সুব্রত রুজ

ছানার মিষ্টি: ভাজামিষ্টি
ছানার ভাজা মিষ্টি বললে প্রথমেই মনে আসে তিন বোন— লেডিকেনি, পানতুয়া আর ল্যাংচা। এক এক করে আলোচনা করছি।
পানতুয়া: পানতুয়া আগে এসেছে, লেডিকেনি পরে। পানতুয়ার উপকরণ হল ঘি, ছানা, ক্ষীর, বেকিং পাউডার, চিনি, ময়দা ও সুগন্ধের জন্য এলাচ, গোলাপজল আর গোলাপি আতর।
পানতুয়া করতে হলে ময়দাকে ঘি দিয়ে ময়ান দিয়ে মেখে তারপর তার সঙ্গে ছানা, চিনি, খোয়া ও এলাচগুঁড়ো যোগ করে নিতে হবে। এরপর কেউ গোলাপজল বা গোলাপি আতর দেন, কেউ দেন না। এবার ঘিয়ে ফেলে ভাজা। লালচে রং ধরলে কড়া থেকে নামিয়ে রসে ফেলা।
পানতুয়ার রস একদম জলরস। অনেকের মতে পানতুয়া নামটি এসেছে পানি তাওয়া বা জলের মতো পাতলা রস থেকে। তবে আমার মতে কথাটায় গোলমাল আছে। পানি মানে জল এটা তো ঠিক আছে, কিন্তু তাওয়া মানে রস ওটা একদম মিলছে না। কথাটা ‘প্রাণতোষা’ অর্থাৎ কিনা যা প্রাণকে তোষণ করে, এটা হলে তবু একটু মেলে। প্রাণতোষা থেকে পানতোয়া হওয়া ধ্বনিবিজ্ঞানের নিয়মেই সম্ভব।
লেডিকেনি: লেডিকেনির জন্মদাতা হিসাবে ভীম চন্দ্র নাগের নাম শোনা যায় এবং এই মিষ্টি ১৮৫৮ সালে লেডি ক্যানিং-এর জন্মদিন উপলক্ষ্যে লর্ড ক্যানিং-এর অনুরোধে তৈরি হয়। বিশদ বিবরণ আমার ‘কুক কেলভির ঘড়ি’ গল্পে আছে (এই বইয়ের শেষে সে গল্প আছে)।
দিদিমার কাছে ভীম নাগ মশায়ের লেডিকেনির যে প্রস্তুতপ্রণালী শুনেছি তা পানতুয়ার মতোই, খোয়াওলা। আবার তাঁর ভাগনেবাড়ি অর্থাৎ আমার মামার বাড়িতে যে লেডিকেনি তৈরি হয়, তাতে খোয়া থাকে না। ভেতরের বড়ো এলাচের দানাটা অবশ্য দু-জায়গাতেই আছে। রসটাও পাতলা।
রূপায়ণ ভট্টাচার্য ২০১৫ সালে ‘এই সময়’ পত্রিকায় পানতুয়া ও লেডিকেনি নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তিনি বিভিন্ন দোকান ঘুরে পানতুয়া ও লেডিকেনি আস্বাদন করেছেন। তাঁর মতে পানতুয়া এখন গোলাপজাম ঘেঁষা মিষ্টিতে পরিণত হয়েছে। কথাটা ঠিকই। বস্তুত পানতুয়ার বৈশিষ্ট্য যে পাতলা রস, সেটাই আস্তে আস্তে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
রূপায়ণবাবুর লেখা অনুযায়ী পানতুয়া ও লেডিকেনি এখন এক হয়ে গেছে। লেডিকেনির রস দিয়ে মুড়ি, রুটি এসব খাওয়া যাবে, পানতুয়ার রস এতটাই মোটা তা আলাদা করে খেতে গেলে গা গুলোবে। আমাদের এখানে অর্থাৎ দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চলে বাঙালি দোকানেও পানতুয়া বলে যা করে আসলে গুলাবজামুনই, তফাত শুধু ছানাতে। খুব নামী দু-একটা দোকান ছাড়া কলকাতার সব দোকান ঘুরে এভাবে পানতুয়া বা লেডিকেনি আমি খাইনি। কাজেই রূপায়ণবাবুর লেখাটা রেফারেন্স হিসাবে নিলাম। নিজে মোদকসন্তান হওয়ার এই এক বিপদ। বাইরের মিষ্টি প্রায় খাওয়াই হয় না। বেড়াতে গিয়ে যেটুকু খেয়েছি।
ল্যাংচা: শক্তিগড়ের ল্যাংচার ইতিহাস বেশ পুরোনো। সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যালের “রূপমঞ্জরী” অনুসারে ল্যাংচার জন্ম নদিয়ার কৃষ্ণনগরে। সেখানকার রাজকন্যার সঙ্গে বর্ধমানের যুবরাজের বিয়ে হয়। কৃষ্ণনগরের রাজকন্যার প্রিয় মিষ্টি ছিল এই ল্যাংচা। একদিন সে ল্যাংচা খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল। বর্ধমানে আর ল্যাংচা কোথায়? কিন্তু রাজবধূ খেতে চেয়েছে, অতএব ‘ঝাড়ো টেলিগ্রাম। পাকড়ো শালেকো কহিঁ ভি হোয়; চাহে লন্ডন, চাহে প্যারিস।’
কৃষ্ণনগর থেকে ল্যাংচার কারিগরকে নিয়ে আসা হল বর্ধমানে। সেই কারিগর একটু খুঁড়িয়ে চলতেন। তার থেকে মিষ্টিটারই নাম হয়ে গেল ল্যাংচা। আরও দু-একটা গল্প শোনা যায়। সবকটার উপজীব্য একই, কারিগরের পায়ে দোষ ছিল, তার থেকে মিষ্টির নাম ল্যাংচা।
ল্যাংচার উপাদান সব পানতুয়ার মতোই, কিন্তু কারিগরিতে তফাত আছে। ল্যাংচার আসল কারিগরি হল তার ভাজা। কড়া ভাজায় কালচে বাদামি রং ধরে ওপরটা শক্ত হয়ে যায়। রস খাইয়ে খাইয়ে ল্যাংচাকে নরম করে দিতে হয়। এই কায়দা শক্তিগড়ের বাইরে খুব কম লোক জানেন। বিভিন্ন জায়গায় যেসব ল্যাংচা খেয়েছি, হয় লম্বা কালোজাম, নয় লম্বা পানতুয়ার থেকে খুব একটা আলাদা মনে হয়নি। তারাপীঠের ল্যাংচারও নাম আছে, কিন্তু আমার খেয়ে খুব একটা আহামরি কিছু মনে হয়নি। শক্তিগড়ের ল্যাংচার স্বাদ আরও ভালো। দু-একটি দোকানের ল্যাংচা শক্তিগড়ের কাছাকাছি গেছে। আমার মনে হয় তারাপীঠের ল্যাংচার নাম তার লম্বা লম্বা আকারের জন্য। দেড় ফুট, দু ফুট ল্যাংচা তৈরি করা অবশ্যই বিশিষ্টতার দাবি রাখে। তবে শক্তিগড় বাজারের একটি দোকানে যে ল্যাংচা খেয়েছি, জি টি রোডের দোকানগুলোকে বলে বলে একগন্ডা গোল দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
নিখুঁতি: নিখুঁতিকে নির্দ্বিধায় ল্যাংচার তুতো বোন বলা যায়। কিংবদন্তি অনুসারে নদিয়া জেলার শান্তিপুরের ভাগাড় মোড়ে আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে ভোলা নামক এক ময়রার দোকান ছিল। তাঁর কিশোরী কন্যা নিখুঁতি এই মিষ্টির জন্মদাত্রী।
নিখুঁতি করতে গেলে ল্যাংচার মতোই উপকরণ লাগে; অর্থাৎ ছানা ও ময়দা। হুগলি জেলায় ক্ষীরও পেয়েছি। ল্যাংচার সঙ্গে শান্তিপুরের নিখুঁতির তফাত হল নিখুঁতির আকার সরু আঙুলের মতো; আর এতে প্রচুর গোলমরিচ থাকে। চিরচিরে ঝাল ও মিষ্টির যুগল স্বাদের অনুভূতি লিখে বোঝানো যাবে না।
রানিগঞ্জের নিখুঁতিরও নাম আছে। এখানের নিখুঁতিতে ছানার সঙ্গে ময়দা আর সফেদা মিশিয়ে কড়া করে ভাজা হয়। তারপর রসে ফেলে কিছুক্ষণ রেখে রস ঝরিয়ে তোলা হয়। শান্তিপুরের নিখুঁতির মতো রসে ফেলা থাকে না। এখানকার নিখুঁতি মচমচে শক্ত, শুকনো শুকনো; রেখে খাওয়া যায়। বাঁকুড়ার নিখুঁতিও একইরকম। স্বাদে ও টেক্সচারে শান্তিপুর ও রানিগঞ্জের নিখুঁতির আকাশপাতাল ফারাক।
‘মিষ্টান্ন পাক’ বইতে আবার নিখুঁতির যে বর্ণনা দেওয়া আছে তাতে নিখুঁতি লাড্ডুজাতীয় কিছু। প্রথমে সফেদা, ময়দা ও খাসা (কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করেছি। জিনিসটা কী সঠিক কেউ বলতে পারল না।) একসঙ্গে মেখে ঘিয়ে দানা দানা করে ফেলে ভেজে নিয়ে তারপর রসে ফেলে হাতে করে লাড্ডুর মতো বেঁধে নেওয়া। এ নামে হয়তো কিছু ছিল।
স্মৃতি মণ্ডল মুখার্জি লিখেছেন তিনি বাপের বাড়ি কামারকুণ্ডুতে যে নিখুঁতি খেয়েছেন তাতে ঝাল নেই। ওই অঞ্চলের হরিপাল রেলগেটে আমি যে নিখুঁতি খেয়েছি তাতেও গোলমরিচ নামমাত্র। সবটাই মিষ্টি। প্রায় ল্যাংচা। কলকাতার নিখুঁতিও মিষ্টি। আসলে যে এলাকায় যা চলে। আমাদের গুড়কাঠিতে ঝালই বেশি, গুসকরা, কাটোয়ায় ঝাল নেই বললেই চলে। গুসকরাতেই একরকম গুড়কাঠি খেয়েছিলাম ঝালছাড়া তিল দেওয়া; এক্কেরে মুরলীগজার বেসন অবতার।
ছানার জিলিপি: ওড়িয়াদের দাবি পাহালা অঞ্চলে এর জন্ম। এই দাবির পালটা দাবি এখনও শুনিনি। নদিয়া জেলার মুড়াগাছা একসময় ছানার জিলিপির জন্য বিখ্যাত ছিল, তাঁরাও ছানার জিলিপি আবিষ্কারের দাবি করেননি। কাজেই বেনিফিট অফ ডাউট ওড়িয়াদের পক্ষে যাবে।
ছানার জিলিপির উপকরণ ল্যাংচা বা পানতুয়ার মতোই। ছানা, ময়দা, বেকিং পাউডার, ঘি ও চিনি। মেচাপর্বে যে দিদির কথা বলেছি উনি একটু সুজিও দেন। সব উপকরণ পানতুয়ার মতো মেখে লম্বা লম্বা করে নিয়ে তারপর পেঁচিয়ে ঘিয়ে ভেজে রসে ফেলা। বর্ধমান ও বাঁকুড়ায় একটু কড়া ভাজে, হুগলি নদিয়া মুর্শিদাবাদ ও কলকাতায় একটু হালকা। এগুলো খেয়েছি। বাকি জায়গারগুলো জানা নেই।
মেদিনীপুর জেলার কেশপুর ও ডেবরায় পাওয়া যায় মুগের জিলিপি। আমি কখনও খাইনি। এক বন্ধুর পাঠানো ছবিতে দেখলাম ছানার জিলিপির মতোই দেখতে, কিন্তু ওপরটা লালচে না, সোনালি। উপকরণ মুগের বেসন, সফেদা, ঘি ও চিনি।
ছানাবড়া: মুর্শিদাবাদের ছানাবড়া খুব বিখ্যাত। ছানাবড়া সম্ভবত এখানকার লালবাগে আবিষ্কার হয়। লালবাগের নিমাই মণ্ডল বা খাগড়ার পটল ওস্তাদ এই দুজনের একজন এর আবিষ্কারক। কাশিমবাজারের রাজা মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর হাত ধরে ছানাবড়া কলকাতায় আসে ও মুর্শিদাবাদের বাইরে জনপ্রিয় হয়। তবে আমাদের এদিকে কোনও দোকানে করতে দেখিনি। জনশ্রুতি এককালে নাকি হামেশা দশসেরি বিশসেরি আধমনি একমনি ছানাবড়া তৈরি হত। সেই ছানাবড়া দেখে চোখ যেরকম বিস্ফারিত হত তার থেকেই চোখ ছানাবড়া কথাটা এসেছে।
বহরমপুরের ছানাবড়া খেয়েছি। ভেতরটা জালি জালি, রসে ভর্তি, ওপরটা কালোজামের মতো কড়া করে ভাজা। খেয়ে মনে হল বেলাকোবার চমচমের কায়দায় ঢিমে আঁচে ভাজা। উইকিপেডিয়ায় দেখলাম লেখা আছে প্রথমে ঢিমে তারপর কড়া আঁচে ভাজা হয়। তা হবে। চোখের সামনে হতে দেখিনি, আর দোকানে গিয়েও খাইনি। মোবারক বলে ইউনিভার্সিটির এক বন্ধুর বাড়ি ছিল বহরমপুরে; সে বাড়ি থেকে এনে খাওয়াত। এসব গল্প ওর কাছেই শোনা। পরে ক্রসচেক করতে গিয়ে উইকিতেও দেখলাম আছে।
চিত্রকূট: কলকাতায় খুব চলে। জিনিসটা পানতুয়া, তবে চৌকো আকারের। গোটা চার-পাঁচ ক্রিমক্র্যাকার বিস্কিট পরপর রাখলে যেমন আকার হবে, তেমনি। ওপরে একটু খোয়া বা পেস্তা-বাদামের কুচো দেওয়া। বিয়ের তত্ত্বের মিষ্টি হিসাবে বেশি চালু।
সীতাভোগ: বর্ধমানের মিহিদানা ও সীতাভোগ উভয়েই ভৈরব নাগ মশায়ের আবিষ্কার। সীতাভোগ বানাতে হলে ছানার সঙ্গে তিন এক অনুপাতে ছানা ও সফেদা মিশিয়ে ছান্তা দিয়ে সেউভাজার মতো করে ঘিয়ে ফেলে ভেজে নিয়ে রসে ফেলতে হবে। সীতাভোগ কিন্তু হালকা ভাজতে হবে। নচেৎ এর রং লালচে হয়ে যাবে, রসও ঠিকমতো ঢুকবে না। এই ভাজাটিই কারিগরের ওস্তাদি।
সীতাভোগ নামটি কী করে হল তা নিয়ে দুরকম মত শোনা যায়। সুকুমার সেনের মতে কথাটা সিতাভোগ। সিত অর্থাৎ সাদা।
দ্বিতীয় মতটি হল সীতাভোগে যে সফেদা দেওয়া হয় সেই চালটারই নাম সীতাভোগ। সেখান থেকে কথাটা এসেছে। এখন সীতাভোগ চালটি পাওয়া যায় না, কামিনীভোগ বা গোবিন্দভোগ ব্যবহার করা হয়। কেউ বা বাসমতী চাল ব্যবহার করেন। দ্বিতীয় মতটি বর্ধমানের মোদকমহলেই চালু আছে।
ছানার পোলাও প্রায় একই বস্তু। ছানার পোলাওয়ে চৌকো চৌকো ঘনকাকৃতি পানতুয়ার মতো একটি মিষ্টি ছড়ানো থাকে। বাদাম, কিশমিশ ও গোলাপজলও ব্যবহার করা হয়। ছানার পোলাও ও সীতাভোগ-এর মূল পার্থক্য রঙে। ছানার পোলাও জাফরানের রঙে রঙিন, সীতাভোগ সাদা। অনেকের মতে ছানার পোলাও থেকে সীতাভোগের উৎপত্তি, তবে আমার নিজের মতে উলটোটাই। আগে সীতাভোগ, পরে পোলাও। নয়তো ছানার পোলাও-এর মালিকানার দাবি উঠত।
শেষপাতে মাতৃভোগ। পানতুয়ার ভেতর আমন্ড বা কাজু বাটা ও খোয়ার পাক ভরে ভেজে রসে ফেললে যা দাঁড়াবে, সেটাই মাতৃভোগ। আকার কোথাও গোল, কেউ চপের মতো চ্যাপটা করেন। এ মিষ্টি ভাজার কাজে ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা দুটোই লাগে। মাঝারি আঁচে ঢুলিয়ে ভাজাটাই এর বৈশিষ্ট্য। ইদানীং কারিগরের অভাবে বহু দোকানে মাতৃভোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন