পারমিতা চক্রবর্তী
মন্দোদরীর জীবন স্তব্ধ। নিজেকে দেখতে পায় ঘাসের উপর হেটে যেতে, চারপাশে সবুজ মাঠ ঘিরে থাকে, সে শুনতে পায় কেউ যেন মুখ চেপে হাসছে। তাকায় চারদিকে কে দেখার জন্য এবং দেখে একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়েকে হেঁটে আসছে তার দিকে। মেয়েটি খুব সুন্দরী। কিছু সময়ের জন্য মনে হয় এটা যেন সে। ছোটবেলার মন্দোদরীকে দেখতে পায় সে। মেয়েটি হাসছে এবং খেলা করছে। মন্দোদরীর ইচ্ছে হয় কে সে জানার জন্য। হাত বাড়ায় মেয়েটিকে ধরার জন্য। কিন্তু সে চলে যায়।
মন্দোদরীর সারা শরীরে একটা ঝাঁকুনি লাগে। মাথা ভারি হয়ে আসে এবং অদ্ভুত রকমের যন্ত্রণা করতে থাকে ঘাড় থেকে গলা পর্যন্ত। দাসীরা ছুটে আসে তাকে সাহায্য করার জন্য।
‘আপনার অনেক মহিমা, আপনি এতদিন শুয়েছিলেন। আপনার এখন বিশ্রাম দরকার। আমি চিকিৎসককে ডেকে পাঠাচ্ছি। দয়া করে শুয়ে থাকুন।’ একজন দাসী বলেন।
জ্ঞান ফিরেছে রানির। কিছুমাত্র আগেই চোখ খুলে তাকিয়েছেন। আমাদের উচিত এই সংবাদটি দেওয়া লঙ্কেশ্বরকে।
‘তার জীবন দীর্ঘজীবী হোক। রানি চোখ মেলে তাকিয়েছেন।’
‘চিকিৎসককে ডেকে পাঠাও আমরাও কী এখনও তাকে বিশ্রামে রাখব?’
চিকিৎসক এলেন এবং পরীক্ষা করলেন রানির নাড়ি স্পন্দন। কিন্তু মন্দোদরী যেন অজ্ঞানের মতো হয়ে থাকে বিগত দু'দিন ধরে যবে থেকে ওই বিষাক্ত তরল পান করেছিল। ওই জিনিস রাখা ছিল একটি পাত্রে শান্তি ভবনে এবং আরও বেশি বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল ওটির মধ্যে ঋষির রক্ত পড়ার ফলে। মন্দোদরী নিজেকে আরও অসুস্থ বোধ করতে থাকে যখন সেই ঘটনাগুলো মনে পড়তে থাকে। তার নিজের মুখে রক্তের স্বাদ লেগে থাকে, বমি পেতে থাকে এবং চিকিৎসক তাকে বলে এটির কারণ সম্ভবত বিষক্রিয়া।
দশানন মন্দোদরীর ঘরে প্রবেশের ঘোষণা শোনা যায়। নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে না সে দশাননের সাথে সাক্ষাত করার জন্য। চিকিৎসক মন্দোদরীর শরীরের বৃত্তান্ত দশাননকে জানায়। মন্দোদরী চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকার ভান করে। মনে মনে উপলব্ধি করে সে নিজে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে। তিনি রানি এবং এই ঘটনাতে তার স্থান ক্ষুণ্ণ হয়েছে লঙ্কাতে। সে তার স্বামীকে ছোট করেছে। অপরদিকে মন্দোদরী একা ফিরে যায় পুরোনো দিনগুলিতে যখন তার স্বামী ব্যতীত নিজে কার্যকলাপের দ্বারা। মন্দোদরী একজন পরাজিত স্ত্রী। নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের স্বামীকে ভাগ করে নিতে হয় অন্য নারীদের সাথে। মন্দোদরী একজন প্রত্যাখ্যাত, সংগ্রামী নারী যে ব্যর্থ রাজা স্বপ্নপূরণে। দশানন মন্দোদরী শয্যারপাশে বয়সে তার হাত নিজের হাতের নেয়।
‘মন্দোদরী তুমি কি শুনতে পাচ্ছো আমার কথা প্রিয়তমা? দয়া করে চোখ খোলো আমি গভীর ভাবে দুঃখিত যা কিছু ঘটে গেছে। পুরো দোষ আমার। কথা বলো শুনতে কি পাচ্ছো তুমি?’
মন্দোদরী চোখ খুলে তাকায় দশাননের দিকে। ‘প্রভু আমি দুঃখিত যা ঘটেছে তার জন্য। আমি বুঝতে পারছি না আমার কী বলা উচিত। আমার এখন কী করা উচিত তাও বোধগম্য হচ্ছে না।’
‘তোমাকে কোন কিছু ব্যাখ্যা করতে হবে না। এটা সম্পূর্ণ আমার ভুল। আমি তাকে প্রভাবিত করেছি এই ধরনের ঘটনা ঘটানোর জন্য। আমি ভাবতেই পারি না আমার রাগ তোমার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আমি তোমাকে প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম।’
‘আমরা উভয়েই অপরাধী প্রভু। আপনি অপরাধী আপনার ক্রোধ, হিংসার জন্য - আমি অপরাধী আমার ধৈর্য্য, সহনশীলতা কম থাকার জন্য। আমার ব্যক্তিত্ব হারানোর জন্য। আমি আমার বেঁচে থাকা নিয়ে ভাবি না প্রভু। আমার ব্যথা যন্ত্রণা থেকে মৃত্যু অনেক ভালো।’
‘যা ঘটেছে ভুলে যাওয়া উচিত। আমি চিকিৎসকের দ্বারা আশ্বস্ত হয়েছি যে তুমি এই মুহূর্তে ভালো আছো। এক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমি আশা করব তুমি ভুলে যাবে আগের সমস্ত ঘটনা এবং আমি তোমাকে সমস্ত কিছু ভুলতে সাহায্য করবো।’
‘আমি চেষ্টা করব প্রভু। আমার হৃদয় অন্য কথা বললেও আমি চেষ্টা করব।’
আমি তোমার সাথে পরে কথা বলব। নানাশ্রী এবং মাতা কৈকেসী আসবেন আজ তোমাকে দেখতে। আমি তোমাকে আরো ভালো দেখতে চাই। দশানন মন্দোদরীকে চুম্বন করে চলে যায়।
মন্দোদরী আগের থেকে বেশি কিছুটা ভালো হয়ে ওঠে এবং তার বমি ভাব কমে যায়। সে উপলব্ধি করে নিজেই নিজেকে পরিচালনা করতে পারছে, আস্তে আস্তে হাঁটতে শিখেছে। সে সারাদিনের বেশিরভাগ সময় শুয়ে থাকে। প্রতিদিন পরিবারের কেউ না কেউ আসে দেখতে। ওষুধের দ্বারা দিনের বেশিরভাগ সময় আচ্ছন্ন থাকে সে। ধন্যমালিনী, বজ্রজলা, সরমা দিনে দুবার করে দেখতে আসে স্বাস্থ্যের উন্নতির খবর নিতে। ন্যায়নন্দিনী আসে দেখতে কিন্তু তাদের পরিবারের সকলেই চিন্তিত। ত্রিজাতার সম্প্রতি গর্ভস্রাব হয়, সেও আসে পরিদর্শন করতে মন্দোদরীকে। দশানন মায়ারাষ্ট্র থেকে মাইকে আনে যাতে মন্দোদরী তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে। দশানন ভেবেছিল পিত্রালয় থেকে যদি কেউ আসে তাহলে তার যথাযথ পরিচর্যা হবে। মানসিক সুস্থতার সাথে শারীরিক সুস্থতাও হবে।
কিছু মাস পর ত্রিজাতা চিকিৎসককে ডেকে পাঠায়। সে লক্ষ্য মন্দোদরী খাদ্যাভাসের মধ্যে কিছু পরিবর্তন এসেছে। মন্দোদরী ইদানিং টক জাতীয় খাবার বেশি পছন্দ করছে কিন্তু মিষ্টি জাতীয় খাবার খেতেই চায় না। ত্রিজাতা লক্ষ্য করেন মন্দোদরী চোখে-মুখে পরিবর্তন এসেছে এবং কিছুকিছু ঘটছে তার মধ্যে। কাউকে না জানিয়ে চিকিৎসক জানান মন্দোদরীকে পরিদর্শনের জন্য চিকিৎসক মন্দোদরীর শয্যাপাশে বসে তাকে পরীক্ষা করে, ‘আপনাকে যা ওষুধ দেয়া হয়েছে তা সঠিক সময়ে গ্রহণ করা হয়?’
‘হ্যাঁ কিন্তু বমি ভাব কমছে না। আমি এই ওষুধ খাওয়ার পর আরও বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ি।’ মন্দোদরী জানায়।
‘এই ওষুধ আপনাকে হয়েছে এই কারণে যাতে আপনার শরীরের রক্তে যে দূষিত প্রবেশ করেছিল তা যাতে পুরোপুরি ধ্বংস হয়। আপনার ওষুধের তালিকা কোন ঘুম ঘুম ভাব আসে এমন ওষুধ দেওয়া হয়নি।’
‘কিন্তু তিনি তো সারাদিন ঘুমের মধ্যে থাকেন।’ ত্রিজাতা চিকিৎসকে জানায়।
চিকিৎসক প্রশ্ন করেন, ‘আমি দেখলাম আপনাকে যা যা ওষুধ দেওয়া হয়েছে সেগুলি আবার। আপনার মাসিক পর্যায়কাল সঠিকভাবে হচ্ছে নাকি বন্ধ আছে?’
‘আমার এই ঘটনার পর আমি ঠিক মনে রাখতে পারিনি শেষ মাসিক কাল।’
‘ঠিক আছে আমি পরে আপনাকে দেখতে আসব।’ বলে তিনি চলে যান।
চিকিৎসক তাকে আবার দেখতে আসেন। দেখে বোঝেন তার স্বাস্থ্য খুব শীঘ্রই উন্নতি হচ্ছে। তিনি তার হৃদস্পন্দন, পিত্ত ইত্যাদি দেখে কিছু লক্ষণ অনুভব করলেন।
‘পরীক্ষার দ্বারা বোঝা যাচ্ছে মন্দোদরী মা হতে চলেছেন।’ চিকিৎসক জানান।
‘কী বললেন? আবার বলুন...’
‘আপনার মধ্যে যা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে আপনি সন্তানসম্ভবা।’
মন্দোদরীর হৃদগতি যেন আরো তীব্র হয়। একটি আবেগ কাজ করে তার মধ্যে। দুঃখে, আনন্দে কেঁদে ফেলে মন্দোদরী। ত্রিজাতা মন্দোদরীর থেকে আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে এই সংবাদ পেয়ে। কিন্তু চিকিৎসকের মুখ ও আচরণ অন্য কথা বলে। তার মধ্যে কোনরকম আনন্দ দেখতে পায় না মন্দোদরী।
‘কি হয়েছে? কিছু কী ভুল হয়েছে?’ মন্দোদরী প্রশ্ন করে।
‘আমি এখনই কিছু বলতে পারছিনা। আমাকে আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে আপনার মাতৃত্ব সঠিক কিনা তা যাচাই করার জন্য। আপনি সঠিকভাবে বলুন আপনার এই মাসের ঋতুস্রাব কবে হয়েছে?’ কিছুই জানাতে পারে না সে।
‘যাইহোক আপনার যা করার আছে আপনি করুন। কিন্তু আপনি এই নিয়ে এত সন্দেহ প্রকাশ করছেন কেন?’
‘ভুলে যান সব। যদি আমি আপনাকে আপনার মাতৃত্বের লক্ষণ সঠিক বলি তবুও আমি আপনাকে পরামর্শ দেবো আপনি নিজেকে আগে পরীক্ষা করুন তারপর সবাইকে খবর দেবেন আপনার এই সুসংবাদের কথা।’
‘কেন? এটি একটি আশীর্বাদ ... এত সুখবর...’ ত্রিজাতা কিছুটা থেমে যায়।
আমার মনে হয় ওই দূষিত বস্তু ভ্রুণটিকে বেড়ে ওঠাতে বাধা দিয়েছে। এক্ষেত্রে মনে হয় সন্তানকে আপনার পৃথিবীতে না আনাই ভালো। চিকিৎসক জানায়।
‘এটি অসম্ভব সম্পূর্ণরূপে।’ প্রতিবাদ করে মন্দোদরী।
‘ভুল বুঝবেন না। যদি এই পরীক্ষাগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় আপনি সন্তানসম্ভবা তাহলে আপনাকে বলব খুব কঠিন সময় আপনার জন্য এবং এই পর্যায়টি খুব জটিল সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য। রোগের লক্ষণগুলো আরও জটিল। আপনি যদি চান তবে আরও পরীক্ষা করতে চাই।’
‘তার আর কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে আদেশ দিচ্ছি আপনি কোনো ভাবেই এই সংবাদটা কাউকে বলবেন না। আমার যদি আপনার থেকে কোন রকম আর প্রয়োজন পড়ে তাহলে আমি আপনাকে দেখে পাঠাবো কিন্তু মনে রাখবেন কোন ভাবেই এ কথা কাউকে বলবেন না।’
‘আপনার এই গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে।’ ত্রিজাতা চিকিৎসককে কক্ষের বাইরে নিয়ে যান।
পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে মন্দোদরী। চোখ খুলতেই দেখে মাই বিছানার পাশে বসে। কিছুটা অবাক হলেও খুশি হয়।
‘কেমন আছ রাজকন্যা? আমি তোমার অভাব অনুভব করছি। ওহ! আমি দুঃখিত। আমার ছোট ছোটকন্যা এখন রানি। কি সুন্দর তোমার কক্ষখানি। প্রাসাদটি কী সত্যিই পুরো সোনার! দেওয়ালগুলো সোনার পাত দিয়ে এবং সোনার রং দিয়ে তৈরী!’
‘মাই মায়ারাষ্ট্রে সবাই কেমন আছেন? মাতা, পিতাশ্রী সবাই ভালো আছেন তো? তোমাদের সবাইকে খুব অনুভব করি।’
‘সবাই ভালো আছেন। আমরা সবাই তোমার শরীর নিয়ে চিন্তিত। লঙ্কেশ্বর একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন তোমার শরীর নিয়ে আমার কাছে। তা পড়েই মনে হয়েছে কিছু দুর্ঘটনা নিশ্চই ঘটে গেছে। তিনি জানিয়ে ছিলেন তুমি সুস্থ হয়ে উঠেছো। লঙ্কেশ্বর জিজ্ঞাসা করে পাঠান বার্তাবাহকের সাথে আমি আসতে পারব কিনা? তোমাকে খুব ম্লান লাগছে মন্দোদরী। তুমি কি সুস্থ আছো? সব কিছু ঠিক আছে তো? লঙ্কেশ্বর তোমাকে যথাযোগ্য সম্মান দিচ্ছেন তো?’
‘আমি ঠিক আছি চিন্তা করো না। আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই। আমি এই কথা কাউকে বলিনি কারণ আমি আগে নিশ্চিত হতে চাই তারপর ঠিক করবো এ কথা কাউকে বলা উচিত হবে কিনা।’
‘কী হয়েছে রাজকন্যা?’ মাই জিজ্ঞাসা করে।
মন্দোদরী ত্রিজাতাকে বাইরে যেতে বলে গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য।
আগে তুমি আমাকে আশ্বস্ত করো তুমি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া জানাবে না আমি আশা করি তুমি আমাকে সাহায্য করবে আমাদের একজন চিকিৎসক বলেছেন আমি মা হতে চলেছি সম্ভবত কিন্তু তিনি বলেছেন কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে পারছেন না। আমি যে বিষাক্ত পদার্থ পান করেছিলাম সেই বিষক্রিয়ার প্রভাব ভ্রূণটি ওপর পড়েছে। তার ফলে আমার সন্তানের কোন উন্নতি হয়নি।’
‘কোন বিষক্রিয়ার কথা বলছ? যা তুমি পান করেছিলে?’ মাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে।
‘আমি আর পরীক্ষা করতে চাই না।’ মন্দোদরী উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে বলে। মাই জানায়, ‘যদি ওষুধের দ্বারা তাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় তবে আমাদের তাই করা উচিত।’ মন্দোদরী মাইয়ের থেকে একথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হয় এবং জানতে চায়, ‘আমার কী করা উচিত সেটাই প্রশ্ন করে। ত্রিজাতা একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে দূরে। সে পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে এগোতেই তাদের কথাবার্তা শুনে ফেলে। তখন সে বলে ‘যদি আপনি এই সন্তানকে রাখতে চান তবে অবশ্যই তা বলা উচিত রাজাকে।’
‘না কেউ বলবেন না। আমি তোমাদের থেকে প্রতিজ্ঞা চাই যে তোমরা কেউ এই সন্তানের খবর কাউকে জানাবে না।’ ‘কেন আপনি এমন কেন ভাবছেন?’
‘আমার সন্তান বিপদের মধ্যে আছে। আমি খুব মানসিক ভাবে সুস্থ নই। যদি তোমরা বলে দাও সবাইকে তবে সতর্ক করে দেবে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে। তারা প্রত্যেকেই আমার কাছে জানতে চাইবে বাচ্চাটিকে নষ্ট করে দেওয়ার জন্য। আমি নিশ্চিত সন্তান নিয়ে কোন প্রকার ঝুঁকি নিতে তিনি চাইবেন না দশানন। কোন অসুস্থ সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চাইবেন তিনি। কিন্তু আমি চাই এই সন্তান পৃথিবীতে আসুক।’
‘কিন্তু এটাই উপযুক্ত সময়। যদি ওই সন্তানকে মাতৃগর্ভে রাখতে কোনো ঝুঁকি থাকে তবে তাকে নষ্ট করে দেওয়াই শ্রেয়। কেন একটি অসুস্থ শিশুকে পৃথিবীতে আনার জন্য ব্যথা নেবে? এটা শুধুমাত্র ব্যথা নয় ...এই অসুস্থতা তোমার সন্তানকে সারাজীবন বহন করবে।’ মাই বর্ণনা করে।
‘মাই আমি চাই আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে। আমি অনুভব করতে চাই সন্তানকে আমার গর্ভে। কিন্তু যদি সবাই জেনে যায় তবে এখনই অপেক্ষা করা যাবে না। আমি দেখতে চাই আমার সন্তানের বৃদ্ধি আমার গর্ভে। এখন তুমি আমাকে সে ব্যাপারে সাহায্য করবে।’
‘আমি সর্বদা তোমার পাশে আছি রাজকন্যা। কিন্তু তুমি কীভাবে লুকিয়ে রাখবে তোমার মাতৃত্বকে? কিছু মাসের মধ্যেই এটা তোমার শরীরে বোঝা যাবে। অসম্ভব হবে তখন এই সংবাদটি লুকিয়ে রাখতে।’
‘আমি দশাননকে বলব আমি পিতা মাতার সঙ্গে দেখা করতে মায়ারাষ্ট্র যাবো। আমি কিছুদিন সবার থেকে দূরে থাকবো। যতদিন আমার সন্তান বড় হবে আমার ভিতর। যদি সবকিছু স্বাভাবিক থাকে তবে সবাইকে জানাবো এ সংবাদ।’
মন্দোদরী সিদ্ধান্তে তারা খুব চিন্তিত এবং উত্তেজিত হয়ে পড়ে। মন্দোদরী নিজেকে প্রস্তুত রাখে। সে ভীত হয় তার সন্তানের জীবন নিয়ে। মন্দোদরী ভাবে তার মাতৃত্ব যেন সহজভাবে হয় যা প্রত্যাশা করছে এতদিন। চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করে ভগবান শিবের কাছে। ভগবান যেন তার সন্তানকে এবং তাকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে। কিছুদিনের মধ্যে মন্দোদরী বমি বমি ভাব কেটে যায় এবং হাঁটাচলা জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে। তাকে সর্বদা দেখেশুনে রাখে মাই এবং সমস্ত ওষুধ বন্ধ করে দেয়। মন্দোদরী অন্যদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। তাদের পরিবারের সবাই সুস্থ হওয়ার জন্য উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। মন্দোদরী অন্তঃপুরে কিছু মহিলাকে দেখতে পায় তার কক্ষে। তাদের নাম মনে রাখতে পারে না।
‘তোমাকে খুব ভালো লাগছে। তোমার জীবন সুখ ও শান্তিতে ভরে উঠুক।’
‘ধন্যবাদ মাতা। সকলের মধ্যে আপনাকে এখানে দেখে খুব খুশি হয়েছি। আমি আমার কক্ষে একা থাকতে থাকতে একঘেয়ে হয়ে পড়েছিলাম। সবাই আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা প্রকাশ করেছে। আপনাকে দেখে এখন আমার আরো ভালো লাগছে।’
‘ভালো আছো শুনে খুব ভালো লাগলো কিন্তু আমি তোমায় বলবো আরো কিছুদিন বিশ্রাম নিতে। দশাননের তোমাকে খুব দরকার মন্দোদরী। তোমার উপদেশ তার খুব কাজে লাগে। তুমি তার সাথে কিছু সময় কাটাবার চেষ্টা করো। বহু মানুষ তোমাকে দেখতে চায়।’
‘আমি বুঝেছ মাতা। কাল থেকেই আমার কাজে যোগদান করব।’
আস্তে আস্তে বললেন, ‘তোমাকে দেখে খুব খুশি হবে দশানন। আমি চাই সর্বদা তোমরা খুব সুখে থাকো এবং খুব তাড়াতাড়ি তোমার জীবনে মাতৃত্ব আসুক।’
‘মাতা কী মাতৃত্ব নিয়ে সম্ভাবনার কথা জানতে পেরেছে? মন্দোদরী নিজেই দায়ী করে গোটা ঘটনার জন্য। কিন্তু সে বিস্মিত হয় এমন ঘটনার জন্য। সেদিন সন্ধ্যায় মন্দোদরী সবাইকে জিজ্ঞাসা করেছে এমন ঘটনার কথা কে মাতাকে জানিয়েছে? মন্দোদরী আবার পুরোনো দিনে ফিরে যায়। সে দশাননকে জানায় তীর্থযাত্রা যেতে চায়। পরবর্তীদিন সকালে মন্দোদরীর ঋতুস্রাবের লক্ষণ দেখতে পায়। ত্রিজাতা তাকে জিজ্ঞাসা করে তার বিছানার চাদরের লাল রক্তের দাগ কেন? চিকিৎসককে আবার ডেকে পাঠানো হয় দাসীদের দ্বারা এবং সবাই বলেন মন্দোদরীর ঋতুস্রাব হয়েছে।
দশানন খুব খুশি হয় মন্দোদরীকে রাজদরবারে আসতে দেখে। ‘স্বাগত তোমায় মন্দোদরী। আমি বোঝাতে পারবোনা আমি কতটা সুখী হয়েছি এটা দেখে তুমি সুস্থ ভাবে ফিরে এসেছো।’
‘লঙ্কেশ্বর আপনার সান্নিধ্য এতদিন হারাচ্ছিলেন মন্দোদরী। আমরা আপনাকে স্বাগত জানাই।’ নানাশ্রী বলেন।
‘বলো আমরা কী ভাবে পালন করব তোমার এই সুস্থ হয়ে ফিরে আসাকে? আমরা এক মহাভোজের আয়োজন করতে পারি?’ দশানন জিজ্ঞাসা করেন।
‘আমি এভাবে ফিরে আসতে পেরে খুব খুশি। যদি উৎসব পালন করা কথা বলেন তবে আমি অন্য ভাবে পালন করতে চাই। আমি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রার্থনা করতে চাই। সে উদ্দেশ্যে তীর্থযাত্রা কথা বলেতে চাই আপনাকে। আমি চাই আপনার নিরাপত্তা, উন্নতি, অগ্রগতি। আমি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য তীর্থযাত্রা যেতে চাই।’
‘তীর্থযাত্রা কেন? তুমি তো এখানে পুন্য অর্জন করতে পারো। অবশ্য তুমি যেখানে খুশি যেতে পারো।’
‘না প্রভু আমি তীর্থযাত্রা জন্যেই ভারতবর্ষে পূর্ণ স্থানে যেতে চাই। আমি আমার প্রাসাদকে শুদ্ধ রাখতে চাই। আমি এই পবিত্র স্থানের জল আপনার জন্য আনতে চাই।’
‘কিন্তু তার জন্য অনেক মাস দরকার। আমি তোমাকে এত মাসের জন্য ছেড়ে থাকতে পারব না এবং তুমি কাদের সাথে যেতে চাও?’
‘আমি চাই হিমালয়ের আশেপাশে যেতে এবং গঙ্গার জলে স্নান করে শুদ্ধ হতে। আমি যেতে চাই বদ্রিকাশ্রম। অনেকদিন হলো আমি মাতা, পিতাশ্রীকে দেখিনি। আমি চাই কিছু সময় কাটাতে চাই ওনাদের সাথে। যদি আপনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন তবে তীর্থযাত্রার পরে আমি মায়ারাষ্ট্র যেতে চাই।’
দশানন তখনও মানতে চাইছিলেন না।
‘প্রিয় প্রভু, আমি আপনাকে জোর করতে চাইছি এটা শুধুমাত্র কয়েক মাসের ব্যাপার। আমি ফিরে আসবো শীঘ্রই। সুন্দর, পবিত্র মন নিয়ে।’
দশানান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। মন্দোদরী স্বাস্থ্য এবং মুখের দিকে তাকিয়ে মেনে নেন।
‘ঠিক আছে তুমি যা চাইছ তাই হবে। আমি তোমাকে তীর্থযাত্রা যাবার অনুমতি দিচ্ছি কিন্তু তোমাকে তোমার যাত্রা পূর্ণ বিবরণ আমাকে দিতে হবে।’
দশানন বিভীষণের এর দিকে তাকায়, ‘বিভীষণ মন্দোদরীর যাবার জন্য কী কী দরকার এবং একটি বিশ্বস্ত দল ও দাসীদের তাদের সাথে পাঠাও। মন্দোদরী তার সাথে যাকে নিতে চায় সে বিষয়ে কথা বলে নাও।’
‘বিভীষণ অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকে মন্দোদরীর দিকে।দেখে মনে হয় দশানন তাকে খুব কঠিন একটি কাজ দিয়েছেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন