লঙ্কার রানি মন্দোদরী

পারমিতা চক্রবর্তী

পরবর্তীদিন সকালে ভগ্নহৃদয় নিয়ে পিতা এবং রাজা প্রস্তুত হন যুদ্ধের জন্য। নানাশ্রী, ধন্যমালিনী, ন্যায়নন্দিনী এবং মন্দোদরী সবাই সে রাতে দশাননের সাথে থাকে। তারা প্রত্যেকে কথা বলে দশাননের সাথে। কিন্তু তাদের মস্তিষ্ক কার্যকরী হয় না। তারা প্রত্যেকে চায় দশানন আবার বেঁচে ফিরুক।

ভগিনী মীনাক্ষী আসেন দেখা করতে দশাননের সাথে। মীনাক্ষী অন্তোষ্টিক্রিয়ায় যাবার আগে ভ্রাতা দশাননের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

মন্দোদরী ও দশানন এবং অন্যান্য রানিরা তাদের উৎকণ্ঠার কথা জানায় কিন্তু দশানন প্রত্যেককে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

‘দশানন আমি এসেছি আপনার কাছে শুভকামনা জানানোর জন্য।’

‘আমার ভগিনী, আমি এই যুদ্ধ করছি শুধুমাত্র তোমার সম্মানের জন্য। আমি হয়তো তোমার শ্রেষ্ঠ ভাতা হতে পারিনি কিন্তু সর্বদা চেষ্টা করেছি তা হবার। আমি তোমার পায়ে লক্ষ্মণের মুণ্ডু এনে দিতে চাই। কিন্তু যদি আমি অসমর্থ হই তাহলে আশা করব তুমি আমাকে ভুল বুঝবে না।

মীনাক্ষী তার ভুল বুঝতে পারে, ‘ভারত দশানন আমি সত্যিই খুব ক্রুদ্ধ হয়েছিলাম আপনার উপর, লক্ষ্মণকে শিক্ষা দেওয়ার আগে আমি চেয়েছিলাম আপনাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে। আমি ভাবতাম আমার দুর্ভাগ্যের কারণ আপনি। আপনি আমার স্বামীকে হত্যা করেছেন এবং আমি সর্বদা আপনাকে দোষী ভেবেছি। আমি কোন ভাবে আপনাকে মেনে নিতে পারছিলাম না। জানিনা কেন! আপনি নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার আগেই সীতাকে অপহরণ করেন এবং আমার পুত্রকে মৃত অবস্থায় পাঠায় তারা। আমি ভাবতে থাকি আমার পরিবার বলতে বিভীষণ এবং কুম্ভকর্ণ। আমি এখনও আপনার উপর ক্ষুব্ধ। বিভীষণ আপনার শত্রু শিবিরে যোগদান করেছেন তিনি তার ভগিনীর অপমানকে অগ্রাহ্য করে শত্রু শিবিরে যোগদান করেছেন। কিন্তু আপনি আপনার প্রতিজ্ঞায় আছেন। এই যুদ্ধে আপনি নিঃস্ব হয়েছেন এবং আপনার সন্তানদেরও হারিয়েছেন।’

দশানন মীনাক্ষীর কথা শুনে স্তম্ভিত হয়। তিনি তাকিয়ে থাকেন ভগিনীর মুখের দিকে এবং মন্দোদরী কিছুটা বিরক্ত হয়। নানাশ্রী হতবাক হয় মীনাক্ষীর স্বার্থপরতা দেখে।

‘সুতরাং আজ আপনি আপনার ভ্রাতাকে আপনার লক্ষ্যে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছে মীনাক্ষী।’ ন্যায়নন্দিনী তার দিকে তাকিয়ে থাকে কথাগুলি বলে।

দশানন তাকে থামানোর চেষ্টা করে। তিনি মীনাক্ষীর কাঁধে হাত দিয়ে নির্ভরতার কথা বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং সে যা বলে তাই গ্রহণ করেন।

‘আমি জানতাম তুমি প্রতিশোধ নিতে চাইবে এর থেকেও বেশী। তুমি আমাকে দেখলে তোমার প্রতিশোধ নেওয়া কিছুটা প্রশমিত হবে। আশা করি তুমি এখন তৃপ্ত। তোমার পিপাসা, তোমার প্রতিহিংসা পরিপূর্ণ আজ। আমাদের রাজত্ব এই যুদ্ধের দায়ভার বহন করছে খুব সুন্দর ভাবে। আশা করি তুমি উপলব্ধি করবে সে কথা প্রিয় ভগিনী। যখন লঙ্কার সমস্ত বিধবা নারীরা অভিশাপ দেবে সীতাকে, তুমি ভুলে যাবে তোমার পুরানো প্রতিহিংসার কথা।’ দশানন আর ভগিনীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।

‘দয়া করে এ কথা বলবেন না। আমি কখনো ভাবিনি এর পরিণতি যুদ্ধের আকার নেবে... আমি ভাবতেই পারিনি এই যুদ্ধ এত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেবে!’

‘তুমি জানো যুদ্ধ কীভাবে সংঘটিত হয়? একটা যুদ্ধের পরিণাম মৃত্যু। ইহা দাবী করে সিংহাসন, একটা রাজ্যের খাদ্য, সম্পত্তি এবং বহু প্রাণকে ধ্বংস করে।’

‘সুতরাং আমি অনুরোধ করব ভ্রাতা, আপনি আর যুদ্ধ করবেন না, আর যাবেন না। সীতাকে মুক্ত করুন এবং এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করুন।’

নানাশ্রী মাঝে তাদের থামিয়ে বলেন, ‘আপনি মনে করেন খুবই সহজ এই যুদ্ধকে থামানো? আপনার কী মনে হয় তারা এখানে এসেছে শুধুমাত্র সীতার জন্য? তারা এই রাজত্বকে অধিগ্রহণ করতে চায় মীনাক্ষী। আমাদের জাতি, মানুষ, আমাদের ভূমি এখন বিপদগ্রস্থ। রাম, লক্ষ্মণ একটা সংকল্প নিয়ে লঙ্কায় এসেছেন, যাতে তারা রাবণের লঙ্কাকে তাদের অধীনে নিয়ে যেতে পারে। তারা ভারতবর্ষ থেকে অসুর, রাক্ষস নিধন করতে চায়। তারা আমাদেরকে নিধন করে দেবতার কাছে ফিরে যেতে চায়। দেবতারা সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িত না হলেও তারা রাম ও তার বাহিনীকে সাহায্য করে চলছেন।’

‘সুতরাং আমি রাম ও লক্ষ্মণের ধ্বংস দেখতে চাই।’

‘অবশ্যই কিন্তু আপনার এই ইচ্ছাই আপনার ভ্রাতাকে সীতাকে অপহরণ করতে সাহায্য করেছে এবং রাম তার এই পরিকল্পনাকে সার্থক রূপ দিতে পেরেছে। তার ফলে তারা এই বৃহত্তম রাক্ষস সাম্রাজ্যকে আক্রমণ করতে সমর্থ হয়েছে। এটা শুধুমাত্র আপনার জন্য সীতা এখনও বন্দিনী এবং তার স্বামী তার জন্যই যুদ্ধ করেছে। লঙ্কাকে জয় করা এখন তাদের কাছে বড় লক্ষ্য।’ নানাশ্রী মীনাক্ষীকে বোঝান।

‘একটাই আশা আমার প্রিয় ভগিনী আমরা সবাই যুদ্ধ করেছি সম্মানের সাথে। তুমি আমাকে ক্ষমা করো যদি তোমার অপমানের প্রতিশোধ নিতে অক্ষম হই। আমরা সকলেই যুদ্ধ করেছি শুধুমাত্র তোমার জন্য। আমার এক ভ্রাতা এবং তুমি দেখেছো আমার অসামর্থ্যতা। আমি আজই তাদের সাথে যুদ্ধ করতে যাবো এবং অবশ্যই আমার প্রজারা থাকবে আমার পাশে।’ দশানন মীনাক্ষীকে বলেন উত্তেজিত ভাবে।

দশানন নানাশ্রীর কাছে যাওয়ার আগে মাথা নিচু থাকেন, ‘আমি অনেক কিছু বলেছি লঙ্কেশ।’ নানাশ্রী বলেন আর চোখে অবিরত জল নেমে আসে।

‘আমি আপনার সাথে থাকতে পেরে খুবই আনন্দিত, কৃতজ্ঞ। আজ কী হবে তাতে কিছু এসে যায় না। আপনি চিরকাল লঙ্কার নায়ক থাকবেন আমাদের সাম্রাজ্যে। সোনার মত সম্পদ হয়ে থাকবেন ইতিহাসে।’

‘নানাশ্রী আপনি এই সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ছিলেন পিতামহ সুমেলী লঙ্কা জয় করার সময় থেকেই। আমি চিরকাল আপনার সাহায্য পেয়ে এসেছি।’ দশাননের গলা কেঁপে ওঠে।

‘আমি যদি ফিরে না আসি প্রতিজ্ঞা করুন আমার কাছে, আপনি এই সম্পত্তির উত্তরাধিকার হবেন এবং মন্দোদরী আপনার সাথে থাকবে।’ এ কথা বলে দশানন হেঁটে চলে যান বারান্দার দিকে। তিনি সীতাকে দেখতে চেয়েছিলে যুদ্ধে যাওয়ার আগে।’ যদি এটাই তার শেষ সময় হয় তাই একবার তার কন্যাকে শেষ দেখা দেখে নিতে চায়। মন্দোদরী তার কাছে জানতে চান, ‘আপনি কী যাওয়ার আগে বলতে চান?’

‘তুমি কোনদিনই তাকে বলো না একথা। আমি নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারব না। তার চোখে নিজেকে দোষী কোন ভাবে দেখতে পারবনা। আমাকে আরও ঘৃণা করুক সে, আমি যা করেছি তার জন্য। আমি তার কাছে পিতা হতে চাই না। আমি এখন শেষবারের মতো তাকে দেখতে চাই।’

‘আপনি শুধুমাত্র নিজের না প্রভু আপনি রাবণ, এক ক্ষমতাশালী রাজা অপ্রতিরোধ্য শক্তি।’

দশানন নিজের হাত বাড়িয়ে দেয় মন্দোদরীর দিকে, ‘আমি কেউ নই মন্দোদরী। আমি খুবই সামান্য একজন। আমি আমার পথ হারিয়েছি, আমার পরিবার, আমার সহৃদয় সবাইকে হারিয়েছি। আমি তাদের হারিয়ে যেতে দেখেছি, তাদের চিতা সাজাতে হয়েছে আমার হাত দিয়ে। আমার জীবনে আর কী বা বাকি থাকতে পারে।’

মন্দোদরী চেষ্টা করে দশাননের মধ্যে শক্তি, সাহস, আশার সঞ্চার করতে। দশানন বেঁচে থাকার ইচ্ছাটুকু হারিয়ে ফেলে।

‘প্রভু, আপনাকে এই যুদ্ধে পরাজিত হলে চলবে না। আপনি অপ্রতিরোধ্য।’

দশানন সম্মতি দেয় মন্দোদরীর কথায়। ‘আমি খুবই অহংকারী মন্দোদরী। আমি ভাবতাম আমি অপ্রতিরোধ্য। আমি শ্রেষ্ঠ বানর ও মানুষদের জাতি থেকে। আমি কোনভাবেই ভাবতে পারিনি তারা আমাকে আঘাত করতে পারে। আমি মুখোমুখি হয়েছি রামের, এক অমর মানুষের। আজ আমি অপ্রতিরোধ্য নই।’

মন্দোদরীর হৃদয় ভিজে যায়। সে চিনতেই পারে না এই দশাননকে। দশানন কখনও শান্ত,বিষণ্ণ হতে জানতেন না। দশানন তার চারদিকে শান্তির বাতাবরণ তৈরি করে রেখেছেন। তাকে নিরাপদে ফিরতে হবে। তিনি রাজত্ব করবেন এবং মন্দোদরী তার পাশে বসে থাকবেন-এমন দিনের প্রতীক্ষায় থাকে মন্দোদরী। মহান্তকুমার তাই দেখেছেন, দশানন আবার ফিরে আসবেন এবং লঙ্কা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

‘আপনি আবার ফিরে আসবেন এখানে অনেক কাজ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। আপনি সেই কাজগুলো আমাদের মধ্যে দিয়ে দিন।’ মন্দোদরী কাঁদতে থাকে। সে অনুভব করে দশাননের অবস্থান।

দশানন তাকিয়ে থাকে তার দিকে আন্তরিকভাবে এবং বোঝার চেষ্টা করে, ‘তুমি আমার রানি মন্দোদরী, এই রাজত্ব ততটাই আমার যতটা তোমার। আমি যদি চলে যাই, তুমি আমাদের প্রজাদের দায়িত্ব নেবে।’

দশানন মন্দোদরীকে আদর করে, ‘তুমি এখনও আগের মতো আছো, আমি প্রথম যখন তোমাকে দেখেছিলাম।’ দশানন মন্দোদরীকে নিজের দিকে নেয়। ‘এটাই উপযুক্ত সময়, আমাকে আমার চন্দ্রহাস দিয়ে দাও এবং আমাকে আমার ধনুক দাও। আমি সেই দিয়ে যুদ্ধ করব ভৈরবের দ্বারা। অভিনন্দন করো পরবর্তীর জন্য।’ নানাশ্রী এবং মহাপ্রসভ যুদ্ধ দেখে উঁচু স্তম্ভ থেকে। প্রত্যেকে সেখান থেকে যুদ্ধ দেখে। মন্দোদরী প্রার্থনা করে শিবের কাছে। শিবের ভক্ত মন্দোদরী। প্রার্থনা করে তার কাছে যাতে তার স্বামী বেঁচে ফিরে আসতে পারে।

সংবাদ প্রেরক দিনে দুই- তিন বার করে আসে সংবাদ দিতে। সে যা দেখেছে যুদ্ধক্ষেত্রে বর্ণনা করে। লঙ্কেশ্বর রাবণ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে। অদ্ভুত বেগে ধেয়ে আসে দুই প্রতিপক্ষ একে অপরের দিকে। লঙ্কার ভূমি ঢেকে দেওয়া হয় কালো পতাকায়। কুম্ভ, নিকুম্ভ হত্যা করে বেশিরভাগ বানরকে তাদের শক্তি দিয়ে। রাম বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে রাবণকে বারংবার এবং আহত করে রথের আরোহী হস্তিকে। ফলস্বরূপ রাবণের রথের চাকা ভেঙে যায়। রামএবং রাবণ তাদের পূর্ণ শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করে। রাম মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে রাবণের উপর - বরুণাস্ত্র, সূর্যাস্ত্র, ত্রিমূর্তিস্ত্র, ভূমাস্ত্র, গরুড়াস্ত্র, দেবাস্ত্র, সূদরর্শনাস্ত্র এবং অন্যান্য। কিন্তু রাবণ রামের সকল অস্ত্রের সুন্দর ভাবে মোকাবিলা করে।

রাম এবং রাবণের যুদ্ধে প্রথম দিন সমাপ্ত হয় সূর্যাস্ত পর্যন্ত। প্রবল যুদ্ধের পর রাবণ প্রস্তাব করে রামকে তাদের বাহিনীর মৃতদেহগুলো যেন সরিয়ে দেয় মাটি থেকে। প্রথম দিনের পর শতাধিক বানর মারা যায়। প্রথম দিনে এত মৃত্যু একটা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। পরবর্তী দিনও তারা যুদ্ধ করবে স্থির করে। দুই পক্ষের সেনা ফিরে যায় যুদ্ধক্ষেত্র শিবিরে। রাবণ ফিরে আসেন সেনা শিবিরে। যেটি অবস্থিত শহরের বাইরে। তরুণ সেনাগণ ভেবেই অবাক হয়ে তার সাথে সমভাবে যুদ্ধ করে চলছে বৃদ্ধ রাজা। তিনি তার সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করে চলেন। দ্বিতীয় দিনের রাম ও রাবণকে দেখে মনে হয় তারা ধরিত্রীকে তাদের পদতলে উপনীত করবে, একে অপরকে ক্রমাগত আক্রমণ করেই চলে এবং নৃশংসভাবে সেনাদের হত্যা করে চলে।

পরবর্তী দিন উভয় পক্ষের সম সংখ্যক সেনা উপস্থিত থাকে যুদ্ধক্ষেত্রে। রাবণ অপ্রতিরোধ্য থাকে। সেদিন অযোধ্যার রাজপুত্র রাম অন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তারা অর্ধচন্দ্রাকার বৃত্ত তৈরি করে রাবণের বাহিনীকে আক্রমণ করার জন্য। সুগ্রীব নেতৃত্ব দেয় তার সেনাবাহিনীর পিছন থেকে, নিকুম্ভ নেতৃত্ব দেয় লঙ্কার পশ্চিম প্রান্তে প্রবেশদ্বারের প্রান্ত থেকে। দুই যোদ্ধা যুদ্ধ করে চলে বীরবিক্রমে। রাবণ তার সেনাদের দেখে যুদ্ধ করতে এবং প্রতিপক্ষের চক্রান্ত দেখে হেসে ওঠে। রাবণ তার ক্ষমতাকে দ্বিগুণ করে যুদ্ধে মেতে ওঠে। রাম এবং লক্ষ্মণ দুজনে মিলে রাবণের সাথে যুদ্ধ করে। রামের বাহিনী ঘিরে ধরে রাবণকে এবং তার সেনাবাহিনীকে। রাবণের বীরত্ব এবং কর্মক্ষমতায় মুগ্ধ হয় রাম। রাবণ এই শক্তি ও বীরত্ব পেয়েছেন বীরভদ্র বা ভৈরব শিবের থেকে। রাক্ষস সেনা হেসে ওঠে তাদের রাজ্যের বিক্রম প্রদর্শনের সময়। শত্রু শিবিরে ভয়াবহ যুদ্ধ সমাপ্ত হয় না দিন পর্যন্ত তা বর্ধিত হয় রাত পর্যন্ত।

সেনারা ক্লান্তি, বিশ্রামের কথা ভুলে গিয়ে যুদ্ধ করে। কুম্ভ স্থির করে একাই যুদ্ধ করবে সুগ্রীবের সাথে। সে তার রথ থেকে নিচে নেমে এগিয়ে আসে লোহার গদা নিয়ে সুগ্রীবের দিকে। কিন্তু তার ধনুক কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না বানর বাহিনীর উপর। তারা এই বিদ্যায় খুবই পারদর্শী। এক এক করে সুগ্রীব সবাইকে হত্যা করে এবং কুম্ভকে পরাজিত করে। প্রখর সূর্যরশ্মি নিদ্রাচ্ছন্ন চোখকে ব্যথিত করে কুম্ভের, তার সারা শরীর দিয়ে রক্তস্রোত প্রবাহিত হয়। মাটিতে প্রোথিত হয় সে। সুগ্রীব জয়ী হয়।

নিকুম্ভ তার ভাইকে যুদ্ধক্ষেত্রে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নিকুম্ভ পিছিয়ে আসে কিন্তু শক্তিশালী এবং সাহসী হনুমান ধেয়ে আসে তার দিকে। ক্রদ্ধ নিকুম্ভ তার শত্রুদের দিকে এগিয়ে আসে। হতাশাগ্রস্ত নিকুম্ভকে মাটিতে ফেলে দেয় হনুমান তীর দিয়ে এবং এক তীর দিয়ে আঘাত করে।

ভ্রাতুষ্পুত্র এই ভাবে পরাজিত করার জন্য রাবণ আরো তীব্র বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাম লক্ষ্মণের বাহিনীর উপর। এক এক করে অস্ত্র নিক্ষেপ করতে থাকে। তিনি বোমা নিক্ষেপ করেন- শক্তি অস্ত্র, শিবাস্ত্র, কালী অস্ত্র, যক্ষাস্ত্র, পর্বতাস্ত্র এবং মায়াস্ত্র। দুইদিন ধরে একটানা যুদ্ধ করে রাম, লক্ষ্মণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রাবণের সারথি ক্লান্ত হয়ে যায়। লক্ষ্মণের যন্ত্রণা শুরু হয় ক্ষতস্থান থেকে। এই অবস্থায় রাম প্রস্তাব করে যুদ্ধবিরতির একদিনের জন্য। তিনি ধ্বজা উড়িবে বিরতি চান একদিনের জন্য। রাবণ তার সারথির দিকে তাকিয়ে দেখেন সেও পরিশ্রান্ত। তার শান্তির জন্য রাবণ রামের প্রস্তাব মেনে নেন। দুই পক্ষের সম্মতিতে পরবর্তীতে যুদ্ধ করবে না স্থির হয়।

চতুর্থ দিন শুরু হয় রাম রাবণের যুদ্ধ এবং তা মোট তেরো দিন অতিক্রান্ত হয়। রাম এবং লক্ষ্মণ চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ে রাবণকে নিয়ে। বিভিন্ন ভাবে রাবণকে আক্রমণ করে তারা তাকে পর্যুদস্ত করতে অসমর্থ হয়। সেই দিন থেকে রামের বাহিনী সমঝোতার মধ্যে আসতে চায় রাবণের বাহিনীর সাথে। তখন যুদ্ধে যোগদান করে বিভীষণ। তিনি রামের বাহিনীকে পরামর্শ দিয়ে চলেন কীভাবে রাবণকে পরাজিত করা যায়। বিভীষণ যে তার রাজত্ব, মাটির বিপক্ষে যান তার জন্য অনুশোচনা কাজ করে না তার মধ্যে। নিজের ভ্রাতাকে পরাজিত করতে সর্বশক্তি দিয়ে এগিয়ে আসে।

রাবণ বিরোধীপক্ষের ভাইকে দেখে রাগে, ঘৃণায় আরো উন্মত্ত হয়ে ওঠে। কারণ প্রথম অস্ত্র তিনি নিক্ষেপ করেন মঙ্গলাস্ত্র যা মারণাস্ত্র। রাম তার পরিবর্তে যমাস্ত্র নিক্ষেপ করেন যার ফলে বহু মানুষ আহত হয়। রাবণ আক্রান্ত হয় - তিনি রথের মধ্যে পড়ে যান তবুও সোজা হয়ে রাম লক্ষ্মণের সাথে যুদ্ধ করতে যান এবং রামকে শক্ত যুদ্ধের মধ্যে ফেলেন। রাবণকে যুদ্ধ করতে দেখে মন্দোদরীর বুকের মধ্যে হিম পড়তে থাকে। পাকস্থলী যেন স্থির হয়ে যায়। মন্দোদরীর দাসীরা তাকে উৎসাহ দেবার চেষ্টা করে। মন্দোদরী তার স্বামীকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পরে। দশানন চতুর্থ দিন ধরে যুদ্ধ করে চলেন। প্রতীক্ষা করে মন্দোদরী তার স্বামীর ফিরে আসার জন্য। নানাশ্রী আসেন তাকে দেখতে, ‘আমি খুবই ভীত। শুভ সংবাদ নয়, দশানন মারাত্মক ভাবে আক্রান্ত হয়েছেন।’

মন্দোদরী পদস্খলিত হয় এবং ধন্যমালিনী ও ন্যায়নন্দিনীকে ডেকে পাঠায় তুলে ধরার জন্য। জিজ্ঞাসা করে মন্দোদরী, ‘তিনি কী এখনও যুদ্ধ করছেন?’

নানাশ্রী তাকিয়ে থাকে সংবাদের জন্য। তিনি বলেন, ‘আপনার মহিমায় যমাস্ত্র তাকে পরাজিত করতে পারিনি। রাম এবং লক্ষ্মণ বিভীষণের সাথে আলোচনা করছেন কীভাবে তাকে পরাস্ত করা যায়। বিভীষণ রাবণের পেটের তলদেশ দিকে লক্ষ্য করে তীর ছোড়েন। কোন সময় নষ্ট না করে লক্ষ্মণ তার ভাইয়ের হাতে ব্রহ্মাস্ত্র তুলে দেয়। এই ব্রহ্মাস্ত্র বিশ্বভুবনকে ধ্বংস করতে পারে। রাম সেটিকে নিয়ে তীর নিক্ষেপ করেন রাবণের তলদেশে।

দশাননের ছায়া দশাননের আগে মাটিতে পড়ে। ধরণী কম্পিত হয়। কয়েক বছর আগে দশানন অমৃত বানিয়ে ছিলেন এবং তা পান করেছিলেন। সেই অমৃতের গুনাগুন বাহিত হয় রাবণের শিরা-উপশিরায়। বিভীষণ সেই জ্ঞানকে যথাসময় কাজে লাগায় রাম।

‘তিনি কেমন আছেন?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে এক নিঃশ্বাসে।

‘আমরা এখনও সঠিক জানিনা। রাম এক বার্তাবাহকে পাঠান সংবাদ প্রেরণের জন্য। দশানন তার রথের মধ্যে কাতরাচ্ছেন।’ নানাশ্রী জানায় মন্দোদরীকে।

‘আমি এখনই তাকে দেখতে চাই।’

নানাশ্রী তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু সে বুঝতে নারাজ। ‘আমার স্বামী কঠিন অবস্থার মধ্যে চলছেন। তার রাজত্ব স্তব্ধ। আমি এখানে বসে থাকব ও অপেক্ষা করব?’

‘রানি মন্দোদরী পুরোটাই চক্রান্ত। আপনার ওখানে যাওয়া সঠিক হবে না। আমরা তাকে এখানে আনার ব্যবস্থা করতে পারি।’

মন্দোদরী পুরো ঘটনা শুনে যুদ্ধক্ষেত্রে ছুটে যায়। রক্ষীরা তার পিছনে পিছনে চলতে থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে ঢোকার মুখে মৃতদেহের সমুদ্র দেখা যায়। আশেপাশে সমস্ত নদী ভরে যায়। চারিদিকে শুধু রক্ত আর লাশ। দশাননের রথ চকচক করে সূর্যালোকে। চারিদিকে ঘাসের মধ্যে রথটি উজ্জ্বল লাগে। মন্দোদরী প্রার্থনা করে তার স্বামীর আরোগ্যের। সে মনে মনে ভাবে যদি তিনি আজ মারা যান তবে কাল মৃত বলে ঘোষণা হবে।

‘কে তোমাকে এখানে এনেছে মন্দোদরী?’ মন্দোদরীর পা কাঁপতে থাকে। দশাননের গলার আওয়াজ তাকে স্পর্শ করে বলে, ‘কী ভাবে এমন হলো?’

‘ইহা অনিবার্য ছিল। আমি নিজেই নিজেকে চালনা করেছি। আমি চেষ্টা করেছি লড়াই করতে কিন্তু আমি পারিনি!’

‘আমরা সবাই আপনাকে ভিতরে নিয়ে যেতে চাই। আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।’

‘তার কোনো প্রয়োজন নেই। অমৃত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আমার শরীর থেকে ধীরে ধীরে শ্লথ হয়ে আসছে শরীর। আমি বেঁচে আছি শুধুমাত্র এই মুহুর্তের জন্য।’

‘আমি আপনার সাথে মরতে চাই।’

‘তুমি কথা ভাবার একটু চেষ্টা করো না। তুমি লঙ্কার রানি। লঙ্কার তোমাকে প্রয়োজন। প্রতিজ্ঞা কর তুমি এরকম কখনো ভাববে না।’

মন্দোদরী তাকে ধরে কাঁদতে থাকে।

‘এভাবে কেঁদোনা আমার নিজেকে পরাজিত লাগে। আমি মরে ইতিহাস রচনা করব।’

দশানন তার শেষ নিঃশ্বাস নেয়। তার দু'চোখ বন্ধ হয়ে যায়। মন্দোদরী তার পাশে বসে থাকে। সূর্য ধীরে ধীরে নত হয়। দিন ক্রমশ রাতে পরিণত হয়। নানাশ্রী মন্দোদরীর কাঁধে হাত দিয়ে বলেন, ‘এই সময় ভিতরে যাওয়া প্রয়োজন তাদের।’

মন্দোদরী তার স্বামীর মৃতদেহের পাশে বসে কাঁদতে থাকে। তার পাশে থাকে অন্য নারী - ধন্যমালিনী, ন্যায়নন্দিনী এবং অন্তরমহলের মহিলারা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ শোকে পাথর হয়ে যায়। দশাননের রথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে অঙ্গদ, হনুমান, সুগ্রীব, রাম, লক্ষ্মণ।

‘দেবী আপনার স্বামী একজন মহান যোদ্ধা এবং রাজা। আমরা আপনার শোকে মর্মাহত।’

‘আপনি রাম?’ মন্দোদরী রামকে চিনতে পারে।

‘আমি রাম।’ তিনি এগিয়ে আসেন তার ভ্রাতার পাশে, ‘এই হল আমার ভাই লক্ষ্মণ। আমরা অনেক কিছু শিখেছি আপনার স্বামীর থেকে। আমরা তাকে শ্রদ্ধা করি।’

লক্ষ্মণ যোগ করেন, ‘আমরা কোনোভাবেই তার ক্ষতি চাইনি। ইহা তার সাথে সঠিক হয়নি।’

‘আপনারা সিদ্ধান্ত নিন কোনটি সঠিক, কোনটি নয়।’ মন্দোদরী কিছুটা বিদ্বেষের গলায় বলেন।

‘দেবী এই সময় রাবণের শেষ ক্রিয়াকর্মের সময়। তাকে ভিতরে নিয়ে যান।’ রাম ভাবেন আর কথার পুনরাবৃত্তি প্রয়োজন নেই। সবাই রথে করে রওনা হয়। সবাই দশাননেকে ঘিরে থাকে, তার নাম উচ্চারণ করতে থাকে।

লঙ্কার সবাই থাকে তার নাম উচ্চারণ করতে থাকে। করধ্বনি দেয় তাদের জন্য। তাদের রাজা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। বানর নেতা তাদের অনুসরণ করে। বিভীষণ থাকে তাদের সঙ্গে।

প্রত্যেকে দশাননের শেষ কার্য সম্পন্ন জন্য অপেক্ষা করে। মন্দোদরী নানাশ্রীর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তারা এখানে কেন?’

নানাশ্রী উত্তর দেন, ‘এই রাজত্ব এখন তাদের।’

নানাশ্রীর উত্তর মন্দোদরীর রক্তকে হিম করে দেয়।

‘এটাই যুদ্ধের নিয়ম। পরাজিত সেনাদের উপর অধিকার হস্তান্তরিত হয়। লঙ্কা এখন তাদের অনুগ্রহপূর্বক।’

মন্দোদরী যুদ্ধের ফলাফল মানতে পারে না। তাদের আর কোনো প্রতিবন্ধক রইল না। বানরের সেনা তাদের অধিকার দাবি করে। এই ঘটনা হয় শুধুমাত্র একটা নারীর জন্য।

রাজা এবং নেতা পার্শ্ববর্তী রাজ্যের সবাই শ্রদ্ধা জানাতে আসেন দশাননকে। তাদের অন্য রাজ্যের অংশ রাম, লক্ষ্মণের আদেশ জারি হয়। পরবর্তী দিন স্থির হয় দশাননের অন্তোষ্টির জন্য। লঙ্কার রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকে মন্ত্রী, সভাসদস্যরা। তার উদ্দেশ্যে গান গায় লঙ্কাবাসী। লঙ্কার সোনার সাম্রাজ্য ইতিহাস রচনা করে। মন্দোদরী নিজেকে প্রস্তুত করে পরবর্তীর জন্য। বিভীষণ আমন্ত্রণ জানায় রাম, লক্ষ্মণের অতিথিশালায় থাকার জন্য। বিভীষণের প্রত্যাবর্তনকে কোনভাবেই মানতে পারে না মন্দোদরী। লঙ্কায় তার কোন স্থান নেই।

দশাননের মৃত দেহকে চিতার উপর রাখা হয়। মন্দোদরী অনুভব করে প্রথমবার তার চোখ স্থির হয়ে থাকে। তার পিতার বলা কথাগুলো মনে পড়ে যায়। রাজদরবারে দশাননের উপস্থিতি মনে করায়। নানাশ্রী চিতায় আগুন দেয়। বিভীষণ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

‘উনি এখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন?’ মন্দোদরী প্রতিবাদ জানায়, ‘তার কোনো অধিকার এখানে থাকার।’

বজ্রজলা, মীনাক্ষী এবং মন্দোদরীর মাতা তাকিয়ে থাকে রামের দিকে। মন্দোদরী বলে ‘কে তিনি আমার স্বামী অন্তোষ্টিক্রিয়া তত্ত্বাবধান করবেন? আমরা সবাই চুপ করেছিলাম যখন তারা আমাদের শহরে প্রবেশ করেছিল কিন্তু আর না। তাদের আর কোনোরকম ব্যবসা এখান থেকে করা যাবেনা। বিভীষণের এখানে থাকা যাবে না।’

সভাসদরা সবার পিছনে দাঁড়ায়, মানুষজন রানির সাথে গলা মেলান। রাম সবার কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায়। তিনি এগিয়ে আসেন, ‘দেবী মন্দোদরী, আমরা কোনোভাবেই যুদ্ধ চাইনি। এক রক্তের সম্পর্ক চাই অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন জন্য। বিভীষণ, একমাত্র যিনি রক্তের সম্পর্কের আপনাদের পরিবারের। তিনিই একমাত্র উত্তরাধিকার লঙ্কার। রাম ভোলানোর চেষ্টা করে মন্দোদরীকে।

‘আপনার অধিকার রাজ্য শাসন করার রাম কিন্তু আমি কোন ভাবে বিভীষণকে সেই ক্ষমতা দিতে নারাজ। আমি কোনভাবেই তার ছায়া দেখতে নারাজ আমার স্বামীর চিতার সামনে।’

‘দেবী আগে রাজার ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন হোক তারপর ভাবা যাবে কার ভুল!’ রাম হাত জোড় করে অনুরোধ করে।

মন্দোদরী তাকিয়ে থাকে রামের দিকে, সবাই তাদের রাজাকে শেষ দেখার জন্য একত্রিত হয়। মাথা নিচু করে সম্মতি জানায় মন্দোদরী। বিভীষণকে দেখে মনে হয় বিপর্যস্ত। কিন্তু মন্দোদরী তার প্রতি কোনো রূপ সহানুভূতি দেখায় না।

দশানন শেষকৃত্যর পুরো তত্ত্বাবধান করেন নানাশ্রী এবং বিভীষণ। সমস্ত কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর রাম লক্ষ্মণ এক যজ্ঞের আয়োজন করে দরবারে। তারা শিবের পূজা করেন এবং পাপ স্খললের জন্য উদগ্রীব হয়। ব্রহ্মাস্ত্র দিয়ে কুলীন ব্রাহ্মণকে হত্যা করা পাপ। দশানন এক কুলীন ব্রাহ্মণ। তাকে হত্যা করা মহাপাপ করেছে।

পরবর্তীতে লঙ্কাবাসী দেখে বিধবা রানিকে। একে একে সকল মন্ত্রী এসে তাকে সমবেদনা জানায়। যখন মন্দোদরীর পিতাশ্রী-মাতাশ্রী আসেন কেঁদে ফেলে সে। আমাকে আপনার সাথে নিয়ে যান।’

‘পুত্রী মন্দোদরী তোমার দায়িত্ব আছে তোমার রাজত্বের উপর। তুমি কোনভাবেই আমার সাথে আসতে পারো না। তোমাকে এখানেই থাকতে হবে তোমার প্রজার স্বার্থে। এটাই উপযুক্ত সময় সবকিছু নিজের হস্তগত করার। তোমার প্রজারা দেখতে চায় তাদের রাজত্ব, সিংহাসন অটুট আছে।’ পিতাশ্রী বলেন।

‘আমরা তোমাকে সাহায্য করতে পারি,যদি তুমি সাহায্য চাও কিন্তু তোমাকে এখানেই থাকতে হবে এবং নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে রানি রূপে।’ মাতা বলেন, ‘বিবাহসূত্রে যে অধিকার পেয়েছ তা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারবে না।’

যুদ্ধের পর দরবারের কাজ ভেঙে যায়। রাম ,লক্ষ্মণ, বিভীষণ রাজ দরবারে প্রবেশ করে। মন্দোদরীর নিজেকে ক্ষমতাহীন মনে হয়।

‘রানি মন্দোদরী এবং অন্যান্য মন্ত্রীদের সামনে আমি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করতে চাই। আমি এই রাজত্বে উপযুক্ত রাজারূপে বিভীষণকে অধিষ্ঠিত করতে চাই। তিনি মহান, বুদ্ধিমান, উপযুক্ত উত্তরাধিকার এই রাজত্বের। এই সিংহাসন তাকে দেওয়া হল।’

মন্দোদরী রামের দিকে তাকায় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের জন্য। আপনি কী দেখতে পাচ্ছেন না তার সাথে এক ছাদের তলায় থাকা কোনভাবেই সম্ভব না। আপনি তাকে এই রাজত্বের ভার দিতে চাইছেন! আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান রাম। আপনার কী মনে হয় যে তিনি রাবণের পাদুকার যোগ্য? আমাদের প্রজা কোনভাবেই তাকে রাজা হিসেবে স্বীকার করবে না। সভাসদরা মানবে না তাকে। তিনি আমাদের ঠকিয়েছেন।’

‘চিন্তা করুন নিরপেক্ষভাবে দেবী। বিভীষণ আমাদের সাথে যোগদান করেছেন কারণ তিনি মনে করতেন রাবণ সঠিক কাজ করছেন না। আমার সাথে এই রাজত্বের ভার তার অধিকারে আসে। আমি এই ভার তার উপর অর্পণ করতে চাই। আমি চাই আপনাদের থেকে কেউ এই সিংহাসনে বসুক।’ রাম জানান।

লক্ষ্মণ আরো বলেন, ‘আপনি যদি আপনার এই সিদ্ধান্তকে বদলান তবে আপনারও বিভীষণকে যোগ্য মনে হবে। বিভীষণ লঙ্কার উপযুক্ত রাজা। তিনি কীভাবে প্রতারণা করেছেন?’

‘আপনি আপনার দিক সঠিকভাবে প্রমাণ করেছেন রাম, কিন্তু আমাদের প্রজা কোনভাবেই তাকে মেনে নেবে না...’ মন্দোদরী বোঝানোর চেষ্টা করে।

‘হ্যাঁ আমি সম্মত হলাম। আপনার সিদ্ধান্ত নানাশ্রীর সাথে আলোচনা করেছি। আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি শুধুমাত্র আপনি এবং আপনার সাথে বিভীষণ থাকলে প্রজাগণ মেনে নেবেন। লঙ্কার প্রয়োজন রাজা। এক্ষেত্রে আপনি বিভীষণকে বিবাহ করলেই রাজা এবং রানি দুই পাবে লঙ্কা।’

মন্দোদরী রামের প্রস্তাব বুঝতে পারে। বিভীষণ, নানাশ্রী, মহাপ্রসভ এবং মন্ত্রিসভার সবাই রানির দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘আপনার মধ্যে কোন নৈতিকতা নেই? আপনি কীভাবে এমন বিষয়ে ভাবতে পারলেন? এবং আপনারা কী মনে করেন এটা কি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে!’

‘আমি বুঝতে পারছি রানি মন্দোদরী, কিন্তু এছাড়া আর কোন উপায় দেখিনা। আমি এই সিংহাসনের রক্ষাকর্তা। আমি আমার শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়ার চেষ্টা করব এই সিংহাসনকে রক্ষা করতে। আমার উদ্দেশ্যে হল লঙ্কায় এক স্থায়ী, শান্তিপূর্ণ উত্তরাধিকার দেওয়ার।’ নানাশ্রী বলেন।

‘আমারও তাই চাই কিন্তু অন্য পদ্ধতিতে। আমি কোনদিনই বিভীষণকে বিবাহ করতে পারব না। তিনি কোনওদিনই আমার স্বামী কিংবা লঙ্কার রাজা হতে পারবেন না।’ মন্দোদরী জানায়।

মন্দোদরী নিজেকে সবকিছু থেকে দূরে রাখে কিছুদিন। লঙ্কার সবাই দশানন এবং তাকে চোখে হারায়। মন্দোদরীও হারায় প্রজাদের। সে ভাবতে থাকে কী ভাবে সামলে রাখা যায়। তার জানা ছিল না কি করা উচিৎ। এই ভাবে বারো দিন পর বিভীষণ অনুরোধ করে তার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য। মন্দোদরী অস্বীকার করে। কিন্তু বারংবার অনুরোধের ফলে মন্দোদরী সাক্ষাৎ করতে রাজী হয়। মন্দোদরী তাকে বারান্দায় অপেক্ষা করতে দেখে। মন্দোদরী সামনে যেতেই বিভীষণ আগের মত ব্যবহার করার চেষ্টা করে। যেন কোনো পরিবর্তন হয়নি। মন্দোদরী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় সে যা বলবে না পালন করার জন্য।

‘আমি খুব পরিষ্কারভাবে জানাতে চাই, আমি কোনভাবেই আপনার সান্নিধ্য চাই না। আপনি নতুন কিছু কি বলতে চান?’

‘রানি মন্দোদরী কালই শোকজ্ঞাপনের শেষ দিন। আমি আপনার কাছে এসেছি আপনার সিদ্ধান্ত জানার জন্য।’ বিভীষণ জানায়। মন্দোদরী লক্ষ্য করে বিভীষণ এখন আর তার সাথে বৌদি রূপে কথা বলে না।

‘আপনার বিশ্বাসঘাতকতা ভোলার নয়। আপনি আপনার ভ্রাতার সাথে সঠিক করেননি এবং আমি বিস্মিত যে আপনার মধ্যে তাই নিয়ে কোনো অপরাধবোধ নেই আপনি যা করেছেন।’

‘আমি কেন অপরাধবোধে ভুগব যখন আমি জানি আমি কোন অন্যায় করিনি। আমি বহুবার দশাননকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছি। তাঁর অপদার্থতা, একগুয়েমি আমাদের রাজত্বকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। যার পরিণতি আপনি দেখতে পাচ্ছেন।’

‘তাঁর করা ভুলগুলোর জন্য আজ আমাদের এই দিন দেখতে হচ্ছে। আমি সহমত আপনার সাথে। তিনি একগুঁয়ে ছিলেন কিন্তু তার এই একগুঁয়েমির জন্য আজ এত উন্নতি হয়েছে লঙ্কায়।’

‘একজন নারীকে অপহরণ করে আনা হয়েছে তার স্বামীর থেকে আলাদা করা... এটা কী একটা রাজ্যের জন্য সঠিক হয়েছে? আমরা যার জন্য যুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছি এবং ভারত দশানন আমাদের মধ্যে নেই। লঙ্কা আজকের দিনে পরাজিত রাজ্য। তারা আমাদের এই সুযোগ দিয়েছেন কারণ সীতাকে উদ্ধার করেছেন।’

যথেষ্ট হয়েছে। আর কত ছোট করবেন আপনি আপনার ভ্রাতাকে? আপনি কী ভুলে গেছেন আপনার ভগিনীর সাথে লক্ষ্মণ কী করেছেন এবং আমাদের লোকদের হত্যা করেছেন। আপনি কীভাবে এমন অহঙ্কারী হতে পারলেন? আপনি তাদের জন্য কী ন্যায় দিতে পারলেন?

‘যদি তিনি সঠিক করতেন তবে কী আজ এই দিন আসত?’

মন্দোদরী তার কোন উত্তর দেয় না।

‘আমরা যদি একে অন্যকে দোষারোপ করি তবে কি সমস্যা সমাধান হবে। আমি বলতে চেয়েছি আমার ভ্রাতা কিছু ভুল করার জন্য আজ এই পরিস্থিতি এসেছে। আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি এবং আমি আপনার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। তবে আপনি কেন আমার সিদ্ধান্ত মানছেন না আপনি কেন আমাকে গ্রহণ করতে পারছেন না?’

মন্দোদরী নির্বাক।

‘মাঝে মাঝে ভাবি আমি যদি তার পাশে থাকতাম তবে যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে আমি মারা যেতাম আমি বিরোধী পক্ষ নিয়েছি কারণ আমি বুদ্ধিমান এবং সে কারণে আজ সিংহাসনের দাবীদার।’

‘তারা জিততে পেরেছে, কারণ আপনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন আপনার ভ্রাতার সাথে। দশানন সর্বদা আপনাকে বিশ্বাস করতেন আপনি তাকে বঞ্চিত করলেন। তারা জিততে পেরেছে কারণ লঙ্কার প্রতিটি প্রবেশপথে আপনি জানেন, প্রত্যেক সেনাপ্রধান এবং যুদ্ধের কৌশল। আপনি তাদেরকে সাবধান করেছেন নিকুম্ভের যজ্ঞের বিষয়ে এবং অবশ্যই বলেছেন দশাননের দুর্বল অংশের কথা।’ সব শুনে বিভীষণ স্তব্ধ হয়ে যায়। মন্দোদরী আবার প্রশ্ন করে, ‘আপনি কী মনে করেন রাম এবং লক্ষ্মণ এই যুদ্ধে টিকে থাকতে পারতেন যদি না আপনি সমস্ত কিছু তাদের না জানাতেন? আপনি একমাত্র ছায়া ছিলেন, তার ইচ্ছা ছিল আপনার আজ্ঞা ... আপনি এতটা নিষ্ঠুর কীভাবে হলেন? আপনি অত্যন্ত উদার মানসিকতা ছিলেন, আপনি রাজত্বের জন্য এমন করলেন!’

তিনি পুরো কথাগুলো যেন গিলে ফেললেন।

‘আমি কখনোই নিষ্ঠুর ছিলাম না কিন্তু সেই সময় তিনি নিষ্ঠুর ছিলেন। আমি তাকে দোষারোপ করছি না। তিনি তো সাধারণ ভ্রাতা ছিলেন না, আমার সিংহাসনের দাবি ছিল না। কিন্তু আমি এখন এটা চাই। আমি তার রাজত্বে এখন নিজের হাতে নিতে চাই।’

বিভীষণ সিংহাসনের দিকে আরও একধাপ এগিয়ে চলে, ‘আগেও বলেছি এই মতবিরোধ কখনোই থামবে না। আমাদের রাজত্বে এক রাজার খুব প্রয়োজন আপনি কোনোভাবেই একা শাসন করতে পারবেন না এবং আমি বিষয়ে আপনার একান্ত সহযোগিতা চাই। যা কিছু বিনষ্ট হয়েছে তা আমরা দুজনে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করব। আমি কোন ভুল কিছু করছি না এবং সেই কারণে আমি বারংবার আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। আমি বিবাহিত তবু আমি আপনাকে বিবাহ করতে চাইছি। আপনি সম্মত হন এবং তাতেই আমাদের প্রজাদের মঙ্গল।’

তিনি যাবার আগে একটা গোল করে পাকানো কাগজ মন্দোদরী হাতে দিয়ে যান, ‘আমি যাবার আগে এটা আপনাকে দিয়ে গেলাম। এর মধ্যে আমাদের বিবাহের সকল শর্ত লেখা আছে। এটি বিবাহ চুক্তিপত্র। আপনি দয়া করে প্রস্তাব গ্রহণ করুন এবং আপনি যদি রাজি হন তবে এটি বন্ধ করে পাঠাবেন আমার কাছে।’

মন্দোদরীর সম্মুখে অনেক প্রশ্ন উপস্থিত। একদিকে লঙ্কার প্রজা অপরদিকে দশাননের প্রতি ভালোবাসা, নিষ্ঠা। সে কী করবে জানে না। তার পক্ষে বিভীষণকে স্বামী রূপে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। বিভীষণকে দেখলে মন্দোদরীর তঞ্চক মনে হয় যিনি তার ভ্রাতাকে ঠকিয়েছেন। তখনই মন্দোদরী ব্রহ্মার দ্বারস্থ হয়।

ব্রহ্মার বরে - বিভীষণ আমার কাছে একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছেন। আমি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি প্রাথমিকভাবে। কিন্তু এখন কি করবো ভাবছি। আমাকে উত্তর দেওয়া উচিত সেই কারণে আমি আপনার দিকে তাকিয়ে আছি।

‘এই যুদ্ধ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এক মহান নেতা মৃত হয়েছেন। আপনাকে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে হবে বহু বছর পর। আমি এই সিংহাসনে আপনাকে দেখতে চাই। আপনাকে বয়সের থেকে অনেক বৃদ্ধা লাগছে।’

আপনার ভবিষ্যত বাণী কী? এর অস্পষ্টতা আমাকে নির্যাতিত করছে। বিভীষণের প্রস্তাব কী মানা উচিত?

এইভাবে তেরো দিন অতিক্রান্ত হয়। লঙ্কা অপেক্ষা করে নতুন রাজার জন্য। রাম কোনভাবে বিভীষণকে সে পদে অধিষ্ঠিত হতে পারে না কারণ প্রজাদের সম্মতি নেই বলে। মন্ত্রীগণ অপেক্ষা করে মন্দোদরী সিদ্ধান্তের জন্য। মন্দোদরীর মনে পড়ে যায় দশাননের শেষ ইচ্ছার কথা। সে মনস্থির করে। তারা বিবাহ করবেন একটি ছোট্ট অনুষ্ঠানের দ্বারা। সরমা উপস্থিত ছিলেন। মন্দোদরী তাকে দেখতে পায়নি দশাননের অন্তোষ্টি ক্রিয়ার সময়ও। নানাশ্রী মন্দোদরীর সিদ্ধান্তে খুশি হয়। এই অনুষ্ঠান অনেক কিছু মনে করিয়ে দেয় মন্দোদরীকে। সেই সব স্মৃতির সাথেও যেন যুদ্ধ করে সে।

এই বিবাহ একপ্রকার রাজনৈতিক। দশাননের অন্য পত্নীদের কথা মনে পড়ে তার। তারা এই সিদ্ধান্তে হাসাহাসি করে, মানতেই চায় না যে তারা এই বিবাহ করতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রথমবার মনে হয় মন্দোদরী সে আগে রানি পরে স্ত্রী। এড়িয়ে চলে সেইসব নারীদের যারা বিভীষণের সাথে বিবাহের কারণে ভ্রূ-কুঞ্চিত করে। তারা কোন সম্মান জানায় না রানিকে। অনুষ্ঠান হয় নিকট আত্মীয় পরিজন মন্ত্রীদের মধ্যেই।

দশাননের মৃত্যুর ষোলো দিনের মাথায় রাম বিভীষণকে রাজা নির্বাচিত করেন। কেউ কোন ভোজের আয়োজন করে না এবং কেউ কোনো উৎসবে মেতে ওঠে না। বিভীষণের মাথায় দশমাথার মুকুট পরানো হয় যা, দশাননের ছিল একসময়। তিনি সিংহাসনে বসেন এবং হনুমানের জন্য একটি স্থান নির্বাচন করা হয়। সবকিছু আবার নতুনভাবে শুরু হয়। ব্রহ্মার বর রামের দ্বারা বাস্তবে পরিণত হয়।

‘বিভীষণের রাজত্বে শান্তির বাতাবরণ দেখা যায় এবং ন্যায়পরায়ণতা বিরাজ করে।’

রাজত্বের প্রথম দিন বিভীষণ সীতাকে ফিরিয়ে দেয় রামের কাছে। মন্দোদরী দেখে তাদের বারান্দায় একসাথে দশাননের প্রাসাদে। বানররা আনন্দিত হয়, মন্দোদরী সুখী হয় সীতার জন্য। তার দুঃখ এতদিনে প্রশমিত হল, তাকে বিদায় জানানো হয় আড়ম্বরে। অশোকবন ছেড়ে দেওয়ার আগে সীতা আসে মন্দোদরীর সাথে শেষ দেখা করতে। ত্রিজাতার জন্য সীতার খুব কষ্ট হয়, সে তার মায়ের মত হয়ে উঠেছিল এই কয়দিনে। মন্দোদরীর হৃদয় আরো একবার শূন্য হয়।

মন্দোদরী শেষবারের মতো তার মেয়েকে দেখতে কাতর হয়। দরজার বাইরে সাক্ষাৎ করতে কিছুটা ইতস্তত হয় সে।

‘রানি মন্দোদরী, যাবার আগে শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করতে চাই আপনার সাথে। আমি যা বলেছি আপনাকে তা সব ভুলে যাবেন। আপনার এই উদারতা, মহত্ত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাই।’

‘আমি খুবই আনন্দিত। ঈশ্বর আপনার ভালো করুক।’

‘আপনি খুবই পবিত্র এবং প্রতিভাবান নারী।’

‘এইসব কথা বলার আর কোন প্রয়োজন নেই। আমি সবই ভুলে গেছি সীতা। আশীর্বাদ করি আপনার সুখী দাম্পত্যের।’

‘আমরা এখন অযোধ্যার দিকে রওনা হব। আমাদের বনবাস সমাপ্ত। আমি আপনাকে আমন্ত্রণ করতে চাই দয়া করে আসবেন কিছুদিন পর।’

মন্দোদরী সম্মতি জানায়। সীতা পায়ের ধুলো নেয় এবং মন্দোদরী শেষবারের মতো স্পর্শ করে। তার কাঁধে হাত দিয়ে প্রথমবার জড়িয়ে ধরে। আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারলাম না। শুধু কান্না দিয়ে গেলাম। তাকে বিদায় জানিয়ে মন্দোদরী কক্ষে ফিরে আসে।

বিভীষণ এবং তার মন্ত্রিসভার সবাই রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, সুগ্রীব অঙ্গদ এবং আরো অনেক বাহিনীর নেতা সবাইকে নিয়ে বিমানস্থলে রওনা দেয়। তিনি তাদের পুষ্পক বিমানে করে সমুদ্র পার করে দিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে মন্দোদরী'র দাসীরা জানায় সীতাকে অগ্নি পরীক্ষা দিতে হয়েছিল সতীত্ব প্রমাণ করার জন্য। লঙ্কায় থাকার ফলে তার পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন করেন এবং রাম তার পবিত্রতা প্রমাণ করতে বলেন। তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে সংশয়ে থাকেন। মন্দোদরী রামকে অভিশাপ দেয় তিনি তার স্ত্রীকে বিশ্বাস করতে পারলেন না বলে। মন্দোদরী সব শুনে ক্রুদ্ধ হয় কিন্তু কিছু করার থাকে না।

সীতা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং তারা বিমানে চলে যায়। কিছুদিন পর আমন্ত্রণ আসে রাম রাজা হবার অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য। মন্দোদরী সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু বিভীষণ কিছু মন্ত্রী নিয়ে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যায়।

সকল অধ্যায়
১.
অহল্যা, দ্রৌপদী, সীতা, তারা, মন্দোদরীপঞ্চসতীর প্রতি নিবেদন
২.
সূচনা
৩.
বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী
৪.
বিবাহ পর্যায়ে মন্দোদরী
৫.
দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ ও মন্দোদরী কথা
৬.
বজ্রজলা ও মন্দোদরী
৭.
অমৃতের সন্ধানে দশানন ও তার প্রতিক্রিয়ায় মন্দোদরী
৮.
দশানন, বালী ও মন্দোদরী
৯.
মহান্ত, মাতা কৈকেসী ও মন্দোদরী
১০.
মন্দোদরী ও ঋষি ঘৃতস্মদা
১১.
আত্মশ্লাঘা ও মন্দোদরী
১২.
জীবন সন্ধিক্ষণে মন্দোদরী
১৩.
মন্দোদরী ও দশানন
১৪.
মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ
১৫.
মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন
১৬.
যোদ্ধা মেঘনাদ
১৭.
মেঘনাদের বিবাহ ও মন্দোদরী
১৮.
দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী
১৯.
সীতা হরণ ও মন্দোদরী
২০.
বানর ও লঙ্কা
২১.
অহিরাবণ
২২.
যুদ্ধে মেঘনাথ ও মন্দোদরী
২৩.
লঙ্কার রানি মন্দোদরী
২৪.
ফিরে দেখা
২৫.
ঋণ স্বীকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%