পারমিতা চক্রবর্তী
মন্দোদরীর কাছে দিন রাতের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। শোকের প্রধান কারণ তার সন্তান। এই ক্ষতি কোনদিনই মন্দোদরীর পূরণ হবার নয় পরবর্তীতে তার হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে এবং অনেক কিছু সহ্য করতে শিখেছে এবং কীভাবে লঙ্কা থেকে দূরে থাকতে হয় তাও শিখেছে।
তাদের ভারতবর্ষের দক্ষিণ প্রান্তে ঘুরতে প্রায় এক মাসেরও অধিক সময় লেগে যায়। রক্ষীরা জানতে চায় তারা দক্ষিণ প্রান্তে থাকবে কিনা। প্রত্যেককে ঘটনাটি গোপন রাখতে আদেশ দেওয়া হয়। তখন এক দাসী পরিকল্পনা করে। সে সকলের জন্য খুব ভালো রান্না তৈরি করে তাতে বিষ মিশিয়ে দেবে ঠিক করে। তারা তাদের রাতের খাওয়া শেষ করে যখন ঘুমাবে তখন চিরনিদ্রায় চলে যাবে। তাদের দেহ সেখানেই পুড়িয়ে ফেলা হবে। তারা হত্যা করার পরিকল্পনা করতে থাকে যেখানে অন্য রক্ষীরা অপেক্ষারত থাকে। তারা জানে এছাড়া এই তথ্য গোপন রাখা আর কোনো পথ নেই। পরিকল্পনা করে রক্ষীদের মৃত্যুর কারণ কোন কলুষিত খাবার এবং ধ্যান না করার ফল। মন্দোদরী নিজের হৃদয় শীতল পাথর চাপা দিয়ে দাসীদের আদেশ করে এই রক্ষীদের পরিবারের আর্থিক সহায়তা করা হয়। মন্দোদরীর বিমান থেকে তার কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকে রক্ষীরা। দশানন সবাইকে জানিয়েছিলেন মন্দোদরীর আগমন সংবাদ এবং তিনি বিমান পাঠিয়েছিলেন যাতে তারা শীঘ্রই ফিরে আসতে পারে। বিমানে ওঠার একদিন আগেই তাবু খুলে ফেলা হয়। মন্দোদরীর নিজের মনকে প্রস্তুত করে সবকিছু ভুলে যাবার জন্য। লম্বা স্নান করে মন্দোদরী ধ্যানে বসে। নিজেকে সঠিক মত গুছিয়ে নেয় এবং দশাননের সামনে দাঁড়ানোর আগে নিজেকে প্রস্তুত করে আগে। মন্দোদরী জানে তার ব্যবহারে কোন পরিবর্তন দেখা দিবে তার প্রতি কৌতূহল বাড়বে। মন্দোদরী পরের দিন যাত্রা করার আগে সুষম খাদ্য খায় এবং সঠিক সময়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়।
মন্দোদরী সঠিকভাবে সজ্জিত হয়। সুন্দর সিল্কের শাড়ি, অলংকার খচিত শাল মন্দোদরী সকল দুঃখ যেন চাপা পড়ে যায়। মন্দোদরী যে স্থানে ছিলেন এতদিন সেখান থেকে প্রস্থান করে এবং মাই মাথায় চুম্বন করে। মন্দোদরী একাই বিমানে রওনা দেয়। মাই তার সাথে যেতে চায় না। মন্দোদরী তাকে জানান সে তার মায়ের মত তার শক্তি স্তম্ভ কিন্তু তাকে মাই তাকে জানায় বিবাহিত মেয়েদের সাথে মায়ের দীর্ঘদিন থাকা মোটেই শোভনীয় নয় তাই তিনি মায়ারাষ্ট্রে ফেরত যাবেন।
‘তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। আমি খুব আনন্দিত আমার রাজ কন্যাকে দেখে।’
‘মাই আমার কি দশাননকে বলা উচিত কি ঘটেছিল? তিনি আমার স্বামী আমার সন্তানের পিতা ...’
‘খুব ভালো বলেছ মন্দোদরী। যদি তোমার বিবাহিত জীবনকে শান্তিপূর্ণ সুন্দর ভাবে কাটাতে চাও তবে কোনো কথা বলোনা লঙ্কেশ্বরকে।’
‘কিন্তু আমার খুব অপরাধী লাগছে নিজেকে। আমি আমার অপরাধ লোকাতে পারি কিন্তু আমি তাকে ঢাকবো কী করে?’
‘তোমার অপরাধী হবার মত কী হয়েছে?’
‘অপরাধ হলো আমি গোপন করেছি আমার স্বামীর থেকে। অপরাধ হল আমি সন্তানের জন্ম দিয়েছি কিন্তু আমি তাকে ধরে রাখতে পারিনি!’
‘তোমার কোন মেয়ে নেই। বিষয়টা এমন নয় যে তুমি তোমার মেয়েকে লুকিয়ে রেখেছো তার থেকে।’
‘কিন্তু যদি তিনি জানেন? আমি যদি এই সন্তানের কথা বলতাম তিনি কী এইভাবে তাকে জন্ম নিতে দিতেন? তিনি হয়তো তাকে নিরাপদে পৃথিবীতে আসার কিছু ব্যবস্থা করতেন...
তিনি কী এভাবে আমাকে একা ছাড়তে?
‘তোমার নিজেকে অপরাধী ভাবা বন্ধ করো এবার। তুমি তোমার জীবনে এই দুর্ভাগ্যজনক দশাকে লুকিয়ে রেখে সঠিক কাজ করেছে। এই ভাবনাটা সঠিক না হলে তুমি শক্ত হতে পারতে না। তুমি দশাননের মুখোমুখি হতে পারতে না অপরাধী মন নিয়ে।’
‘আমি আর কীভাবে তার মুখোমুখি হতাম?’
‘তুমি একে প্রতিশোধ ভেবে থেমে যাও। তুমি তার কাছে সম্পূর্ণ বিষয় গোপন রেখেছ কারণ তিনিও তোমার কাছে অনেক বিষয় গোপন রাখেন। মনে করো নারীর প্রতি তারা আসক্তির কথা। মনে কর তার অহংবোধ। তিনি তার থেকে কাউকে মহান ভাবেন না। মনে করো তোমার বিবাহিত জীবনের স্বপ্ন ভঙ্গের কথা।’
‘আমি তার প্রতিশোধ নেব নিজেকে দিয়ে?’
‘অবশ্যই তুমি নিজেকে দিয়েই তা পূরণ করবে। তুমি বহু নারী শরীর স্পর্শ করেছেন তার কামার্ত হাত দিয়ে এবং তিনি দুর্ভাগ্যবান যে তার প্রথম কন্যা সন্তানকে ধরে রাখতে পারেননি। তার শব্দ নিক্ষেপ করার সময় কোন জ্ঞান ছিল না। মাই চেয়েছিল যেভাবেই হোক উদ্ধার করতে তাকে এই অপরাধবোধের মানসিকতা থেকে।
মন্দোদরী এগিয়ে যায় বিমান অবতরণের জন্য।
যত শীঘ্র সম্ভব বিমান অবতরণ করে, এগিয়ে এলেন দশানন তার দিকে। তার চোখে যেন স্ফুলিঙ্গ দেখা যায়।
‘স্বাগত প্রত্যাগমনের জন্য মন্দোদরী। তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। আমার মনে হয় তোমার প্রীতিলতা ফলদায়ক হয়েছে।’ দশানন মৃদু হেসে বলেন।
‘আপনাকে ধন্যবাদ আমাকে যাত্রার আদেশ দেওয়ার জন্য।’
‘তুমি এখন বিশ্রাম নাও আমি রাতে তোমার সাথে দেখা করবো।’
মনে হলো নিজেকে কেন যুদ্ধ জয় করে ফিরে এসেছে। রানি মহলের সকল দাসীগণ তাকে অভ্যর্থনার জন্যে এগিয়ে আসে।
রানি প্রায় নয় মাস অন্তঃপুর থেকে বিচ্ছিন্ন ফলস্বরূপ অনেক নতুন মুখ তার চোখে পড়ল। এর অর্থ দশানন অনেক নতুন নারীকে সঞ্চিত রেখেছেন তার শয্যায় তার অনুপস্থিতিতে। কিন্ত মন্দোদরী চুপ করে থাকে কারণ তার বলার কিছু ছিল না।
বজ্রজলা, সরমা, ধন্যমালিনী অপেক্ষারত তার কক্ষের বাইরে। তাকে ভালোবাসা এবং পুরানো ঝগড়া পুনরাবৃত্তি উদ্দেশ্যে অভিনন্দন জানায়। কঠিন সময় কাটানোর পর ফিরতে হয় মন্দোদরীকে পুরানো ছন্দে। সেই রাতে এলেন তাঁর কক্ষে। তারা অনেক রাত অব্দি হাঁটলেন। মন্দোদরী দুঃখিত কারণ তার জীবনে এই অধ্যায়গুলো জানতে জানাতে পারলো না তাকে। মন্দোদরী দশাননের চোখে চোখ রাখতে পারে না কারণ তিনি খুব ভালো বুঝতে পারতেন তাকে। যখন মন্দোদরী তার কাছে যায়, ‘আমার মনে হচ্ছে তুমি কত শতাব্দীর জন্য চলে গিয়েছিলে।’
‘আমি তো মাত্র কয় মাসের জন্য গেছিলাম প্রভু।’
‘তারপর দিন সংখ্যা বাড়তে থাকে মাসের মধ্যে।’
মন্দোদরী খুশি হয় তার স্বামীর এই ছলনাতে। দশাননের কাছে জানতে চায় রাজ্যের এবং রাজদরবারের কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা।’
‘সব সঠিক মধ্যেই চলছে। শুধুমাত্র সর্বত্রই তোমার অভাব চোখে পড়ে।’
‘সত্যি তাই প্রভু।’
আমাদের চিরশত্রু কাতৃভ্য অর্জুন, হরিয়াসের সাথে চেষ্টা করছেন ইন্দ্রের সাথে সন্ধি করানোর জন্য। কুবের এবং সকল দেবতা ইন্দ্রকে বুঝিয়ে চলেছে যাতে এই সন্ধি না হয়।
‘এই সন্ধি আমাদের জন্য খুবই অশুভ হবে।’
‘কাতৃভ্য অর্জুন খুব শক্তিশালী রাজা। ইন্দ্র তাকে ব্যবহার করবে আমার বিরুদ্ধে যেতে। যদিও কুবের কোনরকম নতুন বন্ধুত্বের ঝুঁকি নেবে না পুরনো শত্রুর বিরুদ্ধে।’
‘তবে কি আমাদের আরো সজাগ হওয়া উচিত?’
‘অবশ্যই আমাদের আরো সজাগ হওয়া উচিত। আমার মন্ত্রীদের এবং আমার উপলব্ধি বলছে যে আমার বিরুদ্ধে তাদের মাথায় কোন দুষ্টবুদ্ধি এসেছে তাই তারা অর্জুনকে সাথে নিতে চায়। আমাদের গুপ্তচররা আমাদের জানিয়ে দিয়েছে দুষ্টুবুদ্ধি গত দু'বছর এসেছে হরিয়াস থেকে। আমার মনে হয় মীনাক্ষী সবটাই জানি। তুমি মীনাক্ষীর কাছে জানতে চাও তার স্বামীর আসল উদ্দেশ্য কী?’
‘দুষ্টুবুদ্ধির উদ্দেশ্য... কিন্তু প্রভু মীনাক্ষী মোটেই পছন্দ করবে না যদি আমি তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করি। সে নিজেকে আরও সংযত করে নেবে। এই বিষয়টি ব্যক্তিগত যা কোনোভাবেই আপনার দরবারে সঙ্গে যুক্ত নয় আমি আগে তার আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে চাই তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করব। আপনার মনে হয় সত্যিকী ভাবছে?’
‘এটা অনেক কারণ হতে পারে আমাকে ধ্বংস করা, আমার ক্ষতি করা অথবা আমাকে ক্ষুব্ধ করা।’
‘এখন আমি যেতে চাই প্রভু আপনার কোন কিছু হবেনা আমি আশ্বস্ত করলাম আমি অন্তঃপুরে কিছু নারীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছি বাগানে জমায়েত হবার জন্য। আমি সকলের সাথে দেখা করতে চাই যারা এখানে এসেছেন আমি যাবার পর। এই জামায়েতের কারণে মীনাক্ষিকে আমন্ত্রণ করা যাবে এবং সেখানে আমি তার সাথে খোলাখুলি কথা বলব। সবাইকে খুব শীঘ্রই আমন্ত্রণ করা হবে।’
ধীরে ধীরে বাগান ভরে ওঠে সেই নারীদের সমাগমে। মন্দোদরী ত্রিজাতার সাথে দেখা করে ফিরে আসার পর।
আমার উপহার হল ‘আপনি’ সে বলে।
‘আমি সর্বত্রই তোমাকেই খুঁজি। কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি। আমি দাসী পাঠিয়েছিলাম তোমাকে নিয়ে আসার জন্য কিন্তু তারা গিয়ে কাউকে দেখতে পায়নি।’
‘আমি শুনেছিলাম আপনার যাত্রার কথা।দুঃখের সাথে আমি মানতে পারিনি। কালই শুনলাম আপনি এসেছেন।’
তাকে খুব দুর্বল লাগে। চোখগুলো যেন বুঝে আসে।
‘সবকিছু ঠিক আছে ত্রিজাতা? তোমাকে দেখতে এমন...’
‘আমি আমার সন্তানকে হারিয়েছি আপনার মহিমায়।’ চুপ করে থাকে ত্রিজাতা এবং অনবরত চোখ দিয়ে জল পড়ে।
মন্দোদরী যেন নিজেকে দেখতে পায় তার চোখে। পঞ্চাশ দিন অতিবাহিত হয়েছে মন্দোদরী তার সন্তানকে হারিয়েছে। তার গলা ধরে আসছিল।
‘সত্যিই? আমি দুঃখিত তোমার এই ক্ষতির জন্য। কী ভাবে হল এমন?’
‘সে আমার প্রথম সন্তান, আমার একমাত্র কন্যা। তার বয়স মাত্র চার বছর। গত দুই মাস ধরে অসুস্থ ছিল কিছুদিন আগে তার জ্বর কিছুতেই কম ছিলনা। আমি সব রকম ভাবে চেষ্টা করি, লঙ্কেশ্বর নিজের চিকিৎসক পাঠান আমাদের সাহায্য করার জন্য।কিন্তু তাকে বাঁচানো যায় না।’
‘তোমার দুঃখ বুঝতে পারছি আমি গভীরভাবে মর্মাহত।’
সদ্যজাত সন্তানকে হারানোর যন্ত্রণা উপলব্ধি করে মন্দোদরী। ত্রিজাতাকে খুবই বিধ্বস্ত লাগে, পূর্বে তার বহু গর্ভস্রাব হয়েছে এবং একমাত্র সন্তানকে ধরে রাখতে পারিনি। ঈশ্বর তার জন্য খুবই নিষ্ঠুর। তার পক্ষে সম্ভব নয় তার প্রথম সন্তানকে ভোলা।
মন্দোদরীর পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয় শিক্ষা নেওয়া ছাড়া। তারা দুজনে একই নৌকায় হাঁটছে। সে তার সন্তানকে হারিয়েছে, তার পক্ষে শোক প্রকাশ করা ছাড়া কিছুই করার নেই। তার ক্ষতিকে পূরণ করতে পারে এমন কেউ পৃথিবীতে নেই। তাকিয়ে দেখে মন্দোদরী চারিদিকে যেখানে উপস্থিত ছিল না নয়নন্দিনী, তার স্বামীর নতুন পত্নীকে। যারা মন্দোদরীকে দেখতে এসেছিল সবার দিকে তাকিয়ে থাকে সে। ওরই মধ্যে যারা সামনে বসে ছিল এবং মীনাক্ষীকে দেখে।মীনাক্ষী স্বামীর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা চোখে পড়ে। মন্দোদরী জানত মীনাক্ষী দুষ্টুবুদ্ধির এই পরিকল্পনা নিয়ে কিছুই যানে না। কারণ দশাননকে সে অসম্ভব ভালবাসে এবং শ্রদ্ধা করে। মন্দোদরী চায় মীনাক্ষীর সাথে কিছু মুহূর্ত কাটাতে এবং নিজেদের মধ্যে কথা বলতে।
‘বৌদি মন্দোদরী, আমি খুব আনন্দিত আপনি এত সুন্দর একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন বলে। বলুন আপনার যাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু কথা। আপনার পছন্দের জায়গা। আমরা সব জানতে চাই আপনার থেকে।’ মীনাক্ষী প্রশ্ন করে।
‘আমি বলেছি ...আমি অনেক কথাই বলেছি তোমার বোন মীনাক্ষী সাথে।’
‘আমার পিতৃগৃহ ভ্রমণের পর মায়ারাষ্ট্র থেকে যাই। তারপর বদ্রিকাশ্রম যাই পূন্যকর্ম করার জন্য। খুব অপূর্ব স্থান, পর্বত, ঝর্ণা, পাখি, জল সর্বত্র যেন স্বর্গীয়। আমার মনে হয় তোমার উচিত ভারতবর্ষের উত্তর প্রান্তে ঘুরে দেখা উচিত মীনাক্ষী।’
‘কখনো হবে হয়ত, বৌদি মন্দোদরী।’ মীনাক্ষী অল্প হেসে উত্তর দেয়।
‘সবকিছু ঠিক আছে তো বোন মীনাক্ষী? তুমি এই বিবাহে খুশি তো?’
‘অবশ্যই, কিছু সময় তিনি ব্যস্ত থাকেন। বিদ্যুতজীব সর্বদা চেষ্টা করেন আমাকে খুশি রাখতে। কিন্তু কিছু মন্ত্রী কালকেয়কে চেষ্টা করেন প্রভাবিত করতে আমার মনে হয়।’
‘প্রভাবিত করে তাকে? কীভাবে? তুমি কী তাকে তোমার এই অনুভূতির কথা জানিয়েছ?’
‘না জানাইনি। কিন্তু সবাই জানে আমাদের বিবাহ রাজাকে খুশি করতে পারেনি। আমার স্বামী খুশি নন তাকে এ নতুন নাম দেওয়া হয়েছে। তাদের জাতির লোক বিষয়টি ভালো নেননি। কিছু জিনিস কখনো ভালো হয়নি লঙ্কেশ্বর এবং কালকেয়র মধ্যে। তাদের রাজপুত্রের অপমানকে তারা ঠিক মেনে নিতে পারেননি।’
কিন্তু লঙ্কেশ্বর এক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার তিনি তার এক মন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। আমার মনে হয় তিনি তোমাকে এই বিষয়ে উৎসাহ দেবেন।’
‘এটুকুতেই সন্তুষ্ট বৌদি। বিদ্যুতজীব ভয়ঙ্কর প্রতিবন্ধ। তিনি একজন পথ প্রদর্শকের কাজ করবেন সেনাবাহিনীতে। কিন্তু আমার দাদার রাজত্বে মন্ত্রী হওয়ার মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।’
‘আমি তোমাকে জোর করব না কিন্তু তোমার স্বামী যদি খুশি না হন তার প্রাপ্য সম্মানে সে বিষয়ে তাঁর দশাননক জানানো উচিত নয়?’
‘আমি খুব ভীত যে ভারত দশানন কোন ভাবেই তার অনুরোধ গ্রহণ করবেন না এবং আমার স্বামী এই নিয়ে খুবই চিন্তিত এবং দায়বদ্ধ তার অনুভূতি নিয়ে।’
মন্দোদরী মনে করে মীনাক্ষী একজন সাদাসিদে মানুষ এবং জানেনা দুষ্টবুদ্ধির উদ্দেশ্য সম্পর্কে। মন্দোদরী দেখে মীনাক্ষী তার স্বামীর প্রতি ভালোবাসার কথা, এর মধ্যে লক্ষ্য করে যে সে কিছু কিছু জিনিস লুকানোর চেষ্টা করছে।
পরেরদিন মন্দোদরী রাজদরবারে প্রবেশ করে দেখেন দশানন তার মন্ত্রী এবং সহকর্মীদের সাথে পরিকল্পনায় ব্যস্ত। তিনি কক্ষের কেন্দ্রে বসে পালকের দ্বারা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে চলেছেন। মন্দোদরী দশাননকে মীনাক্ষীর সাথে সম্পূর্ণ কথোপকথন জানাতে চায়।
‘আহ ... রানি মন্দোদরী! কিছুক্ষণ ধরে আমার তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করছিল!’
‘প্রভু আমি আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।’
‘অবশ্যই কিন্তু প্রথমে বলো তুমি এখানে কেন এসেছ এবং আমি যে তালিকা প্রস্তুত করছি তা কী দেখেছ? এটা জন্মকুন্ডলী এবং জন্মবৃত্তান্ত বলছে যে সুপ্রসন্ন সময়, দিন এবং জন্ম বৃত্তান্ত ...’
‘এটি একটি জন্ম বৃত্তান্ত এবং জন্মকুণ্ডলী ...কার প্রভু?’
‘এটা আমাদের পুত্রের জন্মকুণ্ডলী।’ দশানন উত্তর দেন।
কিছুটা ভীত হয়ে বলে, ‘আমাদের পুত্র?’
‘হ্যাঁ আমাদের পুত্র... এটা সম্ভবত ইতিহাসে প্রথমবার হয়েছে যে কেউ তার পুত্রের পরিকল্পনা করছেন এবং করবে না কেন? আমাদের যথেষ্ট জ্ঞান আছে, পরিসংখ্যান এবং দক্ষতা আছে।’
‘প্রভু আপনি সচেতন এ বিষয়ে যে আমি জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কোন প্রকার পড়াশনা করিনি এবং আমি নিশ্চিত নই যে আপনি তৈরি করতে পারবেন কিনা আগত শিশুর জন্ম কুণ্ডলী।’
‘আমাকে আগে বর্ণনা করতে দাও মন্দোদরী। যখন একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে তখনই সম্ভাব্য জন্ম কুণ্ডলী তৈরি হয় তার জন্মস্থান, তারিখ অনুযায়ী এবং গ্রহের অবস্থান অনুযায়ী। আমি সেই পদ্ধতিকে পরিবর্তন করেছি এবং তৈরি করেছি একটি কুন্ডলী যাতে দেখা যাচ্ছে এক মহরথী হবে এবং সকল অস্ত্র অপারদর্শী হবে। সে হবে উপযুক্ত বাবার উপযুক্ত ছেলে।’
‘প্রভু আমি আপনার গণনার বিঘ্ন ঘটাব না কিন্তু আপনি নিশ্চিত ভাবে কি করে জানলেন যে সে ছেলেই হবে।’
দশানন মন্দোদরীর প্রশ্ন শুনে হেসে ওঠে। ‘প্রিয়তমা মন্দোদরী এটা খুব সরল গণনা আমাদের প্রথা অনুযায়ী। এটা দেখাচ্ছে যে এক বছরের মধ্যে তোমার জটিল মাতৃত্বের সম্ভাবনা ছিল কিন্তু সে অবস্থা এখন চলে গেছে এবং আমরা গণনায় দেখেছি যে আগত সন্তান আমাদের পুত্র হবে।’
মন্দোদরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। মন্দোদরী খুবই উদ্গ্রীব হয় এটা দেখার জন্য যে তাদের গণনা সত্যি হয় কিনা।
‘তোমার মনে কোন প্রকার সন্দেহ আছে?’ দশানন প্রশ্ন করে এবং হেসে তাকায় নানাশ্রীর দিকে।
‘আপনার নির্দেশ অনুযায়ী সকল গণনা শেষ হয়েছে এবং দেখা যাচ্ছে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। আমাদের পরামর্শদাতা যারা গ্রহের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেয় তারা বলেছেন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে। নবগ্রহ গুরু যারা আমাদের বিশেষ অতিথি তারা জানিয়েছেন আপনি যা চান তাই হবে।’
‘আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি কিন্তু লঙ্কেশ্বর এই সিদ্ধিলাভের দ্বারা আমরা ব্যক্তিগত ভাবে কি উপকৃত হব? আমি কোন ভাবে সাহায্য করতে পারব না কিন্তু আমরা আমাদের ভুলগুলোকে আবিষ্কার করতে পারব।’
দশানন ক্রুদ্ধ ভাবে তাকায় এবং বোঝা যায় তিনি কোনো আপত্তিতে কর্ণপাত করতে রাজি নন।
‘আমরা আগে এই নিয়ে আলোচনা করেছি মন্দোদরী এবং তুমি কী অন্য কিছু বলতে চাও, আমি তোমার সাথে আলাদা ভাবে কথা বলতে চাই তোমার কক্ষে।’
মন্দোদরী তাড়াতাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করে এবং অপেক্ষা করে সাক্ষাৎ করার জন্য। তিনি যখন মন্দোদরীর কক্ষে প্রবেশ করেন তাঁকে পূর্ণ উত্তেজিত দেখায় এবং মন্দোদরী সতর্ক হয়ে যায় সে যাতে কোনরূপ আপত্তিকর কথা না বলে। মন্দোদরী জানায় তার ভগিনী জানে না তার স্বামীর উদ্দেশ্য কী এবং সতর্ক করেছেন এই বলে যে তার মধ্যে অনেক কিছু হওয়ার প্রবণতা আছে কারণ তিনি খুবই বুদ্ধিমান।
‘দুষ্টুবুদ্ধি কী পরিকল্পনা থাকতে পারে?’
‘আমি খুব আমি খুব শীঘ্রই তা জানতে পারবো মন্দোদরী। আমি খরাকে আদেশ করবো পর্যবেক্ষণ রাখতে গোটা ঘটনার। এখন আমি গর্বিত যে এটা দেখে আমার বোনকে আমার বিরুদ্ধে নিয়ে যায়নি।’
"আমি দুঃখিত আমার তাৎক্ষণিক অনুভূতি প্রকাশের জন্য। রাজদরবারে আমি এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চাইনি কিন্তু আমার মনে হল এই বিষয়ে তাদের সাহায্য না নেওয়া ভালো। তারা যদি আমাদের ধ্বংস করে দেন।’
‘তারা এখানে রক্ষিত অতিথিরূপে বন্দী রূপে নয়। তুমি চিন্তা করো না তারা এখানে কেউ বন্দীদশায় নেই। আমার রাগ হয়েছিল যখন তুমি আমার দৃষ্টিভঙ্গি ধরতে পারনি। আমি চাইনা আমার পুত্র আমার মত সংগ্রাম করুক। আমার শৈশব যৌবন সব চলে গেছে উন্নতির জন্য সংগ্রাম করতে করতে। আমাকে লড়াই করতে হয়েছে আমার অধিকার, আমার শিক্ষা, আমার জাতি বংশ এবং পরিবারের জন্য। বর্তমানে আমি চাই এক পুত্রসন্তান যে সকল সুযোগ-সুবিধা পাবে। তোমার কী মনে হয় আমি ভুল কিছু বলছি?’
‘প্রভু আমার অনুমান করার ক্ষমতা খুবই সীমিত। আপনি আপনার মত করে ব্যাখ্যা করেছেন, আমার মনে হয় না আপনি ভুল হবেন পিতা রূপে।’
দশাননের কার্যকলাপ কতটা ভুল তাতে কিছু যায় আসে না মন্দোদরীর। দশাননের উদ্দেশ্য মন্দোদরীকে উপলব্দি করতে সক্ষম হয়েছে যে তিনি একজন প্রকৃত বাবা। সম্পূর্ণ জীবন তার পুত্রের জন্য। মন্দোদরী দশাননের উপর কিছু কিছু বিষয় রাগ করলে বিশ্বাস করে যে দশাননের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। তাই সে চায় তাদের তাদের প্রথম সন্তান যেন পৃথিবীর সর্বশক্তিমান পুরুষ হয়ে ওঠে। দশানন তার রানিদের থেকে মন্দোদরীকে সর্বদাই আলাদাভাবে দেখেন; তিনি চান মন্দোদরীর সন্তানের পিতা হতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন