সূচনা

পারমিতা চক্রবর্তী

হিন্দুধর্মের প্রধান দেবতা শিব। তাঁকে সন্তুষ্ট করতে দেবতা, নর্তকী, দেবী সদা তৎপর থাকতেন। এমনকি মর্ত্যলোকে নরনারী সকলেই তাঁর পুজো করে থাকেন, তাকে তুষ্ট রাখার চেষ্টা করেন। মধুরা তেমনই এক অপ্সরা, যিনি ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন এবং তাকে স্বামী রূপে পেতে চেয়েছিলেন। মধুরা নিজেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ভগবান শিবকে সমস্ত রকমের অলংকার, ঐশ্বর্য দিয়ে ভরিয়ে রাখবেন। এই ভেবে একদিন সে কৌলাসে পৌঁছায়। তখন পার্বতী উপস্থিত ছিলেন না। শিব তখন ধ্যানে মগ্ন। তাঁর পাশে কারোর উপস্থিতি বোঝার কোন অবকাশ ছিল না। শিবকে দেখে মধুরার সারা শরীর যৌনকামনায় ভরে ওঠে। মধুরার শরীরে স্বর্গীয় সুন্দর গন্ধ ভরে ওঠে প্রাঙ্গণ। শিব যখন ধ্যান ভঙ্গ করে চোখ খোলেন দেখেন এক সুন্দর অপ্সরা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মধুরার শৈল্পিক শরীর এবং যৌন আবেদন দেখে ভালোবেসে ফেলেন শিব। সুন্দরের পূজারী শুধুমাত্র মানুষ নন ভগবানও। সুন্দরের ডাককে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা স্বয়ং ভগবানের নেই। মধুরার রূপে মুগ্ধ হয়ে শিব নিজেকে সমপর্ণ করেন এবং তাকে বর দেবেন বলে মনস্থ করেন। এমন সময় পার্বতী প্রবেশ করেন কৈলাসে এবং লক্ষ্য করেন শিবের গায়ের ভষ্ম লেগে আছে মধুরার স্তনে। পার্বতীর বুঝতে একটুও অসুবিধা হয় না গোটা ঘটনাটা। রাগে, ক্রোধে উন্মাদ হয়ে পার্বতী মধুরাকে অভিশাপ দেয় এবং সাথে সাথে সে ব্যাঙের আকার ধারণ করে। পার্বতীর অভিশাপ হল দীর্ঘ বারো বছর ব্যাঙের আকার ধারণ করে কুয়োর মধ্যে কাটিয়ে দেওয়া। পার্বতী তাঁর স্বামীকে পথভ্রষ্ট করার যন্ত্রণা মেনে নিতে পারেননি। বহু প্রচেষ্টায় শিব তার স্ত্রীর রাগকে প্রশমিত করেন এবং নিজ কর্মের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন। এই যুদ্ধ কিংবা বিরোধ যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। পরকীয়া যেমন মানব জীবনে ছিল তেমন স্বর্গলোকেও। অপ্সরা, নর্তকীদের প্রেমে পড়ত দেবতাগণ। তাদের এই অবৈধ সম্পর্কের জোরে তৈরী হত চাপানউতোর। তেমনই এক নিদর্শন মধুরা। পরিস্থিতিকে আয়ত্তে আনতে শেষে ভগবান শিব এগিয়ে আসেন এবং মধুরাকে বরদান করেন। মধুরা আবার পুনর্জন্ম লাভ করবে একজন সুন্দরী তরুণী হয়ে এবং তার স্বামী হবেন এক সাহসী, শক্তিশালী পুরুষ এবং অন্যতম শিবের ভক্ত।

এই ঘটনা ঘটে যাবার কিছুদিন পর অসুররাজ মায়াসুর এবং তার স্ত্রী হেমা তাদের ঘটে যাওয়া জীবনের প্রায়শ্চিও করতে শিবের উপাসনা করেন নিকটবর্তী অরণ্যে। তাদের দুই পুত্র - মায়াবী ও দুন্দুভী। মায়াসুর ও হেমার জীবনে একটাই অপূর্ণতা ছিল তাদের কোন কন্যা সন্তান ছিল না। একটা কন্যা সন্তান পাওয়ার আশায় তারা শিবের উপাসনা করেন। তাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে এই একটাই অন্তরায়। মায়াসুরের প্রায়শ্চিত্ত যখন পরিপূর্ণ হয় এমনই এক সকালে হেঁটে চলেছে জলের সন্ধানে। মায়াসুর শুনতে পায় এক বাচ্চার কান্নার শব্দ। বাচ্চাটিকে খুঁজতে খুঁজতে মায়াসুর বুঝতে পারেন আওয়াজটি আসছে একটি কুয়োর থেকেই। তখনই তিনি তৎপর হন বাচ্চাটিকে উদ্ধার করার জন্য। কুয়োতে দেখতে পান একটি সুন্দর ফুটফুটে কন্যাকে। হেমা তখন তপস্যারত ছিলেন। মায়াসুরের চিৎকারে ধ্যানভঙ্গ হয়ে হেমা উপস্থিত হয় কুয়োর সামনে। হেমা ও মায়াসুরের যৌথ প্রচেষ্ঠায় বাচ্চাটিকে উদ্ধার করা হয় এবং তারা ভগবান শিবের জয়গান করতে থাকে। অবশেষে তারা এক কন্যা সন্তানকে পায়। এই পালিত কন্যার নাম মন্দোদরী।

সকল অধ্যায়
১.
অহল্যা, দ্রৌপদী, সীতা, তারা, মন্দোদরীপঞ্চসতীর প্রতি নিবেদন
২.
সূচনা
৩.
বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী
৪.
বিবাহ পর্যায়ে মন্দোদরী
৫.
দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ ও মন্দোদরী কথা
৬.
বজ্রজলা ও মন্দোদরী
৭.
অমৃতের সন্ধানে দশানন ও তার প্রতিক্রিয়ায় মন্দোদরী
৮.
দশানন, বালী ও মন্দোদরী
৯.
মহান্ত, মাতা কৈকেসী ও মন্দোদরী
১০.
মন্দোদরী ও ঋষি ঘৃতস্মদা
১১.
আত্মশ্লাঘা ও মন্দোদরী
১২.
জীবন সন্ধিক্ষণে মন্দোদরী
১৩.
মন্দোদরী ও দশানন
১৪.
মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ
১৫.
মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন
১৬.
যোদ্ধা মেঘনাদ
১৭.
মেঘনাদের বিবাহ ও মন্দোদরী
১৮.
দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী
১৯.
সীতা হরণ ও মন্দোদরী
২০.
বানর ও লঙ্কা
২১.
অহিরাবণ
২২.
যুদ্ধে মেঘনাথ ও মন্দোদরী
২৩.
লঙ্কার রানি মন্দোদরী
২৪.
ফিরে দেখা
২৫.
ঋণ স্বীকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%