বজ্রজলা ও মন্দোদরী

পারমিতা চক্রবর্তী

দশানন দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান ধন্যমালিনীর সাথে। দশানন পছন্দ করেন তাঁর সাহচর্য। তার নিষ্পাপ বাকচর্চায় মাতা কৈকেসী মন্দোদরীকে সান্তনা দেবার কোন চেষ্টাই করে না। তিনি আশা করেন মন্দোদরী পুরো পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে। শীঘ্রই ফ্যারাওকন্যা সবার আলোচনার মুখ্য হয়ে ওঠে। অপরূপ সৌন্দর্য্য শুধুমাত্র মন্দোদরীর স্বামীকে নয়, অন্য পুরুষকেও আকৃষ্ট করা শুরু করে। যার ফলে রাজ মহলের নারীরা তার উপর ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। ফ্যারাওদের মধ্যে বিবাহ প্রথাগত নয়। সেই কারণে দশানন তাকে বিবাহ করেননি। তার সৌন্দর্য্য এতটাই ছিল যে প্রতিরাতে উপহার হিসেবে প্রদান করত দশানন এর কাছে নিজেকে। তাকে নিয়ে দিনের পর দিন ব্যস্ত হয়ে পরে দশানন। মন্দোদরীর একাকীত্ব জীবন বেড়ে যেতে থাকে। এই সময় মন্দোদরী সারাক্ষণ নিজের কক্ষে থাকত। সবসময় মাতা-পিতার কথা মনে পড়তে থাকে এবং মনে হয় তার সে যেন মায়ারাষ্ট্রে ফিরে যায়। বজ্রজলা তখন নিয়মিত ভাবে আসতে শুরু করে মন্দোদরীর কক্ষে। কুম্ভকর্ণ তখন অন্য এক মহিলাকে বিবাহ করেছেন। বজ্রজলা ও তার বুকে একই আগুন জ্বলে চলছে। তারা সারাদিন একসাথে কাটাত। সেই একমাত্র যে মন্দোদরীকে সঠিকভাবে বোঝে। কিছুদিনের মধ্যে বজ্রজলা মন্দোদরী ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে। নিজের বিবাহিত জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে সে। মন্দোদরীর বিবাহের মাত্র একবছর আগে কুম্ভকর্ণ ও বজ্রজলার বিবাহ হয়। কুম্ভকর্ণ পরবর্তীকালে অপর এক রাক্ষসী কন্যাকে বিবাহ করেন। কুম্ভকর্ণের বিকট উচ্চতা, ওজন ও সর্বক্ষণের ঘুমের কারণে বজ্রজলা কুম্ভকর্ণকে পছন্দ করত না। একদিন মন্দোদরীর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে প্রশ্ন করে, ‘বৌদি! আপনি কী  আপনার স্বামীর থেকে বেশি কাউকে ভালোবাসেন?’ চমকে যায় মন্দোদরী। সে স্বামী, পিতাশ্রী, মাতা, ভ্রাতা ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসার কথা কল্পনাও করতে পারে না।

মন্দোদরী কিছুটা ইতস্তত হয়। ব্রজজলা উত্তর দেয়, ‘আমি বুঝতে পারছি আপনার পক্ষে কতটা কঠিন হচ্ছে নিজের স্বামীকে অন্যের পাশে দেখতে এবং নিজের ভালোবাসাকে ভাগ করতে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমি ভালোবাসার চেষ্টা করছি যখন আমার স্বামীকে তখনই আমার স্বামী অন্য রাক্ষস কন্যাকে বিবাহ করেন। আমাদের মধ্যে এখন সন্তান এসে গেছে যারা সারাদিন আমায় ব্যস্ত রাখে কিন্তু একটি বিষয় আমি নির্ভয়ে বলতে পারি লঙ্কেশ্বর সর্বাধিক আপনাকেই  ভালোবাসেন।’ মন্দোদরী তার প্রত্যুত্তরে কোন শব্দ প্রয়োগ করতে পারে না। ব্রজজলা চায় হৃদয়ে হৃদয়ে বন্ধন ঘটানো কিন্তু মন্দোদরী বহুদিন আগেই সে হৃদয়ের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে নিজেই।

দশানন হঠাৎ একদিন বিস্ময়করভাবে প্রবেশ করে মন্দোদরীর কক্ষে। তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং দেখে মনে হচ্ছিল বহুদিন ভালোভাবে ঘুম হয়নি। কখনো এভাবে দেখতে প্রস্তুত ছিল না। মন্দোদরী রেগে যায় এবং দশাননকে আঘাত করবেন স্থির করে। তার দাসীদের এবং দশাননকে বলে সে একান্তে ঘুমিয়ে থাকতে চায়। আসলে সে অজুহাত খুঁজছিল। কিন্তু দশানন প্রায় জোর করেই মন্দোদরীর কক্ষে ঢুকে পরে।

‘লঙ্কেশ্বর আপনাকে খুব পরিশ্রান্ত লাগছে। সবকিছু কুশল তো?’ চিন্তামগ্ন হয়ে প্রশ্ন করে মন্দোদরী কোনদিনই ভাবতেই পারেনি এইভাবে দশাননকে কখনো দেখতে হতে পারে। যে সম্রাট নিজের পারদর্শিতায় দন্ডায়মান করেছে তার সম্রাজ্যকে সে নিজেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে না এটা ভাবা অসম্ভব মন্দোদরীর কাছে।

‘লঙ্কেশ ভগবান! কোনো ভুল তার সাথে কখনো হতে পারে না।’ মন্দোদরী দশাননের সাথে বিশেষভাবে বাক্যালাপে জড়ায় না। দশাননের অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় মন্দোদরীর কাছে খুব দুঃখের কারণ হয়ে ওঠে।  দশাননের এই রূপ মন্দোদরীর কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। দশানন প্রশ্ন করে, ‘তুমি কী তোমার স্বামীর উন্নতিতে খুশি নও মন্দোদরী? তুমি নিশ্চয়ই গর্বিত হবে এটা জেনে যে আমি নবগ্রহ গুরু দেবলোক জয় করতে সক্ষম হয়েছি। আমি অসুরকূলের অধীশ্বর। তোমার স্বামী, সমুদ্র, ভূমি অর্থাৎ ত্রিভুবনের অধিপতি দশানন এর কন্ঠে অহংকার ফুটে ওঠে।

মন্দোদরী দশাননকে কোন ভাবে সোজা করে তাদের শয়ন স্থানে শুইয়ে দেয়। রানি মন্দোদরীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়।

‘হে প্রভু! আমি সত্যিই গর্বিত কিন্তু আপনি আমার আমার থেকে কি প্রত্যাশা করেন? আপনার স্ত্রী যখন দেখেন আপনাকে অন্য নারীর সাথে তখন আর কি বা করার আছে? আমি আপনার উপর কীভাবে সন্তুষ্ট হবো? আপনি আমাকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিবাহ করলেন! এখন আবার তৃতীয় নারী। আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করে যখন ভাবি আপনার শয়নস্থানে অন্য কেউ আপনার পাশে।’

‘মন্দোদরী তুমি অন্য নারী নিয়ে ভেবো না তুমি নিশ্চয়ই জানো আমি তোমাকেই সর্বাধিক ভালোবাসি।’ দশানন মন্দোদরীকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করতে থাকে। দশাননের প্রতি নিঃশ্বাসে সুরার গন্ধ। মন্দোদরী যতবার ভালবাসতে চেয়েছে ততবার আঘাত পেয়েছে। সে জানতেই চায়নি মন্দোদরীর মনের খোঁজ। জীবনের সবথেকে প্রিয় মানুষকে পথভ্রষ্ট দেখলে কষ্ট হয় কিন্তু সে কথা কাকে বোঝাবে মন্দোদরী। দশাননের উশৃংখলতা কথা লোকমুখে শুনে আরো অপমানবোধ আরও বেড়ে যায় মন্দোদরীর।

মন্দোদরীর কাছে অন্তঃপুর নিয়ে কৌতূহল থেকেই যায়। ফ্যারাওকন্যাকে রাখা হবে শীঘ্রই। মন্দোদরী বিভীষণকে দেখেছিল প্রাসাদ তৈরিতে নিয়োজিত হতে। দশাননের অনুপস্থিতিতে তৎপর হয়ে  ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়। সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই প্রাসাদের আশপাশে অন্তঃপুরে সুরক্ষার দায়িত্ব বিভীষণের উপর পড়ে। দশানন এই প্রাসাদটিকে নবগ্রহ গুরুগণের নির্দেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নির্মাণ করেছিলেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই অবস্থানের দ্বারা অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ হয় বাস্তবিক জীবনে এবং যা কিনা রাজনৈতিক প্রভাবকে প্রভাবিত করতে পারে। নবগ্রহগুরুগণ হলেন দেবতা বা উপদেবতা দেবলোকের। একথা মনে করা হয় তাদের মত জ্ঞানী পৃথিবীতে শুধু না পৃথিবীর আশেপাশে কোন গ্রহে পাওয়া যায় না। তারা জ্যোতির্বিজ্ঞানের দ্বারা গ্রহের পূর্বাভাস জানাতেন। এটা কথিত আছে যে সাধনা, ধ্যানের দ্বারা তারা গোটা মহাবিশ্বের আবর্তন, উষ্ণতাকে নিজের মস্তিষ্কের সংযত করতে পারতেন। বলা হয়ে থাকে এই নবগ্রহগুরুগণদের মানুষ পূজিত করেন বিভিন্ন রূপে সূর্য, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, গুরু, চন্দ্র, শনি, রাহু, কেতু নবগ্রহগুরু। সূর্য ছাড়া চন্দ্র এবং গুরু শুক্রাচার্য ছাড়া বাকি গুরুদেব বন্দী করেছিলেন তিনি। মন্দোদরী এবং দশাননের বিবাহ হয়েছিল গ্রহের অবস্থান অনুকূল হওয়ার জন্য। সেই কারণেই দশানন মন্দোদরীকে বিবাহ করেন। রাজপরিবারের মহিলাগণ একত্রিত হয় এক সন্ধ্যায় এই অন্তঃপুর উদ্বোধনের জন্য। তারা প্রত্যেকেই ভবনের পাশে পরিক্রমা করে। মাতা কৈকেসী ভবনটির দ্বারোদঘাটন করেন। প্রত্যেকের জন্য খাবার আনা হয় এবং দাসীরা খাবার পরিবেশন করে। পুরো অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে মন্দোদরী। সমগ্র অনুষ্ঠানটি তত্ত্বাবধান করে ত্রিজাতা। ত্রিজাতা হল রাক্ষসী। মন্দোদরীর কক্ষে সর্বদা তাকে দেখাশোনা করে।

‘আপনার মহিমায় আমি এখন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাধীন। পূর্বে আমার দুটি গর্ভস্রাব হয়েছিল। বর্তমানে আমি চিকিৎসার দ্বারা আবার গর্ভবতী এবং আমার চিকিৎসা চলছে। আমার সন্তানের ওপর যাতে কোনো খারাপ প্রভাব না পড়ে।’ ত্রিজাতা মন্দোদরীর কাছে জানায়।

‘এক্ষেত্রে তোমার কিছুদিন বিশ্রামের প্রয়োজন তুমি তোমার সমস্ত কাজ থেকে ছুটি নাও।’ ত্রিজাতার কাজ রাজপরিবারের সকল দাস-দাসীদের পরিচালনা করা এবং তাদের উপস্থিতি হিসাব রাখা। ত্রিজাতা এই পরিবারের বিশ্বস্ত দাসী এবং রাজ পরিবারের সকল স্ত্রীলোকেরা তার গুপ্ত শ্রেণির লোকেরা তাঁকে গুপ্ত সম্পর্ক, স্বামীর সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে অবগত। বিভীষণ তাকে বোনের মতো দেখে। সরমা ত্রিজাতাকে পরিবারের একজন ভাবে।

মন্দোদরীর দু চোখ পড়ে যায় ফ্যারাওকন্যা এবং তার দাস-দাসীদের উপর। তারা অনুষ্ঠানটি একপাশে বসেছিল এবং তাদের উপস্থিতি মন্দোদরীকে বিব্রত করে। বজ্রজলা দূর থেকে বুঝতে পারে মন্দোদরীর মনের অবস্থা এবং সে বারবার চেষ্টা করে মন্দোদরীর মন ভালো করার। ‘বৌদি মন্দোদরী আপনি নিজেকে কীভাবে ব্যস্ত রাখবেন আগামী দিনগুলোতে?’

দশাননের উপপত্নী অর্থাৎ ফ্যারাওকন্যার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে  উত্তর দেন, ‘আমার বিবাহ হয়েছে এই রাজ্যের রাজার সাথে এবং আমি যথাযথভাবে গ্রহণ করেছি তাকে। আমি একমাত্র নারী যে দশাননকে ভালোবেসে বিবাহ করেছি কিন্তু আজ মনে হচ্ছে এই বিবাহ শুধুমাত্র রাজ্যের স্বার্থের কথা ভেবে হয়েছিল। বিবাহ হয়েছিল রাজনৈতিক মেলবন্ধনের জন্য সন্ধিক্ষণের জন্য।’ বজ্রজলা  প্রত্যুত্তরে জানায়, ‘আমার স্বামীর থেকে দশানন অনেক ভালো। যে কিনা সর্বক্ষণ ঘুমিয়ে কাটায়।’ মন্দোদরী কখনও বজ্রজলার সাথে মতবিরোধ করতো না। মন্দোদরী তার দিকে করুণাবসত তাকিয়ে তাকে উত্তর দেয়, ‘আমি শুনেছি কুম্ভকর্ণের নিদ্রার কথা। তাই আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিনি বিস্তারিতভাবে। তুমি কি আবার বিবাহ করতে চাও?’

‘আমি কুম্ভকর্ণকে বিবাহ করি তার ঘুমের বর পাওয়ার তিন বছর পর। আমি এটাও জানি না এটি বর না অভিশাপ।’ বজ্রজলার গলায় তীব্র অভিমান ধরা পড়ে।

বজ্রজলা মন্দোদরীকে দশানন  এবং কুম্ভকর্ণের প্রজাপতি ঋষি  ব্রহ্মার থেকে বর পাওয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করে। দশানন, বিভীষণ এবং কুম্ভকর্ণ ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করতে উত্তরের পর্বতের দিকে যাত্রা শুরু করেন। মাসের পর মাস তপস্যা করে দশানন সন্তুষ্ট করেন শিবকে। বর হিসেবে পান চন্দ্র'র তরবারি। এরপর তারা আবার যাত্রা শুরু করে উত্তর দিকে এবং প্রতিজ্ঞা করে ব্রহ্মার থেকে বর গ্রহণ করবেন। ব্রহ্মা হলেন তাদের প্রপিতামহ।

দশানন এবং কুম্ভকর্ণ মাসের-পর-মাস তপস্যা করেন। বিভীষণ সামলান দশাননের রাজত্বপাট। তিনি তাদের আশ্বস্ত করেন বহিরাগত দ্বারা কোন ক্ষতি হবেনা লঙ্কার। শীত আগত হয়, গ্রীষ্ম, বর্ষা আসে একের পর এক। কিন্তু তারা এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে দুই হাতের তালু জোড়া করে। মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে ব্রহ্মার আরাধনা করেন।

তাদের প্রার্থনা শুধুমাত্র ব্রহ্মাকে নয় দেবলোকের সকল দেবতার উপর প্রভাব পড়ে। দেবরাজ ইন্দ্র তাদের তপস্যায় চিন্তিত হন। তিনি জানতেন তাঁর ভাই কুবেরকে দশানন সমস্ত সম্পত্তি রাজত্বপাট থেকে বঞ্চিত করেছেন। দশাননের দৃষ্টি পড়েছে ইন্দ্রলোকের উপর। ইন্দ্রলোক পর্বতের উপর অবস্থিত এবং তাকে স্বর্গের উদ্যান বলা যায়। দেবরাজ মানুষকে খরা এবং দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করেন তার পরিকল্পনাতেই বৃষ্টি এবং জল আসে ভূখণ্ডে। যখন ইন্দ্র তার ভাইদের তপস্যায় দেখেন বিপদের আশঙ্কা করেন এবং তার রাজত্ব যে সংকটে পড়বে তা বোঝেন। ইন্দ্র ফিরে আসেন তাঁর রাজত্বে এবং নিমন্ত্রণ করেন দেবী সরস্বতীকে। দেবী স্বরস্বতী হলেন শক্তির প্রধান দেবী। সকল দেবতাদের মধ্যে তাকে জ্ঞানের দেবী হিসেবে ধার্য করা হয়। ইন্দ্র অন্যান্য দেবতাদের কাছে আহ্বান করেন তার রাজত্বকে রক্ষা করার জন্য। ইন্দ্র জানতেন দশানন এবং কুম্ভকর্ণের লক্ষ্য ইন্দ্রলোকের আধিপত্য বিস্তারের দিকে। তাই তিনি দেবী সরস্বতী কাছে প্রার্থনা করেন যাতে এদের মস্তিস্কের  চিন্তার পরিবর্তন করা যায়।

কিন্তু দশানন এবং কুম্ভকর্ণ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় তপস্যার মাধ্যমে ইন্দ্রাসন দখল করার জন্য। তাদের সামনে ব্রহ্মার আবির্ভাব হয় এবং তারা কি বর চায় তার জন্য প্রশ্ন করেন।

‘তোমরা সবাই তপস্যার দ্বারা আমাকে সন্তুষ্ট করেছো। বলো তোমরা কি চাও পুত্রগণ?’

‘আপনি শুধু এই বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তাই নন আপনি আমাদের প্রপিতামহ। আমরা তৃতীয় পুরুষ আপনার পুত্র প্রজাপতির পুলস্তের। আমাদের পিতা ঋষি বিস্রবা প্রজাপতি ঋষি পুলস্তের পুত্র ছিলেন। দশানন এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললেন এবং আরও জানান, ‘আমি অমরত্ব চাই যাতে এই পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে পারি।’

ব্রহ্মা উত্তর দেন, ‘আমি তোমায় এরূপ বর কোনোভাবেই কোনো অবস্থাতেই দিতে পারব না। পুত্র প্রত্যেক জীবনের মৃত্যু আছে এই পৃথিবীতে। ইহা ছাড়া অন্য যে কোন প্রকার বর চাও। আমি তোমাদের নিবিড় তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়েছি। আমাদের সম্পর্কগত কারণে আমি এই মাটির সবটুকু সাথে জড়িত। তোমরা আমার আপনজন।’ ব্রহ্মার উত্তরে কিছুটা ভালোবাসার ছোঁয়াও দেখা যায়।

দশানন পরবর্তীতে জিজ্ঞাসা করেন ভগবানের থেকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে চায় সম্পূর্ণ ঐশ্বরিক ভাবে। সে যাতে দৈত্য, অপদেবতা, নাগ এবং সমগ্র পৃথিবীর বন্যশ্রেষ্ঠর মধ্যে অন্যতম হতে পারে। সে যাতে অপরাজেয় হয় দেবতা, অসুর, যক্ষ, রাক্ষস, পিশাচ, অপ্সরা, গন্ধর্ব, বেতাল এবং প্রেত সম্প্রদায়ের মধ্যে। ব্রহ্মা দশাননকে সেই বর দান করেন এবং তাকে অতিরিক্ত শক্তি ও অস্ত্র প্রদান করেন। দশাননকে যুদ্ধের জন্য তীর ধনুক প্রদান করেন যা শ্রেষ্ঠত্ব চিহ্নরূপে গৃহীত হয়।

ব্রহ্মা তারপর কুম্ভকর্ণের দিকে ফেরেন,‘তুমি সর্বদা তোমার ভাইকে অনুসরণ করবে কোন প্রকার জিজ্ঞাসা, দ্বন্দ্ব ছাড়াই। তোমরা সমবয়ষ্ক। তুমি সর্বদা তাঁর বিচারের উপর আস্থা রাখবে এবং চিরকাল দশাননের পাশে থাকবে। তোমার যা বাসনা তাই পাবে তুমি।’

কুম্ভকর্ণ ব্রহ্মার দিকে দুটি হাত বাড়িয়ে বলেন, ‘প্রিয় ভগবান আমি আমার ভাইকে দেবলোকের সিংহাসনের মুকুটপরা অবস্থায় দেখতে চাই। আমার ভাই যেন ত্রিভুবনের শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠেন।’

‘প্রিয় পুত্র তোমার ভাই ইতিমধ্যেই নিজের বর গ্রহণ করেছে তুমি এখন তোমার তপস্যার উপহারস্বরুপ বর প্রার্থনা করো।’

দেবরাজ ইন্দ্র দেখে এরপর কুম্ভকর্ণ সিংহাসনের ব্যাপারে আবারও প্রশ্ন করে। ইন্দ্র ইতিমধ্যেই দেবী স্বরস্বতীর কাছে প্রার্থনা করেন কুম্ভকর্ণ যাতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। দেবী সরস্বতী কুম্ভকর্ণের জিভে অবস্থান করে এবং তার জিভকে ঈষৎ ছোট করে তার কথা বলার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেন।

‘বল পুত্র তুমি কি চাও?’ ব্রহ্মা প্রশ্ন করেন কুম্ভকর্ণকে।

‘নিদ্রাসনা’ বলেন কুম্ভকর্ণ কাঁপা কাঁপা জিভে।

‘তথাস্তু! তাই হবে।’

তথাস্তু বলার পর সরস্বতী তার জিভের উপর থেকে সরে যায়। কুম্ভকর্ণের শরীরে হঠাৎ পরিবর্তন আসে তার শরীর দুর্বল হয়ে আসে এবং চোখ ঘুমে ভরে যায়।

‘আমি এমন অনুভব করছি কেন প্রভু?’ প্রশ্ন করেন কুম্ভকর্ণ।

‘প্রিয় পুত্র তুমি নিদ্রাসনে আছো। এই বরের দ্বারা তুমি সারা জীবন ঘুমিয়ে কাটাবে।’ ব্রহ্মা উত্তর দেন।

‘কিন্তু প্রভু আমি তো ইন্দ্রাসন চেয়েছিলাম, ইন্দ্রলোকের সিংহাসন।’ কুম্ভকর্ণ ভয় পেলেন এবং অনুভব করলেন যে অজ্ঞাত ভাবে ভুল উচ্চারণ করেছে সে।

‘তুমি যা চেয়েছো আমি তোমায় সেই বর দিয়েছি পুত্র এবং তুমি মাত্র একটি বর চেয়েছিলে।’

‘কিন্তু আমি নিদ্রার বর চাইনি প্রভু। দয়া করে এই বর তুলে নিন আমার উপর থেকে। আমার তপস্যা এইভাবে বিফলে যেতে দেবেন না।’ কুম্ভকর্ণ কথা থামার সাথে সাথেই নিদ্রায় চলে যান। তিনি ক্লান্ত অনুভব করেন। তার শরীরের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ব্রহ্মা বুঝতে পারে কুম্ভকর্ণ বর চাওয়ার সময় কোন ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে এবং স্বেচ্ছায় সেই বর চায়নি।

‘ঠিক আছে পুত্র। আমি এই বরের সীমা নিয়ন্ত্রণ করলাম। তোমার ঘুম দুটি চাঁদ পরপর বিস্তৃত হওয়া পর্যন্ত থাকবে তারপর তুমি সাধারণ জীবনে ফিরে আসবে।’  ব্রহ্মা জানান কুম্ভকর্ণকে। পরপর দুটি বর দেওয়ার পর তৃতীয় বর দেন ওই দিনেই। তাদের ভাই বিভীষণ সর্বদা নিঃস্বার্থভাবে দুই ভাইয়ের পাশে থাকবেন। ভারত বিভীষণ যুগ শান্তির বার্তা বহন করবে।’ বজ্রজলা জানায় মন্দোদরীকে।

‘ভারত বিভীষণের রাজত্বকাল? তিনি কী কোন রাজত্ব শাসন করছেন?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে বজ্রজলাকে।

‘না বৌদি। কিন্তু তিনি লঙ্কার বেশিরভাগ প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লঙ্কেশ্বর তাঁকে নতুন নতুন পরিকল্পনা সম্পূর্ণকরণের নিয়ন্ত্রক করে দেন।’

মন্দোদরী বুঝতে পারে বজ্রজলা বিভীষণের খুব কাছের এবং তার খুব প্রিয়। তাকে নির্দ্বিধায় যেকোনো বিষয়ে বলা যায়। এই বর নিয়ে কোন কথা কারো সাথে বলতে পারেনা বজ্রজলা। সে মন্দোদরীকে বলে, ‘আমাদের দুজনের সামাজিক মর্যাদা পার্থক্য থাকলেও পরিস্থিতির বিচারে আমরা দুজনেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। আমাদের দুজনের জন্য সহানুভূতি ছাড়া অন্য কিছুই থাকতে পারেনা।’

কিছুদিনের মধ্যেই বজ্রজলা এবং মন্দোদরী দুই বন্ধুতে পরিণত হয়। তাদের দুজনের মধ্যে মনের মিল এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছায় তারা বেশিরভাগ সময় একই কক্ষে অবস্থান করে। সারাদিন সন্তান প্রতিপালন করেন এবং মন্দোদরীর সাহচর্যে দিন কাটে। প্রথমদিকে কুম্ভকর্ণকে বজ্রজলা ভালোবাসার চেষ্টা করলেও পরবর্তীকালে সরে আসে কুম্ভকর্ণের জীবন থেকে।

সকল অধ্যায়
১.
অহল্যা, দ্রৌপদী, সীতা, তারা, মন্দোদরীপঞ্চসতীর প্রতি নিবেদন
২.
সূচনা
৩.
বাল্য ও কৈশোরে মন্দোদরী
৪.
বিবাহ পর্যায়ে মন্দোদরী
৫.
দশাননের দ্বিতীয় বিবাহ ও মন্দোদরী কথা
৬.
বজ্রজলা ও মন্দোদরী
৭.
অমৃতের সন্ধানে দশানন ও তার প্রতিক্রিয়ায় মন্দোদরী
৮.
দশানন, বালী ও মন্দোদরী
৯.
মহান্ত, মাতা কৈকেসী ও মন্দোদরী
১০.
মন্দোদরী ও ঋষি ঘৃতস্মদা
১১.
আত্মশ্লাঘা ও মন্দোদরী
১২.
জীবন সন্ধিক্ষণে মন্দোদরী
১৩.
মন্দোদরী ও দশানন
১৪.
মন্দোদরী ও পুত্র মেঘনাদ
১৫.
মিথিলার স্বয়ম্বর ও দশানন
১৬.
যোদ্ধা মেঘনাদ
১৭.
মেঘনাদের বিবাহ ও মন্দোদরী
১৮.
দন্ডকারণ্যে মীনাক্ষী
১৯.
সীতা হরণ ও মন্দোদরী
২০.
বানর ও লঙ্কা
২১.
অহিরাবণ
২২.
যুদ্ধে মেঘনাথ ও মন্দোদরী
২৩.
লঙ্কার রানি মন্দোদরী
২৪.
ফিরে দেখা
২৫.
ঋণ স্বীকার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%