মিঠাই পর্ব - ১

সুব্রত রুজ

map

গুড়ের মিঠাই

বালককালের একখানা গল্প বলি। অজ পাড়াগাঁয় থাকি। সন্দেশ রসগোল্লা খেতে হলে তিন মাইল দূরের বাজারে যেতে হয়। আমাদের অবিশ্যি মাতৃদেবীর কল্যাণে রসগোল্লার বিশেষ অভাব হয়নি, কিন্তু বাড়িতে মজুত করে রাখার মতো মিষ্টি বলতে ছিল গুড়, বাতাসা, টানার লাড়ু ও গুড়কাঠি। বাঙালি বাড়িতে বাতাসা থাকবেই। বাতাসা ঠাকুরের নৈবেদ্য, তা ছাড়া বাঙালির সংস্কার, কেউ জল চাইলে শুধু জল দিতে নেই। সঙ্গে অন্তত দুটো বাতাসা দেওয়া উচিত।

অনেকেই জানেন, ছোটো বাতাসাকে ফুল বলে আর বড়ো বাতাসাকে ফেনি। ফেনির সাইজ ফুলবাতাসার প্রায় দশগুণ এবং ওই ইজের বয়সে ফেনি বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র ছিল। ফুলবাতাসা ঠাকুরের প্রসাদ হিসাবে রোজই এক-দুটো খেতাম, কিন্তু ফেনি জুটত বছরে একবার; পুজোর সময়।

কলকাতায় আমাদের মেজোমামার এক পরিচিত মানুষ গুড়, বাতাসা, মুড়কি এইসব বিক্রি করতেন। একদিন কোনও কারণে মামা ওঁর সঙ্গে ওঁর কারখানায় দেখা করতে গেছিলেন; সঙ্গে আমরা কয় মামাতো পিসতুতো ভাইবোন।

কারখানার ভেতরে ঢুকে আমার মনে হয়েছিল আলিবাবার সেই গুহায় ঢুকে পড়েছি। একপাশে উনুনে রস ফুটছে, মেজেয় দরমার চাটাই পাতা, তার ওপরে চটের বস্তা। সেখানে শয়ে শয়ে ফুলবাতাসা শুকোচ্ছে। কোনোটা সাদা, কোনোটা লাল। মামার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভদ্রলোক একটা মাটির হাঁড়ি নিয়ে এলেন, তারপর কথা বলতে বলতেই তার ভেতর কী এক কৌশলে হাত ঘোরাতে লাগলেন আর মেঝেয় পাতা চটের ওপর টপ টপ করে আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজনেষু ফেনি পড়তে লাগল। সেই মুহূর্তে যে অনুভূতি হয়েছিল তার নাম awe; reverential fear। চোখের সামনে জানাডু থেকে জাদুকর ম্যানড্রেক উদয় হলেও অতখানি শ্রদ্ধা আদায় করতে পারতেন কি না সন্দেহ। বেয়াল্লিশ বছর পরেও লিখতে বসে সেই ম্যাজিশিয়ানকে আবার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।

খাদ্যরসিক প্রশান্ত ভট্টাচার্য ও সোমনাথ ঘোষ লিখেছেন, তাঁরাও বাতাসা বানানো দেখেছেন। প্রশান্তদার বয়ানমতো, ‘একটা একদিকের কানা ভাঙা হাঁড়িতে গরম গুড় নিয়ে একটা গোলমাথা ডান্ডা ডুবোত কারিগর। প্রত্যেকবার ডান্ডাটা ডুবোবার জন্যে এট্টুসখানি তরল গুড় উথলে পড়ত নিচের চাটাইতে (ওরা বলত চ্যাটা)। কী হাতের মাপ! একই পরিমাণ গুড় চাটাইতে পড়ত। চারদিকে ম ম করত গুড়ের গন্ধ। শুকিয়ে গেলে হয়ে যেত হালকা বাতাসা।’

আজকাল বাতাসা মেশিনে বানানো হয়। সোমনাথবাবু আক্ষেপ করেছেন, মেশিনে বানানো বাতাসা যাকে বলে অখাদ্য। তা তো হবেই, সে গুড়ও নেই আর একজন অভিজ্ঞ কারিগরের হাতের পাক কি আর মেশিনে হয়?

গুড় দিয়ে যতরকম মিষ্টি তৈরি হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত বোধহয় টানার লাড়ু বা সিঁড়ির লাড়ু এবং নারকেল লাড়ু। আমি লাড়ুই বলব, তার কারণ লাড়ু লোকগানের মতোই প্রাচীন মিষ্টি। এর আদিনাম ছিল লড্ডুক। লড্ডুক থেকেই লাড্ডু এবং অনেকের মতে চালগুঁড়ো ও গুড় সহযোগে মোদক নামক যে মিষ্টান্নটি তৈরি হয় সেটাই প্রাচীনতম লড্ডুক। মোদক খেয়েছি, তবে কখনও নিজের হাতে বানানো হয়নি। এক বন্ধু একটি ভিডিয়ো পাঠিয়েছেন। তাতে গুড় জলে গুলে তাতে আতপ চাল বাটা দিয়ে সেই মিশ্রণকে হালকা আঁচে ঘন করে শেষে একটু ঘি দিয়ে নামিয়ে ট্রে-তে ফেলে ঠান্ডা করা হল। এটা নাকি চালের হালুয়া। মোদকের সঙ্গে তফাত তো কিছুই বুঝলাম না। মোদক লাড়ুর মতো গোল, এটা বরফি আকৃতি।

বাংলায় এককালে ঘরে ঘরে আনন্দনাড়ু তৈরি হত। আনন্দউৎসবে বানানো হত বলে এর নাম আনন্দনাড়ু। আতপচালের গুঁড়ো, তিলের গুঁড়ো, নারকেলের মিহি করে কাটা ছোটো ছোটো টুকরো একসঙ্গে গুড় দিয়ে মেখে ঘিয়ে ভাজা। ইদানীং নারকেলকোরা দেওয়া হয়। চোখের সামনে তৈরি হতে দেখেছি, তবে বানানোর অপচেষ্টা কখনও করিনি। আমার মা বেশ ভালো কারিগর, এ জিনিস বানাতে তিনিই সাহস করেননি, আমি তো সেই তুলনায় সদ্যোজাত শিশুমাত্র।

সিঁড়ির লাড়ু বরং নিজের হাতে বহুবার বানিয়েছি। এটা বানাবার জন্য ভালো মানের বেসন ও ভালো মানের তেল দুটোই চাই। যে বেসনে বেগুনি হয় তার চেয়ে একটু মোটা বেসনে নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো, এলাচদানা, সোডা বাই কার্ব নিয়ে এমনভাবে মাখতে হবে যাতে করে একটু শক্ত শক্ত মাখা হয়। তারপর বড়ো ফাঁদের ছান্তায় বেসন দিয়ে চেপে চেপে ঠিক সেউভাজার মতো করে তেলে ফেলতে হবে। অতঃপর ভালো করে তেলে ভেজে একটু মোটা গুড়রসে ফেলে কর্পূর ছড়িয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। রস কুসুম কুসুম গরম হলে গরম থাকতেই রসে ভেজা সেউগুলি নিয়ে হাতে করে লাড়ু পাকালেই সিঁড়ি বা টানা লাড়ু তৈরি। খাওয়ার সময় চিরচিরে ঝাল ও মিষ্টির যুগলবন্দি মুখে এক অনবদ্য স্বাদের জন্ম দেয়। এ লাড়ু চিনির লাড্ডুর মতো ফুলটুসি নয়। রোদে শুকিয়ে এ লাড়ু স্বচ্ছন্দে মাস তিনেক রেখে খেতে পারেন।

আমদের গ্রামে পুজোর মাসটায় বাড়িতে বাড়িতে এই টানা লাড়ু তৈরি হত। অনেকে ঠিকমতো করতে পারতেন না, লাড়ুর কাঠিগুলো শক্ত হয়ে যেত। এর কারণ একটাই। বেসন মাখার সময় ময়দা মাখার মতো মেখে দিলে চলবে না। যেহেতু তেলেভাজা ভাজার বেসনের মতো গোলা হয় না, ব্লেন্ডার ব্যবহারের সুযোগ নেই, হাত দিয়েই মাখতে হবে। একটা বড়ো পাত্রে হাতের তালু দিয়ে ভালো করে চটকে চটকে মাখতে হবে ও হালকা হলে তবেই তেলে ফেলতে হবে।

গুড়কাঠি করার পদ্ধতি একইরকম। শুধু বেসনের গোলা থেকে ছোটো ছোটো লেচি নিয়ে লম্বা করে নিয়ে আড়াই-তিন ইঞ্চি পরিমাণ লম্বা কাঠি কেটে ভেজে নিলেই গুড়কাঠি তৈরি। গুড়কাঠির রস অবশ্য আরও মোটা রস হয়, কারণ রস থেকে তোলার পরে কাঠির গায়ে রসটা লেগে থাকে। বর্তমানে গুড়কাঠি চিনির রসে ফেলা হয়, কিন্তু গুড়কাঠি নামটি রয়েই গেছে। গুড়কাঠির একরকম গুসকরা সাইডে খেয়েছিলাম, ঝালের বদলে তিল দেওয়া, আগাগোড়াই মিষ্টি। পশ্চিমা কারিগররা ময়দা ও তিল দিয়ে এই আকৃতির যে গজা টাইপের মিষ্টিটা বানান, তারই রকমফের।

গুড় দিয়ে সন্দেশ ও রসগোল্লাও হয়, তার আলোচনা যথাস্থানে। সত্যযুগে জিলিপি যখন কুণ্ডলিনী বা কুণ্ডলিকা ছিল, তখন গুড় রসের হত। এই ঘোর কলিতে জালেবি হয়ে গুড়ের জিলিপি কালের গর্ভে তলিয়ে গেছে। কয়েকটা জায়গায় গুড়ের জিলিপি এখনও পাওয়া যায়, কিন্তু মেলা বসলে তবেই।

দুটি মিষ্টি আমার খুব প্রিয়। তিলেখাজা বা গুড়খাজা এবং বাদামচাক বা চিক্কি। দুটোই মহারাষ্ট্র ও বাংলার যোগাযোগের ফল। আমার বাবার মতে বাংলায় বর্গি হানার একমাত্র পজিটিভ সাইড। বাদামচাক খাননি এমন বাঙালি কেউ থাকলে একটু হাত তুলবেন প্লিজ। গুড়খাজা একই বস্তু। কেবল বাদামের জায়গায় ভাজা সাদা তিল।

শিখরিণী বলে একরকম প্রাচীন মিষ্টি একসময় বাংলায় খাওয়া হত, এখন বাঙালিরা খান না। শিখরিণী কিন্তু মহারাষ্ট্র ও দাক্ষিণাত্যে শ্রীখণ্ড বা শিকন্দ নামে জীবিত আছে। এও গুড়ের সঙ্গে টকদই, আদা, কর্পূর, ঘি মিশিয়ে তৈরি। একবারই খেয়েছি, টক, মিষ্টি, ঘি, আদা, কর্পূরের স্বাদ গন্ধ মিলে রসনায় চিত্রবিচিত্র এক অনুভূতি।

মিষ্টান্ন পাক বইটি পড়েছি। মিষ্টান্ন পাকে গুড়ের সেকশনে অনেক কিছুর পাকপ্রণালী আছে, কিন্তু টানার লাড়ু নেই। দেখে একটু অবাকই হয়েছি। আজ থেকে সোয়াশো বছর আগে কি তবে টানা লাড়ু ছিল না ? বোঁদে মোটা গুড় দিয়ে বেঁধে লাড়ু পাকিয়ে যে মিঠাইটা করা হয়, সেও গরহাজির। ব্যাপার কী?

গুড়ের সংসারের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ সদস্য হল মুড়কি। যতদিন উদ্যম ছিল, প্রতি শীতে নলেন গুড়ের রসে আস্তে আস্তে কনকচুর ধানের খই ভিজিয়ে তারপরে বড়ো এলাচের গুঁড়ো ও কর্পূর দিয়ে মা যে অপূর্ব বস্তুটির নির্মাণ করতেন, তার তুলনা কোথাও পাইনি। মুড়কি করা খুব হাতি ঘোড়া কিছু না। নলেন বা জিরেন গুড়ের রস করে কুসুম গরম রসে আস্তে আস্তে খই ভিজিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ রাখতে হবে। খই গুড় টেনে নিয়ে দলা পাকিয়ে যাবে। একটু পরে এলাচগুঁড়ো, কর্পূর দিয়ে তুলে নিয়ে দলা ভেঙে ঝুরঝুরে করে নিলেই মুড়কি তৈরি। রস কতখানি গরম থাকবে, কতটা রস দিলে মুড়কি মেওয়াতি হবে না, ঝুরো ঝুরো থাকবে, এ আন্দাজ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা না থাকলে হয় না। আমি মুড়কি বানাতে পারি কিন্তু মার তত্ত্বাবধানে; নিজে নিজে করতে গেলে ছড়িয়ে একশা হয়ে যাবে।

নারকেল নাড়ু বানাতে গেলে পয়লা কাটের আখের গুড় উত্তম, কারণ এর নিজস্ব স্বাদ চমৎকার। এই গুড়ে জল দিয়ে একটু মোটা রস করে কোরানো নারকেল দিয়ে একটু নেড়ে নিতে হবে। মিশ্রণে যখন খুন্তি আটকে যাবে, তখন এলাচগুঁড়ো কর্পূর দিয়ে নামিয়ে গরম থাকতে থাকতে নাড়ু পাকিয়ে ফেললেই নারকেল নাড়ু তৈরি। চিনির নাড়ুর নাম রসকরা এবং এটা তৈরির পদ্ধতি একটু আলাদা। চিনির সেকশনে বলা যাবে।

একটা লোকায়ত মিষ্টির কথা আগে উল্লেখ করেও লেখার সময় বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, পূর্ণেন্দু ব্যানার্জি মনে করিয়ে দিলেন। মিষ্টিটার নাম আরশে বা গুড়পিঠে। ভালো আতপ চালের একটু মোটা গুঁড়ো আখের গুড় ও গোলমরিচ সহযোগে ভালো করে ছোটো ছোটো লেচি মেখে অল্প চ্যাপটা করে তেল দিয়ে ভাজা। যতটা গুড়, তার দুগুণ চালগুঁড়ো, চামচখানেক গোলমরিচ। ভাজলে লুচির মতো দুভাগ হয়ে ফুলে ওঠে। মা উড়িষ্যার আরিশার সম্মানে একটু তিলভাজাও যোগ করেন। এই মিষ্টিও কয়েকমাস রেখে খাওয়া যায়। এটাকে পিঠেও বলা যেতে পারে।

পিসিঠাম্মার কাছে শোনা কথা, আরশের আদিনাম আটাশে। আটাশে থেকে আটশে, তার থেকে আরশে। নবজাতকের আটাশ দিন বয়সে আরশে দিয়ে তাকে আপ্যায়ন করা হত। হতে পারে। যুক্তি বলছে আসলে নবজাতককে দেখতে বাড়িতে লোকজন আসত, তাদের জন্য জামাইয়ের নামে হাঁস মেরে গুষ্টিসুদ্ধের মাস চিবোবার ব্যবস্থা করা হত।

দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন। আপনার আটাশ দিন বয়স। মায়ের কোলে শুয়ে আছেন। আপনার সামনে থালা ভরা আটাশে সাজানো আছে। ছোটোবড়ো নানা সাইজের দাদা-দিদির হাতে হাতে আরশে ঘুরছে আর আপনি মন দিয়ে বুড়ো আঙুল চুষছেন।

মধুর অভাবে একটু গুড়ই পরিবেশন করলাম। ঋষিরা তো অনুমতি দিয়েই গেছেন। জয় গৌড়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%