ্টা করছেন।’

তারা কেউ জানতে চাননি এবং এরপর কী ঘটেছিল কিংবা লঙ্কেশ  এর পরিবর্তে প্রতিহিংসার নেওয়ার চেষ্টা করেছেন কিনা।

‘কিন্তু একটা কথা আমায় বলুন কেউ কি জয়ী হতে পেরেছিল প্রতিযোগিতায়?’ ধন্যমালিনী প্রশ্ন করে।

‘অবশ্যই আমরা চলে আসার পর এবং যাত্রা শুরু করার পর জানতে পারি পার্শ্ববর্তী এক ক্ষত্রিয় রাজপুত্র অযোধ্যা নগরের ধনুকে দড়ি পড়াতে সমর্থ হয়। পরিশেষে শোনা যায় তিনি ওই ধনুককে ভাঙতে সমর্থ হয়েছেন।’ বিভীষণ বলেন।

মন্দোদরী সিদ্ধান্ত নেয় দশাননের সাথে এই বিষয় নিয়ে কথা বলবেন। মিথিলায় ঠিক কি হয়েছিল তা দশাননের থেকে  জানা মন্দোদরীর কাছে খুবই প্রয়োজনীয়। দশানন এখন কী ভাবছেন অথবা এই ধরনের উপেক্ষা, বিদ্রুপের পর তার মনের অবস্থা কী হয়েছিল। তিনি তার কক্ষে  ছিলেন জানলার দিকে তাকিয়ে যখন মন্দোদরী প্রবেশ করে।

‘তুমি গতকাল কোথায় ছিলে মন্দোদরী? তুমি আমাকে কেন দেখতে আসনি?’

আমি ভেবেছি আপনার অন্য কাউকে দরকার। আমি দুঃখিত যা ঘটেছে তার জন্য ...আমি শুনলাম বিভীষণের থেকে পুরো ঘটনাটা।

‘তুমি আমাকে যেতে দিতে চাওনি...’

‘প্রভু আমি চাইনি আপনি ওই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করুন। আমি ওই বিবাহ নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলাম প্রতিযোগিতা নিয়ে না!’

‘এবং আমি যেতে চেয়েছি প্রতিযোগিতায় ধনুকের জন্য। আমি পরাস্ত হয়েছি মন্দোদরী। আমি কিছুই না কিন্তু আমাকে ঐদিন অহংকারী লাগছিল। আমি ধনুকটিকে নিজের হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করে আমার ভগবানের ধ্যান করছিলাম, তাকে স্মরণ করছিলাম কিন্তু তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি আমার প্রার্থনায় সাড়া দিলেন না। আমার মস্তক অবনমত হল এবং প্রত্যাখ্যাত হলাম। কিন্তু সমগ্র ঘটনা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়...’ ‘ভুলে যান প্রভু, এই নিয়ে আর ভাববেন না।’

‘আমি ভুলতে পারছিনা সেদিনের বিদ্রুপ, অট্টহাসি আমাকে নিয়ে’

‘এটা আপনাকে নিয়ে নয় ...’

‘আমার নিবেদন আমার ভগবানের প্রতি হওয়ার পরেও আমি জয়ী হতে পারলাম না। তোমার কী মনে হয় আমার অহংকার দায়ী এই পরাজয়ের জন্য? আমি নিজেকে কিভাবে পরিবর্তন করব মন্দোদরী?’

মন্দোদরী অনুভব করে তিনি আরও বেশি বিপর্যস্ত পরাজয় বৃদ্ধির কারণেই। এই পরাজয় দশাননকে আরো বেশি লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

‘অহংকার আপনার অন্যতম চরিত্র লঙ্কেশ্বর এবং এটাই প্রমাণ করাই কে আপনি।’

লঙ্কেশ্বর সমগ্র ঘটনায় মর্মাহত হন। তিনি জানতেন তিনি ত্রিভুবনের অধীশ্বর। তাকে পরাজিত করা কারোর পক্ষে সম্ভবপর নয়। তাই স্বয়ম্বরে তিনি ভেবেছিলেন ওই ধনুকে দড়ি পড়াতে পারবেন এবং ধনুককে ভেঙে ধনুকের স্বত্ত্ব পাবেন। নারীর প্রতি তারা আসক্তি চিরকালই। কিন্তু এই পরাজয় মানতে দশানন কখনোই শেখেননি। ছোটবেলা থেকে বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তার বড় হওয়া। তিনি যা চেয়েছেন তাই পেয়েছেন সেই অহংকার আর থাকে না দশাননের। তাই তিনি ফিরে আসেন প্রথম স্ত্রীর কাছে। মন্দোদরী তার জীবনে অনেক বড় আশ্রয় বলা যায়। বহু নারীর সংস্পর্শে এসেও মন্দোদরীর আশ্রয় দশাননের বড় প্রয়োজন। ধীরে ধীরে  দশানন বোঝেন তার থেকেও শক্তিমান কেউ আছেন এই ভূ-ভারতে।

সকল অধ্যায়
১.
অহল্যা, দ্রৌপদী, সীতা, তারা, মন্দোদরীপঞ্চসতীর প্রতি নিবেদন
২.
সূচনা
৩.
বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী
৪.
বিবাহ পর্যায়ে মন্দোদরী
৫.
দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ ও মন্দোদরী কথা
৬.
বজ্রজলা ও মন্দোদরী
৭.
অমৃতের সন্ধানে দশানন ও তার প্রতিক্রিয়ায় মন্দোদরী
৮.
দশানন, বালী ও মন্দোদরী
৯.
মহান্ত, মাতা কৈকেসী ও মন্দোদরী
১০.
মন্দোদরী ও ঋষি ঘৃতস্মদা
১১.
আত্মশ্লাঘা ও মন্দোদরী
১২.
জীবন সন্ধিক্ষণে মন্দোদরী
১৩.
মন্দোদরী ও দশানন
১৪.
মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ
১৫.
মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন
১৬.
যোদ্ধা মেঘনাদ
১৭.
মেঘনাদের বিবাহ ও মন্দোদরী
১৮.
দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী
১৯.
সীতা হরণ ও মন্দোদরী
২০.
বানর ও লঙ্কা
২১.
অহিরাবণ
২২.
যুদ্ধে মেঘনাথ ও মন্দোদরী
২৩.
লঙ্কার রানি মন্দোদরী
২৪.
ফিরে দেখা
২৫.
ঋণ স্বীকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%