সুব্রত রুজ
মিষ্টির দোকানে মিষ্টির অনুষঙ্গ হিসাবে নোনতা করা হয়। নোনতার মধ্যে কচুরি, শিঙাড়া ও নিমকির সঙ্গে চপও থাকে।
চপ ইউরোপীয়দের দান। চপ অর্থ কুপিয়ে কুপিয়ে কাটা। মাংস কুপিয়ে কেটে কিমা করে তাকে ব্রেডক্রাম্ব মাখিয়ে ভেজে যে খাবারটি ইউরোপীয়রা তৈরি করেছেল, সেই ধাঁচেই আমরা বানিয়েছি ভেজিটেবল চপ। বেসন দিয়ে বেগুনি ও চপ সম্ভবত তার একটু আগে পরেই এসেছে।
আগে ভেজিটেবল চপটাই বলি। ভেজিটেবল চপের জন্য লাগে আলু, বিট, গাজর, কড়াইশুঁটি, চিনাবাদাম বা কাজুবাদাম। প্রথমে সবজিগুলো ছোটো ছোটো করে কেটে নিয়ে সেদ্ধ করে নেওয়া হয়। তারপর জল ঝরিয়ে সরষের তেলে নুন, লংকা, আদা, জিরে, ধনে, আমচুর এসব মশলা দিয়ে কষে তারপর ঠান্ডা করে নিয়ে বল বা ডিমের আকারে গড়ে তারপর এরারুটে ডুবিয়ে ব্রেডক্রাম্বে গড়িয়ে নিতে হবে। তারপর ঘিয়ে ভাজা। যেসব দোকানে আলুর চপ বেগুনি হয় না তাঁরা ঘিয়েই ভাজেন। বাকিরা তেলে। চপের দোকানের মশলায় পেঁয়াজ রসুন থাকে, মিষ্টির দোকানে নিরামিষ।
আলুর চপে কেবল আলু ও চিনাবাদাম থাকে। মশলা কষানোর পদ্ধতি একইরকম। আলু মশলায় কষিয়ে মিহি বেসন নুন খাবার সোডা দিয়ে ফেটিয়ে ব্যাটার করে তাতে আলুর মণ্ড গোল বা চ্যাপটা করে ডুবিয়ে ভেজে নিলেই আলুর চপ। আলুর চপ ভাজা হয় সরষের তেলে।
বেগুন লম্বা করে কেটে বেসনে ডুবিয়ে তেলে ভাজলে হল বেগুনি। বেগুনের জায়গায় কুমড়োও চলে। তখন নাম হবে কুমড়ি। বেগুনির ব্যাটারে আবার কালোজিরে, মৌরি, বাদামের গুঁড়ো এসবও থাকে।
তারাপীঠ ও বক্রেশ্বরে বিভিন্ন দোকানে বেগুনি হয়, যা লম্বায় ফুটখানেক বা তার কাছাকাছি। ওই বেগনির জন্য বিশেষ একরকম বেগুনের চাষ করা হয়। হুগলিতেও নাকি ওরকম লম্বা বেগুনের চাষ হয়।
এ ছাড়া গরমকালে এঁচোড় সস্তা হলে তখন এঁচোড়ের চপও হয়। এঁচোড় সেদ্ধ করে চটকে ভেজিটেবল চপের কায়দায় মশলা দিয়ে কষিয়ে একইভাবে ব্রেডক্রাম্বে গড়িয়ে ভাজা।
মাদ্রাজিরা পেঁয়াজকে নিরামিষ ধরেন। মাদ্রাজের মিষ্টির দোকানে পাওয়া যায় পেঁয়াজি, যা কর্নফ্লাওয়ার দিয়ে তৈরি। দেওয়ার সময় গুঁড়ো মশলা ছড়িয়ে দেয়। বেশ চাটমশলার মতো খেতে। অনেক বাঙালি দোকানেও ভেজিটেবল চপের ওপর চাটমশলার গুঁড়ো দেয়। গরম গরম চপের ওপর মশলাটা ভালোই এফেক্ট দেয়।
কে যেন বলেছিলেন পৃথিবীর সেরা সাম্যবাদী হল পান। পর্ণকুটির থেকে রাজপ্রাসাদ সে সর্বত্রগামী। তেলেভাজা সম্পর্কে একই কথা বলা যেতে পারে। এককাপ চা বা কফির সঙ্গে দুটো পেঁয়াজি বা মুড়ির সঙ্গে দুটো বেগুনি থাকলে কে বা রাজা কে বা প্রজা।
বাঙালি কবে থেকে তেলেভাজা খাওয়া ধরেছে, এ বলা চাট্টিখানি ব্যাপার না। বাঙালির ইতিহাস এমনিতেই ধোঁয়াটে। রাজনৈতিক ইতিহাস যদি বা একটুন আধটু আছে, সাংস্কৃতিক ইতিহাস চাইলে একগলা জলে দাঁড়িয়ে কাঁদা ছাড়া বিশেষ কিছু করার নেই। নীহাররঞ্জন রায় খেটেখুটে বাঙালির ইতিহাসের আদিপর্বখানা লিখে গেছিলেন বলে আমার মতো কুঁড়ের বাদশাদের প্রাচীন বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস পড়ার সময় একটু কম বই-টই ঘাঁটতে হয়, আর নির্ভরযোগ্য তথ্যটাও পাই। ক্রসচেক করার দরকার পড়ে না।
নীহাররঞ্জন মঙ্গলকাব্যের অনেক রেফারেন্স দিয়েছেন। প্রাচীনকালের বাংলার খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে জানতে হলে মঙ্গলকাব্য পড়লে কিছুটা ধারণা হবে। সবকটা মন দিয়ে পড়ে ফেললে শুধু খাদ্যাভ্যাসই না, শ-তিনেক বছরের সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা এসে যাবে। বাংলা সাহিত্য পড়েছি সামান্যই, তবে মঙ্গলকাব্যগুলো ভালো লাগত বলে একটু মন দিয়ে পড়েছিলাম। তেলেভাজা তো দূর অস্ত, বেসনের নামো নিশান মেলেনি। কাজেই এটা বলাই যায় তিনশো বছর আগে বাঙালি বেসন খেতে শেখেনি।
অন্যদিকে “শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত” ও “গোবিন্দলীলামৃত” বইতে কৃষ্ণদাস কবিরাজ মহাপ্রভু ভালোবাসতেন এমন বহু খাদ্যের কথা বলেছেন। এর মধ্যে বাঙালি খাবার ছাড়া ওড়িয়া খাবার ও মিষ্টির নাম আছে। ওখানেও তেলেভাজা জাতীয় কিছু পেলাম না। তার মানে মহাপ্রভুর সময়ে, আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে বাঙালি ওড়িয়া কেউ তেলেভাজা খেতে জানত না।
সব মিলেজুলে আমার নিজের ধারণা হল, বেসন ও তেলেভাজা রাজস্থানি ও গুজরাটিদের হাত ধরে বাংলায় এসেছে। শিল্পাঞ্চলের সন্তান হওয়ার সুবাদে রাজস্থানি ও গুজরাটি বন্ধুবান্ধব আছে। এজন্য বেসন ওঁদের খাদ্যের কতখানি জুড়ে আছে সেটা ভালো করে জানা আছে। মোটামুটি তিনশো বছর আগে যেসব মাড়োয়ারি ও কাচ্ছিরা (যদ্দূর জানা এঁরাই সবার আগে বাংলায় আসেন, পিছনে বাদবাকিরা।) ভাগ্য ফেরাতে এদেশে আসেন, তাঁদের দেখাদেখি বাঙালি বেসন খেতে শেখে। সরষের তেল তো হাজারখানেক বছর আগেই হেঁশেলে ঢুকে পড়েছে, বেসনও এসে গেছে, কাজেই #হোক_তেলেভাজা।
তেলেভাজার মূল উপাদান হল বেসন। ছোলা বা মটর শুকিয়ে তার খোসা ছাড়িয়ে জাঁতায় গুঁড়ো করে বেসন তৈরি করা হয়। বেসন সরু ও মোটা দুরকমই হতে পারে। তেলেভাজার বেসন একদম মিহি, কারণ তেলেভাজা করতে হলে বেসনকে জলে গুলে ব্যাটার তৈরি করতে হবে। ওই ব্যাটারে ডুবিয়ে চপ, বেগুনি বানানো হয়। পেঁয়াজির বেসন একটু মোটা হলেও চলে।
তেলেভাজা ভাজতে গেলে সরষের তেলের বিকল্প কিছু নেই। বইপত্র যেটুকু ঘেঁটেছি তাতে জানলাম ভারতীয়রা রান্নায় তেলের ব্যবহার শুরু করে হাজার পাঁচেক বছর আগে। তার আগে কুকিং মিডিয়াম ছিল ঘি। মোটামুটি পাঁচ হাজার বছর আগে ভারতে তিল ও তিলের তেলের ব্যবহার শুরু হয়। (প্রকৃতপক্ষে তৈল কথাটাই এসেছে তিল থেকে)। হাজারখানেক বছর আগে আসে সরষে ও সরষের তেল। তখন ডাল ছিল, কিন্তু বাঙালি বিউলির ডালটাই খেত। এ ডালও ছিল দামি, বড়োলোকের খাদ্য। ছোলার ডাল, অড়হর ডাল, মটর ডাল অনেক পরে বাঙালির হেঁশেলে ঢুকেছে। ছোলাডাল বা মটর ডাল না থাকায় বেসন ছিলই না। ফলে তেলেভাজাও না। সাতশো-সাড়ে সাতশো বছর আগে ডালবড়া জাতীয় খাবার ছিল, সংস্কৃত সাহিত্যে সে উল্লেখ পেয়েছি। তবে সে ডালবড়া বিউলির ডাল বেটে তারপর মশলা মিশিয়ে বা না মিশিয়ে তেলে ভাজা হত। সরষের তেল ততদিনে উত্তর ভারতের হেঁশেলে চলে এসেছিল। দক্ষিণীরা বাদাম তেল বা নারকেল তেল ব্যবহার করতেন। তবে বোনডা, কাঁচকলার বেগুনি জাতীয় ভাজা আজ থেকে সাতশো বছর আগে ওদিকেও ছিল না। ওইসময় বেসন জিনিসটাই ভারতবর্ষে ছিল কি না সে ব্যাপারে নেটে খোঁজখবর করলাম। সবাই একবাক্যে বলল, না। বেসনের ব্যবহার শুরু হয়েছে খুব বেশি হলে চারশো বছর আগে। মুগডালের গুঁড়োকে বেসন ধরলে অবশ্য আলাদা কথা। তাহলে বেসনের বয়েস দাঁড়াবে তিন হাজার বছর। তিন হাজার বছর আগে থেকে মুগের বেসনে সফেদা বা চালগুঁড়ো মিশিয়ে মুদ্গমোদক নামে মোতিচুর জাতীয় মিষ্টি ও মুগলাড়ু তৈরি হত। হুগলি জেলার জয়রামবাটি-কামারপুকুর অঞ্চলে বরবটির বেসন দিয়ে ধবধবে সাদা রঙের জিলিপি ও বোঁদে তৈরি হয়। তেলেভাজার বেলায় সেই সনাতন ছোলা বা মটর ডালের বেসন।
বেসন জিনিসটা খুব সম্ভবত গুজরাট অঞ্চলে প্রথম তৈরি হয়। পরে রাজস্থান ও পাঞ্জাব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, সেখান থেকে বাকি ভারতে। গুজরাটি রান্নায় এবং মিষ্টিতে বেসনের যেরকম ছড়াছড়ি, তাতে করে এরকমটাই আমার মনে হয়েছে। এবং তেলেভাজার আইডিয়াটাও সম্ভবত ওখানকারই। রাজস্থানি, গুজরাটি ও মারাঠি বন্ধুরা বড়ো সাইজের একরকম লংকার ভেতর মশলাদার আলুর পুর ভরে বা না ভরে বেসনে ডুবিয়ে ভাজেন এবং ওই মিরচি পকৌড়া এনতার খান। কোনোদিন যদি শুনি ওটা থেকে বেগুনি এসেছে তাহলে অবাক হব না।
পকৌড়ার গল্পটাই ধরা যাক। পকৌড়া আগে বিউলি ডাল বাটা বা ছোলার ডাল বাটায় সবজি, পেঁয়াজ, মশলা একসঙ্গে মেখে তৈরি হত। ওরকম ডালের পকুড়ি (বিক্রেতারা পকুড়িই বলতেন) আমার ছোটোবেলায় কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় তোলা উনুন বসিয়ে বিক্রি হত। পরে মসুরডাল বাটা আসে। বেসনের পকৌড়া যে অনেক পরে এসেছে, এটা বুঝতে শার্লক হোমস হতে লাগে না।
বেসন ছোলার ডাল দিয়ে হলেও আমাদের এদিকে মটর ডালের বেসনেরই চল বেশি। মটর ডালের বেসনের রং ঈষৎ হালকা হলুদ, ফেটালে সহজে ফ্লাফি হয়ে যায়। শুদ্ধ মটর ডালের তেলেভাজার স্বাদই আলাদা। তবে দোকানে যে বেসন ব্যবহার করা হয়, সেই মটর ডালের বেসনে খেসারি ডাল মেশানো থাকেই। ফলে স্বাদ খারাপ হয়। সহজে ফোলে না। ভালো ব্র্যান্ডের বেসন বাড়িতে ফেটিয়ে দেখলেই ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। ছোলা হোক, মটর হোক, বেসন যদি শুদ্ধ হয়, হালকা হবে, রঙেও তফাত হবে। একফোঁটা ফেটানো বেসন জলে ফেললে হালকা হয়ে জলে ভাসতে থাকবে। ভেজাল বেসনে তা হবে না। বেসনে ভেজাল থাকলে রঙেই বোঝা যায়।
তেলেভাজার আরও একটা অপরিহার্য অঙ্গ হল সোডা বাই কার্ব। এই বস্তুটি কারা ভারতে আমদানি করেছেন এ ব্যাপারে কোনও তথ্য পাইনি। পুরোটাই আন্দাজে বলছি।
সোডা বাই কার্ব, চলতি কথায় খাবার সোডা সম্ভবত পর্তুগিজ ও ডাচ সাহেবদের হাত ধরে এসেছে। মোটামুটি তিনশো বছর আগে হুগলি জেলার শ্রীরামপুর, চুঁচুড়া, চন্দননগর এসব জায়গায় ওলন্দাজ, ফরাসি ও দিনেমাররা থানা গেড়েছিলেন। এঁরা ছিলেন মিশনারি, দেশ থেকে পাচক আনার বিলাসিতা করতে পারেননি। পাচকরা সবাই ছিলেন এদেশি। ডাচদের হাত ধরে এদেশি পাচকরা যেমন কটেজ চিজ বা ছানা তৈরি শিখেছিলেন, আমার বদ্ধমূল ধারণা খাবার সোডার ব্যবহারও এঁদের কাছেই বাঙালি শিখেছে। সাহেবরা এদেশে এসে ডাল–ভাত খেতেন না, নিজেদের অভ্যস্ত খাবারই খেতেন। ইউরোপীয় রান্নার একটা বড়ো অংশ বেকিং নির্ভর। পাউরুটি থেকে কেক, টার্ট, সবই বেক করে বানাতে হয়। বেক করলেই বেকিং সোডা বা সোডা বাই কার্ব লাগবেই। কাজেই এমনটা মনে করা যেতে পারে সোডা বাই কার্ব-এর ব্যবহার সাহেবদের থেকে শেখা।
বাঙালি তেলেভাজার বয়েস যে তিনশো বছরের আশেপাশে, তার আর-একটা প্রমাণ হল আলুর চপ। আলু পর্তুগিজদের হাত ধরে এদেশে আসে। ইউরোপই আলু খেতে শিখেছে ষোড়শ শতাব্দীতে। তারপরে ভারতে এসেছে। লংকার গল্পও তাই। চিলি থেকে স্পেন, তারপর পর্তুগাল হয়ে ভারত। কাজেই সোজা সিদ্ধান্ত, আলু, লংকা, খাবার সোডা এই তিন উপাদানের বয়েস যত, তেলেভাজার বয়েস তার থেকে বেশি নয়।
তেলেভাজা বলতে মূলত বোঝায় চপ, ফুলুরি, পকুড়ি, ডালবড়া, পিঁয়াজি আর বেগুনিকে। এক এক করে আসি।
চপ নামেই মালুম চপ সাহেবদের দান। চপ অর্থাৎ কুপিয়ে কাটা। মাংসকে কুপিয়ে কেটে কিমা বানিয়ে তারপর সেই কিমা সেদ্ধ করে আলুসেদ্ধ ও নুন-মশলা মিশিয়ে কষে তারপর সেই মিশ্রণ ঠান্ডা হলে পরে তাকে গোল বা ডিমের আকারে গড়ে নিয়ে পাতলা অ্যারারুটের গোলা মাখিয়ে ব্রেডক্রাম্বে গড়িয়ে নিয়ে তারপর তেলে ভাজা। চপের মশলায় বিট নুন, নুন, আদা, পিঁয়াজ, রসুন, গোলমরিচ, ধনেপাতা, ধনেগুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, গরম মশলা আর লংকা থাকে। কিমার চপ হয়, আবার কম কাঁটার মাছ, বিশেষ করে লটে বা লইট্যা মাছ সেদ্ধ করে মেখে কিমার চপের কায়দায় বানিয়ে নিলে হবে মাছের চপ। একইভাবে খোসা ছাড়ানো চিংড়িমাছ দিয়ে হয় চিংড়ির চপ। আধখানা ডিম আর বাকি অর্ধেক কষা আলু দিয়ে বানানো হয় ডিমের চপ বা ডিমের ডেভিল।
সাহেবের চপকে বাঙালি বিট, গাজর, কড়াইশুঁটি, আলু সেদ্ধ করে মশলা দিয়ে বানিয়েছে ভেজিটেবল চপ। এটা এত জনপ্রিয় যে মিষ্টির দোকানগুলোয় সুদ্ধু বিক্রি হয়। মিষ্টির দোকানের চপে অবশ্য পিঁয়াজ রসুন থাকে না। শুধু আদা ও লংকা-মরিচ, ধনে-জিরেগুঁড়ো আর শাহি গরম মশলা। কেউ কেউ আমচুরও দেন।
তবে সাধারণভাবে চপ বললে আলুর চপকেই বোঝায়। আলু সেদ্ধ করে প্রথমে মোটা করে চটকে নিতে হবে। মোটা করে মানে আলুভাতের মতো না, দানা দানা থাকবে। তারপর সেই আলুকে নুন মশলা দিয়ে কষিয়ে নিতে হবে। মশলা ভেজিটেবল চপের মতোই। তারপর সেই আলু গোল বা চ্যাপটা করে লেচি বানিয়ে নিয়ে গোলা বেসনে ডুবিয়ে ফুটন্ত তেলে ছেড়ে মিনিটখানেক রাখলেই লালচে রং ধরতে শুরু করে। রং একটু গাঢ় হলে নামিয়ে নিতে হবে। ব্যস, গরম গরম আলুর চপ তৈরি। চপের লেচি চ্যাপটা করে নিলে অবশ্য চপটাকে একবার উলটে দিতে হবে। দক্ষিণী বোনডা একই বস্তু, তবে বোনডার মশলায় কারিপাতা থাকে, নারকেলের গুঁড়োও পেয়েছি। মেদিনীপুর জেলার পাঁশকুড়ার চপ খুব নামকরা। ওতে নাকি বাইশ রকম মশলা থাকে।
একটা মজার গল্প বলি। উত্তর কলকাতায় একটি বিখ্যাত চপের দোকান আছে। এঁদের চপের মশলায় আমচুর থাকে, ফলে একটু টক টক স্বাদ হয়। সেই থেকে রটে গেল, চপ বাসি আলু দিয়ে বানানো। তাই এমন টক। ওদিকে চল্লিশ বছর ধরে তো দেখছি সকাল সন্ধে ‘শোলে’-র লাইন পড়ে। কারা যে এসব রটায়! পুরো হাতিবাগান বাজারের সামনের কচুরির দোকানের কেস।
চপের বেসন গোলাটিই আসল ওস্তাদি। চপের বেসন হবে একদম মিহি, ট্যালকম পাউডারের মতো না হলেও মিহি। বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর মাঝে রেখে ঘষলে পাউডার পাউডার লাগবে। মটরডালের বেসন হলে সিল্কি। সেই বেসনকে নুন ও খাবার সোডা সহযোগে পাতলা করে ফেটিয়ে ফেটিয়ে গুলতে হবে। পাতলা মানে একদম পাতলা না, ততটা পাতলা যাতে চপের লেচি ডোবালে বেসনগোলা লেচির গায়ে লেগে থাকবে। ভালো মানের বেসন জলে ফেলে ফেটাতে শুরু করলেই ফুলে ওঠে এবং ফ্লাফি হয়ে যায়। বেসন ফেটানোর পরে অনেকে একটু ফুড কালার দিয়ে দেন, তাতে রংটা খোলে। আবার এই সুযোগে কিছু অসাধু চপওয়ালা বেসনে এমন একটা রং মেশান, যাতে করে হালকা ভাজলেই চপ লাল রং ধরে নেয়। দেখলে মনে হয় কড়া ভাজা, কিন্তু আদপেই তা নয়।
বেসন ফেটানোর সময় কিন্তু মাথায় রাখতে হবে সোডার পরিমাণ কেজিতে কুড়ি গ্রামের বেশি হলে চপ বাবাজি হুড়হুড় করে তেল টানবে। এক কড়া তেল পাঁচ মিনিটেই শেষ। তারপর পচা চপ খাওয়ানোর দায়ে দোকানে থান ইট। কপাল বেশি খারাপ হলে ‘বেয়াইবাড়ি’ দর্শনও হতে পারে।
বাড়িতে চপ করলে বেসনগোলায় একটু সাদা তেল বা সরষের তেল দিতে পারেন। তাতে তেল কম টানবে। বাড়িতে চপ করলে সোডা ছাড়াও করা যায়। ওপরটা কেনা চপের মতো মচমচে হবে না। ছালটাও ফোলা ফোলা হবে না। কেনা চপের বেসনের ছালটা ফুলে থাকে, কারণ ওই সোডা বাই কার্ব।
ফুলুরি বাড়িতেই হোক বা দোকানে, সোডা বাই কার্ব ছাড়া ফুলুরি ফুলবে না। ফুলুরি সবাই ভাজতে পারেন না, কারণ ফুলুরির বেসনে চপের চেয়ে একটু বেশি সোডা লাগে, এই পরিমাণটা একটু উনিশ-বিশ হলেই ফুলুরি ফটাস। আর বেসন ফেটানোরও বিশেষ কায়দা আছে। ফুলুরির বেসন হবে ঘন। ঠিক কেকের ব্যাটারের মতো। ওপর থেকে চামচে করে ফেললে সরু ফিতের মতো হয়ে গামলায় ফেরত আসবে। চপের বেসনগোলার ঘনত্ব যদি রসের মতো এক তার ধরা হয়, ফুলুরি তবে সোয়া দু তার।
ফুলুরির বেসনে কালোজিরে বা জোয়ান কখনও থাকে, কখনও থাকে না। ফুলুরির সবচেয়ে ইউনিক পয়েন্ট হল কাঁচালংকা। বেসনে মাখা নয়। খেয়াল করে দেখবেন বেসনের গামলার পাশে রাখা বাটিতে মোটা করে কুচোনো কাঁচালংকা রাখা থাকে। কারিগর ফুলুরি ছাড়ার সময় বাঁ হাতে আলতো করে দু-তিনটে কাঁচালংকা কুচি তুলে নিয়ে ডান হাতের ফুলুরির মণ্ডে নিয়ে টুক করে কড়ায় ফুলুরি ছেড়ে দিচ্ছেন। ফুলুরি খাওয়ার সময় লংকাকুচিগুলো ফুলুরির মাঝখানে পাওয়া যায়। ওপরটা মচমচে, ভেতরটা পাউরুটির মতো ফোলা ফোলা; কামড়ালেই মুখে সোডা আর কাঁচালংকার সুগন্ধ, সব মিলেমিশে একবারে ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক।
ফুলুরি এমনি এমনি খাওয়া হয়, মুড়ি দিয়ে খাওয়া হয়, আবার ফুলুরি সরষের মশলায় ফেলে ফাসক্লাস ঝালদে-ও হয়। গরম ভাতে ফুলুরির ঝালদে ইলিশের ঝালদের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে পারে।
কেবল গরম ভাতেই না, গরমকালে পান্তাভাত, পেঁয়াজি, ঝালবড়া আর ফুলুরি মেখে সামনে ধরলে বাঙালি ও ওড়িয়া বিরিয়ানিকেও হেলায় একপাশে সরিয়ে দিতে পারে।
ফুলুরির একটা ছোটো বোন আছে, গোলগোলা। আকারে বড়ো মার্বেল গুলির মতো। ছোটো আকারের বলে বাড়িতে করা যায়। গোলগোলা ভাজা খাওয়া যায়, কিন্তু এর আসল রূপ হল পাঁচফোড়ন, লংকা, বিটনুন, তেঁতুল গুড় দিয়ে টক। গরমকালে পান্তাভাতের সঙ্গে গোলগোলার টকও খুব উপাদেয়। অনেক বাড়িতে মাছ ও গোলগোলা একসঙ্গে দিয়ে টক করে। তার স্বাদ লিখে বোঝাই এতখানি ভাষাজ্ঞান আমার নেই। গোলগোলা আবার বেসনের বদলে ময়দা দিয়েও হয়।
একটু নামী তেলেভাজার দোকানে গেলে দেখা যাবে বারকোশ বা কাচের বাক্সে তেলেভাজা সাজানো আছে। চপ, বেগুনি এদের রং লাল, ফুলুরি সাদা ফ্যাকফ্যাক করছে। ফুলুরি চাইলে তেলে ফেলে এবারে ঠিকঠাক ভেজে দেওয়া হচ্ছে। এর কারণ ফুলুরি খোলা হাওয়ায় রাখলে নরম হয়ে যায়। ওপরের মচমচে ভাব থাকে না, আর ফুলুরি কেমন মিইয়ে যায়। ভালো কারিগররা তাই ডেলিভারি দেওয়ার আগে আরও একবার ভেজে দেন।
বর্ধমান শহরের মানুষজন যত মিষ্টি খান, তত তেলেভাজা খান। এখানকার তেলেভাজার মানও তেমনি। কলকাতার তেলেভাজা যদি বড়ে গুলাম সাহেবের ঠুংরি হয়, বর্ধমান আখতারির গজল। একবার এখানকার এক নামী দোকানে ফুলুরি খেয়ে দেখি একদম সাদা। কেবল বেসন আর সোডা। রবিবাসরীয় ঝালদে স্পেশাল।
শেষপাতে প্রশান্তদার সংযোজন, “আমি একটা চাটের কথা বলতে পারি। গরম ফুলুরি ভেঙে তাতে সাদা দই, তেঁতুলের চাটনি, বিটনু্ন, ওপরে ফ্রেশ ধনেপাতা দিলে বেশ মুখরোচক হয়।”
তেলেভাজার মধ্যে সবচেয়ে সহজে বানানো যায় বেগুনি আর পেঁয়াজি। চপের বেসন যেমন করে মাখে, অমনি করে বেসন ফেটিয়ে তাতে দুটি কালোজিরে বা পোস্তদানা ছড়িয়ে নিয়ে তারপর বেগুন আড়াআড়ি বা লম্বা করে কেটে বেসনে ডুবিয়ে তেলে ভেজে নিলেই গরমাগরম বেগুনি তৈরি। চায়ের সঙ্গে গরম বেগুনির মতো দোহার আর নেই। খিচুড়ির পাতে পোস্ত, ইলিশভাজা যাই-ই থাকুক না কেন, দুটো বেগুনি না থাকলে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আবার মুড়ির সঙ্গে দুটো বেগুনি ভেজে দিলেই চটজলদি জলখাবার হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বানানো যায় বলে বেগুনি আসমুদ্রহিমাচল ভারতের গৃহিণীপ্রিয়।
দোকানের বেগুনির হলমার্ক হল পোস্ত। বেগুনি তেলে ছেড়েই ওপরের কাঁচা দিকটায় স্যাট করে দুটি পোস্তদানা, দু-তিনটে চিনেবাদাম বা কুসুমবীজ ছড়িয়ে দেওয়া। কামড়ালেই ভাজা বেসন আর ভাজা পোস্তর ঘ্রাণ মিলেমিশে একবারে ব্রহ্মস্বাদের ভাইবেরাদর।
যত জায়গার বেগুনি খেয়েছি, ইস্ট অর ওয়েস্ট, বীরভূম ইজ দ্য বেস্ট। তারাপীঠ ও বক্রেশ্বরের এক ফুট লম্বা বেগুনি যে-কোনো জায়গার বেগুনিকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দেবে। এরকম বেগুন হুগলিতেও পাওয়া যায়। যেমন আকার, তেমন স্বাদ। এ বেগুন নাকি বিশেষভাবে চাষ করতে হয়। ইদানীং অজয় পার হয়ে আমাদের এদিকেও এক-আধটা আসছে।
বেগুনের কায়দায় কুমড়ো কেটে কুমড়ি বানানো হয়। আলু লম্বা করে কেটে হয় আলুবড়া। পটল লম্বা করে কেটে হয় পটুলি বা পটলি। আলুবড়ার আলু কখনও কখনও আলুভাজার মতো গোল করেও কাটা হয়। আলুবড়া নামে বড়া, আসলে বেগুনিই। দক্ষিণে কাঁচকলা লম্বা করে কেটে বেগুনি বানানো হয়। ওখানে বেসনে একরকম রং দেওয়া হয় তাই রংটা একটু অন্যরকম। খেয়ে দেখেছি, স্বাদেও একটু আলাদা।
শিপ্রা বিশ্বাস লিখেছেন, বেসনে একটু চালগুঁড়ো দিলে নাকি বেগুনি মচমচে হয়, তেলও টানে কম। এটা কখনও ট্রাই করিনি। আমরা বেসনে একটু সাদা তেল মিশিয়ে দি। তবে অনেকে বেগুনি মচমচে করার জন্য কর্নফ্লাওয়ার দেন। সাহেবি বেগুনিও আছে aubergine fritters; বেগুনকে লম্বা করে কেটে কর্নফ্লাওয়ারের ব্যাটারে ডুবিয়ে ভাজা। শোনা কথা, সাহেবরা নাকি এদানি কর্নফ্লাওয়ারের বদলে বেসন ধরেছেন।
শেষপাতে একটা মজার তথ্য দিই। বেগুন সারা পৃথিবীতে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে লম্বা বেগুনি রঙের বেগুন, যেটা সচরাচর এখানে পাওয়া যায়, সেটা আমাদের উপমহাদেশের। একসময় নাকি সারা পৃথিবীতে বেগুন গাছ আগাছা বলে গণ্য হত, বেগুন ছিল অখাদ্য। আইয়ো ম্মা!
বেগুনির পরেই আসে পেঁয়াজি। পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি পেঁয়াজির কদর কেবল পশ্চিমবাংলা বা ভারতেই না, সারা পৃথিবীতে। পেঁয়াজিও বেগুনির মতো চট করে বানানো যায়; আর এটা চা, মুড়ি, পান্তাভাত, রুটি, মায় বিরিয়ানির সঙ্গে খাওয়া যায়। পেঁয়াজি বা ওপার বাংলার পিঁয়াজু, যে নামেই ডাকা যাক, এটা ছাড়া ইফতার জাস্ট ভাবা যায় না।
পেঁয়াজির মজা হল, পেঁয়াজ ও বেসন নুন-লংকা দিয়ে মেখে বল বানিয়ে তেলে ভেজে নিলেও হয়, আবার পেঁয়াজিতে পেঁয়াজের সঙ্গে পেঁয়াজশাক, ধনেপাতা, মেথিশাক, আদাকুচি, জোয়ান, কসৌরি মেথি, যা খুশি থাকতে পারে। অনেকে শাকওলা পেঁয়াজিকে পকৌড়া বলেন, কিন্তু পেঁয়াজের ভাগ বেশি হলে পেঁয়াজি বলাই উচিত বলে মনে হয়। পকৌড়া বা পকুড়িতে পেঁয়াজ থাকে, কিন্তু কম।
শীতে এই পেঁয়াজশাকের পেঁয়াজি অতীব উপাদেয়। শাকসমেত পেঁয়াজটা মিহি করে কুচিয়ে নিয়ে তাতে আদাকুচি, লংকাকুচি, নুন, বিটনুন, জোয়ান যোগ করে এট্টু বেকিং সোডা আর বেসন গিয়ে মেখে তেলে ভাজলে যে বস্তুখানি কড়া থেকে উঠে আসবে, তার কখানার সঙ্গে এককাপ কফি নিয়ে বসলে বিশ্বসংসারের চিন্তাভাবনা এক লহমায় উধাও। আর প্লেটের একপাশে যদি এট্টু সস আর পেঁয়াজির ওপর এট্টু চাটমশলা ছড়ানো থাকে, তাহলে তো আপনি কে, আর মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কোনজনা।
পেঁয়াজির বেসন ফেটাতে লাগে না। পেঁয়াজিতে বেসনটা বাইন্ডারের কাজ করে। পেঁয়াজের সঙ্গে মশলা দিয়ে বেসনটা মেখে নিলেই হল। অনেকে পেঁয়াজিতে কর্নফ্লাওয়ার দেন, তাতে করে পেঁয়াজি মুচমুচে হয়। বাঙ্গালোরে কর্নফ্লাওয়ারের পেঁয়াজি মিষ্টির দোকানে দোকানে বিক্রি হয়। তাতে আবার বেসনের ব নেই। খেয়েছি, তবে অনভ্যস্ত জিভে ঠিক জুত হল না।
পেঁয়াজিও বেগুনির মতো দুবার ভাজলে ভালো হয়, বিশেষ করে একটু বড়ো আকারের পেঁয়াজি, যা ইদের সময় বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হয়, সেগুলো প্রথমে গোল বলের মতো করে কড়ায় ছেড়ে একটু রেখে তুলে নিয়ে হাতে করে চেপটে নিয়ে আবার ভাজা হয়। এতে করে ভেতরটা ভালো করে ভাজা হয়। কাঁচা ভাব থাকে না।
এক বন্ধু মারাঠী বড়াপাও খাইয়েছিল। তাই দেখে একদিন বার্গার ব্রেড চিরে মধ্যিখানে একখানা চিৎপুরি পেঁয়াজি রেখে তাতে সস, চিজ, লেটুস দিয়ে খেয়ে ফেললাম। জাস্ট অসাম।
ডালবড়া সম্ভবত উত্তর ভারতের দান। একসময় বিউলির ডাল বেটে তেলে ভেজে বড়াজাতীয় একরকম খাবার খাওয়া হত, তাতে কোনও মশলা দেওয়া হত কি না জানা নেই। বিউলি ডালের বড়া এখন আর ভাজা খাওয়া হয় বলে জানা নেই। তবে চাট হিসাবে বিউলি বড়া দই, তেঁতুলের চাটনি, বিটনুন, নুন, চিনি, লংকা, ভুজিয়া যোগ করে দইবড়া ও মশলা দেওয়া রসে বা সরষের বাটায় ফেলে কাঞ্জিবড়া হিসাবে এখন বহুল প্রচলিত। স্বাদ বাড়াতে এতে মুগডালও যোগ করা হয়। দক্ষিণীরা সাম্বর বড়া বা মেদু বড়া খান, তাতে কোনও মশলা থাকে না। ওড়িয়া বিরি বড়াও তাই। মশলাবিহীন সাদা। তবে এগুলো সরাসরি খাওয়া হয় না। মেদু বড়া সাম্বরে ফেলা হয়, বিরি বড়া তরকারি করে খাওয়াই বেশি চালু।
ডালবড়া বলে যেটা এখন চালু, সেটা হল ছোলাডাল বেটে সোডা দিয়ে ফেটিয়ে নিয়ে তাতে পেঁয়াজ, আদাকুচি, ধনেপাতা কুচি, বিটনুন, লংকা, এইসব মশলা দিয়ে মেখে তেলে ভাজা। আকার কোথাও চপের মতো চ্যাপটা, কোথাও গোল বল, কোথাও আয়তঘনাকৃতি। অনেকে আবার ছোলা ও মসুরডাল একসঙ্গে বেটে দেন। তাতে স্বাদ বাড়ে, মচমচেও হয়। গরম মশলারও ব্যবহার আছে।
মুগডাল বাটা দিয়ে করা একরকম ডালবড়া খেয়েছি, তাতে আবার পেঁয়াজ ছিল না। একটু ঝালমিষ্টি খেতে।
বাঙালি ডালবড়াকে এক অসাধারণ রূপ দিয়েছে, ধোঁকা। ডালবড়ার মতো করে ছোলাডাল মশলা দিয়ে ফেটিয়ে আবার তাকে কড়ায় ফেলে নেড়েচেড়ে একটু শক্ত করে নিয়ে তারপর থালায় পেতে বরফির আকারে কেটে নিতে হবে। এবার ওই বরফিগুলো তেলে ভেজে তারপর দই আদা, জিরে গরমমশলা দিয়ে কষিয়ে তরকারি। স্বাদের কথা আর কী বলব, আপনি আমি তো কা কথা, রায়মশায় সুদ্ধু ঘায়েল। ওঁর জন্মদিনে এ ডিশটা একেবারে যাকে বলে মাস্ট ছিল।
আপামর বাঙালি কিন্তু ছোলাডালের চেয়ে মসুরডালের বড়াটাই বেশি পছন্দ করে বলে আমার ধারণা। এ বড়া বানানোর পদ্ধতি ছোলাডালের বড়ার মতোই। এটা আবার ঝালবড়া বলেও নানা জায়গায় চলে। স্রেফ গোটাকতক ঝালবড়া দিয়ে বাঙালি এক সানকি পান্তাভাত উড়িয়ে দিতে পারে, এটা নেমন্তন্ন পেলে হাতেকলমে প্রমাণ করে দিতে পারি।
তবে যত ডালবড়া খেয়েছি, হরিদ্বারের ডালবড়া সেরা। হরিদ্বারের রাবড়ি আর ডালবড়া খেয়ে আর-একটু হলে গেরুয়া ধরে ফেলেছিলাম।
তেলেভাজার সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় রূপের অধিকারিণী হলেন পকৌড়া। মূলত পকৌড়া বলতে যা বোঝায় সেটা পেঁয়াজি জাতীয়। বেস হল ছোলাডাল, মসুরডাল, বিউলিডাল বা বেসন।
পকৌড়াতে পেঁয়াজ থাকতে পারে, নাও পারে। একরকম পকৌড়া হয় পেঁয়াজ, পেঁয়াজশাক, মেথিশাক, সরষেশাক, ধনেপাতা, কাঁচালংকা, আদা, একসঙ্গে মিহি করে কুচিয়ে মোটা বেসনে নুন, বিটনুন দিয়ে মেখে বলের আকারে গড়ে তেলে ভাজা।
আর-একটা হয় শাহি পকৌড়া। কোথাও বলে নার্গিসি পকৌড়া। বিট, গাজর, ধনেপাতা, আলু, মটরশুঁটি ছোটো করে কেটে ভাপিয়ে তারপর বেসনে মাখিয়ে ভাজা। কর্নফ্লাওয়ার দিয়েও মাখা হয়। এতে আবার কাজু, কিশমিশ, বাদামও থাকে। এর বৈশিষ্ট্য হল এটা একটু মিষ্টি। এর আইডিয়াটা সম্ভবত ভেজিটেবল চপ থেকে এসেছে।
বাঁধাকপি কুচিয়ে বেসন ও আদাকুচি, কালোজিরে, জোয়ান দিয়ে হয় বাঁধাকপির পকৌড়া। আবার ফুলকপি ছোটো ছোটো করে কেটে বা একটা একটা ফুল দিয়ে সামান্য ভাপিয়ে বেগুনির বেসনে ডুবিয়ে বানানো হয় ফুলকপির পকৌড়া। বড়ো বড়ো চিজ বা পনিরের টুকরো পাতলা করে কেটে বেসনে ডুবিয়ে বানানো হয় চিজ পকৌড়া বা পনির পকৌড়া। এগুলো আবার কর্নফ্লাওয়ারেও বানানো হয়।
ইদানীং ব্রেড পকৌড়া বা ব্রেডচপ খুব চলছে। প্রথমে দু স্লাইস পাউরুটির মাঝে আলুর চপের পুর বা চিজ বা পনির নিয়ে সে দুটোকে স্যান্ডউইচের কায়দায় তেকোনা করে কেটে নিয়ে এক-একটা টুকরোকে বেসন বা কর্নফ্লাওয়ারের ব্যাটারে ডুবিয়ে ভাজা। কেউ কেউ আবার পাউরুটির টুকরোয় পুদিনা বা ধনেপাতার চাটনি মাখিয়ে তারপর পুর দেন। সাহেবদের কায়দায় একে স্যান্ডউইচ ফ্রিটার বলা যেতে পারে।
ডালের পকৌড়া একইরকম। কেবল বেসটা ডাল। শুধু ডালবাটা, পেঁয়াজবাটা, আদাবাটা, লংকাবাটা দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট আকারের পকুড়ি এককালে খুব চলত। এখন আর অতটা দেখা যায় না। তবে আছে। বড়ো আকারে করলে ওটাই ডালবড়া বা ঝালবড়া। ডালবড়ায় পেঁয়াজ, ধনেপাতা কুচিয়ে দেওয়া হয়, যাতে করে ওগুলো মুখে লাগে।
মাছ মাংস দিয়েও পকৌড়া বানানো যায়। চিকেনের কিমা বা খুব ছোটো করে কাটা হাড়ছাড়া টুকরো বাটা পেঁয়াজ, রসুনবাটা, আদাবাটা, ভিনিগার, লংকাবাটা, গরমমশলা মাখিয়ে কয়েক ঘণ্টা ম্যারিনেট করে নিতে হবে। অতঃপর পুরোটা স্টিমে সেদ্ধ করে বা না করে বেসন জড়িয়ে ভাজলে এটা হল চিকেন পকৌড়া। একই কায়দায় মেটে দিলে হবে লিভার পকৌড়া। চিংড়ি দিলে প্রন পকৌড়া। আমি ওই ব্যাটারে একটু পোস্তবাটাও দি। একটু অন্য গ্রেন আসে। বেসন বা কর্নফ্লাওয়ারে মাখার আগে মাংস বা মাছ মশলা মাখিয়ে যে কয়েক ঘণ্টা ম্যারিনেট করে রাখা হয়, পকৌড়ার স্বাদটা ওই ম্যারিনেশনের ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকে।
লটে মাছের পকৌড়াও ভালো চলে। লটে মাছের ঝামেলা কম, কুচো করে কেটে সরাসরি পেঁয়াজ, আদা, লংকা রসুন কুচিয়ে বেসনে মেখে দিলেই কাম তামাম। এ মাছ নরম, ভাপাতে হয় না। চট করে বানানো যায়। শীতের সন্ধেয় কফির সঙ্গে লা-জবাব।
খাসির চর্বি কুচিয়ে লটে পকৌড়ার কায়দায় ভাজলে দারুণ হয়। কামড়ালেই গলা বা আধগলা চর্বি আর ভাজা পেঁয়াজের মিলমিশে একবারে কৈবল্যদশা। এর ব্যাটারে ডিমও দেওয়া হয়। এটা জলমার্গের পথিকদের পথের সাথি।
মাংসের পকৌড়ার মধ্যে সেরা হল ব্রেন পকৌড়া। এটা সিন্ধ অঞ্চলের খাবার। পাঠানরা পাঁঠা বা ভেড়ার ঘিলু খেতে বেজায় ভালোবাসেন। ব্রেন পকৌড়া ওঁদের আবিষ্কার। রেলপথ চালু হওয়ার পর ব্রেন পকৌড়া সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।
ব্রেন পকৌড়ার প্রস্তুতপ্রণালী সবটাই কানে শোনা। প্রথমে পাঁঠা বা ভেড়ার ঘিলু নিয়ে তাকে পেঁয়াজবাটা, রসুনবাটা, আদাবাটা, লংকাবাটা, গরমমশলা, নুন দিয়ে সারারাত ম্যারিনেট করে রাখা হয়। এবার ওই ঘিলুকে মশলা দেওয়া বেসনে জড়িয়ে ভাজা হয়। ভেতরে ঘিলুটা গলে গিয়ে কামড়ানোর সময় মুখে পড়ে। দুটো কারণে বাড়িতে ব্রেন পকৌড়া করার অপচেষ্টা কখনও করিনি। এক, ঠিক কী কী মশলা দেওয়া হয় জানা নেই, কারণ ওটা ট্রেড সিক্রেট, কেউ বলবে না। দুই, পাঠানদের হাতের তার। কয়েক প্রজন্মের সাধনা ছাড়া ও তার হাতে আসবে না।
চপে ফেরত আসি। আলু ও ভেজিটেবল চপ ছাড়াও আরও বেশ কিছু চপ হয়, সেগুলো বলি।
এঁচোড় ছোটো ছোটো করে কেটে সেদ্ধ করে চটকে তাকে চটকানো আলুর সঙ্গে মেখে নেওয়া হয়। এবার নুন, আদাবাটা, লংকাবাটা, জিরেবাটা, গরমমশলা কষে তাতে এঁচোড়-আলুর মাখাটা দিয়ে মেখে নিতে হবে। এবার ঠান্ডা করে চপ বা ডিমের আকারে গড়ে নিয়ে বেসন বা ব্রেডক্রাম্ব জড়িয়ে তেলে ভাজলেই এঁচোড়ের চপ।
আলুর সঙ্গে কাঁচা আম সেদ্ধ করে তার পাল্পটা চটকে মেখে বেসনে ভাজলে হবে আমের চপ। আমের সময় আম, নইলে আম-আদা।
ইদানীং ক্যাপসিকাম চপ খুব চলছে। ছোটো ছোটো ক্যাপসিকামের ভেতরের বীজটা ফেলে দিয়ে তাতে আলুর পুর ভরে সবটা বেসন জড়িয়ে ভাজা। আগে দক্ষিণেই চলত। এখন তো আমাদের এদিকেও ভালোরকম চালু হয়ে গেছে।
পটলের বীজ বার করে আলুর পুর ভরে বেসনে ভেজে হয় পটল চপ। বেশ দোলমার মতো খেতে লাগে। সয়া চপ আর মোচার চপ, এ দুটোও চালু আইটেম। সয়া চপ করতে গেলে সয়াবিনের নাগেটস ও আলু সেদ্ধ করে জলটা ফেলে মেখে নিতে হয়। তারপর আলুর চপের মশলা দিয়ে কষে ভেজিটেবল চপের কায়দায় ব্রেডক্রাম্ব মাখিয়ে ভাজা।
মোচার চপ একই কায়দায় বানানো হয়। মোচাটাকে ছোটো ছোটো করে কুচিয়ে কেটে সেদ্ধ করে জল ফেলে আগে চটকে নিতে হবে। এবার আলু সেদ্ধর সঙ্গে চটকানো মোচা মেখে আদা, জিরে, লংকা বাটা, গরম মশলা, বাদামগুঁড়ো দিয়ে কষা। বাড়িতে করলে টমেটো পিউরি দিতে পারেন, দোকানে অবশ্য টমেটো দেয় না। এবার ডিমের আকারে ওই পুর গড়ে নিয়ে ব্রেড ক্রাম্ব জড়িয়ে ভাজা। বাড়িতে করলে আলুর চপের মতো বেসন জড়িয়েও ভাজা যায়।
আর একটা আমাদের এদিকে চলে, টমেটো চপ। ক্যাপসিকাম চপের কায়দায় ভেতরের বীজ ফেলে দিয়ে আলুর চপের মসলা পুরে বেসন জড়িয়ে ভাজা। কিমার চপ আর ডিমের চপ তো আগেই বলেছি।
ভাজা খাবারের সঙ্গে একটা চাটনি না হলে ঠিক জমে না । ভেজিটেবল চপ আর যে-কোনো পকৌড়া চাটনি ছাড়া ভাবাই যায় না। তেলেভাজার সঙ্গে সচরাচর চাট মশলা বা একটু বিটনুন ছড়িয়ে দেওয়া হয়। চপের সঙ্গেই একটা চাটনি দেওয়া হয়। সেটা পুদিনার চাটনি, ধনেপাতার চাটনি বা সস হতে পারে। সস বলতে টমেটো সস ও মাস্টার্ড সস তথা কাসুন্দিকে ধরেই বললাম। কোথাও কোথাও টমেটো কেচাপও চলে।
তবে খুব কম দোকানেই আমি ভালো চাটনি পেয়েছি। বেশির ভাগ দোকানেই ভেজিটেবল চপ বা পকৌড়ার সঙ্গে কাটা শশা-পেঁয়াজ আর টমেটো সস নামক লাল রং করা কুমড়োসেদ্ধ ধরিয়ে দেয়। ওই সস দিয়ে তেলেভাজা খেলে তেলেভাজার আসল স্বাদটাই পাওয়া যায় না। কিছু মিষ্টির দোকান তো আর-এক কাঠি বাড়া। চাটনি মানে বাসি রসে তেঁতুল আর লংকাগুঁড়ো মেশানো। ওর চেয়ে বরং চাটমশলা ঢের ভালো। তেলেভাজার ওপর ছড়িয়ে দেয়, তেলেভাজায় একটা আলাদা মাত্রা আসে। দু-একটা নামকরা দোকানে আবার নিজস্ব ফর্মুলায় বানানো মশলা দেওয়া হয়। তেলেভাজার শৌখিনরা ওই মশলার টানে ভিড় করেন।
৮৩-৮৫ বর্ধমানে গুরুকুল বাস করেছি। কোর্ট এলাকায় একজন তেলেভাজা বিক্রেতা ঠেলাগাড়ি নিয়ে বসতেন। উনি চপের সঙ্গে কাসুন্দি দিতেন। ওটাও নাকি ওঁর বাড়িতে বানানো। ওরকম স্বাদের কাসুন্দি কমই খেয়েছি। ২০০০-এও বসতে দেখেছি। উনি এখন বসেন কি না জানি না।
এক রাজস্থানি মহারাজের দোকানে পকৌড়ার সঙ্গে পুদিনার চাটনি দিয়েছিল। চাটনিটা খেতে অসাধারণ, কিন্তু খুব ঝাল। পকৌড়াও ঝাল, চাটনিও ঝাল। ঝালের চোটে পকৌড়ার স্বাদটাই মাঠে মারা গেল।
যাকগে, এসব ছোটো কথা বাদ দিয়ে বরং আমার মায়ের বানানো ধনেপাতা আর পুদিনার চাটনির রেসিপি দুটো বলি। আমরা বাড়িতে তেলেভাজা করলে চাটনিটাও করে নি। ধনেপাতার চাটনি আমার নিজের খুব প্রিয়।
ধনেপাতার চাটনি করা বেহদ্দ সহজ। ধনেপাতা আর কাঁচালংকা মিক্সিতে বেটে নিতে হবে। এবার ওই মিশ্রণে তেঁতুলের রস, নুন, বিটনুন, গুড়, জোয়ান মিশিয়ে মাখলেই ধনেপাতার চাটনি তৈরি। অনুপাতের ওপরে স্বাদ নির্ভর করবে। আমরা একটু মিষ্টি পছন্দ করি।
পুদিনার চাটনির রেসিপি প্রায় এক। কেবল একটু আদাবাটা যোগ হবে, আর তেঁতুলের বদলে শরবতি লেবুর রস। আমি টক দইও দিই। মন্দ হয় না।
তার মানে এটা নয় যে সস একবারে হ্যাক-ছি। ভালো ব্র্যান্ডের সস পেঁয়াজির সঙ্গে যে দোয়ারকি করবে, তার ধারেকাছে কেউ নেই। বাদলা দিনে খিচুড়ির সঙ্গে সস আর কাসুন্দি দিয়ে পেঁয়াজি পেলে ইন্দ্রত্বই কী, শিবত্বই কী!
সস ইউরোপ এলাকার বহু প্রাচীন খাদ্য। আজ থেকে প্রায় তিনহাজার বছর আগে গ্রিসে ভাজাপোড়া খাবারের সঙ্গে খাওয়ার জন্য সস আবিষ্কৃত হয়। মজার কথা, প্রথম আবিষ্কৃত সস ছিল মাছসেদ্ধ দিয়ে তৈরি। রোমান আমল ছিল সসের সুবর্ণ যুগ। শোনা কথা তখন নাকি পঞ্চাশ রকমেরও বেশি সস খাওয়া হত। পম্পেই নগর ছিল রোমানদের সস হাব। এখানে জালা জালা সস তৈরি হয়ে সারা রোমে চালান যেত। কিন্তু ‘কপালে নেইকো ঘি’। ভিসুভিয়াসের লাভায় পম্পেই নগর চাপা পড়ল, আর সে অগ্নিসমাধিতে অনেক সসের গোপন রেসিপিও ছাইচাপা পড়ে গেল। আর সেগুলো পাওয়া যায়নি।
কাসুন্দি ভারতবর্ষেরই আবিষ্কার। সাহেবরা খান মাস্টার্ড সস। কিন্তু ওঁরা এটা ভারতে আসার পরে খেতে শিখেছেন, নাকি ওঁরা আসার পরে ভারত খেতে শিখেছে, এ প্রশ্নের সদুত্তর পাইনি। এখনকার কাসুন্দিতে লংকা থাকে। সেই হিসাবে কাসুন্দির বয়েস তিনশোর মতো হবে। আবার নীহাররঞ্জনের বইতে পড়েছি প্রায় শ-আটেক বছর আগেকার কবি শ্রীহর্ষ বিরচিত নৈষধ চরিত বইতে লেখা আছে দময়ন্তীর বিয়ের ভোজে দই ও সরষেবাটা দিয়ে তৈরি কোনও একটা খাবার খেয়ে লোকে ঝালের চোটে মাথা ঝাঁকাচ্ছিল ও কপাল চাপড়াচ্ছিল। রাইসরষে বস্তুটি হাজারখানেক বছর আগেও ছিল। কাসুন্দি ওরই ডেরিভেটিভ হতে পারে, কারণ কাসুন্দির বেসই হল রাইসরষে ও দই ।
নৈষধ চরিতের গল্পটা পড়ার পর একটা কথা মনে হল। আটশো বছর আগে লংকা ছিল না। ভারতে লংকা আসে চারশো বছর আগে, পর্তুগিজ ফাদারদের হাত ধরে। তার আগে চুইলতা নামক গাছের রস দিয়ে ঝাল খাওয়া হত। চুই অনেকদিন ধরে ব্যবহার হচ্ছে, ওতে অমন বিষঝাল হওয়ার কথা না। তখন বোধহয় লংকাজাতীয় কিছু নতুন আমদানি হয়েছিল। পাচক ঠাকুররা ডোজ ঠিক করতে পারেননি।
কাসুন্দিতে আসা যাক। আমার চেনাজানা কাউকে কাসুন্দি বানাতে দেখিনি। কাসুন্দি করার অনেক নিয়মকানুন আছে। এক প্রবীণার সঙ্গে কথা বললাম। বন্ধু অনার্য তাপস একটি উইকির লিংক দিলেন। এ থেকে কাসুন্দির নিয়মকানুন সম্পর্কে একটা ধারণা হল। যা বুঝলাম, ব্রাহ্মণ ছাড়া এত নিয়মকানুন জানা বা পালন করা কার্যত অসম্ভব বলে অব্রাহ্মণরা কাসুন্দির ব্যাপারে বিশেষ মাথা ঘামাতেন না। বহু পরিবারে নানা নিয়মের ধুয়ো তুলে কাসুন্দি করা হয় না।
কাসুন্দি মূলত পূর্ববঙ্গে তৈরি হত। কাসুন্দি তৈরির ব্যাপারে ঢাকা-বিক্রমপুর রীতিমতো নামজাদা। অক্ষয় তৃতীয়ার দিন সধবা মেয়েরা কুলোয় করে কাসুন্দির উপকরণ রাইসরষে, কালো সরষে, শুকনো লংকা, ধনে, গোলমরিচ, জিরে, হলুদ, জোয়ান, তেজপাতা, মৌরি, রাঁধুনি, নুন, দারচিনি নিয়ে নদী বা পুকুরে যেতেন। সেখানে কিছু অনুষ্ঠান হত। ব্রাহ্মণ মেয়েরা নিজেরা করতেন, অব্রাহ্মণদের বেলায় একজন ব্রাহ্মণ লাগত। কিছু মন্ত্র পড়ার ব্যাপার ছিল। শুনে মনে হল মন্ত্রের মাধ্যমে মা লক্ষ্মীর কৃপা চাওয়া হত। মনে হল বললাম, কারণ মন্ত্রটা কী জানতে পারলাম না। উইকিতে আছে গানের মাধ্যমে দেবতার কাছে স্বাস্থ্য, সম্পদ ও পরিবারের কল্যাণ ভিক্ষা চাওয়া হত। এবার সরষে ও বাকি মশলা ধুয়ে বাড়িতে এনে তাকে পাঁচটি ফল, পান, ধান দূর্বা দিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে পুজো করা হত।
এবার সবকিছু কড়া রোদে কয়েকদিন শুকিয়ে নেওয়া হত। তারপর সবকিছু ভালো করে শিলে বেটে নেওয়া হত। এরপর একটি নতুন মাটির হাঁড়িতে জল ফুটিয়ে সেই জল দিয়ে পেস্ট করে দই মিশিয়ে কাসুন্দি রেখে দেওয়া হত। দইয়ের অ্যাসিড কাসুন্দিকে গাঁজিয়ে দিত। ব্যস, এবার বয়ামে ঢেলে দিলেই কাম তামাম। বছর বিশেক নিশ্চিন্দি।
কাসুন্দির বয়ামটি বিশেষ শ্রদ্ধার বস্তু ছিল। কেবল সধবারাই সেই বয়ামে হাত দিতে পারতেন, তাও স্নান করে কাপড় ছেড়ে তবেই। প্রাক-সংরক্ষক যুগে এ সাবধানতা না রাখলে চলত না। এখন তো সোডিয়াম বেনজয়েটের যুগ। আজকাল পুরোনো কাসুন্দি স্বচ্ছন্দে ঘাঁটা চলে।
কাসুন্দির সরষে একটু কচা বাটতে হয়, নয়তো তেতো হয়ে যেতে পারে। সরষের সঙ্গে কাঁচা আম, জলপাই, চালতা, বিলিতি আমড়া, কুল এরকম টক ফল কেটে শুকিয়ে বেটে কাসুন্দি বানানো হত। আম কাসুন্দিটাই এখন চলে। উইকিতে লেখা আছে এদানি টমেটোও চলছে। মাসিমার কাছে শুনলাম ওঁর মা দশ রকম কাসুন্দি বানাতে পারতেন।
সারা পৃথিবীতে তেলেভাজা নানা নামে চলে। কিন্তু তেলেভাজার গান বাঙালিই বাঁধতে পারে। খোদকত্তা জহর রায় গানটি বেঁধেছিলেন:
‘চপ খাব আস্ত
তৈরি করব স্বাস্থ্য
বেগুনি খাব গোটা
আমরা হব মোটা
পেঁয়াজি খাব শেষে
খাব ভালোবেসে!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন