বানর ও লঙ্কা

পারমিতা চক্রবর্তী

অতীত বর্তমান হয়ে দাঁড়ায়। ছোট বালিকা খেলা করে বেড়ায় মাটিতে, হেঁসে বেড়ায় মন্দোদরীর দিকে। এখন সে জানে কে সে এবং তাকে স্বপ্নে দেখতে পায়। মন্দোদরী জানে এখনও তার স্বপ্ন বেঁচে আছে। সেই স্বপ্ন মন্দোদরীকে পেছনে টেনে নিয়ে যায়। মন্দোদরী যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। সে তার কন্যার সারা গায়ে স্পর্শ করে এবং হাতদুটো নিজের হাতে নেয়।

মন্দোদরী তাকে বলতে চায় তার মাতা তাকে প্রত্যাখ্যান করেনি। তাকে জন্ম দেওয়ার জন্য তার মাতাকে অনেক দূর যাত্রা করতে হয়েছিল। মন্দোদরী চেষ্টা করে হৃদয়ের কথা শুনতে। তার প্রাণে এক আনন্দের সঞ্চার হয়, যখন জানতে পারে তার প্রথম সন্তান জীবিত আছে।

মন্দোদরী জেগে ওঠে ঘুম থেকে যেন মনে হয় সূর্যাস্ত হয়েছে বহু বছর আগে। তার জীবনের প্রতি পদক্ষেপে অন্ধকারে ভরে যায়। সামনে বহু প্রশ্ন এসে ভিড় করে। একথা কী ভাবে দশাননকে জানাবে? কাকে সে প্রথম জানাবে? প্রায় ছাব্বিশ বছর পর কন্যার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। মন্দোদরী ভাবে একথা জানালে সীতার জন্য নিরাপদ হবে না। রাম না আসা পর্যন্ত মন্দোদরীই তাকে রক্ষা করতে পারবে।

দশাননকে কোন কিছু বোঝানোর আগে জানতে পারে সীতাকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে অশোক বনে। দশাননের আদেশ মত তার পর্যবেক্ষণের জন্য রাখা হয় এক মহিলা রক্ষীকে। দশানন রামকে এক বছর সময় দেয় সীতাকে খোঁজার জন্য তারপর সে বিবাহ করবে। মন্দোদরী ভীত হয় দশাননের এই প্রকার চিন্তাভাবনার জন্য। সে প্রার্থনা করে রাম যেন দ্রুত ফিরে আসে, দশানন সীতাকে কোন কিছু করার আগেই। মন্দোদরী জানে তার স্বামী কতটা প্রতিহিংসাপরায়ণ।

অশোক বনের কেন্দ্রে অশোক গাছ অবস্থিত। একটি বারান্দা তৈরি করা হয় তাকে কেন্দ্র করে। দশানন একটি ব্যক্তিগত বাগান তৈরি করেন। বাগানের শেষ দিকে একটি ভেষজ বাগান তৈরি করেন, যাতে বাইরে থেকে কেউ বুঝতে না পারে। অশোক গাছের নিচে মাঝে মাঝে সীতাকে দেখে যায়। দশাননের প্রাসাদের শেষে বারান্দায় সারাদিন কাটিয়ে দেয় সীতা। দশানন মাঝেমাঝে সীতাকে দেখে যায়। মন্দোদরী তার সন্তানকে বাচাঁনোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ত্রিজাতাকে সীতার দেখাশোনার জন্য রাখা হয়। সীতার স্বাস্থ্য মাঝেমধ্যেই খারাপ হয়। মন্দোদরী চেষ্টা করে সর্বতোভাবে রক্ষা করতে সীতাকে। ত্রিজাতাকে জানায়, সীতা তার প্রথম সন্তান। একথা শুনেই চমকে ওঠে ত্রিজাতা। তার কন্যার স্বামী রাম! ত্রিজাতা'র মনে পড়ে সেই সময়ের কথা যখন, তার সন্তান তাকে ছেড়ে চলে যায়। সেই ঘটনাও প্রায় ছাব্বিশ বছর আগের। সীতার প্রকৃত পরিচয় শুনে বিস্মিত হয় ত্রিজাতা। মন্দোদরী এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। একদিকে তার কন্যাকে বাঁচাতে হবে। অন্যদিকে স্বামীর প্রতিশোধ!

ত্রিজাতা সীতাকে বাজপাখির মত দেখে রাখে। তার পাশে মহিলা রক্ষী দিনরাত পাহারা দেয়। আট মাস সময় যেন আট বছর মনে হয়। মন্দোদরী চোখের সামনে দেখে তার কন্যা একটু একটু করে ভারাক্রান্ত হয়। সীতা ভাবে তার সাথে কবে রামের দেখা হবে কিংবা আদৌ দেখা হবে কিনা। মন্দোদরীর দৃঢ় বিশ্বাস দশানন কোনোভাবেই সীতার ক্ষতি করতে পারবে না। অবশ্যই রাম তাকে উদ্ধার করবে। দশানন দিন গুনতে শুরু করে।

তিনি আবার নবগ্রহ গুরুর স্মরণে যান। কোন সময় দশাননের জন্য সঠিক নয় তা জানার চেষ্টা করেন। তাঁর মাথার মধ্যে একটা প্রশ্ন ফিরে আসে বারবার কোন সময় সীতাকে বিবাহ করা সঠিক হবে।

দশানন দ্বিতীয়বার সীতাকে লঙ্কায় ফিরিয়ে আনে। মন্দোদরী মনে মনে ধন্যবাদ জানায় দশাননকে সীতার সাথে দূরত্বে থাকার জন্য। সীতার ত্রিজাতার প্রতি ভালবাসা বেড়ে যায়। ত্রিজাতাকে সে মায়ের মত দেখতে শুরু করে। সে ত্রিজাতাকে তার জীবনের সমস্ত ঘটনা জানায়। সীতা জানায়, সে মিথিলার রাজকন্যা। যার সাথে বিবাহ হয় রামের এবং তারা বনবাসে যায়। মন্দোদরী তাকে জানায় সীতা তার প্রকৃত মাতা কে সে খবর এখন জানে না। মন্দোদরী এখনই সীতার কাছে কোনো অধিকার কিংবা কোনো পক্ষ নিতে চায় না। প্রত্যেকেই অপেক্ষা করে রামের ফিরে আসার জন্য।

একজন বহিরাগত প্রবেশ করে এবং অশোকবনের আশেপাশে দেখা যায়। এক ধাতু নির্মিত ঘন্টা সবাইকে সতর্ক করে দেয়। এই প্রথমবার প্রতিরক্ষা বিঘ্নিত হয়। দশাননের পরিবারের সবাই আলোচনা করে, আসন্ন পরিস্থিতির কথা ভেবে প্রত্যেকে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যদি কোন আক্রমণ হয় শহরে সবাই সতর্ক হয়ে থাকে। মন্দোদরী দশাননের কাছে যায়।

দশানন পরামর্শ নেয় মেঘনাদ, প্রহেষ্ঠার সাথে।

‘প্রভু লঙ্কায় কী তোলপাড় হচ্ছে? লঙ্কায় কী কোন বহিরাগত এসেছে?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে।

মেঘনাদ উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ মাতাশ্রী সম্ভাবত একজন স্বদেশী পুরো বিষয় পর্যবেক্ষণ রাখছেন।’

‘সীতা নিরাপদ তো?’

‘সীতা নিরাপদ। ওই বহিরাগত কারোর কোন ক্ষতি করেনি। কিন্তু তিনি বাগানের অর্ধেক গাছ কেটে ফেলেছে। আমাদের রক্ষী তাকে আটক করার চেষ্টা করছে।’ দশানন জানান।

‘তিনি কী আটক হয়েছেন?’

‘এখনো হয়নি। শীঘ্রই হবে...’

‘পিতাশ্রী লঙ্কেশ আমি ওই বহিরাগতকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। তিনি একজন বানর। আমার ছোট পুত্র আকাশ্যকুমার এই সংবাদ দিয়েছে।

‘তিনি বানর! তুমি কী নিশ্চিত? বানর কোন গাছের আশে পাশে ঘুরছে?’ দশানন প্রশ্ন করেন।

‘আমি নিশ্চিত পিতাশ্রী। আপনি যদি আমাকে আদেশ করেন আমি তাকে বন্দী করে এখানে নিয়ে আসছি।’ আকাশ্যকুমার বলে।

‘যাও এখনই। এখানে নিয়ে এসো তাকে।’ আদেশ করেন দশানন। আকাশ্য কুমার তার লক্ষ্যে চলে যায়।

‘ভারত দশানন বানর উপজাতি তো আপনার বন্ধু। আপনি কেন ভাবছেন বানর আমাদের ক্ষতি করবে? আমার মনে হয় কোন ভুল হচ্ছে ...’ বিভীষণ বলেন।

একজন মহিলা রক্ষী অশোকবনে দেখেছে সীতার সাথে বানরের কথা বলতে। সে তখন অন্য রক্ষীদের সতর্ক করে। কিন্তু মূল সময় বানকে দেখতে পাওয়া যায় না।

‘আমরা এখনও জানিনা বানর কেন সীতার সাথে কথা বলছিলেন। বানর আমাদের বন্ধু কিন্তু ওনাকে আটক করার কারণে আমাদের অনেক রক্ষী আহত হয়েছে।’ মেঘনাদ বলে তার মাতাশ্রীকে।

মন্দোদরী তার কন্যার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়। দশানন তার সেনাদের আদেশ দেন যে কোন ভাবেই বহিরাগতকে খুঁজে বার করতে হবে। সব প্রাসাদ এবং অন্তঃপুরের উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হয়। প্রাসাদের মূল দ্বার বন্ধ থাকে। সকল সেনাদের আদেশ দেওয়া হয় লঙ্কার সকল ঘরবাড়ি খুঁজে দেখতে।

আকাশ্যকুমার সংবাদ দেয় তাদের এক রক্ষী আহত হয়েছে। লঙ্কার সেনা অশোকবনে বহিরাগতকে আটক করেছে। সে বড় বড় গাছ ধ্বংস করেছে এবং শীঘ্রই অচেতন হয়ে পড়ে। মন্দোদরী ভয় পায়। নানাশ্রী এক চিকিৎসককে ডেকে পাঠান বহিরাগতের শুশ্রূষার জন্য। দশানন পুরো পরিস্থিতির জন্য অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন। তিনি ওই বহিরাগতকে বন্দী করার আদেশ দেন। তাকে জীবিত অথবা মৃত যে কোন অবস্থায় দশাননের সামনে হাজির করার জন্য। মেঘনাথ তার পিতার আদেশ পালন করেন এবং অশোকবনে সেই আদেশের কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেকে পুরো বিষয়টিকে মিশন হিসাবে দেখেন প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। সীতাকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় তার মধ্যে। অপরদিকে বড় লেজযুক্ত এক বানরকে দেখা যায় গাছে গাছে লাফিয়ে বেড়াতে। তার চেহারা সুঠাম ও সুন্দর। কাঁধের মধ্যে এক ধাতুর জিনিস নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আকাশ্যকুমার চিহ্নিত করে ওই বহিরাগতকে দেখতে বানরের মত এবং উঁচু লম্বা লেজ আছে। মেঘনাদ তাকে ধরার জন্য নানা প্রকার অস্ত্র ব্যবহার করে।

এই প্রথমবার মন্দোদরী মেঘনাদকে আঘাত করতে দেখে। যা দৃশ্যমান হয় তাতে বোঝা যায় মেঘনাদ প্রচুর চেষ্টা করে বানরকে আঘাত করার কিন্তু প্রতি পদক্ষেপেই সে নিজেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তা দেখে দশানন আরো ক্ষিপ্ত হয়ে যান এবং তাকে বধ করার আদেশ দেন। মেঘনাদ বিভিন্ন কোণ থেকে তীর ছুঁড়তে থাকে। প্রত্যেক তীর ছোঁড়ার আগে মন্ত্র পাঠ করে নিক্ষেপ করে। মন্দোদরী জানে এটাই মেঘনাদের শেষ ব্রহ্মাস্ত্র। এই বাণেই বানর আঘাতপ্রাপ্ত হবে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে হত্যা করা যায় না তাকে কিন্তু আঘাতপ্রাপ্ত হয়। বানর অক্ষত ভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন নিজের পায়ে। তারপর তিনি মেঘনাথের আশেপাশে ঘুরতে থাকেন।

পরবর্তীতে তিনি উপস্থিত হন রাজদরবারে। প্রত্যেকে চায় তাকে কাছ থেকে দেখতে। তার হাত এবং ঘাড় দুটোই দড়ি দিয়ে বাঁধা। তাকে দেখতে কদাকার এবং ভয়ঙ্কর। পরনে ধুতি। দেখতে তাকে খুব উৎগ্রীব লাগে।

‘আপনি কে বানর? আপনি এখানে কী করে এলেন এবং কিভাবে আমাদের বাগানের মধ্যে প্রবেশ করলেন?’ নানাশ্রী প্রশ্ন করেন।

‘আমি হনুমান। শ্রীরামচন্দ্রের আদেশমত এখানে এসেছি। আমি খুঁজতে এসেছি জননী দেবী সীতাকে।আমি এখানে তাকে দেখেছি।’ তার উত্তর শুনে রাজদরবারে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়।

‘আপনি বানর। কিষ্কিন্ধ্যা রাজা আমাদের বন্ধু হয়। তিনি কীভাবে শ্রীরামকে এমন আদেশ দিতে পারলেন? দশানন বানরের কাছে জানতে চান।

‘আমি আপনাকে জানাই লঙ্কার বন্ধু বালি পরাজিত হয়েছে তার ভাই সুগ্রীবের কাছে। রাজা সুগ্রীব এমন সমস্ত আদেশ দান করেছেন।’ হনুমান জানায় রাজা দশাননকে। রাজদরবারে ফিশফিশ আওয়াজ শুরু হয় এরপর কেউ কেউ বলেন, ‘প্রভু ইনি চর?’

‘সুতরাং আপনি এখানে এসেছেন চৌর্যবৃত্তি করতে আমাদের উপর।’ নানাশ্রী তাকিয়ে থাকেন বানরের দিকে।

‘আমি এখানে এসেছি জননী দেবী সীতাকে খুঁজতে, যাকে এখানে অপহরণ করে রাখা হয়েছে। আমি তার কাছে শ্রীরামচন্দ্রের বার্তা পৌছে দিতে এসেছি।’ হনুমান বলেন।

‘কী বার্তা? আমাদের বলুন।’ দশানন বলেন।

‘শ্রীরাম বলেছেন যিনি সীতার গা স্পর্শ করবে তাকে তিনি চরম শাস্তি দেবেন। তিনি তার রাজত্ব ছারখার করে দেবেন এবং তাকে তিনি এমন উদাহরণ দেবেন যাতে তার মত এমন কাজ আর কেউ কখনো করতে না পারে।’

হনুমান দশাননের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। মন্দোদরীর শিরদাঁড়া দিয়ে যেন রক্ত স্রোত বয়ে যায়। দশানন উল্লাস দিয়ে ওঠে হনুমানের উপর।

‘ইহা খুবই আকর্ষণীয়। আমরা সবাই অপেক্ষা করে আছি শ্রীরামের এখানে আসার জন্য। তিনি যদি এখান থেকে তার স্ত্রীকে নিয়ে যেতে চান তবে তিনি নিজে এবং তার ভ্রাতা লক্ষ্মণকে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলুন। আমি সেই দৈত্য যে সীতাকে অপহরণ করেছি। আমি আমার প্রজাতির মানুষদের হত্যা করার প্রতিশোধ অবশ্যই নেব এবং তাকে এমন শিক্ষা দেব যাতে তিনি আর কোনদিন ভবিষ্যতে কোন ভগিনীর সাথে এমন ঘটনা ঘটানোর সাহস না পান।’

হনুমান মৃদু হেসে, ‘সমর্পণ! আপনি কী প্রভু শ্রী রামকে বোকা মনে করেছেন?’

‘বাকসংযত করুন বানর। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন লঙ্কাপতি রাবণের সামনে। আপনি সঠিক শব্দ প্রয়োগ করুন। আমি কিন্তু আপনার জিভকে পুড়িয়ে দিতে একটুও সময় ব্যয় করব না।’ মেঘনাথ রেগে যায়।

‘আমি আপনাকে বুদ্ধি দিয়ে চলার পরামর্শ দিতে চাইছি। এখনো হাতে সময় আছে। সীতাকে প্রভু রামচন্দ্রের কাছে শ্রদ্ধাপূর্ণ ভাবে পাঠিয়ে দিন এবং নিজের ভুল স্বীকার করুন। তিনি খুবই দয়ালু ...’

‘আর একটা কথা বললে আমরা এখানে আপনাকে শেষ করে দেবো।’ নানাশ্রী রাগে চিৎকার করেন।

‘যথেষ্ট হয়েছে! দশানন আদেশ দিয়ে ডেকে পাঠান।’

‘আমরা বৃথা সময় নষ্ট করছি। তাকে বন্দী করা হোক।’

হনুমান হেসে ওঠে উচ্চকণ্ঠে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। সেখানে যা যা পাত্র ছিল মাটিতে ফেলে দেয়। ক্রমাগত বিদ্রুপ করতে থাকে। রাবণকে বলে, ‘আমি ভূমিপুত্র হনুমান। ভিক্ষা করার আমার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি দেখলাম কে আমায় বন্দি করেছে।’ মেঘনাদের দিকে তাকিয়ে থাকে হনুমান।

‘আপনি যে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করেছেন তার সম্মান রাখার জন্যই আমি বন্দী হয়েছি। যদি আপনি মনে করেন আমাকে খুব সহজে বন্দি করা যায় ...’

মন্দোদরী ভাবে তিনি মায়াবী।

‘আমাদের রামকে সতর্ক করা উচিত তার মাধ্যমে। প্রভু এখন একে ছেড়ে দিন।’ বিভীষণ পরামর্শ দেন দশাননকে।

‘তুমি কি তোমার বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছো?’ দশানন চিৎকার করে।

‘আমরা তাহলে ওনাকে দাঁড়াতে দেব এবং অপমানিত হব। তিনি আমার পুত্রকে আঘাত করেছেন এবং হুমকি দিয়েছেন আমার দরবারে আমার সামনে। আমরা কীভাবে তাকে ছাড়ব?’ বিভীষণ মৃদুস্বরে বোঝানোর চেষ্টা করে দশাননকে যাতে তিনি তার কথা শোনেন।

‘ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছেন যে তিনি কতটা ভয়ঙ্কর। মেঘনাদ ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করার পর তিনি অক্ষত আছেন। তাকে দেখতে বিভ্রান্তিকর মনে হয় সবার। তিনি আমাদের আরও সম্পদ ধ্বংস করবে বলে মনে হয়।’

দশানন নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।

‘আমার তাতে কিছু যায় আসেনা। বন্দি করো তাকে এবং নিয়ে যাও এখান থেকে।’

বিভীষণ ফিরে তাকায়। তাকে পরাজিত লাগে। নানাশ্রীর দিকে ফিরে তাকায় এবং ফিসফিস করে বলার চেষ্টা করে। তারা মাথা নিচু করে শোনে দশাননের আদেশ।

নানাশ্রী মাঝে বলেন, ‘প্রভু লঙ্কেশ আমাদের তাকে একটা শিক্ষা দেওয়া উচিত। আমার মনে হয় তাকে এক বার্তাবাহক হিসেবে পাঠানো হয়েছে। আমাদের তাঁকে কারারুদ্ধ করা ঠিক হবে না। কারণ তাকে শাস্তি দিয়ে আমাদের কিছু হবেনা।’

দশানন বোঝেন নানাশ্রীর বক্তব্য, ‘আপনি কী শাস্তি দিতে চান নানাশ্রী?’ দশানন প্রশ্ন করেন।

‘একজন বানরের লেজ হল তার গর্ব। আমার মনে হয় আপনি ওটা পুড়িয়ে দিন। তারপর তাকে লঙ্কা থেকে তাড়িয়ে দিন। এটা হবে আমাদের তরফ থেকে যোগ্য জবাব। আমাদের মানুষকে হত্যা করার শাস্তি। কুড়িজন সেনাকে পদপিষ্ট করে মেরেছে হনুমান তার হাঁটু দিয়ে। সেও বাঁচতে পারত না। কিন্তু এনাকে আমরা আমোদ হিসেবে গ্রহণ করেছি।’

শীঘ্রই তার লেজ জালানো হয়। রাজদরবার স্তম্ভিত হয়। বানর এই দণ্ড গ্রহণ করে, ‘জয় শ্রীরাম।’ বলে উঠে উড়ে যায়। এর ফলে রক্ষীদের আগুনের দ্বারা কিছু ক্ষতি হয়। সে এক বাড়ি থেকে অপর বাড়িতে লাফাতে থাকে। বাড়িগুলো ভষ্মিভূত হয়। সেনারা সবাই ভয় পায়। তাকে আবার সবাই ধরার চেষ্টা করে। কেউ কেউ বিভিন্ন জায়গায় তাকে দেখতে পায়। আগুন ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। লঙ্কার প্রাসাদ-দুর্গ, বাড়ি, বাগান সব ভষ্মিভূত হয়। সকলের চোখে সামনে লঙ্কার সব সোনা গলে যেতে থাকে। দশানন সবকিছু দেখে নিশ্চুপ থাকেন। দশানন, নানাশ্রী কেউই বুঝতে পারেনি এমন পরিণতি হতে পারে। মেঘনাদ, অতিকায় এবং ত্রিশির দায়িত্ব নেন। তারা পরিবার এবং সকল মন্ত্রীদের অন্তঃপুরে সরিয়ে নেন। আগুন আরও বেড়ে যায়। আহত হয় লঙ্কার অনেক সেনা, তাদের চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় চিকিৎসালয়ে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পর্যালোচনা করা হয়। নারান্ত্বক এবং দেবত্বক সেনাবাহিনীর দায়িত্বে থাকে। লঙ্কার চারিদিকে প্রতিরক্ষা আরো সুরক্ষিত করা হয়। লঙ্কার মানুষ একে অন্যর দিকে তাকাতে ভুলে যায়। চারিদিকে ধ্বংসস্তুপ শুধু। মন্দোদরী তার কক্ষের বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখে শুধু কালো ধোঁয়া ভেসে যায়। চোখ ঢেকে যায় কালো অন্ধকারে।

পরের দিন সকালে দশানন তাঁর রাজত্বে যা কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত, ক্ষত তাকে মেরামতির আদেশ দেয়। দশাননের পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে ধ্বংস দেখা। তিলে তিলে গড়ে তোলা লঙ্কার পতন দশাননকে ভেঙে চুরে দেয়। চিকিৎসক আকাশ্যকুমারের জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করে কিন্তু সে অচেতন হয়ে থাকে। তার মাথার ক্ষত খুবই মারাত্মক। দশানন তাকে পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখেন। মন্দোদরী তার কাছে দুদিন কাটায় প্রার্থনা করে যাতে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে কিন্তু তাদের প্রার্থনা কাজ হয় না। তৃতীয় দিনে আকাশ্য কুমার ঘুমের মধ্যে থেকেই চলে যায়। নিজের সন্তানের মৃত্যু চোখে দেখা একজন মা'র পক্ষে খুবই কষ্টদায়ক। তাদের কনিষ্ঠপুত্র তাদের ছেড়ে চলে যায়। মন্দোদরী আহার পরিত্যাগ করে। নিদ্রাহীন রাত কাটায় মন্দোদরী। সে বোঝে তার সাথে সবাই কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু তার কানের মধ্যে দিয়ে কিছুই পৌঁছায়না অন্তরে। তিনদিন পর তার অন্তোষ্টির আয়োজন করা হয়। চিতা প্রস্তুত করা হয়। আকাশ্যকুমারের মাথা দশাননের হাতে থাকে এবং তিনি চিতা মধ্যে সাজিয়ে দেন। শেষ কান্না কেঁদে নেয় মন্দোদরী ছেলের গাল, শরীর স্পর্শ করে। দশানন, মেঘনাদ এবং অন্যান্য ভাইয়েরা অন্তোষ্টি ক্রিয়ার জন্য এগিয়ে আসে।

তেরো দিনের শোক পালন করা হয়। প্রত্যেকে তারা দিনে একবার ভোজন করে। মন্দোদরী নিজের কক্ষ থেকে সূর্য উদয় এবং অস্ত দেখে। ঈশ্বরের কাছে মন্দোদরী বারবার প্রশ্ন করে কেন তার সাথেই এত খারাপ কিছু ঘটে। তার কন্যা তার থেকে পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন। সে যে জীবন ফেলে এসেছে কিছু বছর আগে তাকে কোনোভাবেই ছোঁয়া যায় না। মন্দোদরী কোনোভাবেই কন্যার কাছে তার মাতা'র জায়গা নিতে পারবে না। মেঘনাথ মাতা'র থেকে পিতা'র পুত্র অনেক বেশি। পিতার সাথে আত্মিক সম্পর্ক অনেক বেশি। এই যুদ্ধে তার ছোট পুত্রের হাস্যকর ভাবে মৃত্যু ঘটে। এটা কী রানি হয়ে মেনে নেওয়া যায় মন্দোদরী পক্ষে?

রাজদরবার থেকে তাকে আবার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঘরবাড়ি গুলোকে আবার আগের অবস্থায় ফেরানার চেষ্টা করা হয়। বাগানের ঝর্ণা সারানো হয়, বাগানকে আবার পরিচর্যা করা হয়। আকাশ্যকুমারের স্থান ফাঁকা থাকে বাদ বাকি আবার স্বাভাবিক হতে থাকে। প্রত্যেকে রাজ দরবারে একত্রিত হয় এবং তার বীরত্ব নিয়ে আলোচনা করে। মন্দোদরী দশাননের অন্য ক্ষতি চোখে পড়ে না। তার সাথে থাকে ধন্যমালিনী এবং ন্যায়নন্দিনী। দশানন তার রাজত্বের কাজ সঠিক ভাবে করতে পারে না। সীতা তখনও থেকে যায়। মন্দোদরী তার জন্মবৃত্তান্ত কয়েকজনকে জানায়। মন্দোদরী নিজেই পুত্রের মৃত্যুর জন্য দোষারোপ করে। দোষারোপের পালা শুরু হয়। বিভীষণ ভাই দশাননকে দোষারোপ করে, তার দূরদর্শিতার জন্য লঙ্কায় এমন ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। শোকে বিভীষণের মুখে শব্দ নিক্ষেপ শুরু হয়।

‘ভারত লঙ্কেশ আপনি আমার শোক ভরা উত্তাপ গ্রহণ করবেন। আপনার এই ক্ষতি অপূরণীয়। আমরা সবাই দুঃখিত আপনার কনিষ্ঠতম পুত্রের মৃত্যুর জন্য। কিন্তু এই মৃত্যুর দায় কার প্রভু? আপনার কী মনে হয় না ঈশ্বর ক্রুদ্ধ আপনার উপর? আপনি ওই মহিলাকে বন্দী করে রেখেছেন। আপনার মনে হয় না এ পাপ!’ বিভীষণ চোখে চোখ রেখে কথা বলেন দশাননের সাথে। সবাই স্তব্ধ এ কথা শুনে। মন্ত্রিরা সবাই নিজেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলা শুরু করে।

‘কী ভুল হয়েছে? এই সময় এই কথা বলা উপযুক্ত নয়।’ নানাশ্রী মাথা নাড়িয়ে বোঝায় বিভীষণকে।

দশানন মাঝে বলেন, ‘বলতে দিন নানাশ্রী। আমি শুনতে চাই সে কী বলতে চায়।’ সরমা বসেছিল নারীদের মধ্যে। রাগার্ত ভাবে তাকিয়ে থাকে দুই ভাইয়ের মধ্যবর্তী সংলাপে।

‘আমার তেমন কিছু বলার নেই ভারত লঙ্কেশ। আমি কোন কিছুর মধ্যে নেই। আকাশ্যকুমার খুবই সরল তার মৃত্যুর কারণ আপনার দূরদর্শিতার অভাব।’ দশাননকে আরও মর্মাহত লাগে।

‘তুমি কী বলতে চাও? পরিষ্কার করে বল।’

‘ক্ষমা করবেন প্রভু। আমাদের সাম্রাজ্যে যা কিছু হচ্ছে সবটাই বিপরীতে চলছে তার একমাত্র কারণ সীতাকে এখানে রাখা। আমরা আজ কেউই শান্তিতে নেই। তাকিয়ে দেখুন বানর আর কী কী করতে পারে। ভেবে দেখুন রাম এবং লক্ষ্মণ যখন পৌঁছবে তখন কী হবে। আমরা কী এতই অপারগ তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি? না প্রভু এর একমাত্র কারণ সীতাকে এখানে অপহরণ করে রাখা। ওনাকে ছেড়ে দিন অথবা আমাদের জন্য অনেক কিছু অপেক্ষা করে আছে।’

‘আমি তোমার এই শব্দগুলো মানিনা বিভীষণ। আমি প্রথম না যে এই যুদ্ধ শুরু করেছি তারা আমাদের ভগিনীর সাথে অভদ্র আচরণ করেছে এটা তারই প্রতিশোধ মাত্র। তুমি নিজেই ভাবো এটা কী সঠিক সিদ্ধান্ত হবে তাদের ছেড়ে দেওয়া। কোথায় ছিল বুদ্ধি যখন আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম ভগিনীর অপমানের প্রতিশোধ কীভাবে নেওয়া যায়। কোথায় ছিল সাহস যখন আমাদের ভগিনীর সম্মান মাটিতে লুণ্ঠিত হচ্ছিল? তুমি এখন তো আমার দোষ খুঁজে চলছো, কোথায় ছিল তোমার বিচার যখন বানর রাজদরবারে দাঁড়িয়েছিল এবং তুমি তাকে বন্দি করতে পারছিলে না!’

‘যা ঘটছে তার জন্য আমিও দায়ী। কিন্তু আমি এই সমস্যা যেখানে উদ্ভুত হয়েছে তার মূল উপড়ে ফেলতে চাই এখনই। সীতাকে মুক্ত করে দিন এবং সব শেষ হয়ে যাক।’

‘তুমি বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলছো না বরং ভীরুবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের মতন বলছো বিভীষণ।’ দশানন চিৎকার করেন।

‘আমি তোমাকে এতদিন সহ্য করেছি, কোন শাস্তি দিইনি কারণ তুমি আমার ভ্রাতা। তুমি দরবারে এমন কথা বলতে পারছ কারণ আমি তোমাকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছি। কিন্তু ভুলে যেওনা আমি এখন রাজা। আমাকে শুধুমাত্র ভ্রাতা ভাবা ঠিক হবে না। তুমি বহু বছর আগে রাজা হবার যোগ্যতা নিজেই হারিয়েছো।’

বিভীষণের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। নিস্তব্ধ চোখ তার। সময় দ্রুত পরিবর্তন হয়। দশানন যা যা করেছেন তাঁর রাজত্বে তা নিয়ে তার ভ্রাতা, ভগিনীর মধ্যে অসন্তোষ শুরু। মীনাক্ষী আগেই ভ্রাতার দিকে অঙ্গুলি নিক্ষেপ করেছিল স্বামীকে হত্যা করার জন্য। কিন্তু তার সব দায় তার ভ্রাতা বহন করে চলেন। দশানন কোনভাবেই নিজের নিন্দা সহ্য করতে পারে না রাজদরবারে।

ধীরে ধীরে প্রত্যেকেই নিজের ক্ষতির কাছে নতিস্বীকার করে। বানর তাদের বিমানবন্দরে ব্যাপক ক্ষতি করে। সমস্ত যন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি করে দেয়। শনিদেব, নবগ্রহগুরুকে খুঁজে পাওয়া যায় না কোথাও। সবাই বিশ্বাস করে যখন সমগ্র শহর পুড়তে থাকে তিনিও পালিয়ে যান। অন্যান্য নবগ্রহগুরু দশাননকে সঠিক পথ দেখায়। তারা দশাননকে পরামর্শ দেন পরবর্তী ছয় মাসে তার কী করা উচিত কী নয়।

মন্দোদরীর সাথে দেখা হয় সীতার কনিষ্ঠ পুত্র আকাশ্যকুমারের মৃত্যুর পর। ত্রিজাতা ছিল সেই সময়ের সঙ্গী। মন্দোদরী ঠিক করতে পারে না সঠিক কী হওয়া উচিত। সীতা একমাত্র কারণ হনুমানের লঙ্কা আসার। তিনি সক্ষম ছিলেন সীতাকে উদ্ধার করার জন্য। তিনি কেন এলেন না এই সমস্ত চিন্তা মাথার মধ্যে ঘোরে মন্দোদরীর। সীতা কেন তাকে আটকাল না? আমার পুত্র এবং আমার শহরকে ছাড়খাড় করে দিল। অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। প্রশ্ন থেকেই যায়।

এইভাবে নয় মাস অতিক্রান্ত হয়। শেষ তারিখ সীতার জন্য আগত হয়। মন্দোদরী বিস্মিত হয় যদি সত্যিই দশানন সীতাকে বিবাহ করেন। এমন ঘটনা যদি ঘটে রামের অনুপস্থিতিতে তবে ভয়ঙ্কর কিছু অপেক্ষা করে আছে লঙ্কার জন্য। এই সময় দশাননকে সমস্ত তথ্য জানানো উচিত। এমন সময় কেউ একজন বলে, ‘রাজা আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।’ তার চিন্তাকে বাধা দেয় দাসী।

‘সবকিছু ঠিকঠাক আছে? আমি দরবারের দিকে আসছিলাম একটা আলোচনার জন্য।’

‘বসো মন্দোদরী। আমরা সবাই সব কিছুই জানি। দশানন বলেন এবং সাথে সাথে এক মন্ত্রী বলতে শুরু করেন। মন্ত্রী মহাপ্রসভ এখন আমাদের সেনাপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘প্রভু আমরা তাদের সৈন্য দেখেছি। প্রচুর, প্রচুর সদস্য। তারা প্রত্যেকে বানর মানুষ। তাদেরকে বানরের মত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক, নৌকাচালনা, পশুপালন করা ইত্যাদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে তাঁবু করে ভারতবর্ষের দক্ষিণ প্রান্তে। তারা জানে কীভাবে আক্রমণ করতে হয়।’

‘ক্ষমা করবেন প্রভু, কিন্তু, উনি কাদের সেনাবাহিনীর কথা বলছেন?’ মন্দোদরী দশাননকে জিজ্ঞাসা করেন।

‘রাম ও লক্ষ্মণ। আমাদের মন্ত্রীরা ফিরে এসেছে বাণিজ্য করে ভারতবর্ষ থেকে। বন্দরের সামনের থেকে তারা দেখেছে বানর মানুষদের তাঁবুতে প্রশিক্ষণ নিতে।’ দশানন জানান।

‘সুতরাং রাম ও লক্ষ্মণ এখন বানরদের সাথে আছেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে?’ মন্দোদরী মন্ত্রীদের কাছে প্রশ্ন করে জানতে চায় তাদের মনোভাব।

মন্দোদরী ভীত হয়। আবার যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু হতে চলেছে। প্রত্যেকেই সেই বানর মানুষদের দেখতে পাওয়া শুরু করে আশেপাশে। রাম ও লক্ষ্মণ এখন বানর প্রজাতির সাথে সন্ধি করেছেন-- যার কেন্দ্রে কিস্কিন্ধ্যা রাজা সুগ্রীব। সমুদ্রের ধারে তাঁবুতে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে। তারা সমুদ্র পার করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। রাজদরবারে গুনগুন ধ্বনি শুরু হয়, দশানন তখনও চুপ করে থাকেন।

নানাশ্রী আসেন এবং বলেন, ‘আমাদের উচিত চর নিযুক্ত করা অথবা অপর সেনাপ্রধান নিযুক্ত করা যাতে তিনি সমস্ত সংবাদ রাখতে পারে বিপক্ষ শিবিরের।’

‘তথ্য অবশ্যই যেন বিশ্বাসযোগ্য হয়। মহাপ্রসভ জানেন, তিনি কী সংবাদ দেবেন।’ দশানন বলেন।

‘পিতাশ্রী,আপনি আমাকে আদেশ দিন আমি তবে সৈন্য সামন্ত নিয়ে রওনা দিই এবং আরও কিছু তথ্য নিয়ে আসি।’ মেঘনাদ বলে।

‘না তোমায় এখানে দরকার। যে কেউ একজন যেতে পারে।’ আতিকায় তাদের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়ায়, ‘আমি তোমাকে পাঠাতে চাই না সেখানে। আমার তোমাদের সবাইকে দরকার ...’ দশানন বলেন।

মন্দোদরী বিভীষণের দিকে তাকিয়ে থাকে। দশাননকে গোটা পরিস্থিতি চুপ করিয়ে দেয়।

‘তারা কেমন করে সমুদ্র পারাপার করবে?’ মন্দোদরী নানাশ্রীর কাছে জানতে চায়।

মূল ভূখন্ড ভারতবর্ষের লঙ্কার সাথে যুক্ত এবং তাদের মধ্যে এক সূক্ষ্ম যোগসূত্র আছে। সমুদ্র বিভাগ করে দিয়েছে ভারতবর্ষ থেকে। এটা অসম্ভব যে কারোর পক্ষেই তা পেরিয়ে আক্রমণ করার এবং ভূখণ্ডের সেতু এত লম্বা হওয়া সম্ভবপর নয় যা সমুদ্রকে পার করে লঙ্কার সাথে ভারতবর্ষে সংযোগ ঘটাবে।

‘তারা আক্রমণ করতে পারে নৌকার দ্বারা।’ প্রহেষ্ঠ এবং বাকিরা একে অপরের সাথে আলোচনা করে। কী ভাবে রাম আক্রমণ করতে পারে।

মন্দোদরী সব শোনে শান্তভাবে। তারা জানায় যে রামকে আক্রমণ করতে গেলে নৌকা, জাহাজ দ্বারা করতে হবে। লঙ্কার সেনা তখনই তাদের ধ্বংস করবে তারা বন্দরে আসার আগে। সকল কৌশল অনুমান করা হয়। মন্দোদরী দশাননের দিকে তাকিয়ে থাকে। দশানন শুনে অবাক হয়ে যান রামের সেনাবাহিনী আছে। তারা ভাবতেই পারেনি রাম অস্ত্রশস্ত্র দ্বারা শক্তিশালী হতে পারে।

‘পিতাশ্রী আমরা অপেক্ষা করছি আপনার আদেশের জন্য।’মেঘনাথ বলে।

‘আমরা কোনো পরিকল্পনা করার আগেই বন্ধ করে দিতে পারি। অহিরাবণ বলুন, আমরা সকলেই এটা একটা কাজের মধ্যে আছি।’ দশানন বলেন।

অহিরাবণ হল দশাননের ভাইপো। তিনি পাতালা অংশের প্রধান। তিনি দশাননকে সাহায্য করেছিলেন ইন্দ্রের সাথে যুদ্ধ করার সময়। দশানন তাকে সাহায্য করেন এই অঞ্চল স্থাপন করার সময়। তার এক ছোট এবং শক্তিশালী সেনাবাহিনী আছে। তিনি বিশ্বাস করেন রাম ও লক্ষ্মণ লঙ্কা থেকে বেঁচে ফিরতে পারবে না।

সকল অধ্যায়
১.
অহল্যা, দ্রৌপদী, সীতা, তারা, মন্দোদরীপঞ্চসতীর প্রতি নিবেদন
২.
সূচনা
৩.
বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী
৪.
বিবাহ পর্যায়ে মন্দোদরী
৫.
দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ ও মন্দোদরী কথা
৬.
বজ্রজলা ও মন্দোদরী
৭.
অমৃতের সন্ধানে দশানন ও তার প্রতিক্রিয়ায় মন্দোদরী
৮.
দশানন, বালী ও মন্দোদরী
৯.
মহান্ত, মাতা কৈকেসী ও মন্দোদরী
১০.
মন্দোদরী ও ঋষি ঘৃতস্মদা
১১.
আত্মশ্লাঘা ও মন্দোদরী
১২.
জীবন সন্ধিক্ষণে মন্দোদরী
১৩.
মন্দোদরী ও দশানন
১৪.
মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ
১৫.
মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন
১৬.
যোদ্ধা মেঘনাদ
১৭.
মেঘনাদের বিবাহ ও মন্দোদরী
১৮.
দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী
১৯.
সীতা হরণ ও মন্দোদরী
২০.
বানর ও লঙ্কা
২১.
অহিরাবণ
২২.
যুদ্ধে মেঘনাথ ও মন্দোদরী
২৩.
লঙ্কার রানি মন্দোদরী
২৪.
ফিরে দেখা
২৫.
ঋণ স্বীকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%