পারমিতা চক্রবর্তী
দশানন ও মেঘনাদ যদি ইন্দ্রলোকে দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করত তাহলে ভারতবর্ষের উত্তরের রাক্ষসদের আধিপত্য বিলুপ্ত হত। তারা সবাই দশাননের ভাই কুবেরের অধীন। মেঘনাদের বয়স যখন ষোল বছর তখন সে এবং দশানন কুবেরকে পাল্টা প্রতিপক্ষের মুখে ফেলে। কুবের জানতেন তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মত ক্ষমতা তাঁর নেই। কুবের তার সম্পদ থেকে দশাননের সম্পত্তি অনুমোদন করতেন, পরিবর্তে তারা তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। তবে দশানন বুঝিয়ে দিতেন কুবেরকে যে তারা কতটা শক্তিশালী। একটা কথা শোনা যায় সে সময়, যে দশানন মেঘনাদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন গুরু শুক্রাচার্যের কাছে ফিরে যেতে চায় কিনা সে। সেখানে গিয়ে যাতে ভগবান শিবের আরাধনা করতে পারে। মেঘনাদ তাতে রাজি হয় যাতে সে সিদ্ধি লাভ করতে পারে এবং বিভিন্ন প্রকার অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী হয়।
দশ মাস পরে লঙ্কায় ফিরে আসে এবং যুদ্ধকলার গুরু হয়ে ওঠে। নানাশ্রী দশাননকে বিবাহের প্রস্তুতি শুরু করতে বলেন।
‘আমি আপ্লুত ইন্দ্রজিৎ- লঙ্কাপতি রাবণের পুত্র যার মধ্যে বিভিন্ন রকমের গুণ, শৃঙ্খলা বেড়ে উঠেছে অতি অল্প বয়সে। সে পরিচালনা করতে পারে ব্রহ্মাস্ত্র, পশুপাত অস্ত্র, বৈষ্ণবাস্ত্র’ নানাশ্রী বলেন।
‘ভারত দশানন সত্যিই ভাগ্যবান, তিনি পেয়েছেন এমন এক অনন্য পুত্রকে।’ বিভীষণ মজা করে মেঘনাদকে নিয়ে।
‘সে আমার প্রত্যাশার অতিরিক্ত।’ দশানন বলেন।
‘আপনার অনুমতি নিয়ে আমি বিবাহের প্রস্তাব রাখছি আমাদের জ্যেষ্ঠ পুত্র মেঘনাদের।’
মেঘনাদ হতচকিত হয়ে যায় নানাশ্রীর এমন কথা শুনে।
দশাননও ভ্রূ কুঞ্চিত হয় নানাশ্রীর প্রস্তাবে।
‘বিবাহের প্রস্তাব মেঘনাদের জন্য! এত শীঘ্র?’
মন্দোদরী এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করে, ‘প্রভু সে এখন সতেরোতে উত্তীর্ণ হয়েছে। এটাই উপযুক্ত সময় তার জীবন সঙ্গীকে যুক্ত করার।’
‘তাকে এখন বৈবাহিক সম্পর্কে বেঁধে ফেলতে চাইছ?’ দশানন হেসে ওঠে উচ্চকণ্ঠে।
‘ঠিক আছে আমি তোমাকে আদেশ দিলাম।’
‘আমার কাছে একটি প্রস্তাব আছে নাগরাজ শেষনাগের থেকে। তিনি তার কন্যার বিবাহ দিতে চান লঙ্কার রাজপুত্র ইন্দ্রজিতের সাথে।’ নানাশ্রী বলেন।
‘আপনার পছন্দ হয়েছে? আপনি কী তার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন?’ দশানন নানাশ্রীকে জিজ্ঞাসা করেন।
‘দুর্ভাগ্যবশত না। আমি তার একটি ছবি দেখেছি। আমি তার সৌন্দয্যের প্রশংসা শুনেছি।’ নানাশ্রী হালকা মজা করেন।
‘আপনি কী এমন কারণ দেখলেন তাতে মনে হলো সেই কন্যা মেঘনাদের যোগ্য হবে? দশাননকে কিছুটা চিন্তিত লাগে।
মন্দোদরী মেঘনাদের দিকে তাকিয়ে থাকে এই কথোপকথনে তার অভিব্যক্তি কি হয় দেখার জন্য। কিন্তু তার মুখে কোনরকম বহিঃপ্রকাশ নেই।
নানাশ্রী দশাননের প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে বলে যে, ‘প্রভু লঙ্কেশ আমি ইদানিং অনেক ছবি দেখেছি। মেঘনাদের জয়ের এই খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর আমার কাছে অনেক প্রস্তাব আসে। আমাদের প্রিয় রাজপুত্র বর্তমানে বিখ্যাত তীরন্দাজ, প্রতিভাবান বালক, শৃঙ্খলাপরায়ণ জ্ঞানবান এবং খুব সঙ্ঘবদ্ধ। আমি তেমনি গুণ দেখতে পাই ওই ছবিতে।’
‘মন্দোদরী আমি এখনও শঙ্কিত!’
‘আমি তোমার মতামত চাই মেঘনাদ। তুমি তাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে চাও? তুমি কি এই প্রস্তাবে রাজী?’দশানন প্রশ্ন করেন মেঘনাদকে।
‘যদি আপনি সম্মত থাকেন, তবে আমিও রাজি পিতা।’
দশানন পুত্রের কথায় কিছুটা স্তম্ভিত হয়।
নানাশ্রী আপনি খবর দিন উপজাতি রাজাকে সঠিক পদ্ধতিতে। বিভীষণ খুব শীঘ্রই তাকে ডেকে পাঠাবেন উপহার নিয়ে।
মেঘনাদের বিবাহের তারিখ ধার্য হয় শীঘ্রই।
মন্দোদরী শয়নের সময় গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসে কী ভাবে বড় হয়ে গেল এত ছোট্ট সন্তান! এখন তার বিবাহের বয়স হয়ে গেল। তার জীবন যেন একটা একটা মালার মতো স্তরে স্তরে সজ্জিত। প্রথমে কন্যা তারপর স্ত্রী এবং এখন শাশুড়ি। মন্দোদরী ও দশানন বড় আসবার ভর্তি করে জামাকাপড়, অস্ত্রশস্ত্র পাঠায় নাগাদের কাছে। মন্দোদরী মনে মনে ভাবে মেঘনাদের বিবাহ কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় হয়নি।তার পছন্দ করা কন্যার সাথে বিবাহ স্থির হয়েছে। মন্দোদরী নিজের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে তার পুত্রের বিবাহ তাঁর মতো রাজনৈতিক সমঝোতায় হয়নি।
নাগা উপজাতিদের প্রচলন হল বিবাহের পূর্বে কন্যাকে থাকার জন্য প্রাসাদ পাত্রীর পিতাকে কিনে দিতে হয় যৌতুক রূপে এবং বিভিন্ন প্রকার অলংকার দিতে হয় পাত্রের পক্ষ থেকে বিবাহের সময়। বিয়ের আগের রাতে দুই পরিবার একত্রিত হয়। ভোরের দিকে মন্দোদরী ঘুমায় মেঘনাদের কক্ষে। সে তার ভাইয়ের সাথে বসে থাকার কারণে মাকে লক্ষ্য করতে পারে না। প্রত্যেককে আনন্দিত দেখে মন ভরে যায় মন্দোদরীর।
বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিবাহে যোগদান করতে আসে বিভিন্ন দেশের রাজা, ইন্দ্রলোকের দেবগণ। দশাননের বানর বন্ধুগণ বালি,কিষ্কিন্ধ্যা রাজা আমন্ত্রণ পান এই অনুষ্ঠানে। দশানন এই উৎসবে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। তার প্রিয় পুত্রের বিবাহ উপস্থিত। পুরো ত্রিকোঠা শহরকে ফুল দিয়ে সাজানো হয়। গান্ধর্ব এবং গান্ধর্বী ডেকে আনা হয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য। দেবরাজ ইন্দ্র অপ্সরা রম্ভাকে পাঠান অনুষ্ঠান শুরু হবার আগে নৃত্য পরিবেশন করার জন্য। তার সৌন্দর্য্য অতুলনীয় কিন্তু তার থেকেও বড় হয়ে দাঁড়ায় ‘মেঘনাদ’ নামের মানুষটি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলে ইন্দ্রজিৎ, ইন্দ্রজিৎ নামে ডাকতে থাকে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হন গুরু শুক্রাচার্য। মেঘনাদকে বসানো হয় মণ্ডপের সামনে আগুনের উজ্জ্বল শিখার কাছে। গুরু শুক্রাচার্য যজ্ঞ পরিচালনা করেন। বধূ সুলোচনা সমস্ত অতিথি অভ্যাদের সাথে আলাপ করে অনুষ্ঠানে সুন্দর ভাবে। সে হেঁটে যায় সাদা ও সোনালী শাড়ি পরে। তার সৌন্দর্য্য আভিজাত্যপূর্ণ, চোখখানি মায়ামিশ্রিত। বিয়ে শেষ হবার পর সুলোচনাকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানায় রানিমহল থেকে। মন্দোদরী তাকে রুবি বসানো নয় থাকের সোনার নেকলেস প্রদান করে। আশীর্বাদস্বরূপ ধন্যমালিনী ন্যায়নন্দিনী বিভিন্ন রকমের গয়না উপহার দেয়। অন্তঃপুরে নারীরা তাকে নিয়ে নানা মজা করে কিন্তু তাতে সে একটুও প্রভাবিত হয় না। সুলোচনা তাদের বিদ্রুপকে হেসে উড়িয়ে দেয় এবং সকলের ভালোবাসার প্রার্থী হয়ে ওঠে। মন্দোদরী দেখে সন্তুষ্ট হয় তার পুত্রের জন্য সঠিক পাত্রী পছন্দ করেছে তারা। সেই বছর রাজপরিবারে বিয়ে লেগেই থাকে। ইন্দ্রজিতের বিবাহের পরে লঙ্কা সেনাবাহিনীর প্রধান অতিকায়া, ধন্যমালিনীর বড় পুত্রের বিবাহ হয়। একে একে সকল বড় থেকে ছোট ত্রিশির, নারান্তক এবং দেবত্বক সবার বিবাহ হয়ে যায়। দশানন ও তার রানিরা একে একে তাদের পুত্রদের সংসার গুছিয়ে দেয়। দশাননের অন্যান্য ছেলেদের মনে তাদের পদ নিয়ে অসন্তোষ জন্মায়। মীনাক্ষী এই সবকিছু থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। সে সব কিছুর জন্য দুষ্টবুদ্ধিকে দায়ী করে এবং নিজেকে আরো নিঃসঙ্গ করে তোলে। মন্দোদরী চেষ্টা করে সর্বদা মীনাক্ষীর পাশে থাকতে। কিন্তু তার মধ্যে ক্রোধের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে যায়। মন্দোদরী চেষ্টা করে লঙ্কার যে কোন কাজে মীনাক্ষীকে নিয়োগ করতে কিন্তু তার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তার যোগাযোগের একমাত্র কেন্দ্র খর এবং দুসন। তারা সর্বদা অসন্তুষ্ট থাকে দশানন এবং মন্দোদরীর উপর। বিভীষণের আধিপত্য কমে যায় লঙ্কায়। তার সব উপদেশ দরখাস্ত হয় এবং তাকে রাজ্যপাঠ থেকে নানাশ্রীর দ্বারা সরিয়ে রাখা হয়। কুবেরের সাথে যুদ্ধের সময় বিভীষণ দশাননকে বলেছিলেন চুক্তি করতে যাচ্ছে তিনি উত্তরের আধিপত্য ছেড়ে দেন কিন্তু দশানন তার উপদেশ প্রত্যাখ্যান করেন। দশানন চেয়েছিলেন যুদ্ধে কুবেরকে পরাস্ত করে তার রাজত্ব দখল করতে এবং আরও সমস্ত সম্পদ কেড়ে নিতে তার থেকে। মেঘনাদের বিবাহের পূর্বে কুবের এবং দশানন চুক্তিতে আসেন শান্তিপূর্ণভাবে। বিভীষণ নতুন নতুন পরিকল্পনা করেন যাতে লঙ্কার উন্নতি বৃদ্ধি পায়। বিভীষণ একটি নতুন সেতুর পরিকল্পনা করে সমুদ্রের ওপর যাতে সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশের সংযোগ স্থাপন করা যায়। দশাননের তা ঠিক পছন্দ হয় না। কারণ তিনি আকাশ পথে যেতে বেশি পছন্দ করতেন এবং সেতু নির্মাণ ব্যয় সাপেক্ষ হবে লঙ্কার পথে। বিভীষণের প্রত্যেক পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করা হয় বলে তার মনকষ্ট বাড়তে থাকে। বিভীষণ নিজেকে নিয়োজিত করে বিষ্ণুর কাছে যেতে দশাননের মতো শক্তিশালী হতে পারে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন