ময়দা পর্ব - ৩

সুব্রত রুজ

map

ময়দা ও ক্ষীর

ময়দা ও ক্ষীর সহযোগে তৈরি মিষ্টি বললে প্রথম যে নাম আসবে, সেটি লবঙ্গলতিকা।

লবঙ্গলতিকা অনেককালের পুরোনো মিষ্টি কর্পূরনালিকা। আদিতে কর্পূর ব্যবহার করা হত কি না বা কর্পূর অন্য কোনও অর্থে বলা হয়েছে কি না এ প্রশ্নের যথাযথ উত্তর পাইনি। তবে নলাকৃতি ছিল সেটা জানা গেছে।

লবঙ্গলতিকা করতে গেলে ময়দা ময়ান দিয়ে মেখে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। অনেকেই ময়দা মাখার সময় একটু সোডা বাই কার্ব যোগ করে দেন। তারপর চার আঙুল ব্যাসের লুচি বেলে নিয়ে তাতে চিনি দিয়ে পাক করা খোয়া দিতে হবে। এবার পাটিসাপটার কায়দায় মুড়ে নিয়ে খোলা মুখ দুটো সামান্য জল বুলিয়ে মুড়ে বন্ধ করে দিতে হবে। এবার রোল করে একটি গোটা লবঙ্গ গায়ে গেঁথে দিলেই লবঙ্গলতিকা তৈরি। এবার ঘিয়ে ফেলে ভাজা। তারপর রসে ফেলা। রসের ঘনত্ব কমবেশি এক তার। বিভিন্ন জায়গায় পড়েছি মুঘলরা এমনিতে খুব একটা মিষ্টি ভালোবাসতেন না। উৎসব পরব ছাড়া শেষপাতের ডেসার্টটা ফল দিয়ে চালাতেন। কিন্তু যে ক-টি মিষ্টি মোগলাই রন্ধনে স্থান করে নিতে পেরেছিল, লবঙ্গলতিকা তার অন্যতম। নামটিও আকবরের আমলে মুঘলদেরই দেওয়া। নামদাতা সম্ভবত আকবর নিজে। আবুল ফজল-এর কলম অনুযায়ী ভদ্রলোক যৌবনে খেতে-টেতে ভালোবাসতেন। পরের দিকে একরকম নিরামিষাশী হয়ে গিয়েছিলেন, কাজেই একটু মিষ্টাসক্ত ছিলেন। তানসেনও হতে পারেন। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত একটা বইয়ে পড়েছিলাম উনি ‘রিচ’ খাবার একদম পছন্দ করতেন না। শাহি দাওয়াতের দু-চার দিন বাদ দিয়ে বছরভর সাদামাটা খাবার খেতেন এবং মিষ্টি খেতে ভালোবাসতেন।

এবার ক্ষীরকান্তি। এও পুরোনো মিষ্টি। হিন্দিতে বলে গুজিয়া। লবঙ্গলতিকার মতো ময়দা মেখে লুচি বেলে ভেতরে ক্ষীরের পুর দিয়ে অর্ধচন্দ্রের কায়দায় বা বা পূর্ণচন্দ্রের কায়দায় লুচির ওপর লুচি চাপিয়ে মুখটাকে মুড়ে ভাজা, তারপর রসে ফেলা। গুজিয়া কিন্তু ভাজাই খায়, বিশেষ করে পশ্চিমে। তৈরির সময় গুঁজে গুঁজে মুখ বন্ধ করা, তাই গুঁজিয়া। বাঙালি দোকানের গুঁজিয়া আবার অন্য মিষ্টি। ক্ষীরের পাক পাটায় গড়িয়ে লম্বা করে দুটো মুখ চেপে দেওয়া।

এবার ক্ষীরের চপ। খাস্তা কচুরি বা গুটকে কচুরির মিষ্টান্ন অবতার। সত্যি বলতে গেলে ক্ষীরের চপ আগে না লবঙ্গলতিকা আগে, এ বলা খুব শক্ত। কচুরিও খুব প্রাচীন খাদ্য।

ক্ষীরের চপ বানাতে গেলে ময়দা বেশ করে ময়ান দিয়ে ফেলে রাখতে হবে। তারপর খাস্তা কচুরির কায়দায় লেচি কেটে লেচিটা বাটির মতো করে ক্ষীরের পুর দিয়ে মুখটা মুড়ে নিতে হবে। দোকান ভেদে ওই পুরে কুচোনো কাজু, কিশমিশ, বাদাম বা কাজু মেশানো খোয়ার পাক ভরা হয়। তারপর ঘিয়ে ভেজে রসে ফেলা। ক্ষীরের চপের ময়দায় একটু রং দেওয়া হয়, নচেৎ ভাজার পর কেমন সাদাটে দেখতে লাগে।

ক্ষীরের শিঙাড়া করতে গেলে চপের মতোই পুর এবং লেচি করতে হবে। তারপর শিঙাড়ার মতো মুড়ে ঘিয়ে ভেজে রসে ফেলে একটু রেখে তুলে নেওয়া। শিঙাড়ারও বয়েস অনেক। আদি নাম শৃঙ্গাটক। নোনতা পর্বে বিশদে আলোচনা করা যাবে।

খোয়া ও ময়দা থেকে দুটো মিষ্টি হয়, গুলাবজামুন ও কালাজামুন। এ দুটো উর্দু ভাষার মতোই ভারতে মুসলিম শাসন অথবা ইন্দ-তুর্ক যোগাযোগের ফল।

ক্ষীরের সঙ্গে চিনি ময়দা মিশিয়ে সেই মিশ্রণকে গোলাপজল এবং জাফরান ভেজা দুধে স্নান করিয়ে গোল্লা পাকিয়ে ঘিয়ে ভেজে এক তারের রসে ফেললে হয় গুলাবজামুন। ভালো দোকানের গুলাবজামুনের রসে এলাচ, জাফরান, জায়ফল, দারচিনি এসব মেশানো হয়। বেশ একটা সুগন্ধ হয়। ময়দায় জাফরান দেয় বলে গুলাবজামুনের ভেতরটা ওরকম গোলাপি রং।

খুব খানদানি কিছু দোকান ছাড়া গোলাপজামে একগাদা ময়দা দেওয়া হয়, ফলে রসে ফেলার পর ভেতরটা কেমন থেসথেসে হয়ে যায়। ইদানীং এরারুট, সুজি ও পাউডার দুধের ভেজাল এই মিষ্টির মহিমা অনেকখানি নষ্ট করেছে।

গুলাবজামুনের বোন কালাজামুন, বাংলা ভাষায় কালোজাম। কালোজাম ভাজার আগে খোয়ার মিশ্রণে চিনি একটু বেশি করে দেওয়া হয় এবং ভাজাটাও কড়া হয়। ফলে চিনি পুড়ে গিয়ে কালো রং ধরে নেয়। ভাজার পর মোটা রসে একটু রেখেই তুলে নেওয়া হয়। এবার ওপরে খোয়ার গুঁড়ো বা চিনি ছেটানো হয়। কালোজাম শুকনো শুকনো। গোলাপজাম রসালো। প্রচলিত মত, ভীম নাগ গোলাপজামের আদলেই ছানা ময়দা ক্ষীর মিশিয়ে লেডিকেনি তৈরি করেন। এ মিষ্টি দুটো ছানাপ্রিয় বাঙালি সমাজ সেভাবে গ্রহণ করেনি। শখেসাধে খায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%