পারমিতা চক্রবর্তী
মায়ারাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর মন্দোদরী লঙ্কার কথা ভাবতে থাকে খুব শীঘ্রই যেতে পারে তার প্রস্তুতিও শুরু করে দেয়। কিছুদিনের মধ্যে মন্দোদরী রাবণকে চোখে হারাতে থাকে। অভূতপূর্ব ভাবে মন্দোদরী লঙ্কা ত্যাগ করার পর লঙ্কায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়। মন্দোদরী দশাননকে অজস্র চিঠি লিখেন কিন্তু তার একটিও প্রত্যুত্তর আসেনি। প্রত্যেকটিতে মন্দোদরী দশাননকে ছেড়ে কেমন আছে, তাঁর স্বাস্থ্য কেমন ইত্যাদি ইত্যাদি জানতে চাইতেন। কিন্তু কিছু বিষয় অবাক করে মন্দোদরীকে। দশানন এই সময় কোন খোঁজ করেননি মন্দোদরীর। সে কেমন আছে জানতেও চায়নি। মন্দোদরী লঙ্কা ত্যাগ করার আগে দশাননকে খুব বিচলিত দেখেছিল। যে স্বামী তাকে ছাড়া একটি রাতও কাটাতে পারত না সে এতদিন মন্দোদরীকে ছেড়ে কিভাবে কাটাচ্ছেন!
প্রায় একমাস পর পিতাশ্রী এবং মাতা হেমা প্রচুর উপহার সাজিয়ে মন্দোদরীকে বিদায় জানালেন। উষ্ণ প্রত্যুগমনের অনুষ্ঠানের পর মায়ারাষ্ট্রের সেনা ও পরিচালিকাগণ লঙ্কার উদ্দেশ্যে নিয়ে চললেন। রানি মন্দোদরী যখন লঙ্কায় পৌঁছায় অভ্যর্থনায় মুখর হয়ে ওঠে প্রজাগণ। মাতা কৈকেসী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বধূকে আশীর্বাদ করে প্রাসাদে প্রবেশ করান কিন্তু মাতা কৈকেসীকে সাধারণের তুলনায় একটু চুপচাপ দেখে মন্দোদরী। মাতা প্রাসাদ থেকে কক্ষে আসার পথে খুব কম কথা বলছিলেন। এই বিষয়টি বারবার ভাবায় রানিকে। সে লঙ্কা ত্যাগ করার পূর্বে এমন পরিস্থিতি ছিল না। মাতা কৈকেসী মন্দোদরীকে খুব ভালবাসতেন। তারা আগেও নিজেদের মধ্যে সময় কাটিয়েছেন বহুক্ষণ। মন্দোদরী অপেক্ষা করছিল দশানন তার অভ্যর্থনা করুক কিন্তু তাকে কোথাও দেখা গেল না।
মন্দোদরী বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করলো। তার জন্য নিযুক্ত থাকা দাসী, পরিচালিকাগণ তার সাথে সঠিকভাবে বাক্যলাপ করছে না। তাকে এড়িয়ে চলছে। মন্দোদরী মনে মনে ভাবছিল এটা তার হয়তো মনের ভুল। তার পরিচালিকাগণ হয়তো ভেবেছে সে ক্লান্ত, অবসন্ন তাই হয়তো সঠিক ভাবে কথা বলছে না। মন্দোদরী সারাদিনের বিশ্রামের পর ভেবেছিল সন্ধ্যায় দশাননের সাথে সাক্ষাৎ হবে কিন্তু শোনা যায় রাজা দশানন রাজনৈতিক ভ্রমণে গিয়েছেন এবং কিছুদিনের মধ্যে ফিরে আসবেন। মন্দোদরীর কিছুটা দুঃখ পেলেও প্রকাশ করল না। সে আশা করেছিল দশানন তাকে জানিয়ে যাবে যে তিনি রাজনৈতিক কারণে রাজ্যের বাইরে থাকছেন। অর্থাৎ দশানন কী চাননা মন্দোদরীর সাথে দেখা করতে! তার মধ্যে এক উচাটন ভাব বর্তমান। এই কয়েকটা দিন তার কাছে কয়েক বছর মনে হতে লাগল! যেন কত যুগ সে দশাননকে দেখেনি। একঘেয়েমি ও একাকীত্বে কাটাতে বেরিয়ে পড়ে মন্দোদরী। লঙ্কার বিভিন্ন অংশ নিয়ে তার মাথায় যে পরিকল্পনা ছিল, সেই বিষয়ে পরিদর্শন করতে লাগলেন এবং যে সমস্ত জায়গায় নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল তা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। সমস্ত জায়গাগুলি পরিদর্শনের পর মন্দোদরী সাক্ষাৎ করে নানাশ্রীর সাথে। নানাশ্রী মাল্যবান মন্দোদরীকে দেখামাত্রই, ‘স্বাগত রানি মন্দোদরী। কেমন ছিলেন এই দিনগুলি?’
মন্দোদরী হাসিমুখে উত্তর দিল ‘খুব শান্তিতে ছিলাম এই দিনগুলি। নানাশ্রী আমি চলে যাওয়ার পর লঙ্কায় অনেক পরিবর্তন চোখে পড়ছে।’ নানাশ্রী সাথে সাথে প্রশ্ন করলেন, ‘কী পরিবর্তন চোখে পড়ল রানি?’
‘আমি ঠিক নিশ্চিত ভাবে বলতে পারব না নানাশ্রী। লঙ্কার কেউ আমার সাথে সঠিকভাবে কথা বলছে না। যাইহোক প্রেক্ষাগৃহে কাজ কেমন চলছে নানাশ্রী?’ মন্দোদরী সজ্ঞানে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে এবং সে অনুভব করে এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না নানাশ্রী।
‘কাজের অগ্রগতি খুবই ভালো আপনি চাইলে আমি আপনাকে দেখাতে পারি।’
মন্দোদরী মৃদু হেসে প্রশ্ন করে, ‘দশানন ঠিক এখন কোথায় বলতে পারেন নানাশ্রী?’
নানাশ্রীর সাথে কথা বলতে বলতে মন্দোদরী দেখে একটি বড় নির্মাণকার্য চলছে কিছুটা দূরে যা দেখে মনে হয় বড় একটি প্রাসাদ নির্মাণ হবে। নানাশ্রীকে প্রশ্ন করে মন্দোদরী, ‘ওই প্রাসাদটি কার জন্য নির্মিত হচ্ছে?’ সে খুব সন্তর্পনে প্রশ্নটি করে নানাশ্রীকে।
‘ওখানে নারীদের জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হচ্ছে যার নাম অন্তঃপুর। রাজপরিবারের নারীদের একটি অংশ ওখানে থাকবে।’ নানাশ্রী এমন ভাবে প্রশ্নের উত্তর দিল যাতে মন্দোদরীর মনে আর কোন প্রশ্ন না থাকে। ‘অন্তঃপুরের দরকার কেন?’
‘দশানন উত্তর-পশ্চিম ভ্রমণ করার পর বেশ কিছু নারীদের দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছেন যারা অন্তঃপুরবাসিনী। এই অন্তঃপুরবাসিনীরা রাজাদের রক্ষিতা। তাদেরকে মূল প্রাসাদ থেকে আলাদা করে অন্তঃপুরে রাখা হয়। এই অন্তঃপুরে পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রবেশ নিষেধ করা হয়। এটা তাদের নিরাপত্তার জন্যই। দেবরাজ ইন্দ্রের রাজধানী ‘অমরাবতী’ এমন অনেক বাড়ি আছে যা অন্তঃপুর হিসেবে বিখ্যাত সেখানে শুধুমাত্র অপ্সরা থাকেন।’
মন্দোদরী নানশ্রীকে জানায়, ‘আমাদের ইতিমধ্যে অনেক অতিরিক্ত কক্ষ আছে। এখানকার নারীগণ কেন অন্তঃপুরে থাকতে যাবেন?’ মন্দোদরীর পক্ষে পুরো ঘটনাটা বোঝা সম্ভব নয় কারণ সে ভাবতেই পারেনা দশানন তাকে ছাড়া অন্য কোন নারীর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। আমাদের সমাজে হিন্দু রমণীরা স্বামীকে ভগবানরূপে পূজা করে। প্রতিদিন তারা ঘুম থেকে উঠে স্বামীকে প্রণাম করে দিন শুরু করে। নানাশ্রী জানান, ‘রানি সেই কক্ষগুলো সবই পরিপূর্ণ।’ নানশ্রী উত্তর দেওয়ার পর তার মুখে এক আশ্চর্য ছাপ দেখা দেয়। তিনি আরো জানান ‘আমি জানিনা এই সংবাদ আপনাকে দেওয়া উচিত কিনা কিন্তু দশানন ইতিমধ্যে আরও একটি বিবাহ সম্পন্ন করেছেন। দশানন যে সমস্ত উপজাতিগুলোকে শাসন করেন তাদের মধ্যে কোন এক উপজাতির রাজকন্যাকে বিবাহ করেছেন তিনি।’
সংবাদটি পেয়ে মন্দোদরীর হৃদয় বিদ্যুৎবেগে দ্বিখণ্ডিত হয় সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। ‘নানাশ্রী এই ঘটনা কী আমার মায়ারাষ্ট্রে আসার পর ঘটেছে?’
‘হ্যাঁ লঙ্কাপতি চেয়েছিলেন একটি রাজনৈতিক ভ্রমণে বেরোতে পশ্চিম অঞ্চল থেকে এবং সেখানকার উপজাতি প্রধান তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। এই বিবাহ শুধুমাত্র রাজনৈতিক সমঝোতা। তিনি দশটি উপজাতি প্রধান হয়ে উঠেছেন বর্তমানে। ‘শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একাধিক বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নিলেন?’ নানাশ্রী মন্দোদরীকে পুরো ঘটনাটা যে ভাবে বোঝাতে চাইলেন তাতে সবটাই বিস্ময়কর মনে হল মন্দোদরীর কাছে। সে বুঝতে পারল না যে তার ঠিক কি করা উচিত। নিজেকে বোঝাতে পারছিল না তার প্রিয় স্বামী শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিবাহ করতে পারে। সে রেগে যাবে না কাঁদবে না আনন্দ পাবে বুঝতে পারছিল না। সমগ্র ভূখন্ড যেন তার পা থেকে সরে যাচ্ছে মনে হল।
‘রানি মন্দোদরী আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা কিন্তু এই বিবাহ হয়েছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে এবং লঙ্কাকে আরো সমৃদ্ধ করতে। এই বিবাহ শুধুমাত্র সৌজন্যতার বহিঃপ্রকাশ।’ নানাশ্রী বারংবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।
‘এই বিবাহ কতটা সমঝোতামূলক আমি জানিনা তবে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজাকে রানি সম্মতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তা নেওয়া হয়নি। আমি এখন স্বাভাবিকভাবেই দশাননের কাছে যেতে পারবো না।’ কথাগুলো বলে নিজের অনুভূতি আবৃত করে ফিরে আসে মন্দোদরী নিজ প্রাসাদে নিজ কক্ষে। সেখানে উপস্থিত হয়ে তার দাসী এবং পরিচারিকাদের উদ্দেশ্যে জানায়, ‘এই ঘরের আশেপাশে যেন এই পরিবারের কাউকে দেখতে না পাওয়া যায়। আমি নিজের মতো সময় কাটাতে চাই। দশানন না ফেরা পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতেই হবে।’ শুনে দাসীরা সবাই মাথা নিচু করে চলে যান। বোধহয় তারা বুঝতে পারছিল রানির মনের অবস্থার কথা। এরইমধ্যে মাতা দাসীদের দ্বারা জানতে পারেন রানির মনের অবস্থার কথা। মাতা আসেন মন্দোদরীর কাছে সান্তনা দেওয়ার জন্য তিনি মন্দোদরীর হাত নিজের হাতে নিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন, ‘মন্দোদরী আমার কাছে কোন ভাষা নেই এই পরিস্থিতিকে বোঝানোর জন্য। আমি বুঝতে পারছি তোমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। কোন স্ত্রী তার স্বামীকে ভাগ করতে পারেন না অন্য নারীর সাথে। আমি নিজেকে তোমার জায়গায় বসিয়ে পুরো ঘটনাটা অনুধাবন করার চেষ্টা করছি। কিন্তু তুমি যদি নিজেকে লঙ্কার রানি হিসেবে গোটা ঘটনা দেখো তবে তোমার কষ্ট কিছুটা কমবে।’
‘তিনি কেন আমাকে এই বিবাহের কথা আগে জানাননি?’ বলেই উচ্চস্বরে কেঁদে ওঠে মন্দোদরী।
‘অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে দশানন জড়িত। যা তোমার থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তোমাকে ভালোবাসে এই নিয়ে কোন সন্দেহ নেই তুমি হবে লঙ্কার রানি।’
‘তিনি কী আমাকে প্রধান রানি রূপে মর্যাদা দেবেন মাতা?’
‘দশানন শুধুমাত্র তোমারই স্বামী নন তিনি এ দেশের রাজা। পরবর্তীকালে তিনি সর্বশক্তিমান রাজারূপে প্রতিষ্ঠিত হবেন ভূখণ্ডে।’ মন্দোদরীকে যথাসম্ভব বোঝানোর চেষ্টা করেন মাতা কৈকেসী।
‘কিন্তু মাতা আমার স্বামী একজন দক্ষ শাসক হওয়ার জন্য এত উৎসাহী কেন? আমি তো এইরূপে তাকে পেতে চাইনি। আমি শুধুমাত্র লঙ্কার রানিরূপে নিজেকে দেখতে পাচ্ছিনা’ উৎকন্ঠায় জানায় মন্দোদরী।
তিনি তোমাকে অশ্রদ্ধা করার মত এমন কোন কাজ করেননি। একজন রানিকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয় রাজ্যের উদ্দেশ্যে। আমি তোমাকে ভীত করার জন্য কোন কথা বলছি না পুত্রী। কিন্তু তোমাকে রানি হতে গেলে নিজের ব্যক্তিগত চাহিদা গুলোকে পিছনে ফেলে এগোতে হবে। তুমি সামান্য বিশ্রাম নাও এবং চিন্তা করো কথাগুলো। দশানন কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে আসবেন তুমি তখন তোমার সব কথা জানিও। এই কথা বলে মন্দোদরীর কক্ষ ত্যাগ করেন মাতা। নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভাবতে শুরু করে সে। দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ জীবনদর্শনকে নড়িয়ে দেয়।
বর্তমানে রানি নতুন রানিকে অভ্যর্থনা করবে এটি নিয়ম চলে আসছে। তার অন্যথা হয়নি রানির ক্ষেত্রেও। রানি নববধূকে অভ্যর্থনা জানালেন। তার মনে নানা প্রশ্ন উৎকণ্ঠা থাকলেও রীতি নীতির ক্ষেত্রে কোনরকম উদাসীনতা দেখালেন না। দশাননের নতুন বধূর জন্য মন্দোদরী অনেক উপহার পাঠালেন। নির্ধারিত হল প্রাসাদের অতিথিদের মধ্য থেকে একটি কক্ষ। যদিও তার নিজস্ব প্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল। রানি মন্দোদরীর পক্ষ থেকে নানা উপহার উপজাতি রাজকন্যাকে প্রদান করা হয়। পরিবর্তে রাজকন্যা রানির সাথে দেখা করার অনুরোধ প্রেরণ করেন। রানি সম্মত হলে তার কক্ষে রাজকন্যা ও রানি মন্দোদরীর দ্বিপ্রাহরিক আহারের ব্যবস্থা করা হয়। ঠিক তখনই মন্দোদরীর মনে পড়ে যায় নানাশ্রী অন্তপুর নির্মাণের কথা। রাজপরিবারের নারীদের দেশে উদ্দেশ্যে বানানো এই প্রাসাদ। মন্দোদরীর নানাশ্রীর কথাগুলি মনে পড়তে থাকে এমন সময় উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা হয় উপজাতি রাজকন্যার উপস্থিতি। রাজকন্যা যখন রানির সামনে উপস্থিত হয় তখন দেখে মনে হয় বারো বছরের তরুণী। তার স্বামী পছন্দস্বরূপ দ্বিতীয় স্ত্রীকে কেমন দেখতে হবে সেই নিয়ে মন্দোদরীর মধ্যে অনেক দ্বন্দ্ব ছিল।
কিন্তু সে হতাশ হয়। এই নারী কোনভাবেই দশাননের পছন্দ হতে পারে না। রাজকন্যা চেহারায় তন্বী এবং অস্ত্র দিয়ে বাধা তার গোটা গা। তার হাতে জাতির চিহ্ন আঁকা এবং চোখদুটো তারুণ্যে ভরা। বয়স এতটাই কম ছিল উপজাতি কন্যার যা বিবাহের পক্ষে অনুপযুক্ত। চোখের চাউনিতে সারল্য মাখা। সর্বদা মাথা নীচু রেখেই রাখে রানির কাছে। মন্দোদরীর মনে হয় তার স্বামীকে বিবাহ করার জন্যই সে নিজেকে অপরাধী ভাবছে। মন্দোদরী তার সম্মুখে বসার স্থানে উপস্থিত হয় বলে দয়া করে নিজের স্থান গ্রহণ করুন।
‘ধন্যবাদ আপনাকে এমন উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য। আমি ধন্যমালিনী। উপজাতি রাজকন্যা। আমাদের সম্পর্কের নিরিখে আপনি যে সম্মান আমাকে দেখিয়েছেন তা আমার কাছে আশীর্বাদস্বরূপ। আমাদের সম্পর্ক যাইহোক না কেন আমি চিরকাল আপনার ভগিনী হয়েই থাকবো।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে যায় ধন্যমালিনী। তার কথাবার্তায় মনে হয় সে খুবই আধুনিক মনষ্ক। ধন্যমালিনীকে দেখে মন্দোদরীর প্রাথমিকভাবে সব ধারণা যায় ভেঙে যায়। সে ভেবেছিল দশানন বোধহয় এই নারীর রূপে মুগ্ধ হয়েই বিবাহ করেছেন। মন্দোদরী একসময় ভাবত জীবনে সে ছাড়া অন্য কোন নক্ষত্রের অবস্থান ঘটবে না দশাননের আকাশে। তার রূপে মুগ্ধ হয়েই দশানন তাকে বিবাহ করেছেন। তাই মন্দোদরী প্রথমে মেনে নিতে পারেননি দশাননের দ্বিতীয় বিবাহকে। এই বিবাহ কেন সম্পন্ন করা হল সে যখন থেকে চলে যায় লঙ্কা থেকে।
সম্পূর্ণ বিবাহ কেন রানির অগোচরে হলো! তবে এই বিবাহ পূর্বে স্থির ছিল? মন্দোদরীকে রাবণ ভয় পেয়েই কী বিবাহের কথা জানালেন না। কিংবা তার পিতা-মাতা এই বিবাহের কথা আগেই কি জানতেন! তাই তাদের ইচ্ছায় মন্দোদরীকে ডেকে পাঠানো হয়। নাকি এই বিবাহ পূর্বেই হয়েছিল এখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হলো। পুরো বিষয়টি মন্দোদরীর কাছে ধোঁয়াশা।কিন্তু ধন্যমালিনীকে দেখে মন্দোদরীর মনের চাপ কিছুটা কমে। ধন্যমালিনীর দ্বারা কোন ক্ষতি হবে না এটা বেশ বুঝতে পারে।
তাদের সাক্ষাতের পর মন্দোদরী নিজের সংস্কার, ধ্যান ধারণা গুলোকে উড়িয়ে দেয় এবং তার স্বামী সম্পর্কে যা অভিযোগ ছিল সবই যেন প্রশমিত হয়ে যায়। বারবার ভাবতে থাকে সে কষ্ট পাবে ভেবেই দশানন দ্বিতীয় বিবাহের কথা জানায়নি। সবশেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় মন্দোদরী এই বিবাহ সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক। এতে ভালোবাসা, প্রেমের কোনো অস্তিত্ব নেই। ধন্যমালিনীকে উপাদেয় খাদ্য খেতে অনুরোধ করে এবং সে তার কাছে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। পরিবর্তে সুনির্মল হাসিতে তাকিয়ে থাকে রানির দিকে। সম্মান প্রদর্শনের জন্য ধন্যমালিনী মাথা নিচু করে থাকে। ধন্যমালিনী খুবই শ্রদ্ধাপরায়ণ এবং রুচিশীল। রানির সামনে কথা বলে তাকে শ্রদ্ধা প্রদান করার মাধ্যমে বারবার প্রমাণ করে ধন্যমালিনী তার আনুগত্য। তারা সকলেই আশা করেছিল পরবর্তী দিনে দশানন লঙ্কা ত্যাগ করবেন। মন্দোদরী নিজেকে সুসজ্জিত করে রাখে অভিনব রূপে এবং তার কক্ষ গোলাপ ফুল দ্বারা আবৃত করে রাখে। দশানন উপজাতি প্রধান রূপে অধিষ্ঠিত হন।
উপজাতিরা দশাননকে পেয়ে তাকে সম্মান, ভালোবাসা প্রদান করার জন্য দশটি মাথাযুক্ত লম্বা সোনার মুকুট প্রদান করেন। দশাননের শীঘ্রই পুষ্পক বিমান আগমন ঘটবে। মন্দোদরী এবং ধন্যমালিনী গোলাপ ফুলের বৃষ্টি করছিল আগমনের আগে থেকেই। দশানন সবাইকে অভ্যর্থনার জন্য স্বাগত জানালেন। প্রথমে মন্দোদরীর দিকে তাকিয়ে উষ্ণ হাসি দ্বারা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন। মন্দোদরীর সব অভিমান যেন কিছুটা ক্ষয় হয় এবং তার মন চায় চায় সে যেন ছুটে চলে যায় তার বাহুডোরে। মধ্যবর্তী ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা ভেবেই ভুলে যেতে চায় মন্দোদরী। মন্দোদরী সর্বান্তকরণে নিবেদিত করেছে দশাননের কাছে।
দশানন একটি হাত বাড়িয়ে দিলেন বিমান থেকে বাহির হওয়ার জন্য। এক সুন্দরী রমনী। বিশেষত সে পরী। কোন সাধারণ নারী নয়। তাকে দেখতে অপ্সরার মতো। কেশ সুন্দর ফুল দ্বারা সুসজ্জিত এবং অঙ্গে হলুদ জরির বস্ত্র। চোখে সুরমা এবং হাত সোনার গয়না দ্বারা সুসজ্জিত। মাথায় পাগড়ি। প্রত্যেকে তার সৌন্দর্য, সম্ভ্রম দেখে স্তম্ভিত। দশানন তাকে ফ্যারাও কন্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।এই কন্যা মরুদ্যান রাজার কন্যা। যখন দশানন ভ্রমণে গিয়েছিলেন পরিচয় হয়েছিল এঁর সাথে।
এই কন্যা কোনোও সাধারণ নারী নয়। সে যখন লঙ্কায় মাটিতে পা রাখে মন্দোদরীর সব প্রত্যাশা ছারখার হয়ে যায়। তার বিবাহ সমাপ্ত হল। সেই নারী দশাননর উপপত্নী। মন্দোদরীকে পিতাশ্রী খুব আধুনিক ভাবে মানুষ করেছিলেন। তবুও রাক্ষস কন্যা কিন্তু আত্মনির্ভর এবং অহংকারী। এই অহংকার তার নিজের পরিচিতিতে তৈরি হয়েছিল। দশাননের দ্বিতীয় বিবাহকে প্রথমে মেনে না নিলেও ধন্যমালিনীর ব্যবহারের সব ভুলে গিয়েছিল মন্দোদরী। সে নিজেকে বুঝিয়ে ছিল দশানন এই বিবাহ বাধ্য হয়েই করেছেন। বস্তুত দশানন মন্দোদরীকে মনেপ্রাণে ভালোবাসে।
মন্দোদরীর রূপে মুগ্ধ দশানন। জীবনে 'প্রেম 'শব্দটি যখন উপলব্ধি করতে শেখে মন্দোদরী তার জীবনে আসে দশানন। তাঁকে সর্বান্তকরণে স্বীকার করে সে। কিন্তু যে মুহূর্তে উপপত্নীকে দেখে মন্দোদরী তার জীবন যেন ঘন অন্ধকার হয়ে যায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন