অন্তিম পর্ব

সুব্রত রুজ

নিজে মিষ্টির ব্যবসা না করলেও অনেক বছর ধরে মিষ্টির ব্যবসা চোখের সামনে হতে দেখছি। কাজেই এই ব্যবসা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা আছে। আজ এটা দিয়েই শেষ করব।

মিষ্টির ব্যবসা আসলে কুটিরশিল্প বা ক্ষুদ্র উদ্যোগ বলতে পারা যায়। নামকরা কয়েকজন বড়ো ব্যবসায়ী আছেন, কিন্তু তাঁদের সংখ্যা শতকরা হিসাবে খুবই কম।

মিষ্টি ব্যবসা বা শিল্প যাই বলি না কেন, এই শিল্প অনেকটা মধ্যযুগের গিল্ডের কায়দায় চলে। নিজস্ব মালিকানায় নিজের বাড়িতে বা নিজের দোকানে এই শিল্পের শুরু হয় এবং মিষ্টি বানানোটা পুরো শ্রমভিত্তিক। মেশিন নেই বললেই চলে। ছোটোখাটো দোকানে মালিক নিজেই কারিগর। বহু ক্ষেত্রেই বাড়ির মেয়েরা সহকারীর কাজটা করে দেয় এবং অনেকেই আস্তে আস্তে নিজেরাই কারিগর হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসাবে নিখুঁতি বা ধরিত্রী বেহেরার নাম করা যায়। নিখুঁতি কিশোরী বয়েসেই নতুন মিষ্টি আবিষ্কার করে ফেলেছিল। আমার মামাদের দোকান অনেককাল এভাবেই চলেছে, ফলে বাড়ির মেয়েরা সবাই ভালো কাজ জানেন।

মিষ্টি করতে গেলে কারিগরের সঙ্গে একজন বা দুজন সহকারী লাগে। এরা সচরাচর কিশোর বয়েসে দোকানে ঢোকে এবং বাসন মাজা দিয়ে জীবন শুরু করে। ক্রমশ ছানা জাঁক দেওয়া, ছানা মাখা এসব কাজে প্রমোশন হয় এবং একদিন তাড়ু ধরতে শেখে। একদম গিল্ড সিস্টেম। গিল্ডের মতোই প্রতি কারিগরের কিছু গোপন কারিগরি থাকে, যা কিছুতেই যাতে বাইরে না যায় তার প্রাণপণ চেষ্টা করা হয়।

আঞ্চলিক ভিত্তিতে বিভিন্ন মিষ্টি নামকরা হয়ে ওঠে। এখানে কাঁচামালের সহজলভ্যতা ও মান যেমন একটা দিক, পুরুষানুক্রমে শিক্ষিত কারিগর আর-একটা দিক।

মিষ্টির ব্যবসা আজ কিন্তু ভালো অবস্থায় নেই। নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তার সম্ভাব্য কারণগুলো বোঝাবার চেষ্টা করি।

পুঁজি: মিষ্টির ব্যবসা করতে গেলে খুব অল্প পুঁজি নিয়ে কাজ করা যায়। নিজেরা কাজ করলে একটা বড়ো উনুন, কয়েকটা বাসন ও একখানা শো-কেস হলেই মিষ্টির দোকান শুরু করা যায়। কাঁচামাল বলতে দুধ ও ছানা ছাড়া আর সবই চেনা মুদির দোকান থেকে ধারে নিতে পারবেন। দোকান কিনতে বা ভাড়া নিতে গিয়ে যদি মোটা সেলামি না গুনতে হয়, তবে দোকান ছাড়া ষাট-সত্তর হাজার টাকা মূলধন নিয়ে একটা মিষ্টির দোকান দেওয়া যায়। হাতে কিছু মূলধন রেখে বড়োজোর লাখখানেক। অবশ্য খুবই ছোটো দোকান হবে। তবুও চালানো যাবে।

এখানে একটা সমস্যা আছে। মিষ্টি শিল্প সরকারের ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের আওতায় এখনও আসেনি। ফলে এই ব্যবসার জন্য ব্যাংক ঋণ নিলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প যে সুবিধেগুলো পায় সেগুলো পাওয়া যায় না। ফলে যাঁরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে চান বা ব্যবসা বাড়াতে চান, তাঁদের নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়।

শ্রম: মিষ্টির দোকান পুরোপুরি শ্রমনির্ভর। যন্ত্রের ব্যবহার খুব কম। ফলে দক্ষতার ওপরে এই ব্যবসা দাঁড়িয়ে আছে। একটা সময় মিষ্টির কারিগররা পুরুষানুক্রমে দোকানে ঢুকতেন। আজকের প্রজন্ম মিষ্টির কাজ করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অনেকেই অন্য কাজে ঢুকে পড়ছে। এখনকার মালিকরা বেশির ভাগ নিজেরা কাজ শেখেননি, কারিগর দিয়ে দোকান চালান। ওদিকে ভালো কারিগর ও জোগাড়ে, দুইয়েরই অভাব। ফলে কর্মীসংকট দেখা দিয়েছে। একজন ভালো কারিগরকে দৈনিক তিনশো থেকে পাঁচশো টাকা বেতন, জামাকাপড় ও খাইখরচা দিতে হয়। ফলে দোকান চালানোর খরচ বাড়ছে। তারপর অন্য খরচ আছে।

খরচ: কারিগর ও জোগাড়ের বেতন, খাইখরচা বেড়ে গেছে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে জ্বালানির খরচ। আগে ছিল কয়লা। তারপর এল ডিজেল, এখন গ্যাস। ফলে জ্বালানিখরচ ভালোই বেড়েছে। একটা মাঝারি দোকানে রোজ একটা করে কমার্শিয়াল সিলিন্ডার লাগে। গ্যাসের দাম রোজই বাড়ছে। ফলে জ্বালানি বাবদ খরচও বেড়ে যাচ্ছে। কাঁচামালের দামও ঊর্ধ্বমুখী। কলকাতায় এখন একটু ভালো মানের মিষ্টি করতে গেলে কমপক্ষে আট-ন টাকা দাম নিতে হচ্ছে। ফলে ক্রেতারা সংকটে পড়ছেন, ব্যবসায়ীরাও।

কাঁচামাল: ছানা, চিনি, গুড়, বেসন, ময়দা, ঘি এসবের দাম বাড়ছে, একই সঙ্গে মান পড়ছে। আগে এক কুইন্টাল দুধ থেকে হাসতে হাসতে আঠাশ-তিরিশ কেজি ছানা কাটানো যেত। এখন চব্বিশ কেজি কাটাতেই ত্রাহি মধুসূদন। তার ওপর দুধে পাউডার দুধ ও এরারুটের উপদ্রব আছে। খুব বড়ো ব্যবসায়ী, যাঁদের নিজস্ব ডেয়ারি বা খাটাল আছে, তাঁরাই কেঁদে কূল পাচ্ছেন না, ছোটোখাটো দোকান, যাঁরা পুরোপুরি কেনা ছানার ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের কথা তো কহতব্য না। দুধ ছানা যাঁরা সরবরাহ করেন, তাঁদের অবস্থাও ভালো না। তাঁরা দুষছেন পশুখাদ্য ও দূষণকে। কেউ ভালো নেই। মোয়া প্রসঙ্গে গুড়ের মান পড়ে যাওয়ার কথা তো লিখেইছি। ঘিয়ের মানও অনেক পড়ে গেছে। আগে শোনপাপড়ি মুখে দিলে চন্দননগরের ঘিয়ের গন্ধে নাক ভুরভুর করে উঠত। সে ঘিয়ের গন্ধই আর নেই। একদিন রাখলে ডালডার গন্ধ বেরিয়ে আসছে।

হিসাবপত্র: বাঙালি হিসাবপত্রের বেলায় চিরকালই ঢিলাঢালা। মিষ্টির ব্যবসা উৎপাদনভিত্তিক ব্যবসা। এখানে কাঁচামাল নিয়ে কারবার। কস্টিং ও অ্যাকাউন্টস ঠিকমতো না রাখলে সমস্যা হবেই। মিষ্টির দোকান যেহেতু কাঁচামাল নিয়ে চলে এবং এখানে উৎপাদন হয়, তাই এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা কাঁচামাল নষ্ট হয়। কাঁচামাল নষ্ট হয়, অবিক্রীত মিষ্টি নষ্ট হয়, আগে জ্বালানিরও অপচয় হত। গ্যাস আসার পর এটা বন্ধ হয়েছে।

মিষ্টির দোকানের হিসাব বলতে কতটা কাঁচামাল থেকে কতটা মাল তৈরি হল, কতটা অপচয় হল এই অপচয়ের সঠিক হিসাব রাখা, বিভিন্ন খাতে কতটা কী খরচ হল, কত আয় হল, দিনের শেষে হাতে কী থাকল, রোজের দুধওলা, ছানাওলা, ভাঁড়ওলা, কয়লাওলার পেমেন্ট; সপ্তাহের শেষে মহাজন, অর্থাৎ যে মুদিখানা থেকে ধারে মাল তোলা হয়েছে তাকে পেমেন্ট কী দিতে হবে, সংসারখরচ বাবদ কত টাকা রাখতে হবে, কত সঞ্চয় করতে হবে, এসব হিসাব রাখতেই হবে। কর্মচারীদের বেতন, খাইখরচ, ইলেকট্রিক, এগুলো মাসকাবারি খরচ। এগুলো মাথায় না থাকলেই আয়ে টান পড়বে। আমার মামাদের দোকানেই দেখেছি আগে এসব হিসাব রাখার ব্যাপার খুব ঢিলাঢালা ছিল। এ নিয়ে অনেকবার বুঝিয়েছি, এমনকী রাগারাগিও করেছি।

দ্বিতীয়ত, মিষ্টি করতে গিয়ে যেসব বাই-প্রোডাক্ট তৈরি হয়, যেমন ছানার জল, রসের গাদ, সন্দেশের ভাঙা টুকরো, ভাঙা জিলিপি, এগুলো কোনোটাই ফেলা যায় না। সব বিক্রি হয়। ছানার জল জমিয়ে তার থেকে একরকম তরল ঘি তৈরি হয়। আগে ওড়িয়ারা দোকান থেকে ছানার জল কিনে নিয়ে গিয়ে এ কাজ করতেন বলে এই ঘিকে চলতি কথায় “উড়িয়া ঘি” বলা হয়। রসের গাদ থেকে কাপড় কাচার বাটি সাবান তৈরি হয়। নারকেল ছাপার বালতি বালতি নারকেল দুধ একদল লোক নিয়ে যান, ওটা থেকে উৎকৃষ্ট নারকেল তেল হয়। বাড়িতে অনেকবার করেছি। ভাঙা জিলিপি, শিঙাড়া কিছুটা খাওয়া হয়, বাকিটা কম দামে বিক্রি হয়। এসব টাকা সাধারণভাবে জমিয়ে রাখা হয় এবং পুজোর মাসে দোকানের কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।

এখানে একটা ক্যাচ আছে। কর্মচারীরা যদি অসৎ হন, তাহলে মালিকের অজান্তে এসব জিনিসের একটা অংশ লুকিয়ে বিক্রি করে সেই টাকা আত্মসাৎ করবেন। মালিক ঢিলাঢালা হলে কিন্তু এ ধরনের চুরি চলতেই থাকবে এবং এর পরিমাণ খুব কম নয়। গাদ, ছানার জল এসব বিক্রির টাকার পরিমাণ বেতন ও জ্বালানি ছাড়া দোকান চালানোর যে দৈনিক খরচ, তার একটা বড়ো অংশ। তাও বেশির ভাগ মালিক এই টাকাগুলো কর্মচারীদেরই দিয়ে দেন। একটা মাঝারি দোকানে সারাবছর যে ঘিয়ের টিন ও বস্তা বিক্রির টাকা জমা পড়ে, শুনলে চোখ কপালে উঠবে।

এত টাকার কারবার, কিন্তু হিসাবের বেলা প্রায় সবটাই মুখে মুখে। এক-দেড়শো টাকার মালপত্র ইধার-উধার হয়ে গেলে ধরবার প্রায় কোনও উপায় নেই। এবার হিসাব করুন রোজ একশো, মাসে তিন হাজার, বছরে ছত্রিশ হাজার হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে।

এখান থেকেই পরিষ্কার, সঠিক হিসাব রাখার কাজটা কতটা জরুরি। এই গাফিলতির জন্য আমার জানা এমন কয়েকটা দোকান লাটে উঠেছে, যাদের ঝাঁপ চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা থাকত।

তবে সুখের কথা, বর্তমানে এই অবস্থা পালটেছে। মালিকরা দেখেই শিখুন বা ঠেকেই শিখুন, এখনকার প্রজন্ম হিসাব রাখার কাজটা খুব গুরুত্বসহকারে করে। এই টেক-স্যাভি প্রজন্ম রীতিমতো কম্পিউটারে ট্যালি, এনজিএন জাতীয় সফটওয়ার ব্যবহার করে হিসাবপত্র রাখে। যারা নিজেরা পারে না, লোক দিয়ে করায়। আগেকার সেই হাতুড়ে খাতালেখকের দলও আর নেই। বদলে ঝকঝকে সব অ্যাকাউন্ট্যান্ট। এদের ভালোই ফি বা বেতন দিতে হয়, কিন্তু এ প্রজন্ম সে খরচ করে। এটা যে বাজে খরচ নয়, এটা এখনকার প্রজন্ম বুঝেছে।

শিক্ষা: শুনতে যতই খারাপ লাগুক, আগেকার প্রজন্মের বেশির ভাগ মিষ্টি ব্যবসায়ী ছিলেন অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত। ফলে কোনও পরিবর্তন করতে এঁদের বেজায় অনীহা ছিল। বাপদাদা যেভাবে চালিয়েছেন, সেভাবেই চালাবেন। পৃথিবী যে পালটাচ্ছে, ক্রেতাদের রুচি পালটাচ্ছে, ব্যবসায় বিজ্ঞাপনের গুরুত্ব বাড়ছে, এসব ব্যাপার নিয়ে আগের প্রজন্ম চিন্তাভাবনাই করেননি। তার দাম চোকাতে হয়েছে। কেস স্টাডি হিসাবে মামাদের দোকানটাই ধরা যেতে পারে। আমার মামারা যতদিন পেরেছেন, নিজেরাই কারিগরের কাজ করতেন এবং সব ব্যাপারটাই থাম্বরুলে ভর করে চলত। ল্যাকটোমিটার, পি এইচ মিটার, বুরেট, পিপেট এসব রাসায়নিক যন্ত্রপাতি তো দূর অস্ত, মিক্সিই কতদিন পরে ঢুকেছে।

এর আনুষঙ্গিক দোষ ছিল অস্বাস্থ্যকর কারখানা। আজ থেকে পনেরো–ষোলো বছর আগেও মিষ্টির দোকানের কারখানাগুলোর যা চেহারা দেখেছি, গণ-ডায়রিয়া হত না কেন সেটাই আশ্চর্য। কারিগরদের অবস্থাও তথৈবচ। উনুনের গরমে ঘেমে স্নান করে তাঁরা কাজ করছেন। কারখানার মেঝে রস ও ছানার জলে চিটচিটে, মাছি উড়ছে। কারিগরদের খালি গা, বড়োজোর একটা গামছা জড়ানো। ব্যাকটিরিয়া জন্মানোর আদর্শ পরিবেশ। ওতেই চলছে।

আজকে কিন্তু জমানা পালটেছে। এখন শিক্ষার প্রভাবে, কিছুটা গ্রিন বেঞ্চের হুড়োয়, কিছুটা ক্রেতাদের হাইজিন সচেতনতার জন্য এখনকার কারখানাগুলো কিন্তু এরকম নয়। বিশেষত বড়ো দোকান ভুজিয়াওয়ালাদের সঙ্গে পাল্লা টানার জন্য যা সব কারখানা বানাচ্ছেন, মডুলার কিচেনকে এক গোল দিয়ে দেবে। তার ওপর নানা আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে। বড়ো দোকানের কথা ধরছিই না, অত পুঁজি লাগাবার ক্ষমতা কজনের আছে? কিন্তু এখন মাঝারি দোকানগুলোতেও মেশিন ঢুকছে। লোকাভাব এর একটা কারণ, কিন্তু ফল ভালোই হচ্ছে। অন্তত কারখানাগুলো আর আগের মতো নোংরা হয় না। কারিগররা কম করে গায়ে একটা আ্যাপ্রন, মাথায় প্লাস্টিক ক্যাপ পরার সচেতনতাটুকু অর্জন করেছেন। নইলে এখনকার হাইজিন সচেতন প্রজন্ম দোকানে ঘেঁষবে কেন? একশো এক বহুজাতিক সংস্থায় হাত না ঠেকিয়ে মেশিনে বানানো টিনে সংরক্ষিত মিষ্টি আসছে। খেতে যেমনই হোক, ‘সেহদ কে লিয়ে হানিকারক’ তো নয়।

এসব ডামাডোলের মাঝেও কয়েকটা ব্যাপার আশা জোগাচ্ছে। এক তো এখনকার মিষ্টি ব্যবসায়ীরা হিসাবপত্র ও কারখানার পরিবেশের ব্যাপারে ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, আজকাল বহু শিক্ষিত ছেলেমেয়ে মিষ্টির ব্যবসায়ে আসছেন। আগে শিক্ষিত ছেলেমেয়ে মিষ্টির ব্যবসায় এলে তাকে অনেক ব্যাঁকাট্যারা কথা শুনতে হত। আজকাল হাওয়া বদলেছে। এ ব্যাপারে শেফ সঞ্জীব কাপুর ও বাঙালিদের মধ্যে সুদীপ মল্লিকের নাম অবশ্যই উল্লেখ করা উচিত। সঞ্জীব কাপুর মিষ্টিও বানিয়ে থাকেন। ওঁর অনেক ভিডিয়ো ইউটিউবে পাওয়া যায়। উনি একজন সেলেব্রিটি এবং ওঁর স্টারডম ফিল্মস্টারদের চেয়ে কম নয়। নতুন প্রজন্মকে উনি ভালোভাবে আকৃষ্ট করতে পেরেছেন। সবচেয়ে বড়ো কথা, বাবা-মারাও বুঝছেন মিষ্টির দোকান করে বা মিষ্টির কারিগর হয়েও নাম ও টাকা দুই-ই উপার্জন করা যায়। সুদীপ মল্লিক নিজেও শেফ এবং টিভিতে বহুবার নানারকম নতুন মিষ্টি বানিয়ে দেখিয়েছেন। নতুন নতুন মিষ্টি তৈরি করা, মিষ্টি শিল্পে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন ভিয়েন, এসব ব্যাপারে তিনি মিষ্টি শিল্পকে নতুন দিশা দেখিয়েছেন। ওঁরও স্টার ভ্যালু বেশ ভালোই।

ইন্টারনেটের বহুল ব্যবহার মিষ্টি শিল্পকে নতুন নতুন রাস্তা দেখাচ্ছে। ইন্টারনেটে অনেক ভিডিয়ো পাওয়া যায়, যাতে করে ঝকঝকে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা মিষ্টি তৈরির প্রক্রিয়া দেখাচ্ছেন। সেদিন এমনই একটা ভিডিয়ো দেখছিলাম। একজন ঝকঝকে তরুণ পুরোদস্তুর শেফের পোশাকে সেজে হাতে গ্লাভস পরে বালুসাই বানিয়ে দেখালেন। কিচেনটি ঝকঝক করছে। নানারকম আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করলেন। এগুলো করতে যে খুব বেশি খরচ হবে সেটাও নয়। আসল কথা হল এভাবে ভাবা। কাঠের পাটার বদলে স্টেনলেস স্টিলের পরাত, টেফলনের প্যান, ডিজিটাল থার্মোমিটার, আধুনিক ডিপ ফ্রিজ, এগুলো করতে খুব হাতি ঘোড়া খরচ হয় না। আগের প্রজন্ম এটুকুও করতে নারাজ ছিলেন। এখন হাওয়া আস্তে আস্তে ঘুরছে। অনেক দোকানেই এখন আধুনিক ফ্রিজ ও এসি শোকেস বসেছে।

শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে মার্কেটিং নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছে। অনেক দোকান সোশ্যাল মিডিয়া বা ওয়েবসাইটের সাহায্য নিচ্ছেন। আজকাল অবাঙালিরাও ছানার মিষ্টি ধরেছেন। ফলে বাংলা ওড়িশা বাদ দিয়ে বাকি ভারতের, বিশেষত পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের বিশাল বাজারের খোলা ময়দান পড়ে আছে।

বাংলার মিষ্টি যাতে প্যাক করে করে দূরে পাঠানো যায় সে নিয়ে গবেষণা চলছে। আজ না হোক দু-দিন পরে সাফল্য আসবেই বলে আমার বিশ্বাস। টিনের রসগোল্লা তো আজকের না। সিতুমিয়ার লেখায় টিনের রসগোল্লার উল্লেখ আছে যা কিনা কলকাতা থেকে লন্ডন যাচ্ছিল। মোয়া তো বেশ কিছুদিন হল কলকাতা মুম্বই বাঙ্গালোর করে বেড়াচ্ছে। বাকিগুলোও হবে।

ক্রেতাদের চাহিদা বদলাচ্ছে, মিষ্টিওলারাও নতুন নতুন মিষ্টি বানিয়ে সে চাহিদা পূরণ করছেন। ছানার সঙ্গে চকোলেট মিশিয়ে চকোলেট মিষ্টি, দইয়ে ফলের ফ্লেভার, রসগোল্লার রকমারি ফ্লেভার, এসব এখন মফস্সলের দোকানগুলোতেও পাওয়া যাচ্ছে। বাঁকুড়ার একজন নামকরা মিষ্টি ব্যবসায়ীর কথায়, ‘এখন দাদা ভ্যারাইটির যুগ। যার দোকানে যত ভ্যারাইটি তার তত খদ্দের। আমাদেরও সেইভাবে করতে হচ্ছে।’

ফলে শুধু বৈচিত্র্যই যে বেড়েছে তা নয়। মিষ্টির মানও বেড়েছে। আগে কলকাতার বাইরে হুগলি আর নবদ্বীপের সন্দেশ বলার মতো ছিল। আসানসোল-দু্র্গাপুর শিল্পাঞ্চলে কড়াপাক তো হতই না, নরম পাকের সন্দেশেরও মান ভালো ছিল না। এখন কিন্তু রীতিমতো ভালো মানের সন্দেশ পাওয়া যায়। এমনকী মিহিদানা সীতাভোগ সরভাজা এদের যা মান, বুক চিতিয়ে বর্ধমান কৃষ্ণনগরকে চ্যালেঞ্জ ঠুকতে পারে।

ডায়াবেটিক রোগীরাও আজকাল বুক ঠুকে মিষ্টি খেতে পারেন। ডায়াবেটিক সন্দেশ ও রসগোল্লা এখন দোকানে দোকানে বিক্রি হচ্ছে। অনেক আগে স্যাকারিন রসগোল্লা বেরিয়েছিল, কিন্তু স্বাদে একটু তিতকুটে হওয়ার জন্য বাজারে চলেনি। এখনকার চিনির বিকল্পগুলোয় সে অসুবিধে নেই। ফলে ডায়াবেটিক সন্দেশ রসগোল্লা বেশ রমরম করে চলছে। এমনকী মফস্সলেও।

সব দেখেশুনে আশাই জাগছে। মিষ্টির ব্যবসায় অনেক বদল এসেছে, আরও আসবে। ক্যালোরিসচেতন প্রজন্মকে মিষ্টির দিকে আকৃষ্ট করা গেছে, এটা বড়ো কম কথা নয়। তবে মিষ্টি ব্যবসায়ীদের ভাবতে হবে, নতুন বৈচিত্র্য আনতে হবে, এবং গত থেকে বেরোতে হবে। ডারউইন সাহেবের নিয়ম মেনেই যিনি পারবেন, তিনি থাকবেন।

মিষ্টি খাওয়া চলুক। আমাদের দিন মিষ্টি হয়ে উঠুক। অথঃ মিষ্টান্ন মিতরে জনগণেশায় নমঃ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%