দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী

পারমিতা চক্রবর্তী

দশানন একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন মাতা কৈকেসীর উদ্দেশ্যে। এই মন্দির তৈরি করতে ছয় বছর সময় লাগে। দশানন নিজের প্রাসাদের সামনে একটি মন্দির নির্মাণ করেন এবং তার মাতাকে শিবপ্রণাম করতে বলেন প্রতিদিন। দশানন হলেন মাতা কৈকেসীর গর্ব। তিনি সর্বদা মাতাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে থাকেন। মাতা যা চেয়েছেন তাই করেছেন দশানন সর্বদা। মন্দিরের উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে মীনাক্ষী এবং বিভীষণকে আলাদা করে রাখেন দশানন। শীঘ্রই মীনাক্ষী তার পুত্রকে ভারতবর্ষের আধিপত্য বিস্তারের জন্য গড়ে তোলে মানসিক ভাবে। মন্দোদরী সর্বদা দেখে এসেছে মীনাক্ষী এবং পুত্ররা যাতে দশাননের শত্রু উঠতে পারে। তারা যাতে লঙ্কায় একসাথে থাকতে পারে। কিন্তু মন্দোদরীর চেষ্টাতে কোন কিছুই হয়না। মীনাক্ষী যেন নিজের জায়গাতেই বহিরাগত হয়ে ওঠে ক্রমাগত। সারাদিন উদাস হয়ে ঘুরে বেড়ায় চারিদিকে। মীনাক্ষীকে নিয়ে সবাই বিদ্রুপ করে। তার নাম রাখে শূর্পনখা- এক প্রবৃদ্ধ নখ যার। সারাদিন বনে বনে ঘুরে বেড়ায় সে। নিজের পরিবার থেকে দূরে চলে যায়। মীনাক্ষী চলে যাবার পর কুম্ভকর্ণ এবং বজ্রজলার যমজ সন্তান কুম্ভ ও নিকুম্ভ নিয়োজিত হয় রাজকার্যে। বজ্রজলার পিত্রালয় খুব ধনী। সে খুব বড় পরিবারের রাজকন্যা। বজ্রজলা তার সন্তানদের বিবাহের পর নিশ্চিন্ত হয়। সে সকলের সামনে স্বীকার করে যে, সে কুম্ভকর্ণকে ছাড়াও আরও একটি মানুষকে ভালোবাসে। মন্দোদরীর কাছে বজ্রজলা ভালোবাসার মানুষটি নাম জানায়নি কিন্তু মন্দোদরী অনুধাবন করে তিনি নিশ্চয়ই কোন উঁচু দরের সেনা হবেন। বজ্রজলার অন্য মানুষকে ভালবাসার মধ্যে কোনও দোষ খুঁজে পায় না মন্দোদরী। এই কঠিন সত্য বলার কারণে মন্দোদরী তাকে আরো ভালবাসে। নিজের স্বামীর প্রতিও একনিষ্ঠ সে। একমাত্র মহিলাদের মধ্যে সে এই সাহস দেখাতে সক্ষম হয়েছিল।

এক উৎসব সংঘটিত হয় দশাননের রাজত্বের ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে। লঙ্কা দশাননের অধীনে সুন্দর ভাবে চলে। তাদের বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়, রাজনৈতিক চুক্তি বিভিন্ন দেশের সাথে আরও সুদৃঢ় হয়, অস্ত্রশস্ত্রের ভাণ্ডার বৃদ্ধি পায়, লঙ্কার ঐশ্বর্য বৃদ্ধি পায় এই কয়েক বছরে। এক বড় জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়। মন্দোদরী সেখানে দশাননের পাশে বসে। নানাশ্রী সেই অনুষ্ঠানে দশ মাতার মুকুট পরিয়ে দেন দশাননকে। সেই অনুষ্ঠানে মন্দোদরীর ডানদিকে এনে দাঁড় করায় রক্ষী এক মহিলাকে। তার মুখ ভেইল দ্বারা আবৃত। আবৃত নারী দশাননের পায়ে পড়েন এবং কাঁদতে থাকে অঝোর নয়নে। যখন সে মুখ তোলে তার চোখ দেখা যায় শুধু। সবাই বুঝতে পারে সে আসলে মীনাক্ষী। বহু বছরের পর লঙ্কায় আবার ফিরে আসে সে।

দশানন তাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে কিছুটা হতবাক হয়ে। প্রত্যেকেই নিজের জায়গা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পরে মীনাক্ষীকে দেখার জন্য। লঙ্কায় এক বড় উৎসব হয়। প্রত্যেকে অপেক্ষা করে মীনাক্ষীর থেকে সমস্ত কথা শুনবে বলে।

দশানন মৃদুস্বরে ‘কী হয়েছে মীনাক্ষী?’ তার মাথায় হাত দেয়।

‘আমি আপনাকে সঠিকভাবে চিনতে পারিনি। আপনি বলেছিলেন আমাকে রক্ষা করবেন আজীবন এবং আজ আমি আপনার কাছে এসেছি সাহায্যের জন্য!’

‘আমি অবশ্যই সাহায্য করব তোমাকে। কিন্তু তুমি এই ভাবে কেন বলছ? এবং কেনই বা তুমি তোমার মুখ ঢেকে রেখেছে?’ দশানন প্রশ্ন করেন।

‘আমি আমার মুখ আপনাকে দেখাতে পারব না; আপনার দিকে তাকাতে পারবো না।’

‘তুমি কেন স্পষ্ট কিছু বলছ না মীনাক্ষী? কী হয়েছে তোমার সাথে?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে।

মীনাক্ষী ধীক্কার দিয়ে ওঠে!

‘মুখের থেকে কাপড় সরিয়ে আমাকে তোমাকে দেখতে দাও।’

‘আমি প্রার্থনা করি আপনার কাছে ভ্রাতা বেশি কিছু জানতে চাইবেন না। আমি কিছু মানুষের দ্বারা প্রতারিত হয়েছি। আপনি যদি আমাকে দেখেন আপনিও আতঙ্কিত হবেন।’ মীনাক্ষী কাঁদতে থাকে।

‘যথেষ্ট হয়েছে মীনাক্ষী তোমার মুখ আমাকে দেখাও!’ দশানন এ কথা বলেই মাথা থেকে কাপড় সরিয়ে দেন কয়েক মুহুর্তের জন্য। সমস্ত নীরবতা ভেঙে চমকে ওঠে সবাই।

দশানন আগুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। মন্দোদরী দুর্বল অনুভব করে কিছু সময়ের মধ্যে। ভেল সরানোর পর দেখা যায় মীনাক্ষীর নাকের, কানের জায়গাটা ফাঁকা। নাকের মাংস এবং কানের মাংস নেই।

‘আমি জানতাম আপনি আমার দুঃখ দেখে সহ্য করতে পারবেন না। আমি খুবই দুঃখিত, এইভাবে আপনার কাছে আসার জন্য কিন্তু আমার আপনার সাহায্যের দরকার। প্রতিশোধ নিতে চাই! প্রতিশোধ নিতে চাই আমাদের মৃত ভ্রাতুষ্পুত্র খর ও দুশন’এর জন্য!

‘কি হয়েছিল?’ দশানন প্রশ্ন করেন। তিনি চিৎকার করে রক্ষীদের ডাকেন।

‘দুই ভাই নিজেদের মধ্যে বাক্য বিনিময় করার সময় এক রাক্ষসকে হত্যা করে। সেই ভ্রাতাদের মধ্যে একজন আমার এই অবস্থা করেছে এবং যে মানুষটি এটা করেছে তার অনেক দোষ ছিল। তিনি জানতেন না আমি আপনার ভগিনী। আমি তাদের সাবধান করি কিন্তু সে হেসে ওঠে। আমি নিজেই এই অপমান ভুলতে আত্মহত্যা করতে যাই কিন্তু শান্তি পাই না। তারা আমাকে দুর্বল প্রতিপন্ন করে অপমান করেছে আপনাকে! আমি তাদের ধ্বংস করতে চাই।’ মীনাক্ষীর কথা শেষ হওয়ার পর দশানন নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে।

‘তারা কারা? এমন কাজ আমার ভগিনীর সাথে করার মতো সাহস কার হবে?’ দশানন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন।

‘ওই দুই ভ্রাতা এবং একজন স্ত্রীলোক বাস করেন দণ্ডকারণ্যে। তারা অযোধ্যা নগর থেকে বিতাড়িত হয়ে এসেছেন। এরা নরকের কীট প্রভু। আমি তাদের বারবার নিষেধ করেছি। আমি তাদের বলেছি আমি আপনার ভগিনী এবং যদি তিনি শোনেন আপনারা আমার সাথে এরূপ ব্যবহার করেছেন তবে তিনি আপনাদের ধ্বংস করবেন। কিন্তু এতকিছু বলার পরও তারা আমার কোন কথা শুনতে নারাজ। যাতে আপনি তাদের বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য কোন পন্থা অবলম্বন না পারেন।’

‘কিন্তু তোমার সাথে তাদের সাক্ষাৎ কোথায় হলো মীনাক্ষী? কেন তারা তোমার সাথে এমন ক্ষতি করল?’ মন্দোদরী উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মীনাক্ষীর দিকে।

‘যখন আমি পৌঁছাই ভারতবর্ষে, খর এবং দুশনকে সাথে নিয়ে এবং আমরা পরিকল্পনা করি ভারতবর্ষের প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর। আমরা যত উত্তরের দিকে যাই বিভিন্ন ধরনের গল্প শুনতে পাই এই দুই মানব সম্পর্কে। এই দুই মানব অযোধ্যা থেকে আসেন। রাক্ষস এবং যক্ষ উপজাতির মানুষদের হত্যা করে যান ক্রমাগত। এই দুই মানব হলেন রাজপুত্র। এদের প্রচেষ্টা হলো ভারতবর্ষের উত্তর থেকে অসুরদের বিনষ্ট করা যাতে তারা সেখানে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। তাদের রাম ও লক্ষ্মণ নামে অভিহিত করা হয়। কিছু সন্ন্যাসী এবং দেবতারা তাদের সাহায্য করেন।’

রাজদরবারের কিছু মানুষ তাদের নামও জেনে গেছে। তারা দৌড়ে আসে মীনাক্ষীর গল্প শোনার জন্য।

‘আমরা পৌঁছে যাই দণ্ডকারণ্যের গভীর অরণ্যে এবং সেখানেই তিন মাসের জন্য থাকার ব্যবস্থা করা হয়। আমি আমার পুত্রকে জিজ্ঞাসা করি দণ্ডকে থাকার জন্য কোন রক্ষী লাগবে কিনা, এমন সময় শুনতে পাই আমাদের এক আত্মীয়কে হত্যা করছে ওই দুই মানব।’ মীনাক্ষী তাকায় মামা মরিচনের দিকে। তিনি রাজদরবারে উপস্থিত ছিলেন উৎসব পালন করার জন্য।

‘এটা তোমার মা তারকা, যিনি এই বনভূমিকে শাসন করেন?’

‘খর এবং দুশনকে তখন থেকেই সবাই স্বাভাবিক মানুষ রূপে ভাবত না। তারা ঘোষণা করে পুরস্কার। তাদের সেনাবাহিনীর মধ্যে যে ওই মানুষকে ধরে আনতে পারবে তার জন্য। আমরা তখন নিজেদের মধ্যে বলাবলি করি ওই দুই মানব অরণ্যের মধ্যে একটি অংশ শাসন করছে। তাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষনের জন্য লোক নিয়োগ করা হয়।’

‘একদিন আমি স্নান করছিলাম নিকটবতী এক নদীতে, আমি তখন এক নারীকে দেখতে পায়। সে জল ভরছিল এবং আমায় দেখতে পাইনি। তিনি একজন অপূর্ব অপ্সরা। এখানে এমন সুন্দর রমণীকে দেখা দুঃসাধ্য এবং আমি কৌতুহলী হয়ে পড়ি সে কে থেকে জানার জন্য। আমি সাঁতার দিয়ে তার কাছে যাই কিন্তু সে আমাকে দেখে ফেলে এবং প্রাণপণ চিৎকার করে। সাহায্য চাই, সাহায্য চাই বলে।’ লক্ষ্মণ ভাবে জলে কিছু হয়েছে।

‘আমি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করি। একজন ভাবেন নিশ্চই সেই নারীর সাথে কিছু হয়েছে। তৎক্ষনাৎ সে তীর ছোঁড়ে নদীর দিকে। ওই নারী স্তব্ধ হয়ে যায়! আমি তাকে ভুল বুঝি ওই তীর লাগে কিছু জন্তুর গায়ে।’ মীনাক্ষী কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়।

‘আমি আপনাকে দেখে ভয় পেয়েছিলাম বলে দুঃখিত। কে আপনি? তিনি কে? মীনাক্ষীকে প্রশ্ন করে ওই নারী।

‘আপনি কে যদি বলেন কিংবা নাও বলেন আমি আপনাকে হত্যা করব।’ বলে সেই মানব কিন্তু সেই নারী অপেক্ষা করতে বলে, ‘না লক্ষ্মণ, ধৈয্য ধরো। তিনি একজন নারী।’ সেই নারী আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমরা ক্ষতিকারক নই। আমরা বনবাসে আছি এবং ইনি আমার দেওর লক্ষ্মণ। দয়া করে চলে যান আপনি এখান থেকে ফিরে যান যেখান থেকে এসেছেন।’

‘আমি চলে আসি আমাদের তাঁবুতে এবং আমার ভাইপোদের জানাই পুরো ঘটনা। তারা শোনামাত্রই বেরিয়ে পড়ে তাদের আক্রমণ করার জন্য। আমি তাদের পিছনে পিছনে যাই। আমাদের লোক উদ্ধার করে তাদের এবং চিহ্নিত করে তাদের বাসস্থান। তারা বসবাস করত এক সুরক্ষিত কাঠের গৃহে। চারিদিকে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। সেখানে সুরক্ষার জন্য ত্রিস্তর দেওয়াল ছিল যা আমাদের লোক সঠিকভাবে দেখতে পায়নি। তারপর আমরা অপেক্ষা করছিলাম কাঠের দেয়ালের পাশে নিজেদের রক্ষা করার জন্য। তখন আমরা দেখি একজন ওই কাঠের দেওয়াল মেরামত করছে। অন্যজন ওই নারী সুরক্ষার জন্য ভিতরে রয়েছেন। শীঘ্রই আমাদের লোকজন ধরে ফেলেন তারা এবং এক এক করে মাটিতে ফেলে দেয়। পুরো পরিকল্পনা তারা তৈরি করেছিল। তারা গাছের মধ্য থেকে তীর ছুঁড়তে শুরু করে। আমি দেখি একের পর এক সেনা মারা যায় তাদের হাতে। খর এবং দুশন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আমার চোখের সামনে। আমি ভয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠি যা দেখি তা নিয়ে। লক্ষ্মণ দূর থেকে আমাকে লক্ষ্য করে দৌড়ে আসে আমার দিকে এবং আমার কেশ তার মুষ্টিতে মুষ্টিবদ্ধ করে।’

‘আমরা তখন দেখি সেই নারীকে যে নদীতে স্নান করছিল। তারা ছিল তাদের সাথে যারা আমাকে রাক্ষসী ভাবে। লক্ষ্মণ তার ভাই রামকে বলে তখন আমি বুঝি রাম লক্ষ্মণের বড় ভাই।’

‘আমি আপনাকে বলছিলাম আপনি ফিরে যান এখান থেকে যেখান থেকে এসেছিলেন। আপনি এখানে কেন এসেছেন আবার?’ সেই রমণী জিজ্ঞাসা করেন।

‘আপনি রামের পত্নী?’

‘বৌদি,ওই নারী কোন সাধারণ নয়, তিনি নিশ্চয়ই আমাদের বৃত্তান্ত কাউকে জানিয়েছেন।’ লক্ষ্মণ মীনাক্ষীর কেশ চেপে ধরে বলেন।

‘আমাকে যেতে দিন, আপনি জানেন না আমি কে।’ মীনাক্ষী বলে।

‘তারা বলেন, সেই অসুর, যাদের আমরা হত্যা করেছি আপনি কী ওদের বিবাহ করেছেন?’ বড় ভাই রাম প্রশ্ন করেন।

‘না আমি বিধবা ওই মানুষগুলিকে আপনারা হত্যা করেছেন খর এবং দুশন আমার ভ্রাতুষ্পুত্র।’

‘তারা বলেছেন তারা তাড়কার আত্মীয় এবং আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে এসেছে।’ রাম বলেন।

‘আপনি আমাদের হত্যা করেতে এসেছেন। আপনি সেই মানুষ এবং তার স্ত্রীকেও হত্যা করেছেন। তারা এখন অনাথ হয়ে গেছেন। আপনাদের নিজেদের ধিক্কার দেওয়া উচিত।’ মীনাক্ষী বলে এবং প্রত্যুত্তরে লক্ষ্মণ ধিক্কার দিয়ে ওঠেন। ‘আপনি আমার ভ্রাতাকে একথা বলার সাহস পেলেন কীভাবে?’

‘যথেষ্ট হয়েছে লক্ষ্মণ তুমি এনাকে অরণ্যের বাইরে রেখে এসো এখনই। ইনি ক্ষতিকারক নন।’ রাম লক্ষ্মণকে বলেন।

‘ভ্রাতা রাম,ওই নারী আমাদের ধ্বংস করতে এসেছে। আমার পক্ষে ওনাকে ছেড়ে আসা সম্ভব নয়।’ একথা বলে লক্ষণ মীনাক্ষীকে আরো চেপে ধরে।

‘যথেষ্ট হয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে আমাকে আটক করে রেখেছেন। এটা অবশ্যম্ভাবী যে আমার ভ্রাতা আপনাকে হত্যা করবে। আপনি একজন নারীর সাথে এমন ব্যবহার করছেন। কারণ আমি একাকী। আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারছিনা। আমি আপনাকে সাবধান করছি বারবার।’

‘ইহা কী সত্যি আপনি কেন আপনার গুণ, ক্ষমতা দেখাচ্ছেন না? লক্ষ্মণ বিদ্রুপ করে। মাথা নীচু হয়ে লক্ষণ মীনাক্ষীকে দেখে।’ আপনি দেখতে খুব সুন্দর তা আপনি জানেন। আমি আপনাকে বিবাহ করতে চাই এবং এখানে রেখে দিতে চাই। আমি এখনো পর্যন্ত বিবাহ করিনি। আপনি কোন ভাবে আমার ভাইয়ের ক্ষতি করতে পারবেন না। আপনার আত্মীয় সব লোক মারা গেছেন, আপনার স্বামী ও মৃত।’

‘আমি সহ্য করতে পারিনি এইসব কথা, তিনি বারংবার আমাকে অপমান করে চলেন, আমি আমার হাতের নখ দিয়ে আঘাত করি লক্ষ্মণের মুখে।’

‘রাক্ষসী!তোমার সাহস হলো কিভাবে!তুমি আমাকে আঘাত করার চেষ্টা করছ।’

‘কিন্তু আমার ভ্রাতা তোমার সব কার্যকলাপ বন্ধ করে দেবে।’

‘যথেষ্ট হয়েছে লক্ষ্মণ! এখনই ত্যাগ করুন ওনাকে।’ রাম বলেন।

‘না ভ্রাতা। এত সহজ নয়। আমি তাকে উচিত শিক্ষা দিতে চাই প্রথমে।’ বলেই লক্ষ্মণ ছুরি বের করে।

‘বন্ধ করো ভ্রাতা! তুমি কী প্রতিশোধ নিতে চাইছ? তিনি লঙ্কার রাজা। আমি আবার সাবধান করছি তোমাকে।’

‘আমি পরোয়া করি না কে তার ভাই। যদি সে প্রতিশোধ নিতে আসে আমি তাকে হত্যা করব।’

মন্দোদরী অবাক হয়ে যায় একজন মহিলাকে এমন কেউ করতে পারে তা ভাবতেই পারে না। মীনাক্ষী অসহায়ের মতো কাঁদতে থাকে। চলে যায় সে।

‘আমার সারা শরীরে যন্ত্রণা শুরু হয়। নাক, কান দিয়ে অঝোর ধারায় রক্ত পড়তে থাকে। তিনি আমাকে টানতে টানতে নদীর সামনে নিয়ে আসেন এবং আবার আমাকে আঘাত করেন। রাত নেমে আসে এবং আমি আমার তাঁবুতে ফেরত আসি। আমি এবং আমার চারজন রক্ষী অরণ্য থেকে প্রাসাদে ফিরে আসি।’

দশাননের মুখ অন্ধকারে ছেয়ে যায় তার কণ্ঠ কাঁপতে থাকে। দশানন বলেন, ‘আমি এর যোগ্য জবাব দিতে চাই ভগিনী। আমি তোমাকে বর্ণনা করতে পারবো না আমার মনের প্রতিক্রিয়া। তোমার দুঃখ আমার দুঃখ। তোমার অপমান আমার অপমান। আমি এই দরবারের সকলের সামনে দাঁড়িয়ে তোমাকে বলছি আমি প্রতিশোধ নেব এই অপমানের। তাদের শাস্তি দেব। তুমি অবশ্যই তোমার বিচার পাবে।’ বলেই দশানন বেরিয়ে যান।

মীনাক্ষীকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। মাতা কৈকেসী এবং অন্যান্য নারীদের জানানো হয় মীনাক্ষীর ফেরার কথা।রানিমহলের সকল দাসী এবং অন্যান্যরা একত্রিত হয়ে বলাবলি করে মীনাক্ষীর দুঃখের কথা।

‘তারা এখন বনবাসে আছে। আমরা কোনভাবেই তাদের রাজত্বকে আক্রমণ করতে পারব না।’ নানাশ্রী বলেন।

‘আমরা ঠিকমতো জানিনা তারা কোথায় থাকেন এবং তাদের খুব সাধারণ বলে মনে হয় না। তারা মানব রাজপুত্র এবং অবশ্যই দক্ষ। সেই কারণেই খর এবং দুশনকে হত্যা করতে পেরেছে।’ বিভীষণ বলেন।

‘আমি ভাবি না যদি তারা রাক্ষস, দেবতা, মানব যাই হোক না কেন আমি তাদের মুণ্ডপাত করব।’ দশানন এ কথা জানান।

‘লঙ্কেশ, আমি যখন অনেক বছর আগে দণ্ডকে যাই নানা প্রকৃতির গল্প শুনি এই দুই ভ্রাতার অসুরদের হত্যা করার ঘটনা সম্পর্কে। ঋষি বিশ্বামিত্রের আদেশমত ওই দুই ভাই নানা ঘটনা ঘটিয়ে চলে। আমি সাবধান করি আমার মাতা তাড়কা এবং ভাই শম্ভুকে। এই দুই রাজপুত্র কীভাবে হুমকি দিয়ে থাকে তা জানাই। কিন্তু এটা অবশ্যম্ভাবী যে তিনি মৃত্যুকে লুকিয়ে রাখতে পারেন না। আমি বার্তা পাঠাই শম্ভুকে এখানে আসার জন্য কিছু দিনের মধ্যে। আমরা কথা বলার পর আমাদের কর্মপন্থা ঠিক করব কী ভাবে ওই দুই ভ্রাতাকে যুদ্ধে হারানো যায়।’ মরিচন বলেন রাজদরবারের সবাইকে।

‘আমি সহমত মরিচানের সাথে। শম্ভু জানে তাদের যুদ্ধে হারানোর কৌশল। তারা কতটা শক্তিশালী শত্রু আমাদের এটা জানা উচিত। আমাদের তাদের বিরুদ্ধে নামতে হবে।’ নানাশ্রী তা বোঝানোর চেষ্টা করে দশাননকে।

‘আপনি কী অন্ধ? আমার ভগিনীর যন্ত্রণা দেখতে পান না? আমি আর একদিন অপেক্ষা করতে রাজি নই। আমি তাদের ধ্বংস করব।’ দশানন চিৎকার করে ওঠে।

‘ভারত লঙ্কেশ, আপনি খুব ভালোভাবেই জানেন আমাদের ভ্রাতুষ্পুত্র খর এবং দুশনের কথা। এটা খুবই অসম্ভব বিশ্বাস করা যে তাদের সেনাবাহিনীর পয়ত্রিশ জনকে এই দুই মানব তাদের শক্তির দ্বারা হত্যা করেছে। তারা অবশ্যই শক্তিশালী আমরা স্বীকার করি বা না করি।’ বিভীষণ বোঝানোর চেষ্টা করেন।

দশানন থেমে যান এবং কিছু সময়ের জন্য ভাবতে থাকেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে হবে এই সময়। আমার পুত্র নারান্ত্বক হবে আমাদের পথপ্রদর্শক। মেঘনাথকে খবর দেয়া হয় যাতে সৈন্যদের যথাযথভাবে প্রস্তুত রাখে। নারান্ত্বক তাদের পরাজিত করবে এবং নিয়ে আসবে এখানে।’

দশাননরা তিন দিন অপেক্ষা করে মামা শম্ভুর সাথে লঙ্কা পৌঁছানোর জন্য। তার মা'র মৃত্যুর পর শম্ভু আত্মসমর্পণ করে রামের কাছে। সে রাজি হয়ে যায় চিরকালের জন্য দণ্ডকারণ্য ছেড়ে আসার। দশানন বিষন্ন হয়ে পড়ে। মীনাক্ষীর অপমান বারবার বিঁধতে থাকে। মামা শম্ভু রাম এবং লক্ষ্মণ সম্পর্কে যা জানেন সব বলে দেন দশাননকে।

‘আমার প্রভু লঙ্কেশ রাম এবং লক্ষ্মণ কোন সাধারণ মানব না। তারা ক্ষত্রিয়। তারা রঘুবংশী রূপে চিহ্নিত। তারা গুরু বশিষ্ট এবং মুনী বিশ্বামিত্র দ্বারা পরিচালিত। যুদ্ধবিদ্যায় এবং ধনুর্বিদ্যা আমি তাদেরকে খুব সাবলীলভাবে পরাজিত করতে দেখেছি অন্যদের। তারা রাজা দশরথের সন্তান এবং অযোধ্যার রাজপুত্র। আমি শুনেছি রাজা দশরথের তিন রানির আজ্ঞা পালন করার জন্য রাম এবং লক্ষ্মণ বনবাসে যায়। তারা বিস্ময়কর ভাবে পশ্চিম প্রান্তে দন্ডকে থাকার মনস্থির করে। সেই সময় তারা বিশ্বামিত্রের কাছে সবরকম অস্ত্র চালানোর বিদ্যা আয়ত্ত করে। পরিবর্তে গুরুর আদেশমত অসুরদের নিধন করতে থাকে এবং তাদের সাথে বনবাসে আসেন সীতা, মিথিলার রাজা জনকের কন্যা।’

দশাননের চোখে বিদ্যুৎ খেলে যায়। তেরো বছর আগে এই নাম শুনেছিলেন দশানন স্বয়ম্বর সভায়।

‘সীতা, রাজা জনকের কন্যা?’ দশানন তাকে ভোলেননি।

‘ভারত লঙ্কেশ রাম সেই রাজপুত্র অযোধ্যার। যিনি মিথিলায় সেই প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েছিলেন। তিনি সেই পুরুষ যিনি শিবের ধনুক ভেঙেছিলেন।’ বিভীষণ বলেন।

‘সীতা রামের স্ত্রী ...আপনি সত্যিই জানেন সীতা জনকের কন্যা?’ প্রশ্ন করেন দশানন। ‘আমি নিশ্চিত প্রভু তিনি জানকী, জনকের কন্যা।’ মামা শম্ভু বলেন।

‘কিন্তু লঙ্কেশ বনবাসে থাকা দুই ভ্রাতাকে আক্রমণ করা সঠিক হবে না। যতদিন না পর্যন্ত তাদের বনবাস সমাপ্ত হচ্ছে তাদের উপর আক্রমণ করা সঠিক হবে না। আমাদের আরও ধৈর্য ধরা উচিত।’ নানাশ্রী বলেন।

‘এইক্ষেত্রে আমাদের অন্য পদ্ধতিতে প্রতিশোধ নিতে হবে। তারা মীনাক্ষীর সাথে যেরূপ ব্যবহার করেছে আমিও তাই করতে চাই।’ দশানন বলেন।

‘প্রভু ঠিক কী করতে চান?’ মন্দোদরী ভয় পায় তার স্বামীকে নিয়ে। ‘আমরা কোন যুদ্ধ প্রস্তুতি করতে চাই না। তারা প্রভাবিত করছে আমাকে।’ দশানন বলেন।

‘আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে প্রিয় প্রভু? তাদের এতদূর এসে যুদ্ধ করার কোন উদ্দেশ্য থাকবে বলে আমার মনে হয় না।’ মামা শম্ভু বোঝানোর চেষ্টা করেন দশাননকে।

আমরা তাদের কাছে এক পন্থা উপস্থিত করব তাদের দেওয়া ওষুধ দিয়ে তাদেরকেই মারব। আমি এটা করেই ছাড়ব। দশানন মামা মরিচনের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তারা আপনাকে দেখেছেন আপনি আমার সাথে আসুন। আমরা কালই দন্ডকে যাব।’

সকল অধ্যায়
১.
অহল্যা, দ্রৌপদী, সীতা, তারা, মন্দোদরীপঞ্চসতীর প্রতি নিবেদন
২.
সূচনা
৩.
বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী
৪.
বিবাহ পর্যায়ে মন্দোদরী
৫.
দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ ও মন্দোদরী কথা
৬.
বজ্রজলা ও মন্দোদরী
৭.
অমৃতের সন্ধানে দশানন ও তার প্রতিক্রিয়ায় মন্দোদরী
৮.
দশানন, বালী ও মন্দোদরী
৯.
মহান্ত, মাতা কৈকেসী ও মন্দোদরী
১০.
মন্দোদরী ও ঋষি ঘৃতস্মদা
১১.
আত্মশ্লাঘা ও মন্দোদরী
১২.
জীবন সন্ধিক্ষণে মন্দোদরী
১৩.
মন্দোদরী ও দশানন
১৪.
মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ
১৫.
মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন
১৬.
যোদ্ধা মেঘনাদ
১৭.
মেঘনাদের বিবাহ ও মন্দোদরী
১৮.
দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী
১৯.
সীতা হরণ ও মন্দোদরী
২০.
বানর ও লঙ্কা
২১.
অহিরাবণ
২২.
যুদ্ধে মেঘনাথ ও মন্দোদরী
২৩.
লঙ্কার রানি মন্দোদরী
২৪.
ফিরে দেখা
২৫.
ঋণ স্বীকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%