পারমিতা চক্রবর্তী
দেবর্ষি নারদ মুনি ঘুরে যাবার পর দশানন নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করতে থাকেন। বানরের চিন্তায় তার নিদ্রা বিপন্ন হয় একদিন তিনি তার বিমান নিয়ে উদ্দেশ্যে রওনা হন।
বালিকে এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলবেন বলে। তিনি ফিরে আসেন কিছুদিন পর। যখন বিমান অবতীর্ণ হয় দশানন তাড়াতাড়ি নেমে পড়েন। বাঁ পা সামনে রেখে মুখে তার ভয়-ভীতি জড়ানো। তাকে বেশ কিছুটা বিধ্বস্ত লাগে। বিষন্নতা ছেয়ে যায় চোখেমুখে। সৈন্য-সামন্ত তাঁকে তার কক্ষে নিয়ে যায়। দশাননকে বেশ অসুস্থ লাগে। ‘প্রভু আপনার এইবার ফিরতে কেন এত সময় লাগলো?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে।
‘তুমি জানো তো মন্দোদরী আমি কিস্কিন্ধা ছিলাম।’
‘হ্যাঁ জানি প্রভু। কিন্তু কী হয়েছে সেখানে? আপনি আক্রান্ত হলেন কীভাবে?’
‘যখন কিস্কিন্ধায় আমি যাই তখন সূর্যাস্ত। আমি দেখি নদীর উপর বিস্তর শিলাখণ্ড। আমি নদীর উপর দিয়ে হেঁটে যাই তখন বুঝি শিলাখণ্ডগুলি আসলে বানর তিনি আর কেউ নন বালি। আমি বুঝতে পারিনি সোনালী চুল প্রস্তরখন্ডের উপর। বালি আমার মুখোমুখি হয় সন্ধ্যাবেলায় প্রার্থনা পর। যখন সে নদী থেকে উঠে আসে আমি নিজের পরিচয় দিই এবং নিজের বীরত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করি।’
হঠাৎ করে চুপ করে যায় দশানন।
‘তারপর কি হল প্রভু?’ প্রশ্ন করে মন্দোদরী।
‘বানর আমার প্রতিদ্বন্দ্বীতা কথা শুনে তেমন পাত্তা দেয় না মৃদু হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলে আপনি যেখান থেকে এসেছেন সেখানে ফিরে যান নাহলে আমার রাজত্বের যে বিমান নেমেছে তাকে আমি ভেঙে দেবো।’
দশানন রেগে যায় এবং প্রথমেই বানরের লেজে আঘাত করেন। তিনি ভেবেছিলেন তার লেজটাই সব থেকে দুর্বল কিন্তু যখন তার লেজে প্রথম স্পর্শ করেন দশানন অবাক হন। কোনভাবেই লেজকে ঘোরানো সম্ভব হয়না তার পক্ষে। বানর তাতে রেগে যায় এবং দশাননে শরীরে গোটা লেজটাকে পেচিয়ে রাখেন। দশাননের হাত ধরে নদীতে ছুড়ে ফেলে দেয়। দশানন এমনভাবে অপমানিত এর আগে কখনোই হয়নি। তাও সেই অপমান তাকে পেতে হয় বানরের থেকে।
দশাননের চোখ লাল হয়ে যায় রাগে, অপমানে। মন্দোদরী দুঃখিত হয় তার স্বামীর এরূপ অবস্থার জন্য। দশানন নিজের সাম্প্রতিক অবস্থা কাঠামোয় নিজেকে বহন করে নেয় এবং তিনি বুঝতে পারেনি যে রাজকীয় প্রহরী ছাড়া সেখানে যাওয়া উচিত হয়নি। শুধু সাহস প্রদর্শনের জন্য তাকে এতটা অপমানিত হতে হল।
‘প্রথমবার আমি ওঠার চেষ্টা করি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়ে যাই এবং বানরের লেজ ধরে তাকে মাটিতে ফেলার পূর্ণ চেষ্টা করি। আবার সে তার লেজকে কুণ্ডলিত করে আমার চারপাশে পুনরায় আমাকে ফেলে দেয় মাটিতে। তৃতীয়বার আমি যখন তার সামনে উপস্থিত হই সে আমাকে সারারাত চেপে আটকে রাখে। আমি চেষ্টা করি বেরিয়ে আসার কিন্তু বারংবার চেষ্টায় আমি ব্যর্থ হই। আমি কোনমতেই আমার সমস্ত শক্তি দিয়েও আমি বানরের সাথে যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারিনি। সে অপেক্ষা করে আমাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য... এইভাবে সারা রাত কেটে যায় এবং সূর্যোদয় হয়।’
‘আপনাকে দেখে সামান্য মানুষ মনে হয় না। আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন? আমি জিজ্ঞাসা করি। আমি আবার নিজের পরিচয় দিই এবং তিনি মাথা নত করেন।
‘তিনি আমাকে অভ্যর্থনা করেন তার প্রাসাদে অতিথিরূপে একদিনের জন্য।’ লঙ্কাপতি রাবণ আপনি আপনার সমস্ত শক্তির দ্বারা আজ পরাজিত হয়েছেন। আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি আপনি যদি আমাকে আরোও একবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তাহলে আমি আপনাকে উপদেশ দেবো আমার অতিথি হয়ে একদিন থাকতে। যতই হোক আপনি একজন রাজা। আপনাকে আমার রাজত্বে যথাযথ সম্মান অভ্যর্থনা করা আমার কর্তব্য। আপনি বিশ্রাম নিন, আহার গ্রহণ করুন এবং রাতে শয়ন করুন। আমরা আবার গতকাল দেখা করব।’
‘আমি চেষ্টা করলাম যাতে আরো একবার তার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারি। কিন্তু আমার নিজস্ব মতামত প্রদর্শনের কোন জায়গা ছিল না তাই বাধ্য হয়ে তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম।’
‘আপনি গ্রহণ করলেন আমন্ত্রণ! পুরো ঘটনাটি আমার কাছে বিস্ময়। কীভাবে সম্ভব দশানন এর পরাস্ত হওয়া বানরের কাছে এবং আপনি আপনার শত্রুর আমন্ত্রণ কেন গ্রহণ করলেন ‘দশানন মন্দোদরীর দিকে তাকায় এবং বলে’ আমি অবাক হই চেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে কেউ তার শত্রুকে আমন্ত্রণ করতে পারে তার কক্ষে। সে মহৎ, সাহসী এবং অতিথি পরায়ণ। যখন যুদ্ধে আমি পরাস্ত হই তখন সে কিন্তু আমাকে অতিথি হিসেবে বরণ করে এবং রাজারূপে সম্মান প্রদর্শন করে।’
মন্দোদরী কোনভাবেই নিজেকে বোঝাতে পারে না। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতাবান পুরুষ দশানন। তার জীবনযাত্রায় উশৃঙ্খলতা থাকলেও মন্দোদরী অন্ধের মত ভালবাসে তাকে। নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করেছে দশাননের কাছে। বহু নারীসঙ্গ থাকা সত্বেও নিজেকে একমাত্র রানি ভাবে লঙ্কার। ধন্যমালিনীকে প্রথমে মন্দোদরীকে মানতে পারিনি কিন্তু ধন্যমালিনীর স্বভাব, মন্দোদরীর প্রতি আনুগত্য ভালোবাসায় পরিনত হয়।
‘কিন্তু প্রভু আপনি বর প্রদত্ত সন্তান। প্রজাপতি ব্রহ্মার দ্বারা আপনি বর পেয়েছেন তারপরও আপনি কিভাবে পরাস্ত হন?’
দশানন বেশ বুঝতে পারেন মন্দোদরী চিন্তান্বিত সমগ্র বিষয়টি নিয়ে। তার স্বামীকে সে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শক্তিবান পুরুষ হিসেবে মনে করে। তাঁর পরাজয় যেন মন্দোদরীর পরাজয়।
‘আমিও তাই চিন্তা করছি কাল সারারাত ধরে। তারপর উপলব্ধি করার চেষ্টা করি ব্রহ্মার বর নিয়ে। আমি দেবতা ব্রহ্মার কাছে অপরাজিত থাকার বর চাইনি। আমি কখনোই জানতাম না বানর এত শক্তিশালী হতে পারে। আমি আমার বর প্রার্থনা করার সময় তাই বানরদের নাম গ্রহণ করিনি। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি কখনো একজন বানর আমার প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে। এটা আমার অহংকার বলতে পারো কিংবা অবহেলা।’ হতাশ হয়ে পড়ে দশানন কিছুটা।
‘তারপর দিন কী হল প্রভু?’ মন্দোদরী উদ্বিগ্ন গলায় প্রশ্ন করে।
‘পরবর্তী দিন আমরা আবার শুরু করলাম এবং যুদ্ধ সূর্যাস্ত পর্যন্ত চললো। আমি আবার পরাজিত হলাম। পরিশেষে বশ্যতা স্বীকার করি এবং বালির কাছে সমর্পণ করি। যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করি এবং নমস্কার করি তার কাছে। ইহা আমার কাছে অবিশ্বাস্য। পরিশেষে এটা এটা মুখ্য যে দশাননকে পরাজিত করার লোক উপস্থিত যুদ্ধক্ষেত্রে!’
এই পরাজয় প্রথম ব্যথিত করে মন্দোদরীকে। এই প্রথম পরাজয় বুঝতে শুরু করেন দশানন। তিনি খুব উদাস হয়ে পড়েন তার বর নিয়ে। তার বর অসমাপ্ত হয়ে পড়ে এবং এতদিনের তপস্যা বিফলে যায়। কিন্তু পরে মন্দোদরী অনুভব করে এই পরাজয় তাঁকে অনেক বুদ্ধিমান করে তুলেছে আগের থেকে।
বালি আমার কাছে বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। আমি গ্রহণ করি। না হলে পরাস্ত করত আমায়।
সে খুবই দুষ্প্রাপ্য রকমের সাহসী এবং উদার ছিল সেই যুদ্ধক্ষণে। আমাদের কেবল সন্ধি হয়নি তখন। ভবিষ্যতে আমাকে তার সাথে সন্ধি করতে হবে। আমি কোনদিন যুদ্ধে তার সাথে জয়ী হতে পারব না কিন্তু বন্ধুত্বের মাধ্যমে আমি জয়ী হব।’
‘প্রভু এই যুদ্ধ আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছে। আপনার মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে যা খুবই ভালো। আমি আপনার চরিত্রের এই দিকগুলি কোন দিনই দেখতে পেতাম না।’
মন্দোদরীর চোখে ভালোবাসার ছোঁয়া আবার দেখা যায়। প্রথম যেদিন দশাননকে দেখে সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়ে যায় তার। ভালোবাসা, প্রেম যেন উন্মুক্ত পথে ছুটে বেড়ায়।
‘আমি জানি না ভালো কি মন্দ!কিন্তু আমি গর্বিত যে আমি একজন প্রকৃত শক্তিশালী মানুষের কাছে পরাজিত হয়েছি। আমি মুগ্ধ তার গুণের দ্বারা। আমার মধ্যে যে অহংকার এতদিন ছিল যে আমি অপরাজেয় তা ভেঙে চুরমার গেছে এবং আমি নিজেকে পরিবর্তন করার সাহস অর্জন করেছি।’
শীঘ্রই দশানন গবেষণায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একদিন শ্রদ্রুলা গুপ্তচর একটি সংবাদ দেয় দরবারে। দশানন তার সাম্রাজ্যকে বৈদেশিক শত্রুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করে রেখেছিলেন আগেই। তারা খবর জানায় যে মীনাক্ষী লুকিয়ে বিবাহ করেছেন বিদ্যুতজীব দানবপুত্র কালকেয় অধিপতিকে। কালকেয় লঙ্কার শত্রু বহুবছর ধরেই এবং দশানন অগ্নিশর্মা ভগিনীর উপর। ভগিনী কী ভাবে লঙ্কার শত্রুকে বিবাহ করতে পারে। দশানন তার সৈন্যদের আদেশ দেন মীনাক্ষী এবং বিদ্যুতজীব যেন দর্শনের কক্ষে উপস্থিত হয়। দশানন রাজপ্রাসাদে সকল নারীকে দোষারোপ করেন তারা কেন বিষয়টি আগে জানাননি তাঁকে।
‘মাতা কৈকেসী আপনি বলতে পারেন পারেন মীনাক্ষী কিভাবে সাক্ষাৎ পেল দানব পুত্রের সাথে? আপনার কাছে এই গুপ্ত বিবাহ নিয়ে কী কোনো তথ্যই ছিল না এবং মন্দোদরী তুমি লঙ্কার রানি হয়েও কেন আর নজর দাওনি চারপাশের পরিস্থিতিতে। তোমার চারপাশে যারা থাকেন তাদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানা তোমার কর্তব্য এবং বৌদি সরমা ও বজ্রজলা আপনারা আপনাদের দায়িত্ব পালন করেননি সঠিক মত। যখন মন্দোদরী ব্যস্ত ছিলেন তখন কেন আপনারা দায়িত্ব নেননি?’ চিৎকার করেন প্রত্যেকের উপর কিন্তু কেউই তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না।
প্রভু আমাদের উচিত মীনাক্ষীর কথা পুরো শোনা। মন্দোদরী মৃদুস্বরে দশাননকে বোঝানোর চেষ্টা করে।
‘মীনাক্ষীর কথা শুনতে হবে? সে এখন তরুণী এবং অবিবাহিতাও। সে প্রমাণ করেছে যে সে একটি মূর্খ।’ দশানন ভীষণ রেগে যান।
‘আমি কোনভাবেই এই বিবাহ মানি না। তাতে যা হয় হোক।’
এমন বলবেন না প্রভু। শান্ত হন। মীনাক্ষী আপনাকে খুবই ভালবাসে এবং সে যদি বিবাহ করে আমাদের কি বা করার থাকতে পারে! আমাদের এই বিবাহকে মেনে নেওয়া উচিত কারণ মীনাক্ষী তাকে ভালবেসে বিবাহ করেছে।’
‘আমি মানি না এই বিবাহ।’
‘প্রভু আপনি এইভাবে ভাববেন না। আমি অনুরোধ করব পুরো ঘটনা ভুলে যাবার জন্য। আপনি যদি তার সিদ্ধান্তকে মেনে না নেন সে ভয়ে কোনভাবেই আপনার কাছে আসতে পারবে না।’
‘আমার পক্ষে সব কিছু বলা সম্ভব নয়।’ দশানন রাগ মিশ্রিত কন্ঠে জানায় মন্দোদরীকে।
মাতা কৈকেসী এবং মন্দোদরী চেষ্টা করেন দশাননকে শান্ত করতে। অবশেষে রাজি হন দশানন এবং তাদের বিবাহকে মেনে নেন। তিনি খুবই ভালোবাসেন ভগিনীকে। দশাননের মনে মীনাক্ষী স্বামীর উপর রাগ প্রশমিত হয় না। দশানন বিদ্যুতজীবকে ক্ষমা করতে পারে না কারণ তারা লুকিয়ে বিবাহ করেছেন।
পরবর্তীতে মীনাক্ষী ও বিদ্যুতজীব উপস্থিত হয় দশাননের প্রাসাদে, মীনাক্ষী তার ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চায়।
ভারত দশানন ক্ষমা করুন যদিও আমি আপনাকে আঘাত করেছি কিন্তু আমি কোন ভুল করিনি...
তুমি কোন ভুল করনি কিন্তু যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছে সেটি ভুল। দশাননের গলা কেঁপে ওঠে।
মন্দোদরী এতক্ষণ পর্যন্ত চুপ ছিল তার স্বামীর বাদানুবাদে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেন কালকেয়, যদি আপনার সাহস থাকত আমার ভগিনীকে বিবাহ করার জন্য তবে আপনি সরাসরি আমার সাথে কথা বলতেন এবং আমাকে বলতেন মীনাক্ষীর হাত আপনার হাতে দেওয়ার জন্য। আমি তখন আপনার সাহসিকতার প্রশংসা করতাম। আমি আমার ভগিনীকে আপনার হাতে দিয়ে দিতাম। যদিও আমাদের পরিবারের মধ্যে শক্রতা থেকেই যাবে তথাপি আমি আপনাকে আমাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে মেনে নিতাম কারণ আমি আমার ভগিনীকে খুবই ভালোবাসি অন্য সকলের থেকে। কিন্তু আমি কখনোই ভুলবো না যে আপনার মন ভালো নয়। আপনি আমার ভগিনীর মস্তিষ্ক প্রভাবিত করে আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওকে নিয়ে গেছেন। লঙ্কাতে আপনাকে সবাই দুষ্টুবুদ্ধি বলে ডাকেন।
মন্দোদরী খুব বিস্মিত হয় তার স্বামীর ওপর। বিদ্যুতজীবকে এই নামে অভিহিত করার জন্য মন্দোদরী কিছু বলতে পারেনা তার স্বামীকে।
দশানন সমুদ্রযাত্রা করেন তাঁর রাজত্বের আশেপাশে দ্বীপগুলি অবস্থা দেখার জন্য। দশাননের ভগিনীর বিবাহ নিয়ে যে সমস্যা উদ্ভূত হয়েছিল তার থেকে বেরোনোর জন্য তিনি বেরিয়ে পড়েন। আগে কখনোই দশানন এক মাসের বেশি সমুদ্রযাত্রা যেতেন না। কিন্তু এবার খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন দশাননের প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে। একসময় সে খুব তৎপর হয়ে ওঠে।
দশানন যখন সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়েছিলেন তখন খুব শান্ত এবং এলোমেলো ছিলেন। এক রাতে মন্দোদরীর ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ করে খুব চিন্তা করতে থাকেন দশাননের জন্য। তার চিন্তার মধ্যে কোন দুঃস্বপ্ন ছিল না তবুও রাতে মন্দোদরী ঘুমোতে পারে না। ক্লান্তি তাকে ঘিরে ধরে। পরেরদিন মন্দোদরীর মধ্যে অস্বস্তি বাড়তে থাকে এবং সে নিশ্চিত হয় যে নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। তখন নানাশ্রীর সাথে দেখা করেন এবং নিজের চিন্তার কথা জানান।
নানাশ্রী বহুদিন হয়ে গেল কোন সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না লঙ্কেশ্বরের তিনি এখন কোথায় আছেন বা তার শরীরের বৃত্তান্ত কীরকম?
আমি বুঝতে পেরেছি আপনার ভাবনার কথা মন্দোদরী। কিন্তু দশানন ভালই আছেন তিনি ভারতবর্ষের পূর্বদিক ভ্রমণ করছেন এবং সাক্ষাৎ করেছেন আমাদের মিত্রের সাথে। তিনি অবশ্যই দেখা করেছেন মামা মরিচন এবং ভাইদের সাথে। সবকিছু ঠিকঠাক আছে। নানাশ্রী আশ্বস্ত করেন মন্দোদরীকে।
তবুও আমি রক্ষী পাঠাতে চাই রাবণের কাছে। তার জন্য ইন্দ্র এবং তার সমকক্ষ কিছু শত্রু ক্ষতির কারণ হতে পারে। তিনি কোন সমস্যার মধ্যে না থাকলেও আমি চাই যেহেতু আপনি এতবার বলছেন আমি একটি সৈন্য দল পাঠাতে এবং কিছু গুপ্তচর সুরক্ষার জন্য।
নানাশ্রী কিছু সেনা পাঠান সমুদ্রের মাধ্যমে এবং একটি বার্তা পাঠান পাঠান সমুদ্রের মাধ্যমে দশাননের কাছে। মন্দোদরী দিনদিন অধৈর্য হয়ে পড়ে। সে দেখতে পায় তার কক্ষের বাইরে এক সুন্দরী দাঁড়িয়ে আছে। গাছের ছাল এবং তার চুল দেখতে যোগিনীর মত। সেই রমণী মন্দোদরী দিকে তাকিয়ে আছে কোন কথা বলা যায় কিনা। মন্দোদরী ভাবে তার ভাগ্য আবার শায়িত হয়েছে এ ঘটনার জন্য। কিছুদিন পর মন্দোদরী চোখ সম্পূর্ণরূপে অন্ধকার হয়ে যায়। শুদ্রুলা, মুখ্য গুপ্তচর এবং অন্য রক্ষীরা খবর দেয়। কিছুদিন পর নানাশ্রী আমন্ত্রণ জানায় মন্দোদরীকে একটি সুরক্ষাযুক্ত জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলোচনা করবেন বলে। নানাশ্রীর অনুসঙ্গ ছিল কিছু রক্ষী। রানি মন্দোদরী আপনাকে ধন্যবাদ এত অল্প সময়ের বার্তায় আপনি এখানে আসতে পেরেছেন বলে সবকিছু ঠিক আছে নানাশ্রী? লঙ্কেশ কিছু বার্তা পাঠিয়েছেন তার সেনার মাধ্যমে?
লঙ্কেশ কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে আসবেন তাৎক্ষণিকভাবে সেনাগণ কিছু সংবাদ এনেছেন আমাদের জন্য।
কী বার্তা? আপনি কী সাক্ষাৎ করেছেন দশাননের সাথে? মন্দোদরী শুদ্রুলাকে প্রশ্ন করেন।
আমি দেখা করেছি, তিনি বলেছেন কিছুদিন পর ফিরে আসবেন কিন্তু তিনি কোন বার্তাই পাঠাননি। তাহলে আপনি কী সংবাদ দেবেন আমায়? কোথায় পেলেন তাকে? তিনি সুস্থ আছেন তো? মন্দোদরীর দুচোখ জলে ভরে ওঠে।
তিনি সুস্থ আছেন। তিনি কিছু দুর্ভাগ্যের সঙ্গী হয়েছেন। যখন তিনি ভারতবর্ষের পূর্ব দিকে যাচ্ছিলেন তার কাকার সাথে সাক্ষাতের পর তার বিমান নামে পুষ্ককরা বোনের জলের খোঁজে। সেখানে তার সাথে সাক্ষাৎ হয় বেদাবতীর সাথে। বেদাবতী হলেন ব্রহ্মঋষি কুশধ্বজার কন্যা। বেদাবতী গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। ইহা বিশ্বাস করা হয় যে বেদাবতী নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে কারণ রাবণ। শুদ্রুলা বলেন।
মন্দোদরী নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে সে যা শুনছে।
আপনি কি বলতে চান? এই মৃত্যুর কারণ রাবণ? নানাশ্রী উচ্চকণ্ঠে প্রশ্ন করেন।
কিছু মানুষ ওই অঞ্চলে যারা প্রতিদিন নারীর সামনে আসত না তারা চিৎকার শুনতে পায় এবং দেখে আগুন লেগেছে কাঠে। তারা পালিয়ে আসে এবং দেখে একটি নারীকে আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে চোখ বন্ধ করে। তারা দেখে লঙ্কেশ্বরকে বিমানে ফিরে যেতে। আগুন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে গাছের আশেপাশে তাড়াতাড়ি। বিমানটির নাম পুষ্পক।
তিনি কী মারা গেছেন? নানাশ্রী প্রশ্ন করেন। হ্যাঁ ওখানকার মানুষরা আগুন থেকে বাঁচাতে পারেননি। তার সমস্ত শরীর পুড়ে যায় ভয়ঙ্করভাবে।
কিন্তু লঙ্কেশ্বর কেন দায়ী এই মৃত্যুর জন্য? মন্দোদরী কেঁদে ওঠে।
মন শান্ত করুন রানি। দশানন ফিরে আসবেন শীঘ্রই।
নানাশ্রী স্বান্তনা দেওয়া চেষ্টা করেন মন্দোদরীকে।
আমি কীভাবে শান্ত হব আমার স্বামী এক নারীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কি এমন কারণ থাকতে পারে যার জন্য তিনি আগুনে পুড়তে বাধ্য হন? দশাননের কী প্রভাব ছিল এই মৃত্যুতে!
আপনার সাথে লঙ্কশের কখন দেখা হয়? তিনি কী আপনাকে বলেছেন ঠিক কী ঘটেছিল? নানাশ্রী প্রশ্ন করেন।
তিনি কিছুই বলেননি ঠিক কী ঘটেছিল যখন তার সাথে বেদাবতী সাক্ষাৎ হয়। দশানন সেখানে অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে ছিলেন। বেদাবতীর মৃত্যুর পর দশানন সেখান থেকে চলে আসেন। গুপ্তচর উত্তর দেয়।
দশাননের ফেরা পর্যন্ত উৎকণ্ঠা ও চিন্তা করা ছাড়া কিছুই করার নেই মন্দোদরীর অপেক্ষা করতে থাকে এবং দশাননের নিরাপদে ফেরার প্রতীক্ষায় থাকে। তিনি এক মাসের অধিক লঙ্কায় ফেরেননি। মন্দোদরীর মনে প্রশ্ন এসে ভিড় করে। তার হৃদয় ঘৃণা, ক্রোধে ভরে যায়। মন্দোদরী চেষ্টা করে পুরো ঘটনাটা লুকিয়ে রাখতে সকলের থেকে।
দশানন বেশ কয়েক মাস পরে ফিরে আসেন মন্দোদরীর দাসী জানায় সেই সংবাদ। প্রথমে মাতা কৈকেসী এবং নানাশ্রীর সাথে দেখা করেন তিনি। তারপর বিলম্ব করে দেখা করেন মন্দোদরীর সাথে।
মন্দোদরী তার কক্ষে সুগন্ধি জাফরান রেখে দেয়। যখন ঘরে প্রবেশ করেন দশানন মৃদু গন্ধ পাওয়া যায়।
আপনি কেমন আছেন প্রভু এবং কী এমন ঘটনা ঘটল যার জন্য আপনি আমার থেকে এত দূরে থাকলেন। আপনার অনুপস্থিতি অনেক গুলো প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায় সাধারণ মানুষ ও আপনার পরিবারের মধ্যে। মন্দোদরী প্রশ্ন করে এবং তার চোখের জলে ভরে যায়।
মন্দোদরী আমি এমন কোনো কাজ করিনি যাতে আমায় এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে আমি তোমাদের থেকে এত দূরে ছিলাম এটাই বড় আক্ষেপ।
মন্দোদরী বিদ্যুৎবেগে তাকিয়ে থাকে দশাননের দিকে। লঙ্কেশের পক্ষে এত সাহস থাকা কি করে সম্ভব? তিনি কী ভাবে পাপের মূল্য ঘোচাবেন? দশানন তার জীবনকে আরও দুঃসহ করে তুলেছে।
দয়া করে এভাবে বলবে না। আমি দীর্ঘদিন ধরে একটি যন্ত্রণার মধ্যে কাটাচ্ছি এবং শেষে আমি তোমার চোখে ঘৃণা দেখতে পাচ্ছি আমার জন্য। আমি তোমার মুখোমুখি হব না শীঘ্র। দয়া করে ভুলে যাও আমায়।
আমি কিছুদিন ধরে এক দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছি যখন গুপ্তচর আপনার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিরে আসেন। বলুন আমায় কি হয়েছিল? ওই নারীর মৃত্যুতে আপনি কিভাবে অপরাধী হন?
এটা একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। আমি কোনোভাবেই মনে রাখতে চাই না।
কী সেই ঘটনা প্রভু? আপনি মনে রাখতে চাইবেন না বলছেন! আপনি কি ভয় পাচ্ছেন এই সত্য স্বীকার করতে?
আমি মোটেই ভীত নই। খুব শীঘ্রই আমি সব ভুলে যাব যা ঘটেছে তার জন্য। আমি অনুতপ্ত। আমি তার জন্য ব্যতীত।
আপনার অনুশোচনা একজনের জীবনকে ফেরাতে পারে না! আপনাকে বলতে হবে কি ঘটেছে প্রভু আমি সাহায্য করব আপনাকে সর্বতোভাবে।
আমার বিমান অবতীর্ণ হয় এক গভীর বনের মধ্যে। জলের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলাম। শুনলাম এক সুন্দর আওয়াজ ভেসে আসছে দূর থেকে। তারপর শুনি মন্ত্র উচ্চারণ। আমি সে দিকে হেঁটে গেলাম দেখলাম এক সুন্দর তনয়া ধ্যানে মগ্ন হয়ে আছেন। তার পোশাক দেখে মনে হলো তিনি সন্ন্যাসিনী। আমি এর আগে এমন সৌন্দর্য কোন নারীকে দেখিনি। তার চোখ ধ্যানে মগ্ন। আমি আমার চোখকে কোনো মতেই আটকাতে পারলাম না তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করার জন্য। আমি তার সুন্দর ত্বকে অভিভূত হলাম। ওই নারীর সুন্দর ঠোঁট এবং অপূর্ব শরীর যে কোন মানুষকে তার হাঁটুর সামনে উপস্থিত করতে পারেন। পরনে কালো বস্ত্র। আমি যে মুহূর্তে রওনা হলাম তখন পদস্খলনের দ্বারা কমন্ডলুর জল পড়ে যায়। দুর্ভাগ্যবশত সেই জল তার চোখে লাগে। কিছু সময়ের জন্য চোখ খোলে সেই নারী ...
আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন আপনি জানেন? আপনি আমার তপস্যা ভঙ্গ করেছেন। কে আপনি?
আমি লঙ্কেশ, লঙ্কাঅধিপতি। নদীতে যাচ্ছিলাম তখন আপনার মন্ত্র উচ্চারণের শব্দ শুনি। আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই আপনি এত সুন্দর হওয়ার সত্ত্বেও এই রকম বস্ত্র কেন পরে থাকেন? এখন সূর্যাস্তের সময়। আপনি এই ঘন জঙ্গলে একাকী কী করবেন? আমি বেদাবতী ব্রহ্মঋষি কুশধ্বজ কন্যা। আমার পিতা চান ভগবান বিষ্ণুকে স্বামীরূপে গ্রহণ করতে; তাই আমি তপস্যা করছি জয়ের জন্য।
আপনি তপস্যা করার জন্য উপযুক্ত নন। এই গভীর বনে সৌন্দর্য আপনার জন্য সর্বনাশ ডেকে আনছে। বনে অনেক হিংস্র জন্তু জানোয়ার বাস করে। তারা ঘন অন্ধকারে আপনাকে আঘাত করতে পারে। আপনি আপনার আশ্রয় চলে যান অথবা আমার বিমানে আপনি যেতে পারেন এবং আমি আপনাকে ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে পারি।
আমাকে নিয়ে ভাবার কোন কারণ নেই। আমি এই বনে জন্মগ্রহণ করেছি। আপনি এখন এখান থেকে চলে যান।
বেদাবতী আপনার সাথে আমার দেখা হওয়ার পিছনে নিশ্চয়ই একটি কারণ আছে। আপনি শুধু শুধু আপনার সময় নষ্ট করছেন বিষ্ণুকে পাওয়ার জন্য। যদি তাঁর আপনার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকতো তাহলে আপনার কাছে ধরা দিতেন।
আমি তার সামনে যাই এবং তিনি উঠে পড়েন তপস্যা থেকে।
যথেষ্ট হয়েছে দশানন। আপনি আমার সামনে আসবেন না। আমার পক্ষে বিষ্ণু ছাড়া অন্য কাউকে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। আপনি আপনার অধিকারের সীমা অতিক্রম করছেন। আমার অনুরোধ আপনার কাছে এই স্থান ত্যাগ করার।
কেন আপনি আমার সাথে আসতে ইচ্ছুক নন? আমি মুগ্ধ আপনার সৌন্দর্য দ্বারা। আমি একজন শক্তিশালী সম্রাট এবং আমার রাজ্য ক্ষমতা সম্পন্ন। আপনি আমার সাথে আসুন আমার রানি হয়ে।
আপনার কোন সম্মান আছে? আমার কোন আগ্রহ নেই আপনার ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির উপর। আমার জীবন সম্পূর্ণ উৎসর্গকৃত এবং আমি তাকে স্বামী রূপে গ্রহণ করেছি। আমি শুধুমাত্র হরির। এখন দয়া করে আপনি স্থান প্রস্থান করুন না হলে আমি অভিশাপ দেবো আপনাকে। চিৎকার করে ওঠে বেদাবতী।
আপনি আমার কথা শুনছেন না বেদবতী। যদি বিষ্ণু আপনাকে তার জীবনে চাইতেন তাহলে আপনাকে এভাবে গভীর বনের রাখতেন। না হতেই পারে এটা তার আপনাকে অপছন্দ করার লক্ষণ। আমি তার হাত আমার হাতে নিই।
আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করবেন না রাবণ! অথবা আমি আপনার মৃত্যুর কারণ হব। বেদাবতী বলেন।
আমি প্রত্যাখ্যান কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনা।
কোন মহিলা প্রত্যাখ্যাত হয় না লঙ্কাপতি রাবণ?
সেই নারী যথেষ্ট একগুঁয়ে এবং আমি চাইলাম তাকে উচিত শিক্ষা দিতে। আমি তার কেশ ধরলাম এবং নিজের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করি। তিনি একটি ধারালো অস্ত্র রেখেছিলেন নিজের বক্ষে লুকিয়ে এবং যখন আমি তাকে ধরি কেটে যায় আমার হাত।
আপনি আমার তপস্যা ভঙ্গ করেছেন। আপনি আমার সতীত্বকে স্পর্শ করেছেন। চিৎকার করে ওঠেন এবং আমি বুঝতেই পারছিলাম না তিনি কেন এমন করছেন আমি তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে চেয়েছি।
আপনার এত হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করি।
আর একটা শব্দ আপনি বলবেন না। আপনি ভাবেন কোন মহিলার শক্তি নেই আপনাকে প্রত্যাখ্যান করার? আপনার স্পর্শের দ্বারা আমার শরীর কলুষিত হয়েছে এবং আমি এখনই মাটিতে একে জ্বালিয়ে দেব।
কিন্তু মনে রাখবেন আমি আবার নতুন জীবন ফিরে পাবো। একজন মহিলাই আপনার মৃত্যুর কারণ হবে এবং সে আমিই হব। আমি আবার জন্মগ্রহণ করব আপনার মৃত্যুর জন্য।
ঘোষণা মাত্রই তিনি নিজের গায়ে আগুন জ্বেলে দেন আমি চেষ্টা করেছি তাকে আটকাবার কিন্তু আগুনের শিখায় পারিনি। আমি আমার চোখের সামনে তাকে পুড়ে যেতে দেখেছি কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না।
‘আপনি কী করছেন লঙ্কেশ্বর? এটা অপরাধ। তিনি হলেন সন্ন্যাসিনী। আপনার তাকে বিরক্ত করা কিংবা অসুবিধা ফেলা উচিত হয়নি।’
‘আমি চেষ্টা করেছি তাকে আটকাবার।’
‘এবং সচেষ্ট হননি।’
‘বিশ্বাস করো মন্দোদরী এই প্রথমবার আমি কৌতুহলী ছিলাম কে এই নারী এবং একাকী এই বনে কি করছেন! কিন্তু যখন তিনি প্রত্যাখ্যান করেন আমি আরো ক্রুদ্ধ হয়ে যাই এবং কেনই বা তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করলেন। তার মৃত্যুর জন্য আমি কোনভাবেই দায়ী নই। বিষ্ণু কোনদিনই তাকে নিজের জীবনে গ্রহণ করবেন না ...’
‘আপনি নিজেকে কিভাবে আত্মরক্ষা করবেন লঙ্কেশ্বর? তিনি একজন তপস্বিনী। আপনার কোনভাবেই তার তপস্যাকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা উচিত হয়নি। আপনার সেই স্থানে থাকা মোটেই সংযত হয়নি।’
তার মৃত্যুর পর আমি সমস্ত ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন করেছি। আমি শোকস্তব্ধ। আমি যা কাজ করি তা নিজের কাছে অর্থাৎ আত্মসমর্পণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি সব সময় দেখেছি আমার প্রতি তার ক্রুদ্ধ আচরণ। এখন বুঝেছি আমি তার জন্য ব্যথিত। তিনি নিজেই নিজের পথ দেখেছেন। আমি শুধু মাধ্যম ছিলাম কিন্তু কারণ নই। দশানন এ কথা বলে চলে যান।
মন্দোদরী তার স্বামীর এইরূপে ব্যথিত হয়। রাবণের চরিত্র পরিবর্তন করতে চাইলেও মন্দোদরী পরাজিত হয়। বেদাবতীর মৃত্যু মন্দোদরীর আত্মসম্মানকে আঘাত করে। একজন নারী সম্মান রক্ষা করার দায়িত্ব শুধুমাত্র তার নয়, পুরুষেরও। পুরুষরা চিরকালীন নারীদের অচ্ছুত করে রেখেছে। একজন নারী পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে তা তারা ভাবতেই পারেনা। নিজের সম্মান রক্ষা করার জন্য বেদাবতীকে আত্মহত্যা করতে হয় যা দশাননের পৌরুষত্বে আঘাত করে। একজন নারী তার মৃত্যু সংবরণ করবে এটা ভাবনার অতীত। তাই যখন দশানন দেখেন একাকী বনে নারী তপস্যা করছেন নিজের কামবাসনাকে আয়ত্ত করতে পারেন না।
নিজেকে অসহায় লাগে মন্দোদরীর। এত বড় ঘটনা দশাননের জীবনে ঘটে যাবার পরও তার মধ্যে কোনরকম প্রভাব পরে না। মন্দোদরী যখন দশাননের খবর পাচ্ছিল না মাসের-পর-মাস তখনই বুঝেছিল যে নিশ্চয়ই তিনি কোন নারীসঙ্গ পেয়েছেন। দুই পত্নীর পর তৃতীয় পত্নীর অভ্য্যর্থনা তাকে কম সময়ের মধ্যে করতে হবে এটা মনে মনে ভেবেই নিয়েছিলেন। দশানন যখন মন্দোদরীকে ছেড়ে থাকেন তখনই তার জীবনে এই ঘটনাগুলি আগমন হয়।
নানাশ্রী বারংবার দশাননকে সঠিক পথে চালনা করতে চাইলেও পর্যদস্ত হয়। দশানন অন্য রানি কিংবা রক্ষিতার মধ্যে মন্দোদরীকে সর্বাধিক ভালবাসে তার মন্দোদরীই জানে। কিন্তু মন্দোদরী চায় তাকেই একমাত্র প্রথম পত্নী, প্রেমিকা, বন্ধুত্ব, সম্মান দিক। দশানন কোনভাবেই তার প্রথম পত্নীর মনের খোঁজ রাখেনা। বহু চেষ্টা করেও মন্দোদরী নিজের আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে পারেনা দশাননকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন