পারমিতা চক্রবর্তী
মন্দোদরী যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়। নিজের দুই বিশ্বস্ত দাসীদের এবং মাইকে সাথে নিয়ে যাবে ঠিক করে। মন্দোদরী ত্রিজাতাকে বলে লঙ্কা থেকে যেন বিশ্বস্ত খবর বার্তাবাহকের দ্বারা প্রেরণ করা হয়। মন্দোদরী সরমাকে নিযুক্ত করে অন্তঃপুর দেখাশোনার জন্য। মনপ্রাণ দিয়ে মন্দোদরী চায় তার সন্তানটি সুস্থ, স্বাভাবিক হয়। সে নিজেকে নিজে বিশ্বাস করায় তার মধ্যে যে সন্তান পালন হচ্ছে তার মধ্যে কোনরকম অস্বাভাবিকতা নেই। মন্দোদরী ভেবেই নয় সন্তানটি কন্যা হবে।
দশানন একদা প্রকাশ করেছিলেন তিনি একটি কন্যাসন্তান চান। মন্দোদরী মনে মনে দুঃখিত হয় যে এই সংবাদটি তার স্বামীকে জানাতে পারেনি বলে।
শীঘ্রই তারা যাত্রা শুরু করে। তাদের তীর্থযাত্রার সময় দীর্ঘ হওয়ার জন্য তাদের সাথে থাকে প্রচুর সরঞ্জাম, জামাকাপড়। শুধুমাত্র জামা-কাপড় নয় প্রচুর খাবার, তাঁবু তৈরি সরঞ্জাম, সশস্ত্র সেনা, ঘোড়া এবং পালকি যায় তাদের রাস্তা ভ্রমণের সুবিধা হবে বলে। তাদের সাথে যায় ৪টি সামরিক বাহিনী এবং দুইজন বার্তাবাহক চারজন পরিচালিকা এবং দুই বিশ্বস্ত দাসী এবং মাই। মন্দোদরী বড় পাত্রে জলের ব্যবস্থা করে রাখে।
তারা পৌঁছে যায় ভারতবর্ষের দক্ষিণ প্রান্তে তিনদিন পর। সমুদ্র যাত্রায় মন্দোদরীর শরীর আরও অসুস্থ করে তোলে। তারা বিশ্রাম নেয় সমুদ্রের পাশাপাশি অংশে। কিছুদিন পর আবার যাত্রা শুরু করে। প্রথমে উত্তর সীমানায় মায়ারাষ্ট্রে পৌঁছায়। মন্দোদরী দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছিল তার পিতাশ্রী-মাতার সাথে সাক্ষাতের জন্য। সে চায় এই সময়টা কাটাতে এখানে। এখানে থাকলে সে তার মাতৃত্ব নিয়ে অনেক কিছু ভাবতে পারবে। মাতা'র মমতা পাবে মন্দোদরী। মায়ারাষ্ট্রে কোন ভেদাভেদ নেই। এখানে থাকতে চায় মন্দোদরী আপন জনের সান্নিধ্যে।
তাদের বেশিরভাগ সময় কাটে পথে। তারা ভারতবর্ষের মূলমূল মন্দিরগুলো দর্শন করে এবং প্রার্থনা করে মন্দোদরী আগত সন্তানের জন্য। প্রায় একমাস যাত্রাপথের পর পৌঁছায় মায়ারাষ্ট্রে। সেখানে পৌঁছনোর আগেই মন্দোদরী স্নান করে পবিত্র জলে, অঞ্জলি অর্পণ করে, মন্ত্র উচ্চারণের দ্বারা বেদপাঠ করে যাতে তার সন্তানের বেঁচে থাকার শক্তি বৃদ্ধি হয়। মায়ারাষ্ট্রে পৌছানোর পর পিতাশ্রী ও মাতা অভ্যর্থনা করে তাদের রাজকন্যাকে। মন্দোদরী সকলের সাথে দেখা করে মা তাকে নিয়ে চলে যান গোপনকক্ষে কথা বলার জন্য।
‘কেমন আছো পুত্রী? আমরা তোমার স্বাস্থ্যের কথা শুনেছি এবং তাই নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। এখন সব ঠিক আছে তো?’ মাতা প্রশ্ন করেন।
‘হ্যাঁ মাতা। আপনার কিছু জিনিস জানা দরকার আছে। আপনাকে আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করতে হবে কথাগুলো শোনার পর কোন রকম প্রতিক্রিয়া, ধৈর্যচ্যুতি করা চলবে না। পুরো কথা শুনতে হবে শান্তভাবে।’
‘কী হয়েছে পুত্রী?’
মন্দোদরী তার মাতাকে ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃত্ব কথা জানায় এবং তার সিদ্ধান্ত এই সন্তানটির জন্ম লঙ্কা থেকে দূরে হবে সেটিও জানায়। মাতা তার স্বামীর প্রতিক্রিয়া কী হবে এই সিদ্ধান্ত শোনার পর সেই নিয়ে চিন্তায় পড়লেন। মন্দোদরীর বিশ্বাস তার এই সিদ্ধান্ত পিতাশ্রী মেনে নেবে।
‘পুত্রী মন্দোদরী, তুমি কী বুঝতে পারছ তোমার সদ্য আগত সন্তানটিকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছো? বুঝতে পারছো যখন পুরো ঘটনাটা জানবে দশানন তার প্রতিক্রিয়া কী হবে! তুমি তোমার মাতৃত্বের পুরো ঘটনাটা লুকিয়ে গেছে তার কাছে।’
‘আমি বুঝতে পারছি মাতা। একটি বড় ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে কিন্তু কেন আমি এই ঝুঁকি নিয়েছি তাও বলেছি আপনাকে মাতা। আমি কোনমতেই এই ভ্রুণটিকে হত্যা করতে ইচ্ছুক নই। আমি এখানে থাকতে চাই। আমি আমার নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারি। যদিও আমি এই বার্তা পাঠাই পিতাশ্রীকে এটা জিজ্ঞাসা করার জন্য তাহলে তিনি আমার লঙ্কা যাত্রা বন্ধ করে দেবেন। সুতরাং আমি এখানেই থাকবো আপনার কাছে।’
‘তোমার কী মনে হয় তোমার পিতা এটি মেনে নেবেন। এত বড় ঘটনা তুমি দশাননের থেকে লুকিয়ে রেখেছ! আমার মনে হয় ক্ষুব্ধ হবেন শুধু তোমার উপর নয় আমাদের উপর। যখন জানবেন এই ঘটনাটা দশাননের থেকে লুকানো হয়েছে। এই ঘটনা আমাদের উপর, মায়ারাষ্ট্রের উপর কী প্রভাব পাড়বে জানো? এখনো সময় আছে আমার মনে হয় তুমি এখনই জানাও দশাননের কাছে। এই সংবাদ লোকানোর কোন অর্থই নেই। তাকে দশাননের কাছে অবশ্যই এই বার্তা পাঠাতেই হবে।’ মাতা একথা বলে কক্ষ ত্যাগ করে যাতে আর কোনরকম কথোপকথন না হয়।
‘মাতা আপনি আমায় সাহায্য করতে চান না? আমি এখানে এসেছি একটা বিশ্বাস নিয়ে আমার পিতাশ্রী, মাতা আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাবে।’ মন্দোদরী অনুরোধ করে বিনয়ের সাথে যাতে সদুত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু মাতা খুব স্পষ্ট এবং স্থির থাকে।
‘তুমি তো এখন লঙ্কার রানি। তোমার স্বামীর প্রতি তোমার দায়িত্ব কর্তব্য আছে। তোমার পরিবার এবং প্রজার প্রতি ও তোমার পিতাশ্রী-মাতা হয়ে আমরা চাইব তুমি তোমার সকল রকমের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারো। আমরা তোমাকে সেই শিক্ষা দিয়েছি। তুমি আমাকে দেখেছ রানি হয়ে আমার দায়িত্ব পালন করতে। তুমি যে কথা বলছো তা আমাদের নীতি-আদর্শের বিপরীতে তার থেকেও বড় কথা এই ঘটনাটা আমাদের রাজত্বের পক্ষে ভয়ঙ্কর।’
‘দয়া করে বলুন আমাকে পিতাশ্রী... শুনে চুপ করে থাকবেন না।’
‘তোমার কথা নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়েছেন। পুত্রী তুমি বলো আমায় আমাদের দুজনের দায়িত্ব কী আলাদা। তিনি হয় তোমাকে লঙ্কায় ফেরত পাঠাবেন না হলে বার্তা পাঠাবেন দশাননের কাছে।’ এই সংবাদ লোকানোর কোন অর্থ নেই। তাকে দশাননের কাছে অবশ্যই বার্তা পাঠাতে হবে।
মন্দোদরী খুব অসহায় বোধ করে। তার সন্তানকে পৃথিবীতে আনার একটি সুস্থ, নিরাপদ উপায় ভেঙে যায়। অসহায়ের মত কাঁদতে থাকে মন্দোদরী। মাতা তাকে আশ্বস্ত করেন।
‘পুত্রী, আমি দুঃখিত তোমাকে সাহায্য করতে পারছিনা বলে। মায়ারাষ্ট্র হল একটি ছোট রাষ্ট্র। প্রত্যেকেই জানে দশানন এবং তার রাষ্ট্র কতটা শক্তিশালী যদি তিনি সবকিছু জেনে এখানে আসেন তবে সব ধ্বংস করে দেবেন। তিনি তোমার পিতাশ্রীকে মেরে ফেলবেন।’
‘না মাতা আমি কারো ধ্বংসের কারণ হতে চাই না। আপনি বলুন আমার এখন কী করা উচিত, আমার পক্ষে এই গর্ভবতী অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভবপর নয়। আমি পিতাশ্রীকে বলতে পারছি না এবং এখানে থাকতে পারবো না। আমার হাতে অন্য পথ নেই।’
‘তুমি তোমার পিতৃগৃহে এসেছ ভালো করে আহার গ্রহণ করো, বিশ্রাম নাও। আমার মনে হয় তোমার পিতা কিংবা অন্য কাউকে এই ব্যাপারে কিছু জানার দরকার নেই। যদি তুমি মনে করো এই সন্তানকে পৃথিবীতে আনবেই তবে আমি তোমাকে পথ দেখাবো।’
‘বলুন মাতা কী করতে হবে?’
‘এখন কিছু নয়, আগে আমাকে পুরো বিষয়টি চিন্তা করতে দাও। তুমি দুটি চাঁদ না দেখা পর্যন্ত এখান থেকে যাত্রা করতে পারবে না। ততদিন পর্যন্ত আমি তোমাকে উপদেশ দেবো উপযুক্ত পুষ্টি এবং পরিচর্যা নিতে আমাদের ব্যক্তিগত চিকিৎসকের থেকে। তোমার মাই এবং দাসীরা তোমাকে সাহায্য করবে। আমাদের চিকিৎসক তোমার দাসীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দেবে এবং তারা তোমাকে সাহায্য করবে। কিন্তু দুটি চাঁদ যাবার পর তোমাকে যাত্রা করতে হবে এবং আমি তোমায় বলে দেবো কোথায় তোমার সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। আমি সকলের কাছে এটাই বলব যে তুমি তোমার তীর্থযাত্রা আবার শুরু করেছো।’
দুই মাস যাওয়ার পর মন্দোদরী তাদের আদেশ দেয় এখান থেকে রওনা হবার জন্য। অপেক্ষা করছিল তারা পরবর্তী গন্তব্য স্থান শোনার জন্য। মন্দোদরী অপেক্ষা করে মাতার থেকে পরবর্তী আদেশ আসা পর্যন্ত। সে খুব চিন্তায় থাকে তার শরীরের যা অবস্থা তাতে কেউ না দেখে ফেলে, জানতে না পারে। সে অনুভব করে তার সন্তান একটু একটু করে বড় হচ্ছে তার ভিতর।
‘মাতা আমার এবার যাওয়া উচিত। আমি আমার রক্ষী, দাসীদের বলতে পারছিনা পরবর্তী গন্তব্য স্থান। আপনি বলুন কোথায় যাব?’
‘পুত্রী তোমার পরিকল্পনা তৈরি রাখো তীর্থযাত্রা ঘিরে। তুমি যাও উত্তরে বদ্রিকাশ্রম তীর্থযাত্রার দিকে। তারপর ফিরে আসো সমতলের কোন এক আশ্রমে, সেখানে তোমার সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। মাই চেনে সেই স্থান। আমি তাকে বলে দিয়েছি। আমি জানি ওই ঋষি খুব সুন্দর ভাবে আশ্রমকে রক্ষা করেন এবং সেখানে সেসব কিছু ব্যবস্থা আছে যা তোমার আরাম, বিশ্রামের জন্য দরকার। তুমি শুধুমাত্র চারজন রক্ষী নিয়ে যাও তোমার সাথে। অন্যদের আদেশ দেওয়া দক্ষিণের দিকে যেতে। তুমি লঙ্কা যাওয়ার পথে তাদের সাথে দেখা করবে কারণ তাহলে তোমার ওপর খুব কম মানুষের চোখ পড়বে। এবার যাত্রা শুরু করো। আশীর্বাদ থাকল তোমার সাথে। সুস্থ থেকো নিরাপদে থেকো। কপালে চুম্বন দিয়ে বিদায় জানায় কন্যাকে। মন্দোদরী যাবার আগে পিতার সাথে সাক্ষাৎ করে যায়।
পিতাশ্রী বুঝতে পারেন মেয়ের অসুবিধা। তিনি বুঝতে পারেন যে তার বিবাহ সুখকর নয় কিন্তু দশাননের রাজনৈতিক মর্যাদার জন্য তাদের মধ্যে ঢুকতে পারেন না তিনি। পিতাশ্রী জানেন মন্দোদরীর অনেক কর্তব্য দায়িত্ব। কিন্তু তিনি কখনোই তার মেয়েকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে পারেন না তার অসুবিধার কথা। কন্যা পিতার কক্ষে যায় কিন্তু সেখানে তার সাক্ষাৎ হয় না। তিনি যখন মেয়ের সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে চান না তখন বারান্দায় পায়চারি করেন। তার দুচোখ জলে ভরে ওঠে কিছু না বললেও মন্দোদরী বুঝতে পারে পিতার অবস্থা। তিনি তাকে আশীর্বাদ করেন। বিয়ের পর এই প্রথম মন্দোদরী পিতৃগৃহে এত দিন কাটায়। মন্দোদরী ভাইদের বিদায় জানায় এবং তাদের স্ত্রী পুত্র-কন্যা ভালোবাসা জানিয়ে মায়ারাষ্ট্র ত্যাগ করে মন্দোদরী তার রথকে উত্তর ভারতবর্ষের দিকে যাওয়ার জন্য আদেশ দেয়।
তারা পঁচিশ দিন পর বদ্রিকাশ্রম পৌঁছায়। বদ্রিকাশ্রম খুব পবিত্র মন্দির রূপে চিহ্নিত হয়। এটা বিশ্বাস করা হয় দুই সাধু নাম নর এবং নারায়ণ কঠিন তপস্যা করেছিলেন এখানকার পর্বতে। মন্দোদরীর রথ পর্বতের উপর উঠতে পারে না ফলে তারা থেকে যায় ফলে তারা রয়ে যায় সমতলে। মন্দোদরী পালকিতে স্থানান্তরিত হয় এবং অন্যরা পায়ে হাঁটতে থাকে। বেশ কিছু জায়গায় তারা বিশ্রাম নেওয়ার পর পর্বত থেকে সমতলের পৌঁছায়। মন্দোদরী তখন পরিপূর্ণ মাতৃত্বে। তিনি ছয় মাসের সন্তানসম্ভবা এবং তার পক্ষে উঁচু জায়গায় যাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। অলকানন্দার জলে স্নান করে মন্দোদরী। মন্দোদরীর দুঃখ, মন পরিষ্কার হয়ে যায়। সে বিশ্বাস করে তার সন্তান এই অলকানন্দা জলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হবে এবং তার স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে।
মন্দোদরী আরও কিছু পথ যেতে চায়। হিমালয়ের পবিত্র মন্দির শিবের দর্শনের জন্য। কিন্তু মাই তাকে সাবধান করে যে তাদের কাছে সময় খুব কম। হিমালয় পর্বতমালা খুব রুক্ষ, ঠাণ্ডা এবং ঝড়ো হাওয়া প্রবণ এলাকা। এই কারণের জন্যই মন্দোদরী পালকির মধ্যে বসে যাত্রা করে। যদিও এটি তার শরীরের জন্য নিরাপদ নয় তবুও তারা এগিয়ে চলে। ভারতবর্ষে সমভূমি অঞ্চলে বসবাস করে তাই উপর থেকে নিচে নামতে সময় কম লাগে মাই মন্দোদরীকে বনের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে যায় আশ্রমে। সেখানে তার জন্য জামা কাপড়, রন্ধন সামগ্রী সব কিছু তৈরি থাকে। রক্ষীদের বাইরে পাহারা বন্দোবস্ত হয়। মন্দোদরী আগেই জানতো এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল তাদের জন্য এক ঋষি কৃপায় এবং তার মাতা-পিতৃগৃহত্যাগ করার আগেই জানিয়েছিলেন তাদের প্রস্থানের সংবাদ। সাত মাস পরই তার মাতৃত্ব কঠিন সময় উপস্থিত হয়। এর কারণ তার অতিরিক্ত পরিশ্রম ও চিন্তা। মন্দোদরী শরীরে যন্ত্রণা, ক্লান্তি অনুভব করে।
‘মন্দোদরী তোমার সন্তানের জন্য এই ক্লান্তি অনুভব হচ্ছে আমার মনে হয় তুমি সময়ের আগেই মা হবে।’ মাই জানায়।
‘এটা ক্ষতিকর হবে নাতো মাই? খুব তাড়াতাড়ি হচ্ছে না তো? তোমার কী মনে হয় আমার সন্তান যথেষ্ট স্বাস্থবান হবে?’ মন্দোদরী চিন্তিত হয় এই তাড়াতাড়ি সন্তান আগমনের সংবাদে।
‘শোন রাজকন্যা আমার, এত চিন্তা বন্ধ করো। হ্যাঁ এটা খুব ব্যতিক্রম সে সাত মাসের সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া কিন্তু অসম্ভব নয়। তোমার সন্তানের গঠন সম্পন্ন হবে তোমার গর্ভে।’
‘তুমি ঠিক বলছো মাই? আমি যে বিষাক্ত বস্তু পান করেছি তার ফল কী হবে? আমার শরীর যদি সেই বিষক্রিয়ার প্রভাব ত্যাগ করতে শুরু করে?’
‘থাক এত ভেবোনা আমার রাজকন্যা, আবার তুমি বেশি ভাবছো। আমি জানি তুমি পারবেন না এই চিন্তা বন্ধ করতে কিন্তু এটা তোমার সন্তানের জন্য ক্ষতিকারক হবে।’
‘মাই তোমার কী মনে হয় আমার কন্যা সন্তান হবে না পুত্র?’
‘তোমার শরীরের গঠন দেখে মনে হচ্ছে তোমার কন্যাসন্তান হবে।’ মন্দোদরী স্মিত হেসে উত্তর দেয় কারণ পুরো ঘটনাটা স্মৃতি রোমন্থন করে।
‘আমি কী কিছু ভুল করছি? তুমি জানো দশানন একবার আমায় বলেছিলেন তিনি একটি কন্যাসন্তান চান, যে সর্বদা তাকে বিরক্ত করবে এবং খেলবে।’
‘পুত্রী তুমি তোমার সন্তানকে পৃথিবীতে নিয়ে আসছো এর মধ্যে কোন ভুল হতে পারে না এবং তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছো। একবার একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম দাও তারপর আমরা লঙ্কেশ্বরকে সংবাদ দেব। তিনি খুব আনন্দিত হবেন এবং তিনি ভুলেই যাবেন যে তুমি তোমার মা হবার লুকিয়ে রেখেছো তার কাছে।
‘কিন্তু মাই কী হবে যদি আমার সন্তান সুস্থ না হয়? এটা একটা বড় প্রশ্ন যার থেকে দূরে থাকতেই আমার এখানে আসা।তোমরা তো জানোই আমি আমার মাতৃত্ব নিয়ে কতটা চিন্তিত। আমরা একে অনেক অনেক দিন ধরেই গোপন রেখেছি। অসংখ্য অজুহাত খাড়া করেছি কারণ আমরা জানি এই সন্তান সুস্থ ভাবে পৃথিবীতে আনার জন্য অনেক বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছি।’
‘আমরা সবাই জানি তুমি পৃথিবীতে একটি সুস্থ সন্তান আনতে চলেছো। আমাদের উচিত বাকি সবকিছু ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দেওয়া।’
আবহাওয়া গরম হয়ে ওঠে এবং আর্দ্রতা বাড়তে থাকে খরা প্রবণ এলাকায় আবহাওয়ার মতো। গতরাত থেকে মন্দোদরীর মধ্যে প্রসব বেদনা দেখা যায় সে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। মাই সঠিক বলেছিল মনে মনে ভাবে। সন্তান জন্ম নেবে সময়ের আগেই। সে অনুভব করে পেটের মধ্যে একটা পাথরের মত একটা পিণ্ড এবং পা বেয়ে জলের ধারা বয়ে যায়। শুরু হয় জলস্রাব। মন্দোদরীকে অনেক দাসীরা ঘিরে ধরে। তারা মাইকে সজাগ থাকতে বলে এবং জোর করে মন্দোদরীকে ঘুমানোর জন্য। কিন্তু মন্দোদরী পারেনা সে সজাগ থাকে কোনরকম শব্দ শোনার জন্য। মন্দোদরী ভাবে প্রসব বেদনার আওয়াজ যদি বাইরে অবধি পৌছায় তবে তারা জানতে চাইবে সন্তানের স্বাস্থ্যের খবর। মন্দোদরীর শরীরে যেটুকু শক্তি ছিল তা দিয়ে হাঁটতে থাকে দিয়ে কিছুদূর গিয়ে একটি শহর দেখতে পায়। শহরটির নাম মিথিলা। মন্দোদকীর পক্ষে আরও হাঁটা কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। সে দাঁড়িয়ে থাকে নিজের পায়ে কিন্তু হাঁটু শরীরের ভার নিতে অসমর্থ হয়।
‘আরো জোরে আরো জোরে শ্বাস নাও।’
‘পুত্রী মন্দোদরী তুমি ঠিক আছো শুধু নিজেকে আরো জোরে ধাক্কা দাও।’
কিছু সময়ের মধ্যে তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। মন্দোদরী এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। সন্তানের সাথে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন নাড়ি কাটতে থাকে সুন্দরভাবে পরিষ্কার করে তাকে। মন্দোদরী কাছে নিয়ে আসে এবং স্পর্শ করে নিজের হাতের মধ্যে নেয়। সন্তানের ত্বকে স্পর্শ করে মন্দোদরীর মধ্যে নরম অনুভুতি জাগে।
সন্তানের শরীরে নরম অনুভুতিগুলোকে অনুভব করে। তার ছোট ছোট হাতগুলো নিজের হাতের মধ্যে নেয়। একটি কালো জন্মদাগ দেখা যায়। ডান হাতের কনুইয়ের নীচে এই জন্মদাগ দেখে মন্দোদরী হাসে কারণ একই দান ডান হাতে আছে। তার কন্যা যেন তারই পরিপূরক হয়ে ওঠে।
‘পুত্রী মন্দোদরী সে কাঁদছে না কেন? আমি তো অনেকক্ষণ ধরে তার হৃদস্পন্দন শোনার চেষ্টা করছি! তুমি কি শুনতে পাচ্ছ?’
তখন মন্দোদরীর মধ্যে চেতনা জাগ্রত হয় এবং জোর করে বুকে টেনে নেয় তাকে। কিন্তু কোনভাবেই তার হৃদস্পন্দন শোনা যায় না চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। দাসীরা চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। মন্দোদরী, প্রার্থনা করেছে যাতে তার প্রাণ ফিরে আসে। কিন্তু সবকিছুই ব্যর্থ হয়।
‘পুত্রী মন্দোদরী সূর্যোদয় হবে।’
‘তুমি এই সন্তানকে আমার কাছে দাও। এটা ভগবানের।’
‘তুমি কি বলছ? সে বেঁচে আছে, আমি কোনভাবেই তাকে দেবো না।’
‘আমি জানি তোমার অনুভূতি কিন্তু আমি জানি এর পরিণতি। খুব শীঘ্রই শহরের মানুষ আমাদের আবিষ্কার করবে আমাদের যেতে হবে।’
‘আমি কোনভাবেই আমার সন্তানকে দেব না।’
‘সে আর আমাদের মধ্যে নেই। আমাকে সন্তানকে দাও আমি তাকে ভূমি মাতার কাছে রেখে আসব। সে এখন ভগবানের।’
মাই তাকে নিয়ে যায় মন্দোদরীর থেকে। তাকে রাখা হয় বড় একটা পাত্রে কাপড় ঢাকা দিয়ে। তারপর মাটি খুঁড়ে ওইপাত্রটি রেখে দেয়া হয়। মন্দোদরী আবার কাঁদতে থাকে এবং ভগবানের কাছে।
তারা ফিরে আসে আশ্রম থেকে এবং যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। মন্দোদরী এই ঘটনার পর পাথরে পরিণত হয়। তখন তার চোখে ভাসে সদ্যজাত শিশুটির মুখ। সে অনুভব করলেই তার অস্বস্তি বেড়ে যায়। সেই স্থানটি যেখানে তার সন্তানকে ফেলে এসেছে তার কথা মনে পড়ে। যদি এমন কোন ঘটনা ঘটে তার সন্তানের জীবন ফিরে আসে। কিন্তু মাই তাকে বলে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পরবর্তী দিন তারা লঙ্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন