মিঠাই পর্ব - ২

সুব্রত রুজ

map

চিনির মেঠাই : বাতাসা, কদমা, নকুলদানা, মঠ, মুড়কি

বাতাসা তৈরির পদ্ধতি গুড়ের মেঠাই লিখতে গিয়ে একটুখানি বলেছি। চিনির বাতাসা তৈরির পদ্ধতি কিছু আলাদা না। চিনি ও জল একসঙ্গে ফুটিয়ে প্রথমে রস করা হয়। সেই রসকে সোডা বাই কার্ব ও সাইট্রিক অ্যাসিড জাতীয় কিছু রাসায়নিক দিয়ে ফেনা ফেনা করা হয়। তারপর সেই ফেনায়িত রসকে একটা কানা-কাটা হাঁড়িতে নিয়ে তাতে একটা কাঠের ডান্ডা ডুবিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেই রস মাটিতে পাতা চাটাইয়ের ওপর রাখা চটের ওপর ফোঁটা ফোঁটা করে ফেলা হয়। শুকিয়ে গেলে সাদা ধবধবে বাতাসা তৈরি হয়। এদানি মেশিন বেরিয়েছে। কিন্তু রসটা সেই হাতেই বানানো হয়।

নকুলদানা বানাতে গেলে ঘন রসে একটি বড়ো এলাচদানা বা ভাজা ছোলা বা বাদাম ডুবিয়ে তুলে নিলে ঘন রস সেই বাদাম বা ছোলা বা এলাচদানাকে ঘিরে জমে যায় এবং নকুলদানার সৃষ্টি হয়। এখন কংক্রিটের মিক্সারের মতো একটি মেশিনের ভেতরে অল্প অল্প রস দিয়ে বাঁইবাঁই করে ঘুরিয়ে নকুলদানা বানানো হয়। ওই ঘোরার ফলে রস কীভাবে জমে গিয়ে নকুলদানার আকৃতি নেয়। আগের মতো ভেতরে ছোলা, বাদাম, এলাচ দিতে লাগে না। আবার বইয়ে পড়েছি, ছোলা বা বাদামের ওপর রস জমিয়ে যে মেঠাই, তার নাম খাগড়াই।

ঘন চিনির রস ছাঁচে ফেলে নানারকম জীবজন্তু ও মন্দিরের আকৃতি দিয়ে যে বস্তুটি তৈরি হয়, তা দেখে এই বুড়ো বয়েসেও মনটা খাই খাই করে ওঠে। এই চিনির মঠ বা মট মেলার সময় কিনে আনা হত। শুকনো চিনি জমিয়ে বানানো বলে বেশ কিছুদিন রেখে খাওয়া যেত। এতে নানারকম রং করা হয়। আবার গোলাপি আতর দিয়ে সুগন্ধিত করা মঠও খেয়েছি।

চিনির মুড়কির কারিগরি গুড়ের মুড়কির মতোই। চিনির রস করে ঈষদুষ্ণ রসে খই ফেললেই রস টেনে নিয়ে খই দলা পাকিয়ে যাবে। তাকে কর্পূর ও এলাচ দিয়ে নেড়ে হাত দিয়ে দলাগুলো ভেঙে নিলেই সাদা মুড়কি তৈরি।

এবার কদমা। কদমফুলের মতো দেখতে, তাই কদমা। কদমা বানাতে হলে প্রথমে শোনপাপড়ির পাকের কায়দায় চিনি জলে ফেলে রস করে আস্তে আস্তে সেই রসকে ঘন করে একটা থকথকে প্লাজমার মতো মণ্ড বানানো হয়। ওটা লাল স্বচ্ছ জেলির মতো দেখতে হয়। ওপরটা একটু ঠান্ডা হয়ে গেলে এবার সেই মণ্ডকে ফুট সাতেক ওপরে দেয়ালে গাঁথা একটা মোটা পেরেকের বা লাঠির ওপর ঝুলিয়ে দিয়ে হেঁইয়ো বলে এক টান। চিনির তাল লম্বা হয়ে নেমে এলে পেঁচিয়ে দিয়ে আবার টান। কয়েকবার টানার পরে পাকিয়ে নিয়ে সবসুদ্ধু নামিয়ে নেওয়া। এবার সেই পাক লম্বা লম্বা করে পাটায় গড়িয়ে চাকু দিয়ে লেচি কেটে নেওয়া। এবার সেই লেচির গায়ে বাঁশের বা লোহার চাকু দিয়ে দাগ দিয়ে কেটে কিছুক্ষণ রেখে দিলেই কদমা তৈরি। ঠাকুরের ভোগ হিসাবেই এর ব্যবহার বেশি। কদমা নানা আকারের হয়। একদম ছোটোটা টলগুলির আকারের। এর থেকে একমন আকার বিশিষ্টও হতে পারে। আবার ওস্তাদ কারিগররা পাখি, ফুলদানি এসব আকৃতিবিশিষ্ট কদমাও বানান।

এ প্রসঙ্গে একটা ব্যক্তিগত খেদ ব্যক্ত করি। আমার ঊর্ধ্বতন সপ্তম পুরুষ মোদক সন্তান হয়েও ডালরুটি কামানোর তাগিদে তাড়ুর বদলে রেঞ্চ ধরেছিলেন, কিন্তু তাড়ু একবারে ছাড়েননি। তাঁর বংশধররাও হাতুড়ি কাতুড়ি চালিয়ে পেটের ভাত জোগাড় করতেন। মহাজন পন্থায় বংশে মিষ্টি তৈরির ধারাটা চালু ছিল। আমার প্রপিতামহ হরিপদ ওরফে হরে ময়রা কলের মিস্তিরি ছিলেন, কিন্তু কদমা তৈরিতে মাহির ছিলেন। খাস করে এইসব একমনি আধমনি কদমা। উখরার রাজবাড়িতে রাসের সময় হরে ময়রার এইসব আধমনি কৈলাসেরা ভিড় জমাত এবং ছেলেবেলায় ওই অঞ্চলের অশীতিপরদের মুখে হরে ময়রার কদমার নাম শুনেছি। পাশা পালটাল পিতামহের আমলে। পিতামহ (১৯০৫-১৯৬৭) সে বাজারে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে উড়িষ্যায় চাকরি নেন। তস্য পুত্র-পৌত্র-আদি কলমকে জীবিকার উপায় করেন। তাড়ু পুরোপুরি বর্জিত হয়। নিট ফল, হরে ময়রার অধস্তন চতুর্থ পুরুষ কদমা, বাতাসা নকুলদানা কিনে খায়। ট্রাজেডিটা গ্রিসান না শেক্সপিরিয়ান, এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%