পারমিতা চক্রবর্তী
মন্দোদরীর বিবাহ প্রস্তুতিতে সরগরম মায়ারাষ্ট্র। তাদের বিবাহের ক’দিন আগে দশাননের বিশেষ উপদেষ্টা মাল্যবান মায়ারাষ্ট্রে এসে দেখে যান বিবাহ প্রস্তুতি সঠিকভাবে হচ্ছে। দশানন মাল্যবানকে নানাশ্রী নামে ডাকতেন। নানাশ্রী ও তার স্ত্রী সুন্দরী লঙ্কা থেকে জামা-কাপড়, গয়না সামগ্রী নিয়ে আসেন মন্দোদরীর জন্য। মাতা সুন্দরী হলেন কেতুমতী'র বোন এবং মাতা কৈকেসীর মাসি।
বাহো সমাপ্ত হলে দশানন প্রেরিত স্বর্ণ সম্ভারে সজ্জিত হয়ে মন্দোদরী লঙ্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সাথে ছিলেন দশাননের কনিষ্ঠতম ভাই ও তার স্ত্রী সরমা এবং নানাশ্রী বা মাল্যবান। বিভীষণ দশাননের মত শক্তিশালী ছিলেন না কিন্তু বিভীষণের আচরণ প্রকৃতি ও অবিকল দশাননের মত ছিল। ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক ছিল খুব স্নিগ্ধ। বিভীষণ মানুষটি খুব সুন্দর প্রকৃতি। দশাননের ঐশ্বর্য, ক্ষমতা, প্রতিপত্তির প্রতি কোন আকর্ষণ ছিল না তার। বিভীষণকে বর্ণনা করা যায় খুব স্বল্প শব্দের দ্বারা। প্রথম পরিচয়ের দিন থেকে বিভীষণের সাথে মন্দোদরী এক আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয়। মন্দোদরী বিভীষণকে শ্রদ্ধা করা শুরু করে। মন্দোদরী মায়ারাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার আগে উষ্ণ অভ্যর্থনায় সবাইকে প্রশমিত করেছিলেন বিভীষণ।
মন্দোদরীর প্রথম রাত কাটে লঙ্কায় বিয়ের নানা প্রস্তুতি, মায়ারাষ্ট্র ছেড়ে আসার কথা চিন্তা করতে করতে। পিতাশ্রী মন্দোদরীর বিবাহে যেমন প্রতিবেশী সকল রাজাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তেমন দেবগনের আমন্ত্রণ ছিল। অসুরপ্রধান, গান্ধর্ব, অপ্সরা সকলেই নিমন্ত্রিত ছিল বিবাহে। বিবাহের তিনদিন আগে থেকে চলছিল আচার, রীতিনীতি। চতুর্থদিনে বিবাহ এবং পঞ্চম দিনে লঙ্কায় প্রত্যাগমন। বহু দিন ও মাসের অবসান ঘটিয়ে বিবাহের দিন ভোর থেকে শুরু হয় আচার-অনুষ্ঠান। ভোরে স্নান করার পর মাতা হেমা ও পিতাশ্রী মায়াসুর আশীর্বাদ করেন মন্দোদরীকে। গায়ে লাল ও সোনালি জরির বস্ত্র, মাথায় সোনালী জরীর ভেল এবং সারা গায়ে সোনার গয়না পরা মন্দোদরীর মাথা সজ্জিত ছিল সাদা ফুলে।
মন্ডপটি দেখে মনে হচ্ছিল স্বর্গের উদ্যান। মন্ডপের দেয়াল স্বর্গীয় ফুল দ্বারা সুসজ্জিত কোনায় কোনায় চারটি কলাগাছ একসাথে বাঁধা। গোটা মায়ারাষ্ট্র বিয়ে নিয়ে উচ্ছ্বসিত। দশাননের পক্ষ থেকে আগত নানাশ্রী, মাতা সুন্দরী বিভীষণ এবং দশাননের কাকা ও মামা মারিচন সবাই দুহাত ভরে আশীর্বাদ করে নবদম্পতিকে। অসুরগুরু শুক্রাচার্য এসেছিলেন সাদা বস্ত্রে এবং রুপার গহনায়। বিবাহের প্রতিটি মন্ত্র উচ্চারণ তারই করা। মন্দোদরীর হাতে এলাচের কুড়ি ও ফুল দিয়ে তৈরি মালা। সফল প্রজাগণ উচ্ছ্বসিত হয়ে দেখলেন রাজবিবাহ। শতাব্দী কখনোই দেখেনি এমন বিবাহ। মন্ত্র উচ্চারণের সাথে বেজে ওঠে উলুধ্বনি। দশানন উপস্থিত হলেন মন্ডপ প্রাঙ্গণে। ‘রাবণ ধ্বনী’ উঠল চারিদিকে। মন্দোদরী তাকিয়ে থাকে রাবণের দিকে এবং তাকে যেন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত মনে হয়। দশাননের আগমনে মন্দোদরীর হৃদয় বাঁধভাঙ্গা বাণের মত ভীত হয়ে ওঠে। দশাননের প্রবেশে মনে হয় মন্দোদরীর বিশ্বসংসারে একমাত্র তিনিই আছে তার জীবনে। তিনি দৈত্যই হোক বা অসুর কিংবা ব্রাহ্মণ - সে একমাত্র প্রিয়তম মন্দোদরীর। সারা শরীর জুড়ে এক অদ্ভূত ভালোলাগায় ভরে ওঠে মন্দোদরীর। দুটি হৃদয় মিলেমিশে একাকার নদীর মত। চারিধরে পড়ে আছে বালি, নুড়ি। সমগ্র জ্যোতিষ্কলোকে একটি নক্ষত্র বিরাজমান - সে রাবণ। মন্দোদরী জীবনে প্রথম প্রেম দশানন, তাকে দেখার প্রথম মুহূর্ত থেকে মন্দোদরীকে একা করে দিয়েছে আরও। পরবর্তী দিন মন্দোদরীর শ্বশুরগৃহে যাওয়ার আয়োজন প্রস্তুত। মাতা হেমার চোখের জল স্থির। পিতাশ্রী, মাই, মায়াবী, দুন্দুভী এবং তার প্রিয় সখীদের থেকে বিদায় নেওয়ার সময় উপস্থিত হল। ফেলে আসা শৈশব, কৈশোর সরিয়ে পুষ্পক বিমানে যাত্রা দেয় মন্দোদরী। যাত্রা শুরু করে মাটি থেকে উত্তর দিকে। লঙ্কা একটা দ্বীপ যার চারপাশে সমুদ্র। পুষ্পক বিমানে করে যাওয়ার সময় চোখে পড়ল মন্দোদরীর সুন্দর হলুদ একটি ভূখণ্ড। নববধূ বিমান থেকে ভূমিতে নামার পর দেখল চারিদিকে সবুজ গাছ আর প্রাসাদ, ঘর সবই সোনা দ্বারা গঠিত। মাইয়ের থেকে শোনা গল্প গুলির মত। চারিদিকে শুধু আশ্চর্য সুন্দর ভূখণ্ডটিকে সোনার প্রাসাদ কিংবা গৃহের আকারে নির্মাণ করেছেন মন্দোদরীর পিতা মায়াসুর। পিতাশ্রী গৃহগুলো নির্মাণ করেছিলেন কুবেরের জন্য। লঙ্কা তৈরি হয় মূলত যক্ষ জাতিদের জন্য। যার প্রধান শাসক ছিলেন কুবের। পরবর্তীকালে এর রাজ্যের শাসন স্থানান্তরিত হয় রাক্ষসের হাতে। দশানন খুব আধুনিক প্রযুক্তির অনুগামী ছিলেন। তিনি মোট দশটি বিমানপথ তৈরি করেছিলেন শ্রীলঙ্কায়। এই বিমানবন্দর গুলি হল-
ভেরাগানটোটা, মাহিয়াঙ্গানা শ্রীলঙ্কা, থুটুপোলাকান্দা, ভেরিয়াপোলা, মেটেল,
গুরুলুপোথা, মাহিয়াঙ্গানা, দক্ষিণ উপকূল রেখা, উসানগোদা, কুড়ুনগেলা।
দন্ডুমোনরা বিমানটি রাবণ বেশি ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। সিংহলি ভাষায় মোনরা অর্থ ময়ূর। এই বিমানটি উড়তো ময়ূরের মত। দশানন তার রাজধানীর নামকরণ করেছিলেন তিনি ত্রিকোঠা অর্থাৎ ত্রিকূট পর্বত বেষ্টিত। বিমানবন্দরগুলি পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ রাখা হত। এই বিমানপথ দিয়েই দশানন লঙ্কা ছাড়াও আরো অনেক রাজত্ব শাসন করতেন। তাঁর রাজত্ব ধীরে ধীরে বর্ধিত হলো বালিদ্বীপ, কলিঙ্গদ্বীপ, স্বর্ণপুরা এবং মালয়দ্বীপ পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত এবং অঙ্গদ্বীপ ব্যারাওদ্বীপ, সঙ্গদীপ, যাদবদ্বীপ এবং অন্ধ্রালয় - যেগুলি সমুদ্রের উত্তরে অবস্থিত। মন্দোদরী ও রাবণের বিবাহের পর পুষ্পক বিমান এসে দাঁড়ায় এই বিমানপথে। পুষ্পক মাটিতে নামার পর শ্রীলঙ্কার প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে দামামা বাজিয়ে, পুষ্পবৃষ্টির ধারা উষ্ণ অভ্যর্থনায় ভরিয়ে তোলে নবদম্পতিকে। কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকেন রাবণমাতা কৈকেসী। দূর থেকে মন্দোদরী মাতা কৈকেসীক দেখে হাসি বিনিময় করে। দূর থেকে মাথার সাদা কেশ চকচক করছিল যেন চাঁদ আকাশ থেকে মাটিতে নেমে এসেছে। রাজকুমারীকে মাতা উষ্ণ চুম্বনে বরণ করেন। মাতা কৈকেসী রাজকুমারীকে দেখে খুবই পছন্দ হয় এবং বলেন, ‘আমি খুবই সৌভাগ্যবতী তোমার মত এত সুন্দরী রাজকুমারী আমার পুত্রবধূ। আমি তোমায় আশীর্বাদ করি তুমি সুখী হও ঐশ্বর্যশালী হও।’ নববধূর যাতে সমস্ত শত্রু, অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা পায় তার জন্য তার সামনে গোটা নারকেল ফাটানো হয়। অসুররা নারকেলকে খুব শুভ মনে করে। যে কোন প্রকার শুভ কাজ করার আগেই তারা নারকেল ফাটায়। দশাননের বোন মীনাক্ষী মন্দোদরীর রূপে মুগ্ধ হয়ে যায়। ‘বৌদি মন্দোদরী আপনার অবিশ্বাস্যরূপেই মুগ্ধ হয়েছেন দশানন।’ মীনাক্ষী অপূর্ব সুন্দরী। চোখ দুটো মায়াবী ময়ূরের মত এবং তীক্ষ্ণ। মীনাক্ষী ভালোবাসা দুহাত বাড়িয়ে দেয় মন্দোদরীর দিকে এবং কপালে চুম্বন করেন।
একে একে লঙ্কার পরিবারের সকলের সাথে সাক্ষাৎ হয় মন্দোদরী। প্রথমে সরমা এবং কুম্ভকর্ণের স্ত্রী বজ্রজলা এবং তাদের সদ্যজাত পুত্র কন্যাদের সাথে আলাপ হয় তার। লঙ্কার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত রমণীরা ভরিয়ে দেয় বিভিন্ন উপহারে বধূকে। এরপর মন্দোদরীর সাথে দেখা হয় অনল, নানাশ্রী কন্যা এবং মাতা সুন্দরীর সাথে। দশাননের খুড়তুতো ভাই বোন অহিরাবণ, খর, দুশন এবং কুম্ভিনীর সাথে পরিচয় হয় একে একে।
মন্দোদরী প্রথম বন্ধু হয় মীনাক্ষী। মীনাক্ষী মন্দোদরীকে তার কক্ষে নিয়ে যায় বিশ্রামের জন্য। তাদের পরবর্তী কর্মসূচি মহাভোজ। রাজবধূকে পরিবারের তরফে পরিচয় করানো হবে এই মহাভোজ। মীনাক্ষী পরিচয় করিয়ে দেন মন্দোদরীর সাথে সকল দাসীদের, পরিচারিকাদের এবং বাইরে অপেক্ষারত সকল মহিলাদের সাথে। মন্দোদরীর দেখা শোনার জন্য বারোজন দাসীকে নিযুক্ত করা হয়। তার পিতার গৃহে দাসীর সংখ্যা ছিল মাত্র তিন। মাইকে মন্দোদরী কখনো দাসী রূপে দেখতো না। ছোটবেলা থেকেই সমস্ত আবদার, খেলার সঙ্গী ছিল সে। লঙ্কায় সেদিন মন্দোদরীকে রাজবেশে তৈরি করার জন্য এবং স্নান করানোর জন্য মোট চারজন দাসীকে নিযুক্ত করা হয়। প্রত্যেক দাসীদের নিজস্ব কাজ ভাগ করা থাকত। অবশেষে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে মন্দোদরী রওনা হয়। অনুষ্ঠানটির জন্য একটি বড় উদ্যান নির্ধারিত হয়। উদ্যানের চারিপাশ আলোকিত। দশাননের আসন মহাভোজের মূল কেন্দ্রে স্থাপিত হয়। মন্দোদরী সেখানে উপস্থিত হওয়া মাত্রই দশানন নিজের হাত বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। দশাননের পাশেই মন্দোদরী আসন স্থির করা হয়। দশানন মন্দোদরীকে জানায় পরবর্তী দিন সকল প্রজার সামনে মন্দোদরীকে লঙ্কার রানি রূপে ঘোষণা করা হবে। রাজকুমারী মন্দোদরী এখন থেকে ‘লঙ্কা রানি’ রূপে চিহ্নিত হবে।
দশাননের সাথে কথা বলার জন্য অনেকক্ষণ থেকেই অপেক্ষা করছিল সে। মন চাইছিল একাকী, নিভৃতে দশাননকে পেতে। মন্দোদরীর সাথে রাজ্যের সকল অতিথি, অভ্যাগত, মন্ত্রী সেনাপ্রধান সকলের সাথে আলাপ করিয়ে দেওয়া হয়। সকল লঙ্কাবাসী খুবই আনন্দিত অনুষ্ঠানে এসে। সকল প্রজা দুহাত ভরে আশীর্বাদ করেন তাদের। লঙ্কা খুব সুখী একটি রাজ্য। এখানে খাদ্যের প্রাচুর্য, সোনা মানিক সহজলভ্যতা, দক্ষ শিল্পী, উত্তরাধুনিক কৌশল, সৈন্যসামন্ত সবই পরিকল্পনামাফিক লঙ্কা এক সুরে বাঁধা গেল এবং একটি পথ সম্পূর্ণরূপে ফাঁকা করে দেয়া হয় এবং অন্য প্রান্তে জোটবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকে প্রজারা। দশানন মন্দোদরী পিছনে গিয়ে জানালেন তার কনিষ্ঠতম ভাই কুম্ভকর্ণ আসতে চলেছে। দশানন তার ছোট ভাইকে খুব ভালোবাসেন এবং তার জন্য গর্ব অনুভব করেন। মন্দোদরী আগেই শুনেছে বিভীষণের থেকে কুম্ভকর্ণ দশাননের খুব কাছের। কুম্ভকর্ণ অত্যন্ত শক্তিশালী রাক্ষস। উচ্চতা আট ফুট পরনে কমলা রঙের ধুতি, নীল রঙের উত্তরীয় কাঁধে। সে তার দাদা বৌদিকে নতুন জীবনের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন। মন্দোদরীকে বলে, ‘তারা যেন সর্বদা একসাথে চলতে পারে এবং জীবনে তাদের অনেক ঐশ্বর্য প্রাপ্তি হয়।’ দশানন মন্দোদরীকে বললেন তার ভাই তার মতোই সুদক্ষ প্রশাসক। জটিল পরিস্থিতিতে পড়লে দশানন নানাশ্রীর পর কুম্ভকর্ণের থেকে নানা উপদেশ দিয়ে থাকেন। সে একজন ভালো উপদেষ্টা। কিছু সময় পরেই উৎসব সমাপ্ত হয় এবং মন্দোদরী নিজের কক্ষে ফিরে যায়।
পরবর্তী দিন লঙ্কায় রাজ্যাভিষেক হবে স্বর্ণসম্ভারে। পাঁচ প্রকার জলে শুদ্ধ করা হয় রাজকুমারীকে। সেদিন অপরূপ বেশে সুসজ্জিত মন্দোদরী। দামী গয়না শরীরে ঝলমল করছে। রাজ্যাভিষেকের অনুষ্ঠানটি সংঘটিত হয় লঙ্কার মূল প্রাসাদে।
শপথ নেওয়ার পর দশাননের মাতা কৈকেসী মাথায় লম্বা মুকুট পরিয়ে দেন এবং লঙ্কার রানি রূপে অভিষিক্ত করেন। দশানন রানি মন্দোদরীর দুই হাত ধরে ঘোষণা করেন এখন থেকে তিনি রাজ্যের রানি রূপে অধিষ্ঠিত হবেন এবং রাজ্যকে চালনা করতে পারবেন। রাজ্যের রাজধানী থেকে বিশাল বড় শোভাযাত্রা এসে উপস্থিত হয় সেখানে। এরপর নিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় লঙ্কার দেবী লঙ্কিনীর থেকে আশীর্বাদ নেওয়ার জন্য।
দেবী লঙ্কিনী বহু বছর ধরে সামুদ্রিক ঝঞ্চা থেকে রক্ষা করে আসছেন লঙ্কাকে। তিনিই প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বা অধিবাসী লঙ্কার। এটা মনে করা হয় যে দেবী লঙ্কিনী ডাকাত থেকে রক্ষা করে এবং সামুদ্রিক বন্দরে ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে সাহায্য করেন। জলদস্যুর হাত থেকে রক্ষা করে দেবী লঙ্কিনী।
সেই সন্ধ্যায় মন্দোদরী অপেক্ষারত দশাননের জন্য। এটাই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ স্বামী-স্ত্রী রূপে। তাদের কক্ষের সম্মুখে সুন্দর ভাবে ফুলে সুসজ্জিত করা হয়। আয়ুর্বেদিক মোমবাতি, ফুলের ঘ্রাণে সুবাসিত কক্ষ। ঘরের চারদিকে ঝাড়লন্ঠন ঝোলানো। শয়নস্থানটি গোলাকার মার্বেলের একটি স্ফটিক বেসের সাথে খোদাই-করা। সমগ্র স্থানটি পাতলা পর্দা দ্বারা আবৃত। এরই মধ্যে তার শয়নকক্ষের দায়িত্বে থাকা পরিচারিকার বার্তায় জানায় দশাননের আগমন সংবাদ। মন্দোদরীর ভেতর সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস চলছে। এই বিবাহ মন্দোদরীর ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি পরিবর্তিত করে। দশানন মন্দোদরীর কক্ষে প্রবেশ করা মাত্রই বন্ধ হয়ে যায় দ্বার। মন্দোদরী তাকে অভিবাদন জানাতে মাথা নিচু করতেই বাহুর মধ্যে আবিষ্ট করে দশানন। ‘আমার রানি আমি তোমার সাথে সারাজীবন কাটাতে চাই।’ মন্দোদরী উপলব্ধি করছিল সে যেন এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল। দশানন মন্দোদরী হাতে চুম্বন দিয়ে তাকে নিবিড় ভাবে কাছে ডেকে নেয়। সে রাতেই শুরু এবং শেষের কথা মন্দোদরীর জীবনে একটা বড় অধ্যায়ের সূচনা করে। তার জীবনে প্রথম পুরুষ দশানন।
‘প্রেম’ শব্দটার সাথে আগে তেমনভাবে পরিচয় হয়নি মন্দোদরীর। সে রাতের পর থেকে মন্দোদরী হয়ে ওঠে প্রকৃত এক নারী। দশানন মন্দোদরীকে জানায় সে কোন বড় বংশে জন্মগ্রহণ করেনি। দশানানকে লঙ্কার রাজা পদে অধিষ্ঠিত হতে বহু সংগ্রাম, রক্তক্ষরণ যুদ্ধ করতে হয়েছে। মন্দোদরী গর্বিত তার জীবনে এমন এক পুরুষের আগমনে। সে একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ পুরুষ। তিনি জীবনে যত না সফল হয়েছেন তার থেকে ভুল বেশি করেছেন। তিনি আশা করেন মন্দোদরী এভাবেই তাকে গ্রহণ করবে।
মন্দোদরী জানায়, ‘দশাননের সকল প্রকার ভালো খারাপের সঙ্গী হয়ে থাকতে চায় সে। তাঁর সকল শত্রু-মিত্র মন্দোদরীর শত্রু মিত্র। দশানন মন্দোদরীকে জানায় লঙ্কা দশাননের কাছে সর্বস্ব। এখানকার প্রজাগণ তার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। কিছু মানুষ জানত নানাশ্রী মাল্যবানও সুমেনী শাসন করার আগে লঙ্কা শাসন করতো তার অর্ধভ্রাতা কুবের। কুবেরের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের জন্য অসুররা দেবতাদের বিরাগভাজন হন এবং তাদের হাত থেকে অনেক ক্ষমতা চলে আসে। কুবেরের রাজত্বকালে যক্ষ উপজাতির হাতে প্রচুর ধনসম্পদ, ঐশ্বর্য চলে আসে এবং কুবের তখন লঙ্কার আধিপত্য বিস্তার করে। দশানান বহু প্রচেষ্টা, সহনশীলতার দ্বারা লঙ্কার অধীশ্বর হন। দশাননই লঙ্কার ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করেন। যা কিছু উন্নয়ন দশাননের অঙ্গুলি স্পর্শে হয়েছে এবং লঙ্কাকে তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত করেন।
মন্দোদরী দশাননের সমস্ত কথা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল। তিনি বলেন লঙ্কা এবং তাঁর প্রজাগণ খুবই সৌভাগ্যবান এবং মন্দোদরী নিজে সেই রাজ্যের রানি হতে পেরে গর্বিত। মন্দোদরী দশাননের চোখে যে স্বপ্ন ও ভালোবাসা দেখেছেন তাতে লঙ্কা নিয়ে তার কৌতূহল ও ভালোবাসা দুই বেড়ে গেছে। দশানন কিছুটা হেসে মন্দোদরীকে আরো নিজের কাছে টেনে বলেন আজকের যে লঙ্কা নিয়ে সকলের এবং তার এত গর্ব তাকে এই জায়গায় পৌঁছতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। দশানন মন্দোদরীকে জানে সে যেহেতু রাজকন্যা তার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় দশাননের জীবন সংগ্রাম। কিন্তু মন্দোদরী নিশ্চয়ই বুঝবে দশাননের জীবনের লক্ষ্য এবং তাকে সম্পূর্ণ করতে দশাননের একাগ্রতা। বিয়ের প্রথম রাতে দশানন মন্দোদরীকে জানায় সে আর লঙ্কা আলাদা নয়।
‘তোমাকে ভয় কিংবা আশঙ্কিত করার জন্য কথাগুলো জানাইনি। তুমি যাতে লঙ্কাকে সমান ভাবে দেখো।’ মন্দোদরীর চোখে ভালোবাসা, প্রসন্নতা চকচক করে ওঠে। দশাননকে জানায় মন্দোদরী সারা জীবন লঙ্কা এবং তার সাথে থাকবে।
অন্তরঙ্গ মুহূর্তে দশানন মন্দোদরীকে বলে ‘প্রথম যখন তোমায় দেখি মনে হয় তুমি আমার জন্য সৃষ্ট। আমি তোমার রূপ, স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম প্রথম দর্শনেই এখন তুমি আমার সাথে আছো সুতরাং সারা পৃথিবী জয় করব।’ সেই প্রথমবার দশানন এবং সে একাকী হয়েছে এবং তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়াই দুজনে বাক্কালাপ করেছে। দশানন ধীরে ধীরে মন্দোদরীর গায়ের অলঙ্কার খুলে ফেলতে থাকে সারা শরীর জুড়ে চুম্বনে ভরিয়ে দেয়। এই প্রথমবার মন্দোদরীর শরীরে প্রথম কোন পুরুষ স্পর্শ করে। সারা পৃথিবী যেন নির্বাক। তারা বহুক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের ভালোবাসায় চুম্বনে ভরিয়ে রাখে। একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে বহুক্ষণ পৃথিবীর কোন তাড়া নেই। লজ্জায়, ভালবাসায় মন্দোদরী মুখ রক্তিম হয়ে ওঠে। মন্দোদরীকে দশানন প্রশ্ন করে, ‘তোমার গালদুটো বেদানার মত রক্তিম কেন? আমি কী তোমায় বিরক্ত করছি?’ ধীরে ধীরে মন্দোদরীকে বিবস্ত্র করে আরো কাছে টেনে নেয় দশানন। রাবণ হল আবেগপ্রবণ প্রেমিক। কিন্তু খুব উদার আত্মসচেতন একটি মানুষ। নারীকে কীভাবে ভালোবাসতে হয় কিংবা একজন নারীকে কিভাবে তার প্রেমে পড়তে হয় তা দশানন জানেন। দুটি নর-নারী হৃদয়ের অন্তরতম মুহূর্তের সাক্ষী সেই রাত। রাত দীর্ঘায়িত হলে কথাদের পরিচর্যা বাড়ে। রাজকুমারী মন্দোদরী থেকে রানি মন্দোদরী। এই মধ্যবর্তী সময়গুলোকে আলাদা করা মন্দোদরী পক্ষে সম্ভব নয়। দশাননকে দেখার প্রথম মুহূর্ত থেকে বিয়ে অবধি এক স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে আগে বিচরণ করত ইট, কাঠ, প্রাসাদ। তার জীবনকে দমকা হাওয়ার মত উড়িয়ে নিয়ে যায় দশানন। সেই রাতে উষ্ণ আলিঙ্গন ছেড়ে দশানন পরেরদিন খুব ভোরে মন্দোদরী কক্ষ ছাড়েন। মন্দোদরীর সারাদিন কাটে দশাননকে নিয়ে নানা ভাবনায় এবং প্রাসাদ পরিদর্শন করে। মন্দোদরী অপেক্ষা করে দশাননকে কাছে পাওয়ার জন্য। বিভীষণ তাদের উদ্দেশ্যে লঙ্কা পরিদর্শন করার জন্য একটি ছোট ভ্রমণ পরিকল্পনা করে। দশানন তাঁর রাজত্বের কাজে যাবার আগে জানিয়ে দেয় তারা যেন সারাদিন লঙ্কা ভ্রমণ করে কাটায় এবং সন্ধ্যেবেলায় দশাননের সাথে সাক্ষাৎ হবে মন্দোদরীর। বিভীষণ রানি মন্দোদরীকে, সৈন্যসামন্ত নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। কোথায় যাচ্ছে আর কী দেখছে কোন কিছুতেই তার কোনো মনসংযোগ নেই। সমগ্র জগৎ মন্দোদরীর কাছে রাবণময়। আগের রাতে ঘটে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে যেন সুতো দিয়ে সেলাই করছিল সে। মন্দোদরীর প্রগাঢ় ভালোবাসা রাবণ। তার চোখে মুখে ক্লান্তি ফুটে ওঠে। বিভীষণ সে কথা বুঝতে পেরে তাকে প্রশ্ন করে, ‘বৌদি আপনি কি অন্য কোন স্থান দেখতে চান নাকি আমি আপনাকে আপনার প্রাসাদে ছেড়ে দেব?’ মন্দোদরী নিশ্চুপ। বিভীষণ তাকে নিজের কক্ষে ছেড়ে আসেন। মন্দোদরী গত রাতের ঘুমের বিভিন্ন মুহূর্তের কথা ভাবতে থাকে এবং কখন দিন অতিক্রান্ত হয়ে রাত আসবে তার প্রতীক্ষা করে।
রানি মন্দোদরী পরিপূর্ণ রাজবধু হয়ে উঠলেন। প্রতিদিন বিভিন্ন বিভিন্ন সাজে পরিবৃত হয়ে তিনি বিভিন্ন স্থান দেখতে বেরোতেন। লঙ্কায় কোন স্থান ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখলে তাকে কীভাবে উন্নত করা যায় কিংবা সেখানে প্রাসাদ নির্মাণ করা যায় এই সংক্রান্ত নানা মতামত দিতেন দশাননকে। প্রতিদিন দশাননকে রাজত্বপাঠে সহায়তা করতেন এবং মূল দরবারের সামনে উপস্থিত হতেন। প্রজাদের সুবিধা-অসুবিধা শুনতেন এবং নানা উপদেশ দিতেন। তাদের বিবাহ কয়েক মাস উত্তীর্ণ হল। মন্দোদরীর মাতা অনেক উপহার দিয়ে তার ভাইদের পাঠালেন মায়ারাষ্ট্র থেকে লঙ্কায়। বার্তা পাঠালেন মন্দোদরীর শাশুড়িমাতা কৈকেসীর কাছে রানি মন্দোদরী যদি কিছু সময় মায়ারাষ্ট্রে থেকে আসত তাহলে মায়ারাষ্ট্র খুব উপকৃত হত। মন্দোদরী আগ্রহী হয়ে পড়লেন তার মাতা, পিতাশ্রীকে দেখার জন্য। এই কয়েক মাসে তার জীবনে অনেক ছোট ছোট গল্পে সৃষ্টি হয়েছে যা তার মা এবং মাইকে শোনানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে কিন্তু দশাননকে ছেড়ে থাকা তার কাছে খুবই কষ্টকর। তবুও মন্দোদরী প্রস্তুত মায়ারাষ্ট্র যাবার উদ্দেশ্যে। এমন সময় দশানন তার কক্ষে উপস্থিত। ‘রানি মন্দোদরী তুমি প্রস্তুত মায়ারাষ্ট্রে যাবার জন্য কিন্তু তোমাকে ছেড়ে কয়েকদিন আমি কিভাবে থাকবো! তুমি আমাকে একা করে চলে যাচ্ছ।’
‘না প্রভু আমি শুধুমাত্র কিছুদিনের জন্য যাচ্ছি মাতা-পিতার সাথে সাক্ষাতের জন্য অল্প দিনের মধ্যেই ফিরে আসব।’ দশানন হালকা হেসে এগিয়ে গেলেন এবং মন্দোদরীকে পুষ্পক বিমানে যেতে বললেন। এই বিমান তাকে সুন্দর ও আরামদায়ক ভাবে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। মন্দোদরীকে দশানন জড়িয়ে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা প্রকাশ করে।মায়ারাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়। মন্দোদরীর কাছে খুব কঠিন ছিল বিষয়টি। তাকে পরিচর্যা করে, বিভিন্ন বিষয়ে হাসি মজা করে উৎসাহ দেয় এবং ভালোবাসে। বিশাল বড় এক রাজবাহিনী ও পরিচারিকাদের সহযোগিতায় তার যাত্রার শুভারম্ভ হয়। মন্দোদরী মায়ারাষ্ট্র থেকে বিদায় নিয়েছিল রাজকুমারী হয়ে এবং ফিরে আসেন রানি হয়ে। তাকে সসম্ভ্রমে অভ্যর্থনা করে মায়ারাষ্ট্র।
এই কয়েকদিনে মন্দোদরীর একবারও মনে হয়নি তার পরিবার ছেড়ে লঙ্কায় গেছে কিন্তু এতকিছুর পরেও মায়ারাষ্ট্র যেন তার কাছে মাতৃসম। শিকড়ের টান অনুভব করে। আসলে মেয়েদের তো নিজস্ব ঘর থাকে না। তা প্রাচীনকাল থেকে আজও চলে আসছে। জীবনের যে পর্যায়ে যেখানে অবস্থান করে সেটাই তাদের ঘর। ছোটবেলা থেকে যেখানে বড় হয়, লালিত পালিত হয় তা পিতৃগৃহ পরবর্তীতে স্বামীগৃহ, পুত্রগৃহ। আমাদের মেয়েদের গৃহ সম্পর্কে ইতিহাস তেমন ভাবে ব্যাখ্যা দেয়নি খুব কম রাজা, পুরুষ সম্প্রদায় আছেন রাজকন্যা কিংবা নারীকে বিবাহ করে তাদের গৃহে থেকে যান।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন