সুব্রত রুজ
[এই বইয়ের বিভিন্ন অংশে ঘুরেফিরে এসেছে লেখকের ‘কুক কেলভির ঘড়ি’ গল্পটির কথা। বিশেষত লেডি কেনির জন্ম প্রসঙ্গে। মিষ্টির ইতিহাস নিয়ে একখানা গল্প আদপে মিষ্টিই। শেষপাতে তাই সে গল্পের স্বাদ নিতে আশা করি, পাঠক দ্বিধা করবেন না।]
হেড কারিগর বলরাম নিপুণ হাতে কড়ায় তাডু় চালাচ্ছে, ভীম উনুনের পাশে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে কড়ার দিকে তাকিয়ে আছে। বলরামের হাতের টানে ছানার তাল আর পয়রা গুড় একটু একটু করে মিলেমিশে গিয়ে কড়াপাকের চেহারা নিচ্ছে। সারা দোকান গুড়ের সুবাসে ম-ম করছে।
কাছেই পাটায় বসা একটি ছেলে একমনে হাতের তালু দিয়ে পাটায় ঘষে ঘষে ছানা বাটছিল। ভীম তার কাছে গিয়ে বাটা ছানাটা বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর সাহায্যে পরীক্ষা করল।
“আর একফেত্তা বাট। এট্টু কচা কচা আচে। মাকম হেন মোলাম না হলি আর কিসির কড়াপাক। এ কি নোকড়োর দোকান পেয়েচিস?”
পরাণ ছেলের কথা শুনে ফিক করে হেসে ফেললেন। ভীম কেন যে কথায় কথায় নকুড়ের খোঁটা দেয় কে জানে। এককালে নকুড় আর তিনি দুজনেই কড়াপাকের নামজাদা কারিগর ছিলেন। এখন বয়েসের কারণে নিজেরা বিশেষ দরকার ছাড়া হাত লাগান না। নকুড়ের কড়াপাকে ছানা সাড়ে তিনফেত্তা বাটে, তিনি চারফেত্তা। যে কারিগরের যেমন তার। তবে একটু কম মোলায়েম করার একটা কারণ হতে পারে জলভরা। চন্নগরের সুজ্জি ময়রা জব্বর একখান মাল বানিয়েছিল বটে। দুখানা তালশাঁস সন্দেশ জোড়া দিয়ে তার ভেতরে কড়ে আঙুলের চাপে সামান্য গর্ত করে চামচে টাক গোলাপজল ভরে গর্তের মুখখানা ফের সন্দেশ দিয়ে বন্ধ করা। বাবুরা খেয়ে একবারে রাস্তায় গড়াগড়ি। নকুড় তাকে আরেট্টু কায়দা করেছে। ওর জলভরায় গোলাপজলের বদলি গোলাপের বাসওলা পাতলা রস, কিংবা নলেন গুড়। আবার চন্নগরের মতো দাঁড় করিয়ে না রেখে শুইয়ে রাখে। চন্নগরের ছানা আবার মাখন হেন মোলাম, কলকাতার একটু কচা।
এখন গোটা কলকাতা নকুড়ের কায়দা ধরেছে। তিনি নিজেও খেয়ে দেখেছেন, চমৎকার। মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখের মধ্যে গলে গিয়ে কড়াপাক আর নলেনের সুবাসে একবারে অমৃত।
তবে হ্যাঁ, বাপেরও বাপ আছে। তিনি পারেননি, কিন্তু ভীম চন্নগরকে পালটা দিয়েছে। প্রায় একই কায়দায় তৈরি অমৃতকলস, কলশির মতো দেখতে, ভেতরে বড়ো এলাচ পেস্তা দেওয়া খোয়াক্ষীর কাজুবাটার পাক। সেও কলকাতা জুড়ে নাম করে ফেলেছে। ভীম এইটুকু বয়েস থেকেই পাকা কারিগর। বাপ-ঠাকুদ্দার কাছ থেকে যা কাজ শেখার শিখেছে, কিন্তু ওতে ওর পেট ভরেনি। উড়িয়া কারিগরের কাছে খাজা বানানো শিখেছে, পশ্চিমা কারিগরের কাছে মোতিচুর, গজা, দরবেশ। এ পাড়ায় অনেকগুলো মিষ্টির দোকান, খদ্দের টানার জন্যে সবাই কিছু না কিছু নতুন মাল বানাবার চেষ্টা করে। ভীম এই ব্যাপারে মহারথ। এই তো কবছর আগে ছানা, খোয়া, পেস্তা, গোলাপজল দিয়ে একখানা মাল নামিয়ে সবার সামনে ধরল; মুখে দিয়ে তাঁর মতো তিন পুরুষের বনেদি কারিগরেরও উলটে পড়ার জোগাড়। বলরাম বামুন মানুষ, সে হাতজোড় করে পেন্নাম করল। ছোঁড়াগুলো ধপাধপ গড় হয়ে পায়ের ধুলো নিল। খেতে ভালো হয়েছিল, কিন্তু এখানে চলবে কি না তা নিয়ে একটু ধন্দ ছিল, কারণ এখানকার বাবুরা একটু চড়া মিষ্টি পছন্দ করে, নতুন মিষ্টিটা চার এক ভাগের, একটু হালকা মিষ্টি। বসাকবাড়ির পাঁচুবাবুকে একদিন চাখতে দেওয়া হল, তিনি মুখে দিয়েই বললেন, “আবার খাবো।” ওই নামটাই মুখে মুখে চাউর হয়ে গেল। সেদিন তিনি মনে মনে স্বীকার করেছিলেন ছোঁড়ার এলেম আছে বটে। অনেক কষ্ট করে দোকান দিয়েছেন তিনি, এ দোকান রাখতে পারবে।
বউবাজারের বাবুরা মিষ্টি খেতে পারে বটে। সকালে বিকেলে জলখাবারে জিলিপি, বোঁদে মালপো রসগোল্লা কিংবা সন্দেশ, রাতে ভাতের পাতেও মিষ্টি। বাবুদের মিষ্টি ছাড়া চলে না, তার একটা কারণ বোধহয় প্রায় সবাই বোষ্টম মানুষ। বাড়িতে বাড়িতে গিরিধারী, মদনমোহন, গোপাল, জনার্দন। বাড়ির চৌহদ্দির ভেতরে মাছ মাংস খাওয়া দূরস্থান, নাম নেওয়া বারণ। তো মানুষগুলো খাবেটা কী?
ওইজন্যেই তো এ পাড়ায় এক হাত পরপর মিষ্টির দোকান। শ-তিনেক লোক করেকম্মে খাচ্ছে।
রাস্তার দিকে তাকিয়ে পরাণ ঈষৎ চিন্তিত হলেন। গলা তুলে বললেন, “কই রে, হল তোদের? একপ’র বেলা যেতে গেল, একুনি তো জানবাজার থেকে সরকার মশায় এইসে যাবেন।”
জানবাজারের রানিমা গঙ্গার পারে দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণী প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেখানে পুজো দিতে গেলে প্রতিবার দশ সের বারো সের সন্দেশ নিয়ে যান। এ ছাড়াও অনেক বাঁধা বাড়ি আছে। ভোগের মিষ্টির আলাদা বাসন, আলাদা উনুন। কারিগররা সকাল সকাল গঙ্গাস্নান সেরে শুদ্ধবস্ত্রে সেই সন্দেশ তৈরি করে। তারপর দিনের কাজ শুরু হয়। আজ বলরামের সঙ্গে ভীমও রানিমার বায়নার মিষ্টি বানানোর কাজে হাত লাগিয়েছে।
ভীম কোমর থেকে ট্যাঁকঘড়ি বার করল। খোদ বিলেতের জিনিস, কী এ্যাট্টা নাম বলেছিল ভীম, কুক কেলভি না কি। কলকাতায় ট্যাঁকঘড়ি এখনও আমদানি হয়নি, কোনও এক সায়েব খদ্দেরকে ধরে ভীম বিলেত থেকে আনিয়েছে। ওর খুব শখের জিনিস, কাউকে ছুঁতে অবধি দেয় না। ভীম বলল, “অ্যাকন সাড়ে আটটা বাজে বাবা, সক্কার মশায়ের আসতে আরও পোঁয়ারো মিনিট। আপনে উতলা হবেননি।”
পরাণ পুরোনো আমলের মানুষ, ঘড়ি-ফড়ির ধার ধারেন না। রোদের আন্দাজে সময় নির্ধারণ করেন। তাঁদের সময় প্রহর, দণ্ড, পল দিয়ে বাঁধা। এখনকার সময়ের যে বিলিতি মাপ, সে মাপ তাঁদের অজানা। বাড়িতে একখানা বড়ো ঘড়ি আছে, দেয়ালে আটকানো। ভীম আর নাতি নাতনি ক-টা ইংরিজি পড়তে পারে, ওরাই দ্যাখে আর ওসব ঘণ্টা মিনিট বলে। বাকিরা সেই আগেকার মাপেই আটকে আছেন।
বাঁধা বাড়িগুলোতে নিত্যপুজোর মিষ্টি যায়। ছোটো ছেলে একটা ছোঁড়াকে সঙ্গে নিয়ে সেগুলো শালপাতার ঠোঙায় বা চ্যাঙারিতে ভাগ করছে। এখুনি ভিড় লাগবে। কিছু কিছু চলেও গেছে।
বিশাল এক জুড়ি এসে দোকানের সামনে দাঁড়াল। এ গাড়ি গোটা কলকাতা চেনে; জানবাজারের রানিমার নিজস্ব বাহন। পিছনে পাশে চাপরাশ আঁটা লাঠিবল্লম মায় বন্দুকধারী পাইক। পরাণ চমকে দোকানের বাইরে এসে দাঁড়ালেন, রানিমা নিজেই এলেন নাকি!
হ্যাঁ, তাই-ই। রানিমার খাস দাসী নেমে এল। “কী গো মোদকমশায়, ভোগের সন্দেশ বেঁধে রেকেছ? বসতে পারবুনি কিন্তু, মা স্বয়ং নিতে এয়েচেন।”
ভীম আর বলরাম কয়েকখানা শালপাতা মোড়া চ্যাঙারি হাতে বেরিয়ে এল, “কী কইরে ভাবলি দিদি রানিমাকে রাস্তায় দেঁড় কইরে রাকব? এই দ্যাক। সব বেঁদেছেঁদে তৈরি। নে যা।”
একজন পাইক গাড়ির দরজা খুলে দিতে বলরাম পোঁটলাগুলো গাড়িতে উঠিয়ে দিল। কোচোয়ানের চাবুকের ফটাস শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বিলিতি ঘোড়া জোতা গাড়ি যেন উড়ে চলে গেল।
বলরাম জোড়হাত কপালে ঠেকাচ্ছে। ভীম রাস্তার ওপরেই গড় করল। উপস্থিত পথচারীরাও কপালে হাত ঠেকাচ্ছে। রানিমা পর্দানশিনা নন, গাড়ির জানলা খোলাই ছিল, দয়াময়ী সকালবেলা দর্শন দিয়ে গেলেন। আজ দিনটা ভালো যাবে।
“অ্যাকসের রসগোল্লা আর অ্যাকপো প্রাণহরা দ্যান গো মোদকমশায়।”
“আমায় সাড়ে তিন গন্ডা কচুরি, সাড়ে তিন গন্ডা জিলিপি, দেড় গন্ডা বাবু, দেড় গন্ডা দেদো।”
“কই হে সহদেব, আমার জিনিস?”
ছেলেদের সঙ্গে পরাণও হাত লাগালেন। এ সময়টা বড্ড চাপ যায়।
কেবল এদেশি মানুষরাই যে মিষ্টিখোর এমনটা নয়, মিষ্টি খেতে সাহেবরাও কিছু কম যান না। সাহেবি খানার তালিকায় চোখ বোলালেই শেষপাতে সুফলে, টার্ট, পাই, মাফিনের ছড়াছড়ি। কিন্তু সাহেবি মিষ্টির বেশির ভাগটাই কেক-এর রকমফের। যেসব সাহেব এদেশে এসেছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ এদেশি মিষ্টি চেখে দেখলেন এবং মজলেন। সত্যি বলতে গেলে অষ্টাদশ শতাব্দীর কলকাতায় যতরকমের চিড়িয়া, ততরকমের মিষ্টি। ছানা, খোয়া, ময়দা, বেসন, কাজুবাদাম, কী না দিয়ে মিষ্টি বানানো হয়? শুধু কি কলকাতা; হাওড়া, নদিয়া, চব্বিশ পরগনা, হুগলি, বর্ধমান এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায়। কারও বাবরশা, তো কারও মনোহরা। এ যদি চমচম বানিয়ে বলে কেমন দিলাম? অন্যজন মিহিদানা এগিয়ে দিয়ে বলে, পাগলা ক্ষীর খা। মিষ্টিখোরদের পোয়াবারো যাকে বলে। সাহেবরাই বা আর কতক্ষণ নোলা সামলে রাখবেন?
মাঝখানে ব্যারাকপুরের ঝামেলাটা হয়ে গিয়ে ব্যাবসায় একটু টান পড়েছিল। শোনা যাচ্ছিল সিপাহিরা নাকি খেপেছে; সাহেবদের এদেশ ছাড়া করবে। আবার বাহাদুর শা বলে কে এক মোগল বাদশা দিল্লির তখতে বসবে। অনেক সাহেব কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছিলেন। সাহেববাড়ির কাজ বন্ধ হয়ে গেছিল। এখন অবশ্য সব ঠান্ডা হয়ে গেছে। আজকাল অনেক সাহেববাড়ি তাঁদের বাঁধা খদ্দের। সন্দেশ ছাড়াও চড়ারসের মিষ্টিরও চাহিদা বেশ ভালোর দিকে।
কাল সন্ধেবেলা একটা বাজে ব্যাপার হয়ে গেল। সাহাবাড়ি তাঁদের বাঁধা খদ্দের, সেই বাড়ির মেজোবাবু বলরাম হঠাৎ দোকানে এসে হাজির।
মেজোবাবু মেজাজি মানুষ। গাড়ি থেকে নেমেই হাঁক পাড়লেন, “ভীমসেন, টাটকা মাল কী আচে?”
ভীম একখানা মাটির সানকির ওপর কলাপাতা দিয়ে কয়েকখানা মিষ্টি এগিয়ে দিল, “এজ্ঞে এগুলো এট্টু আগেই ভেন থে নেমেচে। আর ক্ষীরকান্তি একন ভেনে। মুকে দে দ্যাকেন, তাপ্পর যেটা যেটা পচন্দ হয়।”
মেজোবাবু একটা সন্দেশ ভেঙে মুখে দিলেন, “আকায় তেঁতুল কাট ঢুইক্কেচিস?”
ভীম হাসতে হাসতে দু-কান ধরল, “এজ্ঞে অ্যাক-দুকান না দেলে আকা ধরতি তো দু-গণ্টা নেইগে যাবে। তা বেভুল হয়ে গ্যাচে বাবু, দু-মুটো মুড়কি আকায় ফেলি দেলে তেঁতুলের বাসটা পেতেননি। এবারটা মাপ করেন।”
মেজোবাবুও হাসতে হাসতে বললেন, ‘জ্ঞানপাপী।’ বলে আর-একখানা সন্দেশ মুখে পুরলেন।
সন্দেশটা মুখে ফেলেই মেজোবাবুর মুখখানা থমথমে হয়ে গেল। ভীম সেটা লক্ষ করে চমকে উঠল। নির্ঘাত কিছু গণ্ডগোল হয়েছে। অন্য খদ্দের ধরতে পারবে না, কিন্তু মেজোবাবুকে ঠকানো অসম্ভব।
মেজোবাবু বললেন, “পাগটা করেচে কোন শালা রে?”
ভীম গলা বাড়িয়ে দেখল মেজোবাবু একটা প্রাণহরার আধখানা ধরে আছেন। প্রাণহরা, মানে নরহরির ভিয়েন। সে গলা তুলল, “নোড়ো দাদা!”
নরহরি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল, “এজ্ঞে ছোটোকত্তা?”
ভীম কিছু বলার আগেই মেজোবাবু নরহরির গলার গামছাখানা খপ করে ধরে বাঘের মতো গর্জে উঠলেন, “হারামজাদা, বুড়ো হয়ে মত্তি চল্লে, অ্যাদ্দিনের পুরোনো কারিগর তুমি, তোমার এসব মতিবুদ্দি? ভেয়েনে বসি তুমি গুরুক টানচেলে? তামুকের বাসে মাল ভুরভুর কচ্চে, এই এঁটো সন্দেশ কিনা সন্দের শেতলে গিরিধারী খাবে? পাপে মরবি যে শো’র। বংশে বাতি দেবার কেউ থাকবেনি কো।”
নরহরি দড়াম করে মেজবাবুর পায়ে পড়ল, “কত্তা, মা কালীর কিরে, ভেনে বসি গুড়ুক টানিনি কো। কারখানাঘরের বাইরে বসি দু-টান টেনে এয়েচেনু। সকাল থেকে তাড়ু টানচেলাম, তা এট্টু তামুকের নেশা উটি গেল, তাই দুকুরের ভেনে বসার আগে ভাত খেয়ি এট্টু গুড়ুক সেবা করেচিনু। আর কককনো এমনটে হবেনি। আপনি তো আমায় জানেন কত্তা।”
মেজবাবু শিবতুল্য মানুষ। যেমন ঝপ করে রেগেছিলেন, ঝপ করে ঠান্ডাও হয়ে গেলেন, “হুঁ, বুয়েচি। গুরুক সেবা করে কেবল জল দে হাতখান ধুয়েছেলে, তাপ্পর ওই হাতে ছানা মেকেছেলে। তা ক্ষার দে হাত ধুতে হতনি? দেক দিনি, পুরো এক ঘান মাল বরবাদ করে দেলি। যাগগে, ষোলো গন্ডা চন্নপুলি, ষোলো গন্ডা ক্ষীরতক্তি আর তোর ওই শাঁকসন্নেশ সেরটাক বেঁইদে দে।” কপাল ভালো, সন্ধেবেলা খদ্দের লক্ষ্মী ফিরে যায়নি।
একটা জুড়িগাড়ি এসে দোকানের ঠিক সামনেতেই দাঁড়াল। ভীম একটু চকিত হল; কোনও বড়ো খদ্দের। কিন্তু গাড়ি থেকে যারা নেমে এল তাদের দেখে এলাকাসুদ্ধু লোক বোমকে যাওয়ার যোগাড়। একজন আপাদমস্তক দুরস্ত চাপরাশি। অন্যজন এদেশি বাবু, কিন্তু পরে আছেন কোটপ্যান্ট।
কোটপ্যান্ট-ধারী বাবু এখানে বিরল নন, কিন্তু তাঁরা উকিল বা ব্যারিস্টার। তাঁদের কালো কোট, সাদা প্যান্ট সবাই চেনে। ইনি কিন্তু পরে আছেন একরঙা সুট। ইনি তবে কে? আবার সঙ্গে চাপরাশি।
বাবু দোকানে ঢুকেই বললেল, “ভীম নাগ কে?”
ভীম হাতজোড় করে বলল, “আজ্ঞে এই আমি। হুকুম করুন।”
বাবু বললেন, “সাহেব পাটালেন।”
ভীম বলল, “কোন সাহেব এজ্ঞে? আমার দোকানে অনেকগুনো সায়েব খদ্দের আচেন।”
বাবু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “এই বয়েসেই চোকের মাতা খেয়ে বসে আচো নাকি মোদকের পো? দেকতে পাচ্চ না কো ওর কোমরে লাটবারির চাপরাশ রয়েচে?” বলে আরদালিকে দেখিয়ে দিলেন।
লাটবাড়ি কথাটা কানে যেতে ভীমের দু-ভাই ঘুরে তাকাল। ভীম বলল, “হুকুম করুন।”
“শোনো হে মোদকমশায়, কাল এক কাণ্ড হয়েচে। কদিন আগে সায়েবের মেম এয়েচেন বিলেত থে। তো সায়েবের সাতে বিলিতি বাবুর্চিও এয়েচে। তা সে বেটা কাল কী এক বিলিতি মেটাই বাইনেচে, না সায়েবের পচন্দ হয়েচে, না মেমসায়েবের। মেমসায়েব তো বলেই বসল মুককান কেমন ফসফস কচ্চে। আমি জানতুম আমাদের জন্যি ভাঁড়ারে তোমার দোকানের আবার খাবো আর রসকদম আচে। তা আমি সায়স কইরে বন্নু আমাদের মেটাই খেয়ে দেকবেন? তা সায়েব বল্ল, দাও। দেলুম সায়স করে ওনাদের সামনে ধইরে।’
ভীমের ভাইরা একমনে শুনছিল। মেজোভাই বলল, “সায়েবের পচন্দ হল কত্তা?”
“পচন্দ কী রে? তো মেমসায়েবের সাতে চেয়ে চেয়ে গন্ডা দু-এক কইরে ওড়াল দুজনে। আজ হুকুম হয়েচে মেটাই আনো, তার সাতে মেটাইওলাকেও। তা টাটকা মেটাই সের দশেক দ্যাও, আর সাতে তুমিও চলো।”
ভীম মনে মনে বেজায় খুশি। লাটবাড়ি বলে কথা। এ ঘরটা ধরতে পারলে কলকাতাসুদ্ধ নাম তো ছড়াবেই, তার সঙ্গে সায়েববাড়ির বড়ো কাজগুলো পাওয়া যাবে।
ভীম ভাইদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ভেতরে জামাকাপড় বদলাতে গেল। পরাণ এখন নেই, দুপুরবেলাটা বাড়িতে বিশ্রাম করে ঠাকুরকে বিকেলের শেতল দিয়ে তারপর দোকানে আসবেন। এখনও তাঁর আসতে ঘণ্টাখানেক দেরি।
ভীম জামাকাপড় পরে আসতে আসতে মিষ্টি বাঁধাছাঁদা হয়ে গেছে। ভাইরা মিষ্টির চ্যাঙারি ও হাঁড়িগুলো গাড়িতে তুলে দিল। বাবু, ভীম ও আরদালি গাড়িতে উঠে বসলেন।
বাবু বললেন, “মোদকের পো, ইংরিজি বোজো? সায়েব কিন্তু বাংলার ব-ও জানে না।”
ভীম সলজ্জে বলল, “আজ্ঞে, বুজি। এট্টু এট্টু বলতেও পারি। কানা সায়েবের কাচে ক-বচর পড়িচি তো।”
বাবু মাথা নাড়লেন। গাড়ি গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তার দিকে ছুটল।
ভীম একটু রাত করেই ফিরল। মুখে চিন্তার ছাপ। সবাই উদগ্রীব হয়ে ওর প্রতীক্ষা করছিল। ভীমের মুখ দেখে পরাণ বললেন, “কি রে, মুককানা অমন ভেটকে আচিস ক্যানো? সায়েবের মেটাই পচন্দ হয়নিকো?”
“পচন্দ হবেনি ক্যানো, বেজায় পচন্দ হয়েচে। আমি তো দাঁইড়ে থেকে খাইয়ে এলুম। হাবড়ে হাবড়ে খেলে সব।”
“তাহলে লাটসাহেবের বাড়িটে ধরা যাবে বলচিস?”
“আগে তো ফাগুনের পোঁয়ারোটা পার করি, তাপ্পর বাড়ি ধরা।”
“ফাগুনের পোঁয়ারো, সিদিন কী? কী হয়েচে খোলসা করে বল দেনি?”
“হয়েচে কী, ঠিক আটটায় লাটসায়েবরা খেতে বসল। নটার সময় আমার ডাক পড়ল। কিনা দাঁইড়ে থেকে মেটাইয়ের সম্পক্কে বলে বলে দিতে হবে। তা দেলুম। একখান করে পাতে পড়ে আর আমি বুইজ্জে দি কোনটা কী। তাপ্পর হল কী, খেয়েদেয়ে হাত ধুয়ে সায়েব আমায় কাচে ডাকলে। বলে কিনা, তোমার মেটাই খেয়ে খুব ভালো নেগেচে, এমন একখান মেটাই বাইনে দাও য্যা গোটা কলকাতায় কোথাও পাওয়া যাবেনে কো। মার্চ মাসের শেষদিন, মানে আপনার ফাগুনের পোঁয়ারো, মেমসায়েবের জন্মদিন। ওদিন লাটবারিতে দুশো লোক খাবেদাবে। লাটসায়েব ওইদিন সবাইকে নতুন মেটাই খাওয়াবে। কী বেপদ বলুন দিনি, হাতে আর দুটো গোটা হপ্তাও নেই। ওদিকে আমি আবার হ্যাঁ করে দেচি।”
“বাপধন, তোকে আজ দেকচি নে। পারলে তুই-ই পারবি। আর পারবি নাই না ক্যানো! অমেত্তকলস দিয়ে চন্নগরকে কাত করে দিলি, আর একখান নতুন মেটাই লাটসায়েবের সামনে ধত্তি পারবিনে?”
“আজ্ঞে সন্নেশ হলি তো এতখানি ভাবতে হত নেকো। সায়েবদের খাওয়ার সময় নক্ক করেচি ওরা সন্নেশের চাইতে রসের মালটাই বেশি পচন্দ করচে। রসের মদ্যি কিচু করতে হবে। এক কাজ করলি হয় বাবা, পচ্চিমারা যেমন গুলাবজামুন বানায় খোয়া, ময়দা, এলাচ দিয়ে ঘিয়ে ভেজে; তেমনি করে করব। ময়দার জায়গায় ছ্যানা দেব আর ওদের মতো মেওয়াতি করব না। গুলাবজামুনের ভেতরটা কেমন থসথসে। আমি খেয়েছি, ভালো নাগেনি কো।’
“কইরে দ্যাক। কাল লক্ষ্মীবার, মায়ের নাম নে কালকেই নেগে পড়।’
“তাই হোক। ছোটো আকাটা সকালে এট্টু নিক্কে নোব।’
পরের দিন দুপুরে ভীম তার ভাবনামতো মিষ্টি তৈরির তোড়জোড় করছে, এমন সময় পরাণকে আসতে দেখে একটু চমকে গেল। পরাণ দুপুরে বাড়িতে খেতে যান, একবারে সন্ধেয় আসেন। ভীম অবাক হলেও বুকে একটু বলও পেল। রসের মালে সে সন্দেশের মতো স্বচ্ছন্দ নয়, পরাণ অভিজ্ঞ কারিগর, তিনি পাশে থাকলে সুবিধা হয় বইকি।
পরাণ এসেই একটা জোগাড়েকে হুকুম দিলেন, “ছোটো কড়ায় সোয়া দু-সের দুধ চাপা।” তারপর খোয়ার তাড়ুটা তুলে নিলেন। ছেলেরা একটু আপত্তি করল, কিন্তু তিনি কোনও কথা শুনলেন না। নতুনবাজারের কেনা খোয়া নয়। ভীম যে মিষ্টিটা বানাবে, তার জন্য তিনি আজ নিজের হাতে দুধ মেরে খোয়া বানাবেন।
বাবা ছেলে লেগে পড়লেন। পরাণ উনুনে, ভীম পাটায়। নিজের হাতে ছানা বাটতে লাগল সে। এক ভাই আর-একটা উনুনে রস চাপিয়ে দিয়েছে।
খোয়া হতে হতে ভীমের ছানা বাটা হয়ে গেছে। খোয়া ঠান্ডা হলে সে সাড়ে চার আধ ভাগে ছানা আর খোয়া মেশাল। তাতে এলাচগুঁড়ো দিল, আর সামান্য সালটু। ওতে মাল খরা খরা হবে, গুলাবজামুনের মতো নেতিয়ে যাবে না।
পরাণ হাত দিয়ে মিশ্রণটার ঘনত্ব পরীক্ষা করলেন, “ঠিকই লাগছে। এবার গোল্লা পাক্যে নে। সদা ঘি চাপা।”
চন্দননগরের বিশু গোয়ালার ঘিয়ের গন্ধে কারখানা ভুরভুর করে উঠল। পরাণ বারকোশখান তুলে ধরলেন, ভীম প্রথমে উনুনে ব্রহ্মার লেচি ফেলল, তারপর বারকোশ থেকে একগন্ডা করে মাল তুলে কড়ায় ছাড়ল, “জয় মা।” তারপর সাবধানে নাড়তে লাগল।
ধীরে ধীরে ছানার গোল্লাগুলোয় লালচে রং ধরল। রং একটু গাঢ় হলে ভীম কড়াখানা নামিয়ে নিল। ওদিকে দেড় তারের রস তৈরি। ভীম সাবধানে ছান্তা দিয়ে কড়া থেকে গুলিগুলো তুলে নিয়ে রসে ফেলল। এবার আধঘণ্টার অপেক্ষা, তারপরই ফলাফল জানা যাবে।
আধঘণ্টা পরে যখন ভীম রস থেকে মিষ্টি তুলে একখানা সানকিতে সাজাচ্ছে, তখন পুরো দোকান কারখানাঘরে জড়ো হয়েছে।
পরের মিনিট দশেক কারখানাঘরে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। জোগাড়েরা ভীমকে কাঁধে তুলে ধেইধেই নাচছে, বলরাম ভীমের পায়ের ধুলো নেবে বলে পা খুঁজে বেড়াচ্ছে, ভীম চেঁচাচ্ছে, “ও বলাদাদা, তুমি বাউন; আমার পাপ নাগবে গো।” পরাণ মিঠাইয়ের সানকি হাতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, সহদেব ডিগবাজি খাচ্ছে।
ভীম গোল্লা পাকানোর সময় প্রতিটা গোল্লায় একটা করে বড়ো এলাচের দানা দিয়েছিল। মিষ্টি কামড়ালে কুট করে দাঁতে লাগছে, আর এলাচের খোশবাইতে মুখ ভরে যাচ্ছে।
সবাই ঠান্ডা হলে পরাণ বললেন, “বাকিগুলো কড়ায় থাক। আর-এট্টু রস ঢুকুক। সন্দেবেলা নাটসায়েবের বাড়ি নে যাবি। দেখ সায়েবের পচন্দ হয় কি না। তবে যা মাল বাইনেচিস, মনে হয় না সায়েবের অপচন্দ হবে। দেকা যাক।”
ভীম আজও রাত করে ফিরল। আজ তার মুখ ঝলমল করছে। পরাণ বললেন, “মুককানা দেইকে তো মনে হচ্চে সায়েব তোর মেটাই পচন্দ করেছে। কি রে, ঠিক বলিচি?”
ভীম হেসে বলল, “যা কইচেন। সায়েব মেমসায়েব মুকে দে একবারে নাপ্পে উটেচে। সায়েব আমার পিট চাপড়ে দে কইল ব্রাভো; আর একবারে দু ঘান মালের বায়না দে দেল। শ-দুই নোক খাবে তো। জানেন বাবা, এক কাণ্ড হয়েচে। সায়েব আমায় মেটাইয়ের নাম জিগ্যেস কল্লে; তা আমার মাতায় ধাঁ কইরে বুদ্দি খেলে গেল। আমি বন্নু এজ্ঞে যেনার খাতিরের মেটাই, ওঁর নামে নাম।”
“কী নাম বল্লি সায়েবকে?”
“লেডি কেনিং।’
মাসছয়েক পর একদিন এক সাহেব দোকানে এলেন, “বাবু, তোমার তৈরি নতুন মিষ্টি খেতে এলাম।”
ভীম ও পরাণ তাঁকে অভ্যর্থনা করে সানকিতে করে কয়েকটা লেডি ক্যানিং তাঁর হাতে তুলে দিলেন। মুখে মুখে এই মিষ্টির নাম হয়ে গেছে লেডিকেনি।
সাহেব আটটা লেডিকেনি খেলেন, তারপর দুটো কড়াপাক চাইলেন। ভীম নিজের হাতে কড়াপাক এনে দিল।
সাহেব বললেন, “বাবু, তোমার দোকানে একটাও ঘড়ি নেই কেন?”
ভীম নিজের ট্যাঁকঘড়ি দেখিয়ে বলল, “এটা আছে। বড়ো ঘড়ি কার জন্য কিনব? কেউ তো ইংরিজি লেখা পড়তে পারে না। বাংলায় হলে তাও কথা ছিল।”
ভুরু কুঁচকে গেল, “বাংলা লেখা? ওয়াল ক্লকে বাংলা? ঠিক আছে বাবু, এ চ্যালেঞ্জ আমি নিলাম। তোমার পকেটওয়াচে যা যা লেখা আছে, আমাকে বাংলা হরফে লিখে দাও।”
ভীম বলল, “আপনার নামটা জানতে পারি?”
সাহেব মুচকি হেসে বললেন, “টমাস কুক, কুক অ্যান্ড কেলভির কুক।”
১৮৫৮ সালেই বিলেত থেকে তৈরি হয়ে এসেছিল ওই ঘড়ি। ওয়ালনাট কাঠের খোল, কালো আবলুশ রং। এক থেকে বারো সংখ্যা, কুক কেলভি, তার নিচে লন্ডন, সব বাংলা হরফে লেখা। এক থেকে এগারো কালো রঙে লেখা, বারোর রং লাল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, হরফগুলো লিখেছিলেন একজন সাহেব আর্টিস্ট, যিনি একবর্ণ বাংলা জানতেন না।
ঘড়ি দেখে গোটা কলকাতার চক্ষু চড়কগাছ। এরকম বাংলা হরফে লেখা ওয়াল ক্লক কলকাতায় সম্ভবত একখানাই আছে।
মুগ্ধ হয়ে শুনছিল শর্মিষ্ঠা, আজ খবরের সাংবাদিকা। বুমটা এগিয়ে দিয়ে বলল, তাহলে আজ ২০১৮, এ ঘড়ির বয়েস একশো ষাট।
ঘড়ি বলল, টং-টং-টং।
~
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন