মোয়া পর্ব

সুব্রত রুজ

map

মোয়া: মোয়া ছাড়া শীতকাল ভাবাই যায় না। আর মোয়া বললেই একটাই নাম মনে আসে, জয়নগরের মোয়া।

মোয়ার উপাদান হল খই, মুড়ি বা ভাজা চিঁড়ে। এক তারের গুড় বা চিনির রসে এগুলো ফেলে এলাচ, ঘি, দারচিনি দিয়ে নামিয়ে হালকা গরম থাকতে থাকতেই লাড়ু বেঁধে ফেললেই মোয়া তৈরি। পূর্ববঙ্গের বহু মহিলা, বিশেষ করে প্রবীণারা মোয়া তৈরিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। আমাদের গ্রামেও সূত্রধর সম্প্রদায়ের মহিলারা মুড়ি, খই, চিঁড়ে ও তাদের মোয়া বানিয়ে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করতেন। অনেক বাড়ি তাঁদের বাঁধা ছিল।

মোয়া বানানো দেখেছি, করেওছি। এমনিতে সোজা মনে হয় কিন্তু ‘তুলা শুনিতে নরম, ধুনিতে লবেজান।’ এ কাজের জন্য অভিজ্ঞতা চাই, নইলে খই বা মুড়ি একদম মেওয়াতি হয়ে যাবে। গরম গুড় বা চিনির রসে খই ছাড়লে মুড়কি নেতিয়ে যাবে, আর মোয়া বাঁধলে শুকোবার পর ভেঙে যাবে, নয়তো চিটচিটে হয়ে যাবে। মুড়কি বানানোর সময় যেমন খই ও রসের পরিমাণ খেয়াল রাখতে হয়, মোয়াও তাই।

মোয়া অনেক জায়গাতে তৈরি হলেও জয়নগরের মোয়া মোয়ার বাদশা। কলকাতার বিভিন্ন দোকানে যেসব মোয়া বিক্রি হয়, বেশির ভাগটাই জয়নগর থেকে আসে। জয়নগর, বহড়ু, বারুইপুর, ক্যানিং, গোসাবার বহু মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। জয়নগরের মোয়ার মতো রঙিন হাঁড়িটিও তাঁদের মার্কামারা। জয়নগরের মোয়া কিন্তু প্রথম তৈরি হয়েছিল বহড়ুতে। এই মোয়ার জন্মদাতা হিসাবে যামিনী বলে একজনের নাম পাওয়া যায়। ১৯২৯ সালে জয়নগরের পূর্ণ ঘোষ এই মোয়া তৈরি করে কলকাতায় চালান দিতে থাকেন এবং এই মোয়া জয়নগরের মোয়া হিসাবে নামকরা হয়ে ওঠে।

জয়নগরের মোয়ার প্রধান উপকরণ কনকচূড় ধানের খই, নলেন গুড় ও ভালো গাওয়া ঘি। এরপর এলাচ, খোয়া ও কিশমিশ, বাদাম, পেস্তা এইসব। মোয়া তৈরির পরে গুঁড়ো খোয়ায় গড়িয়ে নেওয়া হয় কিংবা ওপর থেকে গুঁড়ো ক্ষীর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর কিশমিশ, বাদাম, পেস্তা দিয়ে সাজানো। মামাদের দোকানে যে মোয়া আসে তাতে ক্ষীর থাকে না, সাদা। কিন্তু খেতে অনুপম। বহু বছর ধরে একজন এই মোয়া দিয়ে যান। ওঁর কাছে শুনলাম ইদানীং নলেন গুড়ের মান পড়ে গেছে। ফলে মোয়ার স্বাদও আর আগের মতো নেই। আর সে ঘি তো নেই-ই। ওঁরা চন্দননগরের ঘি দিয়ে একটু সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বিসমিল্লাতেই তো গলদ। উপাদানের মানের এ সমস্যা সব মিষ্টির।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%