নোনতা পর্ব

সুব্রত রুজ

মিষ্টির দোকানে যেসব নোনতা হয় সেগুলো হল কচুরি, শিঙাড়া ও নিমকি। এ ছাড়া নোনতা হিসাবে চানাচুর, ভুজিয়া, চাট ও তেলেভাজাকেও বোঝায়। এক এক করে লিখি।

কচুরি: কচুরি অনেকদিনের পুরোনো খাদ্য। শংকরের ‘রসবতী’ অনুসারে কচুরি অন্তত চার হাজার বছরের পুরোনো। কচুরির পূর্বপুরুষ হল পুরিকা বা পুরি। কচুরি কথাটি এসেছে দ্রাবিড় ভাষায় কচ্চপুরি বা ছোটো পুরি থেকে।

কচুরির মূল উপাদান হল ময়দা ও ঘি। তার সঙ্গে পুর হিসাবে বিউলির ডালবাটা, মুগের ডালবাটা, ছোলার ডালবাটা, ছাতু, পেঁয়াজ, কড়াইশুঁটি এসব ব্যবহার করা হয়। ডাল বেটে তারপর নুন, আদা, লংকা, হলুদ, জিরে, আমচুর, চাট মশলা এসব দিয়ে তেলে বা ঘিয়ে কষে নিয়ে তারপর ময়দার লেচির ভেতরে পুর করে লুচির মতো ঘিয়ে ভাজা।

কচুরি অনেক রকমের হয়। এক, লুচির মতো। এই কচুরির ময়দাতে ময়ান দেওয়া থাকে না, কারণ ময়ান দিলে ভাজার সময় ফেটে পুর বেরিয়ে যেতে পারে। উপরোক্ত পুর ছাড়াও মাছ কাঁটা বেছে চটকে মশলা দিয়ে কষিয়ে মাছের কচুরিও হয়।

লুচি-কচুরি ডালপুরি নামেও পরিচিত। ছোলা বা মুগের ডাল ঝুরঝুরে করে কষে পুর। ভালো কারিগরের হাতের কচুরি একদিক থেকে ধরে তুললে ডালের গুঁড়ো অন্যদিকে জমে যাবে। শুকনো আলুর দম সহযোগে যাঁরা খেয়েছেন তাঁরাই জানেন কী পাইয়াছেন। ছাতুর কচুরির পুর কেউ ঝুরঝুরে করেন, কেউ মাখো মাখো রাখেন। বিউলির ডালের পুরেরও এই এক ফর্মুলা।

বিউলির ডালের একরকম কচুরি হয়, আকারে একটু ছোটো, পুরটা মাখো মাখো, বেশ একটু হিং সহযোগে পুরটি কষানো। কামড়ালেই নাক হিংয়ের গন্ধে ভুরভুর করে ওঠে। কলকাতার বহু দোকানে এই হিংয়ের কচুরি বিখ্যাত। বিশেষ করে উত্তর কলকাতায় হিংয়ের কচুরি ভালো চলে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তো এই নামে একটা গল্পই লিখে ফেলেছিলেন।

রাধাবল্লভি: এর ইতিহাস খুব আকর্ষণীয়। স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভু নাকি খড়দহে থাকাকালীন শ্যামসুন্দরকে ভোগ দেওয়ার জন্য রাধাবল্লভি উদ্ভাবন করেন। পরে পুঁটিরাম মোদকের পিসেমশাই জিতেন মোদক বৃন্দাবনে তীর্থ করতে গিয়ে রাধাবল্লভি খান। তিনি এর প্রস্তুতপ্রণালী শিখে এসে কলকাতায় চালু করেন। অপরদিকে শোভাবাজার রাজবাড়ি দাবি করেন রাধাবল্লভি তাঁদের উদ্ভাবন। গৃহদেবতা রাধাবল্লভের ভোগ হিসাবে রাধাবল্লভি তৈরি হয়েছিল।

রাধাবল্লভির সঙ্গে লুচি-কচুরির তফাত হল, এতে ঘি ও দই দিয়ে ময়দা মাখা হয়। বিউলির ডালের পুরে হিং ও মৌরিগুঁড়ো থাকে। ডাল ঝুরঝুরে করে কষিয়ে তারপর পুর দিয়ে বেলে ভাজা। রাধাবল্লভির পুরে একটু মিষ্টি থাকে। ঘটি রান্নার সিগনেচার।

খাস্তা কচুরি: নামেই মালুম, খাস্তা কচুরির ময়দায় ঠেসে ময়ান দেওয়া হয়। এই কচুরি লুচির মতো বেলা হয় না। বাটির আকারে লেচি নিয়ে ছাতু বা ডালের পুর ভরে মুখ বন্ধ করে নিয়ে হাতে করে চ্যাপ্টা করে নেওয়া হয়। কেউ কেউ হালকা বেলে নেন। বেশি পাতলা করলে ভাজার সময় পুর বেরিয়ে চলে আসবে। রাজস্থানী প্যাজ কচৌরিও এভাবেই তৈরি। এই কচুরির অপরিহার্য অনুষঙ্গ হল ছোলার মিষ্টি স্বাদের ডাল ও পাকা তেঁতুল ও দই দিয়ে বানানো চাটনি।

কলকাতার অবাঙালি অঞ্চলগুলোয় কচুরির সঙ্গে হালুয়া দেওয়া হত। এই প্রথা এখনও রমরম করে চলছে এবং বাঙালিরাও কচুরি হালুয়া ছাড়েন না।

হাতিবাগান বাজারের গায়ে একটি বিখ্যাত কচুরির দোকান আছে। চল্লিশ বছর ধরে অপবাদ শুনে আসছি ওই দোকানের কচুরি নাকি পাম তেলে ভাজা হয়, কিন্তু ওই কচুরি খেতে হলে ঘণ্টাখানেক সময় হাতে নিয়ে আসাই ভালো। হিংসুটেদের কথায় কান দিতে নেই। যাঁরা খাননি তাঁরা কী হারাইয়াছেন তাঁরা জানেন না, যাঁরা খেয়েছেন তাঁরা জানেন কী পাইয়াছেন।

শিঙাড়া: বৈকালিক আড্ডা মানেই চা-শিঙাড়া। বাঙালির প্রিয় এই শিঙাড়ার ইতিহাস অনেক পুরোনো।

শিঙাড়া আমাদের দেশে আসে তুর্কি ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। দ্বাদশ শতাব্দীতেই একটি খাবারের কথা জানা যায়, যার নাম ছিল সমবুসক। গড়নটি ক্ষীরকান্তি বা হিন্দি গুজিয়ার মতো। ভেতরের পুরটি হত সবজি, পেঁয়াজ বা মাংসের। ইবন বতুতা মহম্মদ বিন তুঘলকের সময় যে শাহি দাওয়াতটি পেয়েছিলেন সেই ভোজসভাটির বিবরণ তিনি সবিস্তারে লিখে গেছেন। সেখানে এই সমবুসক বা সমুসকের বিশদ বিবরণ দেওয়া আছে। তেকোনা শিঙাড়া কবে থেকে তৈরি হয়েছিল তার ঠিকমতো বিবরণ পাওয়া যায়নি।

হিন্দি বা উর্দুতে শিঙাড়ার মানে হল পানিফল। আমরা যাকে শিঙাড়া বলে চিনি তার গড়নটা অনেকটা পানিফলের মতোই। সেখান থেকে শিঙাড়া নামটা আসতে পারে। আবার প্রাচীনকালে শৃঙ্গাটক বলে একটি খাবার ছিল, যার গড়নটা তেকোনা পরোটার মতো। ওখান থেকেও নামটা আসতে পারে। তবে পানিফল থেকে হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি।

শিঙাড়াকে হিন্দিতে বলে সামোসা। বেশির ভাগ খাদ্যসাংস্কৃতিকের মতে সমুসক থেকে সামোসা নামটা এসেছে। আবার রানিগঞ্জের রাজস্থানি দোকানগুলোয় সামোসা বলে যা বিক্রি হয়, সেটা হুবহু পুরোনো সমুসক বা সমবুসক। শুধু পুরটি মিষ্টি, নারকেল কোরা, আলু, খোয়া মিশিয়ে পাক করা। ওঁরা কিন্তু শিঙাড়া বলে যেটা করেন সেটা আলুর শিঙাড়া। আবার ওই একই দোকানে গুজিয়া পাওয়া যায়, যার গড়ন সমুসকের, পুরটি খোয়ার সঙ্গে কুচো বাদাম, কাজু, কিশমিশ মিশিয়ে তৈরি। তারপর রসে ফেলা। বাঙালির ক্ষীরকান্তি। অন্য অবাঙালি দোকানে সামোসা বলে আলুর শিঙাড়াই করে। রাজস্থানী সামোসা যে সমুসক থেকে অনুপ্রাণিত, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই। কিন্তু আর কোথাও সামোসা বিক্রি হয় কি না সেটা জানতে পারিনি। সামোসা শিঙাড়ার এ জট ছাড়ানো বড়ো কঠিন।

বাঙালি শিঙাড়া তৈরি হয় ময়দা, ঘি ও আলুর পুর দিয়ে। শিঙাড়ার ময়দায় ঠেসে ময়ান দেওয়া হয়। মামাদের দোকানে মাঝরাতে ময়দা মেখে সেটা গামলায় রেখে কাপড় চাপা দিয়ে সারারাত রেখে দেওয়া হয়। সকালে লেচি কেটে লুচি বেলে আধা আধা করে ঠোঙার মতো মুড়ে তার ভেতর আদা, জিরে, গরম মশলা দিয়ে কষা আলুর পুর ভরে ঘিয়ে ভাজা।

বাংলায় শিঙাড়া নাকি নদিয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের (১৭১০-১৭৮৩) আমলে তৈরি হয়েছিল। মহারাজ তখন প্রৌঢ়। মানে মোটামুটি ১৭৬০-৬১ সাল নাগাদ। শিঙাড়া তৈরি করেছিলেন মহারাজার খাস পাচক উড়িষ্যার বাসিন্দা গিরিধারী হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহারা।

বাংলায় শিঙাড়া কীভাবে তৈরি হল এ নিয়ে একটা খাসা গল্প আছে। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র নাকি রোজ লুচি তরকারি দিয়ে জলখাবার খেতেন। কিন্তু পাকশালা থেকে ভোজনঘর অবধি আনতে আনতে সে লুচি ঠান্ডা হয়ে যেত বলে পাচকের সঙ্গে রোজই রাগারাগি হত। পাচক গিরিধারীর স্ত্রী শিঙাড়া বানিয়ে এই সমস্যার সমাধান করেন। রাজা খেয়ে এই খাবারের নাম জানতে চাইলে তিনি নাম বলেন সমভুজা। এর জন্য রাজার কাছে তিনি তিনলহরী হার উপহার পেয়েছিলেন। নদিয়ার লোকজন এই গল্পটা জানেন ও বলেন। মূল গল্পের আরও ডালপালা আছে, একটু কমসম করে বললাম। এই কিংবদন্তি ধরলে শিঙাড়ার বয়েস আড়াইশো বছরেরও বেশি।

একটা কথা যাকে বলে পয়েন্ট টু বি নোটেড। ধরিত্রী খাবারের নাম বলেছিলেন সমভুজা। সমবুসক বা সমুসকের আর-একটা নাম সমবুসা বা সমভুজা। সমবুসকের সঙ্গে যে তাঁর পরিচয় ছিল এবং সমবুসকের অনুকরণে যে তিনি এই খাবার তৈরি করেছিলেন, এটা চোখ বুজে বলা যায়। গড়নের জন্য তো হাতের কাছে শালপাতার ঠোঙা ছিলই।

শিঙাড়া এখন ভারতের জাতীয় খাদ্যের মর্যাদা দাবি করতে পারে। আলু ছাড়াও দক্ষিণী শিঙাড়ায় পেঁয়াজের পুর থাকে। আর মাংসের কিমা দিয়ে মাংসের শিঙাড়া ভারতের সর্বত্র পাওয়া যায়। তবে দক্ষিণী শিঙাড়া চ্যাপটা। ওঁরা আমাদের মতো ময়দার ঠোঙা বানান না। ময়দার একটা চারকোনা আয়তকার ফালির ওপর পুরটা দিয়ে তিনপাট করে মুড়ে নেন। অন্ধ্রের পেঁয়াজের পুর দেওয়া শিঙাড়ার নাম আছে। উত্তরপ্রদেশের নানা জায়গায় শিঙাড়া চাট বা সামোসা চাট খেয়েছি। শিঙাড়ার পুরটা মশলা দেওয়া ছাতু বা মুগডালের। আলুর শিঙাড়ারও চাট খেয়েছি। তবে চাটের শিঙাড়া ছাতু বা ডালেরই হয়। আকারও একটু ছোটো, যাকে বলে তারকাকৃতিক্স। আবার আলুর শিঙাড়ার চাটের শিঙাড়াগুলো বিশালাকৃতিক্স।

শিঙাড়ার এত জয়জয়কার, কিন্তু সমবুসক কে তৈরি করেছিলেন সেটা কেউ লিখে রাখেননি। সমবুসকের জন্মদাতা বা দাত্রী অনামা বা অনাম্নীই থেকে গেলেন।

নিমকি: নিমকির জন্ম কোথায় সঠিক জানা যায়নি। তবে একটা গল্প আছে যে, ঢাকা শহরে এর জন্ম। হতেও পারে। ঢাকার পরোটার যেমন নামডাক, ওখানেই কোনও কারিগর হয়তো প্রথম তৈরি করেছিলেন। জিনিসটা তো আর কিছুই না, ছোটো আকারের খাস্তা তেকোনা পরোটা।

নিমকি করতে গেলে ময়দা, ঘি আর কালোজিরে লাগে। নুন তো আছেই। নমক বা নুন দেওয়া খাবার নমকিন, তার থেকে নিমকি। তবে অবাঙালিরা নমকিন বলতে সেউ, চানাচুর, গাঠিয়া, ভুজিয়া, নিমকি, কুচো নিমকি, পাপড়ি সব বোঝেন। বাংলার নিমকিই এরকম তেকোনা পরটা।

নিমকিতে শিঙাড়ার ময়দার মতোই ঠেসে ময়ান দিতে হয়। তারপর কালোজিরে দিয়ে মেখে রাতভর ফেলে রাখা, তারপর সকালে বেলে নিয়ে ভাজা। কেউ কেউ কেজিতে একশো গ্রাম আটা মেশান, ওতে নিমকি মচমচে হয়, বেলতে সুবিধা হয়। আমরা বাড়িতে করার সময় কিন্তু ওই ফর্মুলায় করি। ময়দায় একটু আটা মেশাই। আটার নিমকি করেও দেখেছি। একটু কাঠ কাঠ ধরনের। ময়দার মতো খাস্তা নয়। ভালো লাগল না।

নিমকির ছোটো বোন কুচো নিমকি। নিমকির ময়দা গোল করে বেলে ছোটো ছোটো বরফির কায়দায় কাটা। আমার এক গুজরাটি বন্ধু মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী। ওঁর দোকানে দেখেছি কুচো নিমকি বেলার সময় ময়দাকে তিন-চারটে পাট করে নেয়। ফলে নিমকিগুলো একটু মোটা হয়, আর বাঙালি নিমকির চেয়ে মচমচে। ওঁরা আবার নিমকিতে কালোজিরের সঙ্গে জোয়ানও দেন। এরই মিষ্টিরূপ শক্করপারা।

চানাচুর: বর্ষাকালের অপরিহার্য অনুষঙ্গ মুড়ি-চানাচুর। তামাম ভারতে এর একটাই পরিচয়, “আমি তো এমনি এমনি খাই”।

নামেই মালুম, চানা ডাল বা ছোলার ডাল হল এর বেস। এ খাবার উত্তরপ্রদেশের তৈরি হলেও একটুআধটু এদিক-ওদিক করে সারা ভারতে চলে। চানাডাল বা ছোলার ডাল, মুগডাল, মটরডাল, সেউ, গাঠিয়া, পাপড়ি, বোঁদে, চিনাবাদাম, ছোলা, সবুজ বা হলদে মটর, কাবলি ছোলা, চিঁড়ে, কাজুবাদাম, কিশমিশ, কারিপাতা, কসৌরি মেথি, এসব আলাদা আলাদা করে ভেজে নানারকম মশলা দিয়ে একসঙ্গে মাখা হয়। আলু ও কচুর চিপসও দেয়। রানিগঞ্জে কয়েকটা নামকরা চানাচুরের কোম্পানি আছে। ওঁদেরই একজনের কাছে শুনেছি চানাচুর করতে মোট বাইশটা উপাদান লাগে। মশলায় লাগে নুন, বিটনুন, লংকার গুঁড়ো, আমচুর, ভাজা জিরেগুঁড়ো এরকম বারোটা উপাদান। আর ডাল-টাল মিলে আরও দশটা। সবটা তো কেউ বলবেও না। উপাদানের রকমফেরে ঝাল-মিষ্টি-টক স্বাদ হয়। রানিগঞ্জে একটা খুব ঝাল ঝাল চানাচুর হয়। ওই চানাচুর একশো গ্রামের চেয়ে বড়ো প্যাকেটে বিক্রি হয় না। ছোটোবেলায় একবার দোকানদারকে কারণ জিজ্ঞাসা করায় উনি হেসে বললেন ওটা আবগারি চানাচুর। বড়ো হয়ে মানে বুঝেছি।

ভুজিয়া: রাজস্থান ও গুজরাট হল ভুজিয়া সাম্রাজ্যের রাজধানী। সেউ, গাঠিয়া, পাপড়ি এরাই হল ভুজিয়া। ভেজে বানানো, তাই ভুজিয়া।

ভুজিয়ার মূল উপকরণ হল বেসন, নুন, বেকিং পাউডার ও সাদা তেল। গাঠিয়া ও পাপড়ি সাদা। ওতে আর কিছু থাকে না। সেউতে বিটনুন, গোলমরিচ, লংকাগুঁড়ো, গোটা বা গুঁড়ো এলাচ, লবঙ্গ এসব মেশানো হয়। মিহি বেসন ভালো করে ফেটিয়ে নুন সোডা দিয়ে ঝাঁঝরিতে ফেলে সাদা তেলে ভাজা। বেসনের মণ্ড থকথকের চেয়ে শক্ত হবে। নরম হলে হবে না। গাঠিয়া ও পাপড়ি ঝাল হয় না, সেউ ঝাল। সেউয়ের জন্ম রাজস্থানের বিকানিরে। গাঠিয়া ও পাপড়ি গুজরাট বা রাজস্থানের। এগুলো এখন সারা ভারতে চলছে। বাংলার সেউ আবার সাদা। কোনও মশলা থাকে না।

ডালমুট: মুগডাল বা ছোলাডাল বা সবুজ মটর সাদা তেলে ভেজে নানারকম মশলা মাখানো। অনেকসময় এই তিনরকম ডাল একসঙ্গেই মাখা থাকে।

বুলবুল ভাজা: “হরিদাসের বুলবুল ভাজা, টাটকা তাজা খেতে মজা” এই গানটি একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল। বুলবুল ভাজা ও সমগোত্রীয় সাড়ে বত্রিশ ভাজা এককালে খুব চলত। তবে আমাদের ছেলেবেলাতেই এ খাবার লুপ্ত হয়ে গেছে। এদের চানাচুরের ডেরিভেটিভ বলা যেতে পারে। সাড়ে বত্রিশ ভাজার বিবরণ প্রবীণ-প্রবীণাদের স্মৃতিতে অবশ্য ধরা আছে। বত্রিশ রকম উপাদান লম্বা কোন বা শঙ্কু আকারের ঠোঙায় একসঙ্গে মিশিয়ে ঠোঙার গায়ে তিন-চারটে টোকা দিয়ে সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে ওপরে আধখানা আলুর চপ। সাড়ে বত্রিশের আধা বা সাড়ে।

পাপড়: উত্তর ভারতে পাপড় ও দক্ষিণে পাপ্পডম নামে পরিচিত। খাদ্যবিশারদরা এর জন্মস্থান রাজস্থান বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। সংস্কৃত পর্পট থেকে পাঁপড় নামটি এসেছে। বিউলি ডাল শক্ত করে বেটে তারপর তাকে পাতলা রুটির মতো বেলে নিলেই পাপড় তৈরি। এতে লংকা গোলমরিচ বিটনুন ও আরও কিছু মশলা যোগ করলে হয় মশলা পাঁপড়। রাজস্থান ও পাঞ্জাবের মশলা পাপড় নামকরা।

বিউলি ডাল ছাড়াও মুগডাল, ছোলাডাল, মসুরডাল, চালেরও পাপড় হয়। এগুলো সাধারণভাবে মশলাদার হয়। এ ছাড়াও আলু সেদ্ধ করে পাতলা করে কেটে হয় আলু পাপড়। সাবু সেদ্ধ করে মশলা দিয়ে বা না দিয়ে হয় সাবুর পাপড়। এ পাপড়কে ছাঁচে ফেলে নানা আকার দেওয়া হয়। অন্ধ্রপ্রদেশে নানারকম মাছ, কাঁচা আম, কাঁচকলা এসবেরও পাপড় হয়। খেয়েছি, এখন সব শপিং মলে এসব পাপড় পাওয়া যায়। তবে কীভাবে বানায় তা জানা নেই। আগে হাতে বেলা হত, এখন মেশিন বেরিয়ে গেছে।

পাপড় তেলে ভেজেও খাওয়া যায়, সেঁকেও খাওয়া যায়। পশ্চিমে সেঁকাটাই বেশি চলে।

‘কেষ্ট রে, পাপড় নিয়ে আয়।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%