মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ

পারমিতা চক্রবর্তী

কক্ষের বাইরে বারান্দায় সুগন্ধি ফুল ফোটে। মন্দোদরী দাঁড়িয়ে থাকে বিছানার এককোণে। দূর থেকে সবুজ গাছের সৌন্দর্য, নীল আকাশের শোভা উপভোগ করে। মন্দোদরীর দাসী প্রবেশ করে কক্ষে চিকিৎসক যা নির্দেশ দিয়েছেন তা বারংবার জানানোর জন্য।

তাকে বেশ খুশি দেখায় মন্দোদরীর থেকে। এই সময় ইচ্ছা করলেও কোন কিছু লুকানো যায় না। মন্দোদরীর দাসীরা সবাইকে খবর দেয়।

মন্দোদরীর গর্ভে রক্ষিত তার উত্তরসূরী। এক সন্তান বেড়ে উঠছে তার গর্ভে বিগত দুই মাস ধরে কিন্তু সে যেন কোনোভাবেই যুক্ত নয় তার মাতার সাথে। মাতা কৈকেসী বলেন এই সময় সন্তানের গতি মা অনুভব করেন। মন্দোদরী কোনভাবেই বোঝাতে পারেনা যে সন্তানটি বেড়ে উঠছে তার গর্ভে, সে আগের সন্তানের মত জড়িত নয় মাতার সাথে। প্রত্যেকে আনন্দ করে মন্দোদরীর এই সংবাদে। রানিকক্ষে নারীরা খুব উচ্ছ্বসিত, রাস্তাঘাট সুন্দরভাবে সজ্জিত এবং রাতের আকাশ যেন অগ্নিশিখায় প্রজ্বলিত। দশানন মন্দোদরীর জন্য সমস্ত রকম আরাম, বিলাসিতা ব্যবস্থা করে। মন্দোদরীকে কিছু মাসের জন্য অব্যাহতি দেওয়া হয় রাজদরবারে কাজ থেকে। রানিকক্ষের এক নারী সবাইকে উপদেশ দেন রানির আশেপাশে ভয়াবহ কোন ঘটনা নিয়ে আলোচনা না করা হয়। মন্দোদরী খুব আনন্দিত হয় দশাননের উৎগ্রীব হওয়া দেখে।

সে ভাবে এবং বিস্মিত হয় তার প্রথম এবং দ্বিতীয় মাতৃত্বের কথা ভেবে। প্রথম সন্তান হওয়ার খবর যদি মন্দোদরী সবাইকে দিত তবে কত ভালো হতো। কিছু চিকিৎসক তাকে জানায় কীভাবে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করতে হয়। মন্দোদরী জানে যে তার সন্তান পুত্রই হবে। কারণ সে অনুভব করে এই সন্তান আগের সন্তানের ঠিক বিপরীত।

শীঘ্রই তার সন্তানের বৃদ্ধি ঘটে মাতৃগর্ভে তেমনভাবেই দশাননের সাথে তার সম্পর্কের দূরত্বের বৃদ্ধি ঘটে। চিকিৎসক পরামর্শ দেন সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় স্বামীর থেকে দূরত্ব থাকা শ্রেয়। ফলস্বরূপ দশানন অন্য নারীদের সাথে রাত্রিবাস করেন অন্তঃপুরে। কিন্তু তিনি খুবই যত্নশীল মন্দোদরীর ব্যাপারে। মন্দোদরী যাতে হতাশাগ্রস্থ না হয় তা দেখেন তিনি। প্রতিদিন নিয়ম করে দেখতে আসেন এবং মন্দোদরীর প্রতি পদক্ষেপের খবর নেন সন্ধ্যাবেলায়। তিনি চেষ্টা করে যথাযথ সম্মান দিতে এবং চেষ্টা করেন অন্তঃপুরে খবর যাতে কানে না আসে মন্দোদরীর। মন্দোদরীও সে ব্যাপারে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করে না স্বামীকে।

সময় ভেসে যায়। সন্তান ভূমিষ্ঠ হতে মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি। সরমা, বজ্রজলা একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেখানে রাজপরিবারের সকলে আমন্ত্রিত হয়। সবাই উপহার দেয় রানিকে এবং আশীর্বাদ করে আগত সন্তানকে। মাতা কৈকেসী সোনার তীর ধনুক আনেন আশীর্বাদ করতে উত্তরসূরীকে, যাতে সে সুযোদ্ধা হয়ে উঠতে পারে। মীনাক্ষী মোমবাতি আনে, অন্নলা নতুন জামা কাপড় আনে। সরমা, বজ্রজলা কিনে আনে বিভিন্ন রকমের খেলনা আগত সন্তানের জন্য। ধন্যমালিনী উপহার দেয় সুন্দর গলার হার যা তৈরি রকমারি পাথর দিয়ে। সে বলে তাদের প্রজাতির মানুষ বিশ্বাস করে যে এই হার পরলে একজন নারী শক্তি পাবে তার সন্তানকে পৃথিবীতে আনার জন্য। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অন্য রাজ্যে নারীরা যারা তার জন্য বিভিন্ন উপহার নিয়ে আসেন। সর্বশেষে আসেন ন্যায়নন্দিনী, যে সর্বদা দূরত্বে থাকতেন। সে কোন ভাবেই একই প্রাসাদে থাকার সময় অন্য নারীদের শাড়ি একসঙ্গে থাকা পছন্দ করত না। ‘আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই এবং বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা নারীদের অভিনন্দন জানাই।’ নন্দিয়নন্দিনী জানায় সবাইকে।

‘আমি কৃতার্থ সেই ভালোবাসা এবং অভিনন্দন গ্রহণ করে।’ সে এগিয়ে আসে তার মধ্য থেকেই যে সুন্দরী মহিলারা দাঁড়িয়েছিলেন দূরত্বে।

‘এনারা হলেন নাগা নারী, বাস করেন প্রতিবেশী রাজ্যে। এনারা নাচতে পারেন গাইতে পারেন এবং মনোরঞ্জন করতে পারেন। গ্রহণ করুন আপনার দাসী অথবা নারীদের যারা অপেক্ষারত!’

‘ঠিক আছে ন্যায়নন্দিনী, এটা শ্রেষ্ঠ উপহার হবে।’

‘যদিও এই নারীরা ঠিক আপনার দাসীর মত নয়। আপনাকে এদের সাথে কোন রকম জোর করার দরকার নেই যদি না রাজি থাকেন।’

ন্যায়নন্দিনী মৃদু হেসে বলে, ‘রানি, তারা রাজী আপনাকে সেবা করার জন্য এবং আর কিছু বলার দরকার নেই। আপনি গ্রহণ করুন এনাদের। প্রশিক্ষণের দ্বারা এরা আপনার দাসী হয়ে উঠবে এবং আপনাকে সেবা করতে পারবে।’

মন্দোদরী জানায় তার অনেক দাসী আছে,পরিচালিকা আছে আরও চারজনকে যুক্ত করলে ভিড় বেড়ে যাবে। যদিও এটা আমার প্রথম উপহার অনেক দূরের রাজকন্যার থেকে এবং আমি স্থির এটা গ্রহণ করব যাতে আমাদের সম্পর্কে কোন দূরত্ব তৈরি হয়। ঠিক আছে রাজকন্যা আমি তোমার উপহার গ্রহণ করেছি আমি কৃতার্থ তোমার কাছে। মন্দোদরী উত্তর দেয় এবং সবাইকে উপহার দেয় এই অনুষ্ঠানে আসার জন্য।

মন্দোদরী সারাদিন বিভিন্ন কাজ কর্মের দ্বারা সময় নষ্ট করে তার সন্তানের পৃথিবীর আলো দেখার সময় আগত হয়। চিকিৎসক তাকে উপদেশ দেন সে যাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয় এবং বাইরে যাতে না বেরোয়। সারাদিন ঘরের মধ্যে চিঠি লেখে মন্দোদরী মাতা, পিতাশ্রী, মাইকে এবং তাদের আগত নাতীকে আশীর্বাদ করতে আসবে কিনা। মন্দোদরী কিছু দাসী খেলনা নিয়ে আসে তার কক্ষে যাতে তার মন ভাল থাকে। অন্যরা নানাভাবে খুশি রাখার ব্যবস্থা করে মন্দোদরীকে।

বর্ষা আসে লঙ্কায় যেকোনো সময় এবং মন্দোদরী সন্তানের আগমনের সময়ের মতো। একদিন সকালে মন্দোদরী স্নান করার সময় অনুভব করে একটি বড় মাংসপিণ্ড তার পেটের মধ্য থেকে ক্রমান্বয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। তার পরিচারিকা তাকে নিয়ে যায় এবং চিকিৎসককে সতর্ক থাকতে বলেন। তার সন্তানের যেন পৃথিবীতে আসার কোনো তাড়া নেই। আকাশের মেঘ ক্রমশঃ শীতল হতে থাকে। দশাননের অন্য স্ত্রী দশাননকে সংবাদ দেয় লঙ্কার উত্তরাধিকারী প্রস্তুত পৃথিবীর আলো দেখার জন্য।

সন্ধ্যা থেকে মন্দোদরী ব্যথা শুরু হয়। এই যন্ত্রণা আগের যন্ত্রণা থেকে যেন অধিক লাগে। দাঁতে দাঁত চেপে নিঃশ্বাস নেয়। তার মেয়ের মুখ তখনও উজ্জ্বল স্মৃতিপটে। যন্ত্রণার মধ্যে অনুভব করে তার প্রথম সন্তান তার পাশে বসে আছে। তাকে স্বপ্নের মধ্যে দেখছে, সে হাসছে এবং মা’র দিকে এগিয়ে আসছে। মন্দোদরী যেন এক ধোঁয়াশার মধ্যে থাকে।

‘আপনি ভালো আছেন রানি। শুধু নিজের শরীরকে আরো একবার ঝাঁকুনি দিন।’ দশাননের মধ্য স্ত্রী বলেন।

চিকিৎসক তাকে বলেন, ‘আপনি আরো জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিন।’

প্রত্যেকবার নিঃশ্বাস নেওয়ার পর মন্দোদরী ভাবে এটাই শেষ সময়। চারিদিক ঠান্ডা হয়ে যায়। সময় বাড়ার সাথে সাথে যন্ত্রণা বাড়তে থাকে, চোখ বন্ধ করে থাকে কিছু সময়ের জন্য এবং দেখে একজন মহিলা কালো পরে দাঁড়িয়ে আছেন। ইনি সেই মহিলা যাকে দেখা দিত আগে। তার চুল খোলা থাকে সেই সময় এবং সে ক্রুব্ধ হয়ে থাকে এবং ভয়ঙ্কর চিৎকার আকাশে লুকিয়ে আছে থাকে।

মন্দোদরী চোখ খোলে ভয়ে এবং শোনে ভয়ঙ্কর চিৎকার। আকাশে ভয় লুকিয়ে থাকে আলোর দ্বারা। যন্ত্রণা তার যেন ঠান্ডা অনুভব হয়।

‘আরো একবার, আরো জোরে...’

মন্দোদরী শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চাপ দেয় এবং কিছু সময়ের মধ্যে বাচ্চার কান্না শোনা যায়।

মন্দোদরী দেখে দশাননের অন্য স্ত্রী বাচ্চাটিকে নিয়ে যায় অন্য কক্ষে। ‘রানি মন্দোদরী আপনি একটি পুত্রের জন্ম দিয়েছেন।’

মন্দোদরী শোনে দশাননকে জিজ্ঞাসা করতে, ‘আমার ছেলে। সে কেমন আছে?’

‘প্রভু সে খুব সুন্দর স্বাস্থ্যবান এবং শক্তিশালী। বাইরে খুব ঠান্ডার জন্য তার কান্নার আওয়াজ তীব্র হয়নি।’ দশানন আনন্দে জিজ্ঞাসা করেন ‘আমার রানি কেমন আছে?’

‘এই মুহূর্তে তিনি খুবই ক্লান্ত। আপনার পুত্র তাকে খুব কঠিন মুহূর্তে উপনীত করেছে। কিন্তু তিনি খুব শক্ত মনের মানুষ।’দশাননের অন্য পত্নী উত্তর দেয়।

‘তুমি যে সংবাদ এনেছ আমার জন্য তা শোনার জন্য আমি দীর্ঘ প্রতীক্ষার। আমি তোমাকে এত উপহার দেবো যা তুমি গুনেও শেষ করতে পারবে না। আমি এখন আমার সন্তানকে দেখতে চাই।’

দশানন ঘরে ঢুকে সবাইকে দেখে সন্তানকে কোলে নিয়ে মন্দোদরীর দিকে এগিয়ে যায়।

‘কেমন লাগছে রানি এখন?’

‘আমি খুব আনন্দিত প্রভু। আপনি পুত্র চেয়েছিলাম আপনি পেয়েছেন।’

‘আমি পেয়েছি তোমার জন্য।’

‘আমি ভেবেছি আপনি আপনার সন্তানকে দেখার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারবেন না ...’

‘আমি পারতাম না কিন্তু আমি তোমাকে ধন্যবাদ দিতে চাই প্রথমে।’

‘প্রভু আমি প্রকাশ করতে পারব না কতটা সম্মানিত বোধ করছি।’ দশানন তাদের সন্তানকে নিজের হাতে নেয় এবং তার চোখে জল ভরে ওঠে ।দশানন গর্ববোধ করে।

‘আমার পুত্র এবং প্রথম ও মুখ্য উত্তরাধিকার লঙ্কার! এক বালক যার কান্নার শব্দ বিস্ময়কর... আমি নাম দিলাম মেঘনাদ।’

মন্দোদরী অনুভব করে ছোট পরিবর্তন হয় মেঘনাদের জন্মের পর। তাকে দিনে দুইবার করে দুগ্ধ পান করায় মন্দোদরী এবং বাকি সময় তাকে দেখাশোনা করে সেবিকা। রানির সন্তানকে দুগ্ধ পান করানোর জন্য কিছু বিধিনিষেধ থাকে। সে আবার রাজদরবারে কাজে যোগদান করে। এই সময় দশানের মন্দোদরীর কক্ষে আসার অনুমতি ছিল না। তারা পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে দূরত্ব অনেক বেড়ে যাচ্ছে চিকিৎসকের নির্দেশমত। তাদের সন্তান পরিবারের নারীদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। প্রত্যেকে নতুন পন্থা অবলম্বন করে বাচ্চাটিকে হাসানোর জন্য। মন্দোদরী তার চরিত্রের অন্যতম একটি দিক আবিষ্কার করে। মাতৃত্বের এই সময় তাকে ভুলিয়ে দেয় সমস্ত অতীতের কথা। এই সময় মন্দোদরী রানি থেকে হয়ে ওঠে মা। আরো অনেক সতর্ক, যত্নশীল এবং উদার হয় সে। তার মধ্যে যে এই অনুভূতিগুলো ছিল তা মন্দোদরী জানতই না। সে এখন জানে কখন তার সন্তান কাঁদবে কখন সে তার আশেপাশে ঘুরবে। দশানন মেঘনাদকে দেখতে আসেন প্রতি সন্ধ্যাবেলায় রাজ্যপাঠের কাজ শেষ করে। মন্দোদরী দেখে খুশি হয় দশাননর এই বিভিন্ন দিক। তিনি বুঝতে পারেন ছোট্ট মানুষটি কি বলতে চায় না তার বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে যেন সে সব বুঝতে পারছে।

এমনই এক সন্ধ্যাবেলায় অপেক্ষারত থাকে মন্দোদরী ও তার পুত্র দশাননের জন্য বাগানে। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় তিনি তাদের সাথে দেখা করতে আসেননি। যখন মন্দোদরী তার দাসীকে দশানন সম্পর্কে জানতে চান, সে হতাশ মুখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। দশানন তাদের সাথে দেখা করতে আসবেন বলে আসছিলেন পথে কিছু নারীদের জলক্রীড়া করতে। ওই নারীরা সকলেই রানির দাসী যাদের কিনে এনেছিলেন ন্যায়নন্দিনী। তারা প্রত্যেকেই দশাননের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন।

রানি শুনে রেগে যায়। বোঝা যায় তারা কারোর নির্দেশমতো এখানে এসেছে। মন্দোদরী ন্যায়নন্দিনীর কক্ষে যায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।

ন্যায়নন্দিনী তার দাসীর বানানো প্রেক্ষাপটে খেলছিলেন যখন মন্দোদরী তার কক্ষে প্রবেশ করে। রানিকে দেখে উঠে দাঁড়ায়, কিছুটা হতবাক হয়।

‘কি আশ্চর্য! আপনি কী আমাদের সাথে খেলাতে যোগ দেবেন?’

‘না ধন্যবাদ, এই কারণে আমি এখানে আসেনি...’

‘আমি কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি মন্দোদরী?’

‘যে দাসীগুলোকে তুমি আমাকে উপহার হিসেবে দিয়েছ- কি ধরনের মেয়ে ওরা! তুমি কী কারণে ওদেরকে এখানে?’

‘আমি শুনেছি তারা রানির কাজ সুন্দরভাবে করছে ...’ ন্যায়নন্দিনী বলেন কোমল কন্ঠে এবং এইরকম হাসি মন্দোদরী আগে কখনো দেখেনি।

‘কি বলতে চাও! তুমি ওদের সাথে কী কী পরিকল্পনা করেছে! কী ধরনের কৌশল করেছ তুমি ওদের নিয়ে?’

‘যে ধরনের কৌশল আপনি আমার সাথে করে থাকেন...’

‘তুমি কী উন্মাদ হয়ে গেছো। কী ধরনের আমি তোমার সাথে করে থাকতে পারি?’

‘আপনি ভুলে গেছেন আপনি সর্বদা চেষ্টা করে গেছেন আমার স্বামীকে আমার থেকে দূরে রাখতে। আপনি বিয়ের প্রথম রাত থেকেই সেই কৌশল করে আসছেন আমার সাথে যখন আপনি সারারাত তাকে ব্যস্ত রেখেছিলেন আমি তার অপেক্ষায় বসেছিলাম।’

‘আমি কখনোই সে চেষ্টা করিনি। তিনি আমার কাছে আসতেন আমার হয়ে। আমি সর্বদাই চেষ্টা করেছি তাকে তোমার কাছে পাঠাতে। তুমি ভুলে গেছো তিনি আমারও স্বামী।’

‘আপনাকে আমার কাছে অত সরল সাজতে হবে না। আমি জানি আপনি আমাকে হিংসা করেন এবং সেই কারণে আপনি নিজের দিকে সর্বদা দশাননের দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা করেন। আপনি খুবই অসংরক্ষিত মনে করে নিজেকে আপনাকে। এটা বোঝার দরকার যে আপনার স্বামী আপনার থেকে সরে আসতে চাইছেন। মনে রাখবেন যে আপনার সাথে এক শয্যা না কাটালে নিজেকে ধন্য মনে করেন।’

‘এইভাবে চিন্তা করা অন্যায় আমার মনে হয় তুমি খুবই অহংকারী কিন্তু যথেষ্ট বৈচিত্র্যপূর্ণ। তুমি কী ভেবেছিলে একজন রাজাকে বিয়ে করার সময়। কিন্তু আমি ভুল...’

‘আপনি আমাকে অহংকারী বললেন। আপনি হয়তো জানেন না আপনার জন্য আমাকে কী কী ভোগ করতে হয়েছে।’

‘তুমি তোমার শব্দচয়ন সঠিকভাবে করো ন্যায়নন্দিনী। তোমার রাজত্ব থেকে রাজাকে অনেক সম্পত্তি দেওয়া হয়েছে কিন্তু তুমি তোমার মত করে রাজাকে ভালোবাসতে পারোনি। এটা খুবই নিন্দাজনক যে তোমার পরিকল্পনার সাথে জঘন্য কাজ জড়িত। যার ফলে তোমার স্বামীকে অন্য নারীদের সাথে একই শয্যায় কাটাতে হয়। এত সবকিছু করার কারণ তুমি ভেবেছো আমি তোমার স্বামীর থেকে তোমাকে প্রথম রাতেই আলাদা করে রেখেছি। তুমি আমাকে তোমার মতোই ভেবেছো।’

মন্দোদরী আরো কিছু বলতে চায় কিন্তু সে জানে তাকে নিয়োজিত রাখার মতো কিংবা তাকে বলার মত কোন কিছুই নেই।

‘ভাবো ন্যায়নন্দিনী তুমি কি করবে। তুমি তোমার স্বামীর অন্য স্ত্রীদের হিংসা করো কিন্তু তুমি প্রস্তুত তোমার স্বামীকে অন্য নারীদের সাথে ভাগ করে নিতে যারা সম্মানে তোমার থেকে নিচে।’ মন্দোদরী একথা বলে চলে যান।

ধন্যমালিনী ক্রুদ্ধ হয়ে যায় যখন শোনে ন্যায়নন্দিনী খারাপ ব্যবহার করেছে মন্দোদরীর সাথে। ‘আপনার তার সাথে এত ভাল ব্যবহার করা ঠিক না। তার দাসীদের এখনই তাড়িয়ে দেওয়া উচিত। বের করে দিন রানিমহল থেকে ।বিষয়টি রাজদরবার পর্যন্ত পৌঁছানো উচিত।’ রানির সামনে ক্ষণস্থায়ী ভাবে রেগে যান ধন্যমালিনী।

‘আমি এটা পারিনা। অন্তঃপুরে অন্য নারীরা এই নিয়ে নানা গল্প তৈরি করবে আর বলবে আমি কীভাবে আমার স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছি অন্য স্ত্রীদের হাত থেকে। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত তার এই কাজকর্মের কথা জানতে পেরে। আমি ভাবছি তার সম্মানের কথা। রাজাকে নিয়ে নানা গল্প তৈরি হবে। রানির দাসীর সাথে রাজা এক শয্যার শুয়েছেন।

‘আমি আশাকরি স্বামী ভাগ করা নিয়ে পার্থক্যটা বোঝাতে পেরেছি অন্য নারীদের সাথে। আমি বোঝাতে পেরেছি যে সে কতটা গর্হিত কাজ করেছে। প্রথমে আমাদের ছিল অন্তঃপুরে নারী এখন যোগ হয়েছে আমাদের দাসী। কিন্তু ভাববেন না...আমাদের লঙ্কেশ্বর থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে এইসব নারীদের।’ধন্যমালিনী বলেন।

মন্দোদরী এই কথাবার্তা বলার পর নিজে কিছুটা হাল্কা হয়।

‘আমি জানিনা কীভাবে বললাম কিন্তু আমি কৃতার্থ ধন্যমালিনীর কাছে। যখন তুমি আমার জীবনে আসো আমি ভাবতেও পারিনি তোমার সাথে আমার এত সুন্দর সম্পর্ক হবে।’

ধন্যমালিনী হেসে বলে, ‘আমি আপনার বোনের মত কিন্তু এখন আরো বেশি যত্নশীল হওয়া উচিত নতুন বোনকে নিয়ে।প্রথমত আমাদের প্রস্তুতি করতে হবে সেবাদাসী কিভাবে ফেরত পাঠানো যায় যেখান থেকে তারা এসেছেন। তারা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে।’

অবশেষে মন্দোদরী ফিরে আসে। মন্দোদরীর বন্দীদশা শেষ হয় কিছু সপ্তাহের মধ্যে। দশানন ঘোষণা করে একটি যজ্ঞের শুদ্ধিকরণের জন্য এবং জ্যোতির্বিদ মেঘনাদের জন্মকুণ্ডলী তৈরি করেন। এই যজ্ঞ হল একটি মাধ্যম যার দ্বারা রাজা ঘোষণা করবেন আগামী সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার। এক বড় মহাভোজের আয়োজন করা হয় এই উপলক্ষে যার দ্বারা লঙ্কার মানুষকে জানানো হয় উত্তরাধিকারের সংবাদ।

ন্যায়নন্দিনীর দাসী নিয়ে এই কাণ্ড ঘটার পর মন্দোদরী সরাসরি দশাননের সাথে সাক্ষাৎ করত না। দশানন যেই সময় মেঘনাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন মন্দোদরী সেখানে উপস্থিত থাকত না। দশানন তখন অবশ্যই মন্দোদরীকে এড়িয়ে চলবেন যাতে এই ঘটনার মুখোমুখি হতে না হয়।

দশাননর দিকে না তাকিয়ে মন্দোদরী তার পুত্রকে নিয়ে হেঁটে যান এবং দশাননের পাশে বসেন আচার অনুষ্ঠানের জন্য।

গুরু শুক্রাচার্য পালন করে সমস্ত প্রথা এবং ঘোষণা করেন তাঁর রাজত্বে মেঘনাদ হলেন এই সাম্রাজ্যের রাজপুত্র। পরিবারের সবাই ফুল দিয়ে আশীর্বাদ করেন। এরপর তারা একত্রিত হয়ে রাজদরবারের উত্তরাধিকার ঘোষণা করার জন্য এবং অসংখ্য মানুষের সমাবেশ হয় সেখানে এবং সকল জ্যোতির্বিদকে আমন্ত্রণ করা হয়।

‘দুর্দান্ত জন্মক্ষণ... তার জন্মকুণ্ডলী বলছে যে সে হবে এক অপ্রতিরোধ্য সম্রাট।’ এক জ্যোতিষী বলেন।

এই ঘোষণা হওয়ার পর সবাই খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠে। গুরু শুক্রাচার্য কিছু বিষয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন জন্ম কুণ্ডলী দেখে, ‘একটি বিষয়ে সতর্ক হবার হওয়ার খুব দরকার আছে কিছু সময়। .... কোন দ্বন্দ্ব নেই সে সকল শত্রু নিধন করবে কিন্তু এই পথে শনির দশা জন্মাবে যার জন্য তার কিছু দুর্ভাগ্য নিয়ে আসবে জীবনে।’

সবাই চুপ করে যান রাজদরবারে। দশাননের হাসি কিছুটা স্তিমিত হয়।

‘আমি ব্যথিত ...শনির এই দশা অবস্থান করছে বারো ঘরে, যার ফলে তার স্ত্রী বিয়োগ হবে যখন শত্রু নিধন করবে কোন একসময়।’ শুক্রাচার্য্য বর্ণনা করেন। দশানন ক্রদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন, ‘মন্ত্রী নবগ্রহ ছেড়ে দিন শুধুমাত্র শনিদেবকে থাকতে বলুন উপরের স্তম্ভে। দেখা যাক কি করা সম্ভব।’

‘আমি কিছু বলতে চাই প্রভু। আমি অনুরোধ করব আপনি ফিরিয়ে নিন আপনার এই আদেশ।’

‘মন্দোদরী চুপ করো।’ দশানন চিৎকার করেন।

‘না প্রভু আমি আর চুপ করতে পারছিনা। আপনি বললেন শুধুমাত্র শনিগ্রহকে ধরে রাখা হবে আমাদের সুবিধার জন্য। আপনি জোর করে কোন কিছু করতে চাইছেন কিন্তু এটা কার্যকরী হবে না। আপনি তার জীবনের প্রতি ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। আগে ওকে বড় হতে দিন। কিন্তু আমার পুত্রের ভাগ্য নিয়ে কাউকে পরিহাস করতে দেব না। যদি শনিদেব আমাদের বিরুদ্ধে যান তবে তার বিরুদ্ধে আমাদের বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হবে। আমি আপনাকে শেষবারের মত অনুরোধ করছি প্রভু আমি আপনার কোন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করিনি অদ্যাবধি। শুধুমাত্র এটা ছাড়া। আমি সাগ্রহে প্রার্থনা করছি আপনি আপনার আদেশ তুলে নিন। আপনি দয়া করে কোন দেবতার ক্রোধের কারণ হবেন না। তারা আপনাকে শক্তি দিয়েছেন কিন্তু তারা আপনার ভাগ্যে যা লেখা আছে তা পরিবর্তন করতে পারবেন না। আমাদের তাদেরকে শ্রদ্ধা দেখানো উচিত।’ মন্দোদরী দৃঢ় ভাবে বলেন।

‘আমি তোমাকে নিয়ে চিন্তিত তাই আমি ওনাকে মুক্ত করে দিয়েছি এবং মনে রেখো এটাই প্রথম এবং শেষ বার আমি কাউকে মুক্ত করলাম তোমার অনুরোধ রাখার জন্য। নবগ্রহ গুরুরা এখন মুক্ত।’

সকল অধ্যায়
১.
অহল্যা, দ্রৌপদী, সীতা, তারা, মন্দোদরীপঞ্চসতীর প্রতি নিবেদন
২.
সূচনা
৩.
বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী
৪.
বিবাহ পর্যায়ে মন্দোদরী
৫.
দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ ও মন্দোদরী কথা
৬.
বজ্রজলা ও মন্দোদরী
৭.
অমৃতের সন্ধানে দশানন ও তার প্রতিক্রিয়ায় মন্দোদরী
৮.
দশানন, বালী ও মন্দোদরী
৯.
মহান্ত, মাতা কৈকেসী ও মন্দোদরী
১০.
মন্দোদরী ও ঋষি ঘৃতস্মদা
১১.
আত্মশ্লাঘা ও মন্দোদরী
১২.
জীবন সন্ধিক্ষণে মন্দোদরী
১৩.
মন্দোদরী ও দশানন
১৪.
মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ
১৫.
মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন
১৬.
যোদ্ধা মেঘনাদ
১৭.
মেঘনাদের বিবাহ ও মন্দোদরী
১৮.
দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী
১৯.
সীতা হরণ ও মন্দোদরী
২০.
বানর ও লঙ্কা
২১.
অহিরাবণ
২২.
যুদ্ধে মেঘনাথ ও মন্দোদরী
২৩.
লঙ্কার রানি মন্দোদরী
২৪.
ফিরে দেখা
২৫.
ঋণ স্বীকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%