পারমিতা চক্রবর্তী
লঙ্কার উন্নতি, স্থায়িত্ব, সার্বভৌমত্বের জন্য শত্রু বর্ধিত হয়। শুধুমাত্র লঙ্কার ভৌগলিক নিয়ন্ত্রণের বাইরেই নয় লঙ্কার মধ্যেও শত্রু বাড়তে থাকে। দশানন এবং তার মন্ত্রীরা দুষ্টবুদ্ধির ব্যবহার নিয়ে চিন্তিত হয়। এই পরিবারের মধ্যে দুষ্টবুদ্ধির একজন, যার সাথে কারো সম্পর্ক ঠিক নেই। দশানন তাকে প্রথম থেকেই অপছন্দ করতেন। বহু বছর ধরে তার কার্যকলাপকে উপেক্ষা করে এসেছেন। দশানন বেশ কিছুদিন ধরে রাজদরবারে আসছিলেন না। দশানন তার ভগিনী মীনাক্ষীকে ঠকিয়েছেন এবং লঙ্কার প্রচুর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছেন এই অপবাদ দেয় দুষ্টবুদ্ধি।
রাজদরবারের দশাননের মন্ত্রীরা দুষ্টুবুদ্ধির অসহযোগিতা নিয়ে কথা বলা শুরু করে। মন্ত্রী বলেন, ‘আর কতদিন প্রভু তাকে আমরা পরিবারের একজন বলে নিশ্চুপ থাকব?’
‘আমি চুপ নই। এখন উপযুক্ত সময় নয় কোন কিছু করার। যদি আমরা তার দোষকে প্রমাণিত করতে পারি তাহলে দুষ্টুবুদ্ধি আমাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবেন।’ দশানন মন্ত্রীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন।
‘প্রভু দুষ্টুবুদ্ধি, প্রভাবিত করছে আমাদের সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশকে। তিনি গোপনে সভা করছেন তাদের সাথে এবং এই সৈন্যরা ক্ষেপে উঠছে আপনার বিরুদ্ধে। আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে এরা। আমাদের সূত্র জানিয়েছেন এ কথা এবং তারা অন্য সভার আয়োজন করেছে সম্প্রতি।’
দশানন প্রাণপণ চেষ্টা করেন চুপ থাকতে কিন্তু তিনি নিজের রাগ প্রশমিত করতে পারেন না।
‘আমি আমার তরফ থেকে আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু এক শিয়ালকে পোষ মানানো যায়, মানুষকে পোষ মানানো অসম্ভব। আমি উপেক্ষা করি তার ক্রিয়া-কলাপ মীনাক্ষীর কারণে কিন্তু আর নয় ...’
‘তুমি বহুবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছো মন্দোদরী কিন্তু সে একবারও বলেছে যে কী ঘটেছে প্রকৃত। মীনাক্ষী এতই বোকা নয় যে তার স্বামীর অভিসন্ধি বুঝতে পারবে না। সে কেবলমাত্র বন্দিনী!’
‘প্রভু আমি বলব আপনাকে মীনাক্ষী'র সাথে কথা বলতে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করার আগে।’ মন্দোদরী দশাননের রাগকে স্তিমিত করার চেষ্টা করে।
‘ক্ষমা করবেন আমাকে। আমি আপনাকে উপদেশ দেব আগে আপনি সকল তথ্যের সত্যতা যাচাই করুন তারপর পরিকল্পনা করুন। আমাদের অনেক গুপ্তচর আছে যারা এই ধরনের কাজ করে।’ বিভীষণ উপদেশ দেন।
‘আমার মনে হয় লঙ্কেশ সঠিক। আমরা বহুদিন ধরেই তার কার্যকলাপকে উপেক্ষা করে আসছি। কালকেয় বহুদিন ধরে তার রাজপুত্রকে আমাদের সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে আসছেন। এটা অবিশ্বাস্য যে আমাদের সেনা তাতে অংশ গ্রহণ করেছে। আমার মনে হয় তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলা উচিত হবে আগামী কালের সভায়।’ নানাশ্রী বলেন। নানাশ্রী অভিজ্ঞতায় অনেক প্রবীণ।
‘আমি সহমত আপনার সাথে। আমাদের সেনা পাঠিয়ে দেখা উচিত ছিল এক একজন করে কারা, কারা এই সভায় উপস্থিত আছে। অবশ্যই মেঘনাদকে পাঠানো উচিত। সে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে আমাকে তথ্য দেবে।’ দশানন আদেশ দেন এবং মন্দোদরীর দিকে তাকিয়ে থাকেন সম্মতিজ্ঞাপনের জন্য।
পরবর্তী দিন আদেশ মতো সেনা ঘিরে ফেলে সেই জায়গা যেখানে তারা সভা করছিলেন। মেঘনাদ তাদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তারা দেখে যে তাদের নিজস্ব সেনা কালকেয় প্রধানের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে কোন সভার প্রস্তুতি হওয়ার আগে লঙ্কার সেনা ঘিরে ফেলে। দুষ্টুবুদ্ধি খুব ভয় পায় এবং ভাবে তাকে ধরে ফেলা হবে শীঘ্রই। মেঘনাদ এবং কিছু সেনা ফিরে যায় দশাননের কাছে খবর দেওয়ার জন্য। তারা হাতে নিয়ে আসে কিছু পুঁথি, পরিকল্পিত মানচিত্র দেখানোর জন্য দশাননকে, কী ভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন দশাননকে আক্রমণ করার জন্য। দশানন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং ঘোড়ায় চড়ে কিছু সৈন্য নিয়ে সেখানে আসেন।
তখন সূর্যাস্ত। মন্দোদরী নিজে কক্ষে ছিল এবং তাকে জরুরী ভিত্তিতে ডেকে পাঠানো হয় এটা জানানোর জন্য দশানন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন এবং তিনি সৈন্যদের ছেড়ে এসেছেন। মন্দোদরী খুব চিন্তিত হয় গোটা ঘটনা শুনে। রক্ষীরা দাঁড়িয়ে ছিল রাজদরবারে বাইরে। মন্দোদরী রাজদরবারের প্রবেশ করার আগে বাইরে কিছু মহিলার শব্দ সব পায়। মন্দোদরী দেখে রাজদরবারের মধ্যে তারা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে মীনাক্ষীকে দেখতে পায় সে। রাবণের বোন মীনাক্ষী অনবরত কেঁদে চলেছে। সে যেন নিজের মধ্যে থাকে না, বুঝতে অসুবিধা হয় না মন্দোদরীর গোটা ঘটনা।
দশাননকে দেখতে মর্মাহত লাগে। তার পাশে দাঁড়িয়েছিল শিশু শম্ভুকুমার। দুষ্টবদ্ধি এবং মীনাক্ষীর পুত্র। তার চোখ জলে ভরে থাকে। মাতা কৈকেসী ও তাদের পরিবারের অন্য নারীরা চলে আসেন সেখানে।
‘পুত্রী মীনাক্ষী... দুষ্টুবুদ্ধি... কেউ কী তোমরা বলবে কী হয়েছে?’ মাতা কৈকেসী জিজ্ঞাসা করেন। মাতা জানতেন না দশানন তাদের বিরুদ্ধে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন।
মীনাক্ষী চিৎকার করে বলেন, ‘আপনি আপনার পুত্রকে জিজ্ঞাসা করছেন না কেন? তিনি একমাত্র যিনি আমার স্বামীকে হত্যা করেছেন।’ দশাননের দিকে তাকিয়ে বলে।
‘কি বলতে চাইছো? আস্তে কথা বল মীনাক্ষী। তুমি তোমার ভ্রাতার দিকে আঙুল তুলছো! কেউ কী বলবে কী হয়েছে?’ মাতা কৈকেসী চিৎকার করে ওঠেন।
‘আপনি জিজ্ঞাসা করুন খুনীকে!’ মীনাক্ষীর তিরস্কারে স্তম্ভিত মাতা কৈকেসী।
‘যথেষ্ট হয়েছে মীনাক্ষী, আমার কোন উদ্দেশ্য ছিল না তাকে হত্যা করার এবং তুমি সেটা ভালো ভাবেই জানো। কারণ আমার যদি সে ইচ্ছা থাকতো তাহলে অনেক আগেই তাকে হত্যা করতে পারতাম। তার জন্য আমাকে চোদ্দ বছর অপেক্ষা করতে হতো না।’ দশাননের গলায় আবেগ দেখা যায়।
‘হ্যাঁ অবশ্যই ...কেন নয় কারণ আপনি আমাকে কোনদিন সুখী দেখতেই চাননি অথবা আপনি আপনার আশেপাশে ভ্রাতা, ভগিনীকে কখনই দেখতে চাননি।’
‘মীনাক্ষী যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে কথা বলো। তুমি ভুলে যেও না তুমি এই রাজ্যের রাজার সাথে কথা বলছো।’ মন্দোদরী তার ননদকে শান্ত স্বরে শাসন করার চেষ্টা করে।
‘না আজ পারছিনা, আমি স্তম্ভিত। আমি কোনোভাবেই ভুলতে পারছিনা যে আমার স্বামী আমার সাথে না থাকার কারণ উনি। তিনি তার ভগিনীকে বিধবা করেছেন এবং একজন সন্তানকে পিতৃহারা করেছেন। তিনি সর্বদা চেষ্টা করেছেন আমার মাতার সেরা পুত্র হবার। নিয়ন্ত্রণ করেছেন আমাদের জীবনযাত্রা এবং নিজের ইচ্ছাকে আমাদের উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। আমি আমার স্বামীকে পছন্দ করে বিবাহ করেছি এবং এই কারণে তাকে বছরের-পর-বছর হুমকি দিয়ে গেছেন। তিনি কখনোই আমার সুখ সহ্য করতে পারতেন না এবং তিনি ইচ্ছা করেই তাকে এই ভাবে হত্যা করেছেন।’ মীনাক্ষী কথাগুলি বলেই কাঁদতে থাকে অনবরত।
বিভীষণ সরমাকে ঈশারা করেন এবং হাল্কা আওয়াজে উপদেশ দেন, ‘মীনাক্ষীকে যেন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন তার সান্ত্বনার খুব প্রয়োজন।’
‘না আমি এখন কোথাও যাবো না আপনার সাহস হলো কীভাবে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করার বিভীষণ?’
‘মীনাক্ষী আমি গভীর ভাবে দুঃখিত তোমার এই ক্ষতির জন্য। তথাপি আমার দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের স্বামী কী ছিল তা ভেবে দেখো এবং শান্ত হওয়ার চেষ্টা করো মীনাক্ষী।’ দশানন বলেন।
‘আপনি তো এটাই চেয়েছিলেন? তাই না? আপনি চান আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি, মান্যতা দিই। আপনি বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হতে চান, যিনি সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আপনি যা সিদ্ধান্ত নেবেন তাই আমাদের মেনে চলতে হবে। বিভীষণ তো আগেই আপনার অনুরাগী পোষ্য হয়ে গেছেন। কী বলেন মহারাজ? আমি কী মিথ্যা কিছু বলছি? আপনি তো তাই চান। কুম্ভকর্ণ তো নামাত্রই আছেন তিনি কিছু বুঝতে চান না।’
‘মীনাক্ষী, তোমার ভ্রাতা সর্বদা তোমাকে নিয়ে চিন্তিত। তিনি সর্বদা তোমাকে রক্ষা করে এসেছেন।’ এতক্ষণে মুখ খোলেন মাতা কৈকেসী।
‘আপনি পুত্রস্নেহে অন্ধ মাতা, আপনি তাই কোন কিছু দেখতে পান না।তিনি একজন ভ্রাতাকে আগেই আটকে ফেলেছেন ভৃত্যরূপে আর অন্য জন বর দ্বারা পর্যুদস্ত।’ মীনাক্ষী পাল্টা উত্তর দেয়।
‘দুষ্টুবুদ্ধি আমাদের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন কালকেয়কে সাথে নিয়ে। কালকেয়র দৃষ্টি ছিল চিরকালই আমাদের ঐশ্বর্যের উপর এবং তোমার স্বামী আমাদের গুপ্তচর ছিলেন। যিনি সর্বদা কালকেয়কে একসাথে সাহায্য করে গেছেন।’ দশানন উত্তর দেন।
‘সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
‘শোনো ভগিনী, তোমাকে বিবাহ করেছে দুষ্টবুদ্ধি কারণ তোমাকে ভালবাসলেও আমাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। তার লক্ষ্য ছিল লঙ্কার সিংহাসন এবং তোমাকে মূর্খ বানিয়ে গেছে।’
‘স্তব্ধ হন।’
‘না তোমাকে সম্পূর্ণ সত্য জানতেই হবে ওই মানুষটির ব্যাপারে। তুমি যা জানো ভগিনী তা সম্পূর্ণ সত্য নয়, তুমি তোমার এই বিবাহে খুশি নও। তিনি তোমাকে ঠকিয়েছে এবং তোমাকে ব্যবহার করে গেছেন।’
‘সুতরাং তাই আপনি এমন করলেন কারণ আমি আমার এই বিবাহে সুখী নই বলে।’
‘না আমার তাকে হত্যা করার কোন পরিকল্পনা ছিল না। আমি আমার প্রথম পুত্রের নামে শপথ করে বলছি যদি তুমি চাও তবে তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারো। সে এখানে উপস্থিত আছে।’ দশানন বলেন।
‘আমরা সবাই জানি দুষ্টুবুদ্ধি কিছু পরিকল্পনা করে আসছিলেন কিন্তু তার কোন প্রমাণ ছিল না আমাদের কাছে। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমার নাম ব্যবহার করতেন। কোন সম্পত্তি ক্রয়, অধিগ্রহণের সময় কপটতা করতেন। প্রথম থেকে আমাদের শত্রু ছিলেন, চিরকাল চেষ্টা করে গেছেন আমাদের সমূলে উৎখাত করতে আমাদের সেনাবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে। আমাদের বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, তিনি আমাদের সেনাবাহিনীর বিপুলসংখ্যক সেনাদের আমাদের বিরুদ্ধে নিয়ে গেছেন। তিনি একটি গুপ্ত সভার ব্যবস্থা করেছিল যেখানে পরিকল্পনা করা হয়েছে কী ভাবে আমাদের আক্রমণ করা যায় এবং একটি সভা হওয়ার কথা ছিল সম্প্রতি। আমি যখন পৌঁছাই সেখানে, দুষ্টবুদ্ধি আমাদের সেনাদের দ্বারা বন্দী হয়। তিনি ভয় পেয়ে আমাদের দিকে তীর ছুড়তে শুরু করেন। তিনি ভয় পেয়েছিলেন এই ভেবে যে, তিনি আর কোনভাবেই লুকিয়ে থাকতে পারবেন না। তাই তিনি আমাদের রথের দিকে তীর ছুড়তে শুরু করেন। যাতে আমি শেষ হয়ে যাই। আমি তাকে বারবার বারণ করি কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনি জানতেন যে তিনি কখনোই আমার সাথে যুদ্ধে পারবেন না তাই তিনি আমাকে মেরে ফেলার আগে আমি তাকে শেষ করে দিই।"
মীনাক্ষী দশাননের পুরো কথা স্থির হয়ে যায়। দশাননের থেকে সম্পূর্ণ গল্প শুনে মনে হয় মন্দোদরীর,সে কোনভাবেই মীনাক্ষী'র স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী করতে পারবেনা দশাননকে। কেউ কোন শব্দ করতে পারে না। শম্ভুকুমার তার পিতার পাশে বসে থাকে এবং একটি চাদর টেনে দেয় তার মুখে।
‘আবার বলছি আমি দুঃখিত এইভাবে আমি চাইনি। তোমার এই ক্ষতির জন্য আমি দুঃখিত আমি জানি তোমরা সবাই আমাকে দায়ী করবে কিন্তু আমি এটা শুরু করিনি। তার জন্য আমি আজ এখানে দাড়িয়ে এবং আমি তোমাদের কাছে প্রতিজ্ঞা করছি তোমাদের আত্মরক্ষা করার জন্য যে কোন কিছু করতে প্রস্তুত।’ মন্দোদরী তার স্বামীর চোখে তীব্র অনুশোচনা দেখতে পায়।
তিনি মন্দোদরীর দিকে তাকিয়ে থাকেন এক মুহূর্তের জন্য এবং মন্দোদরী বোঝে তার স্বামী কী চায়! দশাননকে কারোর মৃত্যুর জন্য অনুতপ্ত হতে আগে কখনো দেখেনি মন্দোদরী। সমস্ত রাজদরবার যেন স্তম্ভিত হয়ে যায় এবং তার অন্তোষ্টি ক্রিয়া সমাপ্ত করে পুত্র শম্ভুকুমার।
লঙ্কায় তিন দিনের শোক পালন হয়। তারপর সবাই দুষ্টবুদ্ধিকে নিয়ে নানা কথা আলোচনা করে। মীনাক্ষী এবং শম্ভুকুমারকে একটা প্রাসাদ দেওয়া হয় রানির প্রাসাদের কাছেই। মাতা কৈকেসী শুধুমাত্র তার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হন না, তাদের ভ্রাতা ও ভগিনীর মধ্যে যে সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ে চিন্তিত হন। দশানন কিছুদিনের জন্য সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ রাখেন এবং নিজের প্রাসাদের কক্ষের মধ্যে থাকেন। মন্দোদরী চেষ্টা করে তার মনোভাবকে প্রভাবিত করতে।
‘যা হয়েছে সব ভুলে যান প্রভু। এতে আপনার কোন দোষ নেই...’
‘মন্দোদরী তোমার মনে আছে, আমি তোমাকে আমার শৈশবের কথা বলেছিলাম? আমার ভ্রাতা এবং ভগিনী হল আমার স্তম্ভ। তারা এখনও আমার দুর্বলতা। আমি তাদের অন্তর থেকে ভালবাসি। তুমি জানো আমরা যখন যুবক এবং মীনাক্ষী বয়ঃসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দুই ব্রাহ্মণ সন্তান হাসাহাসি করছিল আমাদের জামাকাপড় নিয়ে এবং সেই রাতে মীনাক্ষী কেঁদেছিল দুঃখে, হতাশায়। পরের দিন সকালে আমি সেই বালকদের মধ্যে একজনের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলাম এবং তারা ক্ষমা চায়। আমি আমার পরিবারের জন্য অনেক সংগ্রাম করেছি। কিন্তু আমি তার থেকে আলাদা করে দিয়েছি তার স্বামীকে...’
‘এই সময় আমরা আমাদের অপরাধের কথা না ভেবে মীনাক্ষীকে যথাযথভাবে দেখাশোনা করি।’
‘সঠিক বলেছ মন্দোদরী। আমি ক্ষত নির্মূলের ব্যবস্থা করি।’
‘আমি আপনাকে বিশ্বাস করি, আপনি যা বলেছেন আমি বিশ্বাস করি প্রভু। এই প্রথমবার আপনি এইরকম কোন বিষয়ের মধ্যে মেঘনাদকে জড়ালেন। সে কি খুব সাহসী? আপনি তাকে যে কাজ দিয়েছিলেন তা কেমন ভাবে সমাপ্ত করল?’
‘তুমি আমাকে আশ্চর্যের মধ্যে ফেললে মন্দোদরী। তুমি কী সত্যি জানতে চাও তোমার পুত্র সাহসী কিনা। তুমি তাকে অবমূল্যায়ন করছ? আমি যা তাকে নির্দেশ দিয়েছে সে ঠিক তাই পালন করেছে, এখন আমি তার সাথে পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলবো।’
‘পরবর্তী পরিকল্পনা? কোথায় কথা বলবেন আপনারা? সে কি প্রস্তুত নয়?’
‘আমি নিশ্চিত যে সে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।’
‘কোন যুদ্ধ প্রভু? আপনার পুত্র এখন নবিশ।’
‘এটা দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ইন্দ্র খুব লোভী হয়ে পড়েছে তার ক্ষমতার জন্য এবং প্রতিবেশী উপজাতিদের উত্তেজিত করে তুলছেন। তার রাজধানীর আশপাশে যেসব উপজাতিরা থাকেন তাদের খেপিয়ে তুলছেন, তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করছে তার এই উদ্যোগ বন্ধ হবে কিনা? আমি এখন রাজি হয়েছি এবং আমাদের সাথে অনেক রাক্ষস সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। এখন আমরা দেবতা ইন্দ্রকে পর্যুদস্ত করব এবং তার সাথে যারা যোগ দেবেন তাদেরকেও পরাজিত করব।’
সুতরাং এই যুদ্ধ দেবতাদের সাথে রাক্ষসদের? প্রভু আপনার কি মনে হয় এখন আপনার পুত্রকে এই যুদ্ধে নেওয়া নিরাপদ হবে? আমরা সবাই জানি এরা কি রকম পরিকল্পনা নেন।
‘তোমার কি মনে হয় মেঘনাদ কোন পন্থা জানেনা! সে আমার পুত্র আমি জানি সে, আমার থেকে আরো ভালো পারবে। মেঘনাদ আমাকে সহচর্য দেবে ইন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। এটা শুধুমাত্র যুদ্ধ নয় এটা একটা পরীক্ষা তার জন্য।’
দশানন ঘোষণা করে খুব শীঘ্রই তারা ইন্দ্রলোক জয় করবে।
এই যুদ্ধ চলেছিল ছয়দিনব্যাপী। সপ্তমদিনে তাদের সেনা ফেরৎ এসেছিল। মন্দোদরী দশাননের বিমানের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং তার পুত্রকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিল। খুব শীঘ্রই তারা অবতরণ করে এবং তাদের বিজয়ী হবার জন্য বাজনা বাজতে থাকে। মেঘনাদ তার পিতার কাছ থেকে নামে এবং পাশ থেকে দশানন বলে ওঠে, ‘এটা তার পুত্রের প্রথম জয়। এই জয়কে পালন করব মন্দোদরী। শুধুমাত্র ফুল এবং ভোজ দ্বারা এই উৎসব পালন করা হবে না।’ মন্দোদরী বলে, ‘আমি কালই বড় উৎসবের ঘোষণা করছি এবং আমি নিশ্চিত এই উৎসব একেবারে অন্য রকমের হবে।’ দশাননের হাসি বন্ধ হয় না।
‘আপনারা সকলে উপস্থিত হবেন সেই উৎসবে তাকে সম্মান জানানোর জন্য। মেঘনাদ শুধুমাত্র দেবতাদের পরাস্ত করেনি, দেবরাজ ইন্দ্রকেও পরাস্ত করেছে।’
‘মন্দোদরী তার পুত্রের সাফল্যে খুব খুশি হয়। এই উৎসবের জন্য মালদ্বীপ থেকে আনা হয় দাহ্য বস্তু, মিশর এবং তারচিয়া থেকে নর্তকী আনা হয়, বানানো হয় উৎকৃষ্ট খাদ্য। মন্দোদরী চেয়েছিল তার পুত্রের এই সাফল্য শুধুমাত্র দেশের মধ্যে নয় দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ুক। সেই সন্ধ্যায় বিভিন্ন রকম আতশবাজির ব্যবস্থা করা হয় যা লঙ্কাবাসী আগে কখনো দেখেনি। মন্দোদরী এর আগে দশাননকে এত খুশি কখনো দেখেনি। উপজাতি প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং লঙ্কার মানুষের মুখে মুখে মেঘনাদের কথা শোনা যায়। সবাই সেখানে অপেক্ষা করে দশাননের থেকে সেই যুদ্ধ বৃত্তান্ত শোনার জন্য।
‘চতুর্থ দিনে আমরা সান্ধ্যকালীন প্রার্থনার সময় ইন্দ্রকে অস্ত্রবিহীন অবস্থায় ধরে ফেলি। তিনি সকল দেবতাদের একত্রিত করেন যাতে আমাকে বলার সুযোগ না দেওয়া হয়। আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিই আমার পুত্রকে কাজে লাগানোর। একটা সুযোগ পাওয়া যাবে মেঘনাদের গুণগুলোকে কাজে লাগাবার। অগ্নিদেব আমার বার্তা মেঘনাদের কাছে পৌঁছে দেয়। আমি জিজ্ঞাসা করি ইন্দ্রের থেকে আমাকে মুক্ত করার জন্য কোন সেনা লাগবে কিনা!’ জনসাধারণ সেই সময় মেঘনাদের নাম উচ্চারণ করে।
দশাননকে আটক করে রাখা হয় এবং মেঘনাদ যুদ্ধে দেবতাদের হত্যা করে। প্রজাপতি ঋষি অন্য দেবতাদের জন্য ভিক্ষা চাইতে আসেননি পরিবর্তে বরদানে প্রস্তুত হন। মেঘনাদ তার কাছে অমরত্বের দাবি করে। অবশ্যই তা দিতে অরাজি হন এবং মেঘনাদ তার রথ নিয়ে এগিয়ে আসে। মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করার পর যুদ্ধে যায় এবং জয়লাভ করে। মন্দোদরীর দুচোখ স্নেহে ভরে ওঠে সে তার পুত্রকে নিজের দিকে টেনে নেয়।
‘আমি গর্বিত তোমার জন্য পুত্র!আরো বড় হও।’
‘মেঘনাদের জন্য আমাদের সবার গর্বিত হওয়া উচিত।’ কুম্ভকর্ণ নিদ্রাসন থেকে জেগে অভিনন্দন জানায়, ‘প্রথম লঙ্কাপতি রাবণ, এরপর তার পুত্র মেঘনাদ পরাস্ত করেছে ইন্দ্রকে।’
সেইসময় প্রজাপতি ঘোষণা করেন যে দেবতাগণ মেঘনাদের সাহসে খুশি হয়েছেন এবং ব্রহ্মা ‘ইন্দ্রজিৎ’ নামে দেন তাকে।
আশে পাশের জনগণ বলে, ‘দীর্ঘজীবী হও ইন্দ্রজিৎ! দীর্ঘজীবী হও রাজপুত্র!’ দশানন এই কথাগুলো ফিসফিস করে মন্দোদরীর কানের পাশে এসে বলেন, ‘তুমি একজন যোগ্য সন্তানের মা এবং আমি গর্বিত তার জন্য।’
মন্দোদরী মেঘনাদকে ভালবাসে। তার বিজয়ে সবাই খুব খুশি। দশানন তার ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছেন পুত্রের মধ্যে। সে এখন আর ছোট রাজপুত্র নেই, সে এখন যোদ্ধা। দশাননের পর মন্দোদরীকে রক্ষা করার মানুষ বড় হয়ে উঠেছে। তার মাথায় ছোট তিলক মনে করায় শিবের প্রতি একাগ্রতা, নিষ্ঠা। মেঘনাদ দশাননের মত বস্ত্র পরিধান করে এবং স্বভাব চলাফেরায় মনে করায় যুবক দশাননকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন