পারমিতা চক্রবর্তী
তারা চলে যাবার তৃতীয় দিন পর বানররা একত্রিত হয় লঙ্কার শহরের প্রবেশের মুখে। এক সতর্কতা ঘন্টা বেজে ওঠে যুদ্ধের জন্য। লঙ্কার সেনা লাইন দিয়ে অপেক্ষা করে যুদ্ধের আরম্ভের জন্য। বিখ্যাত অসুর ব্যূহ শাঁখ বাজিয়ে যুদ্ধের সূচনা করেন। ত্রিকূটের তিনটি পথকে সুরক্ষিত করা হয়। একটি পথ যা উত্তর দিক থেকে লঙ্কার সেনা আক্রমণ করবে ঠিক করে লঙ্কার ধূমরক্ষা, নিকুম্ভ, জাম্বুমালী, বিরুপাক্ষ প্রথমদিকে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসে। লঙ্কার সেনা প্রস্তুত থাকে যুদ্ধের জন্য কিন্তু রামের সেনা কোন নড়াচড়া করে না। মানুষের বদলে বহু বানর পাঠায় লঙ্কা শহরে। একশোর বেশী বানর পাঠানো হয় লঙ্কায়। তারা সমস্ত শহরে তোলপাড় করে ফেলে। সমস্ত লোহার প্রতিবন্ধকগুলো ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে তারা। তাদের সংখ্যা এত বেশি লঙ্কার সেনা হিমশিম খেয়ে যায়। চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় লঙ্কায়। তাদের হাতে কোন অস্ত্র শস্ত্র ছিল না। কোন প্রকার আক্রমণ তারা করেনি। কিন্তু প্রচুর ক্ষতি করে দেয় লঙ্কায়। আশেপাশে গৃহে লুকিয়ে থাকে, ভয় দেখায় সবাইকে। চারিদিকে লাফালাফি করে দরজা-জানলা বারান্দায়। ধন্যমালিনী এবং মন্দোদরী এক নিরাপদ জায়গায় থাকে। ন্যায়নন্দিনী এবং অন্য পুত্ররা সেখানে চলে যায়। লঙ্কার সেনা তাদের ধরে ফেলার চেষ্টা করে। একজন বানরকে ধরতে তিনজন সেনা লাগে।
লঙ্কার সেনা তাদেরকে এই আক্রমণকে ঠেকাতে অসমর্থ হয়। এই কর্মযজ্ঞে তারা ভুলে যায় যে প্রবেশ দ্বারের বাহিরে অপেক্ষারত রামের সেনা। রানিমহলকে সুরক্ষিত করা হয়। দশানন নিজে লক্ষ্য রাখেন রানিমহল ছাড়াও কিছু স্থান। সেনারা আলো জ্বালিয়ে দেখে বাড়ি, প্রাসাদের কোন স্থানে বানর লুকিয়ে আছে কিনা। তারা ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রকারের শক্তিশালী আতসকাচ। অন্যান্য মহল থেকে কী সংবাদ আসে সেই নিয়ে মন্দোদরী খুব চিন্তায় থাকে। এক রক্ষী শেষ খবর দেয় তাদের। ধূমরক্ষা এবং তার সেনাবাহিনী আক্রমণ করে বানরদের এবং শীঘ্রই যুদ্ধ শুরু হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দুপক্ষেরই প্রায় সমান।
‘নিকুম্ভ? নিকুম্ভ কই?’ প্রশ্ন করে বজ্রজলা।
‘তিনি পাহারা দিচ্ছেন পশ্চিমপ্রান্ত তার সেনাবাহিনী নিয়ে। তার দল যুদ্ধ করবে না রক্ষী জানায় এবং যাওয়ার আগে বজ্রজলাকে শান্তি দিয়ে যায়। বজ্রজলা জানায় সে লক্ষ্য করেছে চারিদিকে খারাপ লক্ষণ যা তার পুত্রের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বজ্রজলা মনে প্রাণে চায় তার পুত্র'র সেনাবাহিনী ও পুত্র দেরী করে যুদ্ধে নামুক।
রক্ষীর থেকে সংবাদ আসতে কিছুটা দেরি হয়। হনুমান ভেঙে ফেলেছে ধুমরক্ষার রথ। ধূমরক্ষা খুব শক্তিশালীভাবে যুদ্ধ করার চেষ্টা করে কিন্তু দুঃখজনক ভাবে হনুমান তাকে পরাজিত করে। লঙ্কেশ্বর পাঠান বজ্রদ্রংস্টা এবং তার সেনাবাহিনীকে পরবর্তীকালে অঙ্গদ এবং তার দল এগিয়ে যায় পূবের দিকে। সূর্যাস্ত হওয়ার পর আবার শাঁখ বাজানো হয়। সেনাবাহিনীর ঢুকে যায় শহরের মধ্যে। সেদিনের যুদ্ধ তখনই সমাপ্ত হয় রক্ষী তার শেষ সংবাদ পরিবেশন করে।
‘আপনার মহিমা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উভয়দিকে সমান। এক রক্তাক্ত যুদ্ধ হয় বজ্রদ্রংস্টা এবং অঙ্গদের মধ্যে। দুঃখের সাথে বজ্রদ্রংস্টা মারা যায়। প্রথম দিকে লঙ্কার দুই শক্তিশালী অসুর মারা যায়। ফলস্বরূপ তাদের সেনা শক্তিহীন হয়ে পড়ে নেতৃত্বের অভাবে।
‘লঙ্কেশ কোথায়? আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই।’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে রক্ষীকে।
‘আমি খুবই দুঃখিত রানি। লঙ্কেশ্বর তার সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ক্রীড়াঙ্গনে।’
মন্দোদরী অনুরোধ করে সে যাতে সেখানে গিয়ে দেখা করতে পারে।
‘আমি আপনার বার্তা পাঠিয়ে দিচ্ছি মাতা...’
মন্দোদরী দীর্ঘদিন ধরে গোপনে দশাননের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগ্রহী হয়। মন্দোদরী সীতার কথা যুদ্ধ আরম্ভের সময় বলেছিল দশাননকে। কিন্তু তারপর তার সাথে আর সাক্ষাৎ হয়নি। সারা সন্ধ্যা ধরে মন্দোদরী বার্তা পাঠাতে থাকে যাতে দশাননের সাথে সাক্ষাৎ হয় এবং তিনি বারবার তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনের অদ্ভুত এক বাজনা বাজিয়ে যুদ্ধের সূচনা হয়। অকম্পনা এবং মহোদর দুই মহান অসুরকে পাঠানো হয় প্রহেষ্ঠ'র সাথে যুদ্ধ করার জন্য। ন্যায়নন্দিনী অপেক্ষা করে তার প্রাসাদে তার পুত্রের জন্য প্রার্থনা করে।
রক্ষী জানায়, ‘যুদ্ধ প্রাঙ্গণে অকম্পনা দ্বিতীয়বার আক্রমণ করে হনুমানকে এবং তার বাহিনীর উপর। মহোদর বজ্রব্যূহ তৈরি করে আক্রমণ করে সুগ্রীবকে। লঙ্কেশ্বরকে জিজ্ঞাসা করা হয় প্রহেষ্ঠ কী পূর্বদিকে আক্রমণ করবে?
মন্দোদরী চেষ্টা করে ন্যায়নন্দিনীর সাথে থাকতে এবং তার পুত্রবধূর সাথে সময় কাটাতে। তারা উৎকণ্ঠায় দিন কাটায়।
‘প্রহেষ্ঠ দুর্দান্তভাবে আক্রমণ করে, খুব ভালো প্রতিবন্ধক লঙ্কার।’
‘সুতরাং যুদ্ধে কে পরাজিত হয় গতকাল....’ ন্যায়নন্দিনী জিজ্ঞাসা করে।
মন্দোদরী জানায় ন্যায়নন্দিনীকে যদি সে যুদ্ধ দেখতে চায় তবে উঁচু স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে দেখতে পারে।
‘না মন্দোদরী! আমি কোনভাবেই আমার পুত্রকে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখতে পারব না। আমরা খুবই আতঙ্কিত। আশাকরি আপনি আমার অবস্থা বুঝতে পারবেন। আপনি আকাশ্যকুমারকে হারিয়ে বুঝেছেন। কিন্তু আমাদের ছেলে এতই তরুণ এই যুদ্ধক্ষেত্রে ...’
সেই মুহূর্তে বার্তা আসে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে। ন্যায়নন্দিনী দেখে আরো অবসন্ন লাগে। প্রহেষ্ঠ হত্যা করেছে সুগ্রীবের সেনার বহু মানুষকে। তাঁর অপরিসীম ক্ষমতার দ্বারা তাকে আক্রমণ করেছে যে বানর তার নাম নীল। লক্ষ্মণ চেষ্টা করে করেছে তাকে উদ্ধার করতে প্রহেষ্ঠর হাত থেকে।
‘লক্ষ্মণ, সে কী এখন লক্ষ্মণের সাথে যুদ্ধ করছে?’ ন্যায়নন্দিনী রক্ষীর দিকে ফিরে তাকায়। ‘আমার পুত্র নারান্ত্বককে ডেকে পাঠান এবং বলুন তার ভ্রাতাকে সাহায্য করার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে।’
ধন্যমালিনী চেষ্টা করে তাকে শান্ত করতে, ‘নিজেকে সংযত করো। যুদ্ধক্ষেত্রে এই রকম ভাবে কাউকে নিযুক্ত করা যায় না।’ নয়ননন্দিনী কেঁদে ফেলে।
‘তাহলে কেন লঙ্কেশকে যুদ্ধ করতে বলা হচ্ছে না ...’
মন্দোদরী তার কাঁধে হাত বোলায়, ‘কেউই যুদ্ধ চায়না ন্যায়নন্দিনী। আমাদের জোর করে যুদ্ধে নামানো হয়েছে এবং লঙ্কেশকেও। নিজেকে সুসংহত করো। তোমার এই বিষাদ তোমার পুত্রের জন্য সঠিক হবে না যুদ্ধক্ষেত্রে।’
লঙ্কার সেনা অপেক্ষা করে সূর্যাস্তের জন্য। যুদ্ধে দ্বিতীয় দিন অতিক্রান্ত হয়। সংবাদ আসে অকম্পনার মৃত্যু হয়েছে হনুমানের হাতে এবং মহোদর পর্যুদস্ত হয় সুগ্রীবের দ্বারা। প্রহেষ্ঠ'র কোন সংবাদ পাওয়া যায় না। ন্যায়নন্দিনী প্রাসাদের বাইরে আসে পুত্রকে দেখার আশায়। একটি রথে করে আনা হয় তার রক্তাক্ত দেহ। গলায় তীরবিদ্ধ হয়ে আনা হয়। তাকে হত্যা করে লক্ষ্মণ। তার দেহ রাখা হয় মাতা ও স্ত্রীর সামনে। প্রাসাদ ভরে যায় দীর্ঘনিঃশ্বাস ও হতাশায়। ন্যায়নন্দিনীকে বিধ্বস্ত লাগে। সে বসে থাকে প্রহেষ্ঠ'র মাথার সামনে। তার দেহকে অন্তষ্টি জন্য নিয়ে যাওয়ার কেউ থাকেনা। মেঘনাদ আসে কিছু পরে তার ভ্রাতাদের দেহের অন্তষ্টির জন্য। সে হারায় তার প্রিয় এক ভাইকে। দশানান অপেক্ষা করেন চিতার সামনে। তার চোখে গভীর শোক নেমে আসে। পুত্রকে হারাবার ব্যথায় চোখ লাল হয়ে যায়। মেঘনাদের পাশে নারান্ত্বক, দেবত্বক থাকে। তারা প্রার্থনা করে প্রতিশোধ যেন নিতে পারে। মেঘনাদ ঘোষণা করে সে পরেরদিন লক্ষ্মণকে ধ্বংস করবে।
মন্দোদরী আরো এক পুত্রকে হারায়। এই সন্তান তার গর্ভের না হলেও তার পরম স্নেহে লালিত। মধ্যরাতে এক দাসি ডেকে দেয়, ‘রানি লঙ্কেশ্বর আপনার জন্য বাইরে অপেক্ষমান।’
দশানন তাকে পাঠায় অন্তষ্টিক্ষেত্রে। মন্দোদরী বারবার চেষ্টা করেও সেখানে যেতে পারে না, কিন্তু তাকে যেতে হয়। এইসময় লঙ্কেশ তাকায় মন্দোদরী দিকে।
‘প্রভু ধন্যবাদ আপনাকে। আমার সাক্ষাতের জন্য আপনি অপেক্ষমান। আপনার নীরবতা আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। আপনি স্বেচ্ছায় আমার থেকে আপনাকে সরিয়ে রেখেছিলেন। যখন সবথেকে আমার আপনাকে দরকার ছিল। পাইনি ...’
‘আমার কিছু সময়ের দরকার ছিল মন্দোদরী। আমি প্রচন্ড রেগে গিয়েছিলাম তোমার উপর। আমি তোমাকে চিরকাল আমার থেকেও বেশি বিশ্বাস করে এসেছি এবং তুমি সেই বিশ্বাসভঙ্গ করেছো। তথাপি আমি সবথেকে বেশি তোমার বিশ্বাস ভেঙেছি। আমার অপরাধ অনেক বেশি তোমার থেকে।’
দশানন আরো কাছে আসে মন্দোদরীর এবং হাত দুটো জড়িয়ে ধরে।
‘প্রভু আমি এই সত্য গোপন করে বড় ভুল করেছি। আমার সব কথা প্রথমেই বলা উচিত ছিল।’
‘এই দ্বন্দ্বের থেকে বেরিয়ে এসে মন্দোদরী, তুমি সঠিক কাজ করেছ। এই সত্য সে সময় না বলে আমাকে। আমি তোমাকে তখনই এই সন্তানকে নষ্ট করে ফেলতে বলতাম। আমি কোন অক্ষম উত্তরসূরির দায়িত্ব নেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারতাম না। তুমি সঠিক কাজ করেছো। তুমি তোমার যুদ্ধে একা জয়ী হয়েছ। কিন্তু একটি বিষয় ঠিক যে এই সংবাদ তুমি যদি আমাকে আগে দিতে ভালো হতো। এখন এই সত্য আমাকে আহত করেছে মাত্র।’
‘ক্ষমা করবেন প্রভু ...’
‘সত্যই কি ভোলা সম্ভব? নিজের দিকে তাকিয়ে দেখো মন্দোদরী তুমি কি পেরেছো যা যা ক্ষতি হয়েছে তা ভুলতে? আমার এক কন্যা আছে যে এতদিন আমার থেকে দূরে। যাকে আমি অপহরণ করে রেখেছি। আমার নিজের কন্যা প্রতিদিন অভিশাপ বহন করে চলছে। আমি যার সাথে যুদ্ধ করছি সে তার স্বামী। মিথিলার প্রতিযোগিতায় যদি জয়ী হতাম? তখন কী করতাম? আমি আমার কন্যাকে বিবাহ করতাম। তারপর আমি কী করলাম তাকে এখানে নিয়ে এলাম এবং পরিকল্পনা করলাম রাম এখানে না আসলে আমি তাকে বিবাহ করব। আমি তাকে এক বছর সময় দিয়েছিলাম। হায় ঈশ্বর...’ দশানন যেন নিজের মধ্যেই থাকে না কথাগুলো বলার সময়।
মন্দোদরী চায় তাকে একটু আরাম দিতে।শান্তির মধ্যে রাখতে। ‘সে এখনও জানে না প্রভু। আমি জানতে পেরেছি তার সাথে সাক্ষাতের পর। কিছু বাধা আসছিল আপনার সীতাকে বিবাহ করা নিয়ে। আপনি কি মনে করেন না তা দুর্ভাগ্য? কিছু ঐশ্বরিক ক্ষমতা বাধা দিয়ে আসছিল এবং লক্ষ্য করছিল।
‘রক্ষা করলেও সমাপ্তি হলো কই? আজও আমার কন্যা বন্দিনী নিজ গৃহে। সে তার স্বামীকে পাওয়ার জন্য উন্মাদ। এটাকে ভাগ্য বলবে মন্দোদরী? সেকি এগুলোকে সহ্য করবে বলে জন্মেছে? যদি কোন ঐশ্বরিক ক্ষমতা আটকে রাখে তবে কেন আমার কন্যা এত কষ্ট পাচ্ছে? সে সমস্ত সমস্ত রকমের সুখ থেকে বঞ্চিত?’
‘আমরা কেউ জানিনা কেন এমন হলো এর পরবর্তী কী হতে চলেছে? আমরা কী বলতে পারি?’
‘আমরা কখনোই বলতে পারিনা। সে কোন ভাবে বিশ্বাস করবে না এই সত্য। আমরা যা করেছি তার সাথে... একজন কন্যা তার পিতার প্রতি কী মনোভাব থাকা উচিত এরপর? তার পিতা তাকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন? আমি এখন কোনোভাবেই তাকে কন্যা হিসেবে দেখতে পারছি না যদিও আমি জানি সে কে!এটা এতটাই ব্যথা আমার কাছে আমি বোঝাতে পারব না।’
‘আমরা তাহলে তাকে কিছু জানাবো না। কিন্তু আমরা কোনভাবেই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারব না। আমাদের জিততেই হবে।’
‘আমরা তার জন্য এক প্রাসাদ তৈরী করে দেব। আপনি তাকে কোন কন্যারূপে গ্রহণ করবেন এই ঘোষণা করে দেবেন। আমরা তার জন্য যোগ্য স্বামী খুঁজে বের করব ...’
দশানন হেসে ওঠে মন্দোদরীর পরিকল্পনা শুনে। যুদ্ধ সকল দুর্বলতাকে প্রতিরোধ করে। তারা ইতিমধ্যে পুত্রদের হারিয়েছে এবং আরেকজন যুদ্ধে নামবে।
তৃতীয় দিন বিরুপাক্ষ, মকরাক্ষস এবং মেঘনাদ আক্রমণ করে। দশানন এবং মন্দোদরী দেখে তাদের যুদ্ধ। সে একজন অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা। খুব সহজেই সকল সেনাকে হত্যা করে সুগ্রীবের অধীনে। শীঘ্রই তারা লক্ষ্মণকে ডেকে পাঠায়। বানর সেনা ক্রমাগত চেষ্টা করে যায় লক্ষ্মণকে দূরে রাখতে কিন্তু মেঘনাথ ক্রমাগত তাদের আক্রমণ করে। মন্দোদরী প্রার্থনা করে তার পুত্রের সুরক্ষার জন্য। এক যুদ্ধরথ আসে পশ্চিম প্রান্ত থেকে বানর বাহিনীর। লক্ষ্মণ ছিল সেই রথে। মেঘনাথকে লক্ষ্মণ ডাকতে থাকে যুদ্ধের জন্য। অন্য রথে আসে রাম।
খুব শীঘ্রই মেঘনাদ লক্ষণের রথকে দেখতে পায়। সে তার সেনাদের দিকনির্দেশ করে সেই দিক থেকে অস্ত্র চালানোর জন্য। যুদ্ধক্ষেত্রে বিষাক্ত গ্যাস ছড়ানো হয় যাতে শত্রু'র চোখ ঝাপসা হয়ে যায় এবং তাদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সেনা প্রথম আকাশে সবুজ রঙের তীর ছোড়ে। এটি একটি পন্থা লক্ষ্মণ ও রামে কাছে পৌঁছানোর। এই গ্যাস এতই বিষাক্ত যে রাম ও লক্ষ্মণ দুজনে অচৈতন্য হয়ে পড়ে।
দশানন খুব উত্তেজনা অনুভব করে সম্পূর্ণ ঘটনা দেখে। তিনি খুব প্রভাবিত হন তাঁর পুত্রের যুদ্ধকৌশল দেখে। দূর থেকে দশানন তার পুত্রের নাম নিতে থাকেন যাতে তার কন্ঠ মেঘনাদ শুনতে পায়।
মন্দোদরী নিজেকে সংযত করে। সে তাকিয়ে থাকে দশাননের দিকে। যুদ্ধ সমাপ্ত হয়নি? দিন সমাপ্ত ... তেমন ক্ষতি ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ আসে না।
দশানন মন্দোদরীকে জানায় না অতিকায়’এর মৃত্যু সংবাদ। মহাপ্রসভ শহরে ফিরে আসে। ধন্যমালিনী খুঁজে চলে তার পুত্রকে। পুত্র কোথায়? অতিকায়’এর রথ আসে ত্রিশিরের রথের সাথে সাথে। তারা দশাননের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। ধন্যমালিনী জানে তার সামনে আসবে মৃত পুত্রের শব।
পর পর মৃতদেহ জ্বালানো হয়। শতাধিক মায়ের কান্না মুখরিত হয় লঙ্কায়। কত মা'র সন্তান মারা যায়। হারায় অনেকের স্বামী। সন্তান শোকে বিহ্বল হয় পিতার মৃত্যুতে। রামের বাহিনী আরও এগিয়ে আসে শহরের দিকে। ধন্যমালিনী সজাগ থাকে। মন্দোদরী তার সাথে থাকে। মন্দোদরীর পক্ষে আর পুত্রের অন্তষ্টি দেখা সম্ভবপর হয় না। অতিকায়’এর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। সে বিধবা হয় এবং শাশুড়ির সাথে সাথে চলে আসে। যুদ্ধ সবাইকে বিধ্বস্ত করে। চারিদিকে মৃত শরীরে স্তুপ। দশাননের চোখে স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। রক্তের সম্পর্ক সকল বাঁধন হালকা হতে থাকে। দিন যায় মন্দোদরী নিজেকে বন্দী করে রাখে কক্ষের মধ্যে। তার মধ্যে অপরাধবোধ ক্রমাগত বেড়ে ওঠে। মেঘনাদের রণকৌশলের খবর আসে। নারান্ত্বক এবং দেবত্বকের সাহচর্য গ্রহণ করে মেঘনাদ। লঙ্কার পরিস্থিতি দেখে সবাই প্রার্থনা করে সীতা রামের কাছে যাতে ফিরে যায় এবং যুদ্ধ সমাপ্ত হয়। মন্দোদরী আর সহ্য করতে পারেনা পুত্রদের হারানোর যন্ত্রণা। মেঘনাদ তার মাতার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে মধ্যরাতে।
‘তোমাদের গরীব মায়ের উপর কেন এত কৃপা হল মেঘনাদ? কেন সবাই মিলে একসাথে এসেছো? আমি তোমাদের আর যুদ্ধ করতে দেখতে পাচ্ছি না, আমি তোমাকে আর যুদ্ধক্ষেত্রে দেখতে চাই না।’
‘আপনি কী বলছেন মাতাশ্রী?’
‘আমি তোমার পিতার কাছে জানতে যাচ্ছি যে কবে যুদ্ধ শেষ হবে? তাঁর সীতাকে ফেরত পাঠানো উচিত এবং তার সাথে সমাপ্ত হবে হাস্যকর যুদ্ধের।’
‘এখন কীভাবে সম্ভব হবে মাতা? কত প্রাণ আমরা হারিয়েছি। আমরা কী তাদের সাথে সঠিক ন্যায় করতে পারব? এই যুদ্ধ এখন আর সীতাকে কেন্দ্র করে নেই। এ এখন আমাদের হয়ে উঠেছে। তারা যুদ্ধ করেছিল নির্দিষ্ট একটা উদ্দেশ্য নিয়ে – রাক্ষসকূলকে পরাজিত করতে।
‘আমি বুঝতে চাই না তুমি কি বলছ। তুমি সম্পূর্ণ পিতার মতো কথা বলছ মেঘনাদ!’
সে হেসে মায়ের হাত দুটো ধরে, ‘আমি আপনার আশীর্বাদ চাই মাতাশ্রী। কাল লক্ষ্মণের সাথে যুদ্ধ আমার।’
মন্দোদরী তার সন্তানের কপালে চুমু খায়। ‘তুমি সর্বদা পিতার পুত্র হয়ে থেকো। তুমি কোনদিনই তোমার পিতার মতো আমাকে মান্যতা দেবেনা। তাকে বলো যুদ্ধ সমাপ্ত করতে।
তাহলে তিনি চেষ্টা করবেন। তিনি শুধুমাত্র তোমার কথা শোনেন।
‘আমি এ কাজ কোনভাবে করতে পারব না মাতাশ্রী। যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার একটি উপায় জয়লাভ করা।’ মেঘনাদের আত্মবিশ্বাস দেখে মন্দোদরীর খুব ভালো লাগে। মন্দোদরী হেসে আশীর্বাদ করে তাকে।
‘যাও তবে জয়লাভ করে যুদ্ধ সমাপ্ত করো।’
মেঘনাথ মাথা ঠান্ডা করে যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসে। একটি সুরক্ষিত যুদ্ধ চলে তাদের মধ্যে। নারান্ত্বক, দেবত্বক যোগ দেয় তার সাথে। মেঘনাদ তার সমস্ত সামরিক বাহিনীকে কাজে লাগায়। সে জানে লক্ষ্মণ কোন সাধারণ যোদ্ধা নয়। সে তার সমস্ত বিদ্যাকে কাজে লাগায়। মেঘনাদ মাঝে মাঝে অদৃশ্য হওয়ার বিদ্যা জানে। শেষ দুই দিন ধরে রামের বাহিনী তাদের আক্রমণ করতে থাকে। সূর্য উদয় হয় আবার অস্ত যায়। কিন্তু তারা ক্রমাগত আক্রমণ করে যায়। মেঘনাদের যুদ্ধবিদ্যা খুব কার্যকরী হয় ফলে লক্ষ্মণ একাকী হয়ে পড়ে। মেঘনাদ তার শেষ ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে দেয় যার নাম ঘাতিনী শক্তি - লক্ষ্মণের রথকে ভেঙে দেয়।
সূর্যাস্ত হবার আগেই লক্ষণ অচৈতন্য হয়ে পড়ে। মেঘনাথ ঘরে ফেরে। দুইদিনে যুদ্ধের পর সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে সুস্থ হয় লক্ষ্মণ। বানররা চারিদিকে সেই সংবাদ ছড়িয়ে দেয়। দশানন মেঘনাথকে জিজ্ঞাসা করে নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করার জন্য যাতে সে আবার একটি নতুন রথ উপহার দিতে পারে। কুম্ভকর্ণ আসে যুদ্ধ করতে। সে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে স্ত্রী, পুত্রের সাথে সাক্ষাৎ করে। মেঘনাথ যজ্ঞ শুরু করে ভগবান প্রাথঙ্গিরাকে সন্তুষ্ট করার জন্য।সে মন্দিরের একপাশে বসে থাকে সিদ্ধি লাভের জন্য।
অপরদিকে কুম্ভকর্ণ বানরের সেনাদলকে শেষ দুই দিন ধরে প্রবল প্রতিরোধের মধ্যে ফেলে। কিন্তু তারা একে একে পরাজিত হয়। দ্বিতীয় দিন রাম আসেন যুদ্ধ করতে। তিনি এসে কুম্ভকর্ণকে দেখে বিস্মিত হন। কুম্ভকর্ণের বড় বড় হাত, তাতে অস্ত্র দেখে হতচকিত হয় রাম। তাকে দেখে মনে হয় সমুদ্রের পাশে পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধের পরিণতি মৃত্যু। পরাজয়ের ফল মৃত্যু। মেঘনাদের ধ্যানে, বানররা তার ধ্যানভঙ্গ করার প্রচুর চেষ্টা করে। একমাত্র বিভীষণ জানে এই যজ্ঞের সুফল এবং সে প্রভাবিত করে মেঘনাদকে বিভ্রান্তিতে ফেলার জন্য। লক্ষ্মণ মেঘনাদকে আক্রমণ করতে বনের মধ্যে প্রবেশ করে যখন সে নিরস্ত্র অবস্থায় থাকে। কিন্তু সৌভাগ্যবশত মেঘনাদ রক্ষা পায় সেখান থেকে।
বেশ রাত ধরে বানররা মন্দিরের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে। তাদের লঙ্কার মানুষদের মুখোমুখি হবার মতো মানসিকতা ছিল না। তারা লঙ্কার নারীদের বিভিন্নভাবে বিরক্ত করে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাদের কক্ষে প্রবেশ করে। নারান্ত্বক বর্শা দিয়ে বহু বানর মানুষকে হত্যা করে। সে অঙ্গদের সাথে একত্রিত হয়ে যুদ্ধ করে। দেবত্বক হনুমানকে আটক করে। উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে চলে। মেঘনাদ লক্ষ্মণের সাথে যুদ্ধ করে যায়। তারা প্রত্যেকে উন্নত ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধের অনিশ্চয়তা থেকে যায়।
‘মেঘনাদ নিক্ষেপ করে যমাস্ত্র - যমের নামে নামকরণ করা। লক্ষ্মণ কুম্ভাস্ত্র নিক্ষেপ করে তাকে ধ্বংস করে। লক্ষ্মণ বরুণাস্ত্র প্রয়োগ করে কিন্তু মেঘনাদ ধ্বংস করে রুদ্রাস্ত্র দিয়ে - শিবের দ্বারা এই বানের নামকরণ হয়।
যুদ্ধ ক্রমাগত হয়ে যায়। সমগ্র শহর ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। নারান্ত্বক পরাজিত হয় অঙ্গদের দ্বারা। তাকে শহরে আনা হয় বিপদজনক অবস্থায়। লক্ষ্মণ ইন্দ্রাস্ত্র প্রয়োগ করে মেঘনাদের উপর। তার রথকে ভেঙে দেয় ... আরো রক্ষী মৃত হয় দরকার শুধু আর একজনের মৃত্যুর।
তিন জনের বেশি পুত্রকে হত্যা করে শক্র শিবির। দশানন তাদের চিতা নির্মাণ করে। তাদের স্ত্রীরা বেঁচে থাকার তাগিদ হারিয়ে ফেলে। প্রত্যেকে সীতাকে তাদের মূল শত্রু মানতে থাকে। সরমা তাদের সামনা সামনি হতে লজ্জিত হয়। সমস্ত আকাশ স্তম্ভিত হয়ে যায় মেঘনাদের মৃত্যুর পর। মেঘনাদের জন্মের সময় পরিস্থিতি এমনি ছিল। তাতে স্ত্রী সুলোচনা তার চার বছরের পুত্রকে হস্তান্তর করে মন্দোদরী কাছে। কারণ সে তার স্বামীর চিতায় সহমরণে যায়। ধীরে ধীরে লঙ্কায় কালো ধেয়ে আসে। চারিদিকে শুধু লাশ ঘোরাফেরা করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন