ময়দা পর্ব

সুব্রত রুজ

map

ময়দা বললেই প্রথমেই লুচি-কচুরির কথা মনে এলেও ময়দা দিয়ে অনেক কটাই মিষ্টি হয়। ময়দা দিয়ে মিষ্টি করা আরব ও তুরস্কের দান। ভারতবর্ষে মুসলিমরা অনেক বছর রাজত্ব করেছেন, ফলে ভারতীয় ইরানি, আরবি ও তুর্কি সংস্কৃতির বিনিময় ঘটে এবং সকলেই কমবেশি উপকৃত হয়। মিষ্টির ক্ষেত্রটাও বাদ যায়নি। গুলাবজামুন, কালাজামুন, জলেবি, খাজা, বালুশাহী এমনই কয়েকটা নাম।

পাঠক-পাঠিকা ভাবছেন ময়দার মিষ্টিতে গজা বাদ গেল কেন? গজা বহু প্রাচীন মিষ্টি। সংস্কৃতে মণ্ড বলে উল্লেখ আছে। তবে মণ্ড সম্ভবত যব দিয়ে তৈরি হত। ময়দা পাঠান আমলে এসেছে।

গজা নামটি এসেছে গো-জিহ্ব নাম থেকে। গো-জিহ্ব অর্থে গোরুর জিভের মতো আকৃতিবিশিষ্ট। জিভেগজা দেখেছেন তো? কী মনে হয়?

যে গজা সচরাচর আমরা খাই, তার আকৃতি চৌকো। কিছুটা আয়তঘনাকৃতি। গজা বানাতে গেলে চাই ভালো ময়দা, ভালো ঘি আর কালোজিরে, কালো তিল, সোডা বাই কার্ব আর এক বা সোয়া তারের রস।

ময়দা, ঘি, কালোজিরে, তিল, সোডা একসঙ্গে মেখে বেশ করে চটকে আধ ঘণ্টাটাক ফেলে রেখে পাটায় লম্বা করে বেলে উলটেপালটে চার-পাঁচটা ভাঁজ করে ফের বেলতে হবে। তারপর পাঁচ মিনিট বিশ্রাম। তারপর ছুরি দিয়ে কিউব করে কেটে ঘিয়ে ফেলে ভাজা। হালকা হয়ে ভেসে উঠলেই ঘি ঝরিয়ে হালকা গরম রসে ফেলা। অনেকে রসে এলাচ, দারুচিনি এসবের গুঁড়ো দেন, ফলে গজায় যত রস ঢোকে, তত সুগন্ধ হয়।

গজা অনেকরকম। পান গজা, রাজ গজা, জিভে গজা, জুবিলি গজা, এমপ্রেস গজা এই নাম ক-টা শুনেছি। জিভেগজা আর পানগজা এখনও জীবিত, বাকিগুলো বলছি।

জুবিলি গজা সম্ভবত ভারতে ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞীর রাজত্বের সিলভার জুবিলি উপলক্ষে বানানো হয়েছিল। কোথাও তৈরি হয় বলে জানা নেই।

এমপ্রেস গজা নামটি কীভাবে এল সঠিক জানি না। ১৮৭৭ সালে, যেবছর মহারানি ভিক্টোরিয়াকে এমপ্রেস ঘোষণা করা হয় সে বছর কি? আমার দিদিমা এ ব্যাপারে কাজে আসেননি, কারণ তিনিই জন্মেছেন ১৯২০-২১ সালে। এমপ্রেস গজা মেদিনীপুরে তৈরি হয়েছিল, এটুকু তথ্য পেলাম। তবে দিদিমার তখন বয়েস হয়ে গেছে। ওই তথ্য কতখানি নির্ভরযোগ্য কে জানে। এখন তো আর নাম শুনি না। আর-একটা কথা শুনেছি, লবঙ্গলতিকাকে নাকি এমপ্রেস গজা বলে চালানোর একটা চেষ্টা হয়েছিল; তবে সফল হয়নি।

রাজ-গজার গল্পই শুনেছি। গপ্পে কিছু জল মেশানো আছে, তবে যা রটে কিছু তো বটে। এ গজা নাকি তৈরি হত চন্দননগরের খাঁটি গব্যঘৃত দিয়ে এবং তাতে কুচোনো মেওয়া থাকত। রসে এতটা জাফরান দেওয়া হত যে রসের রং হত গাঢ় হলুদ। বানানোর সময় নাকি আধ মাইল দূর থেকে গন্ধ পাওয়া যেত। এ গজা যে রাজাগজাদের সঙ্গে সঙ্গেই সহবিলুপ্তির পথে গেছে। তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এখন ওইভাবে বানালে এক-একটার দাম পড়বে একশো টাকার ওপর। এত দাম দিয়ে খাবে কে?

কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখেছেন পূপগূজা মহাপ্রভুর প্রিয় ছিল। ওড়িয়া ভাষায় গূজা মানে গজা। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্যের একটি লেখাতেও এই গজার উল্লেখ আছে। কিন্তু রেসিপিটি কবিরাজ মশায় লেখেননি।

অন্ডালে রামনবমী উপলক্ষে বেশ বড়ো মেলা হয়। এখানে একরকম মিষ্টি খেয়েছি ময়দা ময়ান দিয়ে তিলভাজা সহযোগে গুড়কাঠির মতো লম্বা লম্বা করে নিয়ে কেটে ঘিয়ে ভেজে তারপর মোটা রসে ডোবানো। একটু পরে রস ঝরিয়ে নেওয়া। শুকিয়ে গেলে গায়ে রসের কোটিং পড়ে যেত।

আমরা গুড়কাঠির আদলে ওকে ডাকতাম চিনিকাঠি বলে। নেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে বাংলাদেশ-নিবাসিনী আফরোজা নৌরিনের ব্লগে পেলাম ওর নাম মুরলী গজা। আহা, এত মিষ্টি নামখানি অ্যাদ্দিন জানতাম না। এ গজা বিভিন্ন মেলাতে এখনও পাওয়া যায়।

বালুসাইকে গজার ছোটোবোন বললেই হয়। এই মিষ্টির বয়েস অপেক্ষাকৃত কম, কাজেই বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। দক্ষিণ বিহারের হামাওত নামক স্থানটিকে এর জন্মদাতা বলে ধরা হয়। বালুসাই নামটির উৎস কী, এ ব্যাপারে কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। কেউ কেউ বলেন বাল্লু শাহ নামক বিখ্যাত সুফি সাধক এর জন্মদাতা বা তাঁর নামে নাম। কিন্তু এ কথা যাঁরা বলেন তাঁরাও স্বীকার করেছেন এটা শোনা কথা। কোনও ঠোস সাবুদ নেই।

বালুসাই তৈরি করতে গেলে গজার মতো করেই ময়দা ময়ান দিয়ে মেখে কিছুক্ষণ ফেলে রেখে হাতে লেচি করে ডোনাটের মতো আকার দিয়ে তারপর ঘিয়ে ভাজা, তারপর রসে ফেলা। রসগজার রসের মতোই এক তার, এলাচ, জায়ফল, দারচিনি ফেলা। লেচি করার আগে গজার মতো ময়দাকে কয়েকটা পাট করে নিলে বালুসাই খাস্তা হয়, ভেতরে রস ঢোকে ভালো। ডোনাট আকারটি ইউরোপ থেকে আরব না বলিয়া গ্রহণ করিয়াছে, নাকি ভাইসি ভার্সা, তা অবশ্য জানি না।

গজার আর-একটা নেহাত চিংড়ি বোন আছে, শক্করপারা। গজার নিয়মেই ময়দা মাখতে হয়, শুধু ময়দায় দুধ বা সর বা মালাই থাকে। এরপর ময়দাটাকে গজার মতো তিন–চারটে পাট করে বেলে কুচো নিমকির কায়দায় ছোটো ছোটো করে কেটে কেটে ভাজা, তারপর রসে ফেলা। চিনির রসটা একটু মোটা হয়, যাতে করে ওপরে একটা কোটিং পড়ে ও কিছুদিন থাকে। এটা অবাঙালি মিষ্টি, কিন্তু জন্ম কোথায় ঠিক জানি না। একদিন বন্ধুদের আড্ডায় কথাটা তুলতে গুজরাটি বন্ধুরা বললেন গুজরাট ও মহারাষ্ট্র এই দুই জায়গাতেই এটা জনপ্রিয়। তা হবে। কাচ্ছিরাই তো বাড়িতে বাড়িতে করেন দেখেছি। বাঙালিরাও করেন, খুব কম।

ময়দার মিষ্টির বাদশা হলেন খাজা। খাজার জন্ম বিহার ও উত্তরপ্রদেশের বর্ডারলাইনে। খাদ্যরসিকদের মতে আরবি মিষ্টি বাকলাবা একটুআধটু রূপ পালটে খাজা নাম ধারণ করে ভারতবর্ষে আবির্ভূত হন।

খাজা নামটা কী করে হল এটা নিয়ে দুরকম মত আছে। এক দলের মতে, খাজার আক্ষরিক অর্থ ধরলে হয় রসালো কিন্তু শক্ত, মেওয়াতি না (যেমন রসখাজা কাঁঠাল), সেই অর্থে খাজা। দ্বিতীয় দল বলেন, খাজা নামটি এসেছে বিখ্যাত সুফি সাধক মইন-উদ-দীন চিশতির (১১৪২-১২৩৬) নাম থেকে, যাঁকে খাজা বাবা নামেই লোকে চিনত এবং যাঁর প্রচুর ভক্ত আফগানিস্তান থেকে আগ্রা অবধি ছড়িয়ে ছিলেন। মিষ্টিটির ভক্তরা তাঁকে উৎসর্গ করে খাজা নামটি দেন। কথাটা যুক্তির দিক দিয়ে খাটে। আমাদের প্রিয় মিষ্টি বা চাল বা ফল দেবতাকে উৎসর্গ করে গোপালভোগ, কানাইভোগ এসব নাম তো দেওয়াই হয়। রাজভোগ, বাবরশা মায় দারোগাপসন্দ; উদাহরণের অভাব নেই। সেই হিসাবে বাকলাবার খাজা নাম হওয়াও অসম্ভব কিছু নয়। এ বাবদে বালুসাইকেও বাল্লু শাহের নামাঙ্কিত বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সে আমলে বাল্লু শাহের নাম পাঞ্জাবের বাইরে কম লোকই জানত। বালুসাই নামটি অন্য কোনও অর্থে এসেছে।

ইবন বতুতার লেখা এক ভোজসভার বিবরণী “রসবতী” বইতে আছে, যাতে খিস্তি নামক একরকম মচমচে মিষ্টি পরিবেশিত হয়েছিল। ঘিয়েভাজা ময়দার ওই মিষ্টিটি কি তবে খাজা? নাকি এই গোষ্ঠীর ডেরিভেটিভ?

খাজার সবচেয়ে বড়ো রহস্য হল, কীভাবে বিহারের খাজা হুম্মাত করে লম্ফ মেরে উড়িষ্যায় এল এবং মহাপ্রভুর ছাপ্পান্ন ভোগেই বা তার জায়গা হল কীভাবে? এর উত্তর দিতে আমি অপারগ।

দ্বিতীয় ব্যাপার হল, উড়িষ্যার খাজা ও অন্ধ্রের খাজা এখন বিহারের খাজাকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। কলকাতায় যেসব খাজা পাওয়া যায় সবই ওড়িয়া কারিগরের হাতে তৈরি। আমার মামারা সিদ্ধহস্ত কারিগর, কিন্তু খাজা বানানোর হুনর তাঁদেরও নেই।

উড়িষ্যার খাজা ও বিহারের খাজায় তফাত আছে। বিহারের খাজায় ময়দা মাখার সময় ময়ান দেওয়া হয়, উড়িষ্যায় হয় না। ভাঁজে ভাঁজে ঘি ও সফেদার প্রলেপ দু-জায়গাতেই দেওয়া হয়।

খাজা করার সময় পাটায় ফেলে লম্বা করে বেলে নিতে হয়। তারপর ঘি ও সফেদা একসঙ্গে মেখে নিয়ে একটা প্রলেপ দিয়ে তাকে রোল করে নিয়ে মাপমতো কাটা হয়। এগরোলের মতো দেখতে সে লেচিকে চ্যাপটা করে বেলে ঘিয়ে ফেলা হয়। ভাজা হলে তারপর রসে ফেলা। উড়িষ্যাতে মোটা রস ওপর থেকে দিয়ে একটা কোটিং করে দেওয়া হয়। পুরীধামের খাজা তো অনেকেই খেয়েছেন। পনেরো দিন আরামসে থাকে। রোদ খাওয়ালে স্বচ্ছন্দে মাস তিনেক রাখা যায়। কেবল পাত্রটি এয়ারটাইট হওয়া চাই।

বন্ধু প্রিয়জিৎ হাজরার কলমে উঠে আসা খাজার একখানা গল্প ভাগ করে নিই— “আমাদের গ্রামের স্বনামধন্য কারিগর ছিলেন কার্তিক ময়রা (ময়রাটা তিনি পেয়েছিলেন ভালোবাসার উপাধি, আদতে ব্রাহ্মণসন্তান, ওঝা ছিল আসল পদবি) আর তার তৈরি অশ্বিনের খাজা ছিল এক আশ্চর্য বস্তু! শোনা কথা, তাঁর তৈরি ধবধবে ময়েনমারা খাজা ভেজে খোলা রোদে শুকানোর সময় কাকপক্ষী সে খাজার পাপড়িটুকুও তুলে নিতে পারত না। বেকায়দায় চাপ পড়লেই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ত!”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%