পারমিতা চক্রবর্তী
দশানন আবার ফিরে আসার সময় হয় নববধূকে নিয়ে। মন্দোদরীকে যা যা উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তা পালন করে মন্দোদরী। নববধূ থাকার ব্যবস্থা, দাসী, বিবাহের পাত্রী পোশাক সব আয়োজন প্রস্তুত করে রাখে। দশাননের সভাসদ ঘোষণা করে বিমান আসবে কিছু সময়ের মধ্যেই এবং সবাই সেই স্থানে উপস্থিত হয় নতুন বধূকে অভ্যর্থনা করার জন্য। সরমা খুব উৎসাহ নিয়ে সমস্ত প্রথা, কর্তব্য পালন করে। তিনি জানতেন মন্দোদরী কোনমতেই অনুষ্ঠানে থাকবে না। মন্দোদরীর পক্ষে কোনো ভাবেই সম্ভব নয় তার স্বামীর নতুন স্ত্রীকে অভ্যর্থনা করার। নানা উপায় মন্দোদরী চেষ্টা করে সেই স্থান থেকে কিভাবে দ্রুত বেরানো যায়।
লঙ্কার প্রত্যেককে অপেক্ষা করছিল বিমান নিচে অবতরণের জন্য। বিমান অবতরণের সাথে সাথে চিৎকার ওঠে। সব রক্ষীরা বেরিয়ে আসে বাইরে। দশাননের সাথে সাথে নিয়ে তারপর আসেন মন্ত্রীদের ও তার স্ত্রী, মাতা কৈকেসী ও নানাশ্রী। মন্দোদরী নিজেকে লুকিয়ে রাখে খোলসের মধ্যে। সে নিজেই বুঝতে পারেনা তার এরূপ মনোভাবের কারণ কি শুধু হিংসা নাকি উৎকণ্ঠা! নববধূর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন দশানন একে একে মাতা, নানাশ্রীর সাথে।
মন্দোদরী দিকে ফিরে তাকায় নববধূ। তার দিকে মৃদু দৃষ্টিতে উদ্দীপ্তভাবে তাকিয়ে থাকে এবং মন্দোদরীকে দেখে সম্মান প্রদর্শন করে। রানির মনে কতটা কষ্ট হলো তা নিয়ে কারোর কোনো চিন্তা নেই। মন্দোদরী কোনোভাবেই ভুলতে পারেনা তার স্বামীর কারণে এক নারী আগুনে মৃত্যুবরণ করেছে।
‘আমি অভ্যর্থনা জানাই আমাদের রাজত্বে।’ মন্দোদরী নিজের হৃদয় উন্মুক্ত করে বলে ‘বৌদি সরমা আপনাকে আপনার কক্ষে নিয়ে যাবেন।’ সেই সময় মন্দোদরীর হাত দুটো মাথায় নিয়ে বলে, ‘ধন্যবাদ আপনাকে আমাকে গ্রহণ করার জন্য। আমি আপনার সম্পর্কে অনেক শুনেছি।’ খুব সুন্দর সার্টিন কাপড় পরিহিত নবদম্পতি তার মাথায় টায়রা তাদের রাজবংশের চিহ্ন আঁকা, গায়ের রং ফর্সা চুল, ঘন কুচকুচে এবং নিতম্ব সোজা। সরমা তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে মুগ্ধ হয় এবং তাঁকে তাঁর কক্ষে নিয়ে যায়, ‘আপনার নাম কী?’ প্রশ্ন করে।
‘বৌদি সরমা তিনি দুধের মত সাদা, গভীর অরণ্যে যেন হরিণীর মতো সুন্দর। সে খুবই আকর্ষনীয় এবং তার থেকে চোখ ফেরানো সম্ভব না। আমি তার নাম দিলাম ন্যায়নন্দিনী। দশানন ঘোষণা করেন এবং সবাইকে এই সংবাদ দিতে আদেশ দেন।
‘খুব ভাল বলেছেন আমি এখন আপনার আদেশ মত তাকে নিয়ে যাচ্ছি নিজ কক্ষে।’ সরমা দশাননের দিকে তাকিয়ে বলে কয়েক মুহূর্তের জন্য। মন্দোদরী ভাবে এই মুহূর্তে তার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা। মন্দোদরী নিজের ঘরের দিকে চলে যাবে স্থির করে কারণ সেই স্থানে তার কোন কার্যকারিতা নেই। মন্দোদরী দশানন এবং নানাশ্রীর সাথে কথা বলতে পারেনা। মন্দোদরীর আশেপাশে যারা ছিল তারাও ফিরে তাকায় না তার দিকে। মাতা কৈকেসী ছিল না সেখানে যে মন্দোদরী কিছুটা সময় কাটাবে তার সাথে অথবা রাজদরবারে যাবে। মন্দোদরী তাকিয়ে থাকে বাগানের দিকে যেখানে দশাননের কক্ষ অবস্থিত। সেখানে কিছুক্ষণ প্রতীক্ষা করে এবং ফিরে আসে। তার আচরণের জন্য ক্ষমা চাইতে যায়। মন্দোদরী খুব একাকী হয়ে যায় এবং সেই সময় তার সাথে কথা বলার মত কেউ থাকে না।
‘আপনি কি কোনো সঙ্গী খুঁজছেন রানি মন্দোদরী?’
মন্দোদরী তাকায় কিন্তু কাউকেই দেখতে পায় না সে মুহূর্তে।
পর মুহূর্তে ‘আপনার এখানে কী দরকার ঋষি মুনি?’ প্রশ্ন করে।
‘কিছুই না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনি কারো সঙ্গ খুঁজছেন। আপনাকে দেখতে খুব বিমর্ষ লাগছে। এটা কি আপনার স্বামীর নতুন সঙ্গী নিয়ে আসার কারণ? প্রশ্ন করেন ঋষি ঘৃতস্মদা।
আপনি যেহেতু ঋষি তাই আমাদের রাজত্বে নিয়ম-কানুন জানেন না। আপনি আমাদের অতিথি আমি আশা করব আপনার থেকে উপযুক্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান পেতে রানি রূপে। মন্দোদরী কিছুটা রেগে যায় আমি কিন্তু অন্যায় করিনি। আমি একজন মেয়েকে নারীতে রূপান্তর হতে দেখেছি। আপনি নিশ্চয়ই আমাকে দেখেছেন কিন্তু অবশ্যই আমাকে চিনতে পারছেন না। আমি কী করে জানব না মন্দোদরী! আপনি এখনো লুকাতে শেখেননি। সত্যি যে আপনি আপনার স্বামীর অন্য বিবাহ ও সম্পর্কের দ্বারা বিব্রত আছেন। আপনি এমন একজনকে বিয়ে করেছেন যে খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং আপনার উপস্থিতি তার কাছে এবং তাঁর রাজত্বের কাছে কিছুই যায় আসে না।
ঋষির কথাগুলো আরো ক্রোধ বাড়িয়ে দেয় মন্দোদরীর।
‘আপনি প্রকৃতস্থ হন এবং নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখুন। আপনার জীবনের কাছে অত্যন্ত দামি হতে পারে এই কথাগুলো।’
‘আমার জীবনের মূল্য মন্দোদরী? সত্যি কথা বললে অথবা মহান রাবণ একজন ঋষিকে কোন সুযোগ দেবেন না। এটা রাবণের অহংবোধ ছাড়া আর কী?’
‘শুনুন মন দিয়ে ঋষি আমি কিন্তু আমার স্বামীর অন্যান্য সম্পর্ক গুলোকে গ্রহণ করেনি কিন্তু আমি তার সম্পর্কে অন্য কোনোরকম কথা শুনতে প্রস্তুত নই।’ এ কথা বলতেই ঋষি চলে যান। সেদিন সকলকে এড়িয়েই চলে মন্দোদরী।
সে নিজে প্রাসাদে থাকে এবং কাউকে সহ্য করতে পারেনা যে কিনা দশাননের সম্পর্কে বিরুদ্ধে কোনো কথা বলবে। যদি একজন বহিরাগত যেমন ঘৃতস্মদা তার মস্তিষ্ককে বিচলিত করতে পারে তাহলে অন্তরমহলের দাসীদের অন্য ধরনের গল্প কে কিভাবে নেবে মন্দোদরী ভেবে পায়না। প্রায় প্রত্যেকেই রাজার ভোজে অংশগ্রহণ করেছে। মন্দোদরীর কিছুটা সময় কাটাবে দাসীদের সাথে ঠিক করে।
মন্দোদরী শুনছে দাসীদের নালিশ, শাশুড়ি মাতার কাছে বিভিন্ন প্রকার বাচ্চাদের নিয়ে গল্প এবং দাসীদের স্বামীর সাথে বিভিন্ন প্রকার সমস্যা নিয়ে কথা।
এরমধ্যে রক্ষীরা ঘোষণা করেন দশাননের আগমন সংবাদ। মন্দোদরী দাসীরা তার কক্ষ ত্যাগ করে। মন্দোদরী অপেক্ষা করে দশাননের আগমনের জন্য। সে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং মনে মনে স্থির করে যে এবার তার স্বামীর সাথে কোন বিষয় নিয়ে বিবাদে জড়াবে না। শেষবার তার সাথে কথোপকথনের স্মৃতি জলজল করে।
‘স্বাগত প্রভু আমি খুব অবাক হয়েছে আপনাকে দেখে। সঠিকভাবে উৎসব হয়েছে তো?’
‘আমি তোমাকে প্রত্যাশা করেছি সেখানে। এখানে না।’
‘ক্ষমা করবেন লঙ্কেশ্বর আমি ভেবেছি এটা আপনার বিবাহকালীন রাত্রিযাপন ও আপনার নতুন স্ত্রীকে উপলক্ষ করে উৎসব। আমি চাই না তিনি আমাকে দেখে কোনভাবেই অস্বস্তিতে পড়ুক।’ মন্দোদরী বর্ণনা করে দশানন তাকিয়ে থাকে এবং মন্দোদরীই জানে যে দশানন তার কোন অজুহাতই শুনবে না।
‘তুমি জানো এই উৎসব নতুন শান্তি ও সন্ধির জন্য এবং সেই রাজকন্যা এই উৎসবের একটি অংশ। তুমি এই রাজত্বের রানি। তুমি কি বহিরাগত? আমি অবাক হচ্ছি যে তোমাকে এই কথা বোঝাতে হচ্ছে ভেবে। তুমি তোমার কর্তব্য সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। এটি শুধুমাত্র সমঝোতা হয়েছে রাজ্যের সাথে যা তোমাকেও পালন করতে হবে। এটা কোন বড় ব্যাপার না। তুমি ভেবো যে এই সমঝোতা হয়েছে এক নারীর সাথে যার স্বামী তোমার স্বামী।’
‘আমি ইহা করতেই পারি কিন্তু আমার পক্ষে এটা সহজ নয়। আপনার পাশে অন্য নারীকে দেখা।’
‘খুব ভালো তাহলে আমি তোমাকে বলবো আমার পাশে আরো শক্ত হয়ে দাঁড়াতে। অন্য নারী আসবে যাবে আমি বিশ্বাস করি আমার হৃদয়ে তোমার স্থান সুরক্ষিত ঠিক যেমন আমার রাজ্য সুরক্ষিত।’
‘এটা সত্যিই কষ্টসাধ্য আমার কাছে লঙ্কেশ। আমি যতই চেষ্টা করিনা কেন পরাজিত হব। তুমি জানো প্রায় একশোর অধিক নারী বসবাস করে অন্তঃপুরে আমার সাথে এক শয্যা ব্যবহার করে। তুমি রানি হিসাবে ভাবো স্ত্রীরূপে নয়। কারণ এই ভাবে না ভাবলে তুমি পরাজিত হবে। আমি চাই তুমি সর্বদা আমার পাশে থাকো।’
‘আমি আমার চেষ্টা করব প্রভু যা কিছুই হোক আমার ভালোবাসা চিরন্তন হবে আপনার প্রতি আর পরাজিত হবো না।’
মন্দোদরী এবং দশানন সারারাত একসাথে কাটায়। মন্দোদরী দশাননের হাতে মাথায় রেখে ঘুমায়। সেই ব্যক্তিকে সে খুব ভালবাসে তার যে সমস্ত কিছু চলে গেছে এই চিন্তা ভাবনাগুলো দূরে সরিয়ে রাখে। যখন মন্দোদরী ওঠে ঘুম থেকে সকালে দেখে দশানন তার পাশে শুয়ে আছে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে ধরে। ঘটনাটি নববিবাহিত বধূর জন্য খুব খারাপ হয়েছে। বিয়ের প্রথম রাতে রাজকন্যার সাথে থাকার কথা ছিল তার স্বামীর। তার জন্য মনটা খুব খারাপ লাগায় ভরে ওঠে।
‘সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার আগে এবং আমাকে আগের মত অনুভব করানো যেন আমার জন্য প্রতীক্ষারত কেউ ...’ মন্দোদরী কিছুটা মজা করে দশাননের সাথে।
‘তুমি আমার জন্য প্রতীক্ষারত প্রিয়তমা। আমিও চাই তোমার প্রতিক্ষার পরিপূরক হতে চাই।’
নিজের বুকের কাছে নিয়ে নেন মন্দোদরীকে। তার পুরানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়।
‘প্রিয় প্রভু রাজকন্যা কাল রাত থেকে আপনার জন্য প্রতীক্ষারত। আমি আশা করব আপনার ব্যবহার এমন হওয়া উচিত হবে না যাতে কেউ আঘাত পাবে।’
‘তুমি তার জন্য কেন এত ভাবছো?’ দশানন প্রশ্ন করেন।
‘আমি কখনোই চাইনা আমি স্ত্রীর অধিকার নিয়ে চিন্তিত কথা সে ভাবুক। আমাকে যেন সে তার প্রতিপক্ষ না ভাবে।’
‘অন্তঃপুরে কেউ কী তোমায় প্রতিপক্ষ ভাবে অথবা সেই জায়গায় পরিবর্তিত হতে পারে এমন জায়গা কী এসেছে?’
‘তেমন কোন বিষয় না প্রভু। ধন্যমালিনী আমার থেকেও ছোট কিন্তু সে আমার থেকে অনেক পরিণত। কিছু কিছু ব্যাপারে তার সাথে ও কিন্তু সঠিক করছেন না প্রভু। তাকেও কিন্তু আজকাল খুব ভালো দেখায় না।’
‘ইহাই সব থেকে আশ্চর্যজনক আমার গোটা জীবনে।’
যদি আপনি আজ্ঞা দেন আরো আশ্চর্যজনক ঘটনা বিবৃতি করতে আমাকে অন্তঃপুরে অন্যান্য মহিলাদের ব্যাপারে। তাহলে আমি বলতে পারি।’ মন্দোদরী দশাননকে কিছুটা ব্যঙ্গ করেন।
‘আমি কখনোই চাইনা অন্য কারোর ব্যাপারে আলোচনা করতে মন্দোদরী। তুমি কি জানো আমি কি চাই। আমি চাই তোমার এক সন্তান হোক। প্রথমত আমি চাই তোমার একটি কন্যা সন্তান হোক যে তোমার মতো সুন্দরী এবং তোমার মত ক্ষমা করবে আমাকে।’
‘আমি তো জানতাম না প্রভু আপনি কন্যা সন্তান প্রত্যাশা করেন।’
‘আমি একটি মেয়ে চাই মন্দোদরী। আমি জানি আমি রাক্ষস এক মিনিটের জন্য কোন ব্রাহ্মণকে হত্যা করার দ্বন্দ্বে ভুগবো না। আমাকে সবাই অহংকারী, স্বার্থপর, বিশ্বাসঘাতক বলে জানে এবং তার জন্য আমি গর্বিত। আমি একজন অসৎ চরিত্র, লোভী এবং পাপী ব্যক্তি। কিন্তু আমার কন্যা হবে আমার গর্ব। আমি তার জন্য গোটা পৃথিবী জয় করব। আমি তার সমস্ত স্বপ্ন পূরণ করবো। আমি তাকে সমস্ত শক্র’র থেকে রক্ষা করব।’
মন্দোদরী দশাননকে দেখে এবং তার কথা শুনে খুব খুশি হয়। কোন মানুষ দশাননের এই রূপের কথা ভাবতেই পারবে। মন্দোদরী নিজেও ভাবতে পারিনি দশাননের এরূপ ভাবনার কথা। দশাননের সন্তান নিয়ে এ রূপ ভাবনার কথাতেই মন্দোদরী আরো উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। সে মনে মনে ভাবে তাদের বিয়ে অনেকদিন হলো কিন্তু সন্তানের কথা ভাবা হয়নি। এই সময়টি উপযুক্ত দশাননে সন্তানের জন্য। মন্দোদরীর সমস্ত চিন্তা ভাঙিয়ে প্রশ্ন করে, ‘তুমি কি বল এটা নিয়ে? তুমি ঠিক করো আমাদের সন্তানের নাম।’
‘কিন্তু প্রভু আমি ক্ষমা চাইছি এ ব্যাপারে। আমাকে একদিন সময় দেওয়া হোক, আমি মাতার সাথে দেখা করতে চাই।’
‘তুমি পরে ওনার সাথে দেখা করো আজ আমার সাথে থাকো।’
‘যদি এটা গুরুত্বপূর্ণ নয় তাহলে আমারও দেরি হবে একজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে। কিন্তু একটি চিন্তার ব্যাপার হলো এক অতিথি আমাদের সাথে আছেন এবং মাতা কৈকেসী চান আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করি সম্মান প্রদর্শনের জন্য।’
‘কে সেই অতিথি?’
‘মাতা কৈকেসী তার পরিচয় ব্যক্ত করেননি আমার কাছে। বেশ কিছুদিন ধরে ঋষি ঘৃতস্মদা আপনার প্রাসাদের গুপ্ত কক্ষে থাকছেন। আমি অবাক হলাম এটা দেখে আপনি এ ব্যাপারে কিছুই জানেন?’
মন্দোদরী হতবাক হয়ে পড়ে।
‘তুমি জানোই মন্দোদরী আমি এই অতিথি'র ব্যাপারে খুবই নিলিপ্ত এবং কেনই বা করব। যখন আমি জানি আমার রাজত্বে ব্রাহ্মণগণ আমাকে অর্ধ জারজ সন্তান বলে। তারা আমার মাতাকে এই বলেই চিহ্নিত করেন। আমার মাতা আমার মতামত ছাড়া এখানে তাকে থাকতে আদেশ দেন কীভাবে?’
‘ঋষি ঘৃতস্মদা সপ্তর্ষি পরিবারের এবং মাতা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আমাদের রাজ্যের উপর দিয়ে যাওয়ার সময়।’ কিন্তু দশাননের এই সংবাদ কোনভাবেই প্রভাবিত করতে পারে না।
‘যদি মাতা তাকে আমন্ত্রণ করতেন তাহলে তাকে তার নিজের দায়িত্বে রাখতেন। তিনি কেন লঙ্কার প্রাসাদে থাকবেন? তুমি লঙ্কা রানি হয়েও তার সাথে সাক্ষাৎ করছ কেন ব্যক্তিগতভাবে?’ দশানন রেগে গিয়ে চলে যাবার চেষ্টা করেন।
‘না প্রভু আমি তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে যাইনি। আমি শুধুমাত্র আদেশ পালন করেছি মাত্র।’
‘তুমি মাতা কৈকেসীর থেকেই আদেশ পেয়েছ?’ দশানন চিৎকার করে ওঠেন।
‘আমি তোমাকে আবার মনে করাতে চাই মন্দোদরী তুমি কী রানি? যদি না তোমার ওনার সাথে কোন রকম ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে থাকে।’
‘প্রিয় প্রভু দয়া করে এভাবে বলবেন না। আমি শুধুমাত্র আজ্ঞা পালন করেছি। সে ক্ষেত্রে আমি তোমাকে এখন এখান থেকেই আদেশ দিচ্ছি তাকে এই স্থান ত্যাগ করতে বলার জন্য।’
‘কিন্তু এটা খুবই খারাপ দেখাবে যদি আমরা তাকে এমন হঠাৎ করেই স্থান পরিত্যাগ করতে বলি। তিনি তপস্যায় আছেন এবং আমরা তপস্যা থামিয়ে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারিনা।’
‘আমি চাই তিনি এখনি চলে যাক। আমি চাইনা আমার কোন ভূখণ্ডে ঋষি বসবাস করুক।’ দশানন একথা বলে চলে যান।
মন্দোদরী বিস্মিত হয় দশাননের ঘৃতস্মদা নিয়ে মনোভাব দেখে।
দশাননের আদেশ মতো মন্দোদরী সাক্ষাৎ করেন ঘৃতস্মদা সাথে। তিনি বলেন, তিনি এখানে আর বেশিদিন থাকতে পারবেন না, তিনি যাতে শীঘ্রই গন্তব্যস্থল খুঁজে পান এবং সেখানে তপস্যা সম্পন্ন করেন। ঘৃতস্মদা তখন তপস্যায় ছিলেন যখন মন্দোদরী প্রবেশ করে। তিনি বারান্দার মধ্যবিন্দুতে বসেছিলেন একই রকমের পাত্র নিয়ে যা তিনি আগেই চেয়েছিলেন। তিনি একটি মন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন চোখ বন্ধ করে। তার আশেপাশে কেউ প্রবেশ করছে এটা উপলব্ধি করা মাত্রই চোখ খুললেন।
‘আমি খুবই লজ্জিত আপনাকে বিরক্ত করার জন্য, কিন্তু আপনাকে আমি কিছু বলতে চাই।’
‘আমি একটি শান্ত জায়গা চেয়েছিলাম এই কারণে যে কেউ আমার তপস্যায় বাধা না দিতে পারে। আমার মনে হয় এই জায়গাটি তেমন নয়। রক্ষীদের সারাদিন পায়ের শব্দ পাওয়া যায়, দাসীরা এখানে আসেন।
‘আমার মনে হয় আপনি বুঝবেন না এটা রাজার প্রাসাদ তাই এই জায়গাটি সারাদিন ব্যস্ত থাকে। আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি। এখন আর আপনাকে নতুন করে কোনো অভিযোগ করতে হবে না কারণ আমি আপনাকে বলতে এসেছি অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করার জন্য, যেখানে আপনি শান্তিমত তপস্যা করতে পারবেন, মন্দোদরী ঋষিকে জানান।
‘সুতরাং আপনি কি চান আমি আপনাকে যেতে বলি নাকি লঙ্কেশ্বর আপনাকে বলবেন?’ মন্দোদরী মনে মনে ভাবে ঋষি বোধহয় আর উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করবেন না।
‘আমার মনে হয় আপনি যথাযোগ্য সম্মান পেয়েছেন এবং আপনাকে কোনরকম অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হবেনা।’
ঋষি হাসলেন, ‘আমি একজন নির্জনবাসী। আমার কোন প্রকার বিলাসের প্রয়োজন নেই যা এখানে আপনারা দিয়েছেন। আমি জানি আমার পদ্ধতি এবং শব্দ কোন ভাবেই আপনার ভালো লাগার কথা নয়। কারণ আমার হৃদয় যা মুখেও তাই। যাই হোক আমি চাই আমি এখান থেকে যাওয়ার আগে আমার তপস্যা সমাপ্ত করতে। সিদ্ধিলাভ কোনোভাবেই সম্ভব নয় আমি এখান থেকে চলে গেলে। আমি আপনার অনুমতি চাই আরো কিছুদিন এখানে থাকার জন্য।’
‘ক্ষমা করুন এটা সম্ভব নয় এবং সিদ্ধিলাভ কী এভাবে নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ?’
‘আমি একবার প্রার্থনা করার জন্য তপস্যা অনুশীলন করেছিলাম দেবী লক্ষ্মীর কাছে। তিনি একটি বড় পাত্র দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং বলেছিলেন এই বড় পাত্রটি এখানে রাখা হয়েছে আমার পরীক্ষার জন্য। পাত্রটি দুধ এবং ঘাসে পরিপূর্ণ এবং মন্ত্র দ্বারা শুদ্ধ, দেবী লক্ষ্মী এর মধ্যে বাস করবেন। আমি পাত্র থেকে একটি জীবন্ত ভ্রুণ একটি মহিলার গর্ভে স্থাপন করব। আমি তাকে আমার কন্যারূপে আমার কাছে আনবো এবং সে এই পৃথিবীর ভারসাম্য এনে দেবে। আমি কোনোভাবেই পাত্রটিকে এই পাত্রটিকে খোলা রাখতে পারবো না যদি এর মধ্যে কোন বিষাক্ত কিছু পড়ে।’
তখন আমি প্রার্থনা করেছিলাম যাতে আরো কিছু সপ্তাহ আমি থাকতে পারি তাতে পুরো পরীক্ষা সম্পন্ন হয় এবং সিদ্ধিলাভ হয়।
মন্দোদরী অসমর্থ হয়। ঘৃতস্মদা চোখের দিকে তাকায় অনেক প্রত্যাশা নিয়ে। ঋষি মুনির মধ্যে ভদ্রতা কম হলেও তিনি সৎ এবং একনিষ্ঠ তার নিজের প্রতি।
‘আমি এই মুহূর্তে আপনাকে কোন প্রতিজ্ঞা করতে পারছিনা। কিন্তু আমি লঙ্কেশ্বরের সাথে কথা বলবো যাতে আপনি আরো কিছুদিন থাকতে পারেন।’
মন্দোদরী নিজের মনের মধ্যে উৎগ্রীব হয় দশানন তাকে যে কাজ দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ করতে পারেনি, ভয় পায় যে এই বিষয়টি তাকে চিন্তায় ফেলবে যখন তিনি দেখবেন এখনও ঘৃতস্মদা প্রাসাদে থেকে গেছেন ।
সূর্যাস্ত হওয়ার পর দশানন যখন ফিরলেন তার দরবারে মন্দোদরী গোপনভাবে তার সাথে দেখা করেন। মন্দোদরী চায় ঘৃতস্মদা আরো কিছু সপ্তাহ এখানে থাকুক। দশানন তখন সোনার পানপাত্র নিয়ে একটি বিষয়ে গভীর চিন্তা করছিলেন ।
‘প্রিয় প্রভু আমি ইচ্ছা করে আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি। কিন্তু আমি একমুহূর্ত আপনার সাথে কথা বলতে পারি? মন্দোদরী কিছুটা ইতস্তত হয়ে প্রশ্ন করে।
‘তুমি আমাকে বিরক্ত করছ না কোনোভাবে। বল কি ব্যাপার?’
‘আপনার আদেশ মতো আমি ঋষি ঘৃতস্মদাকে বলেছি এই প্রাসাদ ত্যাগ করার জন্য এবং অন্য গন্তব্যস্থল খুঁজে নেওয়ার জন্য। কিন্তু...’
‘কিন্তু কী? তিনি যাচ্ছেন কিনা না?’
‘প্রভু তিনি একটি অনুরোধ করেছেন যাতে আরো কিছুদিন ওনাকে থাকতে দেওয়া হয়।’
দশানন আরও রেগে যান, ‘যদি ওই ঋষি কিছুদিন থাকতে চান তাহলে তিনি নিজে আমার কাছে বলতে পারতেন! কিন্তু আমি জানি তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না কারণ তার মধ্যে অহংকার এবং দাম্ভিকতা পরিপূর্ণ।’
‘প্রিয় প্রভু তিনি একজন তপস্বী। আমাদের কোন ক্ষতি হবে না তাকে আরো কিছু সপ্তাহ থাকার অনুমতি দিলে।’
‘আরো কিছু সপ্তাহ? আমি কোনভাবেই আমার রাজত্ব আর একটি দিনও থাকতে দিতে রাজী নই। তাকে ফেরৎ পাঠাও নাহলে মন্দোদরী আমি তাকে হত্যা করব আমার আদেশ অমান্য করার জন্য।’
‘আপনি হত্যা করার কথা কেন বলছেন? তিনি খুব বিনীতভাবে অনুরোধ করেছেন।’
তুমি কী ওনাকে জিজ্ঞাসা করতে ভয় পাচ্ছ? তুমি কেন ওনার জন্য এত কথা বলছ?’
দশানন খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে, ‘তুমি কী আমার কাছে কিছু লুকাতে চাইছ উত্তর দাও... কেন তাকে বাঁচাতে চাইছ?’
মন্দোদরী দশাননের ব্যবহারে আঘাত পায়। সে কোনভাবেই দশাননের থেকে এমন ব্যবহার প্রত্যাশা করে না।
ঘৃতস্মদার জীবন নিয়ে খুব ভীত হয় মন্দোদরী এবং বলে, ‘প্রিয় প্রভু তিনি অনুশীলন করছেন দেবী লক্ষ্মীর একটি কন্যা সন্তানের জন্য। তিনি একটি পরীক্ষার চেষ্টা করছেন একটি জীবন তৈরি করার চেষ্টা করছেন সিদ্ধির দ্বারা এবং আমি উপলব্ধি করেছি এটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোথাও যাবেন না। তিনি কিছু জিনিস সংরক্ষণ করে রেখেছেন একটি বড় পাত্রে এবং বলেছেন যাতে কেউ তাকে বিরক্ত না করে এবং তাকে কোথাও যেতে না হয়। আমার কোন ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য নেই কিন্তু অনুরোধ করব আপনাকে আপনি যাতে তার অনুরোধ মঞ্জুর করেন মানবিকতা কথা ভেবে।’
‘তোমাদের বোকা বানাচ্ছে। সেখানে পাত্রে কোন কিছু নেই। তিনি একজন গুপ্তচর এবং এসেছেন বাইরের কারোর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেখতে আমাদের ক্ষমতা। তিনি আমাদের গোপন বিষয়গুলো জেনে আমাদের শত্রুদের তথ্য সরবরাহ করবে এবং আমি এটা প্রমাণ করব। আমি প্রমাণ করব যে ওই পাত্রের মধ্যে কোন জীবন এবং পবিত্র কিছুই নেই।’ কথা শেষ হওয়া মাত্র দশানন শান্তি ভবনের দিকে যাত্রা শুরু করেন।
মন্দোদরী যথারীতি খুবই ভয় পায়। ঘৃতস্মদাকে মেরে ফেলার কথাগুলো মনে পড়ে। মন্দোদরী দৌড়ে যায় এবং রক্ষীদের অনুরোধ করে ডেকে পাঠাতে বিভীষণ এবং নানাশ্রীকে।
দশানন ঘরে প্রবেশ করে সেখানে ঘৃতস্মদা তপস্যা করছিলেন। দশানন চন্দ্রহাসের তরোয়াল টেনে বের করেন এবং ঋষির গলায় ঠেকিয়ে রাখেন।
‘কী করে আমার আদেশ অমান্য করেন? ভুলে যাবেন না আপনি আমার ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে আছেন।’
ঋষি একটুও ভয় পান না রাজার চিৎকারও ধমকানিতে।
‘আপনার মহিমা, আমি একজন ঋষি, যিনি শুধুমাত্র ঈশ্বরের আদেশ পালন করেন এবং আমি মুক্ত সারা পৃথিবীতে। আমি আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে, আপনার কাছে অনুরোধ করছি আমাকে কিছু সপ্তাহ এখানে থাকতে দেওয়ার জন্য।’
‘আপনি কিছুই নন শুধুমাত্র একজন স্বার্থপর এবং অহংকারী বুদ্ধিমান ব্যক্তি। আমি ঘৃণা করি রক্ত যা আপনার ধমনিতে বয়ে চলেছে। আমি চলে যাব আমার জায়গা থেকে। আপনি সিদ্ধান্ত নিন বেঁচে ফিরবেন না মৃত!
দশাননের চোখে যেন রক্ত দেখা যায়। মন্দোদরী আগেও দেখেছে দশানন রেগে গেলে নিজের মধ্যেই থাকেন না।
ঘৃতস্মদা উত্তর দেয়, ‘আপনি আমাকে অহংকারী বললেন। ভুলে যাবেন না সেই রক্ত আপনার শরীরে বইছে। আপনিও একজন ব্রাহ্মণ। আপনি ভুলে যাবেন না যে জিভ দিয়ে আমাকে স্বার্থপর বলেছেন আমি তার শিক্ষক। আপনি যা কিছু উপার্জন করছেন তা আমিই আপনাকে দিয়েছি এবং বেশি কিছু শিক্ষা যা পেয়েছেন আপনার জন্য যথেষ্ট নয়।
দশানন রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে তলোয়ার বের করেন। এক কোপে ঘৃতস্মদার গলা উড়িয়ে দেন ঘাড় থেকে। তার শরীর মাটিতে পড়ে থাকে রক্তাক্ত হয়ে। মন্দোদরীর জামাকাপড়ে রক্ত লাগে। মন্দোদরীর জ্ঞান যতক্ষণ পর্যন্ত ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত গোটা ঘটনার সাক্ষী ছিল সে। নানাশ্রী এবং বিভীষণ সেই স্থানে প্রবেশ করেন। তারাও এই দৃশ্য দেখে ব্যথিত হয়। দশানন চলে যাওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু মন্দোদরী আটকে রাখে তাকে।
‘কেন প্রভু আপনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন আমাকে আপনি কোন অসহায় মানুষের প্রাণ নেবেন না।’
‘তিনি অসহায় ছিলেন না। তিনি অমান্য করেছেন আমার আদেশ এবং আমাকে আঘাত করেছেন। তুমি কেন এত আঘাত পাচ্ছো? তুমি কোথায় দেখেছো তাকে?’
‘যথেষ্ট হয়েছে প্রভু। আপনি একজন ব্রাহ্মণের প্রাণ নিয়েছেন এবং আমার সতীত্ব নিয়ে কথা বলছেন। আপনার কৃতার্থ থাকা উচিত আমার প্রতি। আমি এখনও আপনার সাথে আছি।’
‘সত্যি প্রভু আমি কী বোঝাতে চেয়েছি আপনাকে? এক্ষেত্রে আপনি আমার জীবন নিয়ে নিতে পারতেন। আমি নিজেই নিজের জীবন আপনার হাতে তুলে দিতাম হাসতে হাসতে।’
মন্দোদরী সেই পাত্রটির কাছে পৌঁছয় এবং সবুজ অংশটি পান করে। দশানন বার বার বাধা দেন। মন্দোদরী কোন কথা না শুনে পান করেন এবং নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে সে যা দেখেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটিতে পড়ে যায়।
দশানন কী করবে বুঝতে পারে না।
রাগ, হিংসা আর তার রক্তে বয়ে চলেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এর থেকে তার মুক্তি নেই। নিজের স্ত্রীকে সন্দেহ করে সে। তাইতো প্রতি ঘরে ঘরে মন্দোদরী বেঁচে থাকে। জীবনের প্রতিমুহূর্তে এই চরিত্রকে দেখা যায়। আজকের সমাজ ব্যবস্থায় মন্দোদরীর মৃত্যু হয়নি। প্রতিনিয়ত তাকে সংগ্রাম চলে যেতে হচ্ছে ...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন